ক্লেমেন্তাইন ফন রাদিচ-এর কবিতা “একগাল চিরন্তন”

“আমিই প্রথম নই যাকে তুমি ভালোবেসেছ ।

তুমিই প্রথম নও যার দিকে আমি চিরকালীন

দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছি । আমরা

আমরা দুজনেই হারাবার কথা জানি যা

ছুরির ফলার মতন । আমরা দুজনেই জীবন কাটিয়েছি

ঠোঁটে ত্বকের চেয়ে বেশি ক্ষতের পরত নিয়ে । আমাদের ভালোবাসা 

মাঝরাতে কোনও খবর না দিয়ে এসেছিল ।

আমরা যখন জীবনে ভালোবাসা আসার

আশা ছেড়ে দিয়েছিলুম তখন প্রেম এলো । আমি ভাবি

তা নিশ্চয়ই তারই

অলৌকিকতার অংশ ।

এ-ভাবেই আমাদের নিরাময় হয় ।

আমি তোমাকে ক্ষমা করার মতো চুমু খাবো । তুমি

আমাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরবে যেন আমিই আশা । আমাদের বাহু

জখমে জড়ানো পটির কাজ করবে আর আমরা পরস্পরকে কথা দেবো

বইয়ের মাঝে রাখা ফুলের মতন । 

তোমার ত্বকের লবণকে 

আমি সনেট লিখবো । আমি তোমার নাকের  আঁচড়কে

উপন্যাস লিখে শোনাবো । আমি একটা অভিধান লিখবো

যার পাতায় প্রতিটি শব্দ থাকবে যেগুলো আমি তোমাকে পাবার চেষ্টায়

ব্যবহার করেছি আমার অনুভূতি জানাবার জন্য ।

তোমার জখমের দরুন আমি 

নিজেকে গুটিয়ে নেবো না ।

আমি জানি অনেকসময়ে

চিড়ধরা তোমার যাবতীয় পরিপূর্ণতায়

তোমাকে দেখার জন্য নিজেকে প্রশ্রয় দেয়াও কঠিন,

কিন্তু অনুগ্রহ করে জেনে রাখো :

তুমি সূর্যের চেয়ে উজ্বল দিনের চেয়েও বেশি

উদ্ভাসিত হও

কিংবা রাতের মতন যখন আমার কোলে ঢলে পড়ো

তোমার দেহ তখন হাজার প্রশ্নে চুরমার,

তুমি আমার দেখা সুন্দরতমা ।

তুমি যখন একটা স্হির দিন তখন তোমায় আমি ভালোবাসবো।

তুমি যখন ঘুর্ণিঝড় তখনও আমি তোমাকে ভালোবাসবো ।”

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

লুইস গ্লিক-এর কবিতা

লুইস গ্লিক-এর কবিতা : অনুবাদ মলয় রায়চৌধুরী

লাল পপিফুল

বড়ো ব্যাপার হল

একটা মন

না থাকা । অনুভূতি :

ওহ, আমার তা আছে ; ওগুলো

আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমার রয়েছে

স্বর্গে একজন মালিক

যার নাম সূর্য, আর মেলে ধরি

তার জন্য, তাকে দেখাই

আমার হৃদয়ের আগুন, আগুন

তার উপস্হিতির মতন ।

অমন গৌরব আর কীই বা হতে পারে

হৃদয় ছাড়া ? হে আমার ভাইরা আর বোনেরা,

তোমরা কি এককালে আমার মতন ছিলে, বহুকাল আগে,

তোমরা মানবজাতি হয়ে ওঠার আগে ? তোমরা কি

তোমাদের অনুমতি দিয়ে্ছ

একবার অন্তত মেলে ধরার, কেই বা চাইবে না

আরেকবার মেলে ধরতে ? কেননা সত্যি কথা

যা আমি এখন বলছি

তা তোমাদেরই মতন । আমি বলছি

কেননা আমি বিধ্বস্ত ।

অতীত

ফিকে আলো আকাশে ফুটে উঠছে

হঠাৎই পাইন গাছের

দুটি ডালের ফাঁকে, তাদের সূক্ষ্ম ছুঁচগুলো 

ঝলমলে পাতার ওপর খোদাই করা

আর এর ওপরে

উঁচুতে, পালকময় স্বর্গ–

বাতাসের সুবাস নাও । গন্ধটা শাদা পাইনগাছের,

বেশ তীব্র হয়ে ওঠে যখন এর ভেতর দিয়ে হাওয়া বয়

আর যে ধ্বনি জাগায় তাও সমানভাবে অদ্ভুত,

কোনো ফিল্মে বাতাসের শব্দের মতন–

ছায়ারা সরে যাচ্ছে । দড়িগুলো

নিজেদের আওয়াজ তুলছে । তুমি এখন যা শুনতে পাচ্ছ

তা পাপিয়ার ডাক, যৌনতার,

পুরুষ পাখি মাদি পাখিকে প্রণয় নিবেদন করছে–

দড়িগুলো সরে যায় । শোবার দোলনা

বাতাসে দোল খায়, বাঁধা রয়েছে

শক্ত করে দুটো পাইনের গাছে ।

বাতাসের সুবাস নাও । গন্ধটা শাদা পাইনগাছের ।

তুমি যে কন্ঠস্বর শুনছ তা আমার মায়ের

কিংবা গাছেরা যে আওয়াজ তুলছে কেবল তাইই

যখন বাতাস তাদের ভেতর দিয়ে বয়

কেননা কোন শব্দই বা তুলবে

যদি কোনোকিছুর ভেতর দিয়ে না যায় ?

প্রথম স্মৃতি

বহুদিন আগে, আমি জখম হয়েছিলুম । আমি বেঁচে রইলুম

নিজে প্রতিশোধ নিতে

আমার বাবার বিরুদ্ধে, এই জন্য নয় যে

তিনি কেমন লোক ছিলেন—

এই জন্য যে আমি কী ছিলুম : সময়ের আরম্ভ থেকে,

শৈশবে, ভেবেছিলুম

ব্যথার অর্থ

আমাকে ভালোবাসা হয় না ।

এর অর্থ আমিই ভালোবাসতুম ।

আনন্দ

একজন পুরুষ আর একজন নারী শুয়ে আছে শাদা বিছানায় ।

এখন সকাল । আমার মনে হয়

ওরা তাড়াতাড়িই জাগবে ।

বিছানার পাশে টেবিলের ওপরে একটা ফুলদানি

তাতে লিলিফুলের গোছা ; সূর্যের আলো

তাদের কন্ঠে জমে ওঠে ।

আমি দেখি পুরুষ নারীটির দিকে পাশ ফিরল

যেন তার নাম ধরে ডাকবে

কিন্তু নিঃশব্দে, নারীটির মুখের গভীরে–

জানালার প্রান্তে,

একবার, দু’বার

একটা পাখি ডেকে ওঠে ।

আর তারপর নারীটি নড়ে ওঠে ; তার দেহ

ভরে ওঠে পুরুষের শ্বাসে ।

.

আমি চোখ খুলি ; তুমি আমায় দেখছ ।

এই ঘরের ওপরই প্রায়

সূর্য সাবলীলভাবে সরে যাচ্ছে ।

তোমার মুখ দ্যাখো, তুমি বলো

নিজেরটা আমার সামনে তুলে ধরে

যেন আয়না গড়ে তুলছ ।

তুমি কতো শান্ত । আর জ্বলতে-থাকা চাকা

আমাদের ওপর দিয়ে মৃদুতায় অতিক্রম করে যায় ।

হ্যালোউইন-এর অল হ্যালোজ

এমনকি এখনও এই ভূদৃশ্য একসঙ্গে মিশছে ।

অন্ধকার হয়ে উঠছে পাহাড় । বলদেরা

ঘুমোচ্ছে তাদের নীল জোয়ালে,

খেতগুলোকে

পরিষ্কার করে ফেলার পর, আঁটিদের

সমানভাবে বেঁধে পথের পাশে ডাঁই করে রাখা ।

পঞ্চমুখি পাতার মাঝে, দেঁতো চাঁদের উদয় হয় :

.

এ হল বন্ধ্যাত্ব

ফসল তোলার পর বা মহামারীর

আর বউটি জানালার বাইরে ঝুঁকে 

হাত দুটো বাইরে, দাম চোকাবার মতন,

আর বীজগুলো

স্পষ্ট, সোনালী, ডাক দিচ্ছে

এদিকে এসো

এদিকে এসো, ছোট্ট খোকা

.

আর আত্মা গুটি মেরে বেরিয়ে পড়ে গাছের বাইরে ।

টেলিসকোপ

চোখ সরিয়ে নেবার পর একটা মুহূর্ত আসে

যখন তুমি ভুলে যাও কোথায় রয়েছ

কেননা তুমি বেঁচে ছিলে, মনে হয়

অন্য কোথাও, রাতের আকাশের নৈঃশব্দে ।

তুমি এখানে পৃথিবীতে বসবাস তুলে দিয়েছিলে।

তুমি রয়েছ অন্য কোনো জায়গায়,

এমন জায়গা যেখানে মানবজীবনের কোনো অর্থ নেই ।

তুমি দেহধারী কোনো প্রাণী নও ।

যেমন নক্ষত্ররা রয়েছে তেমনই রয়েছ তুমি,

অংশ নিচ্ছ তাদের স্হিরতায়, তাদের বিশালতায় ।

তারপর আবার তুমি পৃথিবীতে । 

রাতের বেলায়, শীতল পাহাড়ের ওপর

টেলিসকোপটা দূরে সরিয়ে রাখো ।

পরে তুমি টের পাও

এই নয় যে দৃশ্যটা নকল ।

তুমি আবার দেখতে পাও কতো দূরে রয়েছে

প্রতিটি জিনিস অন্য জিনিসগুলো থেকে ।

প্রেমের কবিতা

ব্যথা দিয়ে সব সময় কিছু গড়ে তোলা যায় ।

তোমার মা বুনতে ব্যস্ত ।

উনি আমাদের গায়ের চাদর সব রকমের লাল রঙে বোনেন ।

সেগুলো ছিল ক্রিসমাসের জন্য, আর তা তোমাকে উষ্ণ রেখেছিল

যখন কিনা উনি য়ে বারবার বিয়ে করলেন, তোমাকে

সঙ্গে নিয়ে । কীভাবে তা কাজ করতো,

যখন সেই সব বছরগুলোয় উনি নিজের বিধবা হৃদয়কে পুষে রাখলেন

যেন মৃত লোকটি ফিরে আসবে ।

আশ্চর্য নয় যে তুমি যেরকম আছ সেরকমই,

রক্তের ভয় পাও, তোমার নারীরা

যেন একটা ইঁটের দেয়ালের পর আরেকটা ।

অ্যানিভার্সারি 

আমি বলেছিলুম তুমি আশ্লেষে জড়িয়ে ধরতে পারো । তার মানে এই নয় যে

তোমার শীতল পা দুটো আমার কুঁচকি জুড়ে রাখবে ।

.

বিছানায় কেমন আচরণ করা উচিত তা কারোর কাছে শেখা দরকার তোমার ।

আমি মনে করি তোমার উচিত 

নিজের বাড়াবাড়ি নিজের কাছেই রাখো ।

.

দ্যাখো তুমি কী কাণ্ড করলে–

তুমি বিড়ালটাকে সরে যেতে বাধ্য করলে।

.

আমি চাইনি তুমি এখানে হাত দাও

আমি চেয়েছিলুম তুমি ওইখানে হাত রাখো ।

.

তোমার উচিত আমার পায়ের প্রতি আগ্রহ দেখানো ।

তুমি তা মনে করতে পারবে

পরের বার যখন কোনো পঞ্চদশীর সাথে সাক্ষাৎ ঘটবে ।

কেননা পাগুলো কোথা থেকে আসে তার আরও ব্যাপার আছে ।

ডুবে যাওয়া শিশুরা

বুঝলে, ওদের কোনো বিচারবুদ্ধি নেই।

তাই ওরা যে ডুবে যাবে সেটাই স্বাভাবিক।

প্রথমে, বরফ ওদের টেনে নেয়,

আর তারপর, সারা শীত জুড়ে, ওদের পশমের চাদরগুলো

ওরা যখন ডুবছে তখন ওদের পেছনে ভাসতে থাকে

যতক্ষণ না ওরা নীরব হয়ে যাচ্ছে ।

আর  হরেকরকম অন্ধকার হাত দিয়ে পুকুর তাদের তুলে ধরে ।

.

কিন্তু মৃত্যু নিশ্চয়ই তাদের কাছে অন্যভাবে আসে,

আরম্ভের কতো কাছাকাছি।

যেন ওরা সবসময়ই  ছিল

অন্ধ আর ওজনহীন । অতএব

বাকিটুকু স্বপ্নে দেখা, কুপি,

যে সুন্দর চাদর টেবিলটাকে ঢেকে রেখেছে,

ওদের দেহগুলোকেও ।

.

আর তবু ওরা শুনতে পায় ওদের রোজকার নামগুলো

যেন পুকুরের ওপর দিয়ে ভেসে যাওয়া প্রলোভন :

কীসের জন্য অপেক্ষা করছো তোমরা?

বাড়ি এসো, বাড়ি এসো, হারিয়ে গেছ,

জলে,  নীল আর চিরকালীন।   

একটি উপকথা

দুজন মহিলা

একই দাবি নিয়ে

বিজ্ঞ রাজার 

পায়ে পড়ল । দুজন মহিলা,         

কিন্তু একটিই শিশু । 

রাজা জানতেন   

একজন মিথ্যা কথা বলছে ।

উনি যা বললেন তা হল

বাচ্চাটাকে করা হোক

দু’টুকরো ; তা করলে 

কেউই খালি হাতে

ফিরবে না । উনি

তরোয়াল বের করলেন ।

তারপর, দু’জনের মধ্যে

এক মহিলা, একজন 

নিজের অংশ ত্যাগ করল :

তা ছিল

ইঙ্গিত, শিক্ষা ।

মনে করো

তুমি তোমার মাকে দেখলে

দুটি মেয়ের মধ্যে বিপর্যস্ত :

তুমি তখন কী করবে

তাঁকে রক্ষা করার জন্য

নিজেকে ধ্বংস করে ফেলার

ইচ্ছে ছাড়া — উনি জানতে পারবেন

কোন মেয়েটা সৎ, 

যে সহ্য করতে পারবে না

মায়ের বিভক্ত হয়ে যাওয়া ।

বুনো আইরিস ফুল

আমার দুর্ভোগের শেষে

ছিল একটা দরোজা ।

.

আমার কথা শোনো : যাকে তোমরা বলো মৃত্যু

তা মনে রেখেছি ।

.

কানাঘুষো শুনেছি, আওয়াজ, পাইন গাছের শাখা দোল খাচ্ছে ।

তারপর কিচ্ছু নয় । দুর্বল সূর্য

শুকনো ভূতলের ওপরে টিমটিম করেছে ।

.

টিকে থাকা ভয়ঙ্কর

চেতনার মতন

অন্ধকার মাটিতে কবর দেয়া ।

.

তারপর সব শেষ : যাকে তুমি ভয় পাচ্ছ, একটি

আত্মা হয়ে, আর পারছ না

কথা বলতে, আচমকা থেমে, কঠিন মাটি

সামান্য ঝুঁকে পড়ে । আর যা আমি ভেবেছিলুম

পাখিরা নিচু ঝোপে ঢুকছে-বেরোচ্ছে ।

.

তুমি যে মনে রাখতে পারোনি

অন্য জগত থেকে ফিরে এসে

আমি তোমাকে বলছি যে আমি আবার কথা বলতে পারি : যা-কিছু

বিস্মৃতি থেকে ফেরে তা ফিরে আসে

একটা কন্ঠস্বর পাবার জন্য :

.

আমার জীবনের কেন্দ্র থেকে এলো

এক বিশাল ফোয়ারা, ঘন নীল

ছায়ারা আশমানি সমুদ্রের জলে ।

নিষ্ঠা বিষয়ক একটি মিথ

যখন পাতালপুরীর দেবতা হাদিস নির্নয় নিলেন যে তিনি মেয়েটিকে ভালোবাসেন

তিনি তার জন্য পৃথিবীর একটা নকল গড়ে দিলেন,

সবকিছু একইরকম, চারণভূমি পর্যন্ত,

কিন্তু তার সঙ্গে একটা বাড়তি বিছানা ।

সবকিছু একইরকম, সূর্যের আলো পর্যন্ত,

কেননা একজন যুবতীর পক্ষে কঠিন হবে

ঝলমলে আলো থেকে দ্রুত ঘন অন্ধকারে যাওয়া ।

উনি ভাবলেন, একটু-একটু করে, রাত্রির প্রচলন করবেন,

প্রথমে গাছের পাতার ঝাঁকুনির মতন ছায়া ।

তারপর চাঁদ, তারপর নক্ষত্র । তারপর চাঁদ থাকবে না, নক্ষত্র থাকবে না ।

পারসিফোনি নিজেকে এর সঙ্গে ক্রমশ মানিয়ে নিক ।

সব শেষে, উনি ভাবলেন, যুবতীটি একে আরামপ্রদ মনে করবে ।

পৃথিবীর একটা অবিকল প্রতিরূপ

তফাত এই যে এখানে ভালোবাসা থাকবে ।

সবাই কি ভালোবাসা চায় না ?

উনি বহু বছর অপেক্ষা করলেন,

একটা জগত গড়ে তোলার জন্য, লক্ষ্য করতে লাগলেন

পারসিফোনি চারণভূমিতে ।

পারসিফোনি, যে সুবাস নেয়, স্বাদ নেয় ।

তোমার যদি খিদে থাকে, উনি ভাবলেন,

তুমি সবকিছু পাবে ।

সবাই কি রাতের বেলায় অনুভব করতে চায় না

প্রিয় শরীর, কমপাস, মেরুনক্ষত্র, 

ফিকে শ্বাস শোনার জন্য যা বলতে থাকে

আমি বেঁচে আছি, যার মানে এইও হয় যে

তুমি বেঁচে আছ, কেননা তুমি আমায় শুনতে পাচ্ছ,

তুমি এখানে আমার সঙ্গে রয়েছ । আর যখন একজন পাশ ফেরে,

অন্যজনও পাশ ফেরে—

উনি তেমনটাই অনুভব করলেন, অন্ধকারের মালিক,

পারসিফোনির জন্য গড়া 

পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে । তাঁর একথা মনে এলো না

যে ওখানে সুবাস নেয়া যাবে না,

খাওয়ার কথা তো ওঠেই না ।

অপরাধবোধ ? সন্ত্রাস ? প্রেমের আতঙ্ক ?

এগুলো উনি কল্পনা করতে পারেননি ;

কোনো প্রেমিকই ওগুলো ভাবে না ।

উনি স্বপ্ন দেখেন, জায়গাটার কী নাম দেবেন ভেবে পান না ।

প্রথমে উনি ভাবেন : নতুন নরক । তারপর : বাগান

সব শেষে উনি নির্ণয় নেন জায়গাটার নাম দেবেন

পারসিফোনির মেয়েবেলা

সমতল চারণভূমির ওপর থেকে একটা হালকা আলো উঠে আসছিল,

বিছানার পেছন দিকে । উনি যুবতীটিকে আলিঙ্গনে নেন,

উনি বলতে চান আমি তোমায় ভালোবাসি, কোনোকিছু তোমায় আঘাত করবে না

কিন্তু উনি ভাবেন

এটা ডাহা মিথ্যা, তাই শেষে উনি বলেন

তুমি মারা গেছ, কোনোকিছু তোমায় আঘাত করবে না

যা ওনার মনে হয়

এ আরও বেশি আশাব্যঞ্জক সূচনা, আরও বেশি সত্য ।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

বুল্লে শাহ : বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

আমি মসজিদে বিশ্বাস করি না

আমি কাফেরদের রীতিতে বিশ্বাস করি না

আমি শুদ্ধ নই অশুদ্ধও নই

আমি বেদ বা বইতে নেই

আমি ভাঙ আর মদে নেই

আমি হারিয়ে যাইনি অসৎ হইনি

আমি বন্ধনে নেই দুঃখে নেই

আমি বিশুদ্ধে পালিত নই

আমি জলের নই মাটির নই

আমি আগুন নই বাতাসও নই

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

আমি আরবের নই লাহোরের নই

আমি হিন্দিভাষী নাগোর শহরের নই

আমি হিন্দু নই পেশোয়ারি তুর্কি নই

আমি ধর্মের বিভেদ গড়ে তুলিনি

আমি আদম-ইভ গড়ে তুলিনি

আমি নিজের কোনো নাম দিইনি

আদি বা অন্ত আমি কেবল নিজেকে জানি

আমি আরেকজন কাউকে চিনি না

আমার চেয়ে জ্ঞানী কেউ নেই

এই বুল্লে শাহ লোকটা কে

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

আমি মোজেস নই ফ্যারাওও নই

আমি আগুন নই বাতাসও নই

আমি অশিক্ষিতদের মাঝে থাকি না

কে এই বুল্লে শাহ, দাঁড়িয়ে রয়েছে ?

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

Posted in Bulle Shah | Tagged | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা অনুবাদ করেছেন সোনালী চক্রবর্তী

115956646_285680896217721_7152302806069664394_n

Sending You The Apex, Beheaded.

Please Take Care.

 

Immolation : Sonali Chakraborty 

 

Sending you my head beloved,

Shearing from the torso,

Please take care.

Once a viewer of the visage,

You euphonised lovingly,

“Let’s fly”.

A coward, failed to dare that day.

So, sending you the top today, cut.

It’s valentine.

Decorated with a pack of gift neatly

And a card, declaring “Love you”,

It hopes to provide you everything

Once you desired for,

The death damp, saliva or tears.

You will get back the creviced beak,

And would witness every token in the chopped nob,

How the storms were aroused,

Levins waved and immersed were the ships,

All in your dalliance,

Once…

Do not you worry please,

I shampooed before dispatching.

There is no scope left for turning up the nude,

Bearing a low born saline cock.

To behold you forever,

I transmitted untied lids,

Pour some eye drops.

To unwrap, apply much delicacy,

As I sent the mouth, ripped up.

Never forget to feed with my favorites,

Like non veg followed by single malts in the evenings.

Remember to place the piece in your lap

While speaking,

Or to play the guitar in time of singing.

In every sixth month allot a facial,

Smear it with dusts of sandal.

Plant a kiss in the lips,

In every dawn, waking,

And before sleep calls for drowning.

Close both of my lids when the moon comes out,

Light keeps me awake, you know.

Whisper slowly,

Still your love is insane.

I sent you my apex sweetheart,

Tearing from the frame,

Inform about the receipt,

The Card contains mobile number, too.

 

 

 

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

জাঁ-লুক গোদার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আর্মেনীয় পরিচালক আরতাভাজ পিলিশান-এর । অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

জাঁ-লুক গোদার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আর্মেনীয় পরিচালক আরতাভাজ পিলিশান-এর 

অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

আরতাভাজ পিলিশান ( ১৯৩৮ ) একজন আর্মেনীয় চিত্রনির্মাতা, যাঁর কাজ সম্পর্কে ইউরোপে জাঁ লুক গোদারই প্রথম আগ্রহ দেখান । পিলিশান একাধারে তথ্যচিত্র ও কাহিনিচিত্র নির্মাতা , চিত্রনাট্য রচয়িতা, চলচ্চিত্রশিল্পের ইতিহাস রচয়িতা এবং ফিল্ম তাত্ত্বিক । সিনেমাটিক দৃষ্টিকোণের  ‘ডিসট্যান্স মন্তাজ’ শৈলী প্রয়োগের জন্য তিনি খ্যাত, যেমন কৃষ্ণসার হরিণদলের সঙ্গে বিশাল পলায়নকারী মানুষদের তুলনামূলক দৃশ্য । চিত্রনির্মাতা সের্গেই পারাজানোভ বলেছেন যে, পিলিশান একজন বিরল প্রতিভাধর চিত্রনির্মাতা । পিলিশানের ফিল্মগুলো তথ্যচিত্র এবং ফিচার ফিল্মের মিশ্রণ, অনেকটা আভাঁ গার্দ চিত্রনির্মাতা ব্রুস কনারের মতন, প্রথানুগত তথ্যচিত্রের মতন নয়। কিন্তু তা মায়া ডেরেনের মতো আভাঁ গার্দ সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করা যায় না, অর্থাৎ ওনার ফিল্মকে ‘অ্যাবসার্ড সিনেমা’ বলা যায় না । পিলিশানের ফিল্মগুলোকে বলা হয়েছে ‘কাব্যিক দৃষ্টিভঙ্গীকে ফিল্মে নামিয়ে আনার প্রয়াস’ । ফিল্মনির্মাণে উনি পুরোনো ফিল্মের সংগ্রহশালা থেকে কথাবস্তু নিয়ে মিশিয়েছেন, দুটি টেলিফোটো লেন্সের মাঝে তোলা দৃশ্যের মিশেল ঘটিয়েছেন । কিন্তু ওনার সংলাপহীন ফিল্মগুলো বেশ সংক্ষিপ্ত, ছয় মিনিট থেকে ষাট মিনিটের মধ্যেই আবদ্ধ । অবশ্য সঙ্গীত আর ধ্বনি-প্রয়োগকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন । ওনার বেশিরভাগ ফিল্ম কালো-শাদায় তোলা । গোদার-এর সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা প্রকাশিত হয়েছিল ‘লে মন্দে’ পত্রিকার ২ এপ্রিল ১৯৯২ সংখ্যায় ।

 

জাঁ-লুক গোদার :  কেমন পরিস্হিতিতে আপনি কাজ করেছেন ?

আরতাভাজ পিলিশান : আমি আমার সব ফিল্মই আরমেনিয়ায় তুলেছি, তবে মসকো থেকে সাহায্য নিয়েছি । আমি পুরোনো ব্যবস্হার গুণগান করতে চাই না, কিন্তু তার বিরুদ্ধে নালিশও করতে চাই না । অন্তত ওদের একটা সিনেমাটিক ইন্সটিটিউট ছিল, যেখানে খুব ভালো প্রশিক্ষণ পাওয়া যেতো । চিত্রনির্মাণ আমরা কেবল সোভিয়েট ইউনিয়নেই শিখিনি বরং সারা পৃথিবীতে শিখেছি, আর সেসময়ে প্রত্যেকেরই  নিজের কন্ঠস্বর খুঁজে পাবার সুযোগ ছিল । আমি এতো কম ফিল্ম তৈরি করেছি বলে তখনকার এসট্যাবলিশমেন্টকে দায়ি করতে চাই না ; বলা যায় যে, আমার কিছু ব্যক্তিগত সমস্যা ছিল । আমি জানি না নতুন ব্যবস্হায় কী ঘটতে চলেছে । আশা করি আমি ফিল্মের কাজ চালিয়ে যেতে পারব ; সমস্যা তো সব সময়েই থাকে, যেমন ফ্রান্সে রয়েছে, প্রযোজনা সম্পর্কিত সমস্যা আর জনগণের মাঝে সম্পর্কের সমস্যা । এখন পর্যন্ত আমার সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হল ফিল্ম তৈরি করার পর তার বিতরণ ।

জাঁ-লুক গোদার : আমি জানতে পারলুম কেননা নিয়নে তথ্যচিত্রের উৎসবে ওগুলো দেখানো হচ্ছিল, আমি যেখানে থাকি তার কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে । লুসানের সিনেমাথেকের পরিচালক ফ্রেডি বশ, সেগুলোর কপি করার জন্য “সোভিয়েট নিয়ম” অনুসরণ করেছিলেন : উনি রাতের বেলায় কপি করতেন আর আমাদের দেখাতেন — অ্যানে-মারি মিয়েভিল আর আমাকে । আমার ওপর সেগুলো গভীর প্রভাব ফেলেছিল, কিন্তু পারাদজানভের ফিল্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ; উনি মনে হয় পারস্যের জাজিম বোনা আর সাহিত্যের ঐতিহ্যের কাছাকাছি । আপনার ফিল্মগুলো, আমার মনে হয়েছে, কেবল সিনেমাটিক ঐতিহ্য থেকেই জন্মাতে পারে । যেমন আইজেনস্টাইন, দোভঝেঙ্কো আর ভেরতভ একটা ফিল্ম তৈরি করে এমন প্রভাব ফেললেন যাকে বলা চলে ফ্ল্যাহার্টি বা কিউবার তথ্যচিত্র নির্মাতা সানটিয়াগো আলভারেজের মতন । বলা যায় এক ধরণের ফিল্ম, যা  একই সঙ্গে মৌলিক এবং ঐতিহ্যময়, একেবারে আমেরিকার বাইরে, যেগুলো পৃথিবীর চলচিত্রজগতে বেশ ক্ষমতাধর । এমনকি রোম শহরও, খোলামেলা একটা মহানগর, আমেরিকার কাছে ঋণী । যখন দখলকারীর কবজায় দেশটা থাকে, তখন প্রতিরোধের সমস্যা হল কেমন করে তাকে প্রতিরোধ করা হবে । আমি যখন আপনার ফিল্মগুলো দেখলুম তখন মনে হয়েছিল, তথাকথিত সমাজবাদী ব্যবস্হার যতোই গলদ থাকুক, একটা সময়ে কয়েকজন ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্ব ভিন্নভাবে চিন্তা করতে সফল হয়েছিলেন । হয়তো তা বদলে যেতে চলেছে । আমার কথা যদি বলি, বাস্তবের , আর তাকে ব্যবহারের প্রতিনিধিত্বকারী উপায়গুলোর সমালোচক হিসাবে, আমি রুশ চিত্রনির্মাতদের টেকনিককে পুনরাবিষ্কার করলুম, যাকে ওনারা বলতেন মন্তাজ । গভীর চিন্তার ফসল হিসাবে মন্তাজ, যে অর্থে আইজেনস্টাইন এল গ্রেকোকে বলেছিলেন টোলেডোর সবচেয়ে বড়ো মন্তাজশিল্পী ।

আরতাভাজ পিলিশান : মন্তাজ সম্পর্কে আলোচনা করা কঠিন । শব্দটা নিঃসন্দেহে ভুল । হয়তো বলা উচিত “শৃঙ্খলার প্রণালী”। টেকনিকাল প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে, গভীরতার প্রতিফলন হিসাবে আলো ফেলা ।

জাঁ-লুক গোদার : মন্তাজের রুশ প্রতিশব্দ কী ? কোনো প্রতিশব্দ নেই ?

আরতাভাজ পিলিশান : হ্যাঁ, মন্তাজ ।

জাঁ-লুক গোদার : যেমন, উদাহরণ দিই, “ইমেজ” শব্দের দুটি প্রতিশব্দ আছে রুশ ভাষায়। সেগুলো কাজে লাগে । প্রতিটি দেশের সিনেমাটিক শব্দের একটা করে অভিধান হলে আগ্রহের ব্যাপার হবে । আমেরিকানদের দুটো শব্দ আছে : “কাটিঙ” আর “এডিটিঙ” ( শব্দটা “এডিটরদের” কাজের সঙ্গে যুক্ত, সেই লোকগুলো কিন্তু ফরাসি ভাষায় যাদের বলা হয় “editeur’, তা নয়, এই ফরাসি শব্দটা অনেকটা “প্রযোজক” বলতে যা বোঝায়, তাই। শব্দগুলো দিয়ে একই জিনিসকে বোঝায় না, আর ওরা “মন্তাজ” বলতে যা বোঝায় তার ধারেকাছে আসে না ।

আরতাভাজ পিলিশান : অভিধাগুলোর দরুণ কথা বলতে আমাদের অসুবিধা হয় । একই সমস্যা হয় “documentaire” ( documentary ) শব্দ নিয়ে । ফরাসি ভাষায় আপনারা যাকে বলেন “কাহিনিচিত্র”, রুশভাষায় আমরা তাকে বলি “শিল্পচিত্র” । অথচ ফরাসিতে সব ফিল্মই শৈল্পিক হতে পারে । রুশ ভাষায় আরও দুটি অভিব্যক্তি আছে, “played film” এবং “non-played film” ( গোদার শব্দদুটির প্রতিশব্দ করেছিলেন “le cinema joue” এবং “cinema non joue” — এই সাক্ষাৎকারের পর গোদার একটা ছোটো ভিডিও তুলেছিলেন Les enfants jouent a la Russie অর্থাৎ ‘রাশিয়ায় শিশুদের খেলা’ নামে । )

জাঁ-লুক গোদার : ও ব্যাপারটা আমেরিকানদের মতন, যারা গল্পের চিত্রায়নকে বলে “ফিচার ফিল্ম” । ফিচার মানে মুখের বৈশিষ্ট্য, বাহ্যিক গঠন, যে ব্যাপারটা ‘তারকা’দের চেহারা থেকে এসেছে । এই সমস্ত ব্যাপার বুঝতে পারার জন্য অনেক কিছু করা দরকার, যেমন ধরা যাক ফরাসি “copie standard” ( যাতে শব্দ আর ছবি একত্রিত করা হয় ), ইংরেজরা তাকে বলে “married print”, আমেরিকানরা বলে “answer print”, ইতালীয়রা বলে “copia campoione” ( first-rate copy ) — আর তা মুসোলিনির সময় থেকে চলে আসছে। কিন্তু সবচেয়ে সিরিয়াস ব্যাপার হল  documentaire/documentary-র ভুল ব্যাখ্যা । আজকাল তথ্যচিত্র ও কাহিনিচিত্রের মধ্যে পার্থক্য, তথ্যচিত্র এবং কমার্শিয়াল ফিল্মের মধ্যে পার্থক্য, এমনকি তাকে শৈল্পিক ফিল্ম বললেও, তথ্যচিত্রের একটা নৈতিক ভঙ্গী থাকে যা ফিচার ফিল্মের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় । “নিউ ওয়েভ” সব সময় দুটিকে মিশিয়ে ফেলেছে ; আমরা বলতুম যে রাউচ অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক তার কারণ উনি কাহিনি তৈরি করতেন তথ্যচিত্রের গুণাগুণ দিয়ে, আর রেনোয়াও তাই করতেন, কেননা উনি তথ্যচিত্র তৈরি করতেন কাহিনির গুণাগুণ দিয়ে ।

আরতাভাজ পিলিশান : ব্যাপারটা আর পরিচালনার সমস্যা নয় । ফ্ল্যাহার্টিকে অনেক সময়ে তথ্যচিত্র নির্মাতা বলে মনে করা হয় ।

জাঁ-লুক গোদার : ওহ, নিশ্চয়ই । উনি একজন তথ্যচিত্র নির্মাতা, যিনি সবাইকে এবং সমস্তকিছুকে পরিচালনা করেছেন । নানুক, ম্যান অফ আরান, লুইজিয়ানা স্টোরি — প্রতিটি শট পরিচালনা করা হয়েছে অত্যন্ত সাবধানে । ওয়াইজম্যান যখন বড়ো ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোকে নিয়ে ফিল্ম তৈরি করলেন, ‘দি স্টোর’, উনি ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলোর নিজেদের পরিচালনা আর কাহিনিকেও গুরুত্ব দিয়েছিলেন ।

আরতাভাজ পিলিশান : একই কারণে আমি কখনও ফিল্মস্টুডিও বা টেলিভিশন স্টুডিওর কাঠামোর ভেতরে কাজ করার প্রস্তাব দিইনি । আমি এমন জায়গা খোঁজার চেষ্টা করেছি যেখানে শান্তিতে ফিল্ম তোলা যায় । অনেক সময়ে তা টিভির জন্যেও করতে হয়েছে । সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল নিজস্ব ভাষায় কথা বলতে পারা, নিজের ফিল্মের ভাষায় । অনেক সময়ে লোকে বলে যে ফিল্ম হল অন্যান্য শিল্প আঙ্গিকের সমন্বয় । আমি তাকে সত্যি বলে বিশ্বাস করি না । আমার ধারণা, ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল ‘টাওয়ার অফ ব্যাবেল’-এ, যেখানে আরম্ভ হয়েছিল ভাষার বিভাজন । টেকনিকাল কারণে অন্যান্য শিল্প আঙ্গিকের পর তা দেখা দিয়েছে, কিন্তু বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে তা আগে এসেছে । আমি বিশুদ্ধ সিনেমা তৈরির চেষ্টা করি, যার জন্য অন্যান্য শিল্প থেকে কিছুই নিই না ।  আমি একটা এমন সেটিঙ খোঁজার চেষ্টা করি যার চারিধারে আবেগের চৌম্বকীয় ক্ষেত্র গড়ে তোলা যায় ।

জাঁ-লুক গোদার : কিছুটা নিরাশাবাদী হবার কারণে, আমি সমস্ত ব্যাপারের আরম্ভের আগেই শেষটা দেখতে পাই । আমার কাছে, সিনেমা হল শিল্পের শেষ প্রতিভাস, যে ধারণাটা পাশ্চাত্য জগতের । অসাধারণ পেইনটিঙের যুগ শেষ হয়ে গেছে, অসাধারণ উপন্যাস উধাও হয়ে গেছে। সিনেমা ছিল, আপনি যদি মানেন, ব্যাবেলের আগেকার ভাষা, যা সবাই বিষয়টায় শিক্ষা ছাড়াই বুঝতে পারতো । মোৎসার্ট রাজকুমারদের সামনে বাজাতেন, চাষারা তা শুনতো না, যখন কিনা চ্যাপলিন সকলের জন্য অভিনয় করতেন । ফিল্মনির্মাতারা এই অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়েছিলেন যে ফিল্মের ভিত্তির জন্য কী মৌলিক, আর এই ধরণের অনুসন্ধান, আমি আরেকবার মনে করিয়ে দিই, অনেকটা পাশ্চাত্য জগতের ব্যাপার । এটা একটা মন্তাজ । এই বিষয়ে লোকে অনেক আলোচনা করেছে, বিশেষ করে পরিবর্তনের সময়ে । বিংশ শতাব্দীতে সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তন ছিল রুশ সাম্রাজ্যের সোভিয়েত রাষ্ট্রে রূপান্তরণ ; স্বাভাবিকভাবে, রুশরাই সেই অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেশি প্রগতি করেছিল, তার কারণ বিপ্লবের ফলে সমাজ নিজেই আগের আর পরের মন্তাজ তৈরি করে ফেলছিল ।

আরতাভাজ পিলিশান : ফিল্ম নির্ভর করে তিনটি ব্যাপারে : পরিসর, সময় এবং বাস্তব বিচলনে । এই তিনটি উপাদান প্রকৃতিতে বর্তমান, কিন্তু শিল্পের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র সিনেমা তাদের পুনরাবিষ্কার করতে পারে । তাদের ধন্যবাদ যে বস্তুর গোপন ক্রিয়াকে আবিষ্কার করা সম্ভব। আমি নিশ্চিত যে ফিল্ম দর্শনের, বিজ্ঞানের, শিল্পের ভাষায় যুগপৎ কথা বলতে পারে । প্রাচীন যুগ হয়তো এই অভেদের সন্ধান করতো ।

জাঁ-পল গোদার : এই একই ব্যাপার পাওয়া যাবে যদি আমরা অভিক্ষেপের ধারণা সম্পর্কে ভাবি, যেমন তা উদ্ভূত আর বিকশিত হয়েছিল যতক্ষণ না আমরা তা টেকনিকালি অভিক্ষেপের যন্ত্রাদির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছি । গ্রিকরা প্ল্যাটোর বিখ্যাত গুহার তত্বের কথা কল্পনা করতে পেরেছিলেন । এই পাশ্চাত্য ধারণা, যা বৌদ্ধধর্ম বিশ্বাসীরা অনুমান করেননি, অ্যাজটেকরাও করেননি, খ্রিষ্টধর্মে অবয়ব পেলো, যা গড়ে উঠেছে কোনও বৃহৎ আশার  বনেদের ওপরে । পরে তা গণিত বিশেষজ্ঞদের মাঝে ব্যবহারিক আঙ্গিকের বিষয় হয়ে উঠলো, যাঁরা আবিষ্কার করলেন — আবার সেই পশ্চিমের ব্যাপার — বর্ণনামূলক জ্যামিতি । পাসকাল এই ব্যাপারে অনেক খেটেছিলেন, সেই একই ধার্মিক, আধ্যাত্মিক অনুচিন্তন, মোচক সম্পর্কে তাঁর ধারণার ব্যাখ্যা দিয়ে । পরে আমরা পেলুম জাঁ-ভিক্টর পোন্সলেট, নেপোলিয়ানের সৈন্যবাহিনীর এক বিদ্বৎজন। তাঁকে রাশিয়ার কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছিল, আর সেখানেই তিনি আকারের বৈশিষ্ট সম্পর্কে  তাঁর তত্ত্বের ছক কষতে পারলেন, যা কিনা বস্তু সম্পর্কে আধুনিক তত্বের বনেদ। কারাগারে ওনার আবিষ্কার কাকতালীয় ছিল না । ওনার সামনে ছিল একটা দেয়াল, আর সব কারাবন্দীরা যা করে তিনিও তাই করছিলেন: উনি দেয়ালে অভিক্ষেপ ঘটালেন । পালাবার উগ্র ইচ্ছে । গণিতবিদ হবার দরুণ তিনি নিজেকে সমীকরণে প্রকাশ করলেন । উনিশ শতকের শেষে এলো প্রযুক্তিগত উপলব্ধির সঙ্গতি । সেই সময়ে একটা আগ্রহব্যঞ্জক ব্যাপার ছিল ফিল্মে শব্দের অনুপ্রবেশ । এডিশন প্যারিসে এসেছিলেন ডিস্কের সঙ্গে চোখে দেখা যায় এমন দর্শনীয় টেপ নিয়ে। তা এখনকার মতনই কমপ্যাক্ট ডিস্কের ব্যাপার ছিল, যা আজও কিছু স্টুডিও ব্যবহার করে, তার সঙ্গে ফিল্মের ডিজিটাল শব্দাবলীকে মেশাবার খাতিরে । আর তা একটা প্রচলিত ধারা হয়ে উঠল ! অসম্পূর্ণতা নিয়েই, অন্যান্য ছবির মতন, তা চলতে লাগল, আর টেকনিকে উন্নয়ন ঘটাতে পেরেছিল । কিন্তু লোকেরা তা চাইতো না । লোকেরা সাইলেন্ট সিনেমা পছন্দ করত ; তারা কেবল দেখতে চাইতো ।

আরতাভাজ পিলিশান : শেষ পর্যন্ত যখন শব্দ এলো, বিশ শতকের শেষে, মহান চিত্রনির্মাতারা, যেমন গ্রিফিথ, চ্যাপলিন আর আইজেনস্টাইন, ব্যাপারটা সম্পর্কে তাঁদের ভীতি ছিল । তাঁদের মনে হয়েছিল শব্দের অনুপ্রবেশ তাঁদের এক পা পেছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে । তাঁরা ভুল ছিলেন না, কিন্তু তাঁরা যে বিষয়ে ভাবছিলেন, তা সেই কারণে নয় ; শব্দ মন্তাজের মাঝে মাথা গলায়নি, তা ইমেজকে সরিয়ে তার জায়গায় আসতে চেয়েছিল ।

জাঁ-লুক গোদার : ইউরোপে ফ্যাসিজমের উথ্থানের সঙ্গে টকিজের প্রযুক্তি এসেছিল, আর সেই সময়েই আবির্ভাব হয়েছিল বক্তাদের । হিটলার ছিল একজন বড়ো বক্তা, মুসোলিনিও তাই, চার্চিল, দ্য গল আর স্ট্যালিন । টকি ছিল ভাষার ওপরে থিয়েটারের দৃশ্যের বিজয়, আপনি একটু আগে যে কথা বলছিলেন, ব্যাবেলের অভিশাপের আগে ভাষা যে অবস্হায় ছিল ।

আরতাভাজ পিলিশান : ভাষাকে পুনরুদ্ধার করার জন্য আমি যা ব্যবহার করি তাকে বলব “চিত্রকল্পের অনুপস্হিতি” । আমার মনে হয় লোকে ছবিগুলো শুনতে পায় আর আওয়াজকে দেখতে পায় । আমার ফিল্মগুলোতে ছবিগুলো আওয়াজের পাশেই সংশ্লিষ্ট হয়ে অবস্হান করে আর আওয়াজগুলো ছবির পাশে । এই পারস্পরিক বিনিময়গুলো থেকে যে ফলাফল পাওয়া যায় তা নির্বাকযুগের ফিল্মের মন্তাজ থেকে আলাদা, কিংবা বলা ভালো, যে “ফিল্মগুলো কথা বলত না” তাদের থেকে ।

জাঁ-পল গোদার : আজকালকার দিনে ছবি আর আওয়াজ পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ; লোকে টেলিভিশন সম্পর্কে বেশি ওয়াকিবহাল । একদিকে ছবি আর আরেক দিকে আওয়াজ, এবং এখন আর এই দুটির পরস্পরের সঙ্গে স্বাস্হ্যকর ও বাস্তব সম্পর্ক নেই । তারা নিছক রাজনৈতিক প্রতিবেদন হয়ে গেছে । সেই কারণেই পৃথিবীর প্রতিটি দেশে বিশ্ব-টেলিভিশন এখন রাজনীতির কবজায় । আর এখন রাজনীতি নতুন ধরণের ছবি গড়ার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে ( তথাকথিত “হাই ডেফিনিশন” ), এমনই একটা আঙ্গিক যা বর্তমানে কেউই চায় না । এই প্রথমবার রাজনৈতিক ক্ষমতাধারীরা বলতে বাধ্য হয়েছেন : তোমরা এই জানালা দিয়ে এই ফিল্মের ছবিগুলো দেখতে পাবে । এমন ছবি, যার আঙ্গিক একতলার ছোটো জানালার মাপের, ফুটপাথের স্তরে একটা ছোটোখাটো ব্যাপার, যার আঙ্গিক চেকবইয়ের মতন ।

আরতাভাজ পিলিশান : আমি ভেবে অবাক হই যে টেলিভিশন আমাদের কী দিয়েছে। তা দূরত্বকে নিশ্চিহ্ণ করে দিতে পারে বটে, কিন্তু কেবল সিনেমাই সময়কে পরাজিত করতে পারে, মন্তাজ টেকনিকের দরুন । সময়ের এই জীবাণু — সিনেমা তার ভেতর দিয়ে যেতে পারে । কিন্তু টকি আসার আগে ওই পথে তা বেশ দূরে সরে গেছে । সন্দেহ নেই যে তার কারণ হল মানুষ ভাষার চেয়ে বড়ো, শব্দের চেয়ে বড়ো । আমি মানুষের ভাষার চেয়ে মানুষকে বেশি বিশ্বাস করি।

[ ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী ]

 

Posted in Jean-Luc Godard | Tagged | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

জাঁ-লুক গোদার-এর প্রেমিকা ও প্রথম স্ত্রী আনা কারিনার সাক্ষাৎকার । অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

জাঁ-লুক গোদার-এর প্রেমিকা ও প্রথম স্ত্রী আনা কারিনার সাক্ষাৎকার

অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

কাভে জাহেদি একজন মার্কিন চিত্র পরিচালক । তাঁর বাবা-মা ইরান থেকে আমেরিকায় চলে গিয়েছিলেন, সেখানে কাভে জাহেদির জন্ম হয় ; জাহেদির জন্মের বছরই জাঁ-লুক গোদারের ‘ব্রেথলেস’ ফিল্মটি মুক্তি পেয়েছিল । তিনি ছিলেন গোদারের ভক্ত । আনা কারিনা ( ১৯৪০ – ২০১৯ ) যখন বার্ধক্যে পৌঁছে গেছেন তখন এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন কাভে জাহেদি ।

জাহেদি : আপনি কি এখনও অভিনয় করছেন ?

কারিনা : জানো, আমি এখন বুড়ি হয়ে গেছি তো, তাই আর অভিনয়ের প্রস্তাব বেশি পাই না, কিন্তু তা থেকেও আমি যে চরিত্র পছন্দ করি তাতেই কেবল অভিনয় করি । আমি চিরকাল এই রকমই ছিলুম । আমি টাকার পেছনে বা ওই ধরনের ব্যাপারের পেছনে ছুটিনি । যদি ভালো হয়, তাহলে অভিনয় করি, এমনকি ছোটো ভূমিকাতেও । কিন্তু আমার পছন্দ না হলে, আমি বলে দিই, “হ্যালো, গুডবাই”, ব্যাস ।

জাহেদি : আপনি কি আরও কিছু করতে চান, যতোদিন বেঁচে আছেন, মারা যাবার আগে ?

কারিনা : মারা যাবার আগে ? দেখবো…( হাসতে থাকেন ) । তুমি বেশ মজার লোক ! না, আমি জানি না । অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা করে আমি খুশি আর, তোমাকে বলি, লোকে হাসে। আমি লোকেদের হাসাই । বেশ ভালো ব্যাপার । বেশ ভালো সময় কাটে । আর যেখানে আমি থাকি, প্রতিবেশীদের সবাইকে আমি চিনি । আমি তিন পা হেঁটেছি কি, কেউ বলে ওঠে, “আনা, কেমন আছেন ?” বুঝলে, অনেকটা গ্রামের মতন ।

জাহেদি : তার মানে আপনি জীবন উপভোগ করছেন ?

কারিনা : বুঝলে, আমি চিরকালই উপভোগ করেছি । অনেকসময়ে উথ্থান-পতন তো থাকেই। কিন্তু আমি দিব্বি টিকে গেছি ।

জাহেদি : তাহলে এখন কোন ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে আপনি আগ্রহী ?

কারিনা : আমি তিনটে বই লিখেছি — দুটো বাচ্চাদের জন্য । আমি “আগলি ডাকলিঙ” আবার নতুন করে লিখেছি । তুমি জানো তো, হ্যান্স খ্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন । আমি নতুন করে লিখেছি, আধুনিক ভার্শান । তারপর আমি লিখেছি ‘দি লিটল মারমেইড’ যেটা পরের বছর প্যারিসে সঙ্গীতনাট্য হবে ।

জাহেদি : আপনার ভারশানের ?

কারিনা : হ্যাঁ, আমার ভারশানের ।

জাহেদি : দারুণ । তার মানে আজকাল আপনি লেখালিখি করছেন ?

কারিনা : আমি লিখছি, আমি গান গাইছি, আমি যা করছি, জানো তো…

জাহেদি : আপনি যে ফিল্মগুলো পরিচালনা করেছিলেন, আমি সেগুলো খুঁজছিলুম । আমি সেগুলো কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না ।

কারিনা : কে জানে, জানি না । জীবন এই রকমই । হয়তো তুমি জানতে পারার আগে মারা যেতে পারো ।

জাহেদি : ( হেসে ) : হ্যাঁ, হয়তো, আপনার তেমনই ঘটার সম্ভাবনা ।

কারিনা : প্রথমটার নাম ছিল “একসঙ্গে থাকা”। Vivre Ensemble. আমি নিজে প্রযোজনা করেছিলুম ।

জাহেদি : আশা করি একদিন সেটা খুঁজে পাবো ।

কারিনা : আমিও তাই ভাবি ।

জাহেদি : গোদার আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিলেন । আর আপনারা দুজনে যে ফিল্মগুলো করেছিলেন সেগুলো ওনার সবচেয়ে ভালো ফিল্ম । আর অনেক গৌ্ররবজনক । আমি চিরকাল ভেবেছি আপনার আর গোদারের সম্পর্ক নিয়ে একটা ফিল্ম করব । আমি জানি, একজন পরিচালক এখন গোদার আর অ্যানে উইয়াজেমস্কির সম্পর্ক নিয়ে একটা ফিল্ম করছেন, ঠিক কি না ?

কারিনা : ওহ, আমি সে ব্যাপারে জানি না তো ।

জাহেদি : হ্যাঁ, যে ভদ্রলোক ‘দি আর্টিস্ট’ তৈরি করেছিলেন ।

কারিনা : আচ্ছা ?

জাহেদি : হ্যাঁ, উনি একটা ফিল্ম করছেন, আর আমার মনে হয় লুই গারেল তাতে গোদারের ভূমিকায় অভিনয় করছেন ।

কারিনা : লুই গারেল গোদারের ভূমিকায় অভিনয় করছেন ? উনি তো আমার বন্ধু ! আমি জানতুম না !

জাহেদি : দু দিন আগে অ্যানাউন্স করা হয়েছে ।

কারিনা : দুদিন আগে ? আমি তো এখানে দশ দিনের বেশি রয়েছি । দারুণ খবর ।

জাহেদি : অ্যানে উইয়াজেমস্কি একটা বই লিখেছিলেন ।

কারিনা : হ্যাঁ, আমি সেটা পড়েছি ।

জাহেদি : ফিল্মটা সেই বই থেকেই তৈরি হবে । কিন্তু, আমি বলতে চাই, গোদারের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ফিল্মের ইতিহাসে তো আরও গুরুত্বপূর্ণ ।

কারিনা : সেটা…আমি অবাক । আমি সত্যই বিস্মিত । ওরা ওই বইটা থেকে ফিল্ম তৈরি করছে?

জাহেদি : হ্যাঁ ।

কারিনা : হ্যাঁ, বইটার নাম…

জাহেদি : উন অন আপরেস ( এক বছর পরে )।

কারিনা : হ্যাঁ ।

জাহেদি : গোদারের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক নিয়ে কেউ ফিল্ম তৈরি করতে চাইলে আপনি কি রাজি হবেন ?

কারিনা : ওহ, না । আমি তা চাইব না ।

জাহেদি : কেন ?

কারিনা : কেননা, তুমি জানো, ব্যাপারটা ব্যক্তিগত ।

জাহেদি : আপনাদের সম্পর্ক নিয়ে স্মৃতিকথা বা তেমন কিছু লিখতে চান না ?

কারিনা : মানে, সেটা আলাদা ব্যাপার । তুমি তো ফিল্মের কথা বলছ, নয়কি ?

জাহেদি : হ্যাঁ । আপনি যদি স্মৃতিকথা লেখেন তাহলে শেষ পর্যন্ত কেউ না কেউ একটা ফিল্ম করবেই ।

কারিনা : মানে, আমি মারা গেলে হয়তো ঠিকই হবে । আমি ভাবছি ব্যাপারটা বেশ মজার, কেননা বইটা, আমি জানি না, ওটা বিচ্ছিরি, নয়কি ?

জাহেদি : ওহহো । আপনি ওই মহিলাকে চিনতেন ?

কারিনা : হ্যাঁ, ও তো এখন লেখিকা । ও আর অভিনেত্রী নয় । অ্যানে উইয়াজেমস্কির সঙ্গে জাঁ-লুক গোদারের বিয়ে হয়েছিল, আমার পরে ।

জাহেদি : আপনাদের দুজনকে ছাড়া আর কারোর সাথে ওনার বিয়ে হয়েছিল কি ?

কারিনা : না । ও আমাকে বিয়ে করেছিল তারপর সোজা গিয়ে বিয়ে করল অ্যানেকে।

জাহেদি : আপনাদের বিচ্ছেদের পর ?

কারিনা : সবায়ের নামই অ্যানে । বেশ মজার ব্যাপার ।

জাহেদি : আর অ্যানে-মারি মেলভিল, ঠিক বলছি তো ?

কারিনা : হ্যাঁ, সেই মেয়েটার নামও অ্যানে । আর প্রথমজন যাকে ও জানতো তার নাম ছিল অ্যানে কোলেত ।

জাহেদি : তাই নাকি ? আপনাকে দেখার আগে যে মেয়েটির সঙ্গে ওনার সম্পর্ক ছিল তার নামও অ্যানে ?

কারিনা : হ্যাঁ ।

জাহেদি : ওহ, মজার ব্যাপার । আপনাদের এখনও নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা হয় ?

কারিনা : ও কারোর সঙ্গেই কথা বলে না ।

জাহেদি : হয়তো উনি বিরক্ত কিংবা হয়তো উনি…

কারিনা : না, ও চায় না, আমার ধারণা । কে জানে, ঠিক জানি না । আমি কীই বা জানি ? আমি তো আর ওর মাথার ভেতরে থাকি না ।

জাহেদি : শেষ কবে ওনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল ?

কারিনা : অনেক, অনেক কাল আগে । কিন্তু এক সময়ে ও একজনকে বলেছিল, “আনা কারিনার সঙ্গে যোগাযোগ করো, কারণ আমার সম্পর্কে ওই সবচেয়ে ভালো জানে ।”

জাহেদি : সে কথা সত্যি, তাই না ?

কারিনা : মানে, ওর সম্পর্কে কোনো খারাপ কিছু বলার নেই আমার ।

জাহেদি : ওনার মধ্যে কী এমন দেখে আপনি প্রেমে পড়েছিলেন ?

কারিনা : জানো তো, আমি তখন আঠারো বছর বয়সী, বা তার কাছাকাছি ।

জাহেদি : ১৯৫৯ ?

কারিনা : হ্যাঁ, ঠিক বলেছ ।

জাহেদি : “ব্রেথলেস”-এর সময়ে ?”

কারিনা : হ্যাঁ । ও আমাকে একটা ছোটো ভূমিকায় অভিনয় করতে বলেছিল কিন্তু আমি তা করিনি কেননা আমার পোশাক খুলে ফেলতে হতো ।

জাহেদি : উনি আপনার চেয়ে দশ বছরের বড়ো ছিলেন ?

কারিনা : দশ বছর পুরো ।

জাহেদি : উনি ছিলেন ২৮ বছরের আর আপনি ১৮, ঠিক তো ?

কারিনা : হ্যাঁ, সেই সময়ে বয়সের ক্ষেত্রে সেটাকে অনেক বেশি তফাত মনে করা হতো।

জাহেদি : এখনও অনেক তফাত মনে করা হয় ।

কারিনা : ততোটা নয় আজকাল । সবকিছু পালটে গেছে । কিন্তু সেই সময়ে, তুমি যদি একজন নারী হতে, তোমার কোনও কন্ঠস্বর থাকতো না । তুমি যদি নারী হতে, তাহলে ব্যাপারটা স্রেফ : “সুন্দরী হও আর মুখ বুজে থাকো।”

জাহেদি : কিন্তু আপনারা প্রেমে পড়লেন Le Petit Soldat ( ছোটো সৈনিক ) করার সময়ে, তাই তো ? গোদারের কোন ব্যাপার আপনাকে প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছিল ?

কারিনা : ও অত্যন্ত চিত্তহারী ছিল, আর আমি ওর প্রতি আকর্ষিত হই । আমি কখনও টের পাইনি । ব্যাপারটা এমন যে তুমি সামলাতে পারছ না । আমি অনেকটা, কী বলব, তুমি কী বলো ব্যাপারটাকে ?

জাহেদি : চৌম্বকত্ব ?

কারিনা : মানে, আর কোনো কিছু না ভেবেই । ও আমাকে একট ছোটো প্রেমপত্রে লিখেছিল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, মাঝরাতে কাফে দ্য লা পাইতে দেখা করো”– এমন ছিল যে আমি তাছাড়া আর কিছু করতে পারতুম না । আমি তার কারণ ব্যাখ্যা করতে পারব না ।

জাহেদি : আর আপনার সেসময়ে একজন বয়ফ্রেণ্ড ছিল, তাই না ?

কারিনা : হ্যাঁ, ওর খুব খারাপ লেগেছিল ।

জাহেদি : তার মানে গোদার আপনাকে ওই চিঠি লেখার আগেই আপনি ওনার প্রেমে পড়েছিলেন?

করিনা : হ্যাঁ, কারণ আমরা তিন মাস ধরে শুটিঙ করছিলুম । সেটা ছিল দীর্ঘ ফিল্ম কেননা আমরা সাধারণত তিন সপ্তাহে শুটিঙ শেষ করে ফেলতুম ।

জাহেদি : ঠিক, ওনার জন্য সময়টা দীর্ঘ্য ।

কারিনা : ঠিক, বেশ দীর্ঘ্য । আর আমরা শুটিঙ থামিয়ে দিলুম, আর দুজনে দুজনের দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকতুম । ব্যাপারটা ছিল একটু একটু করে পরস্পরের দিকে টান । ব্যাখ্যা করা কঠিন । অনেক সময়ে ব্যাপারটা এরকমই ( দুই হাতে তালি বাজান কারিনা ) বুঝলে ? কিন্তু তা ছিল অত্যন্ত ধীর, একটু একটু করে, প্রেমে পড়া একটু একটু করে, ওর প্রতি আকর্ষিত হওয়া, কাছাকাছি হওয়া । জানি না কেমন করে সেটা বোঝাবো । বোধহয় আমার কাছে উপযুক্ত শব্দ নেই । কিন্তু, হ্যাঁ, আমি সেখানে গেলুম, কাজের পর, মাঝরাতে কাফে দ্য লা পাইতে । ও সেখানে বসে একটা কাগজ পড়ছিল, আর আমি ওর সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলুম। আর আমার মনে হচ্ছিল তা ঘণ্টার পর ঘণ্টা । যদিও তা হয়তো তিন মিনিট বা দুই মিনিট ছিল। আর ও হঠাৎ বলে উঠল, “ওহ এসে গেছো তুমি । চলো যাওয়া যাক।”

জাহেদি : তারপর কোথায় গেলেন আপনারা ?

কারিনা : আমরা ওর হোটেলে গেলুম । পরের দিন সকালে, আমার ঘুম ভাঙেনি, আর ও আমার আগেই বেরিয়ে গেল আর ফিরল একটা সুন্দর ধবধবে ড্রেস নিয়ে । আমি সেটা Le Petit Soldat-এ পরেছিলুম । শুধু আমার জন্য । বিয়ের পোশাকের মতন, বুঝলে ?

জাহেদি : তার মানে আপনারা দুজনে এক সঙ্গে রাত কাটালেন আর সকাল বেলায় যখন আপনার ঘুম ভাঙল আপনার জন্য একটা ড্রেস কিনে এনে উনি হাজির হলেন ?

কারিনা : হ্যাঁ । তুমি যদি ফিল্মটা আবার দ্যাখো, শাদা ফুলের নকশাকাটা ড্রেসটা তোমার মনে পড়বে ।

জাহেদি : আর উনি সকালবেলায় কিনে আনলেন, আপনারা দুজনে একসঙ্গে রাত কাটাবার পর?

কারিনা : মানে, যখন আমার ঘুম ভাঙলো, তখন ও ছিল না ।

জাহেদি : হতে পারে উনি আগেই কিনে রেখেছিলেন ?

কারিনা : না, আমার মনে হয় ও কিনতে গিয়েছিল । রাতের আগে সেটা ঘরে ছিল না ।

জাহেদি : ওই ফিল্মটা অপরূপ, কেননা আপনাকে ওনার ভালোবাসা প্রতিটি শটে দেখতে পাওয়া যায়, যেমনভাবে উনি আপনাকে ফিল্মে উপস্হাপন করেছেন । ওটা যেন কেউ একজন প্রেমে পড়ছে আর দর্শক তা ঘটতে দেখছেন । ওটা একটা গুরুত্বপূর্ণ নথি ।

কারিনা : আমরা প্রেমে পড়ছিলুম । কিন্তু জানো, আমি রাশেসগুলো কখনও দেখিনি । সেই সময়ে আমি জানতুম না তুমি যে বিষয়ে কথা বলছ । কিন্তু ফিল্মে হয়তো, এখন মনে হয়, হ্যাঁ, তাই।

জাহেদি : আমি বলতে চাইছি, দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় ।

কারিনা : নিশ্চয়ই, আমার স্মৃতিতে রয়ে গেছে ।

জাহেদি : ঠিক আছে, La Petit Soldat-এর পর আপনার যুগল হয়ে উঠলেন, তাই তো ? আপনার বয়ফ্রেণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে গেল ?

কারিনা : হ্যাঁ, আর তারপর আমার কোনও বন্ধু হয়নি ।

জাহেদি : কোনও বন্ধু নয় ?

কারিনা : না, কোনও বন্ধু নয় । কেননা আমি জাঁ-লুক গোদারের কাছে গিয়েছিলুম, তাই আমার কোনও বন্ধু জোটেনি ।

জাহেদি : তার মানে আপনি একরকমভাবে একঘরে হয়ে গিয়েছিলেন ?

কারিনা : হ্যাঁ । আমরা যখন ওর গাড়ি করে প্যারিসে ফিরলুম, ও বলল, “তোমাকে কোথায় ছেড়ে দেবো ?” আর আমি বললুম, “তুমি আমাকে ছেড়ে দিতে পারো না, কেননা আমার আর কেউ নেই । আমার শুধু তুমি আছ ।”

জাহেদি : তার কারণ আপনাকে আগের জীবন সম্পূর্ণ ছেড়ে আসতে হয়েছিল ?

কারিনা : হ্যাঁ, ঠিক তাই । আর তারপর ও বলল ঠিক আছে ।

জাহেদি : তখন আপনি ওনার সঙ্গে থাকা আরম্ভ করলেন ?

কারিনা : হ্যাঁ, হ্যাঁ, শঁজে লিজের কাছে রু শাতুব্রিয়াঁয় ইতালিয়া নামে একটা হোটেলে ।

জাহেদি : আর তারপর ?

কারিনা : আমরা সেখানে থাকা আরম্ভ করলুম, আর মাঝে মাঝে এসে ও বলত, “তুমি কি কাটিঙ রুমে যেতে চাও ?” বুঝলে, উনি ফিল্মটার কাটিঙ করছিলেন । আমি বলতুম যে হ্যাঁ । তারপর একদিন ও এসে বললে, “আমাদের জন্য তোমাকে একটা ফ্ল্যাট খুঁজতে হবে।” তাই আমাদের জন্য লা ম্যাদেলিয়েঁর পেছনে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিলুম । আমরা কিছুদিন সেখানে ছিলুম আর তারপর Le Petit Soldat ফ্রান্সে ব্যান হয়ে গেল, তুমি তো জানো, আর মনে হল যেন আমি এতোদিন কিছুই করিনি । কিন্তু তারপর আমি মিশেল দেভিলের কা্ছ থেকে আরেকটা ফিল্মের প্রস্তাব পেলুম । ( ১৯৬৩ সালে ব্যান তুলে নেয়া হয়েছিল ) ।

জাহেদি : ওহ, হ্যাঁ, মিশেল দেভিলে, হ্যাঁ, বেশ বড়ো চিত্রনির্মাতা । কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন করার ছিল, আমাদের হাতে আর বেশি সময় নেই । ( হাতঘড়ি দ্যাখে )। আমাদের আর সময় নেই।

কারিনা : তুমি যতক্ষণ ইচ্ছে সময় নিতে পারো ।

জাহেদি : আমার তিনবার বিয়ে হয়েছে, আর আমি যখন ভাবি কোন কারণে বিয়ে ভেঙে গেল, আমি বলতে পারি আমাদের বিয়ে ভেঙে গেছে এই কারণে বা ওই কারণে । আপনিও তো কয়েকবার বিয়ে করেছেন, তাই না ?

কারিনা : হ্যাঁ । ( গোদারকে ডিভোর্সের পর তিনবার বিয়ে করেছিলেন )

জাহেদি : আপনি যখন গোদারের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাবার কথা ভাবেন, তার প্রধান কারণ কী বলবেন ?

কারিনা : ওহ, আমি যে-কোনো একজনকে চাইছিলুম, বুঝলে, নিছক একজন বন্ধু । আমি ভেবেছিলুম আমার জীবন চিরকালের জন্য বরবাদ হয়ে গেছে, আমার প্রেমের জীবন । তাই আমি একজন বন্ধুর মতন মানুষকে বিয়ে করলুম ।

জাহেদি : আপনি কি এখন গোদারের বিষয়ে বলছেন না অন্য কোনো লোকের সম্বন্ধে ?

কারিনা : না, জাঁ-লুকের পরে । যখন জাঁ-লুককে বিয়ে করি তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলুম, জানো তো?

জাহেদি : তার মানে A Woman is a Woman ফিল্ম করার সময়ে আপনার কুড়ি বছর বয়স ছিল ?

কারিনা : হ্যাঁ ।

জাহেদি : ওই ফিল্মটা খুব সুন্দর । কিন্তু আমার প্রশ্ন হল : আপনারা দুজনে আলাদা হলেন কেন ? সম্পর্কটা বেশ ঝামেলার আর কঠিন ছিল । প্রধান কারণ নিয়ে আপনি কী বলবেন ?

কারিনা : বড়ো, বড়ই দুর্বহ ।

জাহেদি : উনিই দুর্বহ ছিলেন নাকি…

কারিনা : ওর ওজন অনেক ছিল ( হাসেন ) । বড্ডো দুর্বহ ছিল, সমস্ত পরিস্হিতিতে । ও ছিল বড়োই…বড়োই একপেশে চিন্তার মানুষ ।

জাহেদি : ব্যাপার তো কোনো একরকমভাবে হতে হবে ? উনি কি সমস্ত ব্যাপারে অনড় থাকতেন? পজেসিভ ?

কারিনা : না, ও অনেকসময়ে চলে যেত আর ফিরত না ।

জাহেদি : আর তা আপনাকে ক্ষুব্ধ করত ? মানে, আমি বলতে চাইছি, তা আমাকেই ক্ষুব্ধ করে তুলবে ।

কারিনা : হ্যাঁ, বলতে চাই, কোনো টেলিফোন ছিল না । এখনকার মতো ছিল না ।

জাহেদি : ( হাসে ) ঠিক, যেমন, “তুমি এখন কোথায় ?”

কারিনা : ব্যাপারটা সত্যিই সমস্যাজনক ছিল, আর আমি তখন একেবারে একা, বুঝেছ, আর তা সত্যিই মাথা খারাপ করে দেবার মতন ছিল । ও উধাও হয়ে যেত আর বলত, “আমি সিগারেট কিনতে যাচ্ছি”, আর ফিরত তিন সপ্তাহ পর ।

জাহেদি : আর কোথায় যেতেন উনি ?

কারিনা : ও বেশ জটিল । ওহ, ও আমেরিকায় চলে গেল ফকনারের সঙ্গে দেখা করতে ।

জাহেদি : উইলিয়াম ফকনার ?

কারিনা : হ্যাঁ, কিংবা ও চলে যেত সুইডেনে ইঙ্গমার বার্গম্যানের সঙ্গে দেখা করতে । ও চলে যেত ইতালিতে রোবের্তো রোসেলিনির সঙ্গে দেখা করতে । বুঝলে, চলে যেত এখানে সেখানে ।

জাহেদি : তো উনি ফকনারের সঙ্গে দেখা করলেন ?

কারিনা : আর কেমন করে আমি তা জানতে পারতুম জানো ? ও উপহার নিয়ে ফিরত ( হাসলেন ) আর আমি দেখতুম মোড়কটা ইতালীয় নাকি সুইডিশ বা যাহোক ।

জাহেদি : তাহলে আপনারা  একসঙ্গে কতোকাল দুজনে সুখি ছিলেন বলে মনে হয় ?

কারিনা : আমরা যখন শুটিঙ করতুম তখন আমরা বেশ সুখি থাকতুম, সব সময়ে ।

জাহেদি : আর তারপর যখন শুটিঙ বন্ধ হল, তখন আপনার আবার খারাপ লাগতো ?

 

কারিনা : হ্যাঁ, জানো, তারপর ও চলে যেত । ও হয়তো বলত, “আমি তোমাকে দক্ষিণ ফ্রান্সে নিয়ে যেতে চাই।” আমি বলতুম, “দারুণ হবে”। আর আমরা গাড়ি চালিয়ে দক্ষিণ ফ্রান্সে গিয়ে কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচতুম । আর আমরা দুশো কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে যেতুম, আর ও বলতেন, “ওহ আমি  দক্ষিণ ফ্রান্সে যেতে চাই না ।”

জাহেদি : উনি মত বদলে ফেলতেন ?

কারিনা : আমি বলতুম, “কী বলতে চাইছ তুমি ? মানে, তুমি বললে আমরা সেখানে আনন্দ করতে যাবো।” আর আমি ওকে ভালোবাসতুম। আর ও বলত, “আমাকে ফিরে যেতে হবে ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর সঙ্গে কথা বলার জন্য।”

জাহেদি : আপনার সঙ্গে ত্রুফোর বন্ধুত্ব ছিল ?

কারিনা : হ্যাঁ, গভীর ।

জাহেদি : আপনি ওনাকে পছন্দ করতেন ?

কারিনা : হ্যাঁ, অনেক ।

জাহেদি : ওনাকে মনে হয় ভালো লোকদের মধ্যে একজন ।

কারিনা : হ্যাঁ । তারপর বলল, “আর জাক রিভেত । আমাকে ওদের সঙ্গে কথা বলতে হবে কারন ওদের কয়েকটা কথা বলব, আমাকে কাজ করতে হবে ।” তাই আমি বললুম, “ঠিক আছে, তাহলে ফেরা যাক ।” তাই আমরা প্যারিসে ফেরার জন্য রওনা দিলুম । তারপর ও বলল, “তোমাকে বেশ মন খারাপ দেখাচ্ছে…।” আমি বললুম, “না তো, আমি একটু হতাশ হয়েছি, তুমি তো জানো, তুমিই বললে, আমরা দক্ষিণ ফ্রান্সে যাবো । আমি তো তোমার কাছ থেকে কিছুই চাইনি — তুমিই আমাকে বললে দক্ষিণ ফ্রান্সে যেতে।” ও তখন বলল, “আসলে, তুমি যদি তেমন অনুভব করো, তাহলে আমরা এক্ষুনি দক্ষিণ ফ্রান্সে যাবো।” তাই আমরা আবার পেছন ফিরলুম, আর ব্যাপারটা চলতেই থাকল, চব্বিশ ঘণ্টা ধরে, কেননা তখনকার দিনে ফ্রিওয়ে ছিল না, জানো তো, কোনো হাই ওয়ে ছিল না, কোনো ফ্রিওয়ে ছিল না । আর তারপর হঠাৎই, ও বলল, “আমরা প্যারিসে ফিরে যাচ্ছি ।” আর তারপর ও আমাকে বলল, “তোমাকে এখন বেশ ক্রুদ্ধ দেখাচ্ছে।” আমি বললুম, “হ্যাঁ।” আর তাই বললুম, “গাড়িটা থামাও,” আর আমি গাড়ি থেকে নেমে পড়লুম।  রাস্তায় চব্বিশ ঘণ্টা কাটিয়ে আমি ভীষণ চটে গিয়েছিলুম, বুঝলে তো ? আমরা পেছিয়ে আসছিলুম আর ফিরে এগিয়ে যাচ্ছিলুম দক্ষিণ ফ্রান্সের দিকে। আমি চললুম, “আমি দক্ষিণ ফ্রান্সে যাবার প্রস্তাবে হেগে দিই।” আর গাড়িতে আঘাত করতে আরম্ভ করলুম।

জাহেদি : আপনার ব্যাগ দিয়ে ?

কারিনা : না, পা দিয়ে ।

জাহেদি: ওহ, লাথি মেরে ?

কারিনা : হ্যাঁ, লাথি মেরে, গাড়িটাকে । ও বলল, “তুমি হিস্টিরিয়াগ্রস্ত হয়ে পড়েছ।” আর জবাবে আমি বললুম, “হ্যাঁ, তুমি আমাকে মোটর চালিয়ে-চালিয়ে মাথা খারাপ করে দিয়েছ।” আর আমরা সত্যিই লা কোতের দাজুরে গেলুম না । আমরা পরের সকালে ওর বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গেলুম ।

জাহেদি : শুনে মনে হচ্ছে বিয়ে করার পক্ষে উনি একজন জটিল মানুষ ।

কারিনা : হ্যাঁ । ও তাইই…বলা যেতে পারে অন্য কারোর সঙ্গে থাকার মতো মানুষ ও নয়।

জাহেদি : ঠিক ।

কারিনা : ঠিক ।

জাহেদি : তাহলে Le Petit Soldat করার সময়ে সব কিছু ভালো কেটেছিল । আপনারা প্রেম করছিলেন । Une Femme Est Une Femme শুটিঙ করার সময়ে আপনারা দুজনে মানিয়ে চলছিলেন, তারপর একটা ঘটনা ঘটল, রাগারাগি হল । আপনি পোয়াতি হলেন, আর আপনার গর্ভপাত হয়েছিল, ঠিক তো ?

কারিনা : হ্যাঁ। ফিল্মটা করার সময়ে আমি পোয়াতি হয়ে গিয়েছিলুম ।

জাহেদি : Une Femme Est Une Femme করার সময়ে ?

কারিনা : হ্যাঁ ।

জাহেদি : তার কারণ ফিল্মটা ছিল সন্তান পাবার আশা নিয়ে ।

কারিনা : আমার মনে হয় আমার আরজেনটিনা যাওয়া একেবারে উচিত ছিল না…কেননা তার আগে আমি মিশেল দেভিলের ফিল্ম Tonight or Never করেছিলুম । তারপর আমরা গেলুম মার দ্য প্লাতা ফিল্ম ফেসটিভালে । আমার অতো দীর্ঘ্য যাত্রা করা একেবারে ঠিক হয়নি ।

জাহেদি : আর আপনি এই সারাটা সময় পোয়াতি ছিলেন ?

কারিনা : হ্যাঁ । আমি ছিপছিপে ছিলুম বলে বোঝা যেতো না । আর আমার মনে হয় আমার যাওয়া উচিত ছিল না, কেননা যখন ফিরলুম তখন আমি অসুখে পড়লুম ।

জাহেদি : আপনি সন্তান হারালেন ?

কারিনা : হ্যাঁ, বেশ কয়েক মাস পরে । আমি শয্যাশায়ী ছিলুম । তখন ওরা কিছুই টের পায়নি।

জাহেদি : কতো মাসের পোয়াতি ?

কারিনা : প্রায় সাড়ে ছয় মাসের । আমি সত্যিই ভয়ানক অসুস্হ ছিলুম । আমি তখন অসুখে, আর তারপর আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল কারণ আমাকে শল্য চিকিৎসা করাতে হল আর আমি আত্মহত্যা করতে চাইলুম আর সেইসব ব্যাপার । তারপর আমরা করলুম Bande a part.

জাহেদি : ঠিক তার পরেই ?

কারিনা : ঠিক তার পরেই নয় । তার মাঝে আরও ফিল্ম করেছিলুম ।

জাহেদি : গোদারের পরবর্তী ফিল্ম ?

কারিনা : হ্যাঁ, আমি সব সময়েই অসুস্হ থাকতুম ।

জাহেদি : পোয়াতি হওয়া কি পরিকল্পনা করে করা হয়েছিল? আপনি সন্তান চাইছিলেন ?

কারিনা : হ্যাঁ ! নিঃসন্দেহে !

জাহেদি : আপনি সন্তান পাবার চেষ্টা করছিলেন ?

কারিনা : না, আমরা সন্তান পাবার চেষ্টা করিনি, এমনিই এসে গিয়েছিল ।

জাহেদি : আর তারপর, তা ছিল একরকম শেষের শুরু ?

কারিনা : মানে, যেহেতু ও তখনও ছিল, বুঝলে, আর তারপর পরের দিকে ও হাসপাতালে আসত আর আবার চলে যেত । ব্যাপারটা বেশ জটিল ছিল । হ্যাঁ, বুঝলে, তখন আমাদের কথা বলার মতন বিশেষ কিছু ছিল না, মানে মহিলাদের ।

জাহেদি : আপনি তা ফিল্মেও দেখতে পাবেন ।

কারিনা : আমাদের কোনো অধিকার ছিল না । তাই, বুঝলে, বেঁচে থাকার জন্য টাকাকড়ির প্রয়োজন হলে, বেশ কঠিন, বুঝলে, তোমার কাজ ছিল স্রেফ বসে থাকা আর শোনা আর সুন্দরী সেজে থাকা কেননা, সেটা বাদ দিলে, আর কোনো কিছু করার ছিল না ।

জাহেদি : হ্যাঁ, ব্যাপারটা একরকম মারাত্মক ।

কারিনা : “Sois belle et tais-toi.” এইটাই হল সারকথা । “সুন্দরী সেজে থাকো আর মুখ বন্ধ রাখো।”

জাহেদি : ওটা তো ফিল্মের টাইটেল, তাই না ?

কারিনা : হ্যাঁ ! ওই নামে একটা ফিল্ম আছে !

[ ফিল্মমেকার পত্রিকায় প্রকাশিত । ২০১৬ সালের ৯ মে নেয়া সাক্ষাৎকার ]

ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মলয় রায়চৌধুরী

 

Posted in Jean-Luc Godard | Tagged | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

গোদার-এর দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যান উইয়াজেমস্কির আত্মজীবনী নিয়ে ফিল্ম । অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

গোদারের দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যানে উইয়াজেম্সকির আত্মজীবনী নিয়ে তৈরি ফিল্ম ‘রিডাউটেবল’ ( আমেরিকায় নাম ‘গোদার মোনামো” ) 

রিভিউ করেছেন ফিলিপ কেম্প

“গোদার মোনামো” ( Godard Mon Amour ), প্যাশটিশ-নির্মাতা মিশেল অ্যাজানাভিশ্যু ( ‘দি আর্টিস্ট’ এবং ‘ওএসএস : ১১৭’ খ্যাত Michel Hazanavicious ) জাঁ-লুক গোদারের জীবনের একটি ঘটনাবহুল সময়ের সালতামামি তৈরি করেছেন । যে সময়টা তিনি নিয়েছেন সেটি ৩৭ বছর বয়সী গোদারের সঙ্গে উনিশ বছর বয়সী অভিনেত্রী অ্যানে উইয়াজেম্সকির বিবাহিত জীবন, ফরাসি ছাত্রদের মে ১৯৬৮ সালের দ্রোহ, যে দ্রোহের কারণে সেই বছর কান ফিল্ম ফেস্টিভাল বাতিল হয়ে গিয়েছিল, ইত্যাদি নিয়ে। ফিল্মটি অ্যানে উইয়াজেম্সকির স্মৃতিকথা (Un An Après বা One Year After”)-এর ঘটনানির্ভর । গোদার, যখন তাঁর বয়স ৮৭ বছর, এবং তিনি “Le Livre d’Image” ফিল্মটি কান ফিল্ম ফেস্টিভালে প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন,  মিশেল অ্যাজানাভিশ্যু তাঁকে নিয়ে ফিল্ম তৈরি করছেন বলা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন, “মূর্খ, মুর্খের আইডিয়া।” ব্যাপারটা কিন্তু তা নয় । ধারণাটা অসাধারণ । তবে ফিল্মটা উৎকট । উইয়াজেম্সকির জন্ম ১৪ মে ১৯৪৭ এবং মৃত্যু ৫ অক্টোবর ২০১৭ ।

 

কিন্তু অস্বাস্হ্যকর মুগ্ধতা বাদ দিয়ে নয় । গোঁড়া গোদারপ্রেমীদের কাছে “গোদার মোনামো” একটি অপরিহার্য ঘৃণা-দর্শন । যাঁরা গোদার সম্পর্কে দোনামনা, সেই দলবাজদের দৃষ্টিতে ফিল্মটা একধরণের মজার খোরাক যোগাবে । কিন্তু গোদারকে তীব্র সমর্থন  ছাড়াই আপনি এই ফিল্মে বেরঙা, হালকা, ঝকঝকে রঙের বাদামের গুঁড়ো-মাখানো বিস্কুট খেতে পাবেন । ফি্ল্ম আরম্ভ হলে আপনি গোদার সম্পর্কে দুয়েকটা কথা জানতে পারবেন — কিংবা ফ্রান্স, রাজনীতি, যৌনতা আর সিনেমা ইত্যাদি — কিন্তু নিশ্চিত হতে পারেন যে ফিল্ম শেষ হলে আপনি টের পাবেন যে বিশেষ কিছুই জানতে পারলেন না ।

 

গোদার, ভালোর জন্য হোক বা খারাপ, একজন সিনেমাটিক চিন্তাবিদ, এমনই একজন যিনি চেষ্টা করেছেন, বহুপ্রসূ এবং বিতর্কিত কেরিয়ারে, ফিল্ম মাধ্যমের দার্শনিক সম্ভাবনা এবং বৌদ্ধিক সারবস্তু, তাকে যাতে করে তোলা যায় ধারণা এবং তর্কবিতর্কের, গল্পের, ছবির এবং আবেগের আধেয় । কিন্তু অ্যাজানাভিশ্যু তার সম্পূর্ণ উল্টো দেখিয়েছেন ও করেছেন : চিত্রকল্প এবং শৈলীর অভ্রান্তচিত্ত দক্ষ নির্মাতা যাঁর বিশেষ কিছু বলার নেই এবং বিশ্বাসও নেই যে কিছু একটা বলতে হবে । গোদারের সবচেয়ে অনুকরণীয় অবদানগুলোকে দখল করে নিয়ে— বিভিন্ন সুরের মিশ্রণে ভয়েস-ওভার, পরিচ্ছদের টাইটেলগুলো পর্দায় ঝলকে-ওঠা, ফুর্তিবাজ সম্পাদনা, নগ্ন নারীদের ধাঁধায় কথাবার্তা — এগুলোয় শ্রদ্ধার চেয়ে বেশি আছে প্রতিশোধের স্পৃহা । “গোদার মোনামো” অক্লান্ত প্রয়াস করেছে তার প্রধান চরিত্রকে নিজস্ব অগভীরতায় চুবিয়ে দিতে ।

 

১৯৬৭ এবং ১৯৬৮ সালে গোদার একজন বিখ্যাত ও বিতর্কিত চিত্রপরিচালক, নিজের সময়ের একজন সাংস্কৃতিক নায়ক, নিজের খ্যাতিকে ঘষে তুলে ফেলতেও যিনি পেছপা নন এবং নিজের শিল্পকে সমসাময়িক রাজনৈতিক আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াবার চেষ্টা করছেন । উইয়াজেম্সকি ( যাঁর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন স্টেসি মার্টিন ), রক্ষণশীল লেখক ফ্রাঁসোয়া মরিয়াকের নাতনি, তখন সবে আরম্ভ করেছেন La Chinoise ফিল্মে অভিনয়, বামপন্হী ফরাসি যুবা-সংস্কৃতির মাওবাদী বাঁক-সম্পর্কিত ফিল্ম, গোদারের ব্যাঙ্গাত্মক অবদান । মেয়েটি বিয়ে করেন গোদারকে এবং মহানন্দে তার পরাণসুন্দরী ও যৌনতার আদর্শ হয়ে ওঠেন, গোদারের তিরিক্ষি মেজাজকে আকর্ষক আর তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিকে যৌনতাবর্ধক মনে হয় মেয়েটির ।

 

লুই গারেলের অভিনয়ে আংশিকভাবে গোদারের অনন্যসাধারণ প্রতিভা বাকচাতুর্যে মনোহর হয়ে ওঠে, কিন্তু ফরাসি ফিল্মে তাঁকে নেয়াটা বেশ হাসি-ঠাট্টার ব্যাপার । ( লুই গারেলের বাবা, ফিলিপে, একজন চিত্রপরিচালক, যাঁকে বলা হয় ককতো আর গোদারের সন্তান ) । লুই গারেল একজন শক্তিশালী অভিনেতা, তাছাড়া, দেখে মনে হয়, তিনি যশস্বী লোকেদের বেশ চালাকচতুর ছদ্মবেশী । পপুলার সংস্কৃতির ভিন্ন মহাবিশ্বে, ওনার অভিনীত গোদার, একটি বোকা পুরুষব্যাঙের ক্যাঁকো কন্ঠস্বর আর হালকা বদহজমের মেজাজ নিয়ে, ‘শনিবার রাতের শো’ এর অ্যাঙ্করের মতন সপ্তাহশেষের ঘোষক বা ‘নোংরা বিপদের’ প্রতিযোগীর মতন দেখায় ।

 

ফিল্মটিতে গোদারকে নিয়ে যে মজা করা হয়েছে, তাতে দেখা যায়, তিনি কাচের গেলাস ভাঙছেন, অনেক সময়ে প্রদর্শনকারীদের দিকে ছুঁড়ে, যা থেকে মনে হয় যে অ্যাজানাভিশ্যু সুযোগ খুঁজেছেন ভিড়ের অজস্র মানুষের কথা তুলে ধরার । অনেকসময়ে, ঝাণ্ডা ওড়ানোর গুঞ্জনে, একজন গোদার-প্রেমী এসে গোদারের ষাট দশকের ফিল্মের, যেমন ‘ব্রেথলেস’ ও ‘কনটেম্পট-এর গুণগান’ করে যাবে । বিশ্রী ভদ্রতা থেকে সরাসরি নোংরামিতে নেমে যাওয়াটা পরিচালক অ্যাজানাভিশ্যুর প্রতিক্রিয়াশীল বিচ্যুতি এবং তাঁর সৃজনশীল, আদর্শিক এবং মানসিক সংকটের লক্ষণ।

 

গোদার চেয়েছেন ফিল্মনির্মানণে এমনই এক অভিমুখ হয়ে উঠুক যা তাঁর রাজনৈতিক গরজের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারবে, এক দ্রোহী সিনেমার জন্ম হোক যা সমস্ত বুর্জোয়া ও পরম্পরাগত ব্যাপারকে সমালোচনায় অনড় থাকবে । বর্তমানে, এই উচ্চাকাঙ্খাকে টিটকিরি মারা ছাড়া, কোনোকিছুই তেমন সহজ নয়, এবং ষাটের দশকের রাজনীতি-প্রভাবিত শিল্পগুলোকে সেই সময়েও  অনেকের মনে হয়ে থাকবে নির্বোধ, কৌতুকপূর্ণ বা অতিমাত্রায় অভিব্যক্ত। তবে এই ধারণা যে চলচ্চিত্র পুঁজিবাদী মৌজমস্তির চেয়ে বেশিকিছু দিতে পারে এবং ব্যক্তি-এককের আত্মপ্রকাশকে ছাপিয়ে যেতে পারে— তা শোষণ-পীড়নের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে কিংবা সমবেত কল্পনার পথ প্রশস্ত করার কথা ভাবতে পারে– তাকে বাতিল করা চলে না । ১৯৬৮ সালের পর গোদারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যা অলস-চিন্তায় এই ফিল্মে একটি রুদ্ধপথ হিসাবে দেখানো হয়েছে, মনে হবে সেই পথে যাত্রা করা হয়নি । 

 

অ্যাজানাভিশ্যুর যদি সিনেমা ও রাজনীতি সম্পর্কে স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য ধারণা থাকত, তাহলে তাঁর এই পরামর্শ যে গোদারের উচিত ছিল সিনেমা অথবা রাজনীতির মধ্যে কোনও একটা বেছে নেওয়া, তাহলে অমন বিধেয়কে মান্যতা দেয়া যেতে পারত । প্রেমের বিষয়ে বলতে হলে, যা কিনা এই ফিল্মের প্রতীয়মান কেন্দ্রবিন্দু, তাও আরেকটা সুযোগ নষ্ট করার উদাহরণ। কেউই তর্ক জুড়বে না যে গোদার একজন ভালো মানুষ । ফিল্ম সমালোচক হিসাবে আবির্ভাবের সময় থেকে মানববিদ্বেষ তাঁর ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে আছে, এবং তাঁর জীবনীতে বন্ধুত্বভঙ্গ ও পোড়ানো সেতুর ছড়াছড়ি । কিন্তু গোদারের চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন, সেই লুই গারেলের নষ্টামি সত্ত্বেও, এই ফিল্ম তাঁকে মোটেই একজন আকর্ষণীয় পাজি-লোক করে তোলে না ।

 

স্টেসি মার্টিন, যিনি অ্যানে উইয়াজেম্সকির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, তিনি একজন কমনীয় ও নিবেদিত অভিনেত্রী, কিন্তু ফিল্মটা গোদারের নিজের দৃষ্টিতে উইয়াজেম্সকিকে সম্পূর্ণ আয়তনিক নারী হিসাবে দেখার চেয়েও খারাপ । মেয়েটি নিজের স্বামীকে ততোদিন ভালোবাসেন যতোদিন না তাঁর স্বামী সম্পর্কটাকে অসম্ভব করে তুলছেন । লোকটি নার্সিসিস্টিক, পেশায় হিংসুটে আর যৌনতায় পজেসিভ ; সে বিতৃষ্ণ হয়ে পড়ে যখন তার স্ত্রী একটি ইতালীয় ফিল্মে অভিনয় করার সুযোগ পায় যাতে তাকে নগ্ন হতে হবে । এর প্রতিক্রিয়া হিসাবে অ্যাজানাভিশ্যু দেখিয়েছেন এমন একটি দৃশ্য যাতে লুই গারেল ( গোদার ) এবং স্টেসি মার্টিন ( উইয়াজেম্সকি ) দুজনেই উলঙ্গ হয়ে সিনেমায় নগ্নতার নান্দনিকতা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করছেন । এই ধরণের আত্ম-প্রসঙ্গ উথ্থাপনকে  “গোদারীয়” হিসাবে ফিল্মের শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক পর্বের ক্লাসে চালিয়ে দিতে পারে । এই ব্যাপারটা অ্যাজানাভিশ্যুর পরিচয় সহজেই ফাঁস করে ।

 

মিশেল অ্যাজানাভিশ্যু নিউ ওয়েভ আইকন গোদার ও তাঁর প্রেরণাময়ী দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যানে উইয়াজেম্সকির বিয়ে ভাঙার গল্প তুলে ধরেছেন খেলাচ্ছলে, অযৌক্তিকভাবে আর অনেক সময়ে ঘৃণ্য আক্রমণ করে । অভিনেত্রী উইয়াজেম্সকি ১৯৬৬ সালে সিনেমাজগতে প্রবেশ করেছিলেন রবার্ট ব্রেসঁর Au hasdard Balthazar ( এলোমেলো বালথাজার ) এবং পরের বছর অভিনয় করেন গোদারের La Chinoise ( চীনারা ) ফিল্মে । তিনি গোদারকে বিয়ে করেন এবং ১৯৭০ সালে আলাদা হয়ে যান, যদিও আইনি ডিভোর্স কার্যকরী হয় নয় বছর পর । Un an Apres ( এক ছর পর )কে বলা যেতে পারে গোদারের বিরুদ্ধে উইয়াজেম্সকির প্রতিশোধগ্রন্হ । আর মিশেল অ্যাজানাভিশ্যুর ফিল্মকে বলা যেতে পারে একজন নিম্নমানের পরিচালকের ঈর্ষা প্রণোদিত কর্মকাণ্ড ।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

 

Posted in Jean-Luc Godard | Tagged | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

জাঁ-লুক গোদার ও ওতেয়া তত্ব (Auteur Theory ) । অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

জাঁ-লুক গোদার ও ওতেয়া তত্ব ( Auteur theory )

রিচার্ড ব্রডি

অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

ওতেয়া তত্ব ( Auteur theory ) অনুযায়ী পরিচালকই একটি ফিল্মের স্রষ্টা, যেমন একটি বইয়ের স্রষ্টা একজন লেখক অর্থাৎ ক্যামেরাই হল কলম । অ্যান্ড্রু স্যারিস ওতেয়া তত্ত্ব জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন ১৯৬২ সালে তাঁর  “নোটস অন দ্য ওতেয়া থিওরি” প্রবন্ধে ; তিনি জাঁ-লুক গোদার ও ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর বন্ধু ছিলেন । ফরাসি নিউ ওয়েভ সিনেমার দুই তাত্বিক, ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো এবং জাঁ-লুক গোদারকে মনে করা হয় ফিল্ম রচনার ওতেয়া, বিশেষ করে জাঁ-লুক গোদার, যিনি তাঁর প্রথম  ফিল্ম ‘ব্রেথলেস’ নির্মাণের জন্য প্রায় সমস্ত কাজ নিজেই করেছিলেন । চিত্রনাট্য লেখকের তুলনায় পরিচালক যেহেতু ফিল্মের দৃশ্য ও শ্রাব্য উপাদানগুলোর সর্বময় কর্তা, তিনিই ফিল্মটির লেখক । ক্যামেরা কোথায় রাখা হবে, আলো কীভাবে ফেলা হবে, ক্যামেরা থেকে একটি  দৃশ্য কতো দূরে থাকবে, সম্পাদনা কেমন করে হবে, সম্পূর্ণ ফিল্মটা কেমন করে জুড়ে তোলা হবে, এই মৌলিক ব্যাপারগুলো নির্ণয় করেন পরিচালক এবং এর মাধ্যমেই ফিল্মটির বার্তা দর্শকদের কাছে পৌঁছোয় । এই দুই পরিচালকের আগে, বিশেষ করে গোদারের আগে, ফিল্মের প্লট ছিল গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনও লেখকের রচনা অনুসরণ করে ফিল্ম নির্মাণ করার চল ছিল । ওতেয়া তত্বের সমর্থকরা মনে করেন, যে সমস্ত ফিল্মগুলো সিনেমাটিকালি সফল হয়, তাতে পরিচালকের ব্যক্তিগত ছাপ ও একক অবদান অবশ্যই থাকবে ।  হলিউডি প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানের অংশীদারদের থেকে ফরাসি নিউ ওয়েভ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের পার্থক্য করার জন্য ধারণাটিকে তাত্বিক ভিত্তি দেয়া হয়েছিল, এবং এরপরে জনপ্রিয় সংগীত নির্মাতাদের পাশাপাশি ভিডিও গেম নির্মাতাদের ক্ষেত্রেও তত্বটি প্রয়োগ করা হয়েছে ।

 

১৯৫৯ সালের মে মাসে, কান ফিল্ম ফেস্টিভালে, ফ্রান্সের সংস্কৃতি মন্ত্রী আঁদ্রে ম্যালরো বলেছিলেন, “এক বছরের মধ্যেই ফরাসি সিনেমা ( Cinematheque Francaise ) হয়ে উঠবে ফরাসি কমেডি ( Comedie Francaise ), তার কারণ উনি সবে সাতাশ বছর বয়সী ফিল্ম সমালোচক ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর ‘দি ৪০০ ব্লোজ’ ফিল্মটিকে প্রথম ফিচার ফিল্মের শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার পেতে দেখেছিলেন কেননা তিনি জানতেন যে ত্রুফো কোনো ফিল্ম স্কুলে কিংবা ফিল্মের সেটে গিয়ে ফিল্ম করা শেখেননি ; শিখেছিলেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অঁরি লাংলয়ের সংগ্রহশালায় একটা ছোটো ঘরে বসে ফিল্ম দেখে-দেখে ।

 

তা ছিল ম্যালরোর ভবিষ্যবার্তা । ১৯৬০ সালের মার্চ মাসে ত্রুফোর বন্ধু জাঁ-লুক গোদার, আরেকজন ফিল্ম সমালোচক, তাঁর ফিল্ম ‘ব্রেথলেস’ প্যারিসে রিলিজ করলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সে ও অন্যান্য দেশে অভূতপূর্ব প্রশংসা পেলেন । বলা হল যে শেষ পর্যন্ত ফিল্মনির্মাণকে হলিউডের ইনডাস্ট্রি থেকে বের করে এনে শিল্পের মর্যাদা দেয়া হল । এই সাফল্য জন্ম দিলো একটি ফিল্ম আন্দোলনের । ১৯৫৭ সালে একটি প্রবন্ধে ফ্রাঁসোয়া জিরো Nouvelle Vogue বা নিউ ওয়েভ নামে একটি শব্দবন্ধ তৈরি করেছিলেন, এবং বলেছিলেন যে একদল নতুন ফিল্মনির্মাতার আবির্ভাব হয়েছে যারা ফরাসি সমাজকে ফিল্মনির্মাণ সম্পর্কে একেবারে নতুন ভাবনা ও দৃষ্টিকোণ দিচ্ছে । কিন্তু পিয়ের বিলার্দ নামে এক সমালোচক লিখলেন যে এই নতুন চিত্রনির্মাতারা নিউ ওয়েভের নামে যা করছেন তা অপ্রতিভ আর অতিষ্ঠ করে ।

 

গোদার আর ত্রুফো, তখনও তাঁদের বয়স বিশের কোঠায়, আলোচকদের নাস্তিক্য ও সংশয়কে কোনও তোয়াক্কা করলেন না । তাঁদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল চিত্রপরিচালকের ভূমিকাকে একক গুরুত্ব দেয়া, এবং তেমনই অন্তরঙ্গ, নমনীয়, ব্যক্তিগত সম্পর্কে গড়ে তোলা যেমন একজন লেখকের তাঁর উপন্যাসের সঙ্গে হয় । গোদারের নিউ ওয়েভ ফিল্মনির্মাণের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ল জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া, ইতালি, ব্রাজিল, পোল্যাণ্ড, জাপান, তাইওয়ান, ইরান, ভারত, এমনকি হলিউডেও । পরিচালক হয়ে উঠলেন ( Auteur ) ‘ওতেয়া’ । ১৯৬৯ সালে, ‘গ্রিটিংস’ ফিল্মের পরিচালক ব্রিয়ান দ্য পাল-মা ঘোষণা করলেন যে তিনি যদি মার্কিন গোদার হয়ে উঠতে পারেন তাহলে ব্যাপারটা দারুণ হবে । সেই বছরই গোদার সম্পর্কে তেইশ বছর বয়সী জর্জ লুকাস গোদার সম্পর্কে বললেন, “আপনি যখন দ্যাখেন যে আরেকজন আপনার পথেই এগোচ্ছেন, তখন আপনি একা বোধ করেন না ।” ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা স্বীকার করেছেন যে তিনি গোদারকে অনুসরণ করেছেন এবং নিউ ওয়েভ ফিল্ম করতে চেষ্টা করেছেন । অর্থাৎ এনারাও ক্যামেরাকে কলমের মতো ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন ।

 

গোদার এবং ত্রুফো দশ বছর যাবত নিকটবন্ধু ছিলেন, কিন্তু তারপর তাঁদের বন্ধুবিচ্ছেদ হয়। সিনেমা সম্পর্কে তাঁদের একই মতামত ছিল এবং সেই মতামতে নির্ভর করে গড়ে উঠেছিল নিউ ওয়েভের ‘ওতেয়া তত্ব’ । তাঁরা ক্রমশ পরস্পরের থেকে দূরে সরে গেলেন, যাকে বলা হয়েছে ‘ওতেয়া যুদ্ধ’ । গোদারের বয়স এখন সাতাত্তর ; বসবাস এবং কাজ করেন সুইজারল্যাণ্ডের রোলে নামের গ্রামে, এবং ত্রুফো, যিনি ১৯৮৪ সালে বাহান্ন বছর বয়সে মারা যান, তাঁদের দুজনের পরিচয় হয়েছিল ১৯৪০ দশকের প্যারিসে, সম্ভবত লাতিন কোয়ার্টারের ফিল্ম ক্লাবে, যেটি চালাতেন মরিস শেরে নামে একজন স্কুল শিক্ষক, যিনি তাঁর ছদ্মনাম এরিক রোমার হিসাবে বেশি পরিচিত । গোদার এক সময়ে বলেছিলেন যে তাঁরা দুজনে ছিলেন দুটি পরিত্যক্ত শিশুর মতন ।

 

গোদার ১৯৩০ সালে একটি বৈভবশালী সংস্কৃতিমান পরিবারে জন্মেছিলেন ( তাঁর দাদামশায় ছিলেন পারিবাস ব্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন এবং কবি পল ভালেরির বন্ধু ও সচিব ) ; ফ্রান্স আর সুইজারল্যাণ্ডের বিশাল জমিদারিতে তাঁর শৈশব কেটেছিল । তিনি ছিলেন গণিতে পারদর্শী এবং  বইপোকা । ১৯৪৬ সালে প্যারিসে যান স্কুল শিক্ষা শেষ করার জন্য । তাঁর ছিল সাহিত্যিক ও শিল্পী হবার উচ্চাকাঙ্খা, এবং তাঁর পারিবারিক সম্পর্কের দরুন সমাজের সাংস্কৃতিক শৌর্যকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন ; কিছুদিনের জন্য তিনি ছিলেন জাঁ শ্লামবারগারের বাড়িতে ছিলেন আর সেখানে তাঁর সঙ্গে আঁদ্রে জিদের পরিচয় হয়েছিল । কিন্তু বয়ঃসন্ধি পেরিয়ে তিনি পড়াশুনায় অবহেলা আরম্ভ করেন এবং সিনেমা দেখে আর টোটো কোম্পানি করে সময় কাটাতেন, তার জন্য অগ্রজদের থেকে টাকার জন্য নাছোড় ধরাধরি করতেন । টাকার জন্য তিনি একবার তাঁর ঠাকুর্দার সংগ্রহ থেকে রেনোয়ার তৈলচিত্র চুরি করে বিক্রি করে দিয়েছিলেন ।

 

ত্রুফোর জন্ম ১৯৩২ সালে, প্যারিসে ; তাঁর বাবা মায়ের বিয়ে হয়নি । তাঁকে তাঁর মায়ের বাপের বাড়িতে গ্রামে  পাঠিয়ে দেয়া হয় একজন সেবিকার তত্বাবধানে ; পরে তাঁর মা তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে যান, দত্তক নেন এক ভদ্রলোক, যিনি ত্রুফোর পালক-পিতা । যুদ্ধকালীন প্যারিসে অবহেলিত, স্কুল পালাতেন, চুরি করতেন, ভবঘুরের জীবন কাটাতেন । আট বছর বয়সে আবেল গানসের “পারাদিস পেরদু’ ফিল্ম দেখার পর তাঁকে সিনেমা দেখার নেশায় পায় ; প্রতিদিন তিনচারটে ফিল্ম দেখতেন । ১৯৪৮ সালে, ষোলো বছর বয়সে, টাইপরাইটার চুরি করার দায়ে বিপদে পড়েন । ফৌজে যোগ দেন, কিন্তু সেখান থেকে পালান ; তাঁকে জেল খাটা থেকে বাঁচান ফিল্ম সমালোচক আঁদ্রে বাজিন, যিনি ত্রুফোর চাকরি আর বাসস্হানের ব্যবস্হা করেন । এই সময়ে গোদারের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয় এবং দুজনে নিয়মিত সিনেমা দেখে সময় কাটাতেন । ত্রুফো ছিলেন সংস্কৃতিতে বহিরাগত, যিনি প্রবেশ করতে চাইছিলেন ; গোদার ছিলেন সংস্কৃতির ভেতরের লোক যিনি ভেঙে বাইরে বেরোতে চাইছিলেন । দুজনে মিলে বালজাকের রোমান্টিক কাহিনির মধ্যে জীবন কাটাচ্ছিলেন, এবং স্বপ্ন দেখছিলেন নিজেদের প্রতিভার জোরে প্যারিস জয় করার। ১৯৫১ সালে আঁদ্রে বাজিন প্রতিষ্ঠা করলেন কাইয়ে দ্যু সিনেমা ; কিছু কালের মধ্যেই এরিক রোমার তাতে যোগ দেয়ায় গোদার আর ত্রুফো ফিল্ম-সমালোচকের কাজ পেয়ে গেলেন ।

 

জায়মান নিউ ওয়েভের তরুণরা খোলাখুলি ঘোষণা করলেন যে  তথাকথিত বড়ো পরিচালক আর চিত্রনাট্য লেখকদের থেকে তাঁরা ফরাসি ফিল্মজগতকে কেড়ে নিয়ে দখল করতে চলেছেন। ১৯৫৪ সালে কাইয়েতে প্রকাশিত “ফরাসি সিনেমার একটি নির্দিষ্ট প্রবণতা” প্রবন্ধে ত্রুফো আক্রমণ করলেন জাঁ অরেনশে এবং পিয়ের বোস্ত নামের দুই খ্যাতিমান চিত্রনাট্য রচয়িতাকে, সিনেমাকে অবজ্ঞা করার দোষে, এবং তীব্র সমালোচনা করলেন পরিচালক ক্লদ অতাঁ-লারা ও জাঁ দেলানয়কে, তাঁদের “ভীরু কৌশল, চলতি ফ্রেমিংস, জটিল আলোকসজ্জা, পালিশকরা ফটোগ্রাফি, ইত্যাদি, “গুণমানের ঐতিহ্যের নামে চালাবার” জন্য । ফরাসি সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠা পেলো কাইয়ে দ্যু সিনেমা পত্রিকা, ত্রুফোর বিতর্কিত প্রবন্ধের কারণে যার দরুন দক্ষিণপন্হী সাপ্তাহিক ‘আর্টস’ পত্রিকায় চাকরি পেয়ে গেলেন তিনি । প্রবন্ধটি তাঁকে আর তাঁর বন্ধুদের ‘পোলিটিক দেস ওতেয়া’ বা “লেখকের রাজনীতি” বা ‘ওতেয়া তত্ব”র প্রণেতা হিসাবে অন্যান্যদের থেকে পৃথক চিহ্ণিত করে দিতে সফল হলো । সিনেমা আলোচনার বিভিন্ন জমায়েতে তাঁরা ঘোষণা করতে লাগলেন যে শ্রেষ্ঠ পরিচালকরা হলেন লেখক, চিত্রকর, সঙ্গীতকারের মতনই গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যক্তিপ্রাতিস্বিক শিল্পী ।

ত্রুফো তখন প্যারিসে, আর গোদার সুইজারল্যাণ্ডে বাঁধ-নির্মাণ প্রকল্পে বেলচা-কোদাল নিয়ে কাজ করছেন, তারপর রাতের ডিউটিতে সেখানকার সুইচবোর্ডে,  প্রকল্পটা নিয়ে একটা প্রথাগত তথ্যচিত্র তোলার জন্য টাকা রোজগারের ধান্দায় । ফিল্ম তুলে তা বিক্রি করলেন একটা কোম্পানিকে, আর তারপর ১৯৫৬ সালে পাড়ি মারলেন প্যারিসের উদ্দেশে, কাইয়ে দ্যু সিনেমার আড্ডার জমায়েতে যোগ দেবার জন্য । রোবের্তো রোসেলিনি, যাঁকে কাইয়ে দ্যু সিনেমার আলোচকরা তারিফ করেছিলেন, যখন অন্যেরা ওনাকে উপেক্ষা করতো, স্ত্রী ইনগ্রিড বার্গম্যানকে নিয়ে মেলোড্রামাটিক ফিল্ম তুলেছিলেন, প্যারিসে পৌঁছোলেন আর তরুণ সমালোচকদের একত্রিত করে বাস্তববাদী, কম বাজেটের ফিল্ম তৈরি করায় উদ্বুদ্ধ করতে চাইলেন, যে ধরণের ফিল্মের কারণে এক দশক আগে উনি খ্যাতি পেয়েছিলেন । ত্রুফো ভাবছিলেন যে সংবাদপত্রে পাওয়া প্রকৃত ঘটনার মিশেল পোরতেল নামে এক ছিঁচকে অপরাধী আর তার মার্কিন বন্ধুনিকে নিয়ে ফিল্ম করবেন । ১৯৫২ সালে পোরতেল একটা সরকারি গাড়ি চুরি করেছিল, একজন মোটরসাইকেল আরোহী পুলিশকে গুলি মেরেছিল আর প্যারিসে কেটে পড়েছিল, সেখানে দুসপ্তাহ দিব্বি লুকিয়েছিল, তারপর সিন নদীতে একটা ডিঙিতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল । ত্রুফো গোদারকে বললেন ওনাকে সাহায্য করতে । কাহিনিটাকে ফিল্মের আদল দেবার জন্য দুই বন্ধু বসলেন বটে কিন্তু টাকা যোগাড় করতে পারলেন না । ফলে প্রকল্পটা তাঁরা বাতিল করলেন।

 

পরিচালক হবার স্বপ্ন তবু তাঁদের ছাড়ছিল না । ১৯৫৮ সালে ত্রুফো প্যারিসের বাইরের লোকেশানে আশু রচনা করা একটা ফিল্ম তুললেন । জায়গাটা বানভাসিতে ডুবে গিয়েছিল, যার দরুন ছবি তুলতে বেশ অসুবিধা হচ্ছিল, আর গল্পটা ছিল এক তরুণীকে নিয়ে যে গাড়িতে লিফ্ট চাইছিল আর সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য গাড়ি সরবরাহকারী যুবকের সঙ্গে সম্পর্ক পাতিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু ফিল্ম তোলার সময়ে ত্রুফোর মনে হল যে তিনি বিপদে পড়া মানুষগুলোকে নিয়ে তামাশা করছেন, ফলে বাতিল করলেন প্রকল্প । গোদারের মনে হল যেটুকু  তোলা হয়েছে সেই ফুটেজ কাজে লাগানো যেতে পারে । উনি সম্পাদনা করলেন আর বহু প্রসঙ্গ, প্রশ্ন, ইয়ার্কি, ও ফিসফিসে মন্তব্য জুড়ে যোগ করলেন খেলাচ্ছলে ভয়েস-ওভার । এমনকি টাইটেলটাও “Une Histoire d’Eau” ( জলের একটি গল্প ) ছিল শ্লেষ — সেই সময়ের যৌন বেস্ট সেলার “Histoire d’O” ( O-এর গল্প ) নকল করে । দুই বন্ধুর ফিল্ম করার একটা আদরা গড়ে উঠল : ত্রুফো বলবেন গল্প আর গোদার গল্পকে ব্যবহার করবেন তাঁর খেদোন্মত্ত আবিষ্কার উড়াল হিসাবে ।

 

১৯৫৭ সালে ত্রুফো, ম্যাডেলিন মরগেনস্টার্ন নামে এক যুবতীকে বিয়ে করলেন, যাঁর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভালে । মেয়েটির বাবা, ইগনাস মরগেনস্টার্ন ছিলেন ফিল্ম ডিসট্রিবিউটর এবং পরের বছর কান ফেস্টিভালে ত্রুফো তাঁকে পরামর্শ দিলেন মিখায়েল কালাতোজভের “দি ক্রেনস আর ফ্লাইঙ” কিনে নিতে । ফিল্মটা গ্রাঁ প্রি পুরস্কার পেলো । প্রতিদান হিসাবে মরগেনস্টার্ন ত্রুফোকে প্রথম ফিল্ম পরিচালনার ব্যবস্হা করে দিলেন । গোদার ত্রুফোকে লিখেছিলেন যাতে মরগেনস্টার্ন তাঁকেও একটা ফিল্ম পরিচালনার ব্যবস্হা করে দেন কিন্তু তা সম্ভব হয়নি । ১৯৫৮ সালের নভেম্বরে ত্রুফো তোলা আরম্ভ করলেন “দি ৪০০ ব্লোজ” ফিল্ম। পাঁচ মাস পরে ফিল্মটা নির্বাচিত হল কান ফিল্ম ফেস্টিভালে ফ্রান্সকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য । গল্প প্রায় পুরোটাই ত্রুফোর নিজের বয়ঃসন্ধির ঘটনা আর অভিজ্ঞতা নিয়ে তৈরি ।

 

“দি ৪০০ ব্লোজ” এর গল্পটা এইরকম : ১৯৫০-এর দশকে প্যারিসে বেড়ে ওঠা আঁতোয়া দোনিয়েল নামে একটি  ছেলে স্কুল থেকে পালিয়ে যেতো আর বাবা-মাকে মিথ্যাকথা বলত । তার বাবা-মায়েরা তাকে ভুল বুঝেছিলেন এবং তার শিক্ষক  শৃঙ্খলাজনিত সমস্যার জন্য তাকে শাস্তি দিয়েছিলেন ( আঁতোয়া বলেছিল যে তার অনুপস্থিতি তার মায়ের মৃত্যুর কারণে হয়েছিল) । আঁতোয়া প্রায়ই স্কুল আর বাড়ি থেকে দূরে পালিয়ে যেতো। শেষে তার শিক্ষক বালজাক থেকে নকল করে লেখার অভিযোগ করেন। বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার খরচ তোলার জন্য আঁতোয়া তার সৎ বাবার অফিস থেকে একটি রেমিংটন টাইপরাইটার চুরি করে, তবে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করার সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সৎ বাবা আঁতোয়াকে পুলিশে ধরিয়ে দেন । আঁতোয়া  সারারাত জেলখানায় কাটায়, বেশ্যা এবং চোরদের সাথে একটা ঘরে তাকে থাকতে হয় । বিচারকের কাছে সাক্ষ্য দেবার সময়, আঁতোয়ার মা স্বীকার করেন যে তাঁর স্বামী আঁতোয়ার আসল বাবা নন। তার মা যেমনটা চেয়েছিলেন, সমুদ্রের তীরের কাছে আঁতোয়ার মতন অবাধ্য ছেলেদের জন্য একটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে তাকে রাখা হয় । অন্য ছেলেদের সাথে একদিন ফুটবল খেলতে গিয়ে আঁতোয়া একটা বেড়ার তলা দিয়ে সমুদ্রের দিকে পালিয়ে যায়, যা ও চিরকাল দেখতে চাইতো। আঁতোয়া সমুদ্রের তীরে পৌঁছে যায় । আঁতোয়ার একটা ফ্রিজ-ফ্রেম শট দিয়ে ছবিটি শেষ হয়েছে । ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকে আঁতোয়া, আর ক্যামেরাটা তার মুখকে  জুম করে বাড়িয়ে তোলে।

 

ফিল্মটার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে “আর্টস” পত্রিকায় গোদার লিখলেন, “ফিল্ম ওতেয়াদের যুদ্ধে প্রধান ভূমিকা নিয়েছে । আমাদের এই বক্তব্যকে গ্রহণ করা হয়েছে যে হিচককের ফিল্মে তিনি ততোটাই গুরুত্বপূর্ণ যতোটা আরাগঁর বইয়ের জন্য আরাগঁ । আমাদের ধন্যবাদ প্রাপ্য, ফিল্মের যাঁরা ওতেয়া, নিঃসন্দেহে শিল্পের ইতিহাসে স্হান করে নিয়েছে । কিন্তু আমরা লড়াই জিতলেও যুদ্ধ জয় করা এখনও বাকি।” মরগেনস্টার্ন-এর নিবেশ দুই দিনেই দ্বিগুণ হয়ে গেল এবং ফিল্মটির প্রচারের দরুণ ত্রুফো ও তাঁর সঙ্গীদের নিউ ওয়েভের পুরোধা হিসাবে ঘোষণা করা হল ।

 

গোদার বুঝতে পারলেন যে ফিল্ম নির্মাণের মতো সময় তাঁরও এসেছে, আর মনে হল বেশি দেরি করলে সুইযোগ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে । কাইয়ে দ্যু সিনেমার তহবিল থেকে ট্রেন ভাড়া যোগাড় করে তিনি কান পৌঁছোলেন, আর যোগাযোগ করলেন সংঘর্ষরত অথচ সাহসী প্রযোজক জর্জ দ্য বোরেগারের সঙ্গে, যাঁর জন্য তিনি একসময় একটা সংক্ষিপ্ত চিত্রনাট্য লিখে দিয়েছিলেন । গোদার ত্রুফোকে অনুরোধ করলেন, ওনার গাড়ি চোরের কাহিনিটা দেবার জন্য । ত্রুফো তাঁর নাম কাহিনিলেখক হিসাবে ব্যবহারের অনুমতি দিলেন, এবং ক্লদ শাবরল অনুমতি দিলেন তাঁর নাম প্রযুক্তি পরামর্শদাতা হিসাবে ব্যবহারের জন্য । এই দুজনের নামের দরুন প্রযোজককে প্রভাবিত করতে সুবিধা হল গোদারের । গোদার ফিল্মটার নাম রাখলেন À bout de souffle অর্থাৎ “ব্রেথলেস” ।

“ব্রেথলেস” ফিল্মটা “দি ৪০০ ব্লোজ” থেকে একেবারে ভিন্ন ধরণের প্রমাণিত হল । ত্রুফো ব্যবহার করেছিলেন সম্পূর্ণ পেশাদার কর্মীদের এবং আগে থাকতে লেখা চিত্রনাট্য, মার্সেল মুসি নামের চিত্রনাট্যকারের সঙ্গে পরামর্শ করে । ত্রুফো প্রমাণ করার প্রয়াস করেছিলেন যে ফরাসি সিনেমা একটি উপন্যাসের চেয়েও ব্যক্তি-এককের নিজস্ব হবে, ততোটাই অন্তরঙ্গ ও ব্যক্তিগত যতোটা একজনের আত্মজীবনী হয় । গোদার “ব্রেথলেস” ফিল্মে যে কাহিনি রূপায়িত করলেন, তা হলিউডের ফিল্মের মতন ছিল, ব্যক্তিগত ছিল না মোটেই, কিন্তু যা তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন তা হল : অভিগমনের কারণে গল্পটি হয়ে উঠল তাঁর ব্যক্তিগত । 

‘ব্রেথলেস’ ফিল্মের সংলাপ এবং কার্যকলাপ তিনি প্রতিদিন ফিল্ম তোলার সময়ে নির্ণয় নিতেন, বা রাতের বেলায় কোনো রেস্তরাঁ কিংবা কাফেতে বসে ; স্মৃতিকে আর ডায়রিকে কাজে লাগিয়ে— সিনেমাটিক, সাহিত্যিক এবং ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ থেকে তুলে এনে মালার মতন বুনে দিলেন– যা সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্র ছিল,  এমন একটি ব্যাপার গড়ে তুললেন যা সম্পূর্ণরূপে ছিল তাঁর আবিষ্কার । মাথা কাজ না করলে সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিতেন আর চটিয়ে দিতেন প্রযোজকমশায়কে । 

গোদার ছবিটি তুললেন নতুন আঙ্গিকহীন উপায়ে । টেক্সটা তিনি আনতেন অভিনেতাদের কাছে– নায়ক জাঁ-পল বেলমোন্দো আর নায়িকা জাঁ সেবার্গ– ফিল্মের লোকেশানে, কিংবা সংলাপগুলো তাঁদের পড়ে শোনাতেন আর অভিনেতারা শুনে শুনে বলত, ক্যামেরা চলতে থাকত। ওনার ক্যামেরাম্যান রাউল কুতার্দ আগে ছিলেন তথ্যচিত্র তোলার সঙ্গে যুক্ত, এবং গোদার নির্ভর করলেন কুতার্দের অভিজ্ঞতার ওপর, পথের আলো বা ভিড় নিয়ন্ত্রণের বালাই বাদ দিয়ে । শঁজেলিজের পথে অভিনেতাদের হাঁটার সময়ে কুতার্দ ক্যামেরা নিয়ে একটা ডেলিভারি-গাড়িতে বসে রইলেন, যাতে একটা ফুটো ছিল, আর গাড়িটা ঠেলতে লাগল একজন সহকর্মী ; গোদার তাদের চুপচাপ অনুসরণ করলেন । শেষ দৃশ্যে, বোলমিন্দোর চরিত্র যখন রাস্তায় পড়ে, বুলেটের আঘাতে মারা যাচ্ছে, কাছের রেস্তঁরাগুলো থেকে এসেজনসাধারণ অভিনেতার কাছে জড়ো হয়ে গিয়েছিল, যখন কিনা ক্যামেরা তুলছিল সেই দৃশ্য ।

সম্পাদনার ঘরে গোদারের কাজ ছিল আরও দুঃসাহসী । আড়াই ঘণ্টা থেকে কমিয়ে নব্বুই মিনিট করার আদেশের দরুণ, গোদার কেবল সেই অংশগুলোকেই রাখলেন যেগুলো ওনার পছন্দের ছিল, আর ছাঁটাই করতে থাকলেন নানা দৃশ্য, ধারাবাহিকতার ঐতিহ্য জলাঞ্জলি দিয়ে, শটের মধ্যের ছাঁটাই করলেন যা পরে ‘জাম্প কাট’ নামে বিখ্যাত হয়ে উঠল । ঝাঁকুনির ফলে গড়ে উঠল চাক্ষুষ করা যায় এমন জ্যাজ সঙ্গীত । গোদার পরে স্বীকার করেছেন যে, তিনি দর্শকের আকর্ষণ করে দেখাতে চেয়েছিলেন যে পুরোনো ঐতিহ্যকে কেমন দর্শনীয় উপায়ে বাতিল করা যায় । 

ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো এবং জাঁ-লুক গোদারের যাত্রা এই দুটি ফিল্ম থেকে দুই দিকে ধাবিত হওয়া আরম্ভ হল । জনসাধারণ ও পরিচিতদের সামনে তাঁরা পরস্পরের সুখ্যাতি করলেও ভাঙন আর লুকিয়ে রাখা গেল না । প্রতিভাবান লেখকদের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দিতার মতন, এই দুই প্রতিভাবান পরিচালক নিজস্ব ‘ওতেয়া’র পথে যাত্রা করলেন ।

নিউ ইয়র্কার পত্রিকার ৭ এপ্রিল ২০০৮ সংখ্যায় প্রকাশিত । ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মলয় রায়চৌধুরী

 

Posted in Jean-Luc Godard | Tagged | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

জাঁ-লুক গোদার-এর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গ্যাভিন স্মিথ । অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

জাঁ-লুক গোদার-এর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গ্যাভিন স্মিথ

গ্যাভিন : ‘সিনেমার ইতিহাসগুলো’তে  (Histoire(s) du cinema ) সিনেমার শুরু থেকে আপনি যে ফিল্মগুলো তৈরি করেছেন সেগুলো আপনার আগের কাজগুলোর চেয়ে বেশি সংবেদনশীল । প্রত্যেকটাই  সিনেমার সাথে সমঝোতা করার চেষ্টা বলে মনে হয় ।

গোদার : হ্যাঁ । আমিও তাই মনে করি, যদি আমি তা  বলতে পারি, তবে এটা পিকাসোর একটিা কথার মতন আমাকে একবার চোট দিয়েছিল : “চিত্রকর্মটি আমাকে প্রত্যাখ্যান না করা পর্যন্ত আমি আঁকা পছন্দ করি।” আমি বলব যে সিনেমা আমাকে আরও কয়েকটা ফিল্ম, আরও কয়েক দশক ধরে অস্বীকার করবে না, সুতরাং এটা একটা সমঝোতা। আমি যা চাই তা দিয়ে নয়, কারণ আমি কী চাই তা আমি নিজেই জানি না, তবে আমার যা আছে তা থেকে আমি যা চাই তা তৈরি করতে পারবো।  আরও কিছু প্রশ্ন তুলতে সক্ষম না হওয়ার জন্য, কিন্তু যা আমি সত্যিই পছন্দ করি তা করার জন্য, আমার যা আছে তাই দিয়ে মোকাবেলা করতে পারি। এটা একটা শান্তিপূর্ণ মনোভাব। আমি যখন কোনও ফিল্ম করি, তখন তা ভালভাবে করা না হলেও আমি আর ক্রুদ্ধ হই না। রাগ করা উচিত নয়, কেননা যে ছবিটা এইভাবে বা অন্য কোনও ভাবে হওয়া উচিত ছিল , তা চিন্তা না করে কেবল নিজের মতো করে চালিয়ে যেতে হবে ।

গ্যাভিন : তবুও আপনার ফিল্ম নির্মাণের কাজটা সর্বদা একটা বিপরীত চলচ্চিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে।

গোদার : আজকাল এটা ঘটনা, তবে আমি আর তা নিয়ে চিন্তা করি না। আমি যখন একটি বড় ফিল্ম তুলি, তখন আমি নিজেকে বলি না, এটা হলিউডের কোনো জাতীয় চলচ্চিত্র-প্রথার বিরুদ্ধে, এই ধরণের ফরাসি ছবি — এটা আমি করছি কেবল ফিল্মে । আমি জানি যে আমি অবশ্যই বিরোধীপক্ষে, তবে এটা একটি বড় এলাকা।

গ্যাভিন :  সমালোচক হিসাবে আপনার কাজসহ পুরো ক্যারিয়ার, তাকে দেখা যেতে পারে আলোচনার প্রক্রিয়া হিসেবে , সিনেমার সাথে বোঝাপড়ার পদক্ষেপ হিসেবে।

গোদার: আমি পরিচালনা এবং সমালোচনার মধ্যে পার্থক্য করি না। আমি যখন প্রথমফিল্ম দেখতে শুরু করি, তা তখনই চলচ্চিত্র নির্মাণের অংশ ছিল। আমি যদি এখন হাল হার্টলির ছবি দেখতে যাই, তাও সিনেমা তৈরির অংশ। তাতে  কোনও পার্থক্য নেই । আমি ফিল্ম নির্মাণের অংশ আর যা এই এলাকায় ঘটে চলেছে, আমাকে তা অবশ্যই দেখতে হবে। আমেরিকান ছবিগুলোর ব্যাপারে, প্রতি বছর কমবেশি একটা দেখাই যথেষ্ট: সেগুলো কমবেশি সব একইরকম হয়। তবে এটা আমাদের দেখার  একটা অংশ কেননা আমরা তো এই জগতে বসবাস করছি।

 

গ্যাভিন : চলচ্চিত্র নির্মাণ কি এক অর্থে আপনার কাছে একটি ইউটোপিয়ান কার্যকলাপ ?

গোদার: আমার ফিল্ম যেভাবে হওয়া উচিত তা ইউটিপিয়া , তবে সিনেমা বানানো, তৈরি করা, ইউটিপিয়া নয়।

গ্যাভিন : “জার্মানি বছর ৯০ নয় শূন্য” [ Germany Year 90 Nine Zero] এবং “সিনেমার ইতিহাসগুলো”[Histoire (s) du cinemaতে] আপনি সিনেমাকে একটি পতিত মাধ্যম হিসাবে বিবেচনা করেছেন।

গোদার : হ্যাঁ, সেটাই আমার মতামত ।

গ্যাভিন : কোন মুহুর্তগুলো সেই পতনকে  সংজ্ঞায়িত করেছে?

গোদার: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আমেরিকান ফিল্মগুলোর ফরাসি ফিল্মগুলোকে পরাস্ত করার একটা সুযোগ ছিল, যা সেই সময়ে আরও শক্তিশালী এবং সুপরিচিত ছিল। প্যাথে, গাউমঁ, মেলিস, ম্যাক্স লিন্ডার ছিলেন বড়ো একজন তারকা। যুদ্ধের পরে ফরাসিরা দুর্বল ছিল এবং আমেরিকানদের পক্ষে প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় সিনেমাতে ঢুকে পড়ার রাস্তা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আর তারা জার্মান ফিল্মের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। অর্ধেক হলিউড ভরে ফেলেছিল জার্মানরা; ইউনিভার্সাল  প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কার্ল ল্যামেল।

নরম্যান্ডির সৈকত ছিল দ্বিতীয় আক্রমণ; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল ইউরোপকে নিশ্চিতভাবে দখল করার উপায় । আর  এখন, তুমি রাজনীতিতে দেখতে পাও যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার নির্দেশ না দিলে ইউরোপ স্বেচ্ছায় কিছু করতে অক্ষম। এখন ফিল্মগুলোতে আমেরিকা পুরো পৃথিবীর দখল নিয়েছে। সুতরাং  যে সমস্ত গণতান্ত্রিক ধারণা ছিল তা লোপাট হয়ে গেল । আমি আমার পরবর্তী “সিনেমার ইতিহাসগুলো” [Histiore (s) cinema]তে – এক বিশেষ সময়ের, কনসেনট্রেশান শিবিরের সত্যতা দেখাবো, যা এখনও ফিল্মে প্রদর্শিত হয়নি ।  সিনেমায় , এর জবাব দেওয়া হয়নি।

গ্যাভিন : এই প্রসঙ্গে ‘শিন্ডলার্স  লিস্ট’ ফিল্মটা আপনার কাছে কী বোঝায়?

গোদার : ফিল্মটার কোনোই মানে হয় না। কিছুই দেখানো হয়নি, এমনকি সেই আগ্রহসঞ্চারী জার্মান শিন্ডলার-এর গল্পও নয় ফিল্মটা।আসল গল্পটা বলা হয়নি। ওটা একটি মেলানো-মেশানো ককটেল।

গ্যাভিন : আপনি কি মনে করেন যে ইতালীয় নিওরিয়ালিজম এবং ফরাসী নিউ ওয়েভ যুদ্ধের পরের পুনরুদ্ধারের প্রতিনিধিত্ব করেছিল?

গোদার : না, তারা ছিল সর্বশেষ বিদ্রোহ। আমরা যেটাকে আভাঁ গার্দ বলি তা আসলে ‘আরিয়ের গার্দ’ [রিয়ার গার্ড] ছিল।

গ্যাভিন : আপনি কি বলছেন যে ফ্রান্সের ষাটের দশকে আপনাদের সিনেমা আমেরিকান আধিপত্যের অধীন ছিল?

গোদার : আমরা তা ভাবিনি, কারণ একই সময়ে আমরা বেশিরভাগ নিজেরা তর্ক  করেছি কোনো এক ধরণের আমেরিকান সিনেমার পক্ষ নিয়ে । আমরা উইলিয়াম ওয়াইলার বা জর্জ স্টিভেন্সের চেয়ে স্যামুয়েল ফুলার বা বাড বোয়েটিচারকে পছন্দ করেছি। আমাদের ইচ্ছে, অন্তত রিভেতে আর আমার ইচ্ছে ছিল যে , একটা বড় সেটে  সংগীতচিত্র তৈরি করতে আমরা সক্ষম হব। সেটা এখনও একটা আশা! আমরা বলেছিলুম যে হিচকক হলেন একজন দুর্দান্ত চিত্রশিল্পী, দুর্দান্ত ঔপন্যাসিক, কেবল মাত্র খুনের গল্পের পরিচালকই নন, তাই ব্যাপারটা আরও গণতান্ত্রিক ছিল। তবে তা ইউটোপিয়ান ছিল, কারণ সত্যিকার অর্থে কী ঘটে চলছে তা বুঝতে পারার পক্ষে আমরা বয়সে খুব ছোট ছিলাম। আমি আজ এই কথা বলছি কারণ  সম্ভবত আমিই একমাত্র এই জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গী দেখাচ্ছি। আমি ইতিহাস পড়ার জন্য আমার চোখ এবং কান ব্যবহার করছি। শব্দ পড়ার জন্য অন্য লোকেরা তাদের চোখ ব্যবহার করে।

গ্যাভিন : কিন্তু আমেরিকান সিনেমার কয়েকটি বিষয়কে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আপনি কি তাহলে  তখন শত্রুদের ডেকে আনছিলেন ?

গোদার : একেবারেই না. আমরা হিচককের পক্ষে ছিলুম, তবে আমরা শর্লি ক্লার্ক বা জন ক্যাসাভেস বা এড এমশওইলারের পক্ষেও ছিলুম। আমি  সম্প্রতি যখন পড়েছিলুম যে একজন আমেরিকান সমালোচক লিখেছেন যে “হায় আমার জন্য” ( Hélas pour moi )  স্ট্যান ব্রাখাজের ছবির মতো লাগছিল, তখন আমি খুব খুশি হয়েছিলুম। কাইয়ে দ্যু সিনেমায় যোগদানের অনেক আগে থেকে গ্রেগরি মার্কোপৌলোসের সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিল। পরে  তাঁর ছবিগুলো আমার ভাল লাগেনি, তবে ওনাকে আর অন্যান্য লোকদের যারা অকপট সিনেমার পক্ষে ছিলেন তাঁদের আমার মনে আছে। তা ছিল গণতন্ত্র। আমরা বুঝতে পারি নি যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র আর রাশিয়ার কমিউনিস্ট সরকারের  মধ্যে তফাত নেই।

গ্যাভিন : ‘সিনেমার ইতিহাসগুলো’ [Histoire (s) du cinema]র দ্বিতীয় কিস্তিতে আপনি বলেছেন, “প্রযুক্তি জীবন থেকে প্রাণ এবং পরিচয় পুনরুৎপাদন ও নিকাশ করতে চেয়েছিল।” তার মানে কী ?

গোদার: আমাদের এই সত্যটি বিশ্লেষণ করা উচিত যে, যখন ফটোগ্রাফি আবিষ্কার হয়েছিল, তা প্রথম থেকেই রঙিন হতে পারতো, তা সম্ভব ছিল। তবে  এটি দীর্ঘকাল ধরে কালো এবং সাদা হওয়ার কারণ, তা আকস্মিকতাজনিত নয়। তাতে নৈতিক দিক থাকতে পারে, কেননা ইউরোপীয় ও পশ্চিমাবিশ্বের  শোকের রঙ হলো কালো। সুতরাং আমরা প্রকৃতি থেকে তার পরিচয়টি নিচ্ছিলুম এবং একটি নির্দিষ্ট উপায়ে তাকে হত্যা করছিলুম—

গ্যাভিন : সাদা-কালোয় তার ফোটো তুলে ?

গোদার : কেবল ফটোগ্রাফির মাধ্যমে, ভান করছিলুম যে পাসপোর্টে থাকা ছবিটা সেই ব্যক্তির পরিচয় — তা কেবল তার ফোটো , পরিচয় নয়। এবং তারপরে এটা  পেইনটিঙের ক্ষেত্রে একটা বড় পরিবর্তন আনে : আরও বিশদ করে আঁকা আরম্ভ হয় , তথাকথিত বাস্তবতার আরও বাস্তব চিত্র। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা প্রকৃতির পরিচয়কে টেনে বের করে নিচ্ছিলুম, আর যেহেতু  সংস্কৃতিতে কিছুটা নৈতিকতা ছিল, তাই সাদা-কালো রঙে করা হয়েছিল, শোকের রঙে । আমি আরও যোগ করতে চাইব যে, প্রথম টেকনিকালার এবং টেকনিকালার আজও, কম-বেশি আসল ফুলের মতন নয়, বরং তা শবযাত্রার ফুল।

গ্যাভিন : ১৯৭৯ সালে আপনার সিনেমায় ফিরে আসার পর থেকে সিনেমাটিক সৌন্দর্যের ওপর নতুন করে জোর দিয়েছেন । দেখে মনে হয় আপনি ব্যাপারটাকে ফিল্মে রহস্যের ধারণার সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছেন।

গোদার : হ্যাঁ. বেশিরভাগ সময় কোনও রহস্য থাকে না, আর কোনও সৌন্দর্য থাকে না — কেবল মেকআপ থাকে । ‘শিণ্ডলার্স লিস্ট’ বাস্তবতা গড়ে তোলার একটা ভাল উদাহরণ। তা হল ম্যাক্স ফ্যাক্টর। তার রঙের স্টক বর্ণনা করা হয়েছে কালো এবং সাদায়, কারণ ল্যাবগুলোর আসল কালোরঙ এবং সাদা করে তোলার মতন সামর্থ আর নেই। স্পিলবার্গ ভেবেছেন রঙের চেয়ে কালো এবং সাদা বেশি সিরিয়াস দেখায় ।  আপনি আজও কালো এবং সাদা ফিল্ম নিঃসন্দেহে করতে পারেন, কিন্তু তা কঠিন, তাছাড়া কালো এবং সাদা ফিল্ম করার খরচ রঙিনের চেয়ে বেশি। সুতরাং তিনি সিস্টেমের প্রতি বিশ্বস্ত — এটা একটা ফালতু চিন্তা। ওনার কাছে ব্যাপারটা কৌতুকপূর্ণ নয়, আমি মনে করি তিনি নিজের প্রতি সৎ, তবে তিনি খুব বুদ্ধিমান নন, যার দরুন ফল হয়েছে ফালতু । যেন আমি একটি তথ্যচিত্র দেখছি, যা ভাল নয়, তবে শিন্ডলার লোকটা সম্পর্কে  আপনি আসল তথ্য জানতে পারছেন। স্পিলবার্গ সেই মানুষটাকে আর এই গল্পকে এবং সমস্ত ইহুদি ট্র্যাজেডিকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যেন তা এক বিশাল অর্কেস্ট্রা, এক সহজ গল্প থেকে একটা স্টেরিওফোনিক আওয়াজ তৈরি করেছেন।

গ্যাভিন : মানে, উনি ঐতিহাসিক তথ্য দেননি–

গোদার : উনি সক্ষম নন। হলিউড সক্ষম নয়। আসলে, ব্যাপার হল, আমি যে ছবিটি করতে চাই,  তা করতে আমি সক্ষম নই। আমি তার জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারি এবং এর অংশ তৈরি করতে পারি, দুই তৃতীয়াংশ বা কখনও কখনও নয়-দশ অংশ। স্পিলবার্গ একজন নিয়মনিষ্ঠ পরিচালকের মতন ‘শিণ্ডলার্স লিস্ট’ করতে সক্ষম নন ।  প্রতিভাবান নন, বরং যেমন উইলিয়াম ওয়াইলারের মতো পরিচালক, যিনি যুদ্ধের ঠিক পরে, ‘আমাদের জীবনের সেরা বছরগুলি’ ফিল্মটি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন । আজ আপনি যখন ফিল্মটা দেখবেন, আপনি এই বিষয়টি দেখে অবাক হবেন যে হলিউডে কিছু সৎ লোক এবং ভাল কারিগর কারও-কারও কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিলেন।  ওয়াইলারের ফিল্মের চেয়ে সামগ্রিকভাবে সিনেমার সম্ভাবনা অনেক বেশি, তিনি সম্ভাবনার শতভাগ অবদান দিয়েছিলেন। আজ, এটি লোপাট হয়ে গেছে। যদি কোনও একশো গজের দৌড় হয়, উইলিয়াম বারো সেকেন্ডের মধ্যে তা সম্পূর্ণ করবেন; স্পিলবার্গ দৌড়োতে দুই মিনিট সময় নেবেন।

গ্যাভিন : ‘হায় আমার জন্য’( Helas pour moi )-এর একটি প্রধান বিষয় হ’ল যে ন্যারেটিভগুলো সভ্যতার মঙ্গলের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ হলেও,  সত্য ও সত্যকে নথিবদ্ধ করা ও যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে এটি অপ্রতুল ।

গোদার : ‘হায় আমার জন্য’-তে সেই জিনিসটি মিস করেছি, তবে আমি যেহেতু স্পিলবার্গের চেয়ে কিছুটা ভাল, আমার ছবি আরও ভাল হয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে  ততটা সফল হয়নি। আমি পয়েন্টটা মিস করে গিয়েছিলুম। ছবিটি শুরু হওয়ার আগে যা ছিল তা থেকে একেবারে আলাদা হয়ে হাজির হল।

গ্যাভিন : সাক্ষীদের সাক্ষাৎকার দিয়ে ন্যারেটিভের পুনর্গঠন যিনি করছেন তাঁর সঙ্গে তদন্তকারী / বর্ণনাকারীর ভূমিকা আমাকে ওয়েলস-এর আরকাদিন-এর ( Mr. Arkadin ) কথা মনে পড়িয়ে দেয়।

গোদার : হ্যাঁ, আমি, ‘মিঃ আরকাদিন’ আমার মনে আছে, আর  আমি সেকথা ভেবেছিলুম। তদন্তকারী চরিত্রটা সম্পাদনা অর্ধেক করে ফেলার পরে যোগ করা হয়েছিল, কেননা তা নাহলে ফিল্মটা একসঙ্গে বেঁধে রাখা যেতো না । এটা একটা ভাল চলচ্চিত্র তবে তা হতে পারতো আরও.…।  ফিল্মটার উদ্দেশ্য তা ছিল না। ‘মিঃ আরকাদিন’ ফিল্মে সেই উদ্দেশ্য ছিল। এ কারণেই আমি বলছি এটা একটা আরও ভাল ছবি, কারণ অরসন ওয়েলস, যদিও তাঁর কাজ করার পদ্ধতি সেই সময়ে ছিল আশি শতাংশ , শেষ পর্যন্ত তা ছিল ফিল্মের অংশ ।

গ্যাভিন : ‘জেএলজি দ্বারা জেএলজি’র কথা বলা যাক ।

গোদার : সঠিক টাইটেল হল ‘জেএলজি / জেএলজি’। কোনও ‘দ্বারা’ নেই । আমি জানি না কেন গৌমঁ শব্দটাকে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। যদি সেখানে একটি “দ্বারা” থাকে তবে এর অর্থ হবে এটা জেএলজি সম্পর্কে একটা গবেষণা, আমার নিজের সম্পর্কে নিজের দ্বারা  যেন একধরনের জীবনী, যাকে ফরাসী ভাষায় বলা হয় ‘বিবেকের পরীক্ষা’ ( un examen de conscience ); যা ফিল্মটা একেবারেই নয়। এজন্য আমি বলি ‘জেএলজি / জেএলজি আত্ম-পোর্ট্রেট’। নিজের প্রতিকৃতিতে কোনও “আমি” থাকে না । তার মর্মার্থ  কেবল পেইনটিঙে থাকে, অন্য কোথাও নয় । শুধু পেইনটিঙে নয়, চলচ্চিত্রেও তা থাকতে পারে কিনা তা জানতে আমি আগ্রহী ছিলুম।

গ্যাভিন : ফিল্মটি আপনাকে বেশিরভাগ সময় নিঃসঙ্গ হিসাবে তুলে ধরে — এটি কি আপনার জীবনের প্রতিচ্ছবি নাকি স্ব-প্রতিকৃতি ঘরানার  ফিল্ম ?

গোদার : আমি খুবই নিঃসঙ্গ, এটাই — আমি তা বাতিল করতে পারি না। অন্তরজগতে, আমি প্রচুর মানুষ এবং জিনিসপত্রের সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছি, যাঁরা একেবারেই জানেন না যে আমি তাঁদের সাথে যোগাযোগ করে চলেছি। তবে বাইরে, হ্যাঁ, এটা আমার চরিত্র এবং এটাই আমার জীবনের সত্য, যা মানুষের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে  অত্যন্ত একাকী । মাঝে মাঝে আমি সেই মানুষদের বুঝতে পারি যাঁরা ওয়াল্ডেনের বা থোরোর মতো জীবন কাটিয়েছেন। তবে এটাও হতে পারে যে আমি যখন ছোট ছিলুম তখন আমি এক বিশাল ধনী পরিবারের সদস্য ছিলুম, অনেক খুড়তুতো ভাই আর কাকারা ছিলেন। আমার যৌবনে অনেক কিছুই ছিল যে আজকে আমি মনে করি এটা একরকম ন্যায়বিচার যে আজকে  আমার কাছে সমস্তকিছু কম।

গ্যাভিন : আপনি কী ‘জেএলজি / জেএলজি’ ফিল্মকে মৃত্যুচিন্তা হিসাবে দেখছেন? মৃত্যুর অনেক কথা আছে।

গোদার: মৃত্যুর? না, একদম না ।  অন্য যে কোনও সময়ে হলেও ফিল্মটা খুব আলাদা হত না। তোমার যদি একটা ফাঁকা ঘর থাকে, তাহলে  আমি এই কথা ভেবে অপরাধবোধ এবং বেদনা উভয়ই অনুভব করতে পারি না, যে দেয়ালগুলো ফাঁকা, আমার পরিবার নেই, কিংবা কোনও পারিবারিক ফোটো দেয়ালে ঝোলানো, কেননা আমার পরিবার নেই, মাত্র একজন বা দুইজন বন্ধু আছে । কিন্তু ফিল্মটায় যদি অন্য লোকেদের রাখতুম তাহলে সেটা আত্মজীবনীমূলক হয়ে উঠতো আর তারপরে তা অন্যরকম কিছু হয়ে যেতো,  আর স্ব-প্রতিকৃতি থাকতো না। একটা স্ব-প্রতিকৃতি মূলত আয়নাতে বা ক্যামেরায় কেবল একটি মুখ। নয়তো তা হাস্যকর, কারণ তখন তুমি একটা শিশুকে অভিনয়ের জন্য নিতে, তোমার শৈশব দেখাবার জন্য আর…এটা হাস্যকর । অমন করা যায় না।

গ্যাভিন : ” মৃত্যুর পথে জীবন একটি বাধা, এবং এই ফিল্মটি আমার অন্তিম বিচার নির্ধারণ করবে” – এটি কি মৃত্যুর স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি নয়?

গোদার : হ্যাঁ…. না, কারণ যখন আমি আমার এই ছোট ছবিটি [চলচ্চিত্রের উদ্বোধনী চিত্র] আবিষ্কার করলুম, তখন আমি ভাবছিলুম যে কেন আমি ছয় বছর বয়সেই এতো মনমরা দেখাচ্ছি। তা এইজন্য নয় যে  আমার মা আমাকে চড় মেরেছিলেন; আমি মনে করি তাতে গভীরতর কিছু ছিল। তাই সেই সময়েই আমি পৃথিবী সম্পর্কে খুশি ছিলুম না!

গ্যাভিন : আপনার বলা চূড়ান্ত কথা হ’ল: “আমি বেঁচে থাকব। আমাকে ভালবাসার মাধ্যমে আত্মত্যাগ করতে হবে যাতে পৃথিবীতে প্রেম থাকে। ” ওগুলো কি আপনার নিজস্ব কথা না উদ্ধৃতি ?

গোদার : আমার মনে হয় ওটা একটৱা উদ্ধৃতি, তবে এখন আমার কাছে উদ্ধৃতি আর আমার কথা প্রায় একইরকম। আমি জানি না তা কার কাছ থেকে এসেছে; কখনও কখনও আমি তা  না জেনে ব্যবহার করছি।

গ্যাভিন :  উদ্ধৃতিটির  পুনরাবৃত্তি করে, এক অর্থে আপনি তা নিজেই বলছেন।

গোদার : এর সঙ্গে নিশ্চয়ই আমার কোনও কিছু করার আছে,  তবে তা ঠিক কী বলতে পারব না। ব্যাপারটা রঙের মতন, তবে শব্দ দিয়ে তৈরি।

গ্যাভিন : আমার কাছে, ‘জেএলজি / জেএলজি’ যাত্রা করে শীতকাল, নির্জনতা এবং ঘেরাটোপ থেকে বসন্তঋতু, খোলামেলা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার পুনর্নবীভূত বোধের দিকে ।

গোদার : হ্যাঁ ।

গ্যাভিন : শেষ শটগুলির মধ্যে একটা হ’ল বসন্তকালের অবিশ্বাস্য সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ। এটা জীবনের পূর্ণ প্রতিশ্রুতি  বলে মনে হয়।

গোদার : হ্যাঁ। আমি মনে করি বিশ্বের একখানা রূপক তৈরি করা ভাল ছিল, আর তারপরে ছায়া নেমে আসে । তবে  তার মানে দুঃখজনক নয় — তা হল কেবল দিনশেষের কথা ।

গ্যাভিন : ফিল্মের শুরুতে আপনি বলেছেন, “যে জায়গাগুলোয় দৃশ্য চিত্রায়িত হয়েছে তাতে শৈশবের প্রাকৃতিক-ভূদৃশ্যগুলো কারও অন্তরজগতে নেই ।” প্রতিটি প্রাকৃতিক-ভূদৃশ্যে কি  একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিগত অনুরণন আছে?

গোদার: না, আমি নিজে ওটার শুটিঙ করিনি; একজন ফটোগ্রাফার গিয়ে ওগুলো শুটিঙ করে এনেছিল, আর আমি সেগুলো থেকে বেছে নিয়েছিলুম । উনি ছিলেন জেনেভার ফটোগ্রাফার, ইভস পলিকুয়েন, যিনি প্রাকৃতিক-ভূদৃশ্যের শুটিঙ করতে  ভালোবাসেন। বেশিরভাগ ফটোগ্রাফার প্রাকৃতিক-ভূদৃশ্যের শুটিঙ করতে পছন্দ করেন না, তাঁরা আলোর কাছে আত্মসমর্পণ করতে চান না [অর্থাৎ — obéir] । ব্যাপারটা আলোকসজ্জার পক্ষে ভাল নয়, তবে উনি তথ্যচিত্র নির্মাণকারী মানুষ  হিসাবে একা যেতে পছন্দ করেন। তিনি কেবল মেঘের ছায়ার ছবি নেওয়ার জন্য তিন ঘন্টা ব্যয় করতে দ্বিধা করেন না, এবং তার ফলে প্রাকৃতিক দৃশ্যটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

গ্যাভিন : তা কি আপনি নিজেই করতে চাইতেন না?

গোদার : হ্যাঁ, তবে তখন আমি খুব দুর্বল ছিলুম। যাইহোক, আমি সেই জায়গাগুলো খুব ভাল করে জানি, কারণ তা আমার আসপাশের, কারণ এই বিশেষ ফিল্মটার জন্য আমি খুব বেশি দ্বিধা বোধ করছিলুম — এটা করব নাকি ওটা ? যেহেতু উনি নতুন ছিলেন এবং অনেকগুলো শট তুলে আনার আদেশ দেওয়া হয়েছিল, সেটা বেশ ভালভাবে কাজে দিয়েছিল। আমার এমন অনুভূতি ছিল যে আমি ফিল্মটা একা তৈরি করছিলুম না, বেশ কয়েকজন লোক ছিলেন, শুধু আমি একা নই, তথাকথিত প্রতিভাবান বা নৈরাজ্যবাদী ।

গ্যাভিন : ‘জেএলজি / জেএলজি’-তে একটি ভিজ্যুয়াল মোটিফ হ’ল স্কুলর এক্সারসাইজ খাতাগুলো: প্রথমে আপনি তাতে শিরোনাম লেখেন, তারপরে বাচ্চাদের নামগুলি লেখেন  যাদের খাতার পৃষ্ঠাগুলো ফাঁকা , তারপরে সবশেষে আপনার নিজের বইতে ফিরে যান, যাতে তখনও খালি পৃষ্ঠা ছিল । এই ফাঁকা পৃষ্ঠাগুলো ভবিষ্যতের আরেকখানা ছবির মতন মনে হয়, যে ইতিহাস এখনও লেখা বাকি ।

গোদার : হ্যাঁ ।

গ্যাভিন : তার মানে এই ফিল্মটা ফেয়ারওয়েল বা এপিটাফ নয়, যা কারও কারও  মনে হয়েছে । আপনি কি বলতে চাইছেন যে আপনার ভবিষ্যত একজন শিশুর  সম্ভাবনা বা প্রত্যাশার ক্ষেত্রে একইরকম ?

গোদার : আমার তেমন অনুভূতি আছে, হ্যাঁ । হতে পারে  যখন তুমি বুড়ো হয়ে যাবে, একরকম ভাবে তুমি নিজেকে আরও কমবয়সী বোধ করবে অথচ বুড়ো হয়ে গেছ — অল্প বয়স্ক বার্ধক্য, যদি সেকথা বলা যায়, যা খুবই… সান্ত্বনাময়।

গ্যাভিন : শিশুদের সঙ্গে আইডেনটিফাই করার জন্য ?

গোদার:  হ্যাঁ, তবে তুমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছ সেই  সত্যকে এড়িয়ে নয় । তোমার কাছে এখনও আবিষ্কারের জন্য সমস্ত কিছু পড়ে রয়েছে। সাধারণত তাদের দ্বিতীয় ফিল্মের ক্ষেত্রে, চলচ্চিত্র নির্মাতারা বলেন, “আমি কী করতে পারি? আমি সবই করে ফেলেছি।” এখন আমি বলি, “আমি কিছুই করিনি,  আরও অনেককিছু করতে হবে।” কিন্তু আমি তা করার সময় পাবো কী না তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন নই। আমি জানি যে প্রচুর ব্যাপার করার থাকলেও আমি আগে ভাবিনি যে ফিল্মে তা করা সম্ভব হতে পারে — যা-কিছু মোশন পিকচারে ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির ফলে ঘটছে — পুরানো বইয়ের শেলফের একটা শট  অনেক কথা বলতে পারে।

গ্যাভিন : শেষ অবধি, আপনি নিজের বাড়ি না ছেড়ে একটা চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারেন।

গোদার : তেমনটাই তো কমবেশি করেছি ।.

গ্যাভিন : ‘জেএলজি / জেএলজি’-র উদ্বোধনী শট চলাকালীন, ক্যামেরা যখন  আপনার অল্পবয়সী ছবিতে আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ক্যামেরার আর  ক্যামেরাম্যানের ছায়া বেশ স্পষ্ট দেখা যায় ।

গোদার : কেবল একবারের জন্য, আমি দর্শকদের কথা মনে রেখে করেছিলাম –বেশ সংক্ষিপ্ত, যাতে  বুঝতে পারা যায় যে এটি “আমি এবং আমি”। চিত্রশিল্পীদের স্ব-প্রতিকৃতিগুলির সাথে যেমন ঘটে, প্যালেট এবং পেইন্টব্রাশ হাতে ছবি আঁকছেন । 

গ্যাভিন : ভিডিও ক্যামেরায় পেছন থেকে জানালার বাইরের বেশ কয়েকটি শট নেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ ইমেজের  চেয়ে ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে পাওয়া শটটিতে ফোকাস কেন?

গোদার : মানে, দর্শকদের ফোকাস করার কথা ভাবানোর জন্য, ফোকাসের ধারণা দেবার খাতিরে। সাহিত্য, চিত্রকলা বা সংগীতে  ফোকাস করার কোনও ধারণা নেই; ফিল্ম তার বিষয়বস্তুতে ফোকাস করে।

গ্যাভিন : একইভাবে, “হায় আমার জন্য” ( Helas pour moi)তে,  রাশেলের (লরাঁ মাসলিয়াহ) একটি অসাধারণ শট রয়েছে মিডিয়াম লঙ শটে নেয়া, বেশ আউট অফ ফোকাস; মেয়েটি ক্যামেরার দিকে এগিয়ে যান এবং ক্লোজ-আপ হলে ফোকাসে আসেন ।

গোদার : হ্যাঁ, আমি অমনটা পছন্দ করি । ‘সিনেমার ইওতিহাসগুলো’[Histoire ( s ) du cinema]র ছবিগুলোতে ‘বিউটি অ্যাণ্ড দ্য বিস্ট’ [ La Belle et la bete]এর শট আছে, যখন জোসেটি ডে দীর্ঘ করিডোর ধরে হেঁটে আসেন ; ককতো কোনও ট্র্যাকিং শট তৈরি করেননি, তিনি তাকে একটি ছোট্ট ডলিতে রেখে ক্যামেরার দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। বাস্তবে এটি একই ব্যাপার, তবে অর্থ একই নয়। “হায় আমার জন্য” [Helas pour moi]-এর শটে তুমি মর্মার্থ খুঁজে পাচ্ছ: মেয়েটি ফোকাসে আসছে। ব্যাপারটা এমন, কেউ যেন জলের তলদেশ থেকে ওপরে পৃষ্ঠতলে ভেসে উঠছে,  কারণ সর্বোপরি, পর্দা হল একটা পৃষ্ঠতল । আমাকে দর্শকদের চিন্তা করতে প্ররোচিত করতে হবে। এটি সংগীতের মতো – যা নির্দিষ্ট নয় ; এমন বা অমন বোঝানোর ভান করা নয়। আমেরিকান লোকেরা বলতে পছন্দ করে, “আপনি ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন?” আমি উত্তর দেব: “আমি বলতে চাইছি বটে তবে ‘ঠিক’ তা নয়।” [ গোদার হাসেন]

গ্যাভিন :  “হায় আমার জন্য”[Helas pour moi ]তে  একটা স্তরে আপনি সিনেমার প্রযুক্তিগত শব্দভাঁড়ার অন্বেষণ করছেন বলে মনে হয়েছিল: ফোকাস, এক্সপোজার, ক্যামেরা মুভমেন্ট, মন্তাজ এমনকি একটা জুম আউট এবং ইন, যা আমি মনে করি আপনি প্রায় কখনও করেন না–

গোদার : না । খুবই কম ।

গ্যাভিন : প্রথম থেকেই  কি তেমন অভিপ্রায়  ছিল?

গোদার : না, শুটিংয়ের সময় সেটা ছিল। কারণ ফিল্মটা আমার আয়ত্ব থেকে পালাচ্ছিল, সম্ভবত আমি কিছু কিছু করার চেষ্টা করলুম যেগুলো আমি করতে সক্ষম নই তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যাচ্ছিল।  বাক্যটির থেকে ব্যকরণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বা ব্যাকরণ হয়ে যাচ্ছিল বাক্যগুলোর [un souvenir] একটা স্মৃতি । বাক্য তৈরি করা হয়নি, ব্যাকরণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এটা গাণিতিক উপপাদ্যের মতো যা বিজ্ঞানীদের কাছে একেবারেই সাফল্য পায় না, কারণ উপপাদ্যের যোগ, বিয়োগ, সমান চিহ্ণ ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

গ্যাভিন : কিন্তু মাধ্যমটার ব্যাকরণের  শুদ্ধ নিশ্চয়তা দেখার বিষয়ে উত্তেজক কিছু আছে নিশ্চয়ই, তা কেবলমাত্র  জ্ঞানীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও।

গোদার : হ্যাঁ, এটাই সিনেমার শুরু। এই ক্ষমতাটাকে আরও একবার সম্মান জানাতে পর্যাপ্ত পরিমিত হয়ে আমরা সময়ে সময়ে তা করতে পারি। তুমি যদি তা গণিতের ক্ষেত্রে করো, তবে এর কোনও অর্থ পাওয়া যাবে না । তুমি এটা সাহিত্যে করতে পারবে না, কারণ বাক্য এবং ব্যাকরণটি এতটা নিবিড়ভাবে সংযুক্ত , তুমি তাদের কেটে আলাদা করতে পারবে না। তবে সিনেমায় তুমি তা পারবে। আর কিছু না করে তুমি যদি কেবল কোনও ট্র্যাকিং শট বা ভূপ্রকৃতির দৃশ্য তোলো…। এই কারণেই আমি কিছু আনডারগ্রাউণ্ড আমেরিকান ফিল্ম পছন্দ করি, উদাহরণস্বরূপ মাইকেল স্নোর দুর্দান্ত ফিল্ম, ‘লা রিজিওন সেন্ত্রালে’, যা কেবল একটি দীর্ঘ প্যান। তা হল একটা ছবি, একেবারে খাঁটি সিনেমা।

গ্যাভিন : কিন্তু “হায় আমার জন্য” [Helas pour moi]তে  ব্যকরণগত অনুশীলনগুলো মনে হয় “ন্যারেটিভের” সঙ্গে সমন্বিত ।

গোদার : আমি ভেবেছিলুম আমার হাতে একটা ভাল চিত্রনাট্য আছে,  কিন্তু তাড়াতাড়ি শুট করা হয়ে গিয়েছিল । প্রথম খসড়াটা আমি প্রায় ১০০-১২০ পাতা লিখেছিলুম, আর আমাদের তিন সপ্তাহ পরে শুটিং করতে হয়েছিল। তাই আমি প্রযোজক এবং তারকাকে বলেছিলুম, “এটা সম্ভব নয়, আমাদের আরও তিন মাস বা সম্ভবত আরও তিন বছর সময় দরকার । তোমরা রাজি আছো?”  কেউ রাজি ছিল না, তাই আমি ফিল্মটা করলুম, কারণ সর্বোপরি একটা ফিল্ম মানে তো একটা ফিল্ম, ব্যাপারটা জীবনের মতন। আমরা প্রতিদিন যখন খেতে পারি, তখন খাই। তাছাড়া আমাকে কয়েকটা নির্দিষ্ট ব্যাপার সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হয়, তাই সম্ভবত অবচেতনায় আমি সেই ব্যাকরণগত সিনেমাটিক প্রতিমাগুলোকে আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করেছি।

গ্যাভিন : “সিনেমার ইতিহাসগুলো” [Histoirte ( s ) du cinema] দেখার আগে আমি কখনও ভাবিনি যে ভিডিওর ছবি অতো সুন্দর আর প্রলোভনসঙ্কুল হতে পারে । আপনি মনে হয় সম্ভাবনাকে আয়ত্ব করার উপায় আবিষ্কার করে ফেলেছেন ।

গোদার : আমি সোনি কোম্পানির চালু যন্ত্র ব্যবহার করি [ হাসেন ] — আমি ওটা ব্যবহার করছি আর আশা করি comme un aspirateur ( নতুন ভ্যাক্যুয়াম ক্লিনারের মতন ) জিনিসটা ভালো । আমি দেখতে ভালো আর পরিচ্ছন্ন জিনিস পছন্দ করি ; সাইকেল হোক কিংবা মোটরগাড়ি, দেখতে ভালো হওয়া চাই । টেলিভিশন ভালো করে তৈরি হয় না কিন্তু তুমি টেলিভিশনে দারুন সুন্দর প্রতিচ্ছবি তৈরি করতে পারো — জিনিসটা যেমনকার তেমনই, নিজের কাজ যতোটা পারে ভালোভাবে করে । কিন্তু আমি মনে করি যে তা এমন প্রতিচ্ছবি যেন কোনো পেইনটারের আঁকা স্কেচ, যা অসাধারণ পেইনটিঙের মতনই ভালো দেখতে লাগবে ।

গ্যাভিন : আপনার আগের ভিডিওর কাজগুলো ততো পেইনটারসুলভ ছিল না । “সিনেমার ইতিহাসগুলো” [Histoire ( s ) du cinema] যেন বয়নবিন্যাসের ব্যাপারে পেইনটিঙে ।

গোদার : সেটা ঠিক ।এটা চিত্রাঙ্কনের ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত আর এটা খাঁটি চিত্রাঙ্কন, কিন্তু সিনেমাটিক পেইন্টিং—এটা সিনেমার একটা দিক , যা বেশিরভাগ লোক বাতিল করে দিয়েছে। আর শুধু বিজ্ঞাপনই নয়। বিজ্ঞাপনগুলোও পেইন্টিঙ করে, বা সেই পোলিশ ভিডিও নির্মাতা রাইবজাইন্স্কি — সেগুলো কেবল বিজ্ঞাপন, তার কোনও মানে হয় না, স্রেফ সাজসজ্জা। আমি মাঝে মাঝে বিজ্ঞাপনগুলোকে পছন্দ করি,  কারণ ওই এক মিনিটের মধ্যে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়, আর তারা এমন জিনিস তৈরি করে যা মোশন পিকচারে অসম্ভব, কারণ ব্যাপারটা খুব ব্যয়বহুল হবে। তবে এগুলো বিক্রি করার জন্য তাদের মর্মার্থ এবং সেগুলোর বোধবুদ্ধি এবং তাদের লক্ষ্য, এটা বিক্রি সেটা বিক্রি — তা মোটেও ভালো নয় । ৩০ সেকেন্ডে এক মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা ভাল নয় … আমি জানি না, একটি জেনারেল মোটরসের গাড়িও তো মিলিয়ন  ডলার দাম নয়।

তবে আমি  মানি : এটি চিত্রাঙ্কন এবং উপন্যাস। আমার কাছে সিনেমা কেবল আমার লক্ষ্য, তবে তা সম্ভব নয়, কারণ সিনেমা পেইনটিঙ নয় ।  আমার কাছে সিনেমা হ’ল [ একটি পেইনটিঙের পত্রিকায় ভূদৃশ্যের বেশ কয়েকটি চিত্রের একটি চিত্রকর্মের দিকে নির্দেশ করে ] তবে আমি সেই লোকগুলোর সঙ্গে [ যাদের আঁকা]  কথা বলতে ভালোবাসি, আর তারপরে আছে নাটক — তবে সেইরকম পেইন্ট-করা নাটক। কোনও উপন্যাসের মতো নয়। আমি প্রায়শই পেইনটিঙগুলোর দিকে তাকাই আর নিজেকেই বলি, ও কী বলছে? এই লোকগুলো — তারা কী ভাবছে? আমার মনে আছে আমার প্রথম নিবন্ধটা, একটি প্রিমিনজার ছবি এবং ইমপ্রেশনিস্ট পেইন্টিংয়ের মধ্যে  তুলনা ছিল। হয়তো তা সম্ভব নয়, তবে আমার কাছে এটা সম্ভব বলে মনে হয় — ফিল্মটা তো আমার। সেই জন্যই তা পেইনটিঙের কাছাকাছি এবং আরও কাছাকাছি চলে আসছি।

এখন যদি আমি  ফিল্মে [আর্ট ম্যাগাজিনে পেইন্টিং] রাখি, তাহলে আগের প্রতিচ্ছবি কী হওয়া উচিত এবং এর পরের প্রতিচ্ছবি কী হওয়া উচিত? চিত্রকলাতে আমি যা পছন্দ করি, তা হ’ল এটি কিছুটা ফোকাসের বাইরে হয় আর তুমি তার পরোয়া করো না। সিনেমায় তুমি আউট অফ ফোকাস থাকতে পারবে না, তবে তুমি যদি সংলাপ যোগ করো, যদি তুমি ফিল্মে তা দেখাও,   বাস্তবতার দিকে ওই ভাবে চেয়ে দেখা, তবে তোমার ফোকাস-করা সিনেমাটোগ্রাফিক প্রতিচ্ছবি এবং শব্দের মধ্যে এমন একটা জমি রয়ে যায় যা আউট অফ ফোকাস , আর এই আউট অফ ফোকাস হল আসল সিনেমা।

গ্যাভিন : ‘সিনেমার ইতিহাসগুলোর’ ভিজ্যুয়াল টেক্সচারগুলি প্রায়শই এমনভাবে স্তরান্বয়ন করা হয়েছে যে প্রায়ই কিছু জায়গায় যেন একটি পেইনটিঙ ইন্দ্রিয়জ আর ঐশ্বর্য্যময় হয়ে উঠেছে ।

গোদার : হ্যাঁ, ইন্দ্রিয়জ একটি ভাল শব্দ। চিত্রকলার সংবেদনশীলতা, যা উপন্যাসগুলিতে থাকে না, তা ভাল, কারণ প্রতিটি রূপের প্রকাশের নিজস্ব আঙ্গিক থাকা উচিত যা অন্য জনারদের হাতে নেই, অন্যথায়  প্রকাশের শুধু একইরকম রূপ থাকবে। শুরু থেকেই ফিল্মগুলো প্রতিটি পরিবারের অংশ। আমার কাছে ফিল্মগুলো হ’ল শৈল্পিক পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য যার জন্ম সব শেষে হয়েছে, মানে ব্ল্যাক শিপ । কিন্তু তা একটা সাদা ভেড়া — কেননা পর্দাগুলো  তো সাদা [হাসি]। সংবেদনশীলতা এমন কিছু, যা সিনেমায় পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই, যা নীরব যুগে বেশি ছিল এবং স্বাভাবিকভাবে টকিজের সাথে অদৃশ্য হয়ে গেল।

গ্যাভিন : তা সিনেমাকে বন্দি করল না ইমেজকে ?

গোদার : হ্যাঁ, একভাবে দেখতে গেলে তাইই । আমি প্রায়ই প্রযুক্তি ব্যবহার করার  চেষ্টা করি, যেমন ডলবির কথা ধরা যাক, আওয়াজকে ছবি থেকে আলাদা করতে, আর হঠাৎ যখন নাট্যদৃশ্যের সেটার প্রয়োজন হয়, তখন তারা আবার দুজনেই একসঙ্গে হয়ে যায় । এটা [স্পষ্ট], বিশেষত আমেরিকান সিনেমায়, তুমি ক্যামেরা নিয়ে বিশেষ কাজ করো না, এই তথ্যে নির্ভর করে যে,  তা আরও বেশি করে কৃত্রিম হয়ে যাচ্ছে । আমি সম্প্রতি The Pelican Brief দেখেছি। ওটা স্রেফ বিজ্ঞাপন। ক্যামেরা চলতে থাকে, অথচ ক্যামেরার চলাচল বা স্থিরতার সঙ্গে বা শট পরিবর্তনের সঙ্গে ভন স্ট্রোহিম বা ভন স্টার্নবার্গের কোনও যোগসূত্র নেই। এর কোনও মর্মার্থ গড়ে ওঠে না, কেবল আমরা ফিল্ম করছি এরকম ভান করা ছাড়া আর কিছুই নয়।

গ্যাভিন : আপনি অনুভব করেন না যে এটি যৌনতার অন্য রূপ?

গোদার : না, ওটা বেশ্যাবৃত্তি ।

গ্যাভিন : ‘জেএলজি / জেএলজি’-র আরেকটি উদ্ধৃতি: “একটি ইমেজ গড়ে ওঠে মনের দুটি পৃথক বাস্তবকে একত্রিত করে ; বাস্তব যতো দূরে যায় আরও নিখুঁত হয়, ইমেজ ততই শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

গোদার : ওটা একটা পুরানো উদ্ধৃতি। ‘জেএলজি / জেএলজি’তে আমার নিজস্ব প্রায় একটি শব্দও নেই, তবে যেহেতু আমি সেগুলি পড়ছিলুম আর তা নোট কর রাখছিলুম, সেগুলো আমার হয়ে গেল।

গ্যাভিন : Passion ফিল্মের পরিচালক সে-কথা বলেন ।

গোদার : ওটা  ‘কিং লিয়ারে’ [King Lear] রয়েছে। এটা পিয়ের রেভেরদির একটি কবিতা,  ডাডার পরাবাস্তববাদীদের প্রথম একজন, ১৯২১ সালে জুরিখে যখন ডাডার সূত্রপাত হয়েছিল তখন থেকে । কবিতাটা আমার মতামত খুব ভালভাবে প্রকাশ করেছিল যে, কোনও ইমেজ এই জন্যে শক্তিশালী নয় কারণ আপনি একজন মৃত ব্যক্তিকে দেখছেন…। অনেকসময়ে, বলতে গেলে কম সময়েই,  কেবল একজন মৃত ব্যক্তির প্রভাব গড়ে ওঠে । ভিয়েতনাম যুদ্ধ এইজন্যে শেষ হয়ে যায়নি যে আমরা অনেক মৃত মানুষকে দেখেছিলুম ,বরং এই কারণে যে একবার আমেরিকান জনগণ একটি আমেরিকান ছাত্রকে কেন্ট রাজ্যে খুন হতে দেখেছিল — কেবলমাত্র একজন,হাজার নয় — তাই ছিল যথেষ্ট । পরের দিন সকালে তারা আর সক্ষম হয় নি, [তবে] তিন বা চার বছর সময় লেগেছিল আর তারপরে হ্যানয়তে বোমা ফেলা হলো।

গ্যাভিন : কীভাবে আপনি এই আইডিয়াকে ব্যবহার করবেন,  সম্পূর্ণ বিপরীতে দিক থেকে একটি নির্দিষ্ট ইমেজ তৈরি করবেন?

গোদার : কিন্তু  একটি ইমেজ তো বিদ্যমান থাকে না। এটা কোনও ইমেজ  নয়, এটা একটা ছবি। ইমেজ হ’ল আমার সাথে সম্পর্কিত আর সেই দিকে তাকিয়ে অন্য কারোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার স্বপ্ন দেখছি । ইমেজ হল একটা অনুষঙ্গ।

গ্যাভিন : আপনার সত্যিকারের মন্তাজ সম্পর্কে ধারণাটি এখানেই ঘটে?

গোদার : হ্যাঁ । La vrai mission, সিনেমার আসল লক্ষ্য  ছিল মন্তাজ কী তা বিশদ করা আর তা প্রয়োগ করা। কিন্তু আমরা সেখানে কখনও পৌঁছোইনি; অনেক পরিচালক বিশ্বাস করেছিলেন যে তাঁরা সেখানে পৌঁছে গেছেন, কিন্তু তাঁরা করেছিলেন অন্য কাজ । বিশেষত আইজেনস্টাইন। উনি মন্তাজের  পথে এগিয়েছিলেন কিন্তু সেখানে পৌঁছোতে পারেননি। উনি তো সম্পাদক ছিলেন না, উনি কোনাকুনি ছবি তুলতেন। আর যেহেতু কোনাকুনি নেওয়ার ক্ষেত্রে উনি বেশ ভাল ছিলেন বলে, সেখানে মন্তাজের আইডিয়া ছিল। অক্টোবরের তিনটি সিংহ, একই সিংহ কিন্তু তিনটি ভিন্ন কোণ থেকে নেওয়া, তাই সিংহটিকে দেখে মনে হচ্ছে প্রাণীটা  চলমান । আসলে বিভিন্ন কোণের অনুষঙ্গের কারণেই মন্তাজ এসেছিল । মন্তাজ অন্য কিছু, কখনও আবিষ্কার হয়নি। টকিজ আসার ফলে তা বন্ধ হয়ে যায়; টকিজগুলো তাকে কেবল থিয়েটারের মতন ব্যবহার করেছিল ।

গ্যাভিন : আপনি যখন এলিজাবেথ টেইলরের ইমেজকে Place in the Sun-এ উনোনের ভেতরের দেহগুলোর ওপর ‘ইতিহাসের সিনেমাগুলো’তে [Histoire ( s ) cinema] সুপারইমপোজ করেন —তখন তা মন্তাজ।

গোদার :  ওটা ঐতিহাসিক মন্তাজ। এটা একটা সমালোচনামূলক কাজ: এলিজাবেথ টেলরের হাসিখানা কেন এমন হাসি তা ব্যাখ্যা করে—

গ্যাভিন : হলোকস্টের কারণে–

গোদার : হলোকস্টের কারণে। এবং যেহেতু জর্জ স্টিভেনস হলোকস্টের শুটিঙ করেছিলেন, অনেক অনেক  বছর ধরে সেটা তাঁর সেলারে লুকিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু তিনি যখন A Place in the Sun  শুটিং করছিলেন তখন তাতে একইসঙ্গে একধরণের হাসি এবং বিপর্যয় দেখা দেয়। এমনকি তা কোনও অসাধারণ চলচ্চিত্র না হলেও, অত্যন্ত তীব্র আর তুমি তা ব্যাখ্যা করতে পারবে না। জর্জ স্টিভেন্স পরে যে  ছবিগুলো করলেন তার কোনওটিই অতো ভাল ছিল না। মিলি পার্কিন্সকে নিয়ে The Diary of Anne Frank, যা শিণ্ডলার্স লিস্ট-এর চেয়ে ভাল কিন্তু খুব ভাল ফিল্ম নয়; উনি মিলি পার্কিন্সের হাসি সেইভাবে নিতে পারেননি  যেভাবে এলিজাবেথ টেইলর মৃদু হেসেছিলেন ।

গ্যাভিন : পুরো ‘ইতিহাসের সিনেমাগুলো’ [ Histoire (s) du cinema] জুড়ে আপনি অসাধারণ সৌন্দর্য্য ও মাহাত্ম্যের ইমেজের বিপরীতে আতঙ্ক ও  নৃশংসতার ইমেজগুলো উপস্হাপন করেছেন । মনে হয় আপনি বলতে চাইছেন যে সিনেমা এই দুটির মাঝে তৈরি হয়।

গোদার : হ্যাঁ, অতিক্রম করার ধারণা তাতে রয়েছে। আমি যখন থামে-বাঁধা চোখবন্ধ বন্দির নিউজরিল ফুটেজ মেশাচ্ছিলুম — তুমি তো জানো তিন মিনিটের মধ্যেই তাকে গুলি করে মারা হবে  — আমি ওটাকে মিশিয়েছিলুম An American in Paris, জিন কেলি এবং লেসিলি কারন সিন নদীতে নাচের সঙ্গে। এটা অবচেতন কাজ ছিল, কিন্তু পরে আমি নিজেকে বলেছিলুম, যে, হ্যাঁ, আমার তা করার অধিকার আছে কেননা An American in Paris সম্ভবত একই সময়ে তোলা হয়েছিল।

গ্যাভিন : ‘ইতিহাসের সিনেমাগুলো’র [ Histoire (s) du cinema] প্রথম অংশে আপনি ভিডিও প্রয়োগ করেছেন যাতে সম্পাদনার প্রভাবগুলোয় লক্ষণীয় বৈচিত্র্য অর্জন করা যায় — দুটি শট দ্রুত পরস্পরকে কাটতে পারে, কোনো ওয়র্ড প্রসেসরে একটা বাক্য টাইপ করার ছন্দ দিয়ে কাটতে পারা যায়। আপনি ঠিক কী জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করছিলেন?

গোদার : না কেটেই ইমেজগুলোকে মেশানোর চেষ্টা করা হয়েছিল — খুব দ্রুত আরোপন, যাতে কেবল একটা ইমেজ থাকে, কিন্তু আমরা বুঝতে পারলুম যে দুটো আছে।

গ্যাভিন : ওটা আমাকে ফিল্মে ২৪-ফ্রেম-প্রতি সেকেন্ডের প্রভাব বজায় রাখা সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করেছিল। আমি ভেবেছিলাম আপনি চেষ্টা করছেন —

গোদার : বিশদে তা বলতে হলে বলব, হ্যাঁ ।

গ্যাভিন : অত্যন্ত ধিমে তালে চলা ডিজলভগুলো সম্পর্কে কী বলবেন ?

গোদার : সেই সমস্ত পুরোনো কৌশল  মোশন পিকচার ব্যবসার শুরু থেকেই ছিল , যা আমরা নিউ ওয়েভে ভেঙে ফেলতে সক্রিয় ছিলুম — আর এখন ভিডিও আসার ফলে ওটা ফিরে এসেছে, তবে ভালভাবে।

গ্যাভিন : কিন্তু ‘সিনেমার ইতিহাসগুলো’ [ Histoire (s) du cinema] এর মধ্যেও সংক্রমণগত প্রভাব রয়েছে, যার কোনও সিনেমাটিক নজির নেই: যেমন ধরা যাক, যখন কোনও ইমেজ ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে আর শেষে আগের ইমেজটাকে মুছে ফ্যালে। মোশন পিকচারগুলোতে ওয়াইপস আর স্প্লিট-স্ক্রিন প্রভাব আছে, কিন্তু এরকম বিস্তারিত কিছু নেই। সেই ব্যাকরণটা অনন্যভাবে ভিডিওর।

গোদার : হ্যাঁ, তবে এটা তো সিনেমা। আমার কাছে ভিডিও মোশন পিকচারের একটা বিভাগ। যখন তুমি ‘সিনেমার ইতিহাসগুলো’ [ Histoire (s) du cinema] দেখো, তখন তোমার স্বাভাবিক ভিডিওর অনুভূতি হয় না না, তখন তোমার সিনেমার অনুভূতি হয়।

গ্যাভিন : আমি ‘সিনেমার ইতিহাসগুলো’ [Histoire (s) cinema] ভিডিওতে দেখেছি আর টিভির টেপেও দেখেছি—

গোদার : ওটা টিভিতে দেখা ভাল, যদি তোমার টিভি সেটটায় ঠিকমতো সামঞ্জস্য করা থাকে আর  মোটামুটি ভাল স্টেরিও সরঞ্জাম থাকে । টিভিতে কোনও প্রজেকশান নেই । একটা প্রত্যাখ্যান আছে—তুমি তোমার আরামকেদারা্য বা  বিছানায় প্রত্যাখ্যাত হয়ে আছো।সিনেমায় তুমি প্রজেকটেড, কিন্তু তা সত্বেও তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে কী হয়ে উঠতে চাও । টিভিতে কেবল কোনও কিছুর ট্রানসমিশন থাকে ।  সিনেমায় প্রজেক্ট করার ব্যাপারটা অদ্ভুত, হ্যাঁ।

গ্যাভিন : আবার, ‘সিনেমার ইতিহাসগুলো’ [ Hisdtoire (s) du cinema] থেকে একটা উক্তি: “থিয়েটার ব্যাপারটা বেশ পরিচিত; সিনেমা খুবই অচেনা।”

গোদার : রবার্ট ব্রেসঁ ?…

গ্যাভিন : আমি এটিকে আপনার “histoire de la nuit” , রাতের গল্প, আর ইমেজ সম্পর্কে বর্ণনার সঙ্গে যুক্ত করি এবং এই দুটি বাক্যাংশ থেকে আমি যে আইডিয়া পাই  তা এই যে সিনেমা একখানা রহস্যের এলাকা । আপনি কেন মনে করেন যে আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে তৈরি আপনার ফিল্মগুলো রহস্য ন্যারেটিভের রূপ সম্পর্কে ক্রমশ জড়িয়ে পড়েছে? ডিটেক্টিভ [Detective], হেইল মেরি [Hail Mary], নভেল ভিগ [Nouvelle Vague], হেলাস পোর মোই [ Helas pour moi] সব কয়টাই কোনও কেন্দ্রীয়, অদৃশ্য রহস্য বা ধাঁধাকে  ঘিরে আবর্তিত হয়।

গোদার :  তুমি যখন বয়স্ক হয়ে যাও, তখন কাঠামোর বিশ্লেষণ উপন্যাসেরই একটা অংশ। এটা হ’ল জেমস জয়েসের ইউলিসিস এবং এরেল স্ট্যানলি গার্ডনার মধ্যে পার্থক্য। পেরি ম্যাসনে রহস্যটি বর্ণনা করার রহস্য মাত্র, [যেখানে জয়েসের কাছে ] লেখার রহস্য নিজেই উপন্যাসের অংশ। পর্যবেক্ষক এবং মহাবিশ্ব একই মহাবিশ্বের অঙ্গ।  এই শতাব্দীর শুরুতে বিজ্ঞান সেটাই আবিষ্কার করেছিল, যখন তারা বলল যে তুমি পারমাণবিক কণা কোথায় তা বলতে পারবে না। তুমি জানো যে তারা কোথায়, কিন্তু তাদের গতি জানো না ; বা তুমি তাদের গতি জানো কিন্তু তাদের অবস্থান জানো না, কারণ তা তোমার ওপর নির্ভর করে। যিনি বর্ণনা করেন তিনি সেই বর্ণনার অংশ ।

গ্যাভিন : ষাটের দশক ও সত্তরের দশকে আপনি যে রহস্যগুলি সমাধান করার চেষ্টা করছিলেন তা ধর্মনিরপেক্ষ বস্তুবাদ ভিত্তিক ছিল আর আকাঙ্খা, আদর্শ, ভাষা এবং শক্তিক্ষমতার মতো ব্যাপারগুলোর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল। আশির দশকের পর থেকে, যদিও আপনার ফিল্মগুলো এই বিতর্কমূলক প্রশ্ন অব্যাহত রেখেছে, এখন ফিল্মগুলো দর্শন আর অধিবিদ্যার চিরন্তন রহস্যগুলোর সাথে বেশি সম্পৃক্ত।

গোদার : আমিও তাই মনে করি,  আর তুমি যদি সাধারণ ব্যাপারের মাধ্যমে অধিবিদ্যাটা আনতে পারো তাহলে খুব ভাল হয়। এটা শিল্পীর একটা দায়িত্ব। সেজানের আঁকা একটা সাধারণ আপেল একটা সাধারণ আপেলের চেয়ে বেশিকিছু । বা কেবল একটা সাধারণ আপেল।

গ্যাভিন : Nouvelle Vague এবং Helas pour moi ফিল্মে প্রকৃতিকে ব্যবহারের পেছনে কি তাইই আছে ?

গোদার : হ্যাঁ ।

গ্যাভিন : এই দুটো ফিল্মে আপনার উজ্জ্বল প্রাকৃতিক আলোর ব্যবহার অস্বাভাবিক — ক্যামেরা ভেতরে থাকলেও,  বা দিগন্তের জন্য, মনে হয় যেন তা বাইরে শুটিঙ করা । বৈসাদৃশ্যে কেন এমন জোর দিয়েছেন ?

গোদার : কারণ আমি বৈশাদৃশ্য দেখছি। এটা দুটো ইমেজ রাখার উপায়, একে অপরের থেকে অনেক দূরে, একটা অন্ধকারময় এবং একটা রোদযুক্ত । আমি আলোর মুখোমুখি হতে চাই, আর তুমি যদি আলোর মুখোমুখি হও তবে বৈপরীত্য দেখা যায় এবং তারপরে তুমি  রূপগুলো দেখতে সক্ষম হও… যা সর্বদা ইউরোপীয় চিত্রকলার সমস্যা ছিল, তবে রোমান্টিকদের আর দেলাক্রয়ার সময় থেকে আরও সচেতনভাবে। আমি চাই পেছনে আলো থাকবে না, কারণ পেছনের আলো প্রজেক্টরের অন্তর্গত, ক্যামেরার সামনে আলো থাকা জরুরি, যেমন আমরা নিজেরাই জীবনে তা পাই। আমরা গ্রহণ করি এবং [পরে] তা প্রজেক্ট করি।

গ্যাভিন : তার মানে ক্যামেরার পেছনদিকে আপনি নকল আলো কখনও রাখেননি ?

গোদার : কখনই নয় ।

গ্যাভিন : কিন্তু আপনি তো নকল আলো ব্যবহার করেন ?

গোদার : শুধুমাত্র এই কারণে যে আমার তেমন কোনও ফটোগ্রাফার নেই যিনি ৫০ বছর আগের দুর্দান্ত ফটোগ্রাফারদের মতো ভাল । সুতরাং আমি কৃত্রিম আলো ব্যবহার করতে পছন্দ করি,  তবে জিনিসগুলি পরিবর্তন না করে: আমাদের প্রয়োজন হলে ফোকাস করার জন্য শক্তিশালী আলো প্রয়োজন হবে। আমার মতে আর প্রায় ফটোগ্রাফার বলতে কেউ নেই। তাদের মেরে ফেলা হয়েছে, যেভাবে পুরো সেট জুড়ে তারা  টিভির ছবি তোলে আর একই লোকজন দিয়ে ভরাট করে, কোনও ছায়া থাকে না, কিছুই না । আমি সিনেমাটোগ্রাফারদের ব্যবহার করি যারা অতিরিক্ত লাইট ব্যবহার করতে ইচ্ছুক নয় আর প্রধানত ভাল অ্যাপারচার খোলার ক্ষেত্রে কাজ করার চেষ্টা করেন।

গ্যাভিন : ‘ডিটেক্টিভ’ ফিল্মে একটি লাইন  আছে: “এখানে কখনও কোনও আলো হয় না, কেবল কঠিন  আলোর ব্যবস্হা ।” 

গোদার: ‘ডিটেক্টিভ’ বেশ ভাল আলোকিত ছিল, একজন ভাল ফটোগ্রাফার [ব্রুনো নুয়াইটেন]। তিনি অজানা অভিনেতাদের ভাল করে আলোকিত করেছিলেন কারণ দৃশ্যটায় তাদের দেখা না গেলেও তারা ভয় পেতো না। কিন্তু  নাথালি বে বা জনি হ্যালিডের মতো তথাকথিত বিখ্যাত তারকারা আসার সাথে সাথে তিনি কৃত্রিম আলো ফেলেছিলেন আর তা মোটেই ভাল হয়নি। তিনি তাদের প্রতি আলোকপাত করেছিলেন কারণ তারা টিভিতে স্পিকার দেখতে চান। স্পিকার দেখার গুরুত্ব কী? আমাদের কেবল দরকার তারা যা বলছে তা শোনা।

গ্যাভিন : আর আপনি তার সাথে একমত হতে পারেননি ।

গোদার : ওহ, পুরোপুরি [হাসি]। একটা জবরদস্ত তর্কাতর্কি হয়েছিল। কিন্তু আমি তা এড়াতে পারিনি কারণ  চুক্তিতে স্বাক্ষরিত ছিল ব্যাপারটা। একটি সমঝোতা করতে হয়েছিল। একটা ফিল্ম সব সময়েই একখানা আপস ।

[ফিল্ম কমেন্ট পত্রিকার মার্চ-এপ্রিল ১৯৯৬ সংখ্যায় প্রকাশিত । ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মলয় রায়চৌধুরী]

Posted in Jean-Luc Godard | Tagged | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

গোদার-এর মাওবাদী পর্ব : একটি  সমালোচনা : অনুবাদ – মলয় রায়চৌধুরী

 

[ মাওইস্ট ইনটারন্যাশানালিস্ট মুভমেন্ট পত্রিকার ২৬ জানুয়ারি ২০০৪ সংখ্যায় প্রকাশিত ]

 

‘চীনা, বা বরং, চীনা পদ্ধতিতে: ফিল্ম নির্মাণ’, সাধারণত  ‘ল্যা চিনোয়া’ নামে পরিচিত, যা ১৯৬৭ সালের ফরাসি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হিসেবে  জাঁ-লুক গোদার পরিচালনা করেছিলেন।

১. লা চিনোয়া [ চীনা], পরিচালক জাঁ-লুক গোদার, ১৯৬৭

২. লে ভনদে [ পুর্ব দিকের বাতাস ], পরিচালক জাঁ-লুক গোদার, ১৯৬৯

৩. তু ভা বিয়ঁ [ সব ঠিক আছে ], পরিচালক জাঁ-লুক গোদার, ১৯৭২

 

২০০৪ সালে এই ফিল্মগুলো দেখে আমরা  একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই এবং তা হল গোদার সিরিয়াস ছিলেন কি না । আজ আমরা যখন দেখি পশ্চিমে মাওয়ের ইমেজ অভিনব বিজ্ঞাপনের সাথে মিশে গেছে,  তা আসলে মাওকে বিদ্রূপ করার কৌশল এবং তার মাধ্যমে সংস্কৃতিগুলোতে ভোক্তা আবেশের শক্তি প্রদর্শন করা হয়, এমনকি চীন থেকে দূরে থাকলেও। সর্বোপরি, আজ মাওয়ের ইমেজ মূল স্রোতোধারায় ব্যবহারটি বিপরীতমুখী, কারণ এটি চীনে দুর্দান্ত বিজ্ঞাপন প্রচারের গুরুত্ব পায় আর সবাই জানেন যে মাও একজন কমিউনিস্ট ছিলেন। বিপরীতে, সংস্কৃতি বিপ্লবের (১৯৭৬ সালে) সময় গোদার একজন উন্নত চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে মাওয়ের ইমেজগুলো পুরোপুরি গুরুত্ব সহকারে ব্যবহার করেছিলেন — এবং এমনকি মাওয়ের জন্য একটা জিংগল তৈরি করেছিলেন। আমরা বলতে পারি যে এই ফিল্মগুলোতে যাথার্থ্য আছে, মাওবাদী রাজনীতি, তত্ত্ব এবং পদ্ধতির বোঝাপড়া আছে।

 

১৯৬৭ সালে “লা চিনোয়া” মুক্তি পেয়েছিল দেখে অবাক হতে হয় । গোদার যে কেবল মাও আর সোভিয়েত সংশোধনবাদী নেতাদের মাঝে ভাঙনকে ধরতে পেরেছেন তা-ই নয়, গোদার সেই ভাঙনকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।তিনি ছিলেন সময়োচিত ।  “লা চিনোয়া” এবং “উইন্ড ফ্রম দ্য ইস্ট” -এ গোদার সোভিয়েত সংশোধনবাদ, ফরাসী “কমিউনিস্ট পার্টি”, সামাজিক-গণতন্ত্র এবং শ্রমিক আমলাতন্ত্রের নিন্দা করেছেন।

 

“পূর্ব দিকের বাতাস” ফিল্মে প্রচুর আকর্ষণীয় বিষয় রয়েছে তবে ফিল্মের সবচেয়ে বড়ো অবদান এবং তর্কসাপেক্ষভাবে গোদারের সামগ্রিক অবদানগুলি চলচ্চিত্র নির্মাণ-তত্ত্বের অন্তর্গত কারণ “পূর্ব দিকের বাতাস” এবং “লা চিনোয়া” ফিল্মগুলো সম্পর্কে গোদার জানান যে তিনি ঠিক কোন কারণে মাওবাদীদের বিশ্বাস করেন এবং কেমন করে ফিল্ম তৈরি করা উচিত । গোদার  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন তা হল প্রলেতারিয়েত কীভাবে সংগ্রাম করবে এবং ফিল্মের দ্বারা কীভাবে সর্বহারা শ্রেণীর পক্ষে উপকার পাওয়া যায়, যদিও বর্তমানে আমরা যে সমস্ত ফিল্ম দেখি তাতে বেশিরভাগ উপস্থাপনা এবং পদ্ধতিগুলি শাসকদের উপকার করে।

 

মাও-যুগের গোদার বলেছিলেন যে, সর্বহারা শ্রেণীর অবস্হা নিয়ে সমাজতাত্ত্বিক চলচ্চিত্রগুলো যদি সংঘর্ষের চিত্রণ বাদ দেয় তবে তারা কার্যকর হয় না।শ্রমিকদের ভয়াবহ অবস্থা প্রকাশের ফলে হতাশা ঘটবে কিন্ত পাশাপাশি কর্মকাণ্ডও ঘটতে পারে, সুতরাং কীভাবে বিদ্রোহ করা যায় তা ফিল্মে দেখানো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

 

রাজনৈতিকভাবে এই ফিল্মগুলোতে এমন কিছু ব্যাপার আছে যা আমাদের পছন্দ নয়, বিশেষত “তু ভাঁ বিয়ঁ”[ সব ঠিক আছে] ফিল্মটি, যা মূলত একটি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রকে ফরাসী কর্মীদল কর্তৃক অধিগ্রহণ সম্পর্কে । ফ্রান্সে গোদারের সময়ের ঘটনাগুলো আজকের দিনে যেমন, তার তুলনায় সেই সময়ের সাম্রাজ্যবাদী দেশের শ্রমিকদের অবস্হা আরও ঘোলাটে ছিল ।

 দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, ফরাসিদের তাদের অর্থনীতৈক অবস্হা পুনর্গঠন করতে হয়েছিল এবং এমনকি বুদ্ধিজীবীরাও ভেবেছিলেন যে সাম্রাজ্যবাদী ঝোল টানা ভালো, কেননা তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি  পৌঁছানোর পক্ষে সহায়ক হওয়া যাবে আর মার্কিন জীবনের মানদণ্ডে পৌঁছোনো যাবে।

 

গোদার তাঁর সময়ের অন্যান্য অনেকের মতো  ভেবেছিলেন যে তিনি সম্ভবত এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছেন যেখানে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিতে ফরাসিদের দেখাদেখি সংখ্যাগরিষ্ঠ  সমর্থিত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আসবে। যদি এটা সত্য হতো যে ফরাসি শ্রমিকরা শোষিত হচ্ছিল, তবে তাদের সম্পর্কে গোদারের দৃষ্টিভঙ্গি মাওবাদী মানদণ্ড দ্বারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক হতো। অন্যান্য বেশিরভাগ ব্যাপারে গোদার সঠিক হলেও এই একটি ব্যাপারে তিনি ভুল ।

 

২০০৪ সালের সুবিধাজনক অবস্হান থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ১৯৬৮ সালের মে মাসে সংঘর্ষময় ধর্মঘটে বিজয়ের দরুন  বেতন অনেক বেড়ে গিয়েছিল এবং মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছিল যা কিনা ফ্রান্সে সাম্রাজ্যবাদী পরজীবিতার হাতকে শক্তিশালী করে তুলেছিল। “তু ভাঁ বিয়ঁ”[ সব ঠিক আছে]-এর মাংস-প্রক্রিয়াকরণ কারখানার মহিলা  শ্রমিকের চরিত্র যা বলে তার চেয়ে বেশি কিছু প্রমাণ করার দরকার হয়নি, যে কিনা অলঙ্কৃত উক্তিতে জানায় যে, বস যদি এক ডলার দেয় তবে শ্রমিকরা প্রত্যেকে এক হাজার ডলার চায় — যেন সেই পারিমাপের মান কোথাও থেকে উড়ে আসে। ফিল্মের শেষে একদল তরুণ একটি সুপার-মার্কেটে “ভাঙচুর” ধরণের গোলমালের  আয়োজন করে যেখানে লোকেরা টাকাকড়ি না দিয়ে ঠেলা ভরে-ভরে জিনিসপত্র নিয়ে পালায়। 

 

অবশ্যই এটি একটি ভাল প্রসঙ্গ যে কেনই বা লোকেরা সুপার মার্কেটের দোকানগুলোকে টাকা দেবে,   যখন সমাজ অর্থ যোগাতে পারে না, কিন্তু ফিল্মটির পুরো সুরটি সাম্রাজ্যবাদী দেশের শ্রমিকদের অর্থনৈতিক দাবির দিকে খুব বেশি ঝুঁকে ছিল –  সাম্রাজ্যবাদীরা কীভাবে নিজের এবং তাদের দালালদের সুবিধার জন্য তৃতীয় বিশ্বকে শোষণ করে তা দেখানোর পরও গোদার সামাজিক-গণতন্ত্র এবং সংশোধনবাদ থেকে নিজেকে পৃথক রাখতে পেরেছিলেন ।

 

ফরাসী শ্রমিকদের প্রতি গোদারের বিশ্বাসকে বাদ দিয়েও, যাদের শোষণ করা হচ্ছে এবং তাদের সমর্থন করার উপযুক্ত কারণ আছে, এই চলচ্চিত্রগুলোর সাথে আমাদের খুব কমই দ্বিমত রয়েছে। একথা বলা একটা কঠিন শর্তের মতো মনে হতে পারে, তবে বাস্তবে, গোদার তাঁর চলচ্চিত্রগুলোয় চিন্তা করার পদ্ধতিগুলো শেখান। “লা চিনোয়া”  দর্শকদের বোঝাবার চেষ্টা করে যে তাঁর সময়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ কীভাবে বিজ্ঞান ছিল। অতএব অর্থনৈতিক জীবনের তথ্যগুলি পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু সত্যে পৌঁছানোর কয়েকটি প্রাথমিক পদ্ধতি বদলায় না । এই কারণেই আমরা এখনও গোদারের মাওবাদী পর্বকে, ফরাসি শ্রমিকদের প্রকৃতির সাথে তাঁর সঙ্গে আমাদের মতবিরোধ সত্ত্বেও তরতাজা হিসেবে দেখি ।  ফ্রান্স সম্পূর্ণরূপে একটি পরজীবী জাতিতে পরিণত হয়েছিল, তবে গোদার এই ফিল্মগুলোতে যা বলেছিলেন তার বেশিরভাগ আজও বর্তমান।

 

“পূর্ব দিকের বাতাস” ফিল্মে যখন গোদার তত্বনির্মাণকে ফিল্ম প্রোডাকশনের মূল কাজ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, তখন তাঁর সময়ে ফরাসি কর্মীদের প্রতি তাঁর  দৃষ্টিভঙ্গি কী তার গুরুত্ব ছিল না। চলচ্চিত্রের প্রধান দায়িত্বের প্রশ্নটি এখনও অবধি অনুত্তরিত রয়ে গেছে। আরও বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ফরাসি কর্মীদের সম্পর্কে তাঁর ধারণা ভুল ছিল, তবে মূল কাজটি নিয়ে প্রশ্ন এখনও থেকে গেছে।

 

প্রধান দায়িত্বের বিষয়ে গোদারের সঙ্গে আমরা একমত নই, কারণ আমরা একে বলি, “জনগণের মতামত সৃষ্টি এবং ক্ষমতা দখলের জন্য নিপীড়িতদের স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান নির্মাণ”। আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে, “লা চিনোয়া”-র চেয়ে “ম্যাট্রিক্স” এর অবদান বেশি । তবে, আমরা যদি গোদারের মাপকাঠিকে গ্রহণ করি তবে  বলতে পারি যে “লা চিনোয়া” ফিল্মটা “ম্যাট্রিক্স” এর চেয়ে বড় অবদান রেখেছে, কারণ “লা চিনোয়া” সাংস্কৃতিক বিপ্লবে উৎপন্ন মাওবাদী পদ্ধতি এবং নির্দিষ্ট তত্ত্বগুলিকে সরাসরি সামলায়। বিপরীতে, “ম্যাট্রিক্স” সম্ভবত বাইরের ভারী হস্তক্ষেপ ছাড়া মাওবাদের গুরুত্বর বিবেচনা করতে পারে না। এর মধ্য দিয়ে আমাদের এই প্রশ্নটি উত্থাপনের অর্থ হল  যে, এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সর্বহারা শ্রেণি এবং এর সাম্রাজ্যবাদী দেশ বিশেষত মিত্রদের, আসলে কী প্রয়োজন। তত্ব নির্মাণ বা আরও দ্রুত এবং বিস্তৃত আবেদন সহ এমন কোনও কিছুর মধ্যে আমাদের বেছে নিতে হবে। এটিও একটি বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন – মূল কাজটি সম্পর্কে আমরা অথবা গোদার সঠিক কিনা। হয় এক বা অন্য দৃষ্টিভঙ্গি বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করবে।

 

কেউ কেউ বলতে পারেন যে এই ফিল্মগুলো উপদেশ দেবার মতো “ডাইডাকটিক”,  তবে বাস্তবে গোদার দর্শকদের বিভিন্ন শিবিরের পার্থক্য করার চেষ্টা করেছেন: ১) পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শিবির ; ২) ব্রেজনেভের সোভিয়েত সহ সামাজিক-গণতান্ত্রিক / সংশোধনবাদী ও শ্রম আমলা শিবির ইউনিয়ন ; ৩) সর্বহারা শিবির। প্রতিটি শিবির এই সিনেমাগুলিতে তার বক্তব্য রাখে এবং গোদার দেখান যে প্রথম দুটি একটি আরেকটির সঙ্গে যুক্ত । মানুষ এই সংঘর্ষগুলোর দিকগুলো আলাদা করতে পারার সময়, গোদার সম্ভবত “ডাইডাকটিক” চলচ্চিত্রটিকে বুর্জোয়া চলচ্চিত্র হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন, সংঘর্ষ ছাড়াই উপস্থাপনা করেছিলেন।

 

গোদারের তত্ত্ব নির্মাণের প্রধান কাজটা, দর্শকদের আর অর্থ-বিনিয়োগকারীদের এড়াবার খাতিরে চলচ্চিত্র পরিচালকদের উপর একটি ভারী বোঝা চাপিয়ে দেয়। সম্ভবত তাঁর কাজের অনুরণনটির বেশিরভাগ অংশই “শৈল্পিক বিশ্বস্ততা”র প্রশ্নে মাথা গলানো থেকে উদ্ভূত, এটা এমন একটা প্রশ্ন যা যে-কোনও শৈল্পিক পাতি-বুর্জোয়াকে ক্ষুব্ধ করে । তত্ব নির্মাণের দায়টা গোদারের জনপ্রিয়  “আর্টসি” বা “হাই ব্রাউ” ভাবমূর্তির সঙ্গে খাপ খায়।

 

ওনার এই ফিল্মগুলোর সাথে আমাদের উপরোক্ত কয়েকটি মতবিরোধ সত্ত্বেও, আমাদের এও বিশ্লেষণ  করা উচিত যে গোদারের মাওবাদী পর্বটি সঠিক ছিল কিনা। সোভিয়েত সংশোধনবাদকে বারবার মারাত্মকভাবে আক্রমণ করাটা সোভিয়েত ইউনিয়ন আর ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির মতন উপগ্রহ দলগুলোর দেউলিয়াপনা প্রমাণ করেছে । কেবলমাত্র সবচেয়ে বিভ্রান্ত রুশপ্রেমীগুলোই বিশ্বাস করত যে খ্রুশ্চেভ / ব্রেজনেভ যুগটি ছিল “সমাজতন্ত্র”।

 

“পূর্ব দিকের বাতাস”-এ দেখা যায় ফিল্মটি স্ট্যালিনকে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করছে। তখনকার  দিনে এবং আজকালও একটা জনপ্রিয় চর্চা হল – স্টালিনের কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক পদ্ধতির বিপরীতে “স্বায়ত্তশাসন”। গোদার “স্বায়ত্তশাসন” আন্দোলনের ইতিহাসে আলোকপাত করে দেখিয়েছেন,  কীভাবে তা সর্বহারা শ্রেণিকে অবহেলা করে পাশ কাটিয়েছে।গোদার স্টালিনের সময়কার শিল্পকে দোষারোপ করার সময় স্ট্যালিনের অধীনে সমস্ত শিল্পীদের তার জন্য দায়ি করেছিলেন — এমনকি তখন থেকে ট্রটস্কির অত্যধিক শৈল্পিক প্রভাব লক্ষ করে ব্রেস্ট-লিটোভস্কের সন্ধি হওয়ার পরেও লেনিনকে খোঁচা দিয়েছেন – “স্বায়ত্বশাসনের” প্রশ্নে গোদার পুরোপুরি স্ট্যালিনের  পক্ষ নিয়েছেন এবং টিটোর যুগোস্লাভিয়ায় “স্বায়ত্তশাসন” এর আদর্শগত অভিব্যক্তি প্রদর্শন করেছেন। মাও ১৯৬৩ সালে তাঁর প্রবন্ধে শ্রমিক আভিজাত্য, শ্রমিক আমলাতন্ত্র এবং সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশ্নগুলিকে একসাথে যুক্ত বলে প্রতিপাদন করে কড়া জবাব দিয়েছিলেন । গোদার সম্ভবত ” যুগোস্লাভিয়া কি সমাজতান্ত্রিক দেশ? ” প্রবন্ধটা পড়েছিলেন।

 

১৯৬০ এর দশক থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত প্রতিবিপ্লবীরা মার্কস ও লেনিনের অনুগামীদের মতামতকে সরিয়ে যুগোস্লাভিয়াকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন যাতে  মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ থেকে পুঁজিবাদে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে এমন লোকদের মাঝ-পথের ঘর হিসাবে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন । যুগোস্লাভিয়া ছিল “স্বায়ত্বশাসিত উদ্যোগের” সঙ্গে “বাজার সমাজতন্ত্র “। লক্ষণীয়ভাবে অনুপস্থিত ছিল মাও বা স্ট্যালিন ধাঁচের কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক শক্তি।তবু যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে স্ট্যালিনের প্রভাব শেষ হয়ে গিয়েছিল আর গর্বাচভ/ইয়েল্তসিন বুর্জোয়াজি খোলাখুলি আবির্ভুত হল, তখন সবচেয়ে হিংস্রভাবে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে গেল । সেই গণহত্যার সন্ত্রাস আমাদের মতন মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্টালিন এবং মাওয়ের অনুসারীদের অবাক করেনি, কারণ  যুগোস্লাভিয়ার জনগণের বৈষয়িক ভিত্তি এবং পথনির্দেশক ছিল স্হানীয় স্তরে। “বিশ্বব্যাপী চিন্তাভাবনা করুন, স্থানীয়ভাবে কাজ করুন” স্লোগানের এটা একটা গভীর ভুলের উদাহরণ হতে পারে । অর্থনৈতিক “স্বায়ত্তশাসন” যা করেছিল তা হ’ল প্রদেশগুলোকে একে অপরের ঘাড়ে চাপতে উৎসাহিত করেছিল। সেটাই সংকীর্ণ প্রাদেশিক যুদ্ধের বৈষয়িক ভিত্তি তৈরি করেছিল।

 

“স্বায়ত্তশাসন” প্রিয় যুগোস্লাভিয়ার ভয়ংকর পতন প্রমাণ করে যে পুঁজিবাদের পর তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি হল  কেন্দ্রিয় সমাজতন্ত্র এবং তা সম্পর্কে মার্কস এবং এঙ্গেলসের তত্ত্বগুলি একেবারে সঠিক। সর্বহারা শ্রেণীর সংহতি ভঙ্গ করার জন্য “স্বায়ত্তশাসন” আরেকটি শব্দ। “স্বায়ত্তশাসন” আসলে সর্বহারা ও পুঁজিবাদী শ্রেণীর উভয়ের ওপরে লাঠি ঘোরাতে চাইছে এমন পাতি-বুর্জোয়া শ্রেণীর শব্দ। নারীদের প্রশ্নের ক্ষেত্রেও একই কথা। অবশ্য, জেনডার ব্যাপারটা শ্রেণীর প্রশ্ন থেকে তুলনামূলকভাবে স্বায়ত্তশাসিত, কারণ সমস্ত নারীই শ্রমিক নন, তবে একথা সত্য যে স্বায়ত্তশাসন এবং জেন্ডার প্রশ্নে ব্যক্তিবাদ নিপীড়িত ও শোষিতদের একতা ভঙ্গ করে। নারীর  এগিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক গোষ্ঠী-স্তরের উত্তর খুঁজে বের করার বিকল্প নেই। এটা ব্যক্তির স্বতন্ত্র অনুভূতি, বা স্বতন্ত্র ক্ষমতা বা এমনকি বিকেন্দ্রীকরণের প্রশ্ন নয় ।

 

মার্কসের মূল্যের শ্রম তত্ত্ব জোর দিয়েছিল যে শ্রমিকরা কীভাবে একটি নিরপেক্ষ প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে – অর্থাৎ যা তাদের নিজস্ব শ্রম। কারা শোষিত এবং কারা নয় সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপায় না থাকলে সর্বহারা ঐক্যের ক্ষতি হবে। শোষণ এবং ক্ষতিপূরণের প্রশ্নগুলিকে খুব গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে তা না হলে এর পরিণতি হবে গণহত্যার যুদ্ধ যেমন যুগোস্লাভিয়ায় দেখা গিয়েছিল। কেবলমাত্র তাদের কারখানা বা প্রদেশে নয় পুরো দেশ এবং পুরো পৃথিবীর অন্যান্য শ্রমিকদের সাথে কীভাবে চলতে হবে তা শেখা শ্রমিকদের একটি মূল কাজ। “স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে” শোষিতদের “মূল্যমানের শ্রম তত্ত্ব” প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই একে অপরের পরিস্থিতি দৃঢ়ভাবে জানতে সহায়তা করতে সফল হতে হবে। শ্রমিকরা যদি একে অপরের বস্তুগত অবস্থা  দৃঢ়ভাবে অনুভব করতে অক্ষম হয়, তবে তারা পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ হতে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য স্তরে ব্যর্থ হবে। একটি কেন্দ্রিয় অর্থনৈতিক শক্তির মাধ্যমে শ্রমিকরা একে অপরের মধ্যে তাদের সম্পর্কগুলোর সামঞ্জস্য করতে পারে। সেই ক্ষমতা না থাকলে যুগোস্লাভিয়া-ধরণের পরিস্থিতি তৈরি হতে বাধ্য।

 

এই ফিল্মগুলোর সংলাপসমূহের শব্দাবলী মাও-যুগের গোদারের চলচ্চিত্রগুলিতে অগ্রগতির প্রধান বোঝা বহন করে। দ্বিতীয়ত, গোদার সীমাবদ্ধ ক্রিয়া ব্যবহার করেন, রক্ত-লাল রঙ নিক্ষেপ করে এবং  চরিত্রগুলোকে রক্তাক্ত করে তুলে ফিল্মে তুলে ধরা তাঁর পরিচিত ক্রিয়া। তৃতীয়ত, গোদার এছাড়াও দর্শকদের বোঝাবার জন্য ব্যবহার করেছেন এবং দেখিয়েছেন ফটোগ্রাফি বা ফিল্মের ছবিগুলো কীভাবে বুর্জোয়া শ্রেণির পক্ষে সহজেই কাজে লাগানো যেতে পারে ।”তু ভাঁ বিয়ঁ” ফিল্মের শেষে, গোদার ফ্রান্সের এমন ফুটেজ দেখিয়েছেন যার পটভূমিতে নির্বোধ ট্যুরিজম বা ফরাসী জাতীয়তাবাদী জিংগলগুলো বাজিয়ে শুনিয়েছেন । “পূর্ব দিকের বাতাস” ফিল্মে গোদার সাধারণ ফুটেজ ব্যবহার করে বুর্জোয়া চলচ্চিত্র নির্মাণকারী দুটি চরিত্রের অভিনয় উপস্হাপন করেছেন। আমরা দুর্দান্ত মেক-আপ, প্রপস এবং ম্লান আলো দিয়ে একটি কংকুইস্তাদর ফিল্মের ভাবনা কল্পনা করে নিই, তবে গোদার আমাদের দেখিয়েছেন একজন লোক একজন বন্দীকে, প্রকাশ্য দিনের আলোয়, বিশেষ ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়াই টেনে নিয়ে চলেছে –যা প্রকৃত অভিনেতারা দেখতে পায় কোনোরকম প্রপস ছাড়াই — যা বেশ সাদামাটা। বুর্জোয়ারা যখন কিনা দর্শকদের দুর্দান্ত পটভূমির সৌন্দর্য দেখায়, তাঁর মাওবাদী পর্বে গোদার আমাদের দেখান যে সৌন্দর্য আসলে থাকে সংগ্রামে ।

[ ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মলয় রায়চৌধুরী ]

   

Posted in Jean-Luc Godard | Tagged | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান