আর্নেস্তো কার্দেনাল-এর কবিতা

আরনেস্তো কারদেনাল-এর কবিতা । অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

মেরিলিন মনরোর জন্য প্রার্থনা

প্রভু :

পৃথিবীতে মারিলিন মনরো নামে পরিচিত এই বালিকাটিকে গ্রহণ করুন

যদিও তা ওর প্রকৃত নাম নয়

( কিন্তু আপনি মেয়েটির প্রকৃত নাম জানেন : অনাথ মেয়ে ৯ বছর বয়সে ধর্ষিত 

দোকানের কর্মচারী মেয়ে যে ১৬ বছর বয়সে নিজের জীবন শেষ করে দিতে চেয়েছিল )

যে এখন আপনার সামনে নিজেকে তুলে ধরছে কোনো সাজগোজ না করে

কোনো কাগজের দালাল সঙ্গে নেই

কোনো ফোটোগ্রাফার নেই অটোগ্রাফ সইয়ের ব্যাপার নেই,

নভোচরের মতন একা রাত্রির মুখোমুখি যার নাম মহাকাশ ।

বালিকা হিসাবে, মেয়েটি গির্জায় নগ্ন থাকার স্বপ্ন দেখেছিল (  টাইম ম্যাগাজিন যেমন বলে )

সাষ্টাঙ্গ জনগণের সামনে, মেঝেতে মাথা পেতে,

আর ওকে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে হাঁটতে হচ্ছিল যাতে তাদের মাথায় না পা রাখতে হয়।

মনোবিদদের চেয়ে ভালো আপনি এই স্বপ্নগুলো সম্পর্কে ভালো জানেন ।

গির্জা, বাসা, গুহা হলো মায়ের বুকের মতন সুরক্ষিত

কিন্তু তার চেয়েও বেশি…

মাথাগুলো মেয়েটির ভক্ত, তা পরিষ্কার

( আলোর এক স্রোতের তলায় অন্ধকারে মাথার জমঘট )।

কিন্তু মন্দিরটা তো টোয়ান্টিয়েথ সেঞ্চুরি-ফক্স স্টুডিও নয় ।

মন্দির — শ্বেতপাথর আর সোনায় — মেয়েটির দেহের মন্দির

যেখানে মানবপুত্র, চাবুক হাতে,

টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি-ফক্স ব্যাবসাদারদের তাড়ায় ।

যারা আপনার প্রার্থনার বাড়িকে চোরেদের গুহায় বদলে দিয়েছে।

প্রভু :

এই জগত কি পাপ আর বিকিরণে দূষিত,

আপনি দোকানের কর্মচারী মেয়েটিকে কেবল দোষ দিতে পারেন না

যে, আর সমস্ত দোকানের কর্মচারী মেয়েদের মতন, তারকা হবার স্বপ্ন দেখেছিল।

আর ওর স্বপ্ন ছিল বাস্তব ( কিন্তু যেমন টেকনিকালারও বাস্তব )।

মেয়েটি কেবল আমাদের দেয়া স্ক্রিপ্ট অভিনয় করেছিল,

যা আমাদের নিজেদের জীবন, এক অদ্ভুত স্ক্রিপ্ট ।

মেয়েটিকে ক্ষমা করুন, প্রভু, আর আমাদের ক্ষমা করুন

আমাদের বিশ শতকের জন্য

বিশাল অতি-উৎপাদনের জন্য যাতে আমরা সবাই খেটেছি।

মেয়েটি ভালোবাসা পেতে চেয়েছিল আর আমরা দিয়েছি ঘুমের ওষুধ।

যে দুঃখের জন্য আমরা কেউই পবিত্র নই

মেয়েটিকে মনোবিদ দেখাবার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল।

মনে করুন প্রভু ক্যামেরা সম্পর্কে মেয়েটির বৃদ্ধিপ্রাপ্ত আতঙ্ক

সাজগোজকে ঘৃণা, প্রতিটি দৃশ্যের জন্য তাকে নতুন করে তোলার জন্য দাবি

আর কেমন করে আতঙ্ক বেড়ে যেতে লাগলো

আর স্টুডিওতে অনেক দেরিতে পৌঁছোনো ।

দোকানের কর্মচারী মেয়েদেরর মতন

মেয়েটি তারকা হবার স্বপ্ন দেখেছিল ।

আর মেয়েতির জীবন ছিল অবাস্তব, স্বপ্ন যা মনোবিদ ব্যাখ্যা করে আর নথি করে রাখে।

মেয়েটির রোমান্স ছিল দুই চোখ বন্ধ করে চুমু খাওয়া

কিন্তু তারপর চোখ খুলে যায়

আর আবিষ্কার করে প্রচুর আলো ওর দিকে মুখ করা

তারপর আলোগুলো অন্ধকার হয়ে যায় !

আর লোকেরা ঘরের দুটো দেয়াল ভেঙে ফ্যালে ( তা ছিল ফিল্মের সেট )

পরিচালক নিজের নোটবই নিয়ে চলে যান

কেননা দৃশ্যটা তোলা হয়ে গেছে ।

কিংবা প্রমোদভ্রমণের পোতে, সিঙ্গাপুরে একটা চুমু, রিওতে নাচ

উইন্ডসর প্রাসাদে ডিউক ও ডাচেসের অভ্যর্থনা

এক মর্মন্তুদ ফ্ল্যাটের ছোটো বৈঠকখানায় দেখা ।

শেষ চুমু ছাড়াই ফিল্মটি শেষ হয় ।

ওরা মেয়েটিকে তার বিচানায় মৃত পেলো, হাতে ফোন ।

আর গোয়েন্দারা জানতে পারেনি কাকে মেয়েটি ডাকছিল ।

তা ছিল

সেইরকম যে বন্ধু কন্ঠস্বরকে চেনে তাকে ফোন করতে চাইছিল

কেবল রেকর্ড করা কন্ঠস্বর শোনার জন্য যা বলবে : রং নাম্বার

কিংবা কারোর মতন, যে, ডাকাতদের দ্বারা ঘায়েল

তার ছেঁড়া ফোনের দিকে হাত বাড়ায় ।

প্রভু :

কাকে ডাকার চেষ্টা মেয়েটি করেছিল তাতে কিছুই আসে-যায় না

কিন্তু পারেনি ( আর হবতো তা কেউ ছিল না

কিংবা কেউ যার নাম্বার লস অ্যাঞ্জেলেস ফোনের বইতে নেই ।

আপনিই ফোনের জবাব দিন !

দক্ষিণের সমুদ্র

রাফায়েল হেলিওদোরো ভালে-র জন্য

তেইশে মার্চ আমি আকাপুলকো বন্দর থেকে যাত্রা করেছিলুম

আর শনিবার পর্যন্ত যাত্রাপথ নিয়ত রেখেছিলুম, চৌঠা এপ্রিল, যখন

ভোর হবার আধ ঘণ্টা আগে, আমরা চাঁদের আলোব দেখলুম

পাশাপাশি একটা জাহাজ এসেছে

যার পাল আর সামনে দিক রুপোর তৈরি ।

আমাদের কাণ্ডারী ওদের দিকে চেঁচিয়ে বলল দূরে থাকতে

কিন্তু কেউই উত্তর দিল না, যেন ওরা সবাই ঘুমোচ্ছিল ।

আবার আমরা হাঁক পাড়লুম : “কোথা থেকে তোদের জাহাজ আসছে ?”

আর ওরা বলল : পেরু !

তারপর আমরা ভেরীধ্বনি শুনলুম, আর বন্দুক চালাবার শব্দ,

আর ওরা আমাকে নির্দেশ দিলো ওদের জাহাজে যেতে

যেখানে ওদের ক্যাপ্টেন ছিল সেখানে ।

আমি দেখলুম উনি ডেকে পায়চারি করছেন,

ওনার কাছে গিয়ে, হাতে চুমু খেলুম আর উনি জিগ্যেস করলেন:

“ওই জাহাজে কতো রুপো আর সোনা আছে ?”

আমি বললুম, “কিছুই নেই,

কিচুই নেই, স্যার, কেবল আমার ডিশগুলো আর পেয়ালাগুলো।”

তখন উনি জিগ্যেস করলেন আমি ভাইসরয়কে চিনি কিনা ।

আমি বললুম, চিনি । আর ক্যাপ্টেনকে জিগ্যেস করলুম,

“উনি কি ক্যাপ্টেন ড্রেক নিজেই অন্য কেউ নন তো ?”

ক্যাপ্টেন জবাবে বললেন

“উনিই ক্যাপ্টেন ড্রেক যার বিষয়ে আমি বলছি।”

আমার অনেকক্ষণ কথা বললুম, রাতের ভোজনের সময় পর্যন্ত,

আর উনি নির্দেশ দিলেন আমি যেন ওনার পাশে বসি।

ওনার থালাগুলো রুপোর আর তারা কিনারায় সোনা

তাতে ওনার চিহ্ণ ।

স্ফটিকের শিশিতে ওনার রয়েছে বহু গন্ধদ্রব্য আর সুগন্ধী জল

যা, উনি বললেন, রানি ওনাকে দিয়েছেন ।

উনি সন্ধ্যা আর রাত্রির ভোজন সর্বদা বেহালার সঙ্গীতের সাথে সম্পন্ন করেন

আর নিজের সঙ্গে সর্বত্র চিত্রকরদের  নিয়ে যান যাঁরা আঁকতে থাকেন

তাঁর জন্য সমুদ্রতীরগুলো ।

উনি চব্বিশ বছর বয়সী, ছোটোখাটো, লাল দাড়ি ।

উনি হুয়ান অ্যাকুইনা, বিখ্যাত জলদস্যুর ভাগ্নে ।

আর উনি সমুদ্রের ওপরে যতো খ্যাতনামা নাবিক আছেন তার অন্যতম ।

পরের দিন, যা ছিল রবিবার, উনি অসাধারণ পোশাকে নিজেকে সুসজ্জিত করলেন 

আর ওদের দিয়ে পতাকা উত্তোলন করালেন

মাস্তুলের মাথায় ডুবুরি রঙের ছোটো পতাকা উড়িয়ে,

পেতলের আংটি, আর শেকল আর রেলিঙ আর

আলকাজারের আলো সোনার মতন জ্বলজ্বল করছিল ।

ওনার জাহাজ ছিল যেন শুশুকদের মাঝে সোনার ড্র্যাগন ।

আর উনি চলে এলেন, ওনার কাগজ নিয়ে, আমার অর্থ-ভাঁড়ার দেখতে ।

রাত্রির আগে পর্যন্ত সারা দিন আমার কি আছে তা দেখলেন
আমার থেকে যা নিলেন তা বিশেষ কিছু নয়,

আমার নিজের কিছু ছোটোখাটো জিনিস,

আর আমাকে দিলেন একটা ছোরা আর ওদের জন্য একটা রুপোর হাতল

আমায় অনুরোধ করলেন ওনাকে ক্ষমা করে দিতে

কেননা ওগুলো উনি ওনার মহিলার জন্য নিয়েছিলেন :

উনি আমাকে যেতে দেবেন, উনি বললেন, পরের দিন সকালে, বাতাস আরম্ভ হতেই ;

তার জন্য আমি ওনাকে ধন্যবাদ জানালুম, আর ওনার হাতে চুমু খেলুম।

উনি নিয়ে যাচ্ছেন, ওনার জাহাজে, তিন হাজার রুপোর বাট

তিনটে ভাঁড়ার সোনায় ভরা

বারোটা ভাঁড়ার আটটা করে ভাগ করা :

আর উনি বললেন উনি চীনের উদ্দেশে যাত্রা করছেন

সামুদ্রিক মানচিত্র অনুসরণ করে একজন চীনা চালকের পরিচালনায় যাকে উনি বন্দী করেছেন…

নীল উড়োজাহাজের জানালা দিয়ে দেখা দৃশ্য

            এক গোল ছোটো জানালায়, সবই নীল,

জমি নীলাভ, নীল-সবুজ, নীল

                               ( আর আকাশ )

              সবই নীল

নীল ঝিল আর জলাশয়

                    নীল আগ্নেয়গিরি

            অনেক দূরের জমিগুলো আরও নীল দেখায়

         নীল দ্বীপ নীল ঝিলের মাঝে ।

এটা মুক্ত করা দেশের মুখ।

আর যেখানে সব জনগণ যুদ্ধ করেছিল, আমার মনে হয় :

                                           ভালোবাসার জন্য !

শোষণের ঘৃণা ছাড়া

                             বাঁচবার জন্য ।

এক সুন্দর দেশে একে আরেককে ভালোবাসার জন্য

এতো সুন্দর, কেবল নিজেই নয়

                        কিন্তু তার অধিবাসীদের জন্য,

সবার ওপরে তার অধিবাসীদের জন্য ।

ঈশ্বর সেই জন্যে এই সুন্দর দেশ আমাদের দিয়েছেন

তার অন্তর্গত সমাজের জন্য ।

আর যে নীল জায়গাগুলোয় তারা লড়েছিল, যন্ত্রণা ভোগ করেছিল

                  এক ভালোবাসার সমাজের জন্য

                          এখানে এই দেশে ।

একটা নীল টুকরো অনেক বেশি গাঢ় দেখায়…

আর আমি ভাবলুম আমি সেখানে সব কয়টা লড়াইয়ের জায়গা দেখতে পাচ্ছি,

আর সমস্ত মৃত্যুর,

ওই ছোটো গোল জানালার কাচের পেছনে

                                      নীল

                              যতো রকমের নীল হয় ।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

চার্লস বুকোস্কির কবিতা : অনুবাদ – মলয় রায়চৌধুরী

চার্লস বুকোস্কির কবিতা : অনুবাদ মলয় রায়চৌধুরী

প্রেম ও খ্যাতি ও মৃত্যু

এটা আমার জানালার বাইরে বসে থাকে

বাজারে যাচ্ছে এমন এক বুড়ির মতন ;

এটা বসে থাকে আর আমার দিকে লক্ষ রাখে,

ভয়ে গলদঘর্ম হয়

তারের আর কুয়াশার আর কুকুরের ডাকের ভেতর দিয়ে

যখন হঠাৎই

আমি দৃশ্যটা খবরের কাগজ দিয়ে বন্ধ করে দিই

মাছি মারার মতন করে

আর তুমি শুনতে পাবে কাতরানির চিৎকার

মামুলি শহরের ওপর দিয়ে,

আর তারপর সেটা চলে যায় ।

একটা কবিতাকে শেষ করার উপায় ইসাবে

এরকমভাবে

হঠাৎই একেবারে

চুপ মেরে যাওয়া

আর চড়ুইপাখিটা

জীবন দিতে হলে তোমাকে জীবন নিতে হবে

আর যেমন-যেমন আমাদের শোক ফালতু হয় আর ফাঁকা

লক্ষকোটি রক্তাক্ত সমুদ্রের ওপরে

আমি ভেতরের দিকে ভেঙে-পড়া মাছের গম্ভীর ঝাঁক পাশ কাটাই

শাদা-পা, শাদা-পেট, পচন্ত প্রাণীদের

দীর্ঘকাল মৃত আর চারিপাশের দৃশ্যের সঙ্গে দাঙ্গার সঙ্গে যুঝে চলেছে ।

প্রিয় খোকা, আমি তোমার সঙ্গে তা-ই করেছি যা চড়ুইপাখি

তোমার সঙ্গে করেছিল ; আমি তো বুড়ো যখন কিনা এটা বাজারচালু

যুবক হয়ে ওঠা ; আমি কাঁদি যখন কিনা হাসা হলো চলন ।

আমি তোমাকে ঘেন্না করতুম যখন কম সাহসেই 

ভালোবাসা যেতো ।

আমার ৪৩তম জন্মদিনের জন্য কবিতা

একাই শেষ হয়ে যাওয়া

একটা ঘরের কবরে

বিনা সিগারেটে

কিংবা মদে–

ঠিক বিজলিবাল্বের মতন

আর ফোলা পেট নিয়ে,

ধূসর চুল,

আর সকালবেলায়

ফাঁকা ঘর পাবার জন্য

বেশ আহ্লাদিত 

ওরা সবাই বাইরে

টাকা রোজগারের ধান্দায় :

জজসাহেবেরা, ছুতোরেরা,

কলের মিস্ত্রিরা, ডাক্তাররা,

খবরের কাগজের লোকেরা, ডাক্তাররা,

নাপিতেরা, মোটরগাড়ি যারা ধোয় তারা, 

দাঁতের ডাক্তাররা, ফুলবিক্রেতারা,

তরুণীবেয়ারারা, রাঁধিয়েরা,

ট্যাক্সিচালকেরা 

আর তুমি পালটি খাও

তোমার বাঁদিকে

রোদের তাপ পাবার জন্য

পিঠের দিকে

আর তোমার 

চাউনির বাইরে ।

অন্ধকারকে যুদ্ধে আহ্বান

চোখে গুলি মারা

মগজে গুলি মারা

পোঁদে গুলি মারা

নাচে ফুলের মতন গুলি মারা

অদ্ভুত কেমন করে মৃত্যু বেমালুম জিতে যায়

অদ্ভুত যে জীবনের মূর্খ আদরাকে কতো গুরুত্ব দেয়া হয়

অদ্ভুত যে হাসাহাসিকে কেমন করে চুবিয়ে দেয়া হয়

অদ্ভুত যে বদমেজাজ কেমন একটা ধ্রুবক

ওদের যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমাকে তাড়াতাড়ি যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে

আমাকে আমার শেষ জমির টুকরো পর্যন্ত দখলে রাখতে হবে

আমাকে আমার ছোট্ট পরিসরটুকু রক্ষা করতে হবে যা আমি গড়েছি যা আমার জীবন

আমার জীবন ওদের মৃত্যু নয়

আমার মৃত্যু ওদের মৃত্যু নয়

এইসব ব্যাপার

এইসব ব্যাপার যা আমরা ভালোভাবে সমর্থন করি

আমাদের সঙ্গে তাদের কিছুই করার নেই,

আর আমরা সেগুলো নিয়ে যা করি

অবসাদ বা ভয় বা টাকার জন্য

কিংবা ফাটলধরা বুদ্ধির জন্য ;

আমাদের ঘেরাটোপ আর আমাদের মোমবাতির আলো

কম হওয়ায়,

এতোই ছোটো যে আমরা তার ভার বইতে পারি না,

আমরা ধারনার জাল ফুলোই

আর কেন্দ্রটাকে হারিয়ে ফেলি :

সবই পলতে ছাড়া মোমের বাতি

আর আমরা দেখি সেই সব নাম যা এককালে

মনে হতো জ্ঞান,

ভুতুড়ে শহরের পথনির্দেশের মতন

আর কেবল কবরগুলোই আসল ।

তাহলে এখন ?

শব্দগুলো এসে ফেরত চলে গেছে,

আমি অসুস্হ হয়ে বসে আছি ।

টেলিফোন বেজে ওঠে, বিড়ালটা ঘুমিয়ে ।

লিণ্ডা ভ্যাকুয়াম চালিয়ে সাফাই করছে ।

আমি বেঁচে থাকার জন্য অপেক্ষা করছি,

মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি ।

ইচ্ছে করে কিছুটা সাহস যোগাড় করি ।

ব্যাপারটা যাচ্ছেতাই

কিন্তু বাইরের গাছটা জানে না :

আমি তাকে বাতাসের তালে দুলতে দেখছি

পড়ন্ত দুপুরের রোদে ।

এখানে ঘোষণা করার মতো কিছুই নেই,

কেবল অপেক্ষা ।

সবাই এটার একা মুখোমুখি হয় ।

ওহ, এককালে আমি যুবক ছিলুম,

ওহ, এককালে আমি অবিশ্বাস্যরকম

যুবক ছিলুম !

ফাঁদে আটক

শীতের সময়ে আমার

ছাদে আমার চোখদুটো রাস্তার আলোর

মাপের ।

ইঁদুরের মতন আমার চারটে পা কিন্তু

নিজের জাঙিয়ে-দাড়িয়াল ধুই আর

ঝুলিয়ে দিই আর লিঙ্গ দাঁড়িয়ে যায় আর কোনো উকিল নেই।

আমার

মুখখানা একটা ধোয়া কাঁথার মতন ।

আমি  গাই

প্রেমের গান আর বইতে থাকি ইস্পাত ।

আমি বরং মরে যাবো কিন্তু কাঁদবো না ।

আমি বরদাস্ত করতে পারি না

হাউণ্ডগুলোকে তাদের ছাড়া টিকে থাকতে পারি না ।

আমি শাদা রেফরিজারেটারে 

আমার মাথা টিকিয়ে রাখি আর চেঁচাতে চাই

জীবনের শেষ কান্নার মতন চিরতরে কিন্তু

আমি পাহাড়ের চেয়েও বিশাল ।

আর চাঁদ আর নক্ষত্রেরা আর জগতসংসার

রাতের অনেকক্ষণের পায়চারি–

আত্মার জন্য তাই ভালো : 

জানালার ভেতর দিয়ে উঁকি মারা

ক্লান্ত বউদের দেখা

তাদের বিয়ারটানা পাগল স্বামীদের সঙ্গে

যোঝবার চেষ্টা করছে ।

ভাগ্য

এককালে

আমরা  কমবয়সী ছিলুম

এই যন্ত্রটায় ।

মদ খেতুম

ফুঁকতুম

টাইপ করতুম

তা ছিল সবচেয়ে

গুলজার

অলৌকিক

সময়

স্হির

হয়ে আছে

কেবল এখন

সময়ের দিকে

এগিয়ে যাবার 

বদলে 

তা 

এগিয়ে এসেছিল

আমাদের পানে

প্রতিটি শব্দ দিয়ে

ছ্যাঁদা করেছে

কাগজে

সুস্পষ্ট

তাড়াতাড়ি

কঠিনভাবে

খাইয়েছে একটা

ফুরিয়ে আসা

পরিসর ।

কারণ ও প্রভাব

যারা শ্রেষ্ঠ তারা সাধারণত নিজের হাতে মারা যায়

স্রেফ কেটে পড়ার জন্য,

আর যারা পেছনে থেকে গেল

কখনও বুঝতে পারে না

কেন কেউ

কখনও চাইবে

কেটে পড়তে

তাদের 

কাছ থেকে

একজন প্রতিভাবানের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল

একজন প্রতিভাবানের সঙ্গে আমার ট্রেনে দেখা হয়েছিল

আজকে

বছর ছয়েক বয়সের,

ছেলেটা আমার পাশে বসল

আর যখন ট্রেনটা

তীরের পাশ দিয়ে গেল

আমরা সমুদ্রের কাছে পৌঁছোলুম

আর তারপর ছেলেটা আমার দিকে তাকালো

আর বলল,

এটা সুন্দর নয় ।

সেই প্রথমবার

ব্যাপারটা আমি

টের পেলুম ।

এটা আমাদের

ওখানে সব সময় একটা পরিসর থাকে

আমাদের কাছে তারা পৌঁছোবার আগে

ওই পরিসর

ওই পরম আরাম

শ্বাস নেবার

ধরুন

কোনো বিছানায় চিৎপটাঙ শুয়ে

কিচ্ছু চিন্তা না করে

কিংবা ধরুন

কল

থেকে এক গ্লাস জল ঢেলে

কোনোকিছু দিয়ে

মোহাবিষ্ট না হয়ে

সেই

নরম বিশুদ্ধ

পরিসর

তা বহু শতকের

অস্তিত্বের

সমমূল্য

ধরুন

কেবল আপনার গলা চুলকোবার জন্য

জানালার বাইরে দেখার সময়ে

একটা ফুলপাতাহীন গাছের ডালকে

ওই পরিসর

ওইখানে

আমাদের কাছে তারা পৌঁছোবার আগে

নিশ্চিত করে

যে 

যখন তারা করবে

তারা পাবে না

কিছুই

কখনও ।

সমাপ্তি

আমরা গোলাপের মতন যা কখনও ফুটে ওঠার পরোয়া করেনি

যখন আমাদের ফুটে ওঠার সময় ছিল আর

তা যেন এমন যে

সূর্য বিরক্ত হয়ে গেছে

অপেক্ষা করে

জেন-এর জন্য

ঘাসের তলায় ২২৫ দিন

আর তুমি আমার থেকে বেশি জানো ।

বহু আগে ওরা তোমার রক্ত নিয়ে গাছে,

তুমি একটা চুবড়িতে শুকনো কাঠি ।

ব্যাপারটা কি এইভাবেই কাজ করে ?

এই ঘরে

ভালোবাসাবাসির সময়

তবুও ছায়াপাত ঘটায় ।

যখন তুমি চলে গেলে

তুমি নিয়ে গেলে

প্রায় সবকিছুই ।

রাতের বেলায় আমি হাঁটুগেড়ে বসি

বাঘগুলোর সামনে

যা আমাকে নিজের মতো থাকতে দেবে না ।

তুমি যা ছিলে

তা আবার হবে না ।

বাঘগুলো আমাকে খুঁজে পেয়েছে

আর আমি পরোয়া করি না ।

যেমন হাজার কবিতা গড়ে উঠতে থাকে তুমি

টের পাও সৃষ্টি করেছ কেবল

যৎসামান্য ।

তা বৃষ্টির সঙ্গে আসে, রোদের সঙ্গে

যানবাহনের সঙ্গে, বছরের 

রাত আর দিনগুলো, মুখগুলো ।

বেঁচে থাকার চেয়ে  ছেড়ে যাওয়া সহজ হবে

একে, আরেকটা লাইন টাইপ করা এখন যেন

একজন মানুষ রেডিও দিয়ে পিয়ানো বাজাচ্ছে,

শ্রেষ্ঠ লেখকরা বলেছেন অত্যন্ত

কম

আর সবচেয়ে খারাপরা,

বড়ো বেশি ।

হিসেব নিকেশ

ভ্যান গঘ নিজের কান কেটে ফেললেন

সেটা দিলেন এক

বেশ্যাকে

যে সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো

নিদারুণ

বিতৃষ্ণায় ।

ভ্যান, বেশ্যারা চায় না

কান

তারা চায়

টাকাকড়ি ।

আমার মনে হয় সেই জন্যই তুমি

অমন এক মহান

চিত্রকর ছিলে : তুমি

বুঝতে পারোনি

তাছাড়া

অন্যকিছু ।

আমার সঙ্গে দোল খাও

আমার সঙ্গে দোল খাও, যা-কিছুই দুঃখি–

পাথরের বাড়িতে উন্মাদের দল

দরোজাহীন,

কামার্ত আর গান গাইছে কুষ্ঠরোগীরা

ব্যাঙরা বোঝার চেষ্টা করছে

আকাশকে ;

আমার সঙ্গে দোল খাও, দুঃখি ব্যাপারেরা–

কামারের হাপরে টুকরো আঙুলগুলো

সকালের খাবারের মতন বুড়ো বয়স

ব্যবহার-করা বই, ব্যবহার-করা মানুষ

ব্যাবহার-করা ফুল, ব্যবহার-করা প্রেম

তোমাদের আমার দরকার

তোমাদের আমার দরকার

তোমাদের আমার দরকার :

তা পালিয়েছে

একটা ঘোড়া বা কুকুরের মতন,

মারা গেছে বা হারিয়ে গেছে

কিংবা ক্ষমাহীন ।

কবিতা

এটা

নেয়

বেশ খানিকটা

মরিয়া-ভাব

অতৃপ্তি

আর

স্বপ্নভঙ্গ

যাতে

কয়েকটা

ভালো 

কবিতা

লেখা যায় ।

এটা তেমন নয়

সকলের

জন্য

হয়তোবা 

তা 

লেখা

কিংবা এমনকি

তা 

পড়ে 

ফেলা ।

ফাঁদে পড়ে

আমার প্রেমকে পোশাকহীন কোরো না

হয়তো তুমি পাবে একটা ম্যানেকুইন :

ম্যানেকুইনের পোশাক খুলো না

হয়তো তুমি খুঁজে পাবে

আমার ভালোবাসা ।

মেয়েটি বহুকাল আগে

আমাকে ভুলে গেছে ।

মেয়েটি নতুন একটা হ্যাট

যাচাই করে দেখছে

আর দেখতে লাগছে আরও বেশি

ছিনাল

আগের থেকেও ।

মেয়েটি একটি

খুকি

আর একটি ম্যানেকুইন

আর মৃত্যু ।

আমি সেটা

ঘৃণা করতে পারি না ।

ও তো

কোনোকিছুই 

অস্বাভাবিক করেনি ।

আমি ওকে চেয়েছিলুম

শুধু ।

৮ গণনা

আমার বিছানা থেকে

আমি দেখি

৩টে পাখি

টেলিফোনের

তারের ওপরে ।

একটা চলে যায়

উড়ে ।

তারপর

আরেকটা ।

বাকি থাকে একটা,

তারপর

সেটাও

চলে যায় ।

আমার টাইপরাইটার

সমাধিপাথর

তবুও ।

আর আমি

পাখিতে অবনমিত

দেখতে থাকি ।

এক্ষুনি ভাবলুম

তোমাকে

জানাবো

বাঞ্চোৎ ।

বৃষ্টি কিংবা রোদ

চিড়িয়াখানায় শকুনগুলো

( তিনটেই )

বেশ চুপচাপ বসে থাকে তাদের

খাঁচাঘেরা গাছে

আর তলায়

মাটিতে

পচা মাংসের টুকরো ।

শকুনগুলোর পেট ভরে গেছে ।

আমরা যে কর দিই তা ওদের খাইয়েছে

পেট পুরে ।

আমরা পরের খাঁচার দিকে

এগোই ।

তার ভেতরে একজন মানুষ

মাটিতে বসে

নিজের গু

খাচ্ছে ।

আমি ওকে চিনতে পারি

আমাদের আগেকার ডাকপিওন ।

ওর প্রিয় অভিব্যক্তি

ছিল :

“দিনটা তোমার ভালো কাটুক ।

“ 

সেদিনটা আমি তাই-ই করলুম ।

বৌদ্ধদের আগুনে আত্মহত্যা সম্পর্কে

“ওরা কেবল নিজেদের পোড়ায় স্বর্গে যাবার জন্য”

–মন ন্যু

মৌলিক সাহস ভালো,

চুলোয় যাক প্রেরণা,

আর যদি তুমি বলো যে ওদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে

যাতনা অনুভব না করার,

ওরা কি

এর গারেন্টি দিয়েছিল ?

এটা কি তবু সম্ভব নয় 

অন্য কিছুর জন্য মারা যাওয়া ?

তোমরা সংস্কৃতিসম্পন্নরা

আরাম করো আর

ব্যাখ্যার বয়ান দাও,

আমি লাল গোলাপকে জ্বলতে দেখেছি

আর তার গুরুত্ব অনেক বেশি ।

দুর্বলরা পৃথিবীর মালিক হবে

যদি আমাকে ভুগতে হয়

এই টাইপরাইটারে

ভেবে দ্যাখো আমি কেমন অনুভব করব

সালিনার লেটুশ

তুলিয়েদের মাঝে ?

আমি সেই মানুষগুলোর কথা ভাবি

যাদের আমি জেছি

ফ্যাক্ট্রিগুলোতে

বাইরে বেরোবার

কোনো উপায় নেই

বেঁচে থাকতে শ্বাসরুদ্ধ

হাসার সময়ে শ্বাসরুদ্ধ

বব হোপ কিংবা লুসিল

বল-এ যখন কিনা

২ বা ৩ বাচ্চা দেয়ালে

টেনিস বল ঠোকে ।

কোনো কোনো আত্মহত্যা কখনও

নথিভূক্ত হয় না ।

সংক্ষিপ্ত আদেশ

মেয়েটি বলল

তোমার বিগত কবিতাপাঠে আমি আমার মেয়েবন্ধুকে নিয়ে গিয়েছিলুম ।

হ্যাঁ, হ্যাঁ ? আমি জিগ্যেস করলুম ।

ওর বয়স কম আর সুন্দরী, মেয়েটি বলল ।

আর ? আমি জানতে চাইলুম ।

তোমার তেজকে ও

ঘৃণা করে ।

তারপর মেয়েটি কাউচে আরাম করে বসল

আর খুলে ফেলল নিজের

বুটজুতো ।

আমার পা দুটো সুন্দর নয়,

বলল মেয়েটি ।

ঠিকই আছে, আমি ভাবলুম, আমারও তেমন ভালো

কবিতা নেই ; ওর তেমন ভালো

পা নেই ।

দুটো হামাগুড়ি ।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

স্যামুয়েল বেকেট-এর কবিতা : অনুবাদ – মলয় রায়চৌধুরী

স্যামুয়েল বেকেট-এর কবিতা । অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

ক্যাসক্যানডো ( স্বরহ্রাস ও লয়ের মন্দিভবন )

কেন নয় নিছক হতাশার

উপলক্ষের

শব্দস্খলন     

বন্ধ্যা হওয়ার চেয়ে নিষ্ফলা করা কি ভালো নয়

তুমি যাবার পর সময় এতো বেশি গুরুভার

ওরা সব সময় তাড়াতাড়ি টানতে আরম্ভ করবে

চাহিদার বিছানাকে চোখ বুজে নোঙোর আঁকড়াবে

পুরোনো প্রেমের হাড়গুলো আনবে তুলে

একসময়ে গর্তগুলো তোমার চোখের মতন ভরা

সব সবসময় কখনও-নয়ের চেয়ে ভালো তাড়াতাড়ি

কালো চাহিদা ওদের মুখে প্রোক্ষণ করছে

আবার বলছে নয় দিন ভাসিয়ে রাখেনি ভালোবাসা

নয় মাসও নয়

নয় জীবনও নয়

আবার বলছে

তুমি আমাকে না পড়ালে আমি শিখবো না

আবার বলছে কোথাও শেষ আছে

এমনকি শেষবারেরগুলো

শেষবারের ভিক্ষা যাচ্ঞার

শেষবারের ভালোবাসার

জানবার না জানবার ভান করার

একটা শেষ এমনকি শেষবারগুলোর বলা

তুমি আমায় ভালো না বাসলে আমি ভালোবাসা পাবো না

আমি তোমাকে ভালো না বাসলে আমি ভালোবাসবো না

হৃদয়ে আবার বাসি শব্দের মন্হন

প্রেম প্রেম প্রেম পুরোনো মজ্জনকারীর ধপ

অপরিবর্তনীয়ের পেষাই

শব্দের ঘোল

আবার উৎকন্ঠিত

না ভালোবাসার

ভালোবাসার আর তুমি নও

ভালোবাসা পাওয়া আর তোমার দ্বারা নয়

জানবার না জানবার ভান করার

ভান করার

আমি আর বাদবাকি সবাই যারা তোমাকে ভালোবাসবে

যদি তোমায় ভালোবাসে

যদি না তোমাকে ভালোবাসে

 সেরেনা – ১

প্রাচীন মহিয়ান ব্রিটিশ মিউজিয়াম ছাড়া

টেলস আর আরেটিনো

রিজেন্ট পার্কের বুকে ফ্লক্সফুলের গোছা

বজ্রপাতের তলায় পটপট করে ওঠে

রক্তিম সুন্দরী আমাদের জগতে মৃত মাছ ভেসে যায়

সবকিছুই দেবতায় ভরা

চেপে রাখা আর রক্ত বেরোচ্ছে

একটা বাবুই পাখি ছোটো কমলালেবু ডাইনি যত্ন নিচ্ছে বিগতের

শকুন তেমনই তার ঘেয়ো ময়ালে

তাকিয়ে থাকে বাঁদর-পাহাড়ের ওই পারে হাতিরা

আয়ারল্যাণ্ড

তাদের পুরোনো বাড়ি গভীর গিরিখাতে আলো লতিয়ে নামে

আমাকে চুষে নেয় একান্তে ওই পুরোনো আস্হাভাজন পর্যন্ত

জর্জ কসরতকর্তা জ্বলন্ত কিন্তু

আহ পথের ওই পারে এক যোগকারী

মেয়েটি তার ইঁদুরকে কেটে খুলে ফ্যালে

তুষারের মতন শাদা

তার ঝকঝকে উনোনে কোষের টানাঠেলা

যুদ্ধ শ্রম

আহ বাবা বাবা স্বর্গের ওই শিল্প

আবিষ্কার করি স্ফটিক প্রাসাদের দখল নিচ্ছে

প্রিমরোজ পাহাড় থেকে আশীর্বাদপূত দ্বীপের জন্য

হায় আমি নিশ্চয়ই সেইরকম লোক

ফলে কেনউডে কে আমাকে খুঁজে পাবে

ঝোপের মাঝে আমার শ্বাস আটক

সবচেয়ে বেশি খুঁড়ে-তোলা প্রেমিকদের থেকে আর কেউ নয়

আমি নিজেকে বিস্মিত করি অনেক এক চিমনির কবজায়

টাওয়ার ব্রিজকে প্রণিপাতের জন্য

শহরে ঢোকা আর বেরোনো সাপের বালিকা-নমস্কার

সন্ধ্যা পর্যন্ত এক হালকা

গর্বে অন্ধ

ব্রিজের দুই দিকের স্কার্ফকে পাশে সরায়

তারপর অ্যামবুলেন্সের ধূসর গ্রাসে

দীর্ঘশ্বাস ঢেউয়ের কিনারায় স্পন্দিত

তারপর আমি নিজেকে জড়িয়ে ধরি পাজিদের মাঝে

যতক্ষণ না একজন হাঘরে নিজের শনাক্ত চোখদুটোর বিস্ফোরণ ঘটায়

দাবি করে আয়নার সঙ্গে আমি কী করেছি

বিবাহিত পুরুষদের বাড়ির তলায় আমি ভীত ক্রোধে কুঁদে দিই

ব্লাডি টাওয়ার

রেনের মস্তো পালোয়ান দূর থেকে পূর্ণ গতিতে আমাকে পেঁদায়

আর গালাগাল দেয় দিনটাকে খাঁচায় হাঁফাচ্ছে পাটাতনে

সমুজ্বল ভস্মাধারের তলায়

আমি ডিফো হয়ে জন্মাইনি

কিন্তু কেনউডে

কে আমাকে খুঁজে পাবে

আমার ভাই মাছি

বাড়ির সাধারণ মাছি

অন্ধকার থেকে আলোয় হামাগুড়ি দিয়ে আসছে

সূর্যে নিজের জায়গা বেঁধে ফ্যালে

ছয়টা পা রগড়ায়

নিজের পাটাতনে ভারসাম্যে মজা করে

এটা ওর জীবনের হেমন্ত

ও টাইফয়েড আর ধনদৌলত বিলি করতে পারেনি



Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

কার্ট ভনেগাট-এর গল্প : ‘হ্যারিসন বেরগেরন’ : অনুবাদ – মলয় রায়চৌধুরী

হ্যারিসন বেরগেরন : কার্ট ভনেগট

অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী 

বছরটা ছিল ২০৮১, আর শেষপর্যন্ত সবাই একে আরেকের সমান হয়ে গেল । তারা কেবল ঈশ্বর আর আইনের সামনে সমান ছিল না । তারা সবরকম ভাবেই সমান ছিল । কেউই আরেকজনের থেকে বুদ্ধিমান ছিল না । কেউই আরেকজনের থেকে দেখতে ভালো ছিল না । কেউই আরেকজনের থেকে শক্তিশালী বা চটপটে ছিল না । এই সমতা সম্ভব হয়েছিল সংবিধানের ২১১তম, ২১২তম এবং ২১৩তম সংশোধনের কারণে আর ইউনাইটেড স্টেটস হ্যাণ্ডিক্যাপার জেনারালের খোচরদের অবিরাম নজর রাখার দরুন ।

কিন্তু জীবনযাপনের ব্যাপারে কিছু জিনিস ঠিক ছিল না, যদিও । যেমন ধরা যাক এপ্রিল মাস, বসন্তঋতু না হওয়া সত্বেও কিছু লোককে পাগলাটে করে তুলতো । আর এই চটচটে মাসেই হ্যাণ্ডিক্যাপার জেনেরালের লোকেরা জর্জ আর হ্যাজেল বেরগেরনের চোদ্দ বছরের ছেলে হ্যারিসনকে তুলে নিয়ে গেল ।

ঘটনাটা ট্র্যাজিক ছিল, ঠিকই, কিন্তু জর্জ আর হ্যাজেল এই বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে পারল না । হ্যাজেলের ছিল নিখুঁত মামুলি বুদ্ধিবৃত্তি, যার অর্থ হল যে সে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ফেটে পড়া ছাড়া কোনোকিছু সম্পর্কে চিন্তা করতে পারতো না । আর জর্জ, যদিও তার  বুদ্ধিবৃত্তি স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশি ছিল, তার কানেতে লাগানো থাকতো মানসিক খাঁকতির রেডিও । আইন অনুযায়ি সেটা তাকে সব সময় পরে থাকতে হতো । সেটি সরকারি ট্র্যান্সমিটারের সঙ্গে সমন্বিত ছিল । প্রতি কুড়ি সেকেন্ড বা তেমনটাই, ট্র্যান্সমিটার থেকে তীক্ষ্ণ আওয়াজ ছাড়া হতো যাতে জর্জের মতন লোকেরা নিজেদের মস্তিষ্কের অসাধু সুযোগ না নিতে পারে ।

জর্জ আর হ্যাজেল টেলিভিজন দেখছিল । হ্যাজেলের গালে গড়িয়ে পড়েছিল চোখের জল, কিন্তু ও সেই মুহূর্তের জন্য ভুলে গিয়েছিল কেন কাঁদছে ।

টেলিভিশনের পর্দায় ছিল ব্যালেরিনারা ।

জর্জের মগজে একটা সিটি বেজে উঠল । ওর চিন্তাগুলো ভয়ে পালালো, অনেকটা ডাকাতরা যেমন চোরছ্যাঁচোড়ের অ্যালার্ম শুনে পালায় ।

“নাচটা সত্যিই দারুন সুন্দর ছিল, যে নাচটা ওরা এখন নাচলো,” বলল হ্যাজেল ।

“ওহ” বলে উঠল জর্জ ।

“নাচটা খুবই ভালো ছিল,” বলল হ্যাজেল ।

“হ্যাঁ,” বলল জর্জ । ও ব্যালেরিনাগুলোর সম্পর্কে একটু ভাবার চেষ্টা করল । ওরা বিশেষ ভালো ছিল না — অন্য কারোর থেকে ভালো ছিল না, যাই হোক । ওদের ওপরে চাপানো ছিল পাখি মারার ছররার ভারি পোশাক, আর মুখে ছিল মুখোশ, যাতে কেউই, স্বাধীন আর গরিমাময় অঙ্গভঙ্গী দেখে কিংবা সুন্দর মুখ দেখে, মনে না করে যে ব্যাপারটা এমনকিছু যা বিড়ালে টেনে এনেছে । জর্জ মাথায় অস্পষ্ট একটা চিন্তা খেলাচ্ছিল যে সম্ভবত যারা নাচছিল তারা হয়তো অযোগ্য নয় । কিন্তু ভাবনাটা সামান্য এগিয়ে নিয়ে যাবার আগেই ওর কানের রেডিওতে আরেকটা আওয়াজ চিন্তাধারাকে ছত্রখান করে দিলো ।

জর্জ ভেঙচি কাটলো । আটজন ব্যালেরিনার মধ্যে দুজন তাইই করল ।

হ্যাজেল ওকে ভেঙচি কাটতে দেখলো । ওর নিজের কোনো মানসিক অযোগ্যতা না থাকায়, ও জর্জকে জিগ্যেস করল যে সাম্প্রতিক আওয়াজটা কেমন ছিল ।

“মনে হল যেন কেউ দুধের বোতলকে পরেক তোলার হাতুড়ি দিয়ে ঠুকছে,” জর্জ বলল।

“আমার মনে হয় ব্যাপারটা সত্যিই মজাদার, নানা রকমের আওয়াজ শুনতে পাওয়া,” কিছুটা ঈর্ষায় বলল হ্যাজেল । “সব রকমের ভাবনা ওরা ভেবে ফ্যালে।”

“হুঁ”, জর্জ বলল ।

“শুধু, আমি যদি হ্যাণ্ডিক্যাপার জেনারাল হতুম, জানো আমি কী করতুম ?” বলল হ্যাজেল ।

ঘটনাচক্রে, হ্যাজেলের সঙ্গে হ্যাণ্ডিক্যাপার জেনারাল, ডায়ানা মুন গ্ল্যাম্পার্স নামের এক মহিলার, অনেকটা মিল আছে । “আমি হতুম ডায়ানা মুন গ্ল্যাম্পার্স,” বলল হ্যাজেল, “রবিবারদিন আমি রাখতুম রুনুঝুনু বাজনা, কেবল রুনুঝুনু । ধর্মকে একরকম  সম্মান জানানো ।”

“শুধু রুনুঝুনু হলে, আমি চিন্তা করতে পারতুম,” বলল জর্জ ।

“হ্যাঁ, হয়তো বাস্তবিক জোরে করে দিতুম,” বলল হ্যাজেল । আমার মনে হয় আমি একজন ভালো হ্যাণ্ডিক্যাপার জেনারাল হতে পারতুম ।”

“অন্য যেকোনো লোকের মতন ভালো,” বলল জর্জ ।

“স্বাভাবিক বলতে কী বোঝায় তা আমার চেয়ে ভালো কে-ই বা জানে ?” বলল হ্যাজেল ।

“ঠিক,” বলল জর্জ । ও ওর অস্বাভাবিক ছেলে হ্যারিসন-এর কথা ক্ষীণভাবে ভাবতে লাগল, সে এখন কারাগারে, কিন্তু ওর মগজে একুশ তোপের সেলাম তা থামিয়ে দিল ।

“জব্বর !” বলল হ্যাজেল, “ওটা তো অসাধারণ ছিল, নয়কি ?”

ব্যাপারটা এমনই অসাধারণ ছিল যে জর্জ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়ে কাঁপতে আরম্ভ করল, আর ওর রক্তবর্ণ চোখের কিনারায় অশ্রুবিন্দু থেমে রইলো । কপাল টিপে ধরে আটজন ব্যালেরিনার মধ্যে দুজন মঞ্চের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছিল ।

“আচমকা তোমাকে বড়ো ক্লান্ত দেখাচ্ছে,” বলল হ্যাজেল । “সোফার ওপরে গড়িয়ে নিচ্ছ না কেন, যাতে তোমার হ্যাণ্ডিক্যাপ থলেকে বালিশের ওপরে বিশ্রাম দিতে পারো,  ডার্লিঙ ।”

হ্যাজেল সাতচল্লিশ পাউণ্ড ওজনের পাখি মারার ছররা ভরা ক্যানভাস ব্যাগের প্রসঙ্গে কথাটা বলেছিল, যেটা জর্জের গলায় তালা দিয়ে বাঁধা  । “যাও, গিয়ে ব্যাগটাকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম দাও”, ও বলল । “কিছুক্ষণের জন্যে তুমি আমার সমান না হলেও আমি পরোয়া করব না ।”

জর্জ ব্যাগটা দু’হাত দিয়ে তুললো । “আমি কিছু মনে করি না”, ও বলল । “আমি আর এটা টের পাই না । এটা আমার অংশ হয়ে গেছে ।”

“আজকাল তুমি এতো ক্লান্ত হয়ে যাও, মনে হয় ক্ষয়ে গেছো,” বলল হ্যাজেল । “ব্যাগটায় তলার দিকে যদি ফুটো করার কোনো উপায় থাকতো, আর সিসার কিছু ছররা বের করে নেয়া যেতো । মাত্র কয়েকটা ।”

“বের করে নিলে দু বছরের কারাদণ্ড আর দুহাজার ডলার জরিমানা প্রতিটি ছররার জন্য, যদি বের করে নিই,” বলল জর্জ । “আমি সেটা লাভজনক সওদা বলে মনে করি না ।”

“তুমি কাজ থেকে ফিরে যদি কয়েকটা বের করে নিতে,” বলল হ্যাজেল । “ আমি বলতে চাইছি যে এখানে তো তুমি কারোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দিতা করছ না । তুমি শুধু সামলে দিচ্ছ।”

“আমি এটা থেকে মুক্ত হবার চেষ্টা করেছি,” বলল জর্জ, “তারপর অন্য লোকেরাও এটাকে বিসর্জন দেবে — আর বেশ তাড়াতাড়ি আমরা আবার অন্ধকার যুগে ফিরে যাবো, যেখানে সকলে সকলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দিতা করবে । তুমি তা চাও না নিশ্চয়ই, চাও কি ?”

“আমার ঘেন্না করে,” বলল হ্যাজেল ।

“তাহলেই ভেবে দ্যাখো,” বলল জর্জ । “যে মুহূর্তে লোকেরা আইনকে ফাঁকি দেবে, সমাজে কী ঘটবে তা ভেবে দেখেছো ?”

হ্যাজেল এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে যদিও পারেনি, জর্জও কোনো সদুত্তর ভেবে উঠতে পারলো না । ওর মগজে  একটা সাইরেন বাজা আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল ।

“মনে হয় এটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে,” বলল হ্যাজেল ।

“কোন জিনিস ?” ফাঁকা চাউনি মেলে বলল জর্জ ।

“সমাজ”, অনিশ্চিতভাবে বলল হ্যাজেল । “সে-কথাই তো তুমি বলছিলে এক্ষুনি ?”

“কে জানে ?” বলল জর্জ ।

টেলিভিশন অনুষ্ঠান হঠাৎ থামানো হলো একটা সংবাদ ঘোষণার জন্য । প্রথমে বোঝা যাচ্ছিল না সংবাদটা কিসের ব্যাপারে, কেননা ঘোষকের, অন্য সব ঘোষকের মতনই, কথা বলায় ভয়ঙ্কর জড়তা ছিল । আধ মিনিটের মতন সময়ে, আর বেশ উত্তেজিত হয়ে, ঘোষক বলার চেষ্টা করল, “লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন।”

শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে, একজন ব্যালেরিনাকে ঘোষণা পড়ার ভার দিল ।

“ব্যাপারটা ঠিক আছে–” ঘোষক সম্পর্কে হ্যাজেল বলল, “ও চেষ্টা করেছিল । সেটাই অনেক বড়ো ব্যাপার। ঈশ্বর ওকে যা দিয়েছেন তা যতো ভালোভাবে সম্ভব তার চেষ্টা তো ও করেছে । অমন কঠিন প্রয়াসের জন্য ওর মাইনে বাড়া উচিত ।”

“লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন,” বলল ব্যালেরিনা, ঘোষণা পড়তে-পড়তে । মেয়েটি নিশ্চয়ই অসাধারণ সুন্দরী, কেননা যে মুখোশটা ও পরেছিল সেটা ছিল বীভৎস । আর দেখে সহজেই বোঝা যাচ্ছিল নাচিয়েদের মধ্যে ও-ই সবচেয়ে শক্তিময়ী আর গরিমাময়ী, কেননা ওর হ্যাণ্ডিক্যাপ ব্যাগ দুশো পাউণ্ড ওজনের মানুষেরা যেমন পরে তেমনই বড়ো ছিল । আর নিজের কন্ঠস্বরের জন্য ওকে তক্ষুনি ক্ষমা চাইতে হল, যা মহিলাদের কথা বলার পক্ষে  বেশ অপ্রিয় । মেয়েটির কন্ঠস্বর ছিল আকর্ষক, আলোকময়, সময়াতীত সুরে আচ্ছন্ন । “ক্ষমা করবেন–” বলল মেয়েটি, আর তারপর আবার আরম্ভ করল, কন্ঠস্বরকে একেবারে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলে ।

“হ্যারিসন বেরগেরন, চোদ্দ বছর বয়স,” মেয়েটি কর্কশ ভাঙা গলায় বলল, “জেল থেকে পালিয়েছে, যেখানে সে সরকারকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্রের কারণে কারারুদ্ধ ছিল । ছেলেটি একজন প্রতিভাধর এবং ক্রীড়াবিদ, ও কম প্রতিবন্ধী, আর তাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক গণ্য করা হয় ।”

হ্যারিসন বেরগেরনের একটা পুলিশ দপ্তরের ফোটো পর্দায় উল্টো করে ভেসে উঠল, তারপর পাশফেরা, আবার মাথা নীচে, তারপর ডানদিক ওপরে । ছবিটায় সম্পূর্ণ হ্যারিসনকে দেখানো হচ্ছিল, পৃষ্ঠভূমিতে ফিট এবং ইঞ্চের দাগ দিয়ে । ওর উচ্চতা ছিল একেবারে সাত ফিট ।

হ্যারিসনের বাকি চেহারা ছিল হ্যালোউইন-পরবের মতন আর যন্ত্রপাতিতে গড়া । আর কেউ এরকম ভারি হ্যাণ্ডিক্যাপ নিয়ে জন্মায়নি । হ্যাণ্ডিক্যাপার জেনেরালের লোকেরা ভেবে দেখার আগেই হ্যারিসন যাবতীয় বাধাবিপত্তিকে ডিঙিয়ে বড়ো হয়ে গেছে । মগজের হ্যাণ্ডিক্যাপের জন্য কানে রেডিওর বদলে ওর কানে পরানো ছিল ভয়ানক ভারি ইয়ারফোন আর চোখে পুরু ঢেউ-খেলানো লেন্সের চশমা । ওকে অর্ধেক অন্ধ করার জন্যেই কেবল চশমাটা পরানো হয়নি, তার সঙ্গে থাপ্পুড়ে মাথাব্যথা দেবার জন্যও পরানো হয়েছে।

ওর সারা গা থেকে লোহালক্কড় ঝুলছিল । এমনিতে, তাতে এক ধরণের ভারসাম্য ছিল, এক মিলিটারি স্পষ্টতা বলবান লোকেদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, কিন্তু হ্যারিসনকে দেখে মনে হচ্ছিল ও যেন বাতিল লোহালক্কড়ের চলন্ত লোক । জীবনের দৌড়ে, হ্যারিসনকে তিনশো পাউণ্ড বইতে হচ্ছিল । 

আর ওর সৌম্যকান্তিকে প্রতিরোধ করার জন্য হ্যাণ্ডিক্যাপার জেনেরালের লোকেরা ওর নাকে সদাসর্বদা পরে থাকার জন্য লাল রবারের বল আটকে দিয়েছিল, ওর ভুরু কামিয়ে দিয়েছিল, আর ওর সুন্দর দাঁতের সারিকে ঢেকে দিয়েছিল উবড়ো-খাবড়া দাঁতের কালো টুপি দিয়ে ।

“তোমরা যদি এই ছেলেটাকে দেখতে পাও,” বলল ব্যালেরিনাটি, “ওর সঙ্গে যুক্তিতর্ক করার চেষ্টা করবে না, আমি আবার বলছি, করবে না ।”

কবজা থেকে দরোজা আলাদা করার চিৎকার শোনা গেল ।

টেলিভিশন সেট থেকে আসতে লাগলো আতঙ্কের চেঁচামেচি আর ঘেউঘেউ কান্না । হ্যরিসন বেরগেরনের ছবিটা পর্দায় বারবার লাফাতে আরম্ভ করল, যেন ভূমিকম্পের সুরে সুরে নাচছে ।

জর্জ বেরগেরন  সঠিক আঁচ করতে পারল যে ভূমিকম্প হচ্ছে, আর সম্ভবত আঁচ করে থাকতেও পারে, কেননা বহুবার এই পিষে ফেলা সুরে ওর নিজের বাড়িটাও আগে নেচেছে । “হায় ঈশ্বর” — বলল জর্জ, “নিশ্চয়ই হ্যারিসন করছে !”

এই বোধ ওর মন থেকে ফাটিয়ে বের করে দেয়া হল ওর মাথার ভেতরে দুটো মোটরগাড়ির সংঘর্ষের আওয়াজে।

জর্জ যখন আবার নিজের চোখ খুলতে পারল, হ্যারিসনের ফোটোটা চলে গিয়েছিল । জীবন্ত, নিঃশ্বাস-ফেলা হ্যারিসন দেখা গেল পরদা জুড়ে ।

ঠুঙঠাঙ আওয়াজ তুলে, ভাঁড়ের মতন, আর বিশাল, হ্যারিসন দাঁড়িয়ে রয়েছে — স্টুডিওর একেবারে মাঝখানে। স্টুডিওর দরোজার ওপড়ানো হাতল তখনও ওর হাতে ছিল । ব্যালেরিনারা, যন্ত্রবিদরা, সঙ্গীতকাররা, আর ঘোষকরা ওর সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ে হাঁটু কাঁপাতে লাগল, মরে যাবার আশঙ্কায় ।

“আমিই সম্রাট !” ঘোষণা করল হ্যারিসন । তোমরা শুনতে পাচ্ছ ? আমিই সম্রাট ! আমি যা করতে বলব সবাইকে তা তক্ষুনি করতে হবে !” ও পা ঠুকলো আর স্টুডিও কেঁপে উঠল ।

“এখানে আমি এরকমভাবে দাঁড়িয়ে থেকেও, ও গমগম করে বলল, “বিকলাঙ্গ-করা, জবুথবু করে-তোলা, অসুখেফেলা — আমি এর আগের  যেকোনো লোকের চেয়ে বড়ো শাসক ! এবার দ্যাখো আমি কি হতে পারি যা আমি হতে পারি !”

হ্যারিসন ভিজে টিশ্যুপেপারের মতন ও হ্যাণ্ডিক্যাপ বাঁধনের আঙটাগুলো ছিঁড়ে ফেলল, পাঁচ হাজার পাউণ্ড বইতে পারার গারেন্টি-দেয়া ধাতব বাঁধন ছিঁড়ে ফেলল ।

হ্যারিসনের লোহালক্কড়ের হ্যাণ্ডিক্যাপগুলো মেঝেতে ভেঙে পড়ল ।

ওর মাথায় যে বর্ম পরানো ছিল তাকে সুরক্ষিত রাখার তালায় বুড়ো আঙুলের চাপ দিল হ্যারিসন । তা শাকপাতার মতন ছিঁড়ে গেল । হ্যারিসন দেয়ালে ছুঁড়ে মারল ওর হেডফোন আর চশমা ।

রবার-বলের নাক ফেলে দিল দূরে, আর এমন সৌম্যকান্তি চেহারা দেখা দিল যা বজ্রবিদ্যুতের দেবতা থরকেও বিস্মিত করত ।

“এবার আমি আমার সম্রাজ্ঞী বাছাই করব !” ও বলল, ভিতু লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে । “প্রথম নারী যে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াবার সাহস দেখাবে সে তার সঙ্গী আর সিংহাসনের দাবি করতে পারবে !”

কিছুটা সময় কাটল, আর তারপর একজন ব্যালেরিনা উঠে দাঁড়াল, উইলো গাছের মতন দোল খেয়ে ।

মেয়েটির কান থেকে মানসিক হ্যাণ্ডিক্যাপ খুলে নিল হ্যারিসন, তার দেহের হ্যাণ্ডিক্যাপগুলো মোলায়েম হাতে ছিঁড়ে ফেলল  । সব শেষে মেয়েটার মুখোশ খুলে দিলো ।

মেয়েটি ছিল চোখধাঁধানো সুন্দরী ।

“এবার”, মেয়েটির হাত ধরে হ্যারিসন বলল, আমরা কি জনগণকে দেখাবো নাচ বলতে কী বোঝায় ? সঙ্গীত !” ও হুকুম করল ।

সঙ্গীতকাররা ছুটে নিজেদের চেয়ারে ফিরে গেল, আর হ্যারিসন ওদের হ্যাণ্ডিক্যাপও খুলে নিলো । “তোমাদের সমবচেয়ে ভালো সুরটা বাজাও”, ও বলল ওদের, “আর আমি তোমাদের ব্যারন আর ডিউক আর আর্ল করে দেবো।”

সঙ্গীত আরম্ভ হল । প্রথমে স্বাভাবিক ছিল — সস্তাছাপ, বোকাটে, কৃত্রিম । কিন্তু দুজন বাজনদারকে হ্যারিসন তাদের চেয়ার থেকে তুলে নিলো, আর নিজে যে সঙ্গীতটা চাইছিল তা গাইতে গাইতে সঙ্গীতকারের ব্যাটনের মতন তাদের দুজনকে নাড়াতে লাগল । ঠেশে বসিয়ে দিল দুজনকে যে যার চেয়ারে ।

সঙ্গীত আবার আরম্ভ হল আর তা আগের তুলনায় উন্নত ছিল ।

হ্যারিসন আর ওর সম্রাজ্ঞী কিছুক্ষণের জন্য সঙ্গীত শুনল — গম্ভীর মুখে, যেন নিজেদের সঙ্গীতের সঙ্গে হৃৎস্পন্দন মিলিয়ে নিচ্ছে ।

ওরা দুজনে নিজেদের ওজন নামিয়ে নিয়ে গেল পায়ের আঙুলে ।

মেয়েটির পাতলা কোমরা হ্যারিসন নিজের বড়ো-বড়ো হাত রাখল, যাতে মেয়েটি ভারহীনতা বুঝতে পারে যা তাড়াতাড়ি তারই হতে চলেছে ।

আর তারপর, আনন্দ ও গরিমার বিস্ফোরণসহ, তারা বাতাসে উঠে পড়ল !

দেশের আইনই কেবল বাতিল করা হল না, অভিকর্ষের আইন আর গতির আইনকেও বাতিল করা হল ।

ওরা দুজনে ঘুরলো, পাক খেলো, দোল খেলো, অঙ্গবিক্ষেপ করতে লাগলো, হেলতে-দুলতে লাগলো আর ঘুরতে লাগলো ।

ওরা চাঁদের ওপরে হরিণের মতন লাফাতে লাগলো ।

স্টুডিওর ছাদ ছিল তিরিশ ফিট উঁচু, কিন্তু প্রতিবারের নাচ তাদের ছাদের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছিল ।

বোঝাই যাচ্ছিল যে ওরা ছাদে চুমু খেতে চাইছে । ওরা তা খেলো ।

আর তারপরেই, প্রেম আর বিশুদ্ধ ইচ্ছাশক্তির জোরে অভিকর্ষকে বাতিল করে দিয়ে, ওরা ছাদের কয়েক ইঞ্চ তলায় ঝুলে রইলো, আর দীর্ঘ দীর্ঘ সময়ের জন্য নিজেদের চুমু খেলো ।

ঠিক সেই সময়েই ডায়ানা মুন গ্ল্যাম্পার্স, হ্যাণ্ডিক্যাপার জেনেরাল, স্টুডিওতে ঢুকলেন হাতে দু-নলা দশ গজের শটগান নিয়ে । উনি দুটো গুলি চালালেন, আর মেঝেতে পড়ার আগেই সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী মারা গিয়েছিলেন ।

ডায়ানা মুন গ্ল্যাম্পার্স আরেকবার বন্দুকে গুলি ভরলেন । তাক করলেন সঙ্গীতকারদের দিকে আর হুকুম দিলেন নিজেদের হ্যাণ্ডিক্যাপগুলো দশ সেকেন্ডের মধ্যে পরে নিতে ।

তখনই বেরগেরনদের টেলিভিশন সেট পুড়ে নিভে গেল ।

হ্যাজেল জর্জের দিকে ফিরে নিভে যাওয়া সম্পর্কে মন্তব্য করতে যাচ্ছিল । কিন্তু জর্জ তখন রান্নাঘরে গিয়েছিল বিয়ারের টিন আনতে ।

জর্জ ফিরল বিয়ারের টিন নিয়ে, অপেক্ষা করল কিছুক্ষণ আর তখনই হ্যাণ্ডিক্যাপ সংকেত নাড়িয়ে দিল ওকে। তারপর ও বসল । “তুমি কাঁদছিলে”, ও বলল হ্যাজেলকে ।

“হ্যাঁ,” উত্তর দিল হ্যাজেল ।

“কেন ?” জানতে চাইলো জর্জ ।

“আমি ভুলে গেছি,” বলল হ্যাজেল । “টিভিতে সত্যিই  খারাপকিছু দেখাচ্ছিল ।”

“কী দেখাচ্ছিল ?” বলল জর্জ ।

“সবই আমার মনে মিলেমিশে গোলমেলে হয়ে গেছে,” বলল হ্যাজেল ।

“দুঃখের কথা ভুলে যাও,” বলল জর্জ ।

“সব সময় তো তাইই করি আমি,” হ্যাজেল বলল ।

“এইই তো আমার প্রিয় বউ”, বলল জর্জ । ও চোখ মারল । ওর মাথার ভেতরে বন্দুকের চিত্তাকর্ষক আওয়াজ হল।

“বেশ মজার — আমি বলতে পারি ব্যাপারটা ছিল দারুন,” বলল হ্যাজেল ।

“তুমি কথাটা আবার বলতে পারো,” বলল জর্জ ।

“বেশ মজার — আমি বলতে পারি ব্যাপারটা ছিল দারুন ।”

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা’র পরাবাস্তব কবিতা : অনুবাদ- মলয় রায়চৌধুরী

ফেদেরিকো গারসিয়া লরকা-র পরাবাস্তববাদী কবিতা ( ১৮৯৮ – ১৯৩৬ ) 

অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

চাঁদ চাঁদের গাথাসঙ্গীত

কনচিতা গারসিয়া লরকার জন্য

চাঁদ কামারের কাছে এলো

সুগন্ধনির্যাসে তৈরি পেটিকোট পরে

যুবক দ্যাখে আর দেখতেই থাকে

যুবক চাঁদের দিকে তাকায়

অশান্ত বাতাসে

চাঁদ নিজের বাহু তুলে ধরে

দেখায় – বিশুদ্ধ আর যৌন —

ওর টিন-পাতের বুক

দৌড়োও চাঁদ দৌড়োও চাঁদের চাঁদ

যদি জিপসিরা আসে

শাদা আঙটি আর শাদা গলার হার

তারা তোমার হৃদয় থেকে স্পন্দিত হবে

যুবক তুমি কি আমায় নাচতে দেবে —

যখন জিপসিরা আসবে

ওরা তোমায় নেহাইয়ের ওপরে পাবে

তোমার ছোট্টো চোখ বন্ধ করে

দৌড়োও চাঁদ দৌড়োও চাঁদের চাঁদ

আমি ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ শুনতে পাচ্ছি

আমাকে রেহাই দাও যুবক । কথা বোলো না

আমার শাদা মাড়ের গলিতে

ঘোড়সওয়াররা বাজাতে বাজাতে এলো

সমতলের ঢোলক

কামারশালায় যুবক

নিজের ছোটো চোখ বন্ধ করে নিয়েছে

অলিভগাছের বন দিয়ে

কাঁসায় আর স্বপ্নে

জিপসিরা এসে পড়ল

ওদের মাথা উঁচু করে

ওদের চোখ নামিয়ে

রাতের সারস কেমন গান গায়

কেমন গাছে বসে গান গায়

চাঁদ আকাশ পেরিয়ে চলে যায়

যুবকের হাত ধরে

কামারশালায় জিপসিরা

কাঁদে আর তারপর চেঁচায়

বাতাস লক্ষ রাখে লক্ষ রাখে 

বাতাস চাঁদের দিকে লক্ষ রাখে

—————————————————————————————————-

অবিশ্বস্ত গৃহিণী

মেরি পিসের জন্য

তারপর আমি ওকে নদীতে নিয়ে গেলুম

নিশ্চিত যে ও অক্ষতযোনি

যদিও ওর একজন স্বামী ছিল ।

জুলাইয়ের চতুর্থ শুক্রবারে,

কথা দেবার মতন নির্দিষ্ট।

রাস্তার আলোগুলো উবে যাচ্ছিল

আর জোনাকিরা জ্বলে উঠছিল ।

শহরের শেষ বাঁকে

আমি ওর ঘুমন্ত বুক আদর করলুম।

তারা হঠাৎ কুসুমিত হয়ে উঠল

হায়াসিন্থের ডগার মতন

আর ওর পেটিকোটের মাড়

আমার কানে রেশমের মতন হইচই তুললো

ডজনখানেক ব্লেডে চেরা ।

পাইনগাছগুলো, তাদের জ্যোতি 

রুপোর, বাদ দিয়ে, বিশাল হয়ে উঠলো

আর কুকুরের দিগন্ত

নদী থেকে বহুদূর কান্না শোনাতে লাগলো ।

জামগাছের পাশ দিয়ে,

নলখাগড়া আর কাঁটাঝোপ,

যুবতীর এলোচুলের তলায়

আমি বালিতে ডুব দিলুম ।

আমি খুলে ফেললুম আমার গলার রুমাল।

যুবতী ওর পোশাকের বাঁধন খুলে ফেলল।

আমি আমার পিস্তল আর তার খাপ,

ও নিজের কাপড়কানির পরত…

রজনীগন্ধা নয়, খোল নয়,

মসৃণতার অর্ধেকের মতন ত্বক

আয়নার কাচের মতনও নয়

চকমকানির অর্ধেক আছে।

ওর নিতম্ব আমার জন্যে পাখনা নাড়ালো

এক জোড়া সচকিত পোনামাছের মতন:

একটা পুরো আগুনময়

আরেকটা ঠাণ্ডায় ভরপুর ।

সেই রাতে আমি হয়তো

বরং চাপতুম

পথগুলোর মধ্যে বেছে নিয়ে

মুক্তো রঙের ঘোটকীর পিঠে

লাগাম আর রেকাব ছাড়াই।

যেহেতু আমি একজন ভদ্রলোক,

আমি সেসব টুকরোকথা বলব না

যা যুবতী ফিসফিস করে বলেছিল।

সেখানেই ভোর হয়ে এলো

আমার ঠোঁটে কামড়ের দাগ নিয়ে।

চুমু আর কাদায় নোংরা

আমি ওকে নদী থেকে নিয়ে গেলুম

আর লিলিফুলের ফলক

বাতাসের সঙ্গে লড়ছিল ।

আমি তেমন আচরণই করেছিলুম

আমার মতন বজ্জাত যেমন করবে।

আমি ওকে বড়ো খালুই দিতে চাইলুম

খড়ের রঙের সাটিনের তৈরি ।

আমার ইচ্ছে ছিল না ওর প্রেমে পড়ার।

ওর তো একজন স্বামী আছে,

যদিও ও তখনও অক্ষতযোনি

যখন ওকে নদীতে নিয়ে গেলুম ।

—————————————————————————————————-

সন্ধ্যার দুটি চাঁদ

আমার বোনের বন্ধু, লরিতার জন্য

চাঁদ মৃত মৃত

—বসন্তকালে তা জীবনে ফিরবে

যখন দখিনা এক বাতাস

পপলারের ভ্রুকে এলোমেলো করে দেবে

যখন আমাদের হৃদয় দীর্ঘশ্বাসের শষ্য ফলায়

ছাদগুলো যখন ঘাসের টুপি পরে থাকে

চাঁদ মৃত মৃত

—বসন্তকালে তা জীবনে ফিরবে

আমার বোন, ইসাবেলার জন্য

সন্ধ্যা ঘুমপাড়ানি গান গায়

কমলালেবুর জন্য

আমার ছোট্ট বোন গায়

“পৃথিবী একটা কমলালেবু”

চাঁদ ফুঁপিয়ে বলে

“আমি কমলালেবু হতে চাই”

হতে পারবে না তুমি — আমার আদুরি —

তুমি গোলাপি হয়ে গেলেও

কিংবা সামান্য পাতিলেবু

কতো দুঃখের !

তোমার একটা চুমু পাবার জন্য    

তোমার একটা চুমু পাবার জন্য

আমি কিই বা দেবো

একটা চুমু যা তোমার ঠোঁট থেকে বিপথে গিয়েছিল

ভালোবাসার প্রতি মৃত

আমার ঠোঁট স্বাদ পায়

ছায়াদের কাদা

তোমার কালো চোখের দিকে তাকাবার জন্য

আমি কিই বা দেবো

রামধনু তামড়ির ভোর

ঈশ্বরের সামনে নিজেকে মেলে ধরছে—

নক্ষত্রগুলো তাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছে

মে মাসের এক সকালে

আর তোমার পবিত্র উরুতে চুমু খাবার জন্য

আমি কিই বা দেবো

আকরিক গোলাপী স্ফটিক

সূর্যের পলল

—————————————————————————————————-

ছোটো নগরচত্বরের গাথাসঙ্গীত

খোকাখুকুর গান

রাতের নৈঃশব্দে :

স্রোতোস্বিনীর আলো, আর

ঝর্ণার শান্তি !

খোকাখুকুরা তোমাদের হৃদয়ে কিসে পূর্ণ

দৈব আনন্দে  ?

আমি ঘণ্টাঘরের এক নিনাদ,

অস্পষ্টতায় হারিয়ে গেছি।

খোকাখুকুরা গান গেয়ে আমাদের ছেড়ে যাও

এই ছোটো নগরচত্বরে ।

স্রতোস্বিনীর আলো, আর

ঝর্ণার শান্তি !

কী ধরে আছো তুমি

তোমার বসন্তকালের হাতে ?

আমি রক্তের এক গোলাপ, আর

শাদার লিলিফুল ।

খোকাখুকুরা জলে ডুব দেয়

প্রাচীনকালের গানের ।

স্রোতিস্বিনীর আলো, আর

ঝর্ণার শান্তি !

তোমাদের জিভ কি অনুভব করে,

লাল আর তৃষ্ণার্ত ?

আমি হাড়ের এক স্বাদ

আমার চওড়া কপালের ।

খোকাখুকুরা স্হির জল পান করে

প্রাচীনকালের গানের ।

স্রোতোস্বিনীর আলো, আর

ঝর্ণার শান্তি !

কেন তোমরা অনেক দূরে চলে যাও

এই ছোটো নগরচত্বর থেকে ?

আমি খুঁজতে যাই পূর্বজগদ্বাসী জ্ঞানীদের

আর রাজকুমারীদের ।

খোকাখুকুরা যারা তোমাকে সেখানের পথ দেখিয়েছিল,

তা কবিদের পথ ?

আমি স্রোতোস্বিনীর উৎস

প্রাচীনকালের গান ।

খোকাখুকুরা তোমরা কি অনেক দূরে চলে যাও

পৃথিবী আর সমুদ্র থেকে ?

আমি আলোয় পরিপূর্ণ, রয়েছে

রেশমের তৈরি আমার হৃদয়, আর

ঘণ্টাগুলো যা হারিয়ে গেছে,

মৌমাছির সঙ্গে লিলিফুলের সঙ্গে,

আর আমি বহুদূরে চলে যাবো,

ওখানে ওই পাহাড়গুলোর পেছনে,

নক্ষত্রের আলোর কাছে,

যিশুকে সেখানে প্রশ্ন করার জন্য

হে নাথ, আমাকে ফিরিয়ে দাও

আমার শিশুর আত্মা, প্রাচীন,

কিংবদন্তিতে ভরা,

পালকের টুপিতে,

আর কাঠের তরোয়াল নিয়ে ।

খোকাখুকুরা তোমরা আমাদের গাইতে গাইতে ছেড়ে যাও

এই ছোটো নগরচত্বরে ।

স্রোতোস্বিনীর আলো, আর

ঝর্ণার শান্তি !

বিশাল চোখের তারা

রোদে পোড়া খেজুরপাতার 

বাতাসে হাহত, ওরা

মৃত পাতার জন্য কাঁদে ।


অশ্বারোহীর গান

করদোবা।

বহু দূরে, আর একা ।

পূর্ণিমা, কালো ঘোড়া,

আমার জিনের পাশে অলিভ ।

যদিও আমি সব রাস্তাঘাট চিনি

আমি কখনও করদোবায় পৌঁছোতে পারব না ।

মৃদুমন্দ হাওয়ার ভেতর দিয়ে, উপত্যকা বেয়ে,

লাল চাঁদ, কালো ঘোড়া।

মৃত্যু আমার দিকে তাকাচ্ছে

করদোবার মিনারগুলো থেকে ।

ওহে, কতো দীর্ঘ এই পথ !

ওহে, আমার সাহসী ঘোড়া !

ওহে, মৃত্যু আমার জন্যে অপেক্ষা করছে,

আমি করদোবা পৌঁছোবার আগেই।

করদোবা ।

বহু দূর, আর একা ।


এটা সত্যি

ওগো, যে ব্যথা আমি সয়েছি

তোমাকে ভালোবাসতে যেমন আমি তোমায় ভালোবাসি।

তোমাকে ভালোবাসার জন্য, বাতাস, এটা ব্যথা দেয়,

আর আমার হৃদয়,

আর আমার টুপি, তারা ব্যথা দেয়।

কে-ই বা আমার থেকে কিনবে,

এই রিবন যেটা ধরে আছি,

আর কাপড়ের দুঃখ,

শাদা, যা দিয়ে রুমাল তেরি হবে ?

ওগো, যে ব্যথা আমি সয়েছি

তোমাকে ভালোবাসার জন্যে যেমন তোমাকে ভালোবাসি !


নিষ্ফলা কমলালেবু গাছের গান

কাঠুরিয়া ।

আমার ছায়াকে কেটে ফ্যালো ।

এই অত্যাচার থেকে আমাকে মুক্তি দাও

আমাকে নিষ্ফলা দেখার ।

আমি কেন আয়নাদের মাঝে জন্মেছিলুম?

দিনের আলো আমার চারিপাশে ঘোরে ।

আর রাত নিজেই আমার পুনরাবৃত্তি করে

তার যাবতীয় নক্ষত্রপূঞ্জে ।

আমি বেঁচে থাকতে চাই নিজেকে না দেখে।

আমি খোসা আর কীটদের স্বপ্ন দেখবো

আমার স্বপ্নে বদলে যাচ্ছে

আমার পাখিতে আর লতাপাতায়।

কাঠুরিয়া ।

আমার ছায়াকে কেটে ফ্যালো ।

এই অত্যাচার থেকে আমাকে মুক্তি দাও

নিজেকে নিষ্ফলা দেখার ।


চাঁদ জেগে থাকে

চাঁদ যখন পাল তুলে বেরিয়ে যায়

ঘণ্টাধ্বনি মিইয়ে যায় স্হিরতায়

আর দেখা দেয় পথরেখা

যার মধ্যে যাওয়া যায় না ।

চাঁদ যখন পাল তুলে বেরিয়ে যায়

পৃথিবীর পৃষ্ঠতলকে লুকিয়ে ফ্যালে জল,

হৃদয় নিজেকে দ্বীপের মতন অনুভব করে

শাশ্বত নৈঃশব্দে ।

কেউই কমলালেবু খায় না

চাঁদের প্রাচুর্যের তলায় ।

খাওয়া ঠিক কাজ, তাহলে

সবুজ আর শীতল ফল ।

চাঁদ যখন পাল তুলে বেরিয়ে যায়

একই রকমের একশো-মুখসহ,

রুপোর তৈরি পয়সাগুলো

তোমার পকেটে ফোঁপায় ।


বিদায়

আমি মরে যাচ্ছি,

বারান্দাটা খোলা রাখো ।

বাচ্চাটা কমলালেবু খাচ্ছে ।

( বারান্দা থেকে, আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি ।)

ফসলকাটিয়ে যবের ফসল তুলছে ।

( বারান্দা থেকে, আমি তাকে শুনতে পাচ্ছি ।)

আমি মরে যাচ্ছি,

বারান্দাটা খোলা রাখো ।


স্বপ্নচর রোমান্স

সবুজ, যেমন আমি তোমায় ভালোবাসি, সবুজাভায় ।

সবুজ বাতাস, আর সবুজ গাছের শাখারা ।

সমুদ্রে অন্ধকার জাহাজ

আর পাহাড়ে ঘোড়াটা ।

মেয়েটির সঙ্গে যার কোমর ছায়ায় গড়া

উঁচু বারান্দায় স্বপ্ন দেখি,

সবুজ মাংস, আর সবুজ বিনুনি,

আর জমাট রুপোর চোখ ।

সবুজ, যেমন আমি তোমায় ভালোবাসি, সবুজাভায় ।

জিপসিদের চাঁদের তলায় 

নিঃশব্দ জিনিসেরা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে

জিনিসগুলো যা মেয়েটি দেখতে পায় না ।

সবুজ, আমি তোমায় ভালোবাসি, সবুজাভায় ।

শাদা তুহিনের বিশাল নক্ষত্রদল

সকালের পথ খুলে দিচ্ছে ।

ডুমুরগাছ গা ঘষছে ভোরের বাতাসে

তার শাখাদের কর্কশ কন্ঠস্বরে,

আর পাহাড় বিড়ালের মতন চোর

তার খামখেয়ালি চোরকাঁটায় রাগ দেখাচ্ছে ।

কে আসছে ? আর কোথা থেকে…?

মেয়েটি উঁচু বারান্দায় অপেক্ষায়,

সবুজ মাংস আর সবুজ বিনুনি,

স্বপ্ন দেখছে তেতো সমুদ্রের ।

–’বন্ধু, ভাই, আমি অদলবদল করতে চাই

আমার ঘোড়ার সঙ্গে তোমার বাড়িকে,

তোমার আয়নার জন্য বিক্রি করব আমার জিন,

তোমার কম্বলের বদলে আমার ছোরা ।

প্রিয় ভাই আমার, আমি এসেছি রক্তাক্ত

কাবরা’র গিরিপথ ধরে ।’

–’ যদি পারুম, আমার যুববন্ধু,

তাহলে দরদস্তুর করতে পারতুম,

কিন্তু আমি আর আমি নই,

আর এই বাড়িটা আমার, আমার নয়।’

–’বন্ধু, ভাই, আমি এখন মরতে চাই, 

আমার বিছানার সাজসজ্জায়,

লোহার তৈরি, যদি তা পারা যায়,

মিহিন ক্যামব্রিক কাপড়ের চাদরে ।

তুমি কি আমার জখম দেখতে পাচ্ছ

আমার গলা থেকে হৃদয় পর্যন্ত ?’

–’তিনশো লাল গোলাপ

তোমার শাদা জামায় এখন ।

তোমার রক্ত থেকে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে আর চুইছে,

তোমার রক্তবর্ণ কাটা থেকে ।

কিন্তু আমি আর আমি নই,

আর এই বাড়ি আমার, আমার নয় ।’

–’তাহলে আমাকে, অন্তত, ওখানে চড়তে দাও,

উঁচু বারান্দার দিকে ।

আমাকে চড়তে দাও, আমাকে ওখানে চড়তে দাও,

উঁচু সবুজ বারান্দায় ।

চাঁদের আলোয় তৈরি উঁচু বারান্দা,

যেখান থেকে শুনতে পাচ্ছি জলের আওয়াজ ।’

এবার ওরা আরোহণ করে, দুই সহযোগী,

ওপরে উঁচু বারান্দায়,

রক্তের ফোঁটা ঝরাতে ঝরাতে

চোখের জলের রেখা ফেলতে-ফেলতে ।

ভোরের ছাসগুলোয়,

কাঁপে, টিনের ছোতো লন্ঠন ।

স্ফটিকের হাজার খঞ্জনি

ভোরের আলোকে জখম করেছে ।

সবুজ, যেমন আমি তোমায় ভালোবাসি, সবুজাভায়।

সবুজ বাতাস, আর সবুজ গাছের শাখারা ।

ওরা ওপরে আরোহণ করল, দুই সহযোগী ।

মুখের ভেতরে, অন্ধকার আওয়া

এক অদ্ভুত গন্ধ রেখে গেলো,

হীরাকষ, আর পুদিনা, আর মিষ্টি তুলসীপাতার।

–’বন্ধু, ভাই ! মেয়েটি কোথায়, আমাকে বলো,

মেয়েটি কোথায়, তোমার তেতো সুন্দরী ?

প্রায়ই তো, মেয়েটি তোমার জন্যে অপেক্ষা করেছে !

প্রায়ই তো, মেয়েটি অপেক্ষা করতে পারতো,

শীতল মুখাবয়ব, আর অন্ধকার এলোচুলে,

এই সবুজ বারান্দায় !’

জলাধারের ঢাকনার ওপরে

জিপসি মেয়েটা দোল খাচ্ছিল ।

সবুজ মাংস, সবুজ এলোচুল

জমাট রুপোর চোখ ।

চাঁদের আলোর তৈরি বরফরশ্মি

ওকে জলের ওপরে তুলে ধরে আছে।

রাত কতো অন্তরঙ্গ হয়ে এলো,

এক ছোটো, লুকোনো বাজারের মতন ।

মাতাল সিভিল গার্ডরা টোকা দিচ্ছে,

টোকা দিচ্ছে, দরোজা চৌকাঠে টোকা দিচ্ছে ।

সবুজ, যেমন আমি তোমায় ভালোবাসি, সবুজাভায় ।

সবুজ বাতাস, আর গাছের সবুজ শাখারা ।

সমুদ্রে অন্ধকার জাহাজ,

আর পাহাড়ের ওপরে ঘোড়া ।


অপ্রত্যাশিত প্রেমের হরিণ

কেউই বুঝতে পারেনি সুগন্ধ

তোমার তলপেটের ম্যাগনিলোয়া ছায়াকে ।

কেউই জানে না তুমি সম্পূর্ণ পিষে দিয়েছ

তোমার দাঁতের মাঝে প্রেমের টুনটুনি পাখিকে ।

এক হাজার ছোটো পারস্যের ঘোড়া ঘুমিয়েছিল

তোমার কপালের চাঁদের আলোর বাজারে,

যখন কিনা, চার রাত ধরে, আমি জড়িয়ে ধরেছিলুম

তোমার কোমর, তুষারপাতে সে শত্রু ।

পলেস্তারা আর জুঁইফুলের মাঝে,

তোমার দৃষ্টি ছিল ফ্যাকাশে এক শাখা, বীজপ্রসূ ।

আমি তোমাকে দেবার চেষ্টা করলুম, আমার বুকের হাড়ে,

হাতির দাঁতের অক্ষরে যা বলছিল ‘চিরকাল’।

চিরকাল, চিরকাল । আমাকে অত্যাচারের বাগান,

তোমার দেহ, আমার কাছে থেকে চিরকালের জনভ বিদায় নেয়,

তোমার শিরার রক্ত এখন আমার মুখে,

ইতিমধ্যে আমার মৃত্যুতে আলোমুক্ত ।


গোলাপের গীতিকাব্য 

গোলাপ 

সকালের খোঁজ করছিল না :

তার শাখায়, প্রায় অবিনশ্বর,

তা অন্যকিছু চাইছিল ।

গোলাপ

জ্ঞানের খোঁজ করছিল না, কিংবা ছায়ার :

মাংসের কিনার আর স্বপ্ন দেখছিল

তা অন্যকিছু চাইছিল ।

গোলাপ

গোলাপের খোঁজ করছিল না, 

স্বর্গে ছিল অবিচলিত

তা অন্যকিছু চাইছিল ।


অন্ধকার পায়রাদের গীতিকাব্য

জলপাই গাছের শাখার ভেতর দিয়ে

আমি অন্ধকারে দুটি পায়রা দেখতে পেলুম।

একটা ছিল সূর্য’ আরেকটা ছিল চাঁদ ।

আমি বললুম : ‘ছোট্ট প্রতিবেশীরা

আমার সমাধিফলক কোথায় ?’

‘আমার লেজের পালকে,’ বলল সূর্য ।

‘আমার গলায়,’ বলল চাঁদ।

আর আমি যে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল

আমার শরীরে পৃথিবীকে জড়িয়ে নিয়ে,

শাদা তুষারে গড়া দুটো ঈগল দেখতে পেলো,

আর একটি মেয়ে যে ছিল নগ্ন ।

আর একজন ছিল অন্যজন,

আর মেয়েটি, সে দুটির কিছুই ছিলনা ।

আমি বললুম, ‘ছোট্ট ঈগলরা

আমার সমাধিফলক কোথায় ?’

‘আমার লেজের পালকে,’ সূর্য বলল ।

‘আমার গলায়,’ চাঁদ বলল ।

জলপাই গাছের শাখার ভেতর দিয়ে,

আমি দুটো পায়রাকে দেখতে পেলুম, দুটোই নগ্ন ।

আর একজন ছিল অন্যজন,

আর দুজন কিছুই ছিল না ।


ওহে অন্ধকার প্রেমের গোপন কন্ঠ

হে লুকোনো ভালোবাসার গোপন কন্ঠস্বর !

হে পশাম ছাড়াই ভেড়ার ডাক দিচ্ছ ! হে জখম !

হে শুকনো চিরহরিৎ-গুল্ম, তেতো ছুঁচ !

হে সমুদ্রহীন স্রোত, দেয়ালহীন শহর !

হে শাণিত পরিলেখে গড়া বিশাল রাত, 

স্বর্গীয় পর্বতমালা, সরু উপত্যকা !

হে হৃদয়ের ভেতরের কুকুর, কন্ঠস্বর উবে যাচ্ছে,

সীমাহীন স্তব্ধতা, পূর্ণবিকশিত রামধনু !

আমাকে হতে দাও, হিমশৈলের উষ্ণ কন্ঠস্বর,

আর আমাকে বিলুপ্ত হতে বোলো না

জংলিঘাসে, যেখানে আকাশ আর মাংস ফলহীন ।

চিরতরে ছেড়ে চলে যাও আমার হাতির দাঁতের করোটি,

আমাকে দয়া করো । অত্যাচার বন্ধ করো !

হে আমিই প্রেম, হে আমিই প্রকৃতি ।


প্রতিটি গান

প্রতিটি গান

অবশিষ্টাংশ

ভালোবাসার ।

প্রতিটি আলো

অবশিষ্টাংশ

সময়ের ।

একটা গিঁট

সময়ের ।

আর প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস

অবশিষ্টাংশ

এক কান্নার ।


Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

ফিয়োদর দস্তয়েভস্কি’র ‘দি গ্র্যাণ্ড ইনকুইজিটর’- মলয় রায়চৌধুরীর অনুবাদ

মলয় রায়চৌধুরীর অনুবাদ–ফিয়োদর দস্তয়েভস্কি : ‘দি গ্র্যাণ্ড ইনকুইজিটর’

“একেবারে অসম্ভব”, আইভান হেসে বলল, “ভূমিকাসহ আরম্ভ করি তাহলে, আমি ষোড়শ শতাব্দীর  কবিতায় বর্ণিত ঘটনা উল্লেখ করছি, সে একটা যুগ ছিল বটে ,  – যেমনটা তোমাদের স্কুলে বলা হয়েছিল – যখন কবিদের মধ্যে উচ্চতর  ব্রহ্মাণ্ডের অধিবাসীদের ও ক্ষমতাধরদের মর্ত্যে নামিয়ে আনার  আর মরজগতের প্রাণীদের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করাবার দুর্দান্ত ফ্যাশন ছিল… ফ্রান্সে  নোটারিদের  কেরানিরা, আর পাঁচিল-ঘেরা মঠের যাজকরাও দুর্দান্ত অনুষ্ঠান , নাটকীয় অভিনয় করতেন,যাতে  ম্যাডোনা, দেবদূতরা, সন্তরা, যিশুখ্রিস্ট,  দীর্ঘ দৃশ্য গড়ে তুলতেন, এমনকি স্বয়ং ঈশ্বর আসতেন, তখন সবকিছুই ছিল শিল্পহীন আর আদিম । তার একটা উদাহরণ হতে পারে ভিক্টর হুগোর নাটক, ‘নতরে দেম দে প্যারিসে. যাতে, মিউনিসিপ্যাল হলে, ‘লে বোন জাজমেন্ট দে লা ট্রেস-সান্তে এত গ্রাসিউজ ভিয়ার্জ মারি’ নামে একখানা নাটক লুই একাদশের সম্মানে অভিনীত হয়েছিল, সেখানে ভার্জিন মেরি নিজে উপস্হিত হয়ে তাঁর ‘শুভ আশীর্বাদ’ দিয়েছিলেন। মস্কোতে, প্রিপেট্রিয়ান কালখণ্ডে, প্রায় একই চরিত্রদের অভিনয়, বিশেষ করে ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে নির্বাচিত, সকলের বেশ পছন্দ ছিল। এই ধরনের নাটকগুলো ছাড়াও, পৃথিবী ছেয়ে গিয়েছিল রহস্যময় রচনায়, ‘ছন্দ-কবিতায়’ – যার নায়করা সর্বদা নির্বাচিত হতো দেবদূত, সন্ত আর অন্যান্য স্বর্গীয় নাগরিকদের মধ্যে থেকে,  যারা সেই কালখণ্ডের ভক্তিমূলক উদ্দেশ্যে সাড়া দিতে পারতো। রোমান ক্যাথলিক যাজকদের মতন আমাদের  সমাজ-বিচ্ছিন্ন মঠগুলো, নিজেদের সময় কাটাতো অনুবাদ, অনুলিপি  এমনকি এই ধরনের বিষয়গুলো নিয়ে  মূল রচনা লেখায়, আর এটা মনে রেখো, ছিল তার্তারদের সময়কালে ! ..এই প্রসঙ্গে, আমি কনভেন্টে সংকলিত একটা কবিতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি –নিঃসন্দেহে গ্রীক থেকে অনুবাদ, যাকে বলা হয়, ‘’অভিশপ্তদের মাঝে ঈশ্বরের মায়ের পরিভ্রমণ”, যার মধ্যে রয়েছে প্রসঙ্গ অনুযায়ী ছবি আর দান্তের চেয়ে নিকৃষ্ট চিন্তাভাবনা করার সাহস । ‘ঈশ্বরের মা’ নরক দেখতে যান, প্রধান দেবদূত মাইকেলকে সঙ্গে করে, যে ওনার পথপ্রদর্শক হিসাবে  ‘অভিশপ্তবাহিনী’কে দেখায় । মা তাদের সবাইকে প্রত্যক্ষ করেন এবং তাদের নানারকম নির্যাতনের সাক্ষী হন । নির্যাতনের অন্য অনেক অসাধারণ উল্লেখযোগ্য  যন্ত্রণার মধ্যে — প্রত্যেক শ্রেণীর পাপীদের নির্ধারিত বিশেষ যন্ত্রণা —  লক্ষ্য করার যোগ্য, যেমন ‘অভিশপ্ত’ শ্রেণীর একটা দলকে ধীরে ধীরে গন্ধক ও আগুনের জ্বলন্ত হ্রদে চুবিয়ে দেওয়া হয়। যারা পাপ করে তাদের এত নীচে ডুবিয়ে দেয়া হয় যে তারা আর ওপরে উঠতে পারে না, আর ঈশ্বর তাদের চিরকালের জন্য ভুলে যান, অর্থাৎ তারা সর্বজ্ঞের স্মৃতি থেকে মুছে যায়, লেখা হয়েছে কবিতাটায় —  এক অসাধারণ চিন্তার গভীর অভিব্যক্তি , যদি তার নীবিড় বিশ্লেষণ করা হয়। ভার্জিন মেরি ভয়ঙ্করভাবে হতবাক, এবং ঈশ্বরের সিংহাসনের সামনে কান্নায়  হাঁটু গেড়ে বসেন, এবং অনুনয় করেন যে নরকে তিনি যা দেখেছেন — সবই, সমস্তকিছু, ওদের শাস্তি মুকুব করে দেয়া উচিত। ঈশ্বরের সাথে তাঁর কথোপকথনটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ভার্জিন মেরি বলেন, তিনি কখনও ঈশ্বরকে ছেড়ে যাবেন না।  ঈশ্বর তখন ভার্জিন মেরির  ছেলের বিদ্ধ হাত ও পায়ের দিকে ইঙ্গিত করে চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘আমি কীভাবে ওনার জল্লাদদের ক্ষমা করতে পারি?’   তিনি তখন আদেশ দেন যে সমস্ত সন্ত, শহীদ, দেবদূত এবং প্রধান দেবদূত, তাঁকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করবে  যিনি একমেব ও অপরিবর্তনীয় এবং  তাঁর  ক্রোধকে দয়ায় পরিবর্তনের জন্য অনুরোধ করবে— ওদের সবাইকে ক্ষমা করুন। ঈশ্বরের সঙ্গে সমঝোতার পর কবিতাটি শেষ হয়, অনেকটা  গুড ফ্রাইডে আর ট্রিনিটির মাঝের সময়টায়  অত্যাচারের বার্ষিক অবকাশ,  ‘অতল গহ্বর’ থেকে  অভিশপ্তদের কন্ঠে ঈশ্বরের উচ্চ প্রশংসায় সমবেত গান, তাঁকে ধন্যবাদ  দেয়া আর এই কথা বলা:

আপনিই ঠিক, হে প্রভু, খুব সঠিক, 

ন্যায় বিচার করে আপনি আমাদের অভিশপ্ত করেছেন।

“আমার কবিতা একই চরিত্রের। 

“এই দৃশ্যে ,যিশুখ্রিষ্ট নিজে আবির্ভূত হন। সত্য, তিনি কিছুই বলেন না,  কেবল উপস্থিত হন এবং দৃষ্টির বাইরে চলে যান। ক্ষমতা এবং মহান গৌরব নিয়ে আবার ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেবার পর পনেরোটা শতক কেটে গেছে ; তাঁর ভবিষ্যবক্তা চিৎকার করে একথা বলার পর, যে, “প্রভূর পথ প্রস্তুত করো”, পনেরোটা দীর্ঘ শতক কেটে গেছে ! ‘ যেহেতু তিনি  পৃথিবীতে থাকাকালীনই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ‘সেই দিন ও সময় কেউ জানে না, না, স্বর্গের দেবদূতরা নয়, জানেন কেবল আমার পিতা।’ কিন্তু খ্রিস্টিয়জগৎ এখনও তাঁর আগমনের আশায় অপেক্ষা করে আছে। 

“একই পুরোনো বিশ্বাস আঁকড়ে আর একই আবেগে জগত তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে; হ্যাঁ, আরও বেশি বিশ্বাসের সাথে, স্বর্গ থেকে  মানুষের কাছে শেষ ইশারা আসার  পর পনেরো শতক কেটে গেছে,

আর অন্ধ বিশ্বাস একা থেকে গেল 

আস্থাশীল হৃদয়কে শান্ত করার জন্য, 

যেহেতু স্বর্গ আর কোনও ইশারা পাঠাবে না। 

“একথা সত্যি , আবার, আমরা সকলেই  অলৌকিক ঘটনা ঘটার কথা শুনেছি, যদিও ‘অলৌকিক যুগ’ চলে যাবার পর আর ফিরে আসে না । আমাদের ছিল আর এখনও আছে, আমদের সন্তরা, যাঁরা অলৌকিকভাবে নিরাময় করতে পারতেন ; এবং যদি আমরা  তাঁদের জীবনী লেখকদের বিশ্বাস করতে পারি, তাঁদের মধ্যে এমন লোকও ছিল যাঁদের কাছে স্বর্গের রানী  নিজে এসেছিলেন। কিন্তু শয়তান তো ঘুমোয় না, আর সন্দেহের প্রথম বীজ, আর সেই সমস্ত বিস্ময়কর ব্যাপারের প্রতি ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস, ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে খ্রিষ্টিয়জগতে উঁকি দিতে আরম্ভ করেছিল । ঠিক সেই সময়েই জার্মানির উত্তরে এক নতুন এবং ভয়ঙ্কর ধর্মদ্রোহী প্রথম আবির্ভূত হয়েছিল। [ লুথারের সংস্কার]…একটি বিশাল নক্ষত্র ‘ যেন তা প্রদীপের আলোর মতন ঝিকমিকে … ঝর্ণার জলে পড়ল’ … এবং ‘তা  তেতো হয়ে গেল।’ সেই ‘ধর্মদ্রোহী’ নিন্দার সাথে ‘অলৌকিক ঘটনা’ অস্বীকার করলো। কিন্তু যারা বিশ্বস্ত ছিল তারা আরো বেশি উৎসাহভরে বিশ্বাস করতে লাগলো, মানবজাতির অশ্রুজল ঈশ্বরের কাছে আগের মতোই পৌঁছোচ্ছিল, এবং খ্রিস্টানবিশ্ব  আগের মতোই আত্মবিশ্বাসের সাথে তাঁর আগমনের জন্য অপেক্ষা করছিল; লোকেরা তাঁকে ভালবাসতো এবং তাঁর উপর তাদের আস্হা ছিল, আগে যেমন লোকেরা তাঁর জন্য নিজেদের নিরম্বু ও  ক্ষুধার্ত উপবাসী রেখে, দুঃখ আর যন্ত্রণাভোগ করতো, ঠিক তেমনই করতো এই সময়ে …. কতো শতাব্দী যাবত  দুর্বল আর বিশ্বাসী মানুষেরা তাঁর কাছে অনুনয়-বিনয় করেছে, বিশ্বাসভরে কেঁদেছে, বলেছে : ‘আর কতোকাল হে প্রভু, পবিত্র ও সত্য, তুমি কি আর আসবে না?’ কতো দীর্ঘ শতাব্দী তাঁর কাছে নিরর্থক আবেদন করেছে যে, অবশেষে, তাঁর অপার করুণায়, তিনি প্রার্থনায় সাড়া দিতে সম্মত হলেন ….উনি নির্ণয় নিলেন যে আরেকবার, তা যদি এক ঘণ্টার জন্যেও হয়, জনগণের জন্য– তাঁর যন্ত্রণাক্ত, অত্যাচারিত, মারাত্মক পাপী, তাঁর আদরের শিশুসন্তানের মতো, বিশ্বাসী মানুষেরা— তাঁকে আবার দেখতে পাবে । এই ঘটনার দৃশ্যটি আমি স্পেনে নিয়ে গেছি, সেভাইলেতে, ইনকুইজিশনের ভয়ঙ্কর সময়ে, যখন, ঈশ্বরের মহিমাময় গৌরবের জন্য, সারা দেশ জুড়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। 

দুষ্ট অবিশ্বাসীদের খুঁটিতে বেঁধে পুড়িয়ে মারা হচ্ছিল, 

যাজকদের বিচারের জাঁকজমকের পর। 

“এই বিশেষ সফরের, অবশ্যই, প্রতিশ্রুত আগমনের সাথে কোন সম্পর্ক নেই, যখন, নির্ধারিত দিনক্ষণ অনুযায়ী, ‘সেই দিনগুলির দুর্দশার পরে,’ তিনি আবিভূত হবেন ‘স্বর্গের মেঘের ভেতর দিয়ে’। কারণ, ‘ঈশ্বরপুত্রের আগমন’, যেমনটি আমাদের জানানো হয়েছে, হঠাৎ করেই ঘটবে, ‘যেমন বিদ্যুৎ পূর্ব দিক থেকে চকিতে আসে এবং পশ্চিম দিকে ঝলকানি দেয়।’ না; এই একবার, তিনি অপরিচিত হয়ে আসতে চেয়েছিলেন, এবং তাঁর সন্তানদের মধ্যে উপস্থিত হতে চেয়েছিলেন । ঠিক তখনই, যখন বিধর্মীদের হাড়গুলো, যাদের জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলার দণ্ড দেওয়া হয়েছিল, আগুনে ফাটার আওয়াজ শুরু করেছিল। তাঁর অপার করুণার দরুন, তিনি আরেকবার সেই ভাবেই দেখা দিতে চেয়েছিলেন যে-রূপে পনেরো শতাব্দী আগে মর্ত্যলোকে এসেছিলেন। তিনি ঠিক সেই সময়েই নেমে আসেন যখন রাজা, দরবারের সদস্যরা, সেনানীরা, যাজকরা, আর রাজদরবারের সুন্দরীরা, সেভাইলের সমস্ত মানুষের সামনে, একশোর বেশি বিধর্মী বজ্জাতকে ভয়াবহ ‘অটো-দা-ফে অ্যাড মেজরমে দেই গ্লোরিয়ামে’ জ্যান্ত পোড়ানো হচ্ছে,  কার্ডিনাল গ্র্যান্ড ইনকুইজিটরের আদেশে । তিনি চুপচাপ এবং অঘোষিত এসেছেন; তবুও সবাই – কত অদ্ভুত – হ্যাঁ, সবাই তাঁকে তক্ষুনি চিনতে পারে ! জনগণ তাঁর দিকে ছুটে যায়, যেন তারা কোনও অপ্রতিরোধ্য শক্তি দ্বারা আকর্ষিত ; তারা তাঁকে ঘিরে ধরে, তাঁর চারপাশে ঠেলাঠেলি ভিড় করে , তারা তাঁকে অনুসরণ করে … নিঃশব্দে,  তাঁর ঠোঁটে  অসীম মমতার মৃদু হাসি , তিনি ঘন ভিড় অতিক্রম করেন, এবং হালকা পায়ে এগিয়ে যান। প্রেমের সূর্য তার হৃদয়ে উদ্ভাসিত, এবং তাঁর চোখ থেকে আলো, প্রজ্ঞা ও শক্তির উজ্জ্বল রশ্মি বিচ্ছুরিত হচ্ছিল, এবং তাঁকে ঘিরে জড়ো হওয়া জনগণের ওপর ঝরে পড়ছিল , তাদের হৃদয়কে ভালোবাসায় স্পন্দিত করে তুলছিল । তিনি তাঁর হাত তাদের মাথায় বুলিয়ে দিলেন, আশীর্বাদ করলেন, আর তাঁর সামান্য ছোঁয়ায়, এমনকি তাঁর পোশাক থেকে, একটি নিরাময়কারী শক্তিপ্রবাহ বইতে থাকে । একজন বৃদ্ধ, জন্ম থেকে অন্ধ, কাকিয়ে ওঠে, ‘প্রভু, আমাকে সুস্থ করুন, যাতে আমি আপনাকে দেখতে পারি !’ আর তার অন্ধ চোখ থেকে আবরণ খসে পড়ে, এবং অন্ধ লোকটি তাঁকে দেখতে পায় … জনগণ আনন্দে কাঁদতে আরম্ভ করে, এবং যে মাটিতে তিনি পা রাখছিলেন সেখানটায় সবাই চুমু খেতে থাকে । শিশুরা তাঁর চলার পথে  ফুল ছিটিয়ে আশীর্বাদ পাওয়ার গান গায় ! এ তো তিনিই, তিনি নিজেই, তারা একে অপরকে বলে, ইনি অবশ্যই ঈশ্বরপুত্র স্বয়ং, তিনি ছাড়া আর কেউ হতে পারেন না !  পুরানো গির্জার প্রবেশপথে তিনি থামেন, ঠিক তখনই একটি সাদা রঙের কফিন ভেতরে নিয়ে আসা হচ্ছিল, বহনকারীরা বিলাপ করে জোরে-জোরে কাঁদছিল । কফিনের ঢাকনা খোলা, আর তাতে শয়ানো একটি ফর্সা শিশু, সাত বছর বয়সী, শহরের একজন বিশিষ্ট নাগরিকের একমাত্র সন্তান। ছোট্ট শবটি ফুলের তলায় চাপা পড়ে আছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত যাজক, যিনি শবযাত্রীদের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন, তাকে বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল এবং যাজক ভ্রূকুটি করলেন । হঠাৎ একটি ক্রন্দনরত চিৎকার শোনা যায়, এবং শোকাহত মা ঈশ্বরপুত্রের  পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে থাকে। ’যদি তুমিই সেই হও, তাহলে আমার সন্তানকে জীবিত করে তোলো !’ শবযাত্রীদের মিছিল থেমে যায়, এবং ছোট্ট কফিনটি আলতো করে তাঁর পায়ের কাছে নামানো হয়। ঐশ্বরিক করুণা তাঁর দৃষ্টি থেকে প্রবাহিত হয়, এবং যখন তিনি শিশুটির দিকে তাকান, ঈশ্বরপুত্রের ঠোঁটদুটিকে ফিসফিস করতে শোনা যায়, ‘তালিথা কুমি’ ( ছোট্ট খুকি, আমি তোমাকে বলছি, উঠে পড়ো ) এবং  শিশুর মা শুনে থমকে যায় ।’ শিশুটি তার কফিনে উঠে দাঁড়ায় । তার ছোট্ট হাতদুটিতে তখনও সাদা গোলাপের গোছা,  যা তার মৃত্যুর পর রাখা হয়েছিল এবং বড়-বড় বিস্মিত চোখে চারদিকে তাকিয়ে সে মিষ্টি হাসতে লাগলো …. জনতা অত্যন্ত উত্তেজিত। তাদের মধ্যে  ভয়ানক হৈচৈ আরম্ভ হয়ে গেল, জনসাধারণ চিৎকার করে জোরে জোরে কাঁদতে লাগলো, তখনই হঠাৎ, গির্জার দরজার সামনে, কার্ডিনাল গ্র্যান্ড ইনকুইজিটর নিজেই হাজির হলেন…তিনি দীর্ঘদেহী, প্রায় নব্বুই বছর বয়সের শুকনো-মুখ বুড়ো, ভেতরে ঢোকা চোখ, যার গহ্বর থেকে দুটি জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ চমকাচ্ছিল । রোমান ক্যাথলিক চার্চের শত্রুদের ‘অটো দা-ফে’ অনুষ্ঠানে যোগ দেবার সময়ে জনগণের সামনে  যে আড়ম্বরপূর্ণ কার্ডিনালের পোশাক পরেছিলেন,  তা খুলে রেখে এসেছেন, আর এখন পরে আছেন পুরানো, রুক্ষ, যাজকদের ঢোলা আলখাল্লা।  তাঁর নিষ্ঠুর সহকারী আর ‘পবিত্র রক্ষীদলের’ ক্রীতদাসরা দূর থেকে ইনকুইজিটরকে অনুসরণ করছিল । তিনি ভিড়ের সামনে থামলেন এবং এদিক-ওদিক তাকালেন। তিনি সবই দেখেছেন । তিনি ঈশ্বরের পায়ের কাছে ছোট্ট কফিন রাখার দৃশ্য দেখেছেন, জীবন ফিরে পাওয়ার সাক্ষী হয়েছেন। আর এখন, তাঁর কালো হয়ে-যাওয়া, বিষণ্ন মুখ আরও কালো হয়ে গেছে; তাঁর লোমশ ধূসর ভ্রু একের সঙ্গে আরেক মিশে আছে,  এবং তাঁর গর্তে-ঢোকা চোখে  ভয়াবহ আলোয় জ্বলজ্বল করছিল । আস্তে আস্তে আঙুল তুলে, তিনি তাঁর চাকরদের নির্দেশ দেন ঈশ্বরপুত্রকে গ্রেপ্তার করতে ….”সুশৃঙ্খল, বশীভূত আর এখন হাড়হিম মানুষের উপর ইনকুইজিটরের ক্ষমতা এমন, যে বিশাল ভিড় তাড়াতাড়ি পথ ছেড়ে দেয়, এবং প্রহরীদের সামনে থেকে এদিক-ওদিক পালিয়ে যায়, শীতল নীরবতার মধ্যে  প্রতিবাদের টুঁ শব্দটুকুও না করে, ঈশ্বরপুত্রের গায়ে তাদের অপবিত্র হাত রাখার অনুমতি পায় এবং অপরিচিত ঈশ্বরপুত্রকে  দূরে নিয়ে যায় …. সেই একই লোকজন, যেন তারা একটি-মাত্র মানুষ, বৃদ্ধ ইনকুইজিটর তাদের আশীর্বাদ করার পর,  সামনের মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে,  ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। ; প্রহরীরা তাদের বন্দীকে পবিত্র বিচারের বেশ পুরোনো অট্টালিকায় নিয়ে যায় ; ঈশ্বরপুত্রকে  সংকীর্ণ, অন্ধকারাচ্ছন্ন, দমবন্ধকরা কারাগারের ঘরে ঠেলে দিয়ে, তালাবন্ধ করে এবং বিদায় নেয় ….”দিন শেষ হয়, এবং রাত নামে — একটি অন্ধকার, গরম, দমবন্ধ স্প্যানিশ রাত — সেভিল শহরে চুপি-চুপি ঢুকে পড়ে গ্যাঁট হয়ে বসে । বাতাসে চাঁপা আর কমলা ফুলের গন্ধ ভেসে আসে । বিচারসভার পুরোনো হলঘরের আদিম অন্ধকারে  লোহার দরজা হঠাৎ খুলে দেওয়া হয়, এবং গ্র্যান্ড ইনকুইজিটর, একটা টিমটিমে লণ্ঠন হাতে ঝুলিয়ে, আস্তে আস্তে অন্ধকূপের মধ্যে প্রবেশ করে । লোকটা একা, এবং, তার পেছনে ভারী দরজা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে সে চৌকাঠে থেমে যায়, আর এক বা দুই মিনিটের জন্য গোমড়ামুখে আর চুপচাপ  তার সামনে ঈশ্বরপুত্রের মুখমণ্ডল খুঁটিয়ে দ্যাখে । গুনে-গুনে কয়েক পা এগিয়ে,   শেষ পর্যন্ত, বুড়ো ইনকুইজিটর তার লণ্ঠন টেবিলে রেখে দেয় আর এইভাবে ঈশ্বরপুত্রকে সম্বোধন করে :

“তাহলে তুমিই! … তুমি !” … কোনও উত্তর না পেয়ে, ইনকুইজিটর দ্রুত কথা চালিয়ে যায়: ‘’না, উত্তর দিতে হবে না; চুপ করেই থাকো !…আর তুমি কীই বা বলতে পারো ?.. আমি ভালোভাবেই তোমার উত্তর জানি…তাছাড়া, তুমি এর আগে যে উক্তি করেছিলে তার সাথে একটি অক্ষরও  যোগ করার অধিকার নেই তোমার …. কেন তুমি এখন ফিরে এলে, আমাদের কাজে বাধা দেওয়ার জন্য ? তুমি নির্ঘাৎ সেই কাজের জন্যই এসেছো, আর তুমি তা ভালো করে জানো । কিন্তু তুমি কি জানো, আগামীকাল  সকালে তোমার জন্য কী অপেক্ষা করছে? আমি জানি না, আর জানতেও চাই না যে তুমি কে : তুমি নিজেই এসেছো নাকি নিজের প্রতিকৃতি পাঠিয়েছ, আগামীকাল আমি তোমাকে দণ্ডদান করে খুঁটিতে বেঁধে পোড়াবো, যেন তুমি সবচেয়ে বেশি অবিশ্বাসী ;  আর সেই একই লোকেরা, যারা আজকে তোমার পায়ে চুমু খাচ্ছিল, কালকে আমার একটা আঙুলের ইশারায়, তারা তোমার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার চিতায় আগুন দিতে  ছুটে আসবে … তুমি কি এই বিষয়ে সচেতন? ‘ লোকটা বলতে থাকে, যেন একান্ত চিন্তায় কথা বলছে, এবং একবারের জন্যও তার সামনেকার নম্র মুখ থেকে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সরিয়ে নেয়নি। “

“যা বর্ণনা করা হলো আমি অমন পরিস্থিতি বিশেষ উপলব্ধি করতে পারছি না — এ-সব কী, আইভান?” হঠাৎ বাধা দিল অ্যালিয়োশা, যে  এতক্ষণ তার ভাইয়ের কথা চুপচাপ শুনছিল, বলে উঠলো । “এটা কি এক অভিনব কল্পনা, নাকি বুড়ো লোকটার কিছু ভুল, একটা অসম্ভব লেনদেন ?”  ” তুমি যদি চাও তাহলে পরেরটাই হোক”, আইভান হেসে বলল,” তাহলে আধুনিক বাস্তববাদ তোমার রুচিকে এতটাই বিকৃত করে দিয়েছে যে, তুমি অভিনব জগতের কোনো-কিছু উপলব্ধি করতে অক্ষম বোধ করছ ….তাহলে লেনদেনই মনে করা হোক, যদি তুমি তাই মনে করো । তাছাড়া, ইনকুইজিটরের বয়স নব্বুই বছর, আর ক্ষমতার আদর্শ নিরূপণ করতে-করতে পাগল হয়ে গিয়ে থাকবে ; কিংবা, এটা তার দৃষ্টির বিভ্রম হতে পারে, মৃত্যুর কল্পনায় জারিত, দুপুরের শতাধিক অবিশ্বাসীকে পুড়িয়ে মারার তাপে মাথা গরম…. কিন্তু কবিতাটির জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো এই যে, এটা কি লেনদেন নাকি অনিয়ন্ত্রিত কল্পনা ? প্রশ্ন হল, ইনকুইজিটরকে নিজের হৃদয়কে মুক্ত করতে  হবে;  শেষ পর্যন্ত তাকে তার ভাবনা প্রকাশ করতে হবে ; আর নব্বুই বছর যাবত যে রহস্য মনের মধ্যে গোপন করে রেখেছে, তা জোরে-জোরে বলতে শুরু করে।” 

 “এবং তার বন্দী, তিনি কি কখনো উত্তর দেন না? তিনি কি কোনও কথা না বলে, তার দিকে তাকিয়ে, চুপ করে থাকেন ?” 

“অবশ্যই; আর তাছাড়া অন্য কিছু হতে  পারে না,” আইভান উত্তরে বলে। ” গ্র্যান্ড ইনকুইজিটর  যে কথাগুলো বলেছিল সেগুলোই আবার বলে,  যে,  ঈশ্বরপুত্রের বলা আগের  কথার সাথে একটি অক্ষরও যোগ করার অধিকার নেই। পরিস্থিতি তক্ষুনি স্পষ্ট  করার জন্য, ওপরের প্রাথমিক স্বগতসংলাপ ছিল    রোমান ক্যাথলিক ধর্মের অন্তর্নিহিত মর্মার্থ বোঝানোর খাতিরে — যেমন আমি ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে পারি, লোকটার কথার মানে, সংক্ষেপে: ‘তুমি  পোপের কাছে সবকিছু দিয়েছিলে, এবং সবকিছুই এখন তার একার উপর নির্ভর করে; আমাদের কাজে বাধা দিতে তোমার ফিরে আসার কোনও কারণই থাকতে পারে না । ‘ এই বিষয়ে জেসুইটরা শুধু কথাই বলে না, লেখেও একইভাবে । “‘তুমি কি আমাদের কাছে সেই পৃথিবীর অন্তত একটি রহস্যের কথা ফাঁস করতে পারো  , যেখান থেকে তুমি এসেছ?’ বুড়ো ইনকুইজিটর জিগ্যেস করে ঈশ্বরপুত্রকে, আর নিজেই তাড়াতাড়ি তার উত্তর দেয় । “না, তোমার কোনও অধিকার নেই তা বলার, কেননা তা হবে সেই একই কথা যা তুমি এর আগে বলেছিলে,  যখন তুমি পৃথিবীতে ছিলে, তখন সাধারণ মানুষের জন্য যে-উদ্দেশে লড়াই করেছিলে, তাদের তা থেকে বঞ্চিত করছ…তুমি  এখন  নতুন যা-কিছু ঘোষণা করবে তা  পছন্দের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হবে, কারণ এটি একটি নতুন এবং  অলৌকিক ব্যাপার হিসাবে প্রকাশিত হবে, যা পনেরোশো বছরের পুরানো ঘোষণাকে অতিক্রম করে যাবে , যখন তুমি বারবার জনগণকে  বলেছিলে: “সত্য তোমাদের মুক্ত করবে।” তাহলে তাকিয়ে দেখো,  তোমার এখনকার “মুক্ত” মানুষদের দিকে ! ‘ বুড়ো লোকটা টিটকিরি মেরে বলে। ‘হ্যাঁ…! তাতে আমাদের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে।’ নিজের শিকারের দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলতে থাকে সে । ‘কিন্তু আমরা শেষ পর্যন্ত আমাদের কাজ সম্পন্ন করেছি, এবং তা  তোমার নাম করে …. কেননা দীর্ঘ পনেরো শতাব্দী ধরে সেই “স্বাধীনতার” জন্য আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে এবং দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়েছে : কিন্তু এখন আমরা জয়ী হয়েছি আর আমাদের কাজ মিটে গেছে , আর তা বেশ  ভালো  এবং দৃঢ়ভাবে  সম্পন্ন হয়েছে। …. বিশ্বাস কোরো না যে তুমি এত শক্তিশালী ! … এবং কেনই বা তুমি আমার দিকে ভিরু চোখে তাকাচ্ছ,  যেন আমি তোমার ধিক্কারেরও যোগ্য নই? … তাহলে জেনে রাখো,  লোকেরা তাদের মুক্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত এবং সন্তুষ্ট বোধ করে ; এবং সেকারণেই তারা নিজেদের এবং তাদের নিজস্ব ইচ্ছায়, সেই স্বাধীনতাকে, আমাদের পায়ের কাছে ঝুঁকে পড়ে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে । যাই হোক , সেটাই আমরা করেছি। তুমি কি সেই জন্যই কষ্ট করেছিলে ? এটা কি সেই ধরনের “মুক্তি” যার প্রতিশ্রুতি তুমি তাদের দিয়েছ?” 

 “এখন, আরেকবার, তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি না,” অ্যালিয়োশা বাধা দিয়ে বলল। “বুড়ো কি উপহাস করছিল এবং হাসছিল?”

“একেবারেই নয়। উনি এটাকে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছিলেন, উনি মনে করেন যেন নিজে অনন্যসাধারণ মানবসেবা করেছেন, ওনার যাজকভাইরা এবং জেসুইটরা, , লোকেদের স্বাধীনতাকে জয় করে এবং নিজেদের কর্তৃত্বের অধীনে নিয়ে এসে,  একটি মহান কাজ করেছেন, এবং গর্বভরে মনে করেন যে তা করা হয়েছে বিশ্বের মঙ্গলের জন্য । … ‘এবার এখন’, উনি বলেন ( ইনকুইজিশন সম্পর্কে ), ‘আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে, প্রথমবার, মানবজাতিকে খুশি করার বিষয়ে ঐকান্তিক চিন্তা করার । মানুষ জন্মায় দ্রোহী হয়ে, আর দ্রোহীরা কি কখনও সুখী হতে পারে ?…তোমাকে এ ব্যাপারে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু দেখা যাচ্ছে তা কোনও কাজে লাগেনি, কেননা তুমি মানবজাতিকে খুশি করতে পারে এমন একটিমাত্র উপায়কে প্রত্যাখ্যান করেছো; সৌভাগ্যবশত তোমার যাবার সময়ে তুমি আমাদের দায়িত্বে কাজটি দিয়ে গেছো …. তুমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে,  নিজের উক্তির অঙ্গীকারের মাধ্যমে,  আমাদের বন্ধন ও মোচনের অধিকার দিচ্ছো … এবং নিঃসন্দেহে, এখন তুমি  আমাদের তা থেকে বঞ্চিত করার কথা ভাবতে পারো না ! “

 “কিন্তু ‘তোমাকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছিল’’ কথাগুলো বলতে উনি কী বোঝাতে চাইছেন ?” জানতে চাইল অ্যালেক্সিস ।

“এই কথাগুলো বুড়োটাকে তার কথার ন্যায্যতার চাবিকাঠি ধরিয়ে দেয় … কিন্তু শোনো—

“‘ভয়ঙ্কর এবং জ্ঞানী আত্মা, আত্ম-বিনাশকারী এবং অ-সত্তার আত্মা,’ বলা বজায় রাখে ইনকুইজিটর, ‘অস্বীকৃতির মহান আত্মা তোমার সাথে বিজনপ্রদেশে কথাবার্তা বলেছিল, এবং আমাদের বলা হয়েছে যে সে তোমাকে” প্রলুব্ধ করেছিল “… এটা কি সত্যি ঘটনা ? আর যদি সত্যিই তাই হয়ে থাকে, তাহলে সেই  তিনটি প্রলোভনে যা ছিল, যেগুলো তুমি প্রত্যাখ্যান করেছিলে, এবং যেগুলোকে বলা হয় ‘’প্রলোভন’’, তার চেয়ে আলাদা একটিও উক্তি করা চলে না । হ্যাঁ ; পৃথিবীতে যদি কোনও সত্যিকার অবাককরা অলৌকিক ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে তা সেই দিনকার তোমার তিনটি প্রলোভন আর মূলতঃ এই তিনটি ছোটো বাক্যে রয়েছে অনন্যসাধারণ অলৌকিকতা । যদি সম্ভব হতো যে ওগুলো চিরকালের জন্য উবে গিয়ে লোপাট হয়ে যাক, কোনও রেশ না রেখে, রেকর্ড থেকে এবং মানুষের স্মৃতি থেকে, এবং তা তোমার ইতিহাসে আরেকবার জরুরি হয়ে উঠতো উদ্ভাবন করার, আবিষ্কারের,  তুমি কি মনে করো যে বিশ্বের সমস্ত ঋষি,  বিধায়ক, দীক্ষাদাতা, দার্শনিক এবং চিন্তাবিদ প্রমুখদের ডেকে যদি বলা হতো এইরকম তিনটি প্রশ্ন তৈরি করতে, ঘটনার বিশালত্বের পরিপ্রেক্ষিতে,  যেগুলো  তিনটি ছোটো বাক্যে আমাদের জগতের ভবিষ্যতের সমগ্র ইতিহাস ও মানবতাকে– তুমি কি বিশ্বাস করো, আমি জিগ্যেস করছি তোমাকে,  শক্তিশালী এবং সর্বজ্ঞ বুদ্ধির আত্মার দ্বারা বিজনপ্রদেশে তোমাকে দেওয়া তিনটি প্রস্তাবের শক্তি এবং চিন্তার গভীরতা তাঁদের সমস্ত সম্মিলিত প্রচেষ্টা কখনও অমন কিছু তৈরি করতে পারতো ? শুধুমাত্র তাদের বিস্ময়কর যোগ্যতার মাপকাঠিতে  বিচার করে, যে কেউ  বুঝতে পারে যে তারা একটি সসীম, পার্থিব বুদ্ধি থেকে উদ্ভূত হয়নি, বরং প্রকৃতপক্ষে, চিরন্তন এবং পরম-শাশ্বত  থেকে হয়েছে। এই তিনটি প্রস্তাবে আমরা যা  খুঁজে পাই, তারা একটিমাত্র হয়ে গিয়ে আমাদের  ভবিষ্যদ্বাণী শুনিয়েছে, মানুষের সম্পূর্ণ পরবর্তী ইতিহাস ; বলতে গেলে, আমাদের তিনটি চিত্রকল্প দেখানো হয়েছে,  তাদের মধ্যে ভবিষ্যতের সমস্ত স্বতঃস্ফূর্ত, অদ্রবণীয় সমস্যা এবং বিশ্বজুড়ে মানবপ্রকৃতির পরস্পরবিরোধিতা তুলে ধরা  হয়েছে। সেই কালখণ্ডে, তাদের অন্তর্গত বিস্ময়কর প্রজ্ঞা এতটা সহজবোধ্য ছিল না, যা এখন মনে হয় , কেননা  ভবিষ্যত ব্যাপারটা তখন ছিল আবরণের আড়ালে ঢাকা ; কিন্তু এখন, যখন পনেরো শতাব্দী পেরিয়ে গেছে, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে এই তিনটি প্রশ্নে সবকিছুরই এত বিস্ময়করভাবে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, যে তাতে বাড়তি কিছু যোগ করা বা তা থেকে বাদ দেওয়া একেবারে অসম্ভব ! “‘তাহলে নিজেই সিদ্ধান্ত নাও,’’ ইনকুইজিটর কঠোরভাবে এগিয়ে গেলো, ‘ দুজনের মধ্যে কোনজন সঠিক ছিলেন: যিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, নাকি যিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন? প্রথম প্রশ্নটির সূক্ষ্ম অর্থটি মনে রেখো, যা এইকথা বলে: তুমি কি খালি হাতে পৃথিবীতে যাবে ? তুমি কি সেখানে মুক্তি সম্পর্কিত তোমার অস্পষ্ট এবং অনির্ধারিত প্রতিশ্রুতিসহ যেতে চাও, যা মানুষেরা, যারা প্রকৃতিগতভাবে নিস্তেজ এবং বেয়াড়া, যারা বুঝতে এতোই অক্ষম, যে তারা ভয়ে এড়িয়ে যায় ? কেননা মানবজাতির কাছে ব্যক্তি-স্বাধীনতার চেয়ে অসহ্য আর কিছু ছিল না । তুমি কি এই পাথরগুলোকে নির্জন এবং উজ্জ্বল বিজনপ্রদেশে দেখেছো ? এই পাথরগুলোকে রুটি বানানোর নির্দেশ দাও — মানবজাতি তাহলে তোমার পেছনে ছুটবে, এক পাল গবাদি পশুর মতন বিনয়ী ও কৃতজ্ঞ হয়ে । কিন্তু এতোকিছু সত্বেও তা হবে সর্বদা ভিন্ন আর কাঁপুনি দেবে, পাছে তুমি নিজের হাত সরিয়ে নাও এবং তারা তাদের রুটি হারায় ! মানুষকে তাদের স্বাধীন ইচ্ছের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ভয়ে তুমি প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলে; কেননা বেছে নেবার স্বাধীনতা  কোথায়ই বা থাকে যদি মানুষকে  রুটির ঘুষ দেওয়া হয়? মানুষের জীবন শুধু রুটি খেয়ে বেঁচে থাকার নয় — তুমিই তা বলেছিলে । তুমি জানো না, সম্ভবত , ঠিক সেই পার্থিব রুটির নামেই একদিন জাগতিক আত্মা  জেগে উঠবে, সংগ্রাম করবে এবং অবশেষে তোমাকে বশীভূত করবে, তার পরে ক্ষুধার্ত জনতা চিৎকার করে বলবে : “কে সেই পশু  , যে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আগুন নামিয়ে এনেছিল ! ” তুমি কি তা জানো না, কিন্তু কয়েক শতাব্দী পরে, এবং সমগ্র মানবজাতি তার প্রজ্ঞার জোরে এবং তার মুখপত্র ও বিজ্ঞানের মাধ্যমে ঘোষণা করবে, যে, জগতে আর কোনও অপরাধ ঘটে না, তাই পৃথিবীতে আর কোনও পাপ নেই, তাহলে কেবল ক্ষুধার্ত মানুষ থাকবে ? ” আগে আমাদের খেতে দাও আর তারপর আমাদের সৎ হতে বলো !” তোমার বিরুদ্ধে তোলা পতাকায় এই কথাগুলো লেখা থাকবে — এমন একটি পতাকা যা তোমার গির্জাকে তার ভিত্তি পর্যন্ত ধ্বংস করে দেবে এবং তোমার বিগ্রহের জায়গায় আরও একবার বাবেলের ভয়ঙ্কর মিনার উঠে দাঁড়াবে ; আর যদিও ভবনটি  অসম্পূর্ণ রেখে দেওয়া হবে, প্রথমটির মতন, তবুও এই তথ্য খোদাই করা থাকবে যে তুমি প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে পারতে, কিন্তু করোনি, তা হলো এই যে সেই নতুন মিনার নির্মাণের প্রচেষ্টা রোধ তুমি করোনি এবং এইভাবে মানবজাতিকে হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে অনর্থক কষ্ট থেকে রক্ষা করোনি । এবং জনগণ আবার আমাদের কাছেই ফিরে আসবে। তারা আমাদের খুঁজে বেড়াবে ভূগর্ভস্হ সমাধিতে, কারণ আমরা আরও একবার নির্যাতিত ও শহীদ হব — এবং তারা আমাদের কাছে এসে কাঁদতে থাকবে : “আমাদের খেতে দিন, কারণ যারা আমাদের স্বর্গ থেকে আগুন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা আমাদের ঠকিয়েছে !” তখনই আমরা তাদের জন্য তাদের মিনার নির্মাণ শেষ করব। কারণ যারা একা তাদের খাওয়াবে তারাই মিনারটা সম্পূর্ণ করবে, আর আমরা তাদের তোমার নামে খাবার খাওয়াব এবং তাদের কাছে মিথ্যা বলব যে এটি তোমার নামে করা হচ্ছে । ওহ,  আমাদের সাহায্য ছাড়া তারা কখনই, কখনই, নিজেদের খাওয়াতে শিখবে না ! যতক্ষণ তারা মুক্ত থাকবে ততক্ষণ কোনও বিজ্ঞান তাদের রুটি দেবে না, যতদিন তারা মুক্ত থাকবে, যতোদিন না তারা সেই মুক্তিবোধকে আমাদের পায়ের কাছে রেখে বলবে: “আমাদের দাস করে তুলুন, কিন্তু আমাদের খেতে দিন !” সেই দিনটি অবশ্যই আসবে যখন মানুষ বুঝতে পারবে যে মানবমুক্তি এবং সকলের সন্তুষ্টির জন্য  দৈনন্দিন রুটির যোগান দেওয়া একই সঙ্গে অচিন্তনীয় , কেননা মানুষ কখনই নিজেদের মধ্যে ওই দুটো ব্যাপারকে সমানভাবে ভাগ করতে পারবে না। এবং তারা এটাও বুঝতে পারবে যে তারা কখনই মুক্ত হতে পারে না, কারণ তারা দুর্বল, দুষ্ট, দুঃখভোগী এবং জন্মগতভাবে বজ্জাত এবং দ্রোহী। তুমি তাদের জীবনের রুটি দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছ , স্বর্গের রুটি; কিন্তু আমি তোমাকে আবার জিজ্ঞাসা করছি, সেই রুটি কি কখনও দুর্বল ও দুষ্ট, চির-অকৃতজ্ঞ মানবজাতির কাছে, পৃথিবীতে তাদের প্রতিদিনের রুটির সমান হতে পারে? এবং এমনকি ধরে নিচ্ছি যে হাজার হাজার এবং লক্ষ-লক্ষ মানুষ তোমাকে অনুসরণ করে, তোমার স্বর্গীয় রুটি পাবার জন্য, তাহলে কোটি কোটি মানুষের কী হবে যারা জাগতিক রুটিকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য দুর্বলচিত্ত, তারা তোমার  স্বর্গীয় রুটি নিয়ে কী করবে ? অথবা এটা কি তবে হাজার হাজার বীর এবং পরাক্রমশালীদের মধ্যে নির্বাচিত লোকজন, যারা তোমার কাছে খুব প্রিয়, যখন কি না বাকি লক্ষ লক্ষ, সমুদ্রের বালির দানার মতন অসংখ্য, দুর্বল এবং স্নেহময়, তাদের মাল হিসেবে ব্যবহার করতে হবে ওই লোকদের জন্য? না না ! আমাদের দৃষ্টিতে এবং আমাদের কাজের উদ্দেশ্যে দুর্বল এবং নিম্নবর্গের মানুষ আমাদের কাছে বেশি প্রিয়। একথা সত্য যে তারা দুষ্ট এবং দ্রোহী, কিন্তু আমরা তাদের অনুগত হতে বাধ্য করব, এবং তারাই আমাদের সবচেয়ে বেশি গুণগান করবে। তারা আমাদের দেবতা হিসেবে গণ্য করবে এবং সেই সব লোকেদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে যারা  শাসনের মাধ্যমে জনসাধারণকে নেতৃত্ব দিতে সম্মত হয়েছে  আর তাদের স্বাধীনতার বোঝা বইছে — শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে সেই মুক্তি কি ভয়ঙ্করই না হবে ! তারপর আমরা তাদের বলব যে এটা তোমার ইচ্ছার প্রতি আনুগত্য এবং তোমার নামে আমরা তাদের উপর শাসন করছি । আমরা তাদের আরও একবার ঠকাবো এবং তাদের  মিথ্যাকথা বলব – কেননা আর কখনও, আমরা তোমাকে আর আমাদের মাঝে আসতে দেব না। এই প্রতারণার মধ্যে আমরা নিজেদের যন্ত্রণা খুঁজে পাব, কারণ আমাদের অনন্তকাল মিথ্যাকথা বলতে হবে, এবং কখনও মিথ্যাকথা বলা বন্ধ করা চলবে না ! “প্রথম” প্রলোভন “এর গোপন মর্ম এটাই, এবং তুমি  স্বাধীনতার স্বার্থে বিজনপ্রান্তরে সেটিকে  প্রত্যাখ্যান করেছিলে যেটিকে তুমি সর্বোত্তম মনে করেছিলে । এদিকে তোমাকে যিনি লোভ দেখাচ্ছিলেন, তাঁর প্রস্তাবটিতে আরও একটি ঘোর বিশ্ব-রহস্য আছে।”রুটিকে” গ্রহণ করলে,  তুমি সন্তুষ্ট করতে পারতে এবং একটি সর্বজনীন আকাঙ্ক্ষার উত্তর দিতে পারতে, যা রয়েছে প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে  নিরন্তর আকাঙ্ক্ষা হিসেবে, ঘাপটি মেরে আছে মানব-সমষ্টির বুকে লুকিয়ে , সেই সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর সমস্যা — “কাকে বা কী আমরা  পুজো করব?” পুজো করার জন্য তাড়াতাড়ি  একটা নতুন বস্তু বা ধারণা খুঁজে পাবার তুলনায়  যে ব্যক্তি সব ধর্মীয় পক্ষপাত থেকে নিজেকে  মুক্ত করেছে তার জন্য এর চেয়ে বড় বা বেশি বেদনাদায়ক উদ্বেগ আর নেই । কিন্তু মানুষ তাঁরই সামনে নতজানু হতে চায়, যে কেবলমাত্র বৃহত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠের দ্বারা স্বীকৃত ,  তার সমস্ত সহগামীদের দ্বারা যদি নাও হয়, পূজিত হবার অধিকার তার আছে ; তার অধিকার এতই প্রশ্নাতীত যে, মানুষ সর্বসম্মতভাবে তার কাছে মাথা নোয়াতে রাজি হয় । এই দুঃখী প্রাণীদের প্রধান উদ্বেগের কারণ তাদের নিজের পছন্দের মূর্তি খুঁজে তাকে পুজো করা নয়, বরং অন্যরা যাতে বিশ্বাস করবে তা আবিষ্কার করা, আর সমবেত হয়ে  মাথা নত করার সম্মতি দেওয়া। এটা প্রতিটি মানুষের এমন এক প্রবৃত্তি যা সবাই মিলে একসঙ্গে করে, আর সেটাই প্রত্যেক মানুষের প্রধান যন্ত্রণা, যা সময়ের আরম্ভ থেকে মানবজাতির প্রধান উদ্বেগ হয়ে রয়েছে। ধর্মীয় উপাসনার সেই সর্বজনীনতার জন্যই মানুষ একে অপরকে তলোয়ার দিয়ে ধ্বংস করেছে । নিজেদের জন্য দেবতা গড়ে নিয়ে , তারা একে অপরের কাছে আবেদন করতে শুরু করেছিল : “আপনার দেবতাদের পরিত্যাগ করুন, আসুন এবং আমাদের দেবতাকে  প্রণাম করুন, নয়তো আপনাদের সবায়ের এবং আপনাদের মূর্তির মৃত্যু অবধারিত !” এবং  এই পৃথিবী ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত  তারা তা করে যাবে ;  যখন সমস্ত দেবতা নিজেরাই অদৃশ্য হয়ে যাবে, তখনও তারা তা চালিয়ে যাবে, তারপর মানুষ কোনও ধারণার সামনে নতজানু হয়ে তার পুজো করবে। তুমি তো জানতে, তুমি মানব প্রকৃতির সেই রহস্যময় মৌলিক গুণ সম্পর্কে মোটেই অজ্ঞ নও, এবং তবুও তুমি তোমাকে দেওয়া  পরম পতাকাটি প্রত্যাখ্যান করলে, যার প্রতি সমস্ত জাতি সমর্পিত থাকবে এবং যার সামনে সকলেই মাথা নোয়াবে—  পার্থিব রুটির পতাকা, মুক্তির নামে প্রত্যাখ্যাত এবং “ঈশ্বরের রাজ্যে রুটি” পাবার প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন ! , তাহলে দেখো, সেই “মুক্তির” জন্য তুমি আরও কী করেছো ! আমি তোমাকে আবার বলছি, মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় কোনও উদ্বেগ নেই যে সে এমন কাউকে খুঁজে পাক যাকে সে নিজের স্বাধীনতা উপহার দিয়ে দেবে, যা নিয়ে ওই দুর্ভাগা প্রাণীদের জন্ম হয়। কিন্তু সেই একজন লোকই তাদের মুখ বন্ধ করে দিতে পারে আর তাদের বিবেককে নীরব ও শান্ত করার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে, যে বাদবাকি সমস্ত মানুষের স্বাধীনতার মালিক হবে। “দৈনন্দিন রুটি” দিয়ে তোমাকে একটি অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা উপহার  দেওয়া হয়েছিল : একজন মানুষকে “রুটি” দেখাও আর সে তোমাকে অনুসরণ করবে, কেননা  রুটির  আকর্ষণের চেয়ে আর কীই বা চাহিদা তার থাকতে পারে ? কিন্তু যদি, একই সাথে, অন্য একজন তার বিবেকের মালিক হতে সফল হয় — ওহ ! তাহলে তোমার রুটির কথাও ভুলে যাবে, আর মানুষ সেই লোকটাকে  অনুসরণ করবে যে তার বিবেককে প্রলুব্ধ করেছে। এ-পর্যন্ত তুমি ঠিকই ছিলে । কেননা মানুষের রহস্য কেবল তার বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার মধ্যেই সীমিত নয়, বরং সমস্যায়— কীসের জন্য আদৌ বেঁচে থাকা উচিত, এই বোধে ? তার বেঁচে থাকার কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে, মানুষ কখনও বেঁচে থাকতে রাজি হবে না, এবং পৃথিবীতে টিকে থাকার বদলে বরং নিজেকে ধ্বংস করে ফেলবে, যদিও তাকে চারিপাশে রুটি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। এটাই সত্য । কিন্তু কী ঘটেছে ? মানুষের স্বাধীনতাকে কব্জা করার বদলে, তুমি তাকে আরও বিশাল করে তুলেছো ! তুমি কি আবার ভুলে গেছো যে, মানুষের কাছে শুভ এবং অশুভ সম্পর্কে জ্ঞানের তুলনায় আরাম, এমনকি মৃত্যুও,  গ্রহণযোগ্য ? বিবেকের স্বাধীনতার চেয়ে কিছুই তার চোখে বেশি প্রলোভনযুক্ত বলে মনে হয় না, এবং তার চেয়ে কিছুই বেশি বেদনাদায়ক নয় । আর দেখো ! সমস্ত মানুষের  বিবেকের চিরকালীন দৃঢ় বনেদ গড়ার বদলে, তুমি তাদের আলোড়িত করতে বেছে নিয়েছো তাদের ভেতরকার অস্বাভাবিক, রহস্যময় এবং অনির্দিষ্ট, যা-কিছু মানুষের ক্ষমতার বাইরে, আর এমনভাবে তা করেছো যেন কোনোকালে তোমার প্রতি তাদের ভক্তি ছিল না,  এবং তবুও তুমি নাকি “ঈশ্বরপুত্র যিনি তার বন্ধুদের জন্য তাঁর জীবন দিতে!” আবির্ভূত হয়েছো ।  মানুষের কাছে যে উদ্বেগ  অজানা ছিল তাই দিয়ে তাদের আত্মাকে বোঝাই  করে দিয়েছো। অবাধে দেওয়া মানুষের ভালবাসার জন্য তৃষ্ণার্ত, মানুষকে প্রলুব্ধ করে এবং তোমার দ্বারা মোহিত ও বশীভূত করে, যাতে তারা তোমার দেখানো পথ অনুসরণ করে, সেই পুরানো এবং দূরদর্শী নিয়মের বদলে, তাদের হৃদয়ে তোমার প্রতিচ্ছবির পথনির্দেশে, তুমি তাদের স্বেচ্ছায় শুভ ও অশুভ বেছে নেবার  অধিকার দিয়েছো। কিন্তু তুমি  কখনো স্বপ্নেও তেমন সম্ভাবনার কথা ভাবোনি, না, সেই নিশ্চয়তার, যে, সেই একই মানুষেরা একদিন  তোমার মূর্তি আর তোমার সত্যকেও পালটে দেবে, একথা জানার পর যে, তাদের ওপর স্বাধীনতা বেছে নেবার মতো ভয়ঙ্কর বোঝা চাপিয়ে ভারাক্রান্ত করা হয়েছে ? একটা সময় নিশ্চয় আসবে যখন মানুষ বলে উঠবে যে সত্য এবং আলো তোমার মধ্যে থাকতে পারে না, কেননা  কর্মকাণ্ড এবং অসাধ্য সমস্যার বোঝা চাপিয়ে তোমার চেয়ে তাদের অমন বিভ্রান্তি আর মানসিক যন্ত্রণায় আর কেউ  ফেলে যেতে পারত না । সুতরাং, তুমি নিজের রাজ্যের ধ্বংসের ভিত্তি স্থাপন করেছো এবং এর জন্য তুমি ছাড়া আর কেউ দায়ী নয়। “ইতিমধ্যে, সাফল্যের সমস্ত সুযোগ তোমাকে দেয়া হয়েছিল ।” পৃথিবীতে তিনটি ক্ষমতাশক্তি আছে, এই দুর্বল বিদ্রোহীদের বিবেককে ফুসলিয়ে চিরকালের জন্য বিজয় পাবার — মানুষকে — তাদের নিজেদের ভালোর জন্য ; এবং এই ক্ষমতাশক্তি হল: অলৌকিকতা, রহস্য এবং কর্তৃত্ব। তুমি তিনটিকেই প্রত্যাখ্যান করেছো । আর তুমিই প্রথম উদাহরণ স্হাপন করলে । যখন মহান ও  জ্ঞানী আত্মা তোমাকে মন্দিরের  চূড়ায় বসিয়েছিল এবং তোমাকে বলেছিল, “আপনি যদি ঈশ্বরের পুত্র হন, তাহলে নিজেকে নামিয়ে আনুন, কারণ এটি ইতিমধ্যে লিখিত যে, ঈশ্বর আপনার দেবদূতদের আপনার  দায়িত্ব দেবেন : এবং  তারা হাতে করে তুলে ধরে আপনাকে বয়ে নিয়ে যাবে, যাতে না আপনি পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ে যান ।”  এইভাবে তোমার পিতার প্রতি  বিশ্বাস স্পষ্ট  হতো, কিন্তু তুমি তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতে অস্বীকার করলে এবং তাকে মান্যতা দিলে না । ওহ, নিঃসন্দেহে, তুমি এই সমস্ত অভাবনীয় ব্যাপার সম্পর্কে গর্বের সাথে একজন ভগবানের মতন আচরণ  করেছিলে, কিন্তু তারপর মানুষর –সেই দুর্বল আর দ্রোহী জাতি — তারাও কি ভগবান, যে তোমার প্রত্যাখ্যান বুঝতে পারেনি ? অবশ্যই, তুমি ভালভাবেই জানতে যে, এক ধাপ এগিয়ে গেলে, নিজেকে নামিয়ে আনার সামান্যতম প্রয়াস করলে, তুমি “নিজের প্রভু নিজের ঈশ্বরকে” প্রলুব্ধ করতে, হঠাৎ তার প্রতি অবাধ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে, এবং নিজেকে পৃথিবীর ধুলোর পরমাণুতে পালটে ফেলতে, সেই একই পৃথিবী, যাকে তুমি বাঁচাতে এসেছিলে, এবং এইভাবে সেই জ্ঞানী আত্মাকে অনুমতি দিতে যে তোমাকে জয়ী ও আনন্দিত করতে প্রলুব্ধ করেছিল। যাই হোক, তাহলে, এই পৃথিবীতে তোমার মতো কতজনকে পাওয়া যাবে, আমি তোমার কাছে জানতে চাইছি ? তুমি কি কখনও এক মুহূর্তের জন্যও ভেবে দেখেছো যে মানুষেরও অমন প্রলোভন প্রতিরোধ করার শক্তি আছে ? জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মুহুর্তে, যখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বেদনাদায়ক এবং বিভ্রান্তিকর সমস্যাগুলি মানুষের আত্মার মধ্যে লড়াই করে, সত্যিকারের সমাধানের জন্য তার হৃদয়ের মুক্ত সিদ্ধান্তের জন্য অলৌকিকতা এবং বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করার মতন  মানুষের প্রকৃতি কি গড়া হয়েছে ? ওহ, তুমি ভাল করেই জানো যে তোমার সেই কর্মকাণ্ড যুগ যুগ ধরে বইতে লিখে রাখা থাকবে, পৃথিবীর শেষ সীমায় তা পৌঁছে যাবে, আর তোমার আশা ছিল যে, তোমার পদাঙ্ক অনুসরণ করে, মানুষ তার ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে, কোনও রকম অলৌকিকতা  ছাড়াই তার বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখবে ! কিন্তু তুমি জানতে না, মনে হয়,  মানুষ যত তাড়াতাড়ি অলৌকিকতাকে প্রত্যাখ্যান করবে ঠিক ততো তাড়াতাড়িই ঈশ্বরকে প্রত্যাখ্যান করবে , কেননা মানুষ ঈশ্বরকে ততোটা চায় না, যতোটা তাঁর কাছে তাঁরই “একটি প্রতীক” মানুষ চায় । এবং এইভাবে, যেমন অলৌকিক ঘটনা ছাড়া  মানুষ থাকতে পারে না, তাই, অলৌকিকতা ছাড়া বেঁচে থাকার বদলে, সে নিজের জন্য  নিজেই  নতুন বিস্ময় তৈরি করবে ; এবং সে একজন দ্রোহী, একজন বিদ্বেষী, এবং একশো বার নাস্তিক হয়ে,  গণৎকারের হাতসাফাই, বুড়ি ডাইনির জাদুর কাছে মাথা নত করবে এবং পুজো করবে। যখন মানুষ ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে এবং মাথা নাড়িয়ে তোমাকে বলছিল—“তুমি যদি নিজেকে ঈশ্বরের পুত্র মনে করো, তাহলে নিজেকে বাঁচাও, আর আমরা তাহলে তোমাকে বিশ্বাস করবো,” তখন ক্রুশকাঠ থেকে নামতে তোমার অস্বীকৃতি, সেই একই দৃঢ় সঙ্কল্পের কারণে—- অলৌকিকতার মাধ্যমে মানুষকে দাসানুদাস করতে অস্বীকার করেছিলে, অথচ তোমার প্রতি বিশ্বাস অর্জন করেছো কোনও রকম জাদুকরি প্রভাব ছাড়াই । তুমি মুক্তমনা এবং অপ্রভাবিত  প্রেমের জন্য আকুল ছিলে, এবং দাসদের আবেগপ্রবণ শ্রদ্ধা প্রত্যাখ্যান করেছিলে  যাতে তাদের ইচ্ছাবোধ একটি ক্ষমতাশক্তির কাছে চিরকালের জন্য  অধীন হয়ে যায় । তুমি মানুষকে উঁচুতে বসিয়ে বিচার করো, অথচ,  তারা দ্রোহীও , তারা জন্মগত দাস এবং তার বেশি কিছু নয়। ভাবো, আরেকবার তাদের বিচার করো, আজ যখন  সেই মুহুর্ত থেকে পনেরো শতক কেটে গেছে। তাদের দিকে তাকাও, যাদের তুমি নিজের স্তরে উন্নীত করার চেষ্টা করেছিলে ! আমি শপথ করে বলতে পারি যে  মানুষ তোমার চেয়ে দুর্বল আর নিচুস্তরের  যা তুমি কখনও  কল্পনা করোনো । তুমি যা আশা করেছিলে তা কি পেয়েছো ? তাকে এত দামি  করে তুলে এমন আচরণ করেছো যেন তোমার হৃদয়ে তাদের জন্য কোনও ভালবাসা নেই, কারণ মানুষ তা দিতে না পারলেও তুমি তার কাছ থেকে বেশি কিছু চেয়েছো — হ্যাঁ তুমি , যে কিনা মানুষকে নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসে ! তুমি যদি মানুষকে কম সম্মান করতে, তাহলে তুমি তার কাছে কম দাবি করতে, এবং এটি ভালবাসার মতোই হত, কারণ তার বোঝা হালকা করা হত। মানুষ দুর্বল এবং কাপুরুষ।  ব্যাপারটা কেমন হবে, যদি সে এখন আমাদের ইচ্ছা ও শক্তির বিরুদ্ধে সারা বিশ্বে দাঙ্গা এবং দ্রোহ বাধায়, এবং সেই দ্রোহের কারণে গর্ববোধ করে? এটি একটি স্কুল-বালকের ক্ষুদ্র অহংকার এবং অসার । এটা ছোট বাচ্চাদের তাণ্ডব, যেন ক্লাসে বিদ্রোহ করা আর  শিক্ষককে বাইরে বের করে দেওয়া। কিন্তু এটা দীর্ঘস্থায়ী হবে না, এবং যখন তাদের বিজয়ের দিন শেষ হবে, তখন তাদের এর জন্য বড়ো দাম চোকাতে হবে । তারা মন্দির ধ্বংস করবে এবং গুঁড়িয়ে দেবে, পৃথিবীকে রক্তে প্লাবিত করবে। কিন্তু নির্বোধ শিশুদের মতন একদিন শিখতে পারবে যে, তারা দ্রোহী আর প্রবৃত্তিগত কারণে বিদ্রোহী হলেও, তারা দীর্ঘ  সময় বিদ্রোহের মনোভাব বজায় রাখার পক্ষে খুব দুর্বল। মূর্খের কান্নায় ভুগে তারা স্বীকার করবে যে, যিনি তাদের বিদ্রোহী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, তিনি নিঃসন্দেহে  তাদের ব্যঙ্গ করার জন্য তা করেছেন। তারা হতাশ হয়ে  কথাগুলো ঘোষণা করবে, এবং এই ধরনের নিন্দনীয় উক্তি তাদের দুঃখ-কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দেবে — কারণ মানুষের স্বভাব নিন্দা সহ্য করতে পারে না, এবং শেষ পর্যন্ত  প্রতিশোধ নেয়। “আর এইভাবে,  মানবজাতি এবং তার মুক্তির জন্য তোমার ভোগান্তির পরেও, মানুষের বর্তমান অবস্হাকে তিনটি সারশব্দে বলা যেতে পারে: অশান্তি, বিভ্রান্তি, দুর্দশা ! তোমার মহান ভবিষ্যবক্তা সন্তজন তার দিব্যদৃষ্টি নথিভূক্ত করে গেছে যে  সে দেখেছিলো —ঈশ্বরের নির্বাচিত সেবকদের প্রথম পুনরুত্থানের সময়ে — তাদের কপালে “তাদের যে সংখ্যাচিহ্ণ খোদাই করা ছিল”, তা প্রতিটি গোত্রের “বারো হাজার” লোকের । কিন্তু সত্যিই কি তারা এতোজন ? সেক্ষেত্রে তারা মানুষ নয়, তারা দেবতা । সুদীর্ঘ বছর তারা তোমার ক্রুশকাঠ বয়েছিল , বছরের পর বছর ধরে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত দেহে, ভয়াবহ বিজনপ্রান্তর এবং মরুভূমিতে, পঙ্গপাল এবং শেকড় খেয়ে—-এবং তোমার প্রতি অবাধ ভালোবাসার এই শিশুর দল,  এবং তোমার নামে আত্মত্যাগকারী, তুমি তো নিশ্চয়ই গর্ব  অনুভব করেছিলে, না কি ? কিন্তু মনে রেখো, এরা মাত্র কয়েক হাজার— দেবতাই, মানুষ নয়; এবং বাদবাকিরা ? আর শক্তিমানরা  যা সহ্য করতে পেরেছে তা দুর্বলরা সহ্য করতে পারছে না বলে কেন তার জন্য দুর্বলকে দোষী সাব্যস্ত করা হবে ? কেন এমন ভয়ঙ্কর ক্ষমতা ধারণ করতে অক্ষম এক আত্মাকে তার দুর্বলতার জন্য শাস্তি দেওয়া হবে ? তুমি কি সত্যিই  একা এসেছিলে, যারা “নির্বাচিত”, তাদের জন্য ? যদি তাই হয়, তাহলে  আমাদের সীমাবদ্ধ মনে রহস্যখানা  চির-রহস্যময় থেকে যাবে। এবং যদি তা রহস্যই হয়, তাহলে কি আমরা একে সেই হিসাবে ঘোষণা  এবং প্রচার করে ঠিক কাজ করেছিলুম, তাদের শিক্ষা দিয়েছিলুম যে, তোমাকে দেওয়া তাদের  অপরিসীম ভালোবাসা  বা বিবেকের স্বাধীনতা যা-ই হোক,  তা মোটেই জরুরি নয়, বরং কেবল সেই অজ্ঞাত রহস্য, যা তাদের অন্ধভাবে মেনে চলতে হবে, এমনকি তা  তাদের বিবেকের বিরুদ্ধে হলেও তাকে মেনে চলতে হবে  । আমরা সেটাই শিখিয়েছি। আমরা তোমার শিক্ষাকে সংশোধন করে উন্নত করেছি এবং তাকে “অলৌকিকতা, রহস্য এবং কর্তৃত্ব”-র উপর ভিত্তি করে তৈরি করেছি। আর মানুষ আরেকবার গোরুর পালের মতন নিজেদের জন্য হুকুম পেয়ে তা তামিল করতে উল্লসিত বোধ করেছে, এবং  শেষ পর্যন্ত তোমার চাপানো  ভয়াবহ বোঝা থেকে নিজেদের হৃদয়কে মুক্ত করতে পেরেছে, যা তাদের কষ্টের কারণ হয়ে গিয়েছিল। আমাকে বলো তো , আমরা কি ঠিক কাজ করিনি ?  আমরা কি মানবতার প্রতি আমাদের মহৎ ভালোবাসা দেখাইনি, তাদের নম্র চেতনার  অসহায়তাকে অনুধাবন করে, দয়াশীলতায় তাদের ভারি  বোঝা হালকা করে, এবং তার দুর্বল স্বভাবের জন্য প্রতিটি পাপের অনুমতি প্রদান করে এবং ক্ষমাশীল হয়ে আমরা কি তাদের মঙ্গল করিনি , যদি তারা তা  আমাদের অনুমোদন অনুযায়ী করে থাকে ? তাহলে, কেন তুমি  আবার আমাদের কাজে বাগড়া দিতে এসেছো? আর  কেনই বা তুমি  আমার দিকে এত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নম্র চোখে তাকিয়ে আছো, আর এমন চুপচাপ ? বরং তোমার তো ক্রুদ্ধ হওয়া  উচিত, কারণ আমি তোমার ভালোবাসা চাই না , আমি তা প্রত্যাখ্যান করছি, আর আমি তোমাকে নয়, নিজেকে ভালোবাসি । আমি কেন তোমার কাছে সত্য গোপন করব? আমি বেশ ভালোভাবেই জানি  কার সাথে আমি এখন কথা বলছি ! আমার যা বলবার ছিল তা তুমি আগে থেকে জানতে , আমি তা তোমার চোখের ভাষা থেকে বুঝতে পেরেছি । আমি কেনই বা তোমার কাছ থেকে আমাদের রহস্য গোপন করব? তুমি যদি  আমার  মুখ থেকে শুনতে চাও, তাহলে শোনো :  তুমি  ঈশ্বরপুত্র হলেও তোমার  সঙ্গে আমরা নেই, বরং ওনার সঙ্গে আছি, আর সেটাই আমাদের গোপন রহস্য ! বহু শতাব্দী ধরে আমরা তোমাকে পরিত্যাগ করে ওনাকে অনুসরণ  করেছি, হ্যাঁ – আট শতক। আজ থেকে আটশো বছর হলো যখন আমরা তাঁর কাছ থেকে তোমার দ্বারা প্রত্যাখ্যাত  উপহারটি ধিক্কার দিয়ে গ্রহণ করেছি; সেই শেষ উপহার যা উনি তোমাকে  পাহাড়ের চূড়ায় উপহার দিয়েছিলেন, যখন পৃথিবীর সমস্ত রাজ্য এবং তাদের গৌরব দেখিয়ে তিনি তোমাকে বলেছিলেন: “যদি তুমি নিচে নেমে আমার পুজো করো তবে এই সবকিছু আমি তোমাকে দিয়ে দেবো !” আমরা তাঁর কাছ থেকে নিয়েছিলাম রোমসাম্রাজ্য, আর সম্রাট সিজারের তরোয়াল, আর  নিজেদের এই পৃথিবীর  একমাত্র রাজা হিসেবে ঘোষণা করেছিলাম, যদিও আমাদের কাজ এখনও পুরো সম্পন্ন হয়নি। কিন্তু এর জন্য কাকে দোষী করা হবে ? আমাদের কাজ এখন প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, কিন্তু  শুরু তো করা গেছে।  এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হয়তো আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, এবং ততোদিন মানবজাতিকে অনেক কষ্ট পেতে হবে, কিন্তু আমরা একদিন নিশ্চিত লক্ষ্যে পৌঁছব, এবং জগতের একমাত্র কর্তা হবো, এবং তারপর মানুষের সার্বজনীন সুখের কথা ভাববার সময় পাওয়া যাবে। “তুমি নিজে সম্রাট সিজারের তরোয়াল তুলে নিতে পারতে  ; কেন তুমি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলে? শক্তিশালী আত্মার দেয়া তৃতীয় প্রস্তাবটা গ্রহণ করলে তুমি জগতের  প্রতিটি আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারতে, যা মানুষ নিজের জন্য চায় ; মানুষ পুজো করার  জন্য একটা অটল বস্তু খুঁজে পেতো; যা তার বিবেককে উপস্হাপিত করতে পারতো, এবং অপরটি সবাইকে একত্রিত করে  সর্বজনীন এবং সমন্বয়পূর্ণ পিঁপড়ে-পাহাড়ে পরিণত করতে পারতো ; কেননা ভূবনব্যাপী মিলনের জন্য একটি সহজাত প্রয়োজন হলো মানবজাতির জন্য তৃতীয় এবং চূড়ান্ত দুর্বিপাক; যা সমগ্রভাবে মানুষ নিজেদের একত্রিত করার জন্য করেনি ।  অনেক তো ছিল, মহান ইতিহাসের  মহান জাতি, কিন্তু তারা যতো বড়ো ছিল, তারা ততো অসন্তুষ্ট বোধ করেছে, কেননা তারা মানুষের  একটি সার্বজনীন একীকরণের  প্রবল প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। তৈমুর আর চেঙ্গিজ খানের মতো মহান বিজেতারা,  জয় করার প্রচেষ্টায় পৃথিবীর মুখে ঘূর্ণিঝড়ের মতন আছড়ে পড়েছে,  কিন্তু তারাও, হয়তো অসচেতনভাবে,  সর্বজনীন এবং সাধারণ একীকরণের জন্য একই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে। জগতের রাজত্ব এবং সিজারের রাজসিক বেগুনি পোশাক গ্রহণ করে, যে-কেউ সার্বজনীন রাজ্য খুঁজে পেতো, এবং মানবজাতির কাছে অনন্ত শান্তি আনতে পারতো। আর যিনি মানবজাতির বিবেকের অধিকারী হয়েছেন এবং তাদের হাতে মানুষের দৈনন্দিন রুটি দিতে পেরেছেন তাঁর চেয়ে ভালো আর কে-ই বা মানবজাতিকে শাসন করতে পারেন ? সিজারের তরোয়াল এবং বেগুনি পোশাক গ্রহণ করে, আমরা নিঃসন্দেহে, তোমাকে বঞ্চিত করেছি, এখন থেকে তাঁকে একাই তুমি অনুসরণ করবে । ওহ, বহু শতাব্দীর বুদ্ধিবৃত্তিক হাতাহাতি এবং বিদ্রোহের মুক্ত চিন্তাধারা এখনো আমাদের সামনে রয়েছে, এবং তাদের বিজ্ঞান ফুরিয়ে যাবে নরমাংসভক্ষণে,  কেননা আমাদের সাহায্য ছাড়াই  ব্যাবিলনের মিনার গড়া শুরু করার পর, ওদের তা শেষ করতে হবে নরমাংসভক্ষণে । কিন্তু ঠিক সেই সময়েই নৈরাজ্যবাদী দৈত্যটা আমাদের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করবে, আর আমাদের পায়ের তলা চাটবে, এবং তাতে রক্তের অশ্রু ছিটিয়ে দেবে আর আমরা রক্তবর্ণ দৈত্যটার ওপর বসে থাকব, আর  “জঘন্য ও নোংরামিতে পরিপূর্ণ” সোনার পেয়ালাটা উঁচুতে তুলে ধরে দেখাবো যে  তার উপরে  “রহস্য” শব্দটি লেখা রয়েছে ! কিন্তু কেবল তারপরই মানুষ শান্তি ও সুখের রাজ্যের সূচনা দেখতে পাবে। তুমি তোমার নিজের নির্বাচিতদের নিয়ে গর্বিত, কিন্তু এই নির্বাচিতরা ছাড়া তোমার আর কেউ নেই, এবং আমরা – আমরা বাদবাকি সবাইকে বিশ্রাম দেব। কিন্তু সেটাই শেষ নয়। তোমার নির্বাচিতরা এবং তোমার আঙুর ক্ষেতের শ্রমিকদের মধ্যে অনেকেই,  যারা তোমার আরেকবার আসার অপেক্ষায় ক্লান্ত, তারা তাদের হৃদয়ের দুর্দান্ত উদ্দীপনা এবং তাদের আধ্যাত্মিক শক্তিকে ইতিমধ্যে অন্য ব্যাপারে  নিয়ে গেছে, আর আজও  নিয়ে যাচ্ছে, এবং শেষ পর্যন্ত তোমার বিরুদ্ধে তোমারই মুক্তির পতাকা তুলবে । কিন্তু তার জন্য তোমাকে নিজেকেই ধন্যবাদ দিতে হবে। আমাদের শাসনের অধীনে এবং দাপটে সকলেই আনন্দে থাকবে , এবং তোমার মুক্ত পতাকার অধীনে তারা যেমন বিদ্রোহ করতো, বা একে অপরকে ধ্বংস করতো, তা আর করবে না ।  ওহ, আমরা যত্ন নিয়ে তাদের কাছে প্রমাণ করব যে তারা যদি সম্পূর্ণ মুক্তি পেতে চায়, তাহলে তাদের  আমাদের খাতিরে নিজেদের স্বাধীনতাকে বাতিল করতে হবে আর পুরোপুরি আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে । তুমি কী ভাবছো যে আমরা ধ্রুব কথাবর্তা  বলছি নাকি মিথ্যা আওড়াচ্ছি ? ওরা সবাই নিজেদের কাছে আমাদের ন্যায্যতা নিশ্চিত করবে, কেননা ওরা দেখবে যে, তোমার দেয়া মুক্তি ওদের কতটা অবমাননাকর দাসত্ব এবং সংঘাতের দিকে নিয়ে গেছে। মুক্তি, চিন্তার স্বাধীনতা এবং বিবেকের স্বাধীনতা এবং বিজ্ঞান তাদের এমন দুর্গম বাধাবিপত্তির  মধ্যে নিয়ে গিয়ে ফেলবে, এমন সমস্ত বিস্ময় ও সমাধানের অতীত রহস্যের  মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে, যে তাদের মধ্যে কেউ কেউ—যারা বাকিদের চেয়ে বেশি বিদ্রোহী এবং বেপরোয়া– নিজেদের ধ্বংস করে ফেলবে; অন্যরা — বিদ্রোহী হলেও দুর্বল — একে অপরকে ধ্বংস করবে; বাদবাকিরা, দুর্বল, অসহায় এবং দুঃখী, ফিরে এসে আমাদের পায়ে  হামাগুড়ি দিয়ে পড়বে আর কেঁদেকেঁদে বলবে : “‘হ্যাঁ, যিশুর পিতা, আপনিই যথার্থ ছিলেন; আপনি একা ঈশ্বরের রহস্যের অধিকারী, এবং আমরা আপনার কাছে ফিরে এসেছি, প্রার্থনা করছি যে আমাদের নিজের কাছ থেকে আপনি আমাদের রক্ষা করুন ! “আমাদের কাছ থেকে খাবার রুটি পেয়ে,  তারা স্পষ্টভাবে টের পাবে যে আমরা তাদের কাছ থেকেই রুটি নিই, যে রুটি তাদের নিজের হাতে তৈরি , কিন্তু সমানভাবে  কোন অলৌকিকতা  ছাড়াই তাদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয় ; আর তা উপলব্ধি করার পর,  যদিও আমরা পাথরকে রুটিতে রূপান্তরিত করিনি, তবুও রুটি তারা পেয়েছে, যখন কিনা অন্য প্রতিটি রুটি সত্যই তাদের নিজের হাতে পাথরে পরিণত হয়েছে, তারা তা পেয়ে বরং অত্যন্ত আনন্দিত  হবে। ততোদিন পর্যন্ত, তারা কখনও সুখী হবে না। আর  কে তাদের অন্ধ করতে সবচেয়ে বেশি  সাহায্য করেছে,  বলো তুমি ? তুমি ছাড়া আর কে-ই বা জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে  অজানা পথে পরিচালিত করেছে ? কিন্তু আমরা আরও একবার ভেড়াগুলোকে খেদিয়ে আনবো আর চিরকালের জন্য আমাদের হুকুমের অধীনে রাখব। আমরা  তাদের নিজস্ব দুর্বলতা প্রমাণ করে দেবো,  এবং তাদের আবার হৃতমান করে রাখব, যদিও তারা তোমার কাছে শুধুমাত্র গর্ব করতে শিখেছে, কেননা তাদের যোগ্যতার চেয়ে বেশি তুমি তাদের গুরুত্ব দিয়েছো । আমরা তাদের সেই শান্ত, নিরহঙ্কার  সুখ দেব, যা অমন দুর্বল, মূর্খ প্রাণীদের উপকার করে, এবং একবার তাদের দৃষ্টিতে তাদেরই দুর্বলতা প্রমাণ করার পর, তারা হয়ে উঠবে ভীরু এবং অনুগত, এবং মুরগির বাচ্চারা যেমন মুরগির চারপাশে জড়ো হয়, তেমন আমাদের চারপাশে ঘুরঘুর করবে। তারা অবাক হয়ে আমাদের  কুসংস্কারের  প্রশংসা  করবে আর   এতো গৌরবময় ও জ্ঞানী মানুষের নেতৃত্ব দেখে তাদের মুষ্টিমেয় কয়েকজন মিলে লক্ষ-কোটি মানুষের দলকে বশীভূত করতে পারবে । মানুষ ক্রমে আমাদের ভয় পেতে শুরু করবে।  আমাদের সামান্যতম ক্রোধে তারা ঘাবড়ে যাবে, তাদের বুদ্ধি দুর্বল হয়ে যাবে, তাদের চোখ শিশু এবং মহিলাদের মতো সহজেই কান্নায় ভেসে যাবে; কিন্তু আমরা তাদের দুঃখ এবং কান্না থেকে হাসি, শিশুসুলভ আনন্দ এবং আনন্দময় গানের সহজ অবস্হান্তর শেখাব। হ্যাঁ; আমরা তাদের ক্রীতদাসের মতো কাজ করতে বাধ্য করবো, কিন্তু তাদের বিনোদনের সময় তাদের একটি নিষ্পাপ শিশুর মত জীবন থাকবে, খেলাধুলা এবং আনন্দময় উল্লাসে ভরপুর  । এমনকি আমরা তাদের পাপ করার অনুমতি দেব, কেননা দুর্বল এবং অসহায়, তার দরুন তারা আমাদের  প্রতি আরও বেশি ভালবাসা অনুভব করবে, যাতে তারা এতে লিপ্ত হতে পারে। আমরা তাদের বলব যে,  সব ধরনের পাপ থেকে তারা পরিত্রাণ পাবে , যদি সেগুলো আমাদের অনুমতি নিয়ে করা হয়; যাতে এই সমস্ত পাপের দায় আমরা নিজেদের উপর নিয়ে নিই, কারণ আমরা জগতকে এতই ভালবাসি যে, আমরা তার সন্তুষ্টির জন্য আমাদের আত্মাকে উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত। আর, তাদের সামনে বলির পাঁঠা এবং উদ্ধারকারীর আলোয় হাজির হলে, আমদের আরও বেশি শ্রদ্ধা করা হবে। আমাদের কাছে তাদের কোনও গোপনীয়তা থাকবে না।  তাদের স্ত্রী আর রক্ষিতাদের সঙ্গে বসবাসের অনুমতি দেওয়া, অথবা তা নিষিদ্ধ করা, সন্তান বিয়োনো বা নিঃসন্তান থাকা, নির্ভর করবে আমাদের প্রতি তাদের আনুগত্যের মাত্রার ওপর ; এবং তারা তাদের আত্মার সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক রহস্য আমাদের কাছে আনন্দের সাথে খোলাখুলি বলবে — সবাই, তারা সবাই আমাদের পায়ের কাছে লুটিয়ে থাকবে, এবং আমরা তাদের কাণ্ড-কারখানা তোমার নাম নিয়ে অনুমোদন করব, এবং মাফ করে দেব, আর তারা আমাদের বিশ্বাস করবে এবং উল্লসিত হয়ে আমাদের মধ্যস্থতা স্বীকার করবে , কেননা এটি তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এবং নির্যাতন থেকে মুক্তি দেবে — নিজেদের জন্য স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সিদ্ধান্তের বোঝা থেকে বাঁচবে । এবং সকলেই খুশি হবে, সবাই, তাদের দু-এক দল শাসক ছাড়া বাকি সবাই। কারণ আমরা, আমরা যারা  মহান রহস্যের রক্ষক তারাই হবো দুর্দশাগ্রস্ত । সেখানে থাকবে লক্ষ লক্ষ সুখী খোকাখুকু, এবং এক লক্ষ শহীদ যারা নিজেদের উপর শুভ ও অশুভ জ্ঞানের অভিশাপ চাপিয়ে নিয়েছে। শান্তিপূর্ণ হবে তাদের অন্তিমযাত্রা , এবং শান্তিপূর্ণভাবে তারা মারা যাবে, তোমার নামে, কবরের চবুতরাগুলোর পেছনে — সেখানে মরে পড়ে থাকবে। কিন্তু আমরা গোপনীয়তাকে পবিত্র রাখব, এবং তাদের  ভালোর জন্য তোমার রাজ্যে অনন্তকালীন জীবনের মরীচিকা দেখিয়ে ঠকাব। কেননা, কবরের ওপারে সত্যিই কি জীবনের মতো কিছু আছে, নিঃসন্দেহে  তাদের মতন বোকাদের মগজে তা ঢুকবে না ! লোকেরা আমাদের বলে আর তোমার পুনরাগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করি, যে,  পৃথিবীতে আরও একবার তুমি বিজয় লাভ করবে; সঙ্গে থাকবে তোমার  নির্বাচিত সেনাবাহিনী,  গর্বিত এবং শক্তিশালী ; কিন্তু আমরা তোমাকে বোঝাবো যে, তারা নিজেদের বাঁচিয়েছে বটে কিন্তু আমরা সবাইকে রক্ষা করেছি। আমাদের সেই বড় অসম্মানেরও হুমকি দেওয়া হয়েছে যে, সেই বেশ্যারমণী অপেক্ষা করছে, “মহান ব্যাবিলন, যে কিনা বেশ্যাদের মাতা-ঠাকরুন” — যিনি বাইবেল-কথিত দানবের ওপর বসে আছেন, তার হাতে রয়েছে ‘রহস্য’, শব্দটা খোদাই করা তার কপালে ; এবং আমাদের বলা হয়েছে যে দুর্বলরা, মেষশাবকগুলো তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে এবং তাঁকে নিঃসঙ্গ ও নগ্ন করবে । কিন্তু তারপর আমি উঠে দাঁড়াব, এবং আঙুল তুলে তোমাকে দেখাব পাপমুক্ত সেই  লক্ষ লক্ষ সুখী শিশু । এবং আমরা যারা নিজেদের পাপ নিজেদের উপর নিয়েছি,  নিজেদের ভালোর জন্য, তোমার সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করব : “আপনি যদি পারেন এবং সাহস থাকে, তবে আমাদের বিচার করে দেখান !” তাহলে জেনে রাখো যে আমি তোমাকে মোটেই ভয় পাই না। জেনে রেখো যে আমিও ভয়াবহ বিজনভূমিতে বাস করেছি, যেখানে আমি পঙ্গপাল এবং শেকড় খেয়ে বেঁচেছিলুম, আমারও আছে পূতস্বাধীনতা, যা দিয়ে তুমি মানুষকে আশীর্বাদ করেছো এবং আমিও একবার তোমার নির্বাচিত, গর্বিতদের দলে যোগ দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিলুম ।. কিন্তু আমি আমার বিভ্রান্তি কাটিয়ে উঠেছিলুম আর তখন থেকে উন্মাদনার সেবা করতে অস্বীকার করেছি। যারা তোমার ভুল সংশোধন করেছে তাদের সৈন্যদলে যোগ দিতে আমি ফিরে এসেছি। আমি গর্বিতদের ছেড়ে সত্যকার নম্রদের কাছে ফিরে এসেছি, আর তা স্রেফ তাদের নিজেদের সুখের জন্য। এখন আমি তোমাকে যা বলছি তা মুছে যাবে,  এবং আমাদের রাজ্য ঠিকই গড়ে উঠবে, আমি তোমাকে বলছি,  আগামীকালের পরই তুমি সেই অনুগত মানুষের দল দেখতে পাবে, যারা আমার হাতের একটি ইশারায় ছুটে গিয়ে তোমার খুঁটিতে  জ্বলন্ত কয়লা ফেলবে, যার ওপর দাঁড় করিয়ে আমি তোমাকে আগুনে পুড়িয়ে মারব, আমাদের কাজে গোলমাল বাধাবার  সাহস করার জন্য। কারণ, যদি কখনও কেউ থেকে থাকে যে আমাদের ইনকুইজিশনের অগ্নিকুণ্ডে পুড়ে মরার যোগ্য — তাহলে সে তুমি ! আগামীকাল আমি তোমাকে পুড়িয়ে মারব । যা বলার ছিল তা বলে দিলুম। ” 

আইভান থামল। ও ঘটনার মধ্যে সেঁদিয়ে গিয়েছিল আর প্রবল উত্তেজনায় কথা বলছিল,  কিন্তু  হঠাৎ ফেটে পড়ল হাসতে হাসতে । 

“কিন্তু এ-সবকিছুই অযৌক্তিক !”  অ্যালিয়োশা আচমকা চেঁচিয়ে উঠল, যে ততোক্ষণ  পর্যন্ত বিভ্রান্ত এবং উত্তেজিত হয়ে চুপচাপ শুনছিল । “তোমার কবিতাটা খ্রিষ্টের মহিমা, মোটেই অভিযোগ নয়, যেমনটা তুমি, সম্ভবত, বোঝাতে চাইছিলে । আর কে-ই বা তোমাকে বিশ্বাস করবে যখন তুমি ‘মুক্তির’ কথা বলছ? ব্যাপারটা তাহলে কি আমাদের খ্রিস্টানদের বোঝা উচিত ? তাহলে কি রোম ( সমস্ত রোম নয়, সেকথা বলা অন্যায় হবে), কিন্তু রোমান ক্যাথলিকদের মধ্যে যারা সবচেয়ে খারাপ, ইনকুইজিটর আর জেসুইটরা, তাদের তুমি ফাঁস করতে চাইছিলে !  তোমার ইনকুইজিটর তো একখানা বিদকুটে চরিত্র। কোন পাপগুলোর দায় তারা নিজেদের উপর নিচ্ছে? ওই সমস্ত রহস্যের রক্ষক কারা, যারা মানবজাতির কল্যাণের জন্য নিজেদের উপর অভিশাপ চাপিয়ে নিয়েছিল ? তাদের সাথে কারোর কখনও দেখা হয়েছে? আমরা সবাই জেসুইটদের জানি, এবং তাদের পক্ষে ভালো কথা বলার কেউ নেই; কিন্তু তুমি তাদের যেমনভাবে তুলে ধরলে, তেমনটা কবে ছিল তারা ? কক্ষনো ছিল না, কক্ষনো নয় ! জেসুইটরা কেবল রোমান ক্যাথলিকদের একটা সেনাবাহিনী, যারা নিজেদের পার্থিব ভবিষ্যতের সাম্রাজ্যের জন্য তৈরি করছে, চাইছে একজন মুকুটপরা সম্রাট — তাদের মাথার ওপর একজন রোমান প্রধান যাজক। সেটাই তাদের আদর্শ আর উদ্দেশ্য, যার মধ্যে কোনোরকম রহস্য বা অসহ্য যন্ত্রণা নেই। ক্ষমতার জন্য সবচেয়ে প্ররোচিত চাহিদা, জীবনের মামুলি আর পার্থিব সুখের জন্য, নিজেদের লোকেদের দাস বানিয়ে রাখার আকাঙ্ক্ষা, অনেকটা আমাদের দেশের কেনা গোলামের ব্যবস্হার মতন কিছু, নিজেদের ভূমি মালিক হিসাবে বজায় রাখা — তাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করা যেতে পারে। তারা হয়তো ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, এমনটাও সম্ভব, কিন্তু তোমার ওই যন্ত্রণাভোগী ইনকুইজিটর একেবারে ফালতু — নিছক কষ্টকল্পনা ! ” 

“থামো ! থামো !” আইভান বাধা দিয়ে হাসতে থাকে । “এত উত্তেজিত হয়ো না। তুমি বলছ এটা কষ্টকল্পনা, নাহয় তা-ই হোক ! কিন্তু দাঁড়াও । অবশ্যই, এটা  অভিনব। নিছক ‘আনন্দ’ কি এর উদ্দেশ্য? এটা কি যাজক প্যাসি তোমাকে শিখিয়েছেন? “

 “না, না, একদম উল্টো, কারণ ফাদার প্যাসি একবার আমাকে নিজে যা বলেছিলেন, তার মতন কথাই তুমি বলছ,  যদিও, হুবহু তা নয় – একেবারে অন্যরকম কিছু,” বলল  আলেক্সিস, বেশ লজ্জায় পড়ে । 

“একটা দামি তথ্য, যদিও তোমার ‘তা নয়’ বলার পরও।  আচ্ছা, আমাকে তুমি বলো, তোমার কল্পনার ইনকুইজিটর আর জেসুইটরা  ‘মামুলি বস্তুগত সুখ’ অর্জনের কারণ ছাড়া আর কেনই বা বেঁচে থাকতে চাইবে ? কেন তাদের মধ্যে একজন সত্যিকারের শহীদকে পাওয়া যাবে না, যে একটা মহান এবং পবিত্র ধারণার নিয়ে যন্ত্রণা ভোগ করছে এবং হৃদয় দিয়ে মানবতাকে ভালোবেসেছে ? এখন  ধরে নিই যে এই ‘মামুলি বস্তুগত সুখ’ এর জন্যে হাঘরের মতন পড়ে থাকা সত্ত্বেও এই জেসুইটদের মধ্যে অন্তত একজন থাকতে পারে , আমার বুড়ো ইনকুইজিটরের মতন একজন, যিনি নিজে বিজনপ্রদেশে শেকড় খেয়ে বেঁচেছিলেন, মুক্ত ও নিখুঁত হওয়ার প্রয়াসে দেহের কষ্টকে সহ্য করতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু যিনি মানবতাকে ভালবাসায় ঢিলে দেননি কখনও, এবং যিনি একদিন ভবিষ্যদ্বাণীর  সত্য’র সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন ; যিনি যতোটা পারেন বুঝতে পেরেছিলেন যে পুরোনো ব্যবস্থায় মানবতার বড় অংশ কখনই সুখী হতে পারবে  না, ব্যাপারটা সেই লোকগুলোর জন্য নয় যারা ভাবে যে একজন মহান আদর্শবাদী এসেছিলেন এবং মৃত্যু স্বীকার করেছিলেন আর ঈশ্বরপুত্রের সর্বজনীন সম্প্রীতির স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই সত্য উপলব্ধি করে, তিনি পৃথিবীতে ফিরে এসেছিলেন আর যোগ দিয়েছিলেন — বুদ্ধিমান এবং ব্যবহারিক মানুষদের সাথে। এটা কি অতো  অসম্ভব মনে হয় ? ” 

“কার সাথে যোগ দিয়েছেন? কোন বুদ্ধিমান আর ব্যবহারিক মানুষ?” অ্যালিয়োশা বেশ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল। ” তারা কেনই বা অন্য লোকেদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হবে , আর  তাদের কাছে কোন রহস্য এবং গোপনীয়তা থাকতে পারে? তাদের কোনটাই নেই। তাদের যা আছে তা হলো নাস্তিকতা এবং অবিশ্বাস । তোমার ইনকুইজিটর ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, এবং এটাতেই যাকিছু রহস্য থাকতে পারে তা আছে!” 

“হয়তো তাই । তুমি ব্যাপারটা ঠিকই আঁচ করতে পেরেছো । আর সত্যিই এটা তাই, এবং সেটাই লোকটার পুরো রহস্য; কিন্তু এটা কি তাঁর মতো একজন মানুষের কাছে তীব্র যন্ত্রণা নয়, যিনি মরুভূমিতে তপস্যা করে নিজের সমস্ত  জীবনযৌবন নষ্ট করেছিলেন, এবং তা সত্ত্বেও সহকর্মীদের প্রতি তাঁর ভালবাসা থেকে নিজেকে নিরাময় করতে পারেননি? তাঁর জীবনের শেষ দিকে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে আরম্ভ করেন যে মহান এবং ভয়ানক আত্মার পরামর্শ মেনে নিলে তবেই  এই লক্ষ লক্ষ দুর্বল বিদ্রোহীদের ভাগ্য,  ‘ বিদ্রূপে গড়া অর্ধ-সমাপ্ত মানুষের নমুনাগুলোকে’,  সহনীয় করে তোলা যায়। আর, একবার ব্যাপারটা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে গেলে, তিনি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন যে সেই উদ্দেশ্যকে অর্জন করার জন্য, একজনকে জ্ঞানী আত্মার নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে, যিনি মৃত্যু এবং ধ্বংসের সেই ভয়ঙ্কর আত্মা, অতএব মিথ্যা এবং প্রতারণার একটি পদ্ধতি গ্রহণ করে মানবতাকে সচেতনভাবে মৃত্যু এবং ধ্বংসের দিকে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে যেতে হবে, আর তাছাড়া,  সব সময় তাদের ঠকাতে হবে,  যাতে তারা বুঝতে না পারে যে তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, এবং তাই দুঃখী অন্ধ লোকগুলোকে, অন্তত এই পৃথিবীতে তারা যতোদিন আছে, আনন্দের বোধে ফুসলিয়ে রাখতে হবে । এবং এটা লিখে নিতে পারো : ঈশ্বরপুত্রের নামে একটি পাইকারি প্রতারণা, যাঁর আদর্শ নিয়ে বুড়োটা  এতো আবেগপ্রবণ ছিল, এত উদার,  তার প্রায় সারা জীবন ধরে বিশ্বাস করেছিল ! এটা কি  কষ্ট নয়? 

আর এমন একটা একক ব্যতিক্রম যদি পাওয়া যেতো,  সেই সেনাবাহিনীর মধ্যে এবং শীর্ষে,  ‘যে কিনা ক্ষমতা ভোগ করার জন্য অথচ  জীবনের নীচ সুখের জন্য লালায়িত,’ তুমি কি মনে করো যে অমন একজন মানুষ একটি ট্র্যাজেডি ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট  ? তাছাড়া,  প্রধান নেতা হিসেবে আমার ইনকুইজিটর মশায়ের  মতো একজন একক ব্যক্তি, সমগ্র রোমান ক্যাথলিক ব্যবস্থার বাস্তব  ধারণাটি জেসুইট  লোকজনদের দিকনির্দেশ করার জন্য যথেষ্ট প্রমাণিত হবে, আমার কবিতায় বর্ণিত একাকীত্বের সবচেয়ে বড় এবং প্রধানতম  বিশ্বাস কোনও সময়েও আন্দোলনের মূল পরিচালকদের মাথা থেকে উবে যায়নি । কে জানে, সেই ভয়ঙ্কর বুড়ো ছাড়া, মানবতাকে এত দৃঢ়ভাবে, আর  আদি উপায়ে ভালবেসেছে, এমনকি আমাদের দিনকালেও তিনি একাকী ব্যতিক্রমের আকারে বজায় রয়েছেন, যার অস্তিত্ব কেবল আকস্মিকতার  কারণে নয়, বরং একটি স্পষ্ট পরস্পরনির্ভর সমঝোতা থেকে উঠে এসেছে, এক গোপন সঙ্গঠনের আকারে, যার উন্মেষ হয়েছিল বহু শতক আগে, যাতে রহস্যটিকে দুর্বল ও  দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের  হঠকারী দৃষ্টি থেকে রক্ষা করা যায়, এবং তা কেবল কি তাদের নিজেদের আনন্দের জন্য ? সুতরাং ব্যাপারটা তেমনই দাঁড়ালো ; এর অন্যথা হতে পারে না। আমার সন্দেহ হয়  যে খ্রিস্টধর্মীর্ গোপন সংস্হা ফ্রিম্যাসনদের সংগঠনের ভিত্তিতে এরকমই কোনও না কোনও রহস্য আছে , এবং রোমান ক্যাথলিক পাদ্রিরা যে তাদের  ঘৃণা করে, তার কারণ এটাই,  তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রতিযোগী, বিশ্বাসের  বিভেদ খুঁজে পাবার ভয় , যা উপলব্ধি করার জন্য গরুর পাল আর একজন রাখাল প্রয়োজন। যাইহোক, আমার ধারণা সমর্থনের উদ্দেশ্যে, আমাকে এমন একজন লেখকের মতন দেখতে লাগছে যে তার লেখালিখির সমালোচনা সহ্য করতে অক্ষম। এটাই যথেষ্ট। ” 

“তুমি সম্ভবত নিজেই একজন ফ্রিম্যাসন !” বলে উঠল অ্যালিয়োশা। “তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো না,” ও যোগ করল, কন্ঠস্বরে গভীর দুঃখ নিয়ে। কিন্তু হঠাৎ করে মন্তব্য করার দরুন দেখলো যে তার ভাই তার দিকে ঠাট্টার চোখে তাকিয়ে আছে, “তাহলে তুমি কীভাবে তোমার কবিতা শেষ করতে চাও?” ও অপ্রত্যাশিতভাবে জানতে চাইলো, চোখ নামিয়ে, “নাকি, এটি এখানেই খতম?” 

“আমার উদ্দেশ্য  এরকম একটা দৃশ্য দিয়ে শেষ করা : নিজের হৃদয়কে হালকা করে, ইনকুইজিটর মশায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন ঈশ্বরপুত্রের মুখ থেকে কিছু শোনার জন্য, নৈঃশব্দের বদলে তিক্ত ও তীক্ষ্ণ কথা শুনতে চাইছিলেন । ঈশ্বরপুত্রের স্তব্ধতা ইনকুইজিটরের ওপর বোঝার ভার হয়ে দাঁড়ায়। ইনকুইজিটর এতোক্ষণ লক্ষ্য করছিলেন যে তাঁর ঈশ্বরপুত্র মহাআগ্রহে চুপচাপ তাঁর কথা শুনছেন, ইনকুইজিটরের মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে এবং বন্দীর  চোখ দুটি মৃদুভাবে স্থির , এবং তা থেকে বোঝা যায় যে বন্দীর উত্তর দেবার আগ্রহ নেই । ঈশ্বরপুত্র হঠাৎ  উঠে দাঁড়ান; আস্তে আস্তে এবং নীরবে প্রশ্নকর্তার  কাছে আসেন, তিনি তাঁর দিকে ঝুঁকে আলতোভাবে রক্তহীন, নব্বুই বছরের ঠোঁটজোড়ায় চুমু খান । এটাই ছিল যাবতীয় উত্তর। থরথর করে কাঁপতে থাকে গ্র্যাণ্ড ইনকুইজিটর ;তার মুখের কোনায় দেখা দেয় আক্ষেপ-পীড়িত খিঁচুনি । ইনকুইজিটর দরজার কাছে গিয়ে কপাট খুলে দেয়,  এবং ঈশ্বরপুত্রকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘যান,’  বলে ইনকুইজিটর, ‘চলে যান, আর কখনও ফিরে আসবেন  না … আবার আসবেন না  … কখনও না, কখনও না !’ এবং ঈশ্বরপুত্রকে  অন্ধকার রাতে বেরিয়ে যেতে দেয়। বন্দী অদৃশ্য হয়ে যায়। “

 “আর বুড়ো ইনকুইজিটর ?”

 “চুম্বন তার হৃদয়কে জ্বলিয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু বুড়ো তার নিজের ধারণা এবং অবিশ্বাসে অটল ছিল।”

 “আর তুমি, তার সাথে? তুমিও !” হতাশ হয়ে অ্যালিয়োশা বলে ওঠে । শুনে,  অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে আইভান।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

বিট আন্দোলনের কবি-মহিলারা : অনুবাদ – মলয় রায়চৌধুরী

বিট আন্দোলনের কবি মহিলারা

অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

মার্গারেট রেনডাল-এর কবিতা ( ১৯৩৬ )

পরবর্তী সূর্যের সন্ধানে

তেওতিহুয়াকানে আমি অসহায় দেখি তুমি পিছলে চলে যাচ্ছ,

চুষে ফেলা, নিয়ে নেয়া

এই সময় থেকে অন্য সময়ে ।

তুমি আমার পাশে হাঁটো,

ছেলেমেয়ে আর নাতি-নাতনিরা ভুলে গিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে  

সূর্য আর চাঁদের পিরামিডের মাঝে

মৃতের চওড়া রাস্তা বরাবর,

কিন্তু আমি জানি যে তোমার খোলোস কেবল আমার সঙ্গে থাকে

খড়ির মতন ফ্যাকাশে আর বোবা ।

পরে তুমি বর্ণনার চেষ্টা করো কোথা থেকে পালিয়ে এসেছ

কতো কষ্ট করে : ঝুরঝুরে আর শীতল

দুই সহস্র বছর যা গেছে আর আছে তার মাঝে ।

কেমন করে তুমি সাক্ষীর কাছ থেকে নিজেকে ছিঁড়ে নিলে

তোমার হলোগ্রাম চোখদুটো,

একের পর এক বুকের ভেতরে ঢুকে-যাওয়া 

আগ্নেয়শিলার ছুরি, রক্তে জবজবে হৃদয়গুলো

অন্ধকার থেকে আকাশে তোলা

পরবর্তী সূর্যের সন্ধানে ।

দেবতাদের জন্মস্হান, তার মহাগৌরবের মুহূর্তে

পিরামিডের স্পন্দিত শহর

আর প্রজাপতি প্রাসাদসারি,

২০০০০০ ওটোমি, জাপোটেক, মিক্সটেক,

মায়া, নাহুয়া আর টোটোনাকদের বাড়ি,

কারিগরদের, কুমোরদের, 

কোয়েৎজালকোটলের উপাসকরা :

পালকদেহ সাপ যা ওদের দিয়েছিল

সাধারণ জীবনের ঝর্ণা ।

কোনও বীভৎস ব্যাপার এখানে ঘটেছিল,

এটুকুই কেবল তুমি বলতে পারো

যখন তুমি শেষ পর্যন্ত আমার কাছে ফিরে এলে,

কোনও ঘটনা যা বলা যায় না,

আর তুমি তা বললে না

যতদিন না আমাদের কবিবন্ধু মেয়েটি

তার নিজের মৃত্যুর মুখে-পড়া অভিজ্ঞতার কথা বলল

পিরামিডের সর্বোচ্চ শিখরে আটক

নামতে অসমর্থ ।

চাকোতেও তুমি সেই সন্ত্রাস অনুভব করো,

বিশেষ করে পুয়েবলো বোনিতোতে : বিশাল বাড়ি

মাটির তলায় ৬০০টা ঘর রেড ইনডিয়ানদের

গোলাকার অসম্পূর্ণ দেয়াল, ছোটো দরোজা আর উঁচু জানালা

ফ্রেমের মতন উড়ন্ত মেঘদলের সৌন্দর্য ধরে রাখতো

৮০০ বছর আগে যা ঘটেছিল তাকে আড়াল করে রাখা

সেসময়ে যখন এটাই ছিল কেন্দ্র,

পথের মোড় গাণিতিক বাতাসে সর্পিল চলে গেছে ।

আর কেঅন দ্য চেলিতে, নাভাহো ৎসেগিদের সঙ্গে

স্পেনিয়দের ঘোটালা — “গুহার ভেতরে”

১৮০৫ সালে যেখানে দুটো স্রোতোধারা মেশে

সাক্ষী হিসাবে রয়ে গেছে এক বিধ্বস্ত গুহা ।

আক্রমণকারীরা নারী, শিশু, বৃদ্ধদের গণহত্যা করল,

আর দুই শতক পরে

তাদের ভয় তোমার দেহে বাস করে,

তুমি নিজের ভেতরে নিজেকে গুটিয়ে নাও,

সেদিন মরুভূমির বাতাসকে চিরে ফেলেছিল আর্তচিৎকার। 

এক হাজার বছরে যদি আমরা এখনও অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছি

পরবর্তী সূর্যের জন্য

আমি অবাক হবো যদি কোনো পর্যটক আউশউইৎস,

রামাল্লা, বাগদাদ, কাবুল, সোয়েটো, 

মোরাজান, অ্যাকটেল কিংবা পোর্ট-অউ-প্রিন্স প্রমুখ জায়গায়

সেখানে যা ঘটেছে সে সম্পর্কে জানতে পারেন

তাহলে হয়তো অনুভব করবেন তাঁকে একটা দিকে 

টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে 

তাদের আর আমাদের সময়ের মাঝে, ভয় হয় তাঁরা

এখনও একে আরেকের সঙ্গে যা করি তা থেকে পালাতে পারবেন না ।

মাইনের ভেতরের ক্যানারি পাখি

ড্রেসডেন আর টোকিও, হিরোশিমা, বাগদাদ,

কাবুল, পাইনট্রি রেজ কিংবা সাউথ ব্রংকস,

ক্যানারিদের মনে করা হয়  কোল্যাটারাল ড্যামেজ 

সেই লোকগুলোর কাছে যারা গুলি চালাবার, বোমা ফেলার হুকুম দেয় ।

ও এক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসে যা ওরা বলেছিল আমাদের স্বাধীন রাখবে।

এখন বাসা হয়ে গেছে টুকরো সাজাবার ধাঁধা যেখানে অনেক টুকরো নেই।

কেউ আর পুরোনো অবস্হায় ফিরিয়ে আনতে পারবে না, কেউই নয়

নৈঃশব্দ্য এখন চলমান স্বপ্ন ।

দুই ঘণ্টা পর আর প্রতিটি গোপনতার একটি মিথ্যা বরাদ্দ,

মেয়েটি ভেবেছিল ভেটেরান অ্যাসিসট্যান্স সাহায্য করবে

কিন্তু মহিলা সেনাদের জন্য তেমন সাহায্যের ব্যবস্হা নেই

আর যেখানেই আরোগ্যের প্রতারণা ঘাপটি মেরে আছে সেখানে ধর্ষণ লুকিয়ে।

দেহরক্ষার সাম্প্রতিকতম বর্ম বেশি বিকলাঙ্গের উৎস।

যদি কোথাও কিছু অবশিষ্ট থাকে

তা কৃতজ্ঞ রাষ্ট্রকে ফেরত পাঠিয়ে দাও

পতাকায় মোড়া বাক্সের গরিমায় ।

যারা বাড়ি ফেরে না তাদের জন্য : দীর্ঘ নিরবতা,

মেয়েটি কখনও পরিচিত হয়নি এমন প্রিয় মুখগুলো,

কন্ঠস্বরগুলো মেয়েটিকে বলে

ও হলো মাইনের ভেতরের ক্যানারি পাখি

ডেভিড আর গলিয়াথ  

পাহাড়ের ওপর থেকে সময় গড়িয়ে যায়,

অ্যালাব্যাস্টারের পাতলা চাদর

মরুভূমির পালিশের মতন পোক্ত ।

ভয় জেগে ওঠে

বুকের হাড় আর হৃদয়ের মাঝে

তার ধাক্কা খাবার অধিকার জানায়

যৎসামান্য রেশসহ

ভিয়েৎনামের জাতীয় সঙ্গীতের ।

সময় আর সঙ্গীতের পংক্তি

আমার সংস্কৃতি থেকে এতো বিচ্ছিন্ন

মনে হয় পর্যটক পাখিদের

মিল নেই এমন এক জুটি 

আর আমি স্মৃতির টুকরো ওছলাই

লাইনাস কম্বলের ওপরে

—লূতাতন্তু-আলো এখনও জড়িয়ে

প্রতিটি অমীমাংসিত পুরস্কারে ।

ভিয়েৎনাম : ডেভিড আর গলিয়াথ

আমার প্রজন্মের ।

প্রতিটি ন্যায়নিষ্ঠ সংঘর্ষ

লোভ ও দোষের দেবতাদের বিরুদ্ধে,

প্রতিটি নারী ব্যবহৃত ও অপব্যবহৃত

কেবল তারা নারী বলে,

প্রতিটি ক্ষুধার্ত শিশু

বাড়ি সম্পর্কে আতঙ্কিত ।

ধূর্ততা ছদ্মবেশ পরে থাকে শুশ্রুষার,

মানচিত্রে ঘুরে বেড়ায় পথগুলো

যতক্ষণ না তারা টলতে-টলতে কিনারায় গিয়ে পড়ে যায়

খেলার বিশাল টেবিল থেকে ।

বরফের অদৃশ্য ফালি

ত্বকের তলায় গর্ত করে

যা কেবল আদর খেতে চায়

প্রতিটি ক্লান্ত গহ্বরে ।

মানাগুয়া থেকে লেখা চিঠি

একমাত্র যা তুমি চাও তা হল আমাদের হত্যা, যারা টিকে গেছে

তোমাদের অজস্র পোশাক-মহড়ায়

এখনও ব্যাপারটা তেমন গুরুতর নয়, আমাদের অনেকেই তোমাদের

আশা ব্যক্তিগত স্তরে পূরণ করে না :  তাগড়া বা নীল-চোখ বা সম্ভাবনাময়

কেউই করে না তোমাদের বর্তমান আই কিউ অনুযায়ী

কিংবা ররশাখ যা তোমাদের জীবনের বোধ সম্পর্কে সংজ্ঞা তৈরি করেন ।

তোমাদের সঙ্গে মতের মিল না হলে ক্ষমা করো

তোমাদের আণবিক বোমার সংজ্ঞা প্রয়োগ করে

যুগ্মবৈপরীত্যের রাসায়নিক সমাধান

কিংবা সালভাদোরের  সমাধান যথেষ্ট ব্যথা-নির্মূলক হিসাবে।

আমরা অত্যন্ত অনুন্নত আমাদের ব্যথা নিজেদের প্রাগতৈহাসিক

উপায়ে সামলাবার জন্য ।

আমাদের সমাজ নিয়ে তোমাদের প্রশ্নের যদি সম্পূর্ণ উত্তর দিতে না পারি 

তাহলেও আমাদের ক্ষমা কোরো, যদি একে মার্কিস্ট-লেনিনিস্ট

কিংবা সামাজিক-গণতান্ত্রিক, বহুমাত্রিকতাকে মান্যতা দেওয়া

কিংবা যথেষ্ট খোলা বাজার ।  

যদি আমরা আমাদের নিজস্ব সৃষ্টিশীলতার প্রক্রিয়া অনুসন্ধানের 

অপক্বতায় জোর দিই 

আমাদের স্বদেশকে তীব্রভাবে ভালোবাসি

৫০০০০ বোন আর ভাইরা আমাদের কন্ঠে শিকড় বিছিয়ে রাখে ।

আমাকে ক্ষমা করবেন, দয়া করে, আমরা সব সময়ে ভুলে যাই

আমাদের সত্যকে রক্ষা করার জন্য তোমাদের অনুমতি নেবার প্রয়োজন ছিল

আর যেমন ভালো বুঝি তেমন করে আমাদের হাসি বিতরণ করা দরকার ছিল।

নিজেদের মাথা ঘামাবেন না এটুকু বোঝার জন্য যে

আমাদের সৈন্যদের লড়াই করতে শেখার সঙ্গে কবিতাপাঠও শিখতে হয়

আত্মসন্মানবোধ আর কেমন করে রক্তের বদলে কালি দিয়ে তাদের নাম লিখবে,

যখন আমাদের দাদুদিদারা এই জমি খুঁচিয়ে তাঁদের জীবন কাটাতেন

 তোমরা তোমাদের সৈন্য পাঠালে । পরে তোমরা আমাদের দিলে

“আমাদেই একজন” : কিনলে আর দাম মেটালে

তোমাদের মার্কিন জীবনযাত্রা দিয়ে ।

তার ছিল এক ভাই আর এক ছেলে, এক নাতি

আর অজস্র পকেট ।

আমরা একাধিকবার বিদায় সম্ভাষণ জানিয়েছি

কিন্তু তোমরা বিপুল সংখ্যায় আমাদের ভাইদের শিক্ষা দিলে

তাদের কিনে ফেললে আর ছাঁচে গড়লে 

( আমাদের ছাঁচে রাখার জন্য )

আর যে ছাঁচে তারা আমাদের রাখল তা বেশির ভাগই পাইন-বাক্সে 

আর অনুভূমিক । এখানে যুবক হওয়া

অপরাধ ছিল, আর তোমরা রোজ মনে করিয়ে দিতে

সেই অপরাধের কথা

কতোজনের দ্বারা, আর কতো দিন অন্তর করা হয় ।

কিন্তু আমরা ভেলে যেতুম, আমরা লড়তুম আর তোমাদের চিরন্তন বন্ধুর

প্রতিরক্ষামূলক পাহারার নিচে থেকে বেরিয়ে আসতুম। 

আমরা লড়তুম আর জিততুম, আমরা কবর দিতুম

আমাদের বোনেদের আর ভাইদের ( কেউ কেউ ছিল ফর্সা

বা তোমাদের ব্যক্তিত্বের সংজ্ঞার সঙ্গে খাপ খেতো )

আর আমাদের দীর্ঘ ব্যথা আরম্ভ হতো, নিঃশব্দ আনন্দ, অসম্ভবকে

আমাদের ইতিহাসের চোখ আর হাত দিয়ে সম্ভব করে তোলা ।

আমরা জানি আমরা তোমাদের ১৯৮২-এর মাপকাঠির সঙ্গে

খাপ খাই না যা তোমরা নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্যে তৈরি করেছ ।

তোমরা চাও কেবল আমাদের খুন করতে । আমরা কেবল চাই বেঁচে থাকতে ।

—মানাগুয়া, ফেব্রুয়ারি, ১৯৮২

    লেনোর কানডেল-এর কবিতা ( ১৯৩২ – ২০০৯ )

      ঈশ্বরের/প্রেমের কবিতা

ভালোবাসার অন্য কোনো পথ নেই/কিন্তু/সুন্দর/

           আমি তোমার সবকিছু ভালোবাসি

আমি তোমাকে ভালোবাসি/তোমার শিশ্ন আমার হাতে

পাখির মতন চঞ্চল হয়ে ওঠে

আমার আঙুলগুলোয়

যেমন যেমন তুমি ফুলে বেড়ে ওঠো আর কঠিন হও আমার হাতে

বাধ্য করো আমার আঙুলগুলোকে খুলতে

তোমার শক্ত শক্তি

তুমি সুন্দর/তুমি সুন্দর

তুমি এক শতবার সুন্দর

আমি আমার প্রেমের হাত দিয়ে তোমাকে আলোড়িত করি

             গোলাপি-নখ দীর্ঘ আঙুল

আমি তোমাকে সোহাগ করি

আমি তোমাকে আদর করি

     আমার আঙুলের ডগা…আমার হাতের তালু…

তোমার লিঙ্গ উঠে দাঁড়ায় আর আমার হাতে স্পন্দিত হয়

এক চমকপ্রদ জ্ঞান/যেমন আফ্রোদিতি জানতেন

         একটা সময়ে দরবতারা পবিত্র ছিলেন

         /আমি মনে করতে পারি লতাকুঞ্জের মধ্যে রাতগুলো

          আমাদের রস মধুর চেয়েও মিষ্টি

         /আমরা একইসঙ্গে ছিলুম মন্দির আর দেবতা/

আমি তোমার সঙ্গে নগ্ন

আর আমি আমার মুখ তোমাতে দিচ্ছি    শ্লথতায়

আমি অপেক্ষা করছি তোমাকে চুমু খাবার জন্য

আর আমার জিভ তোমাকে পুজো করছে

                     তুমি সুন্দর

                     তোমার দেহ আমার কাছে এগিয়ে আসে

মাংসের সঙ্গে মাংস

ত্বক পিছলে যায় সোনালি ত্বকে

যেমন আমার তোমাতে

       আমার মুখ আমার জিভ আমার হাত

আমার তলপেট আর পাদুটি

তোমার মুখে            তোমার ভালোবাসায়

অবাধে…অবাধে…

আমাদের দেহ আলাদা হয় আর জোড়া লাগে

অসহ্যভাবে

তোমার মুখাবয়ব আমার ওপরে

           যাবতীয় দেবতাদের মুখাবয়ব

           আর সুন্দর রাক্ষসদের

  তোমার চোখ

  ভালোবাসা ভালোবাসাকে ছোঁয়

   মন্দির আর দেবতা

   এক

সন্মতির বয়স    

দেবদূতদের সঙ্গে কথা না বলে আমি সন্তুষ্ট হই না

আমি দেবতার চোখ দেখতে চাই

যাতে ব্রহ্মাণ্ডে অলৌকিকতার টোপ দেবার জন্য নিজেরটা প্রয়োগ করতে পারি

যাতে শ্বাস ফেলতে পারি আর বিষ ওগরাতে পারি

যাতে ওই দরোজাটার তালা খুলতে পারি যেটা আগেই খোলা আর ঢুকতে পারি বর্তমানে

যা আমি কল্পনা করতে পারি না

আমি তার জবাব চাই যে প্রশ্নগুলো করতে এখনও শিখিনি

আমি আলোকপ্রাপ্তিতে প্রবেসের দাবি করছি, অলৌকিকতার সংমিশ্রণে

অসহ্য আলোর উপস্হিতিতে

হয়তো সেই ভাবেই যেভাবে গুটিপোকারা তাদের উড়ালের ডানা দাবি করে

কিংবা ব্যাঙাচিরা দাবি করে তাদের ব্যাঙজীবন

কিংবা মানবসন্তান দাবি করে তার বেরোনো

উষ্ণ গর্ভের সুরক্ষা থেকে

প্রথমে ওরা দেবদূতদের জবাই করলো

১.

প্রথমে ওরা দেবদূতদের জবাই করলো

তারের দড়ি দিয়ে তাদের রোগা শাদা পা বেঁধে

আর

তাদের রেশমের কন্ঠ শীতল ছুরি দিয়ে চিরে

মুর্গির বাচ্চার মতন ডানা ঝাপটিয়ে তারা মারা গেল

আর তাদের অবিনশ্বর রক্ত জ্বলন্ত পৃথিবীকে ভিজিয়ে দিলো

আমরা মাটির তলা থেকে তা দেখলুম

সমাধিফলক থেকে, কবরের গুপ্তঘরে

আমাদের হাড়গিলে আঙুল চিবিয়ে

আর

পেচ্ছাপে দাগ-ধরা গোটাবার চাদরে কাঁপতে লাগলো

বিদায় নিয়েছে উচ্চশ্রেনির দূতেরা আর স্বর্গীয় দূতেরা

ওরা ওদের খেয়ে ফেলেছে আর মজ্জার লোভে হাড় ফাটিয়েছে

ওরা নিজেদের পাছা পুঁছেছে দেবদূতদের পালকে

আর এখন তারা পাথুরে রাস্তায় হাঁটছে

আগুনের গর্তের মতন চোখ নিয়ে

২.

দেবদূতদের ব্যাপারে কে শাসকদের খবর দিয়েছে ?

কে যিশুর শেষ-ভোজের পেয়ালা চুরি করেছে আর তা বদলে দিয়েছে একজগ মদ দিয়ে?

কে গ্যাব্রিয়েলের সোনালি শিঙকে লোপাট করেছে ?

                           তা কি কোনো ভেতরের লোক করেছিল ?

কে দেবতার মেষশাবককে পুড়িয়ে খেয়েছে ?

কে সন্ত পিটারের চাবিগুলো উত্তর সাগরতীরের

পায়খানার মধ্যে ফেলেছে ?

কে সন্ত মেরিকে ঘরসামলাবার ছাপ মেরেছে ?

                           তা কি কোনো ভেতরের লোক করেছিল?

আমাদের অস্ত্রগুলো কোথায় ?

আমদের গদাগুলো কোথায়, আমাদের আগ্নেয়তীর, আমাদের বিষ-গ্যাস

আমাদের হাতবোমা ?

আমরা বন্দুকের জন্যে হাতড়াই আর আমাদের হাঁটুতে গজায় ক্রেডিট কার্ড।

আমরা বাতিল চেক বমি করি

দুই পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকি চাপের সামনে সাবান-মাখা মুখে ফুঁপিয়ে

আমাদের রেডিওঅ্যক্টিভ চোখে

আর চিৎকার করি

শেষতম রাইফেলের জন্য

পয়গম্বরি কামান

ইস্টারের বোমা

নারীদের গর্ভ চিরে শিশুদের বের করে আনে

বেয়োনেট দিয়ে

অন্ধ নার্সদের চোখে রক্ত ছেটাতে থাকে

তাদেরই তরোয়ালে তাদের কচুকাটা করার আগে

পুরুষদের লিঙ্গ হয়ে উঠেছে নীল ইস্পাতের মেশিনগান,

বুলেট বীর্যপাত হয়, মৃত্যুকে ওরা অরগ্যাজমের মতন ছড়িয়ে দ্যায়

ঝোপের ভেতরে প্রেমিকরা একে আরেকের লিঙ্গ ওপড়াতে থাকে

লোহার নখ দিয়ে

টাটকা রক্ত খেতে দেয়া হয় স্বাস্হ্যের জন্য বীজানুহীন

কাগজের কাপে

ক্লাবের সিফিলিসে ভোগা মেয়েরা তা এক ঢোঁকে গিলে ফ্যালে

পেপিয়ার মাশে মুখোশ পরে

প্রত্যেকে মুখ হাতে রাঙানো হ্যামলেটের মা

দশ বছর বয়সে

আমরা মাটির তলা থেকে দেখি

আমাদের চোখগুলো দূরবীনের মতন

আমাদের আঙুল ছুঁড়ে দিই কুকুরদের দিকে লজেঞ্চুসের জন্য

তাদের ডাক থামাবার উদ্দেশে

শান্তি বজায় রাখার খাতিরে

বন্ধুত্ব করা আর প্রভাবিত করার জন্য

৩.

বোমা পড়লে আশ্রয় নেবার কোলাপসিবল ঘরগুলো আমরা কোলাপস করে দিয়েছি

আমরা জীবন বাঁচাবার গোটাবার নৌকোগুলো গুটিয়ে ফেলেছি

আর বারোটা বাজবার পর

সেগুলো ভেঙেচুরে ইঁদুরের গুয়ে জমে পাহাড় হয়েছে

সার হয়েছে বিষাক্ত ফুলের জন্য

আর ভিনাসকুঁজো গাছের জন্য

মাটির তলায় আমরা গুঁড়ি মেরে থাকি

আমাদের ছ্যাঁদাকরা বুক জড়িয়ে ধরি ছাতাপড়া বাহু দিয়ে

আমাদের ছিন্ন শিরা থেকে টপটপ রক্ত পড়ার আওয়াজ শুনতে থাকি

আমাদের চেনলাগানো খুলির ব্রহ্মতালু উপড়ে তুলি

মস্তিষ্কে হাওয়া খেলানোর জন্য

                  ওরা আমাদের দেবদূতদের খুন করেছে

কৌতূহলীদের কাছে আমরা আমাদের দেহ আর সময় বিকিয়ে দিয়েছি

আমরা আমাদের শৈশব বেচে দিয়েছি ডিশওয়াশার আর মিলশহরের বিনিময়ে

আর নুন ঘষেছি রক্তাক্ত স্নায়ুতে

অনুসন্ধানের সময়ে

                আর ওরা দেবতার খোলা মুখে হেগেছে

ওরা সন্তদের শেকল বেঁধে ঝুলিয়েছে আর ওরা

পয়গম্বরদের ঘুমের ইনজেকশান দিয়েছে

ওরা ক্রিস্ট আর শিশ্ন উভয়কেই অস্বীকার করেছে

আর বুদ্ধকে বলেছে স্কিৎসোফ্রেনিবার রোগী

ওরা যাযকদের আর পবিত্র পুরুষদের নপুংসক করে দিয়েছে

এমনকি প্রেমের শব্দগুলোকে সেনসর করেছে

        প্রতিটি মানুষের জন্য মগজের শল্যচিকিৎসা!

আর তারা রাষ্ট্রপতি পদের জন্য একজন অবমানবকে বেছেছে

        প্রতিটি গৃহিণীর জন্য মগজের শল্যচিকিৎসা!

        প্রতিটি ব্যবসাদারের জন্য মগজের শল্যচিকিৎসা !

        শিশুদের প্রতিটি স্কুলের জন্য মগজের শল্যচিকিৎসা !

আর তারা দেবদূতদের খুন করেছে

৪.

এখন গলিগুলোতে উভলিঙ্গীরা জড়ো হয় কুষ্ঠরোগিদের ঘণ্টা বাজিয়ে 

যেমন করে ধুনুচি জ্বালিয়ে দেবতাদের ধর্ষণ করার উৎসবের তোড়জোড় করে

        যে চর্বি ওদের ঠোঁটে চকচক করে তা দেবদূতদের দেহের

        যে রক্ত তাদের থাবায় জমে থাকে তা দেবদূতদের রক্ত

ওরা রাস্তায় জড়ো হচ্ছে আর দেবদূতদের চোখ নিয়ে দাবা খেলছে

        ওরা শেষ মানুষদের প্রলয়ের জন্য গড়ে তুলছে

৫.

এখন ভোরবেলার পরে

আমরা মাটির তলায় পাথর সরাচ্ছি, গুহার ভেতর থেকে

আমরা ফণিমনসার আঠায় পাওয়া দৃষ্টিপ্রতিভায় চোখ বড়ো করে তুলেছি

আর দাঁত মেজেছি গত রাতের মদে

আমাদের বগল ঠুসে বন্ধ করেছি ধুলোয় আর ছুঁড়ে দিয়েছি

আর তর্পণ করেছি একে আরেকের পায়ে

আর আমরা রাস্তায় ঢুকবো আর তাদের মধ্যে হাঁটবো আর লড়াই করব

আমাদের রোগা ফাঁকা হাত তুলে ধরব ওপরে

আমরা জগতের আগন্তুকদের মাঝে তিক্ত বাতাসের মতন প্রবেশ করব

আর আমাদের রক্ত গলিয়ে ফেলবে লোহা

আমাদের শ্বাস গলিয়ে ফেলবে ইস্পাত

আমরা খোলা চোখে মুখোমুখি দাঁড়াব

আর আমাদের চোখের জল ঘটাবে ভূকম্পন

আর আমাদের বিলাপ পাহাযগুলোকে উঁচু করে তুলবে

সূর্যের পথচলা থামিয়ে দেবে

ওরা আর কোনো দেবদূতকে খুন করতে পারবে না !

চোদার সঙ্গে ভালোবাসাবাসি করা

চোদার সঙ্গে ভালোবাসাবাসি করা

ভালোবাসার সমস্ত উষ্ণতা আর আরণ্যকতা নিয়ে সঙ্গম করা

তোমার মুখের জ্বর আমার তাবৎ গোপনীয়তা আর অজুহাত খেয়ে ফেলছে

আমাকে রেখে যাচ্ছে বিশুদ্ধ জ্বলন্ত নিঃশেষে

এই মিষ্টতা সহ্য করা কঠিন

     মুখ প্রায় ছুঁচ্ছে না মুখকে

     স্তনবৃন্তের সঙ্গে স্তনবৃন্ত আমরা ছুঁইয়েছি

     আর আমরা হয়ে গেছি সহসা অসাড়

     এক তেজোময়তার স্রোতে

যা কিছু আমি এতোকাল জেনেছি তার অতিরিক্ত

     আমরা স্পর্শ করলুম

     আর দুই দিন পরে

      আমার হাত জড়িয়ে ধরল তোমার ধাতুরসাসিক্ত   শিশ্ন                                                 

      আবার !      

                   তেজোময়তা

                   বর্ণনাতীত

                   প্রায়       অসহনীয়    

প্রপঞ্চগুণহীন বস্তু আর প্রপঞ্চের মাঝের আড়াল

           অতিক্রম করে

বৃত্ত            সাময়িকভাবে পরিপূর্ণ

                                     ক্রিয়ার ভারসাম্য

                                             নিখুঁত

         একসঙ্গে পুশাপ আশি, আমাদের দেহ ভালোবাসায় মজে যাচ্ছে

         যা কখনও মজেনি এর আগে

         আমি তোমার কাঁধে চুমু খাই আর তা থেকে লালসার গন্ধ বেরোয়

         কামদগ্ধ দেবদূতদরা নক্ষত্রদের সঙ্গে সঙ্গম করছে

আর চিৎকার করে স্বর্গকে জানাচ্ছে তাদের অপ্রশমণীয় আনন্দ

         ধুমকেতুদের লালসা ধাক্কা খাচ্ছে অপার্থিব মৃগিরোগে

         স্ত্রীপুরুষ লক্ষণান্বিত দেবতারা পরস্পরের সঙ্গে

         অচিন্ত্যনীয় কাজ করছে

         চিৎকার করেসমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে আর তা অতিক্রম করে

                                      ছড়িয়ে দিচ্ছে তাদের আহ্লাদ

আর আমরা পাসাপাশি, আমাদের দেহ ভিজে আর জ্বলন্ত,

আর

     আমরা ফোঁপাই      আমরা ফোঁপাই আমরা ফোঁপাই অবিশ্বাস্য চোখের জলে

     যা সন্তরা আর পবিত্র মানুষেরা ঝরিয়েছে

     তাদের নিজেদের জ্যোতির্ময়  দেবতাদের সামনে   

আমি কানে কানে তোমার প্রতিটি রোমকূপে ভালোবাসা জানিয়েছি   

                           যেমন তুমি জানিয়েছ

                                 আমাকে  

আমার সমস্ত দেহ হয়ে উঠেছে যোনিমুখ     

আমার পা আমার হাত আমার তলপেট আমার বুক আমার কাঁধ আমার চোখ  

তুমি তোমার জিভ দিয়ে

আমাকে অবিরাম চোদা করো   তোমার দৃষ্টি দিয়ে

তোমার কথা দিয়ে তোমার উপস্হিতি দিয়ে

আমরা অন্য মূর্তিতে বদলে যাচ্ছি

আমরা কোমল উষ্ণ আর কম্পনরত

নতুন সোনালি প্রজাপতির মতন

                      তেজোময়তা

                      বর্ণনাতীত

                      প্রায় অসহনীয়

রাতের বেলায় অনেক সময়ে আমি দেখি তোমার দেহ উদ্ভাসিত

ভালোবাসার গ্রিক দেবতা/কবিতা

ভালোবাসার যুবক গ্রিক দেবতাকে প্রণাম যিনি তরুণীদের সঙ্গে সঙ্গম করেন!

কেবল দেবতারাই অমন ঔদার্য্য পছন্দ করেন

সবায়ের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেন সুষমা

ভালোবাসার গ্রিক দেবতাকে প্রণাম ! যিনি সৌন্দর্য্যকে ভালোবাসেন

আর তা সর্বত্র পান     

হে ভালোবাসার গ্রিক দেবতা আমি তোমাকে আর তোমার দেবীদের দেখেছি

ভালোবাসার কামনার কুয়াশায় মোড়া ফুলের মতন সত্য  

যা নিজের দিনে ফোটে আর বাতাসে হারিয়ে যায়

আমি তোমার চোখ দেখেছি আহ্লাদে ধিকিধিকি জ্বলছে    

যখন তুমি তোমার সুন্দর জিভ দিয়ে মিষ্টি মননের সৌন্দর্য্যকে ভালোবাসছিলে  

আর তারপর দেখেছি একই আহ্লাদের গভীরতায় ঝিকমিক করছে

যখন কোমল রমণীরা তোমার বাহুতে শুয়েছিল

ভালোবাসার গ্রিক দেবতাকে প্রণাম ! যিনি প্রেমকে সঞ্চয় করে রাখেন না

বরং তা খরচ করে ফ্যালেন সোনালি ছাঁকনিতে জলের মতন

ভাগাভাগি করে নেন নিজের কোমল খেয়ালি গরিমা

সকলের সঙ্গে যারা তাঁর উপস্হিতিকে মান্যতা দেয়

ফুলের মতন  অবিশ্বস্ত, বাতাস-তাড়িত প্রজাপতির মতন চপল

ভালোবাসার গ্রিক দেবতাকে প্রণাম, তিনি দেবতাদের বালক !

যিনি কেবল সৌন্দর্য্যকে ভালোবাসেন     

আর তা খুঁজে পান সর্বত্র

ফিনিক্সের গান                               

তাহলে আমি আর বড়ো হবো না

যদি শিশু বলতে বোঝায় বিস্ময়ের বোধ   

আমার বৃষ্টিময় বাতাসে আমার মাথায় থাকে বৃষ্টি

আমি সময়ের আগুনে উধাও হবো না

বরং নিজেকে ফিনিক্স হিসাবে প্রমাণ করব

                  ( নক্ষত্রের গুঁড়োর মতন ছাই )

আবার জন্ম আর আবার আর আবার                                         

স্বৈরাচারীদের জন্য কবিতা     

সংবেদনশীল মানুষেরা অসংখ্য–

         আমি প্রতিজ্ঞা করেছি তাদের আলোকিত করব

–বুদ্ধধর্মের প্রথম সঙ্কল্প

মনে হয় তোমাকেও ভালোবাসতে হবে

সুন্দরদের ভালোবাসা সহজ

শিশুদের    সকালের গরিমা   

সহজ  ( যেমন যেমন সমবেদনা বৃদ্ধি পায় )

অচেনাকে ভালোবাসা

অনুধাবন করা আরও সহজ ( সমবেদনায় )

তাতে যে ব্যথা আর সন্ত্রাস লুকিয়ে আছে

যারা নিজেদের চারিপাশের জগতকে

হিংস্রতার সঙ্গে পরিচালনা করেন  এতো ঘৃণা

কিন্তু ওহ     আমি যিশুখ্রিস্ট নই যে

আমাকে যারা ফাঁসি দেয় তাদের আশীর্বাদ করবো

আমি বুদ্ধ নই        কোনো সন্ত নই

আমার সেই জ্যোতির্ময় ক্ষমতাও নেই

বিশ্বাসে আলোকিত

তবু     তা সত্তেও

তুমি একজন সংবেদনশীল মানুষ

এই বাতাসে শ্বাস নিচ্ছ

এমনকি আমিও একজন সংবেদনশীল মানুষ

এই বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি

চাইছি নিজের আলোকপ্রাপ্তি

তোমার জন্যেও চাইতে হবে

যদি আমার যথেষ্ট ভালোবাসা থাকে

যদি আমার যথেষ্ট বিশ্বাস থাকে

হয়তো আমি তোমার পথকে পার হতে পারবো

আর তাকে বদলাতেও পারব

আমাকে ক্ষমা করুন, তাহলে–

আমি এখনও আপনাকে ভালোবাসতে পারব না

ক্যারল বার্জ-এর কবিতা ( ১৯২৮ – ২০০৬ )

আরম্ভের গান

হ্যাঁ   তোমাকে অনুমতি দেয়া হল তুমি

যাও     হ্যাঁ     তুমি জ্যোতির্ময়

গরিমা দেয়া হল     হলে

           অকাট্য

তুমি যেমন তুমি তেমন দাঁড়িয়ে তোমার মতন

হাঁটো

    হ্যাঁ       তোমাকে ক্ষমা করা হল তোমাকে

ভালোবাসা হল আর আলিঙ্গন করা হল

                হ্যাঁ

                         তোমাকে বলে হবে

অসাধারণ যেমন ভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে  আর

সহজ ভাবে বসে থাকবে

                হ্যাঁ           তুমি আরম্ভ করো

এইভাবে       একটা ছোটো পদক্ষেপ       এই পদক্ষেপ

দোনামনা   বিস্ময়কর   যেমন পর্ণ

ফার্ন গাছের বাতাসে

                 তারপর কোমল আগাছা

আরেক পদক্ষেপ যতোক্ষণ না

                  শ্যাওলা  আর তারপর    

হ্যাঁ          তুমি ওখানে বৃষ্টিতে দৌড়োচ্ছো

আলোর হাওয়া          পাতাগুলো

                                   সবই

মুখগুলো শেষ পর্যন্ত বন্ধুদের   ও

                                হ্যাঁ   

হ্যাঁ

            তোমায় দেখতে এতো সুন্দর যে তুমি             

হাঁটছো যেমন দৌড়োও ওড়ো ভেতরে আসো না     

       বাতাস                  পাতাগুলো

                 জ্যোতির্ময়       সূর্য

আর তোমার মুখ             ও শোনো

                       সবই

          হ্যাঁ           শেষ পর্যন্ত                  

জলের সঙ্গে

ওরা প্রত্যেকে বলে ‘আমি তোমাকে ভালোবেসেছি

কেননা তুমি কখনও আমাকে বলোনো যে আমি কুৎসিত’

সাবান রক্তকে থামায় : ঠাণ্ডা জল তাকে মোছে ।

ওর চললো, পুরোনো রাস্তা ধরে

প্রত্যেকটা শহরে, উঁচু হ্যাট পরে

ব্যক্তিগত বঞ্চনায়, ওদের ক্ষয়ে যাওয়া নখ

বিশেষ দিনের ডাক টিকিটে সাজানো

তারওপরে তাদের যৌবনের মুখ । গত বছরের

গুজবগুলো বাঁধাকপিকে স্বাস্হ্যের জন্য উপকারী কলরেছে

আর আলো ছিল মূল্যহীন : এটা

দশ বছর আগে উল্টে দেয়া হয়েছে, আর গৃবধুরা

প্রতিটি পর্বে সেগুলো রান্না করলো । কিন্তু যখন

বাড়িটা চুপচাপ হলো, রাত ডুবন্ত

আত্মধিক্কারে, ‘আমি তোমাকে ভালো ভালোবেসেছি,

লক্ষ করো, লক্ষ করো আমি কি করেছি, দ্যাখো,’

জলের সঙ্গে, কেটলিভরা গরম জল,

রক্ত থামাবার জন্য, আর তার পরের সকালে

ওরা চললো, গ্রামের ঝর্ণার দিকে,

সাবানের শাদা ভুলগুলোকে শোধরাবার জন্য ।

হুলো বিড়াল কিছুই করছে না

ফ্র্যাঙ্ক মার্ফির জন্য

      ও বসে থাকে

           জানোয়ার হবার দরুন

একটা মদ্দা জানোয়ার

                পৃথিবীতে জীবন্ত

ও বেঁচে আছে ।

ও জীবন্ত

দেখে বোঝা যায় নড়চড় নেই

ভেতরের অনুগুলো নড়াচড়া করছে

পৃথিবীর দিকে

বিড়াল বসে আছে

দেখা বোঝা যায় কিছুই করছে না ।

বুকের পাঁজর নড়াচড়া করে

ঝিল্লি যৎসামান্য নড়ছে

ফুসফুস

পাকস্হলী।

চোখ দেখছে সরাসরি সামনে দিকে

অনন্তে

যতোক্ষণ ও নিশ্চল বসে

ও নড়ছে নড়ছে নড়ছে

অসম্পূর্ণ কবিতা

১.

বাইরে যাবার জন্য

                পৃথিবীতে

এখন যে পোশাকে তা

জাপানি ছাপাখানা মালিকের,

চোখ নয় কিংবা

অধিনেত্রকোণ, কিন্তু

                    হ্যাঁ,

দশণানুপাত

যেমন একটা দ্বীপের হয় :

বাইরে,

       বাইরে এক জগতে,

     এই পৃথিবী পাবার জন্য ! আর

অনেক সহজ, জটিল

যেমন ভাবা হয়েছিল তার চেয়ে :

             ছোটো করে ফেলা যায়

কয়েকটা লাইনে

ছায়া দিয়ে, কাঠকে

তার কণায়

বাইরের আঙ্গিকের বদলে বরং ।

                         কোন

অংশে তুমি আছো পৃথিবীতে !

আর তার পরে, কোথায়

বাইরে যাও,

হয়তো ডাইনির

পোশাকে,

যখন জানলে

চারিদিকে সমুদ্র ! আর

কড়ি ছড়ানো : লাইন আঁকা

বালির ওপরে ।

            একবার ।

জমির ওপরে সেতু তৈরি।

২.

যেতে দিন

       হতে দিন পৃথিবীর রঙে ;

কমলা কিংবা মরচে-রঙা কিংবা

এটেল মাটির মতন কালো

যেখানে নদীরা রয়েছে

                     কিংবা নীল

শিকড়

খরাভূমির গেরুয়া থেকে,

                 বাঁচানো

বৃষ্টিতে পরিশুদ্ধ

এক হাতের দিকে ।

কিন্তু সব সময়

                 এই কম্বলের মতন

বোনা

আসল ভেড়ার পশম থেকে,

জীবন্ত, কাঁচি দিয়ে তোলা

আর রাঙানো

হয়তো বেরি দিয়ে

যতক্ষণ না ঝকমকে, কিংবা

                        যেন হয় তেমন:

              নরম স্বাভাবিক ।

কিন্তু সব সময়ে

                 ফ্যাশন-করা

চোখ দিয়ে, হাত দিয়ে,

বন্ধুদের মুখের মতন, ক্ষয়াটে কিংবা

যুবক : প্রকৃতির সঙ্গে

                  তা স্বাভাবিক,

            করে তোলা

               হয়েছে।

হেতু এবং উৎপত্তি সম্পর্কে

( ডেনিসে লেভেরটভের জন্য )     

যেমন একজনের হাড়গুলো আর চিন্তাধারা

শাখার মতন দেখা দেয়, চামড়ার মধ্যে দিয়ে,

বছর কেটে যাবার সঙ্গে, ফার্ন পাতার মতন আঁকা

দৃশ্যমান বা আবছা, কন্ঠস্বর মনে পড়ে

যখন পৃষ্ঠা পড়া হয়, এটা হলো বোধ যা

আসতে চলেছে তার, যখন আবিষ্কার হয়

এই মুখ তেমন নতুন নয়, শেষ পর্যন্ত ।

তোমার বিরুদ্ধ ধারণা যখন মেনে নেয়

এই সংজ্ঞাগুলো দিয়ে তুমি যা হয়েছো ।

পরিচ্ছন্নতার প্রভাবে, প্রয়োজনহীন পতন আর পতন,

নতুন যে নকশা তার মিল অক্ষরের সঙ্গে,

অতীত বনিয়াদ গড়ে ফেলছে কিংবা যে পথে

সূক্ষ্ম পর্দাগুলো উঠে যায় ।

সেগুলো হলো তোমার কাছে যা চলে আসছে, মনে করাবার জন্য

হেতু ও উৎপত্তি সম্পর্কে, তোমার নিজের পাতায় ।

ছোটো শহর    

যা আমরা প্রত্যেকে করি

তা বেশ আগ্রহসঞ্চারী ।

বিশেষ করে একে অপরের জন্য ।

পরস্পরের কাছে আগ্রহসঞ্চারী ।

আমরা যা করি

একে অপরকে ।

এটাই সবচেয়ে

আগ্রহসঞ্চারী জায়গা

পৃথিবীতে বড়ো জোর

আগ্রহসঞ্চারী সম্ভাব্য সময় ।         

এখানে । ঠিক এক্ষুনি । আমরা

সঠিক, এখন ; আমরা সঠিক

এখানে । আমরা সঠিক ।

হ্যাঁ, আমরা সবাই এখানে।

আমরা এখানে । সবকিছুই এতো

আগ্রহসঞ্চারী, পরস্পরের কাছে

এমন জায়গা যাকে রাখা উচিত

ইতিহাসে,

পৃথিবীতে এই সময়ে !

যা আমরা করছি তা করে যাবো, যেভাবে

আমরা করি, ওকে আর

পরস্পরের সঙ্গে। আর সব সময়ে

পরস্পরের সম্পর্কে আগ্রহী ।

তুমি যদি এখানে এসে থাকো, তুমি

আপনা থেকেই এখানের হবে

নিশ্চয়ই, আর তুমি হবে

যা আমরা করি তার অংশীদার

এর একটা অংশ যাবে-আসবে

আর তাই আগ্রহসঞ্চারী

যখন তুমি কিছু করছ

আর তোমাকে করা হচ্ছে ।

ইতোমধ্যে, আমরা সবাই এখানে

এই জায়গায় আর এটা

থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো

এখন তো অবশ্যই অন্য সময়ের চেয়ে ।

বারবারা মোরাফ-এর কবিতা

গাইজিন গিরি

সিড কোরম্যানের জন্য

আমাদের মতন অন্যেরা

তুমি কখনও

কামলালসার কবিতা লেখোনি

আমরা প্রত্যক্ষ করলুম

তোমাকে অনুসরণ করতে হবে

তার ভেতর দিয়ে অন্ধকার

আর আগ্নেয়

দরোজা যা যাচ্ছে

রহস্যের

ডাকিনিদের

বাড়ি

তবু মাছের মতন

লাফিয়ে

জল থেকে

তুমি ছিলে না

তুমি কে

দাওনি

সম্ভ্রম

সম্পাদক হিসাবে তুমি

খুন করার

সংবেদন রাখতে

যারা তোমার প্রথম

দর্শনে কুপোকাৎ

মিটার

এখনও পরের

শতাব্দিতে চলছে

শিরোনাম নেই

এটা অন্যরকম দেখায়

যেমন দেখতে

তা থেকে

প্রায় সবসময়

প্রায় সবসময়

প্রায়

সব জিনিসই

সব জিনিস

সব জিনিসই

সব জিনিস

নারী আর

পরুষ পথ

মিলছে

নারী আর পুরুষ

রাস্তা পেরোচ্ছে

হালকা বৃষ্টি পড়ছে

ওদের সামনে, তাদের

আশেপাশে

তাদের মাঝে

তাদের ওপরে

বৃষ্টি বেঁকা হয়ে পড়ছে

অন্য শূন্যতা থেকে

যেখানে মেয়েটি

যোগমগ্ন

ওর পেছনের পাথর

পেছনে স্বচ্ছ

আর ওর সামনের জায়গায়

গোলাপি শার্ট-পরা পুরুষ

টাকমাথা আর ছিপছিপে,

জগিং করছে যে জায়গায়

তা অন্যরকম দেখাচ্ছে

যেমন দেখতে তা থেকে

প্রায় সবসময়

প্রায়

গোলাপি শার্ট-পরা লোকটা

মেয়েটার

ঘন খোলা গোলাপে

শুভকাজের

মতন জরুরি

শ্বাসের মতন

শ্বাস শুধু

গড়তে পারছে না

টাকমাথা লোকটাকে

গোলাপিত

শার্ট

মেয়েটাকে

পেরিয়ে চলে গেল

এমনভাবে

প্রায়ই

স্তব্ধ করে

মেয়েটার মন

এমন ব্যথায় একটা

সহজ

হ্যালো !

সামগা সামগাই

আমি ক্ষ্যাপা

যাকিছু

গোপন তা

প্রতিদিনের অংশ

যেমনভাবে আমরা

বেঁচে আছি

কখনও পৃথক হই না

একাকীত্ব থেকে ।

যাও কথাটা গিয়ে বলো

শহরে ।

ঘুমোতে যাচ্ছি

ও যেতে চায় না

বিছানায়

ওর বয়স দশ বছর

ওর বন্ধুও যাচ্ছে না

ঘুমোতে এতো তাড়াতাড়ি ও ক্লান্ত নয় ও

চোখ খুলে হাই তুলছে বেশি অক্সিজেন পাবার জন্য

ক্লান্ত হওয়ার সঙ্গে ওর কিছু করার নেই কিংবা দরকার

ও বলে সাত ঘণ্টার বেশি ঘুম তা যতো

বয়সই তোমার হোক না কেন সেটা কোনো প্রশ্ন নয়

মুখ এমন নিশ্চিত

আমি ওর চুমু নেয়া থামিয়ে/বোলো না/ওকে বোলো না তৈরি হয়ে নাও

এখন বিছানায় যাবার জন্য ওর সব সময়েই লাগে

আধ ঘণ্টা বা বেশি ও বলে তোমার মতন মেজাজি হয়েছে তাই ?

ঠিক আছে আর তিন মিনিট নয় এখন থেকে আমি বলি এখন

আমি আমার গণিতের হোমটাস্ক করে ফেলেছি ও বলে বাজে ব্যাপার আমি বলি তুমি

টিভি দেখছিলে আঠার মতন সেঁটে গ্লুওন-এর মতন গ্লুওন আবার কি জিনিস

ও বলে কালকে আমি বলি আমি এই বিষয়ে যা জানি এখনই বলছি

তুমি বিছানায় যাবার জন্য তৈরি হচ্ছো কি না আমার হুকুম আর

কানের পেছন দিকটা ধুয়ে ফেলতে ভুলো না সত্যিই আমি হুকুম করছি

ও ভাবে আরেকটা কোনো অজুহাত দেয়া যায় কিনা, আহা আমি ওকে বিছানায়

পাঠাই কানের পেছনে ময়লা নিয়েই

এটাই আমার সুযোগ আমি হাই তুলি ব্যাপারটা অক্সিজেনের আমি

স্নানঘরে যাই দাঁত মাজতে আর মুখ ধুতে, ওহ এটা ঘুমোবার সময়

ডেনিসে লেভেরটভ-এর কবিতা ( ১৯২৩ – ১৯৯৭ )

ঘোষণা

আমরা দৃশ্যটা জানি : ঘর, নানাভাবে সাজানো,

প্রায় সব সময়েই এক বক্তৃতার টেবিল, একটা বই ; সব সময়

দীর্ঘ লিলিফুল ।

বিশাল ডানা মেলে পবিত্র মহিমায় নেমে এলেন,

দৈবিক দূত, দাঁড়িয়ে বা মাথার ওপরে ঘুরছেন,

যাকে উনি চেনেন, এক অতিথি ।

কিন্তু আমাদের বলা হয়েছে ভীরু আনুগত্যের কথা। কেউ বলেনি

সাহস

উৎসারিত তেজোময়তা

তাঁর অনুমতি ছাড়া সামনে যায়নি । ঈশ্বর অপেক্ষা করছিলেন।

উনি স্বাধীন

গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে, বাছবার অধিকার

যা মানবিকতার অঙ্গ ।

কোনো ঘোষণা কি নেই

এক বা অন্য ধরণের বেশিরভাগ জীবনের ?

অনেকে অনিচ্ছায় পরম নিয়তি বেছে নেয়,

তাদের কার্যকর করে বিরূপ গর্বে,

বুঝতে না পেরে ।

বেশিরভাগ সময়ে সেই মুহূর্তগুলো

যখন আলো আর ঝড়ের পথএকজন পুরুষ বা নারীর অন্ধকার থেকে বেরোয়,

তাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়

আতঙ্কে, দুর্বলতার ঢেউয়ে, বিষণ্ণতায়

আর অসুবিধা লাঘবে।

সাধারণ জীবন চলতে থাকে।

ঈশ্বর তাদের যন্ত্রণা দেন না ।

কিন্তু সিংহদুয়ার বন্ধন হয়ে যায়, লোপাট হয় পথ…

উনি একজন শিশু ছিলেন যিনি খেলা করতেন, খেতেন, বানান

করতেন অন্য শিশুদের মতন — কিন্তু অন্যদের মতন,

দয়া ছাড়া কাঁদতেন না, হাসতেন না

বিজয়ে নয় আনন্দে ।

সমবেদনা ও বুদ্ধি

মেশানো ছিল তাঁর মধ্যে, অবিভাজ্য ।

আরও যুগান্তকারী নিয়তির জন্য ডাক পড়ল

অন্যান্যের চেয়ে বিশেষ সময়ে,

উনি পেছপা হলেন না,

কেবল জিগ্যেস করলেন

সহজভাবে, “কেমন করেই বা এটা হতে পারে ?”

আর গম্ভীরমুখে, সৌজন্যে,

দেবদূতের উত্তর হৃদয়ে মান্যতা দিলেন,

তক্ষুনি বুঝতে পারলেন

তাঁকে যে অদ্ভুত মন্ত্রিত্ব উপহার দেয়া হচ্ছিল :

তাঁর গর্ভে ধারণ করতে হবে

অনন্ত ওজন আর ভারহীনতা ; বইতে হবে

গোপনে, সীমিত অন্তরে,

নয় মাসের অনন্তকাল ; ভেতরে রাখতে হবে

কোমল অস্তিত্ব,

ক্ষমতার যোগফল–

এক মৃদু মাংসে,

আলোর যোগফল ।

তারপর জন্ম দিতে হবে,

বাতাসে ঠেলে বের করতে হবে, এক মানব-শিশুকে

অন্য সকলের মতন যার প্রয়োজন

দুধ আর ভালোবাসা—

কিন্তু তিনি ছিলেন ঈশ্বর ।

উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ে ক্যালিফোর্নিয়ায়

ক্ষয়রোগে মৃত ইউকালিপটাস গাছগুলোর মাঝে,

ক্রিসমাসের তুষারে মরচে-পড়া গাছ আর ঝোপের মাঝে

ক্ষেত আর পাহাড়তলি পাঁচ বছরের খরায় হাঁপিয়ে-ওঠা,

এক ধরণের বাতাসি শাদা ফুল নিয়মিত ফুটেছে

পুনরায় ফুটেছে, আর ফিকে গোলাপি, ঘন গোলাপি ঝোপ–

এক সূক্ষ্ম আতিশয্য । তাদের মনে হল

অতিথিরা আনন্দে এসে পড়ছেন পরিচিত

উৎসবের দিনে, বছরের ঘটনাগুলো সম্পর্কে অবিদিত, দেখতে পাননি

চটের পোশাক অন্যেরা পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।

আমাদের কয়েকজনের, মনপরা উপত্যকা ভালো সঙ্গ দিচ্ছিল

আমাদের লজ্জা আর তিক্ততার পাশাপাশি । আকাশ চিরকেলে-নীল

প্রতিদিনের সূর্যোদয়, আমাদের বিরক্ত করছিল হাসাবার বোতামের মতন।

কিন্তু ফুটেথাকা ফুলগুলো, সরু ডাল আঁকড়ে

উড়ন্ত পাখিদের চেয়েও বেশি সতর্ক,

ভেঙেপড়া হৃদয়কে উৎসাহিত করছিল

এমনকি তার নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে ।

                           কিন্তু

আশার প্রতীক হিসাবে নয় : ওরা ছিল ফালতু

অপরাধের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিরোধ

–আবার, আবার— আমাদের নামে ; আর হ্যা, তারা ফিরছিল

বছরের পর বছর, আর হ্যাঁ, সংক্ষিপ্ত সময়ের নির্মল আনন্দে উজ্বল হয়ে উঠছিল

অন্ধকার আলোর বিরুদ্ধে

শয়তানি দিনগুলোর। ওরা আছে, আর ওদের উপস্হিতি

স্তব্ধতায় অনির্বচণীয় — আর বোমাবর্ষণ হচ্ছিল, ছিল

সন্দেহ নেই আরও হবে ; সেই শান্ত, সেই বিশাল শ্রুতিকটূতা

যুগপৎ । কোনো কথা দেওয়া হবনি, ফুলগুলো

তো পায়রা নয়, কোথাও রামধনুও ছিল না । আর যখন দাবি করা হল

যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, তা মোটেই শেষ হয়নি ।

প্রেমের কবিতা

হতে পারে আমি একটা অসুস্হ অংশ

একটা অসুস্হ জিনিসের

     হয়তো কোনোকিছু

     আমাকে ধরে ফেলেছে

নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে

আমাদের মাঝে

   আমি তো তোমাকে

দেখতেই পাই না

   কিন্তু তোমার হাত দুটো

দুটো জানোয়ার যা ঠেলে দেয়

কুয়াশা একপাশে আর আমাকে ছোঁয় ।

বিবাহ সম্পর্কে

আমাকে বিয়ের বাঁধনে জেলে পুরো না, আমি চাই

বিয়ে, একটা

সাক্ষাৎ প্রতিদ্বন্দ্বীতা–

আমি তোমাকে বলেছিলুম

সবুজ আলো

মে মাসের

( নৈশব্দের একটা পরদা ফেলা হয়েছে

শহরের মাঝখানের বাগানে,

গত

শনিবারের পর

দুপুর, দীর্ঘ

ছায়া আর শীতল

বাতাস, সুগন্ধ

নতুন ঘাসের,

নতুন পাতার,

ফুল ফোটার জন্য তৈরি

প্রচুর—

আর পাখিগুলোকে সেখানে আমি দেখেছিলুম,

উড়ন্ত পাখিরা যাত্রাপথে থামছে,

বিভিন্ন রকমের তিনটি পাখি :

আজেলা-ফুলের রঙ গোল মাথা, কালচে,

চিত্রবিচিত্র, ফুরফুরে, ইঁদুরপেছল পাখি,

আর সবচেয়ে ছোট্ট, সোনালি কাঁটাদার ঝোপের মতন পরে আছে

কালো ভেনিশিয় মুখোশ

আর তাদের সঙ্গে তিনটে সম্ভ্রান্ত গৃহিনী পাখি

কোমল বাদামি জীবন্ত পালকে মোড়া—

আমি দাঁড়ালুম

আধঘণ্টার মতো জাদুমগ্নতার তলায়,   

কেউ কাছ দিয়ে যায়নি

পাখিগুলো আমাকে দেখলো আর

আমাকে  যেতে দিলো

তাদের কাছে ।)

এটা

অপ্রাসঙ্গিক নয় :

আমার সঙ্গে

দেখা হবে     

আর তোমার সঙ্গে

দেখা করব

তাই,

একটা সবুজ

ফাঁকা জায়গায়, কারারুদ্ধ

থাকতে চাই না ।  

মনচলার পর

একবার আমরা খেটেখুটে

আমাদের পুরোনো সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর —

‘ভৌতিক’, ‘ঘন’, ‘বাস্তব’, ‘বস্তুনিচয়’ —  থেকে মুক্ত হলে

প্রাচীন পরিমাপ থেকে স্বীকার করতে হয় কি,

যদিও খোলাচোখে কিন্তু লুণ্ঠিত

নেত্রগোচর যন্ত্রপাতিতে, দর্শনীয় নয় ( ওহ,

সংক্ষেপে দেখা যায় না ! ) স্বীকার করতে হয়

যে ‘বড়ো’ আর ‘ছোটো’ ওদের

মর্মার্থ নেই, কেননা বস্তু নয় বরং প্রক্রিয়া, কেবল প্রক্রিয়া,

চেষ্টা করে দেখা দেবার

জ্ঞানযোগ্য : জগতসংসার, ব্রহ্মাণ্ড—

তারপর আমরা যা অনুভব করি

দুর্বল গ্রেপ্তারের মুহূর্তে,

আতঙ্কের কালো কাপড় পড়ে যাচ্ছে

আমাদের মুখের ওপরে, আমাদের শ্বাসের ওপরে,

তা পাসকালের আতঙ্কের নতুন এক মোচড়,

নিরীক্ষণের এক প্রসারণ,

এর উদ্দেশ্য এখন

আমাদের মাংসের ভেতরে, অনন্ত পরিসর আবিষ্কার

আমাদের নিজের অণুর ভেতরে, নূনতম

কণা যাকে আমরা অনুমান করেছিলুম

আমাদের নশ্বর অহং ( আর ভেতরে আর বাইরে,

তারা ঠিক কি ? ) — তারা এখন উদ্দেশ্য

আগে থেকে ফেলে যাওয়া শূন্যতা

বিলাসের ঘোষণা, পরিমাপের বিরে

আমাদের অশরীরী, কাল্পনিককে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া,

( হ্যাঁ, কিন্তু সংবেদী, ) পদার্থের ধারণা,

আমাদের ভাষার মতনই ভ্রমাত্মক,

প্রবহণ যা আত্মা কেবল

পরিব্যপ্ত, এড়িয়ে যায় কিন্তু নাছোড় ।

বিবাহের অবিরাম বেদনা

বিবাহের অবিরাম বেদনা:

উরু আর জিভ, হে প্রিয়,

এর সঙ্গে বেশ ভারি,

তা দাঁতে স্পন্দিত হয়

আমরা আংশিদারীর চেষ্টা করি

কিন্তু ফিরিয়ে দেয়া হয়, হে প্রিয়,

প্রত্যেকে আর প্রত্যেকে

এটা হল প্রকাণ্ড হাঙর আর আমরা

তার পেটের ভেতরে

আনন্দ খুঁজি, কোনও আনন্দ

যা এর বাইরে জানা যাবে না

দুই বনাম দুই এর সিন্দুকের

মধ্যে এর অবিরাম বেদনা ।

নভেম্বর ১৫, ১৯৬৯ বিচার বিভাগে

          বাদামি ডিজেল-ধোঁয়া, শাদা

রাস্তার বাতগুলোর তলায় ।

তিন দিকে ছাঁটা, সব জায়গা ভরা

আমাদের দেহ দিয়ে ।

দেহ যা হুমড়ি খেয়ে পড়ে

বাদামি বাতাসহীনতায়, শাদা রঙে রাঙানো

আলোয়, এক ছাতাপড়া বিহ্বল দ্যুতি,

যা হুমড়ি খেয়ে পড়ে

হাতে হাত দিয়ে, অন্ধ-করে-দেয়া, মুখবিকৃতি ।

তাকে চাই, চাইছি

এখানে উপস্হিত থাকতে, দেহ বিশ্বাস করছে নিজের

বিবমিষায় মৃত্যু, আমার মাথা

নিজের বিষণ্ণতায় স্পষ্ট, এক ধরণের আনন্দ,

জানতে পারা যে এটা মোটেই মৃত্যু নয়,

মামুলি, এক দুর্ঘটনা, একটা

ঠুনকো মুহূর্ত। তাকে চাই, চাইছি

আমার যাবতীয় চাহিদা দিয়ে এই ক্ষোভ,

দেহের ভেতরে জানতে পারা

আমরা সকলে কঠোর অস্বাভাবিকতার

বিরুদ্ধে লড়ছি, চাইছি এর বাস্তব রূপ।

নদীর তীরে যেখানে ডিজেলের ধোঁয়া

আইভিলতায় পাক খেলো, পরস্পরকে টেনে নিয়ে

ওপর দিকে, অচেনা, ভাইয়েরা

আর বোনেরা । কিছুই

ঘটবে না কিন্তু

তিক্ততার স্বাদ নেয়া

স্বাদ । নেই জীবন

অন্য, এটা ছাড়া ।

এলিজা কাওয়েন-এর কবিতা ( ১৯৩৩ – ১৯৬২ )

আমি শবগুলোর চামড়া ছাড়িয়ে নিলুম   

আমি শবগুলোর চামড়া ছাড়িয়ে নিলুম

আর আমার স্বপ্নের জন্য নীল রঙে রাঙিয়ে নিলুম

ওহ, আমি এই পোশাক সর্বত্র পরে যেতে পাসরি

বাড়িতে বসে রইলুম জিনস পরে।

আমি শবগুলোর চুল কেটে দিলুম

আর নিজের জন্যে বুনলুম পোকার পক্ষাবরণ

রেশম বা পশমের চেয়ে সূক্ষ্ম আমার মনে হয়

আর তার ভেতরে কাঁপতে লাগলুম ।

আমি শবগুলোর কান কেটে ফেললুম

আমার মাথা ঢাকার টুপির জন্যে

চোরকাঁটার চেয়ে উষ্ণ

আমি তার দাম দিলুম রক্ত দিয়ে ।

আমি শবগুলোর চোখ উপড়ে নিলুম

যাতে সূর্যের মুখোমুখি হতে পারি

কিন্তু দিনগুলো ছিল মেঘলা আকাশ

আর আমি হারিয়ে ফেলেছিলুম নিজের।

শবেদের যৌনাঙ্গ থেকে

আমি কর্মীসঙ্ঘের উর্দি বানালুম

এসথার, সলোমন, ঈশ্বর নিজে

আমার যোনির চেয়ে উদার ছিলেন ।

আমি শবগুলোর চিন্তা নিয়ে নিলুম

প্রতিদিনের প্রয়োজনের খাতিরে

কিন্তু সব দোকানে সব জিনিসে

সুন্দর করে লেবেল লাগানো ছিল ‘আমি’।

আমি শবগুলোর মাথা ধার নিলুম

পড়ার সুবিধার জন্য

প্রতিটি পাতায় দেখলুম নিজের নাম

আর যতো মিথ্যা শব্দ বলেছি সেগুলো।

শবগুলোর হাড় থেকে গড়া এক  যন্ত্র

আমার মানুষের ভালোবাসার সঙ্গে খেলবে

কেবল যে শব্দ বেরোবে চাবিগুলো থেকে

তা পায়রাদের বকবকম ।

আমি অসংখ্য কবরের ভেতরে খুঁড়লুম

আমি ভাবলুম আমার সময় বেশ ভালো কাটলো

আয়নার দিকে যখন তাকাই সে খিলখিল হাসে

আমার মাথায় টাক আমি অন্ধ আর গায়ে সজারুর কাঁটা ।

আমি ভাবলুম শবগুলো গুরুত্বপূর্ণ

যে ঝুঁকি নিয়েছি তা নিশ্চিন্ত করেছে

যে বস্তুগুলো আমি নিয়েছি

তা দামি বিশুদ্ধ শ্বেতপাথরের ।

কিন্তু যখন এক হৃদয়ের আকর্ষণে পড়লুম

( ছোটো মণিরত্ন দিয়ে বদলাবার পর )

দেখলুম তা মনের মতন রক্তে ভরা

আর আমারটা হয়ে গেল ভুতুড়ে ।

এখন যখন আত্মাদের সঙ্গে দেখা হয়

যাদের ফাঁদে আমি কারারুদ্ধ

তারা আমায় মদ কিনে দেয় বা বই পড়ে শোনায়

কেউই আমার জামিন দিতে পারে না ।

আমি যখন আত্মা হয়ে গেলুম

( আমাকে জীবনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে )

আমি আমার মারাত্মক দেহকে বিক্রি করলুম

ছাত্র-ডাক্তারের ছুরির কাছে ।

এমিলি ডিকিনসনকে লেখা কাল্পনিক প্রেমপত্র

এমিলি

গ্রীষ্ম এলে

তুমি খুলে ফেলবে তোমার

রত্নময় মৌমাছিগুলো

যেগুলো আমাকে হুল ফোটায়

আমি খুলে ফেলবো আমার দুর্গন্ধময়

জিনস

হাতে হাত রেখে

আমরা বাইরে দৌড়োবো

সরাসরি দেখবো

সূর্যের দিকে

দ্বিতীয়বার

তামাটে ত্বকের হয়ে ওঠার জন্যে

আমি মনে করতে পারছি না

প্রশ্নটা — সমাধান এইভাবে হলো

বালির দুটো ঢিবি

মরুভূমিতে বাঁয়ে আর ডাইনে, কিন্তু

উত্তরটা ছিল না দীর্ঘ থাম

এক কাপ চা তাদের মাঝে

মুখের প্রতিটি শব্দ এতো কঠিন

আর বিদেশযাত্রা প্রয়োজন

দেয়াল পর্যন্ত আর ফেরত

ঠিক এক্ষুনি মেয়েটা যে পারে

কিছুই না করে তাকিয়ে থাকতে–

যখন ওরা, জনসাধারণ, জগতসংসার

সামলাবার লোক, চেয়ার আর টেবিল তাতে

অবস্হান তাদের সবায়ের মাঝে, গুনতে ব্যস্ত

জিনিসগুলো আমি জানি এখানে আছে

কল্পনা করতে হবে পরিসর অতিক্রম করে

আমার চোখের কেবল যদি যতোদূর ছবিগুলো

কম বাস্তব হয়ে যায় । বিশাল সূর্য

বন্ধ জানালার ভেতর দিয়ে

তারপর আমিও

শেষ পর্যন্ত দুজনেই অদৃশ্য হয়ে যাবো

একটা পুরুষ আরশোলা

একতা আরশোলা

ঢুকে এলো

আমার জুতোর ভেতরে

সুগন্ধী অন্ধকার ওর ভালো লাগলো

একটা আরশোলা

আমার জুতোর ওপরে

উঠে এলো

শীত আর আলো এড়াতে

আমি আমার হাত

ঢোকালুম

ওর পেছনে

আরশোলা

তোমাসর জন্য সবচেয়ে ভালো যা করতে পারি

তোমাকে তুলনা করতে পারি কাঁসার সঙ্গে

আর ইহুদিদের

তুমি মোটেই স্বাগত নও

       আমার জুতো ব্যবহার করার জন্য

পথের ধারে এক খেপ আরাম পেতে

আমার হাতের ছায়ায়

তুমি ফিরে আসতে থাকো

       মেঝের ওপরে

আরও কিছু ? — ভার —

তুমি একটা শুঁড় হারিয়ে ফেলেছো

আমি তোমার শুশ্রুষা করব

শিক্ষক — তোমার দেহ আমার কাব্বালা…

শিক্ষক — তোমার দেহ আমার কাব্বালা

রাহামিম –দরদ

তিফেরেতে — সৌন্দর্য

মিস্টার রচেস্টারের চুরুটের সুবাস

ফুলের মাঝে

         ফেটে বেরোচ্ছে

         আমি তোমার কন্ঠরোধ করতে চাইছি

         সূক্ষ্ম চিন্তা

         প্রস্তাব রাখা হয়েছে

         ফ্র্যাংকেনস্টাইন থেকে মনোরম সৌষ্ঠব

                আমার ভয় থেকে জেগেছে

         আর তুমি

         সুন্দরভাবে

         আমার গলা চেপে ধরো

দেহ আত্মার সামনে ক্ষুধার্ত

       আর তারপর নিজের স্মৃতির জন্য ধাক্কা দেবার পর

কেন ভয় নেই উপযুক্তকে আঘাত করার—

       বুদ্ধি ছাড়া আমাকে আঘাত করতে পারে না, মজার

       আমি পারিনি, পারব না শিল্পের ক্ষেত্রে

       কিন্তু গোলাপ বা পচা বাঁধাকপি দিয়ে

ঠিক–শুধু এসো আমি বাদামি কাগজ ভেঙে বেরোই

       ঘর

           তোমার

       ফ্র্যাংকেনস্টাইন

জগত কি থেকে                   দেবেরো বাবিসতে

দড়ির ওপরে হাঁটে                 আমি

দেসনুয়েলু ( সে কে ? )          তোমার কন্ঠরোধ করার জন্য

দুহামেল                             আর তুমি

দে ব্রৌলে                            সুন্দরভাবে

দেবেরক্স                             আমার গলা টিপে ধরো

দেক্রক্স

দেবেরক্স

বারাল্ট

সূক্ষ্ম

ফরাসি যুক্তি

গির্জা সন্ন্যাসিনীদের কালো ফুলের শেকল

আমরা সবাই খুনি

কেইথের বুড়ো বাপ ঢেউয়ে লাফিয়ে পড়ল

                  মেথাড্রিন

সকালের সূক্ষ্ম নাচ

     “আমি চাই তুমি আমাকে ডেকে নিয়ে যাও

                  যখন আমি পড়ে যাবো”

                  আমি যাইনি আর পড়ে গেলুম

                                   এমনকি মৃত্যুও নয়

                          আমি অপেক্ষা করলুম

                                      ডুবে যাবার

                                     ঘরের সঙ্গে

                                     বিড়াল গুয়ের মতন

                  আমাকে নিয়ে যাবে

ডোনাল্ডের প্রথম বিছানা যেখানে এই কল্পনা

       লজ্জা ওকে তোমায় পালটে ফেলছে

       আর তুমি বলছ কুলফুলের গোটানো কাগজ

       আর সবুজ মোটরগাড়ি

লজ্জা দেহকে চিন্তা যোগাচ্ছে

       আর খেলা

বিড়ালের দোলনা আর কাল্পনিক

         জ্ঞানের জাফরি আর বাখ

         প্রণালী

ভয় তৈরি করছে অপরাধবোধ তৈরি করছে লজ্জা

         তৈরি করছে কল্পনা আর যুক্তি আর খেলা আর

         সৌম্য গরিমাকে ঢাকা

         ঘটনার স্মৃতিকে ফাঁকা করে দিচ্ছে

         মামুলি সৌম্য দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে গরিমা

ঢেকে দিচ্ছে

        দেবদূতদের মাঝে ভেঙচি

হবে না পারব না

খুনির ভয়

ঝোলাভরা কৌশল আর কর্নেলের ছবি নিয়ে বেঁটে লোক

আমার হত্যা আমার জন্য করে দেবে

ঈশ্বর লুকোনো

       আর ছবির পোস্টকার্ডের জন্য নয় ।

এমিলি

আমহার্সটের শাদা ডাইনি এমিলি

     আমহার্সটের ভীরু শাদা ডাইনি

     নিজের শিক্ষদের খুন করল

          তার ভালোবাসা দিয়ে

আমি বরং নিজেরটা কবর দেবো

         আমার মন

কিংবা ভালো হবে ই নরম ধূসর পায়রা।

ডায়ানে ডি প্রিমা-র কবিতা ।

প্রথম তুষার, কেরহঙ্কসন

অ্যালান-এর জন্য

এটা, তাহলে, পৃথিবী আমাকে যা উপহার দিয়েছে

( তুমি আমাকে দিয়েছ )

নরম তুষার

কোটরে মুঠোমাপের

পুকুরের জলের ওপরে পড়ে আছে

দেখতে আমার দীর্ঘ মোমবাতির সমান

যা জানালায় দাঁড়িয়ে থাকে

যা সন্ধ্যায় জ্বলবে যখন তুষার

ভরে তুলবে উপত্যকাকে

এই কোটর

কোনো বন্ধুই নেমে যাবে না

কেউই মেক্সিকো থেকে বাদামি আসবে না

ক্যালিফোর্নিয়ার সূর্যভূমি থেকে, মাদক নিয়ে

তারা এখন ছড়ানো, মৃত বা নিঃশব্দ

উন্মাদনায় ফাটানো

আমাদের সমবেত দৃষ্টিচেতনার চিৎকাররত ঔজ্বল্য দিয়ে

আর তোমার এই উপহার–

শাদা নৈঃশব্দ্য ভরে তুলছে আমার জীবনের বর্ণালী-নকশা ।

নববর্ষের বৌদ্ধ গান

আমি তোমাকে সবুজ মখমলে দেখলুম, ঝোলাহাতা পোশাক

আগুনের সামনে বসে আছ, আমাদের বাড়ি

কোনোরকমে করে তোলা হয়েছে আরও সৌষ্ঠবপূর্ণ, আর তুমি বললে

“তোমার চুলে নক্ষত্র রয়েছে”– এই সত্য আমি

নিজের সঙ্গে নিয়ে এলুম

এই প্যাচপ্যাচে আর নোংরা জায়গায় যাকে আমরা করে তুলব সোনালি

করে তুলব দামি আর কিংবদন্তিপ্রতিম, এটা আমাদের স্বভাব,

আর এটাই সত্য, যে আমরা এখানে এসেছি, আমি তোমাকে বললুম,

অন্য গ্রহ থেকে

যেখানে আমরা ছিলুম দেবীদেবতা, আমাদের এখানে পাঠানো হয়েছে,

কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে

যে সোনালি মুখোশ আমি আগে দেখেছিলুম, তা খাপ খেয়ে গেলো

তোমার মুখে এতো সুন্দরভাবে, ফেরত দিলে না

ষাঁড়ের মুখ তুমি যোগাড় করেছিলে সেটাও

উত্তরের লোকজনদের মাঝে, যাযাবরের দল, গোবি মরুভূমি

ওই তাঁবুগুলো আমি আর দেখিনি, ওয়াগনগুলোকেও নয়

অত্যন্ত ঝোড়ো উপত্যকায় অত্যন্ত শ্লথ,

এতো ঠাণ্ডা, আকাশে প্রতিটি নক্ষত্রের ভিন্ন-ভিন্ন রঙ ছিল

আকাশ নিজেই একটা জট পাকানো রঙচঙে পর্দা, ঝলমল করছিল

কিন্তু প্রায়, আমি সেই গ্রহ দেখতে পাচ্ছিলুম যেখান থেকে আমরা এসেছি

আমি মনে করতে পারিনি ( তখন ) আমাদের উদ্দেশ্য কি ছিল

কিন্তু মহাকাল নামটা মনে ছিল, ভোরবেলায়

ভোরবেলায় শিবকে প্রত্যক্ষ করলুম, শীতল আলো

মেলে ধরল “মননপ্রসূত” জগতগুলো, তেমনই সহজ,

আমি দেখলুম তাদের প্রচার, বয়ে যাচ্ছে,

কিংবা, সহজভাবে বললে, একটা আয়না আরেকটাকে প্রতিবিম্বিত করছিল।

তারপর আয়নাগুলো ভেঙে ফেললুম, তোমাকে আর দেখতে পেলুম না

কিংবা কোনো উদ্দেশ্য, এই নতুন কালোময়তার দিকে তাকিয়ে রইলুম

মননপ্রসূত জগতগুলো বিদায় হলো, আর মন হয়ে গেল স্তব্ধ :

এক উন্মাদনা, নাকি এক সূত্রপাত ?

ভালোবাসার একটি অনুশীলন

জ্যাকসন অ্যালেনের জন্য

আমার বন্ধু আমার স্কার্ফ নিজের কোমরে বেঁধে রাখে

আমি ওকে দিই চন্দ্রকান্তমণি

ও আমাকে দেয় ঝিনুক আর সমুদ্রগাছালি

ও আসে অনেক দূরের শহর থেকে আর আমি ওর সঙ্গে দেখা করি

আমরা একসঙ্গে বেগুনচারা আর সেলেরিশাক পুঁতবো

ও আমাকে কাপড় বুনে দেয়

                  অনেকে উপহার এনেছে

                  আমি সেগুলো ওর আনন্দের জন্য কাজে লাগাই

                  রেশম আর সবুজ পাহাড়

                  আর ভোরবেলার রঙের সারস

আমার বন্ধু আলতোভাবে হাঁটে বাতাসে বোনার মতন

ও আমার স্বপ্নগুলোকে আলো দেখায়

ও আমার বিছানার পাশে বেদি তৈরি করে দিয়েছে

আমি ওর চুলের গন্ধে জেগে উঠি আর মনে করতে পারি না

ওর নাম, কিংবা আমার নিজের ।

জানালা

তুমি আমার রুটি

আর চুলের সিঁথে

আওয়াজ

আমার হাড়গুলোর

তুমি প্রায়

সমুদ্র

তুমি পাথর নও

কিংবা লাভায় গড়া শব্দ

আমার মনে হয়

তোমার হাত দুটো নেই

এই ধরণের পাখি পেছন দিকে ওড়ে

আর এই ভালোবাসা

জানালার কাচে ভেঙে যায়

যেখানে কোনো আলো কথা বলে না

এখন সময় নয়

জিভ জড়াবার

( বালি এখানে

কখনও সরে না )

আমার মনে হয়

আগামীকাল

তোমাকে ওর বুড়ো আঙুলে বদলেছে

আর তুমি

ঝকমক করবে

ঝকমক

আর ঝকমক

যা খরচ হয়নি আর মাটির তলায়

খুকি-ও’র গান, যার জন্ম হয়নি

হৃদয়খুকি

যষখন তুমি চিরে বেরোবে

তুমি পাবে

এখানে একজন কবি

তেমন নয় যা কেউ বেছে নেবে।

আমি কথা দেবো না

তুমি কখনও ক্ষুধার্ত থাকবে না

কিংবা তুমি কখনও দুঃখ পাবে না

এই পোড়া

ভাঙাচোরা

ভূ-গোলকে

কিন্তু আমি তোমাকে দেখাতে পারি

খুকি

যথেষ্ট ভালোবাস দিয়ে

তোমার হৃদয়কে যা ভেঙে ফেলবে

চিরকালের জন্য

“মেয়েটিই বাতাস”

মেয়েটিই বাতাস যাকে তুমি ছেড়ে যাবে না

কালো বিড়ালকে তুমি মেরে ফেললে ফাঁকা গ্যারাজে, মেয়েটি

গ্রীষ্মকালের ঝোপজঙ্গলের গন্ধ, এমন একজন যে

উঁকি দেয় ছেলেবেলার খোলা আলমারিতে, মেয়েটি কাশে

পাশের ঘরে, শিস দেয়, তোমার চুলের পাখির বাসায়

সে ডিম পাড়ে

জানালার দিকে মুখ করে

মেয়েটি

তোমার আগুনচিমনির বাঁশি, শ্বেতপাথরের প্রতিমা

ম্যান্টলপিসে খোদাই-করা

যে রাতের বেলায় অপেক্ষা করে।

মেয়েটি প্রাচুর্যদায়িকা

যে রাতে কাঁদে, মৃত্যুর বাঁধন

তুমি ছিঁড়তে পারবে না, কালো সজল চোখ

ঝোপের পেছনে উন্মাদ মেয়েরা ক্যারল গাইছে, মেয়েটি

তোমার বিদায়গুলোর শিস ।

সবুজ মণীতে কালো কণা, আওয়াজ

নিঃশব্দ প্রণাম থেকে, মেয়েটি

পুড়ে যাওয়া দেয়ালপর্দা

তোমার মস্তিষ্কে, আগুনরঙা আলখাল্লা

পালকের তৈরি তোমায় নিয় চলে যায়

পাহাড়ের বাইরে

যখন তুমি আগুন হয়ে দৌড়োও

নীচের দিকে

কালো সমুদ্রে

জোয়ান কায়গা-র কবিতা ( ১৯৩৪ – ২০১৭ )

তামালপায়িস পাহাড়ের স্ফটিক

তামালপায়িসে আছে এক বড়ো স্ফটিক ।

পরিচিত একজন গল্পটা বলেছিলেন।

একজন মিয়োক তার দাদুর ওষুধের ঝুলি

বার্কলের ক্রোয়েবের সংগ্রহশালাকে দিচ্ছিলেন ।

তিনি বললেন এই লোকটা বছরের এক নির্দিষ্ট সময়ে

আমায় তামালপায়িস পাহাড়ে নিয়ে গিয়েছিল ।

আমার বিশ্বাস তা ছিল দক্ষিনায়ণের কাছাকাছি সময়ে,

কেননা তখন প্রবাহের জল নীচের দিকে থাকে ।

ওরা থামল আর পাহাড়ে ওঠার পথে কোনো একটা একটা গুল্ম সংগ্রহ করল ।

বোলিনাসের তীরে শান্ত এলাকায় যাবার পথে একটা বেশ বড়ো পাথর আছে ।

                                                                       চলে যাও

পাথরটার কাছে । ওষুধের ঝুলি থেকে স্ফটিক বের করো

যার সঙ্গে তামালপায়িসের স্ফটিকের মিল আছে । আর

                                                যদি তোমার হৃদয় সত্য না হয়

                                                যদি তোমার হৃদয় সত্য না হয়

যখন তুমি শান্ত জায়গায় পাথরটায় টোকা দেবে

                                                তার একটা টুকরো উড়ে যাবে

                                                 আর তোমার হৃদয়ে টোকা দেবে

                       আর তোমাকে মেরে ফেলবে ।

আর সেটাই ছিল প্রথম গল্প যা আমি বোলিনাস সম্পর্কে শুনেছিলুম।

তা সে বহুকাল হয়ে গেল

‘বিপ্লবের সময়ে লিখে রাখা’

এই গল্পের স্বরকম্পনের সময়ে তুমি আরও স্বরকম্পন পাবে।

আমি বলতে চাইছি, এক স্বরকম্প, গানের ক্যানটাস,

আমি বলতে চাইছি, আমাদের গড়ে তোলো,

আমি বলতে চাইছি কাগজ,

আমি বলতে চাইছি সেই রাজত্বের কথা যা আসতে চলেছে,  

এখানে আবিষ্কারের পথে। তা ওম শ্রীমৈত্রেয়,

তুমি আমার স্বরকম্প ডিঙিও না,

কিন্তু ওদের সঙ্গে সর্বনাম হারিয়ে ফ্যালো,

এটা হলো তোমার, এটা হলো তুমি

এটা হলো স্বয়ং, এটা হলো আমি ।     

যন্ত্ররা ধাতব, আমরা তাদের সামলাতে পারি,

তারা আমাদের সেবা করে, আমরা তাদের সামলাই।

এটা আমাকে প্রদত্ত, আর এটা তোমাকে ।

তুমি আমাকে তুমি বলো, আর আমি তোমাকে তুমি বলি ।

কিছু যন্ত্র বেশ সূক্ষ্ম, তারা নিখূঁত,

তারা  পিষে ফেলার বড়ো ধাতব জিনিস নয় ।

যুবতীটি যথেষ্ট কবিতা তৈরি করেছে নিজের সঙ্গী হিসাবে।                                                                    

আমার অনুভূতি । তুমি আমার অনুভূতিদের আটক করেছ ।

আমার দীর্ঘ ছায়ার দল, দীর্ঘ ছায়ারা, দীর্ঘ ছায়ারা।

আমার মিষ্টি মৃদু স্বরের ওঠানামা,

আমার মিষ্টি মৃদু স্বরের ওঠানামা আমার বাহু ।

কেবল কিসের জন্য : যে গান যুবতীটি গেয়েছিল যে গান যুবতীটি গেয়েছিল

সেপ্টেম্বর

            ঘাসগুলো ফিকে বাদামি

            আর সমুদ্র চলে আসে

            দীর্ঘ কাঁপতে থাকা পংক্তি

            কাল রাতের পর পায়ের তলায়

           যা এখন ভোরবেলায় ঢুলছে

          এখানে সেখানে ঘোড়ারা চরে বেড়াচ্ছে

         অন্য কারোর মাঠে

                             অদ্ভুত, তা আমার আকাঙ্খা ছিল না

যা বিদায় জানালো গির্জায় বলার জন্য যাতে আমাকে মুক্তি দেয়া হয়

        কিন্তু যেভাবে স্মৃতির ফিরে আসার কথা  

        অবহেলায় আর বিদেশি খেলা                 

             যখন চরিত্ররা ছিল প্রতিশ্রুতি

তারপর স্বীকরতি । পরিবর্তনের জগতসংসার

বাস্তব কিন্তু বাস্তব নয় বরং বিশ্বাসের ।

             এই শিক্ষা যথেষ্ট ? আমি বলতে চাই

নীতিমূলক প্রবাদ তোমাকে ভেতরে নেবার জন্য আর বাইরে নিয়ে যাবার জন্য

ভালোবাসার রহস্যময় বাঁধন থেকে ?

                     যাহোক আমি নিজে আমি নই     

আর টিকে থাকার কোন ক্ষমতার কথা আমি বলি

আমাদের জন্য যা বাড়ির তৈরি নয় ।

         এ হলো অন্তরজগতের বিলাস, সোনালি প্রতিমার

যা শ্বাস যেমনভাবে পাহাড়েরা নেয়

         আর যা ত্বক নক্ষত্রেরা শ্যামল করে দিয়েছে।

“যখন আমি উদ্বেগে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতুম, সবায়ের”

যখন আমি উদ্বেগে দৃষ্তি নিবদ্ধ করতুম, সবাই

               আমার চেয়ে এগিয়ে থাকত, আমি একেবারে তলানিতে

                          টোটেম থামের,

            ছড়ানো এক উবু জানোয়ার ।

কেমন হয় একটা দ্রুত মালিশ হলে এখন, যুবক আমাকে বলল।

আমি মনে করি না তা উচিত হবে, জবাবে বললুম।

ওহ, বলল যুবক, একটু থেমে, আমার অপেক্ষা করা উচিত ছিল

              তোমার জিজ্ঞাসা করার আমাকে

         ঢেউগুলো কাছে আরও কাছে এসে পড়ল ।

যখন আমি সন্দেহের ফাঁদে পড়ি আমি তখন এখানে থাকি না ।

এই জগতে যা ঘরবাড়িতে আবদ্ধ করে ফেলেছে নিজেকে

            আর যোগাযোগের জাল, আমি বাইরে উড়ে যায়

তলপেটের তলা থেকে।   জীবনের ঝকমকে মুকুট

ঘুরন্ত আলোর, মাথার ওপরে পাক খায়।    বিশুদ্ধ

বিস্ময়ে, তপ্ত

বিস্ময়ে ।   পথগুলো সোনালি হয়ে ওঠে । সমস্তকিছু

মাপে বড়ো হতে থাকে, রঙগুলো উজ্বল হয়, আমরা কিংবদন্তিতে ।

আমরা সহজ বোঝাপড়ায় ।

বেশি কথা বলি না, আমাদের মধ্যে চিন্তা যাতায়াত করে ।

                                   এটা স্মৃতি । আর আমি খুঁজি

ভেসে চলার মিষ্টি দিনগুলো । কুয়াশা সমুদ্রে চলে গেছে, বাতাস ।

ও জংলিঝোপ ছাঁটাই করছে

                             ও জংলিঝোপ ছাঁটাই করছে

                         অসুস্হ দুঃখের একাকীত্বের

      বাতাসের আলগা টুকরোয় ও ক্লিপ ক্লিপ ক্লিপ চালায়

সবুজ ফুলের ডালগুলো পড়া যায় — ‘এরা চলে যাচ্ছে

             আয়ত্বের বাইরে’       মজাদার আর আদরযোগ্য কি এক তাড়না

                   আমরা মনে করি             অজস্র

আত্মপরিচয়       যখন তুমি গান গাও    কতো সুন্দরভাবে    ভেসে যাওয়া

              মেঘগুলো — তুমি এই জগতে একা নও

        নও একলা এক সমান্তরাল পপতিবিম্বের জগত

                         এক জানালায় আগুন জ্বলতে থাকে

                  ফ্রেমে মণ্ডলম, লাল আলোকরশ্মির শিখা

বৃষ্টিতে রাখা বাগান-চেয়ারের পেছনে বসে থাকে

বৃষ্টিতে লাল আলখাল্লা-পরা বৌদ্ধলামারা শহরের ঘিঞ্জি এলাকায় রামধনু জাগে

                    সরল দেশ       অভ্যাস করে বজ্রপাতের

বিদ্যুতের,   শিলা আর বৃষ্টি     আটটা ডগলাস কনীনিকা

                রিবনের লক্ষ্যের পরত

         অতএব  ‘আত্ম’-কে অবিরাম নির্মাণ বেশ মজার

ঝঞ্ঝাটা     ও ছাঁটাই করছে লকেটগাছ, অলিভ

          যা সকালের স্যাঁতসেতে হাওয়ায় মনে হয় বাস্তব

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

শার্ল বোদলেয়ার – ‘নকল স্বর্গ – হ্যাশিশের কবিতা – অনুবাদ মলয় রায়চৌধুরী

 শার্ল বোদলেয়ার : নকল স্বর্গ – হ্যাশিসের কবিতা

প্রথম অধ্যায়

অমেয়তার সাধ

নিজেদের কেমন করে নিরীক্ষা করতে হয় তা যাঁরা জানেন, এবং যাঁরা তাঁদের প্রতীতির স্মৃতিকে সংরক্ষণ করেন, যাঁরা, হফম্যানের মতন, আধ্যাত্মিক পরিমাপযন্ত্রকে তৈরি করতে জানেন, অনেক সময়ে মনের রসায়ানাগারে লক্ষ্য করে থাকবেন বিভিন্ন ঋতু, আনন্দের দিন, মনোরম মুহূর্তদের । এমন দিনও হয় যখন একজন লোক  অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে যৌবনে জেগে ওঠে । যদিও তার চোখের পাতা তন্দ্রার আচ্ছন্নতা থেকে তখনও মুক্তি দেয়নি তাকে, বাইরের জগত তার কাছে প্রতিভাত হয় এক শক্তিময় উপশম হিসাবে, বহিরায়বের এক স্বচ্ছতা নিয়ে, আর রঙের এমনই এক বৈভব সৃষ্ট করে যা তারিফযোগ্য । নৈতিক জগত মেলে ধরে তার বিশাল পরিপপ্রেক্ষণ, নতুন নির্মলতায় পরিপূর্ণ ।

একজন লোক, এই আনন্দে লব্ধকাম, দুর্ভাগ্যবশত বিরল আর সাময়িক, নিজেকে তখনই একজন বড়ো শিল্পী আর বড়ো মানুষ হিসাবে অনুভব করতে থাকে ; যদি এই সবকিছু একটি অভিব্যক্তি প্রয়োগ করে বলতে হয়, তাহলে তখন সে একজন মহৎ সত্তা । কিন্তু আত্মা ও ইন্দ্রিয়ের এই ব্যতিক্রমী অবস্হার একমাত্র ব্যাপার হল — আমি বাড়িয়ে না বলেও তাকে বলব স্বর্গীয়, যদি তাকে আমি প্রতিদিনের ফালতু যাপনের ভারি ছায়ার সঙ্গে তুলনা করি– তাহলে বলব যে তা কোনো দৃশ্যমান ও সহজে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে এমন কোনো সৃষ্টি নয় । তাহলে তা কি সুস্বাস্হ্য এবং বিবেচক জীবনযাত্রার ফলাফল ? প্রথম ব্যাখ্যায় সেরকমটাই মনে হবে ; কিন্তু আমরা মেনে নিতে বাধ্য যে প্রায়ই এই অলৌকিক বিস্ময় ও নিরাময়কারী দানব, সহজ কথায়, নিজেকে এমনভাবে প্রক্রিয়াকরণ করে যেন তা এক উচ্চতর এবং অদৃশ্য ক্ষমতা, যে ক্ষমতা মানুষের বাইরের, তার দৈহিক ক্রিয়াকর্মকে বেশ কিছুকাল যাবত অপব্যবহারের পর ঘটে । আমরা কি বলব যে এটা একনিষ্ঠ প্রার্থনা এবং আধ্যাত্মিক আকুলতার পুরস্কার ? এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে আকাঙ্খার অবিরাম অধিরোহ, স্বর্গাভিমুখী আধ্যাত্মিক পরাক্রমের বিততি, নৈতিক স্বাস্হ্য গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে সঠিক বিধিনিয়ম, যা অতীব উজ্বল এবং অতীব মহিমান্বিত । কিন্তু কোনো এক কিম্ভুত বিধান একে প্রতিভাত করার কারণ হয়ে ওঠে ( যেমন অনেকসময়ে করে ) কল্পনার লজ্জাকর বেলেল্লাপনার পর ; যুক্তিবোধের কুতর্কমূলক অপব্যবহারের পর, যা কিনা, তার সরাসরি ও বিচক্ষণ প্রয়োগে, অনেকটা তুলনীয় বুদ্ধিমান জিমনাস্টিকসের সঙ্গে রাস্তার দড়াবাজিকরদের  স্বশিক্ষিত বোকা-বানানো অঙ্গ-ভাঙনের মতন ? এই কারণে আত্মার এরকম অস্বাভাবিক অবস্হাকে আমি সত্যকার মাধুর্য বলে মনে করব ; একটি ম্যাজিক আয়না যাতে মানুষকে আহ্বান করা হয় নিজেকে সবচেয়ে সুন্দর দেখার জন্য ; অর্থাৎ, যা তার দেখা দরকার, আর যা প্রকৃতপক্ষে হয়তো সে-ই ; এক ধরণের দেবদূতীয় উত্তেজনা ; সবচেয়ে চাটুকার ধরণের একরকম পুনর্বাসন । একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক গোষ্ঠী, যাদের প্রতিনিধিরা ইংল্যাণ্ড ও আমেরিকায় থাকেন, তাঁরা মনে করেন অতিপ্রাকৃত ঘটনা, যেমন ধরা যাক অশরীরীদের প্রেত, ভুত ইত্যাদি হলো ঐশ্বরিক ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ, সদাসর্বদা মানুষের আত্মায় প্রচ্ছন্ন সত্যের স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলার উদ্বেগ ।

এই একক ও চমৎকার স্হিতিতে যাবতীয় ওজস্বীতা ভারসাম্য বজায় রাখে ; যেখানে কল্পনা, যদিও অত্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন, নৈতিক বোধকে বিপজ্জনক ঝুঁকিতে টেনে নিয়ে যায় না ; যখন সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতার ওপরে অসুস্হ স্নায়ুরা, যেগুলো সাধারণ অপরাধকে কিংবা বিষাদকে উসকে দ্যায়, তাকে অত্যাচার করে না ; এই অবিশ্বাস্য স্হিতি, আমি বলব, এর কোনো উন্নত লক্ষণ নেই । তা প্রেতের মতনই ধারণাতীত । বদ্ধসংস্কারের কোনো একটা প্রজাতি, তবে বিক্ষিপ্ত বদ্ধসংস্কারের; তা থেকে আমরা এই নির্ণয়ে পৌঁছোতে পারি যে আমরা সঠিক ছিলুম, অভিজাত অস্তিত্বের নিশ্চয়তা, আর আমাদের প্রতিদিনকার ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে তাকে অধিগত করার আশা আমাদের আছে । চিন্তার এই প্রখরতা, ইন্দ্রিয় এবং আত্মার এই উৎসাহ, প্রতিটি যুগে মানুষের কাছে সর্বোচ্চ আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়ে থাকবে ; আর এই কারণে, অন্য কোনো কিছু না ভেবে, যে তাৎক্ষণিক আনন্দ সে পাচ্ছে, নিজের সংবিধানের আইনকে অমান্য করার উদ্বেগে না ভুগে, সে যাচ্ঞা করেছে, ভৌতিক বিজ্ঞানে, ঔষধি-বিজ্ঞানে, সস্তা পানীয়তে, সূক্ষ্ম সুগন্ধে, প্রতিটি আবহাওয়া ও প্রতিটি কালখণ্ডে, পালিয়ে বাঁচার মাধ্যম, তা কয়েক ঘণ্টার হলেও, তার পাঁকের স্বদেশে, এবং, সমালোচক লাজারে যেমন বলেছেন, “প্রথম আক্রমণেই স্বর্গোদ্যান দখল করা” তা করার উদ্দেশ্যে । হায় ! মানুষের অসৎ চরিত্র, আতঙ্কে ঠাশা এবং তাকেই মান্যতা দিতে হয়, তার প্রমাণ আছে, এমনকি তা তাদের অসীম প্রসারণ হলেও, তার শাশ্বতের জন্য ক্ষুধা ; কেবল, এ এমনই এক স্বাদ যা পথ হারিয়ে ফ্যালে। 

সেই বহুল প্রচারিত রূপকের উল্লেখ করা যেতে পারে, “সব রাস্তাই রোম-এ যায়,” আর তাকে নৈতিক জগতে প্রয়োগ করা যায় : সব রাস্তাই পুরস্কার কিংবা শাস্তি-তে পৌঁছোয় ; শাশ্বতের দুটি বিন্যাস । মানুষের মন প্যাশনে কানায় কানায় ভরা : তার আছে, আমি যদি আরেকটা পরিচিত বাক্য ব্যবহার করি, জ্বলতে থাকার প্যাশন । কিন্তু এই অসুখি আত্মা, যার স্বাভাবিক দুরাচার তার আকস্মিক প্রবণতার সমান, যথেষ্ট আপাতবিরোধী, পরার্থবাদীতা এবং কঠোর গুণাবলীর জন্য, আপাতবিরোধিতায় ঠাশা, যা তার উপচে-পড়া অতিমাত্রিক প্যাশনকে  অন্য উদ্দেশ্যের দিকে ফিরে তাকাবার সুযোগ দ্যায় । সে কখনও আঁচ করতে পারে না যে সে নিজেকে পুরোপুরি বিক্রি করে দিচ্ছে : সে ভুলে যায়, তার প্রমত্ততায়, যে তার চেয়েও ধূর্ত এবং তার চেয়ে শক্তিশালী খেলোয়াড়ের মুখোমুখি হয়েছে সে ; আর পাপের আত্মাকে এক চুল জায়গা ছাড়লে পুরো মাথাটা তুলে নিয়ে যেতে মোটেই বিলম্ব করবে না । এই দৃশ্যমান মালিকের দৃশ্যমান প্রকৃতি — আমি মানুষের কথা বলছি — তাহলে, রসায়নের মাধ্যমে স্বর্গোদ্যান গড়তে চেয়েছে, গ্যাঁজানো পানীয়ের মাধ্যমে ; সেই ক্ষিপ্ত লোকটার মতন যে নিরেট আসবাব আর আসল বাগানকে ফ্রেমে বাঁধানো ক্যানভাসের ওপর আঁকা পেইনটিঙ দিয়ে প্রতিস্হাপন করতে চায় । শাশ্বত সম্পর্কিত সংবেদনের এই অধঃপতনে আছে, আমার মতে, কলুষিত মাত্রাধিক্যের কারণ ; সাহিত্যিকের নিঃসঙ্গ এবং নিবিষ্ট মাতলামি থেকে, যে শারীরিক যন্ত্রণার উপশমের জন্য আফিমে বেদনানাশকের সন্ধান করে, আর এই ভাবে অস্বাস্হ্যকর আহ্লাদের কুয়ো আবিষ্কার করে, একটু একটু করে তাকে বানিয়ে ফ্যালে তার একমাত্র আহার, আর তা হয়ে ওঠে তার আত্মিক জীবনের সমষ্টি ; শহরতলির সবচেয়ে ন্যক্কারজনক নেশাখোরের পর্যায়ে নেমে, তার মস্তিষ্ক অর্চি এবং গরিমায় প্রদীপ্ত, রাস্তার পাঁকে  হাস্যকর গড়াগড়ি খায় ।

আমি যাকে বলি নকল আদর্শ, তা গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে ফলপ্রদ মাদক হলো, পানীয়গুলোর কথা বাদ দিচ্ছি, যা দ্রুত স্হূল উত্তেজনাকে তাতিয়ে তোলে আর যাবতীয় আত্মিক শৌর্যকে, সুগন্ধকে, চাপা দিয়ে দ্যায়, যার অত্যধিক সেবন, সবচেয়ে নিগূঢ় মানুষের কল্পনাকে প্রতিদান দিলেও, তার দৈহিক ক্ষমতাকে ক্রমশ ক্ষইয়ে দ্যায় ; দুটি প্রবলভাবে সক্রিয় মাদক, সবচেয়ে সুবিধাজনক আর সবচেয়ে কুশলী, হলো চরস আর আফিম । এই মাদকগুলো যে রহস্যময় প্রতিক্রিয়া এবং অস্বাস্হ্যকর আনন্দ সৃষ্টি করে, বহুকাল যাবত তার সেবনের ফলাফল থেকে যে অবশ্যম্ভাবী শাস্তি হয়, আর সর্বোপরি  এই নকল আদর্শকে পাওয়ার সন্ধানে যে অমরত্বের জরুরি ব্যবহার হয়, সেই বিষয়ে অধ্যয়ন করাই এই রচনার উদ্দেশ্য ।

আফিমের বিষয়ে আগেই আলোচনা করা হয়েছে, আর তা একই সঙ্গে এমন চমকপ্রদ, বৈজ্ঞানিক আর কাব্যিকভাবে যে, আমি নতুন করে আর কিছু যোগ করতে চাই না । আমি অতএব আরেকটি বিষয়ে অধ্যয়ন করে নিজেকে সন্তুষ্ট করতে পারব, সেই সঙ্গে অতুলনীয় এই বইটির বিশ্লেষণ করব যা পুরোপুরি ফরাসি ভাষায় অনুদিত হয়নি । তার লেখক, একজন সুপ্রসিদ্ধ মানুষ, যাঁর কল্পনার ক্ষমতা অসাধারণ এবং সূক্ষ্ম, বর্তমানে অবসর নিয়েছেন এবং মৌন অবলম্বন করেছেন, বিয়োগান্তক অমায়িকতার সাহসে একদা আফিমে তিনি যে আহ্লাদ ও পীড়ন সহ্য করেছেন তা লিখে গেছেন, আর তাঁর বইয়ের সবচেয়ে নাটকীয় অংশ হলো যেখানে তিনি ইচ্ছাশক্তির অতিমানবিক প্রয়াসের কথা বলছেন, যা তাঁর মনে হয়েছিল জরুরি, যাতে তিনি অবিচক্ষণতায় করে ফেলা অধঃপতনের পথ থেকে নিস্তার পান । 

আজকে আমি কেবল চরসের কথা বলব, আর আমি সেকথা বলব একাধিক অনুসন্ধান আর পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্যাদির পর ; বুদ্ধিমান মানুষদের টীকা কিংবা গুপ্তকথা থেকে পাওয়া সারাংশ থেকে, যাঁরা বহুকাল এই মাদকে নেশা করতেন ; আমি কেবল এই সমস্ত বিভিন্ন তথ্যাদি একত্রিত করব এক ধরনের প্রকরণে, একটি বিশেষ আত্মাকে বেছে নিয়ে, আর যাঁকে ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞায়িত করা সহজ, এই প্রকৃতির অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার পক্ষে যিনি উপযুক্ত ।

দ্বিতীয় অধ্যায়

চরস কাকে বলে ?

মার্কো পোলোর গল্পগুলো, যা নিয়ে অবিবেচকের মতন হাসাহাসি হয়েছে, যেমনটা হয়েছে অন্যান্য পর্যটকদের ক্ষেত্রে, সেগুলো বৈজ্ঞানিকরা যাচাই করেছেন, আমাদের বিশ্বাস দাবি করে । আমি ওনার গল্পগুলো এখানে আরেকবার বলছি না যে কেমন করে, হ্যাশিসে নেশাগ্রস্ত হয়ে ( যা থেকে “অ্যাসাসিন” শব্দের উৎপত্তি ), পর্বতনিবাসী একজন বৃদ্ধ তাঁর আমোদ-প্রমোদে উচ্ছসিত বাগানে কয়েদ করে রাখতেন যুবক শিষ্যদের, যাদের তিনি নিষ্ক্রিয় ও চিন্তাহীন আনুগত্যের  পুরস্কার হিসাবে স্বর্গোদ্যানের ধারণা দিতে চাইতেন । পাঠক ভন হ্যামার-পার্গস্টলের লেখা ‘দি সিকরেট সোসায়টি অফ হ্যাশিসিনস’ বইটি এবং ‘মেমরিজ দ্য লাকাদেমি দেস ইনসক্রিপশানস এত বেলে-লরত্রস” বইটির ষোড়শ খণ্ডে মসিয়ঁ সিলভেসত্রে দ্য সাসির টীকা পড়ে দেখতে পারেন ; আর “অ্যাসাসিন” শব্দের ব্যুৎপত্তিরl বাষ্প ওড়ে তা তাদের মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে তুলতো । যারা ফসল কাটে তাদের মাথা ঘুর্ণিতে ভরে ওঠে, অনেক সময়ে তারা ভাবাবেশে আচ্ছন্ন হয় ; কখনও বা তাদের অঙ্গ সাময়িক দুর্বল হয়ে পড়ে আর কাজ করতে চায় না ।

আমরা রুশদেশের চাষিদের মধ্যে প্রায়শই স্বপ্নচারিতার সঙ্কটের কথা শুনেছি, যার কারণ, ওদের মতে, খাবার রান্নায় গাঁজাবীজের তেলের ব্যবহার । কেই বা মুর্গিদের অস্বাভাবিক আচরণের কথা জানে না যে মুর্গিগুলো গাঁজাবীজ খেয়েছে, আর সেইসব ঘোড়াদের বুনো উৎসাহের কথা, যেগুলোকে চাষিরা, বিয়ে উপলক্ষে আর পৃষ্ঠপোষক সন্তদের ভুরিভোজের উৎসবে, খানাখন্দে-ভরা মাঠে ঘোড়দৌড়ের জন্য যৎসামান্য গাঁজাবীজ খাওয়ায় না, অনেকসময়ে মদের সঙ্গে মিশিয়ে ? যাই হোক, ফরাসি গাঁজা চরস তৈরির জন্য উপযুক্ত নয়, অন্তত, বারংবার নিরীক্ষার পর দেখা গেছে, সেই মাদকের ক্ষমতা চরসের সমান নয় । চরস, বা ভারতীয় গাঁজা ( ক্যানাবিস ইনডিকা ), উরটিকেশিয়া পরিবারের গাছ, দেখতে হুবহু আমাদের অক্ষাংশে যেমন গজায় তেমনই, ব্যতিক্রম হল যে ততো উঁচু হয় না । তাতে নেশা ধরার অসাধারণ উপাদান আছে, যার দরুণ ফরাসিদেশের আর পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের আকর্ষণ করতে পেরেছে । বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে তা কম-বেশি উঁচুদরের বলেই গণ্য করা হয় : আসলে ইউরোপীয়দের কাছে বঙ্গদেশের গাঁজা সবচেয়ে দামি ; যদিও, মিশরের, কন্সটান্টিনোপলের, পারস্যের এবং আলজিরিয়ার গাঁজার উপাদানও এক, তবে এগুলো নিকৃষ্ট স্তরের ।

হ্যাশিস বা চরস ( কিংবা পাতাঘাস ; অর্থাৎ, সর্বোচ্চ স্তরের পাতাঘাস, যেন আরব দেশের লোকেরা একটি মাত্র শব্দ দিয়ে একে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছে, পাতাঘাস হলো পার্থিব আনন্দের উৎস ) বিভিন্ন নামে চেনা যায়, যে সমস্ত দেশে তার ফসল সংগ্রহ করা হয়, তার মিশ্রণের উপাদান আর তৈরির কায়দা অনুযায়ী : ভারতে ‘ভাঙ’ ; আফ্রিকায় ‘তেরিয়াকি’ ; আলজেরিয়া এবং আরাবিয়া ফেলিক্সে ‘মাদজৌন্দ’, ইত্যাদি । বছরের কোন ঋতুতে তা সংগ্রহ করা হচ্ছে তা অনেকটা পার্থক্য ঘটায় । সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা থাকে যখন তা ফুলের অবস্হায় । বিভিন্ন প্রস্তুতি-মিশ্রণে ফুলটা কেমন করে প্রয়োগ করা হচ্ছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ, আর সে-বিষয়েই আমরা আলোচনা করব । চরসের পাতার নিষ্কাশন, যেভাবে আরবরা তৈরি করে, তা হলো তাজা গাছের চুড়োকে মাখনে ফোটানো, সামান্য জল মিশিয়ে । বাষ্পীকরণের ফলে শুকিয়ে এলে, তাকে ছেঁকে নেয়া হয়, যে অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায় তাকে দেখতে পমেটমের মতন, সবুজ-হলুদ রঙের, আর যাতে পাওয়া যাবে চরস আর বিস্বাদ মাখনের অনুপভোগ্য গন্ধ । এ থেকে তৈরি করা হয় দুই থেকে চার গ্রাম ওজনের ছোটো-ছোটো গুলি, কিন্তু বিটকেল গন্ধের দরুণ, যা সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে, আরবরা এক একটা গুলি এক একটা মিষ্টান্নর ভেতরে পুরে রাখে । সচরাচর যে মিষ্টান্নে পোরা হয় তার নাম ‘দাওয়ামেস্ক’, তা হলো চরস, চিনি, আর বিভিন্ন সুগ্ধের মিশ্রণ, যেমন ভ্যানিলা, দালচিনি, পেস্তাবাদাম, কাগজিবাদাম, কস্তুরী । অনেক সময়ে একটু ক্যানথারাইড মেশানো হয়, যার সঙ্গে সাধারণ চরসের প্রতিক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই । এই নতুন চেহারায় চরসের আর কোনো বদগন্ধ থাকে না, আর পনেরো, কুড়ি, তিরিশ গ্রাম ওজনের মাদক সেবন করা যায়, পানপাতায় মুড়ে কিংবা কফিতে গুলে ।

স্মিথ, গ্যাস্টিনেল এবং দেকুরতিভের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চরসের সক্রিয় উপাদান আবিষ্কারে নিয়োজিত ছিল । তাদের প্রয়াস সত্বেও, চরসের রাসায়নিক মিশ্রণের উপাদান বিশেষ জানা যায়নি, কিন্তু সাধারণত মনে করা হয় যে এর মধ্যে রজন জাতীয় গঁদের উপস্হিতি হলো প্রধান উপাদান যে কেবল দশ শতাংশ থাকে । এই রজন পাবার জন্য শুকনো গাছটাকে পাউডার করে ফেলা হয়, যা বেশ কয়েকবার অ্যালকোহলে ধুয়ে নেয়া হয় ; সামান্য চোলাই আর বাষ্পীয়করণের পর দেখা হয় অবশিষ্টাংশে ঘনত্ব একইরকম কিনা ; এই অবশিষ্টাংশকে জলে ধোয়া হয়, যার ফলে চটচটে জিনিসটা বেরিয়ে যায়, আর বেঁচে থাকে কেবল বিশুদ্ধ রজন ।

উৎপাদিত জিনিসটা নরম, ঘন সবুজ রঙের, আর তাতে অনেকাংশে পাওয়া যায় চরসের বিশিষ্ট গন্ধ । পাঁচ, দশ, পনেরো সেন্টিগ্রাম বিস্ময়কর ফলাফল দেবার জন্য যথেষ্ট । কিন্তু হ্যাশচিশাইন, যা চকোলেটের বরফির মতো কিংবা বড়ির আকারে আদার সঙ্গে মেশানো, তা ‘দাওয়ামেস্ক’ আর ‘পাতাঘাস’-এর মতন কম-বেশি কার্যকর, আর তা সম্পূর্ণ আলাদা প্রকৃতির, যে চরস নিচ্ছে তার ব্যক্তিগত পছন্দ আর স্নায়বিক গ্রাহীক্ষমতার ওপর নির্ভর করে; আর, তার থেকেও বেশি, একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ফলাফল হতে পারে। কখনও বা সে অপ্রতিরোধ্য এবং সীমাতিরিক্ত উল্লাসের অভিজ্ঞতা পাবে আবার কখনও স্বপ্নালু তন্দ্রায় আচ্ছন্ন বোধ করবে । এমনকিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা প্রায়ই ঘটে থাকে ; সর্বোপরি, সাধারণ মানসিক ধাত আর শিক্ষিত মানুষের ক্ষেত্রে । বৈভিন্নের ক্ষেত্রে এক ধরণের ঐক্য থাকে যা আমায় চরস-মাতলামির মোনোগ্রাফ সম্পাদনা করার সুযোগ দিচ্ছে, যে ব্যাপারে আমি একটু আগেই বলেছি ।

কন্সটানটিনোপলে, আলজেরিয়ায়, এমনকি ফরাসিদেশেও, কিছু লোক তামাকের সঙ্গে চরস মিশিয়ে ধোঁয়া ফোঁকেন, কিন্তু প্রাসঙ্গিক ব্যাপারটা ঘটে মাত্রা বজায় রেখে, আর, সেহেতু, আলস্যে । আমি সম্প্রতি একজনকে বলতে শুনেছি, চোলাই করার মাধ্যমে, চরস থেকে একটা প্রয়োজনীয় তেল বের করা হয়, যার ক্ষমতা এতাবৎ শোনা মিশ্রণগুলোর থেকে অনেক বেশি সক্রিয়, কিন্তু এই বিষয়ে আমি তেমন গভীর অধ্যয়ন করিনি বলে ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত বলতে পারছি না । একথা বলা কি বাহুল্য নয় যে চা, কফি, নানারকম মদ বেশ শক্তিশালী সহায়ক যেগুলো রহস্যময় নেশার সঙ্ঘটনকে কম বা বেশি দ্রুততর করে ?

তৃতীয় অধ্যায়

আলোকময় দেবদূতের খেলার বাগান

কেমন হয় একজন লোকের অভিজ্ঞতা ? সে কী দেখতে পায় ? অবিশ্বাস্য জিনিসপত্র, নয় কি? বিস্ময়কর দৃশ্যাবলী ? তা কি খুবই সুন্দর ? আর অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ? আর অত্যন্ত বিপজ্জনক? চরস সম্পর্কে অনবগত লোকেরা চরসসেবিদের কৌতূহলমিশ্রিত ভয়ে এই ধরণের প্রশ্ন করেন। ব্যাপারটা, বস্তুত, জানবার শিশুসুলভ ব্যগ্রতা থেকে করা হয়, সেই সব লোকেদের মতন যারা তাদের আগুন পোয়াবার জায়গা থেকে কখনও নড়েনি তারা বহুদূরের অজানা দেশ থেকে আসা কোনো মানুষের মুখোমুখি হয় । তারা মনে করে তাদের কাছে চরসের নেশা এক অস্বাভাবিক বিস্ময়কর দেশ, হাতসাফাই ম্যাজিকের আর ভেলকি দেখাবার বিশাল নাটমঞ্চ যেখানে সবকিছুই অলৌকিক, সবকিছুই অপ্রত্যাশিত । — তা হলো পূর্বধারণা, সম্পূর্ণ ভ্রান্তিকর । আর যেহেতু সাধারণ পাঠক এবং প্রশ্নকারীর কাছে “চরস” বা হ্যাশিস গড়ে তোলে অদ্ভুত আর ওলোট-পালোট জগতের ধারণা, আশ্চর্যময় স্বপ্নের প্রত্যাশা ( হ্যালুশিনেশান বা অমূলপ্রত্যক্ষ বললে ভালো হবে, যা ব্যাপারটা, লোকে যা ভাবে তেমন পৌনঃপুনিক নয় ), আমি এখনই দুটোর গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য  স্পষ্ট করে দিতে চাই, যে চরসের প্রভাব স্বপ্ন থেকে একেবারে আলাদা । স্বপ্নে আমরা যে অ্যাডভেঞ্চার যাত্রায় প্রতি রাতে যাই, তাতে রয়েছে কিছু ইতিবাচক বিস্ময় । এই অলৌকিক ব্যাপারটা নিয়মিত ঘটার দরুণ এর রহস্য ভোঁতা হয়ে গেছে । মানুষের স্বপ্ন দুই ধরণের হয়। কিছু স্বপ্ন তার প্রতিদিনের ঘটনা, তার কাজকারবার, তার ইচ্ছা, তার দোষ, সব মিলেমিশে গিয়ে মোটামুটি স্মৃতির বিশাল ক্যানভাসে দেখা দেয় । এটা স্বাভাবিক স্বপ্ন ; এক্ষেত্রে লোকটা নিজেই তাতে থাকে । কিন্তু অন্য ধরণের স্বপ্নে, যে স্বপ্ন অদ্ভুত আর অপ্রত্যাশিত, স্বপ্নদ্রষ্টার চরিত্র, জীবন, আবেগের সঙ্গে সম্পর্কহীন আর ব্যাখ্যাহীন : এই স্বপ্ন, যাকে আমি বলব এয়ারোগ্লিফিক, প্রত্যক্ষরূপে জীবনের অতিপ্রাকৃত দিকটির প্রতিনিধিত্ব করে, এবং তা উদ্ভট বলেই প্রাচীন যুগের মানুষেরা একে দৈবী বলে বিশ্বাস করতো । স্বাভাবিক কার্যকারণে ব্যাখ্যাহীন বলে, তাঁরা মনে করতেন ব্যাপারটা একজন মানুষের বাইরে থেকে ঘটে, এবং এমনকি আজকের দিনেও, দার্শনিকদের রোমান্টিক ও মূর্খ গোষ্ঠীকে বাদ দিলেও, তাঁরা এই ধরণের স্বপ্নের মধ্যে অনেক সময়ে আবিষ্কার করেন ভর্ৎসনা, অনেক সময়ে হুঁশিয়ারি ; সংক্ষেপে, এক প্রতীকি এবং নৈতিক ছবি যা ঘুমন্ত লোকটার আত্মায় বাসা বেঁধেছে । এটা এক অভিধান যার অধ্যয়ন প্রয়োজন ; এমনই এক ভাষা যার চাবিকাঠি সন্তরা যোগাড় করতে পারেন ।

চরসের নেশায় এরকম কিছুই নেই । আমরা সাধারণ স্বপ্নের বাইরে যাবো না । নেসাটা, যতোক্ষণ থাকে, একথা সত্য, অপরিমেয় স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়, তার জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য এই নেশার রঙবাহুল্যের আতিশয্য আর এর নিষেকের দ্রুতি । কিন্তু তা সব সময়ে ব্যক্তিটির মেজাজের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রাখে । মানুষটা স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিল ; স্বপ্নটা লোকটাকে নিয়ন্ত্রণ করবে । কিন্তু এই সপ্ন হবে সত্যকার বাপের সন্তান । অলস লোকটা নিজের উদ্ভাবন কুশলতাকে চাপ দিয়েছে তার জীবনে আর তার চিন্তাধারায় নকল অতিপ্রাকৃতকে প্রবর্তন করার জন্য ; কিন্তু, তার অভিজ্ঞতার আকস্মিক সক্রিয়তার প্রাবল্য সত্তেও, সে সেই একই মানুষ যে এখন অতিরঞ্জিত, সেই একই সংখ্যা যাকে অত্যন্ত বেশি তেজপূঞ্জে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাকে আনা হয়েছে অধীনতায়, কিন্তু, তার পক্ষে দুঃখের ব্যাপার, সে তা নিজে আনেনি ; অর্থাৎ, তার সেই অংশের দ্বারা যা আগে থেকেই প্রভাবশালী । “সে হতে পারতো দেবদূত ; অথচ সে হয়ে গেলো পশু।” সাময়িকভাবে অত্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন বলা যেতো, যদি নিয়ন্ত্রণহীন ও সহনীয় সংবেদনের বাড়বাড়ন্তকে ক্ষমতার নাম দেয়া হয় ।

তাহলে ব্যাপারটা ভালোভাবে বুঝে নিক, মামুলি আর অজ্ঞ লোকেরা, যারা অসাধারণ আনন্দের সঙ্গে পরিচয়ের জন্য কৌতূহলী, যে তারা হ্যাশিস বা চরসে কোনোরকম অলৌকিক ব্যাপার পাবে না,  কেবল প্রকৃতিকে তার মাত্রাধিক্য ছাড়া কিচ্ছু পাবে না । মস্তিষ্ক এবং যে জৈবদেহে চরস কাজ করে তা কেবল সাধারণ আর ব্যক্তিগত ইন্দ্রিয়-পরিমণ্ডলকে বিবর্ধিত করে তুলবে, একথা সত্যি, পরিমাণ ও গুণমান উভয় ক্ষেত্রে, কিন্তু সদাসর্বদা তাদের উৎসের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে । মানুষ তার নৈতিক ও শারীরিক মেজাজের সর্বনাশ থেকে পালাতে পারে না । চরস হবে, বস্তুত, মানুষের পরিচিত ভাবনাচিন্তা ও প্রতীতির আয়না, যে আয়না বাড়িয়ে প্রতিফলন ঘটায়, অথচ আয়না ছাড়া আর কিছুই নয় ।

মনে করুন আপনার চোখের সামনে মাদকটা রয়েছে : একটা সবুজ রঙের মিষ্টি, প্রায় বাদামের সমান মাপের, তাতে এক অদ্ভুত গন্ধ ; এমনই অদ্ভুত যে মনোভাব বা রুচিকে বিকর্ষিত করে, বমিও পেতে পারে — যেমন, ধরুন, কোনো সূক্ষ্ম এবং অমায়িক সুরভির ক্ষেত্রে, তাকে যদি তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং ঘনত্বে উন্নত করা হয়, তা যা ঘটাবে, তেমনই।

প্রসঙ্গক্রমে বলার অনুমতি দিন যে প্রস্তাবটা বিপরীতও হতে পারে, এবং সবচেয়ে বিতৃষ্ণাজনক ও বিকর্ষক সুরভিও শুঁকে অপার আনন্দ পাওয়া যাবে যদি তার পরিমাণ ও ঘনত্ব কমিয়ে আনা হয় ।

সে-ই ! তাতে রয়েছে আনন্দ ; একটা চামচে স্বর্গ ; যাবতীয় নেশাসহ আনন্দ, তার দোষ, তার বালখিল্য । তুমি বিনা ভয়ে এটা গিলে ফেলতে পারো ; এটা মেরে ফেলবে না ; তোমার দেহের অঙ্গকে জখম করবে না । হয়তো ( পরে ) মায়াবিদ্যার ঘনঘন প্রয়োগ তোমার ইচ্ছাশক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে ; হয়তো মানুষ হিসাবে আজকে তুমি যে লোকটি তার থেকে কম-মানুষ হয়ে যাবে ; কিন্তু প্রতিশোধ তো বহু দূরের ব্যাপার, আর পরিণামস্বরূপ বিপর্যয়কে সংজ্ঞায়িত করা বেশ কঠিন ! তুমি কিসের ঝুঁকি নিচ্ছ ? আগামীকাল যৎসামান্য ক্লান্তি — তার বেশি কিছু নয় । তুমি কি প্রতিদিন কম পুরস্কারের বিনিময়ে এর চেয়ে বড়ো শাস্তির ঝুঁকি নাও না ? তাহলে খুবই ভালো ; তুমি যদি চাও যে এটা দ্রুত আর প্রগাঢ় প্রভাব ফেলুক, তাহলে এক কাপ কালো কফিতে তোমার চরসের খোরাক গুলে নাও । তুমি আগে থেকে তোমার পেট খালি রাখার সাবধানতা নিয়েছো, রাতের খাবার নয়টা বা দশটা পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছ, যাতে বিষটা সক্রিয় হবার জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পায় । বড়ো জোর ঘণ্টাখানেক পরে একটু সুপ খেতে পারো । একটা অদ্ভুত দীর্ঘ যাত্রায় বেরোবার জন্য তুমি যথেষ্ট ব্যবস্হা করে রেখেছ ; স্টিমার ভোঁ বাজিয়ে দিয়েছে, পাল তুলে দেয়া হয়েছে ; আর সাধারণ যাত্রীদের চেয়ে তোমার সুবিধা এই যে তুমি জানো না কোথায় চলেছ । তুমি তোমার যাত্রাপথ বেছে নিয়েছ ; ভাগ্য প্রসন্ন হোক !

আমি আশা করি তুমি সতর্ক হয়ে অ্যাডভেঞ্চারে বেরোবার সময়টা সাবধানে  বেছে নিয়েছ, কেননা সর্বগুণান্বিত লম্পটের জন্য প্রয়োজন পূর্ণ অবসর । তাছাড়া তুমি জানো, চরস অতিরঞ্জিত করে, কেবল লোকটির অনুভূতি ও সংবেদন নয়, কিন্তু তার পরিবেশ এবং পরিস্হিতিও । তোমার এমন কোনো কর্তব্য নেই যে সমায়ানুবর্তীতা কিংবা তৎপরতা দরকার ; কোনো গার্হস্হ দুশ্চিন্তা নেই ; প্রেমিকের দুঃখ নেই । এসব ব্যাপারে সাবধান হতে হবে । অমন কোনো নিরাশা, কোনো উদ্বেগ, ভেতরে-ভেতরে চিন্তা যা তোমার ইচ্ছা ও আগ্রহ দাবি করে, কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে, শোকের ঘণ্টার মতন তোমার নেশা জুড়ে বাজতে থাকবে আর আনন্দকে বিষাক্ত করে দেবে । উদ্বেগ হয়ে উঠবে যন্ত্রণা, আর নিরাশা হয়ে উঠবে অত্যাচার । কিন্তু, যদি এই সমস্ত প্রাথমিক অবস্হা পরখ করার পর, আবহাওয়া যদি ভালো থাকে, তুমি যদি মনের মতন পরিবেশে থাকো, যেমন ধরো ছবির মতো ভূদৃশ্যে কোথাও কিংবা সুন্দরভাবে সাজানো একটা ঘরে, আর বিশেষ করে তোমার আয়ত্তে যদি সঙ্গীতের আবহ থাকে, তাহলে তার চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না ।

মোটামুটি, চরসের নেশার তিনটি স্তর আছে, যাদের পার্থক্য করা সহজ, আর যারা শুরু করছে তাদের পক্ষে বেমানান নয় যে প্রথম স্তরে তারা কেবল প্রাথমিক লক্ষণগুলোর সন্মুখীন হবে । তুমি শুনে থাকবে চরসের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে লোকেদের ফালতু কথাবার্তা ; তোমার কল্পনাতে বিশেষ কোনো ধারণে এই ব্যাপারে ঘর করে থাকবে, এক আদর্শ নেশার ধারণা । তুমি আশা করো যে বাস্তব সত্যিই তোমার আকাঙ্খার স্তরে পৌঁছোবে ; সেটাই একা শুরুতেই তোমাকে উদ্বেগের স্হিতিতে পৌঁছে দেবে, যা বিষটার ঘিরে ধরার চারিত্র্য আর বিজয় করে ফেলার জন্য যথেষ্ট অনুকূল । বেশির ভাগ আনাড়িরা, তাদের প্রথম দীক্ষায়, প্রভাবের মন্হরতার অভিযোগ করে : তারা বালসুলভ অধীরতায় অপেক্ষা করে, আর তাদের পছন্দমতন মাদকের দ্রুত প্রভাব না ঘটলে, তারা অবিশ্বাসের অনর্থক বুকনি হাঁকে, যা অভিজ্ঞদের কাছে, যারা চরসের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপার ভালো করে জানে, বেশ মজার । প্রথম ঝাপটা, বহুক্ষণ আটক ঝড়ের মতন যার লক্ষণ, দেখা দেয়া আরম্ভ করে আর ওই অবিশ্বাসীর বুকে জমে-জমে প্রাচুর্যে ঘনিয়ে ওঠে । তখন তা এক ধরণের আহ্লাদের, অপপতিরোধ্য অসম্ভাব্যতার, যা তোমাকে কব্জা করে ফ্যালে । উল্লাসের এই উপলব্ধিগুলো, কোনো কারণ ছাড়াই, যা নিয়ে তুমি লজ্জাবোধ করতে পারো, পর্যায়ক্রমে ঘটতে থাকে আর তন্দ্রায় মাঝে-মাঝে বিরাম ঘটাতে থাকে, যে সময়টায় তুমি নিজেকে সামলে নিতে চাও। সহজ কথায়, একেবারে মামুলি ধারণাগুলো, নতুন আর অদ্ভুত বাহ্যিক গঠন পায় । যখন এগুলো ঘটতে থাকে তুমি নিজের সম্পর্কে অবাক হও যে ব্যাপারটা আসলে কতো সহজ। বেখাপ্পা প্রতিচ্ছায়া আর সঙ্গতিসমূহ, আগে থাকতে আঁচ করা অসম্ভব, অন্তহীন শ্লেষ, কৌতূকপ্রদ নকশা, তোমার মস্তিষ্ক থেকে অবিরাম ঝর্ণার মতন বেরোতে থাকে । দানবটা তোমাকে আষ্টেপৃষ্টে ধরে রেখেছে ; আহ্লাদের খোঁচা, যা কাতুকুতুর মতন, তার বিরুদ্ধতা করা তখন বোকামি ! মাঝে-মাঝে তুমি নিজেই তোমার বোকামি আর তোমার পাগলামি নিয়ে হাসতে থাকো, আর তোমার বন্ধুবান্ধব, যদি তুমি আরও অনেকের সঙ্গে থাকো, তারাও হাসে, তোমার আর তাদের নিজেদের অবস্হা নিয়ে তোমরা হাসাহাসি করো ; কিন্তু তারা যেমন কোনো অসূয়া ছাড়াই হাসে, তুমিও তাদের প্রতি বিরক্ত না হয়েই হাসো ।

এই আহ্লাদ, একবার আলস্যে আর একবার তীব্রতায়, খোশমেজাজের এই অস্বস্তি, অসুরক্ষার বোধ, এই নির্ণয়হীনতা, শেষ পর্যন্ত, নিয়মমতো, বেশ কম সময়ের জন্য ঘটে । তোমার ধারণাগুলোর মর্মার্থ তাড়াতাড়ি অস্পষ্ট হয়ে যায়, যে আবহের সুতো দিয়ে তোমার ধৃতি একসঙ্গে বাঁধা তা এমন ভঙ্গুর হয়ে যায় যে তোমার দুষ্কর্মের সহযোগীরা  কেউ তোমাকে বুঝতে পারবে না । আর তাছাড়া, এই বিষয়ে এবং এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে, তাকে যাচাই করার কোনো উপায় নেই ! হয়তো তারা ভাবে যে তারা তোমাকে বুঝতে পারছে, আর ভ্রমটা পারস্পরিক । এই চাপল্য, হাসিতে ফেটে পড়া, বিস্ফোরণের মতন, যে লোকেরা তোমার স্হিতিতে নেই তাদের মনে হবে যেন এক সত্যকার খেদোন্মত্ততা, কিংবা অন্তত একজন ক্ষিপ্ত মানুষের বিভ্রম ঘটছে । আরও একটা ব্যাপার, যে লোকটা দেখছে অথচ সতর্কতা অবলম্বন করে নেশা করেনি, তার বিচক্ষণতা এবং সুবুদ্ধির দরুণ, তোমাকে আনন্দ দেয় আর তোমাকে নিয়ে মজা করে যেন তুমি স্মৃতিভ্রংশে ভুগছ । ভূমিকা পালটে যায় ; তার আত্মস্হতা তোমাকে বিদ্রূপের শেষ সীমা পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে যায় । কতোটা রাক্ষুসে মজার এই অবস্হাটা, এমন একজন লোকের ক্ষেত্রে যে আহ্লাদ উপভোগ করছে আর অন্য লোকটা  যে সেই অবস্হায় নেই সে মজা করছে ! পাগলেরা সন্তদের কৃপা করে, আর তখন থেকেই নিজেকে উন্নত মনে করার ধারণা পাগলের মগজে বাসা বাঁধে । দ্রুত তা বিরাট হয়ে উঠবে আর উল্কার মতন ফেটে ঝরে পড়বে ।

আমি একবার এই রকম এক দৃশ্যের সাক্ষী ছিলুম আর যা অনেকক্ষণ যাবত টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, আর যার সৃষ্টিছাড়া চাপ কেবল তারাই টের পাচ্ছিল যারা পরিচিত ছিল, অন্তত অন্য লোকেদের দেখে, মাদকের প্রতিক্রিয়া আর পূর্ণ-স্বরগ্রামের ওপর প্রভাব কতো বিশাল পার্থক্য ঘটায় দুই বুদ্ধমত্তার মাঝে যারা আপাতদৃষ্টিতে সমান । একজন বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ, যিনি চরসের প্রভাব সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন, যিনি সম্ভবত বিষয়টা সম্পর্কে শোনেননি কখনও, নিজেকে কয়েকজনের মধ্যে বেমানান মনে করেন, যখন দ্যাখেন আশেপাশে সবাই মাদকটা নিয়েছে । তারা ওনাকে মাদকটার চমৎকার প্রভাবের কথা বোঝাবার চেষ্টা করে ; এই সমস্ত গালগল্প শুনে তিনি সৌজন্যবশত চওড়া একখানা হাসি হাসেন, একজন মানুষের কিছুক্ষণের জন্য বোকার ভান করার শিষ্টতা । এই আত্মাগুলো তাঁর অবজ্ঞায় দ্রুত উত্তেজিত হয়ে ওঠে, ধারালো বিষের দরুণ, আর এদের হাসাহাসি তাঁকে আহত করে ; আহ্লাদের এই সমস্ত বিস্ফোরণ, শব্দ নিয়ে খেলাখেলি, বদলে যাওয়া মুখভঙ্গী — এই  ক্ষতিকর আবহ তাঁকে বিরক্ত করে, আর তাঁকে ঘোষণা করতে বাধ্য করে, হয়তো, যে তাঁর মতে এই আচরণ অত্যন্ত ক্ষুদ্রের, আর যারা এই মাদক নিয়েছে তাদের পক্ষে নিশ্চয়ই ক্লান্তিকর । তাঁর মন্তব্যের মিলনানন্তকতা সকলকে এক ঝটকায় হালকা করে দিলো ; তারা তখন আহ্লাদে টইটুম্বুর। “এই ভূমিকা তোমাদের পক্ষে ভালো হতে পারে.” উনি বললেন, “কিন্তু আমার জন্যে, নয়।” অন্যেরা অহংকারে চেঁচিয়ে বলল, “আমাদের জন্য এটা ভালো ; আর আমরা কেবল তাইই পরোয়া করি।” প্রকৃত পাগলদের মাঝে রয়েছেন নাকি পাগলের ভান করছে এমন লোকজনেরা তাঁকে ঘিরে রয়েছে তা বুঝতে না পেরে উনি নির্ণয় নিলেন যে সেখান থেকে চলে যাওয়াই ভালো ; কিন্তু কেউ একজন দরোজা বন্ধ করে চাবিটা লুকিয়ে রাখে । আরেকজন, তাঁর সামনে হাঁটুগেড়ে বসে, ক্ষমা চায়, সহযোগী হবার দরুণ, আর অহংকার মিশিয়ে বলে, চোখে জল নিয়ে, যে সে মানসিকভাবে নিকৃষ্ট হলেও, যা বলার ফলে কিছুটা সমবেদনা জাগায় ওনার মনে, আর উপস্হিত সবায়ের  ওনার সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব হয়ে যায় । উনি সেখানে থেকে যাওয়া মনস্হ করেন, এমনকি ধরাধরি করার কারণে, প্রসন্ন হয়ে বাজনা বাজাতে রাজি হন । 

কিন্তু বেহালার আওয়াজ, নতুন রোগের মতন সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে, ছুরি মারে — শব্দটা বড়ো বেশি কঠিন নয় — প্রথমে একজন মাতালকে, পরে আরেকজনকে । আরম্ভ হয়ে যায় একটানা ফ্যাসফেসে দীর্ঘশ্বাস, আচমকা ফোঁপানি, নিঃশব্দ কান্নার অশ্রূজল । ভয়ে সঙ্গীতকার বেহালা বাজানো বন্ধ করেন, এবং, যার আহ্লাদ সবচেয়ে বেশি হইচই-মাখানো ছিল তার কাছে গিয়ে জিগ্যেস করেন যে অতোই যদি কষ্ট হচ্ছে, তাকে যন্ত্রণামুক্ত করতে হলে কী করতে হবে ? উপস্হিত একজন, সাধারণ জ্ঞান আছে এমন একজন, পরামর্শ দ্যায় লেমোনেড আর টক খাওয়াবার ; কিন্তু “অসুস্হ লোকটা”, তার চোখ আহ্লাদে তখন ঝলমল কর‌্ছে, তাদের দুজনের দিকেই ভাষাতীত অবমাননার দৃষ্টিতে তাকায় । একজন “অসুস্হ” মানুষকে তার জীবনপ্রাচুর্যের জন্য সারিয়ে তোলার প্রয়াস, আনন্দধারায় যে “অসুস্হ” !

এই অনুকাহিনি থেকে বোঝা যাচ্ছে, চরসের নেশায় উত্তেজিত লোকেদের অনুভূতিতে মানুষের মঙ্গলকামনার একটা বড়ো জায়গা থাকে । একটা কোমল, অলস, মুক হিতৈষিতা যা জেগে ওঠে স্নায়ুগুলোর শিথিলকরণ থেকে । এই মতামতের সমর্ধনে একজন আমাকে একটা অ্যাডভেঞ্চারের কথা বলেছিল, যা তার ঘটেছিল যখন সে চরসের নেশায় চুর, আর নিজের অনুভূতির হুবহু স্মৃতি ধরে রেখেছিল বলে আমি ভালো করে বুঝতে পেরেছিলুম যে তাকে কেমন বিদকুটে আর নাছোড় বিব্রত অবস্হায় পড়তে হয়েছিল,সমবেদনার পাল্লায় পড়ে । আমার মনে নেই প্রাসঙ্গিক লোকটির নেশা প্রথমবার নাকি দ্বিতীয়বারের নিরীক্ষা ছিল; লোকটা যদি আরেকটু কড়া মাত্রায় নিতো, কিংবা চরসটা যদি প্রতিক্রিয়া করে থাকে, কোনো কারণ ছাড়াই, সাধারণের চেয়েও যার প্রভাব অনেক বেশি– তাহলে তা কি বিরল ঘটনা নয়?

লোকটা আমাকে বলেছিল যে তার আহ্লাদের পুরো সময়টা জুড়ে, নিজেকে প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ অনুভব করা আর নিজেকে প্রতিভাসম্পন্ন বিশ্বাস করার পরম আনন্দময়তায়, হঠাৎ কামড় বসিয়েছিল প্রচণ্ড ভীতির আতঙ্ক । প্রথমে নিজের সংবেদনের সৌন্দর্যে ঔজ্বল্যে ভেসে, ওর আচমকা ভীতির গহ্বরে পড়ে গিয়েছিল । লোকটা নিজেকে প্রশ্ন করেছিল : “এই স্হিতিতে আমার বুদ্ধিমত্তা আর দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কেমন দশা হবে” ( যে স্হিতিকে ও মনে করেছিল অতিপ্রাকৃত )” যদি এই স্হতি চলতেই থাকে আর অসুস্হ অবস্হায়  আত্মার চোখ উন্মোচিত হয়, এই ভয় এমনই যে তার যন্ত্রণা কথা বলে বোঝানো যাবে না । “আমি যেন এক পলাতক ঘোড়া হয়ে উঠেছিলুম”, বলল লোকটা, “টগবগিয়ে রসাতলের দিকে ছুটছি, থামতে চাইছি কিন্তু পারছি না । সত্যিই আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা, আর আমার ভাবনাচিন্তা, ঘটনাক্রমের, দুর্ঘটনার, প্রতিবেশের গোলাম, আর এই সবকিছুই একটা কথায় বলা যায়, তা হলো ঝুঁকি, যা বিশুদ্ধ, পরম গীতোচ্ছাসের আদল নিয়েছিল । আমি কাতর হয়ে নিজেকে বারবার বলতে থাকলুম, ‘অনেক দেরি হয়ে গেছে, অনেক দেরি হয়ে গেছে !’ যখন এই মেজাজ, যা আমার মনে হচ্ছিল অনন্তকালীন, আর আমি সাহস করে বলছি যে তা কেবল কয়েক মিনিটের ছিল, পালটে গেলো, যখন আমি ভাবলুম যে প্রাচ্যের মানুষদের প্রিয় আনন্দের সাগরে আমি ডুব দিতে পারি, যা এই ভয়ঙ্কর অবস্হায় সফল হয়, নতুন একটা দুর্ভাগ্য আমাকে জড়িয়ে ধরল; এক নতুন উদ্বেগ, যদিও মামুলি, আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল । আমার হঠাৎ মনে পড়ল রাতে আমাকে একটা ভোজে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে, অভিজাত লোকেদের সান্ধ্য জমায়েতে। আমি আগাম দেখতে পেলুম যে আমি ভদ্র সুশীল সম্ভ্রান্ত লোকেদের মধ্যে রয়েছি, যেখানে প্রত্যেকে নিজের প্রতিভূ, যেখানে আমার মনের অবস্হা ঝলমলে আলোর মাঝে সাবধানে গোপন করতে হবে । আমি নিশ্চিত ছিলুম যে সফল হবো, কিন্তু ইচ্চাশক্তির প্রয়াসের কথা মনে আনতেই আমার হৃদয় প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিল । কিন্তু ভাগ্যক্রমে, কারণ ঠিক মনে নেই, গসপেলের উপদেশ, “যে দুর্ভোগে ভোগে তার কাছে অপরাধ আসে!” আমার স্মৃতিতে লাফিয়ে এলো, আর তা ভুলে যাবার চেষ্টায়, তাকে ভুলে যাবার জন্য চিন্তাকে কেন্দ্রিত করতে গিয়ে, আমি কথাটা বারবার নিজেকে শোনাতে লাগলুম । আমার বিপর্যয়, ব্যাপারটা সত্যিই বিপর্যয় ছিল, বিশাল আকার নিয়ে ফেললো : আমার দুর্বলতা সত্তেও, আমি সক্রিয় হবার নির্ণয় নিলুম, আর একজন ডাক্তারের পরামর্শের জন্য গেলুম,  আমি প্রতিষেধক ওষুধগুলো জানতুম না, আর বেপরোয়া স্বাধীন মেজাজে জমায়েতে পৌঁছোতে চাইছিলুম, যেখানে আমাকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে ; কিন্তু দোকানটার চৌকাঠে অকস্মাৎ একটা চিন্তা আমাকে কাবু করে ফেললো, ভুতে পাওয়ার মতন, ভেবে দেখতে বাধ্য করলো । আর যেতে-যেতে একটা দোকানের জানলায় নিজেকে দেখতে পেয়েছিলুম, আর আমার মুখটা আমাকে চমকে দিলো । ফ্যাকাশেপনা, চাপা দুটো ঠোঁট, এই ফ্যালফেলে চোখ ! — আমি সজ্জন লোকটাকে ভয় পাইয়ে দেবো, নিজেকে বললুম, আর সামান্য হেলাফেলার খাতিরে ! আর তার সঙ্গো যোগ করো তামাশা যা আমি এড়াতে চাইছিলুম, ওষুধের দোকানে লোকজন থাকারও আশঙ্কা ছিল । কিন্তু অচেনা ডাক্তারটার প্রতি আমার আচমকা সমবেদনা আমার অন্য অনুভূতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে নিলো । আমি কল্পনা করলুম যে এই লোকটা আমার এই মারাত্মক মুহূর্তে আমার মতনই সংবেদনশীল, আর যেমন-যেমন কল্পনা করলুম, এও ভাবলুম যে লোকটার কান আর আত্মা, আমার মতনই, সামান্য আওয়াজে কেঁপে ওঠে, আমি পা টিপে টিপে এগোবার কথা ভাবলুম।

‘ব্যাপারটা অসম্ভব’, নিজেকে বললুম, ‘আমি যে লোকটার সহানুভূতিতে গলা ঢোকাতে যাচ্ছি, তার সঙ্গে আচরণে বড়ো বেশি সতর্কতা নিয়ে ফেলবো।’ তারপর নির্ণয় নিলুম যে নিজের কন্ঠস্বরকে একেবারে স্তব্ধ করে ফেলবো, আমার পায়ের আওয়াজের মতন । তুমি তো জানোই, চরস-নেয়া গলার আওয়াজ : গম্ভীর, ঘড়ঘড়ে, রাশভারি ; আফিমখোর নেশাড়ুদের মতন নয় । যা চেয়েছিলুম ফলাফল হলো তার একেবারে উল্টো ; ডাক্তারকে বিশ্বাস করাবার প্রয়াসে, আমি তাঁকে ভড়কে দিলুম । উনি এই অসুস্হতার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না ; এমনকি এই অসুখের কথা শোনেনওনি কখনও ; তবু উনি আমার দিকে তাকিয়ে দেখলেন কৌতূহল আর অবিশ্বাস মিশ্রিত চাউনি মেলে । উনি কি আমাকে পাগল, অপরাধী বা ভিখারি বলে মনে করলেন ? নিঃসন্দেহে, কোনোটাই নয়, কিন্তু এইসমস্ত বিদঘুটে চিন্তা আমার মগজে লাঙল চালাচ্ছিল । আমি ওনাকে বিস্তারিতভাবে খোলোশা করতে বাধ্য ছিলুম ( কী ক্লান্তিকর ! ) চরসের মেঠাই ঠিক কী বস্তু আর কি জন্য নেয়া হয়, বারবার বোঝাচ্ছিলুম যে তাতে কোনো বিপদ হয় না, আর যাঁহাতক ওনার ব্যাপার, আঁৎকে ওঠার প্রয়োজন নেই, আর আমি যা চাইছিলুম তা স্রেফ প্রভাবটাকে কমাবার বা প্রতিরোধ করার উপায়, মাঝে মাঝে যোগ করছিলুম যে ওনাকে বিরক্ত করার জন্য আমি আন্তরিক দুঃখিত । আমার বলা শেষ হয়ে গেলে ( এই কথাগুলোয় নিজেকে কতোটা ছোটো করলুম সেদিকে খেয়াল দিতে বলব তোমাকে ) উনি বেমালুম চলে যেতে বললেন । আমার ভাবনাচিন্তাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্হাপনের আর শুভচিন্তার এই ছিল পুরস্কার । আমি সন্ধ্যার নিমন্ত্রণে গেলুম ; আমি কাউকেই অপদস্হ করলুম না । কেউই আঁচ করতে পারলো না অন্য লোকেদের মতন হবার জন্য আমাকে কতো কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে ; কিন্তু আমি কখনও ভুলবো না অতিকাব্যিক নেশার অত্যাচার যা শালীনতা দিয়ে সীমাবদ্ধ আর কর্তব্যের চিন্তায় স্বভাববহির্ভূত ।” যদিও কল্পনাপ্রসূত প্রতিটি যন্ত্রণার প্রতি আমি সমবেদনা জানিয়ে ফেলি, এই ঘটনা শুনে আমি নিজের হাসি থামাতে পারিনি । যে লোকটা আমাকে গল্পটা বলেছিল সে সেরে ওঠেনি । লোকটা অভিশপ্ত মেঠাইতে উত্তেজনা পাবার ঝোঁক বজায় রেখেছিল যা কিনা সে জ্ঞান থেকেই পেতে পারতো ; কিন্তু যেহেতু লোকটা বিচক্ষণ আর সংসারি, পার্থিব মানুষ, ও মাত্রা কমিয়ে এনেছে, যার দরুণ বেড়ে গেছে পুনরাবৃত্তি । লোকটা পরে টের পাবে “বিচক্ষণতার” পচা ফলের স্বাদ কেমন হয় !

এবার ফিরে যাই নেশার স্বাভাবিক অগ্রগতির বিষয়ে । প্রথম পর্বের বালকসূলভ আহ্লাদের পরে, বস্তুত, সাময়িক শিথিলতা আসে ; কিন্তু নতুন ঘটনাবলী এসে হাজির হয় সংবেদনের অতিমাত্রিক শীতলতায় — যা এমনকি হয়ে উঠতে পারে, কোনো কোনো লোকের ক্ষেত্রে, তিক্ত-শীতল — আর অঙ্গে-প্রত্যঙ্গে প্রচণ্ড দুর্বলতা । তখন তোমার হবে “মাখনের আঙুল”; আর তোমার মগজে, তোমার সমগ্র অস্তিত্বে, তুমি বোধ করবে এক হতবুদ্ধিকর তন্দ্রা আর স্তম্ভন । তোমার মাথা থেকে এগোতে থাকে তোমার চোখ ; যেন সেগুলোকে প্রতিটি দিকে টান মারছে অনবদ্য পরিতোষ । তোমার মুখাবয়ব ঢেকে যাবে ফ্যাকাশেপনায় ; ঠোঁট ঢুকে যাবে ভেতরে, শ্বাসহীনতার টানে, সেই ধরণের উচ্চাকাঙ্খী মানুষদের মতন যারা নিজেদের বড়ো-বড়ো প্রকল্পনার শিকার হয়, পেল্লাই ভাবনাচিন্তার পাহাড়ের তলায় চাপা, কিংবা দীর্ঘ শ্বাস নেয় যেন ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে । বলা যায়, গলা বন্ধ হয়ে আসে ; তৃষ্ণায় টাকরা শুকিয়ে যায়, যাকে তৃপ্ত করা হয়ে উঠবে অত্যন্ত মিষ্টি, যদি তখনও  আলস্যের আনন্দ মজাদার বলে মনে না হয়, আর দেহে কোনোরকম তোলপাড় না ঘটায় । গভীর অথচ কর্কশ দীর্ঘশ্বাস বেরোয় তোমার বুক থেকে, যেন পুরোনো বোতলের মতন তোমার দেহ, নতুন মদের, তোমার আত্মার, সক্রিয় আবেগ সইতে পারছে না । সময়ে-সময়ে  অঙ্গবিক্ষেপ তোমাকে অসাড় করে তোলে আর শিহরণ ঘটায়, অনেকটা প্রচণ্ড দৈহিক খাটুনির পর দিনের শেষে মাংসপেশিতে যেমন খিঁচুনি হয় কিংবা রাতের বেলায় ঝড়ের আগে নিশ্চিন্ত তন্দ্রায় যেমন হয়।

আরও এগোবার আগে আমি ওপরে যে শীতলতার সংবেদনের কথা বলেছি, সেই প্রসঙ্গে আরেকটা কাহিনি বলব, যা পরিষ্কার করে দেবে যে ঠিক কতোখানি প্রভাবগুলো, এমনকি নিছক দৈহিক প্রভাব, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে বদলাতে পারে । এবারে যিনি কথা বলছেন তিনি  একজন সাহিত্যিক, আর তাঁর গল্পের কোনো কোনো অংশে যে কেউ ( আমি মনে করি ) সাহিত্যিক মেজাজের ইঙ্গিত পাবেন । “আমি নিয়েছিলুম”, উনি আমাকে বলেছিলেন, “যৎসামান্য পাতাঘাসের মাত্রা, আর সব কিছুই ভালোভাবে চলছিল । আহ্লাদের সঙ্কট বেশিক্ষণ স্হায়ী হয়নি, আর আমি নিজেকে পেলুম অবসন্নতা আর বিস্ময়ের স্হিতিতে যা প্রায় ছিল মহানন্দের । আমি আশা করছিলুম এক শান্তিময় আর উদ্বেগহীন সন্ধ্যা : দুর্ভাগ্যবশত, সুযোগ আমাকে উৎসাহিত করলো এক বন্ধুর সঙ্গে নাটক দেখতে যাবার । আমি নায়কোচিত পথ বেছে নিলুম, আমার অপার আলস্য আর চুপচাপ বসে থাকার স্হিতিকে কাটিয়ে উঠতে চাইলুম । আমাদের পাড়ার প্রতিটি ঘোড়ার গাড়ি লোকে ভাড়া করে নিয়েছিল ; আমি রাস্তার ভিড়ের কর্কশ আওয়াজ, বোকা পথচারীদের মূর্খ কথাবার্তা, একটা পুরো সাগর ফালতু লোকে ঠাশা, তার ভেতর দিয়ে অনেকটা হাঁটতে বাধ্য হলুম । আমার আঙুলের ডগাগুলো আগে থাকতেই একটু ঠাণ্ডা ছিল, যেন আমি দুটো হাত বরফের জলে চুবিয়েছি । কিন্তু একে যন্ত্রণাবোধ বলব না ; ধারালো ছুঁচ ফোটানোর মতন অনুভূতি বরং আমাকে আনন্দ দিচ্ছিল। তবু যতো হাঁটতে লাগলুম ততো এই শীতলতা আমার ওপর ছেয়ে যেতে লাগলো । যাঁর সঙ্গে আমি ছিলুম তাঁকে কয়েকবার জিগ্যেস করলুম যে সত্যিই কি খুব ঠাণ্ডা লাগছে । উনি উত্তরে বললেন যে, বরং উলটো, অন্য দিনের তুলনায় তাপ বেশ উষ্ণ । শেষ পর্যন্ত নাটকে পৌঁছে, যে বক্স আমার জন্য নির্ধারিত ছিল সেখানে বসে, তিন-চার ঘণ্টা বিশ্রাম নেয়া যাবে আঁচ করে মনে হলো বাইবেল বর্ণিত ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’তে পৌঁছে গেছি । আসার সময়ে যে অনুভূতিগুলো আমি যৎসামান্য কর্মশক্তি দিয়ে মাড়িয়ে এসেছিলুম তা এবার ফেটে পড়ল, আর আমি নিজেকে ছেড়ে দিলুম আমার নিঃশব্দ প্রমত্ততায় । শীতলতা বাড়ছিল, অথচ দেখলুম লোকেরা হালকা পোশাকে এসেছে, এমনকি ঘেমে গিয়ে ক্লান্তি কাতাবার জন্য কপাল পুঁচছে । এই মজাদার ধারণাটা আমাকে পেয়ে বসল, যে আমি একজন বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষ, যাকে নাটকের হলঘরে গ্রীষ্মকালে শীত উপভোগ করার অধিকার দেয়া হয়েছে । ভীতিকর মনে না হওয়া পর্যন্ত শীতলতা বাড়তেই থাকলো ; কিন্তু কতো বেশি শীতলতায় আচ্ছন্ন হতে পারি সেই কৌতূহল আমাকে কাবু করে ফেলেছিল । শেষ পর্যন্ত এমন একটা সময় এলো যখন তা অনেক বেশি হয়ে পড়লো, সার্বত্রিক, যে আমার ধারণাগুলো জমে বরফ হয়ে যেতে লাগলো ; আমি হয়ে গিয়েছিলুম চিন্তান্বিত একতা বরফের চাঙড় । আমি কল্পনা করছিলুম যে বরফ কেটে আমার মূর্তি গড়া হয়েছে, আর এই উন্মাদ বিভ্রম আমাকে এতো গর্বান্বিত করলো, নিজের মধ্যে এক নৈতিক শুভত্বের বোধ জাগিয়ে তুললো, যে তোমাকে তা বর্ণনা করার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না । আমার জঘন্য আহ্লাদকে যা উঁচুতে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল তা হল নিশ্চয়তার এই বোধ যে বাদবাকি উপস্হিত লোকজন আমার অবস্হা আর তাদের তুলনায় আমার নায়কত্ব তারা অজ্ঞতার কারণে টের পাচ্ছে না, আর এই আনন্দে বিহ্বল হয়ে যে আমার সঙ্গী এক মুহূর্তের জন্যেই সন্দেহ করতে পারেনি যে কেমন অদ্ভুত অনুভূতিতে আমি টইটুম্বুর । আমি

আমার কৈতবের পুরস্কার চুপচাপ গ্রহণ করলুম, আর আমার অসাধারণ আনন্দ হয়ে রইলো যথার্থ গোপনতা । 

“তাছাড়া, আমি সবে বক্সে ঢুকেইছিলুম আর আর আমার চোখ অন্ধকারের প্রকোপে ছেয়ে গেলো যার সঙ্গে, আমার মনে হলো, আমার শীত করার ধারণার সম্পর্ক আছে ; হতে পারে যে এই দুটো ধারণা একে অপরকে শক্তি যুগিয়েছিল । তুমি তো জানো হ্যাশিস সদাসর্বদা আলোর চমৎকারিত্বের উদ্রেক করে, রঙের বাহার, তরল সোনার গড়িয়ে পড়া ; সমস্ত ধরণের আলোই এর প্রতি সমবেদী, যা আলো চাদরের মতন ভাসতে থাকে আর যে আলো আঁটা থেকে আবছা ঝুলে থাকে, উভয় ক্ষেত্রেই ; সামাজিক মহিলাদের আয়োজিত সালোঁর ঝাড়বাতিদান, মোমবাতি যা লোকেরা মে মাসে জ্বলায়, সূর্যাস্তের গোলাপি সম্প্রপাত । মনে হয় যে বেচারা ঝাড়বাতি এতো আলো ছড়ায় যে ঔজ্বল্যের তৃপ্তিহীন তৃষ্ণা মেটাতে অকিঞ্চিৎকর হয়ে পড়ে । আমি ভাবলুম, তোমাকে যেমন বলেছি, আমি ছায়ার জগতে প্রবেশ করছিলুম, যা, উপরন্তু, ক্রমশ ঘন হয়ে উঠছিল, আর আমি স্বপ্ন দেখতে লাগলুম মেরুঅঞ্চলের আলো আর অনন্তকালীন শীতের । আর মঞ্চের কথা বলতে গেলে, নাটকটা ছিল মজার দেবীকে নিয়ে ; তা নিজেই ছিল আলোকময় ; প্রথম দিকে ছোটো এবং অনেকটা দূরে, যেন টেলিসকোপের উলটো দিক দিয়ে কোনো ভূদৃশ্য দেখছি । আমি তোমাকে বলব না যে আমি অভিনেতাদের সংলাপ শুনছিলুম ; তুমি জানো যা তা অসম্ভব । থেকে থেকে আমার চিন্তা কোনো সংলাপের টুকরো খুবলে আনছিলো, আর চতুর নাচিয়ে মেয়ের মতন তাকে বহুদূরের হর্ষোল্লাসে লাফিয়ে পৌঁছোবার পাটাতন হিসেবে ব্যবহার করছিল । তুমি হয়তো ভাববে যে এইভাবে একটা নাটক শোনা যুক্তিহীন আর সঙ্গতিহীন । নিজের ভ্রান্তি দূর করো! আমি আবিষ্কার করলুম যে আমার চিত্তবিক্ষেপ নাটকটা  আমার সূক্ষ্ম অনুভূতিকে ছাপিয়ে গেছে । কিছুই আমাকে বিক্ষুব্ধ করলো না, আর আমি যেন হয়ে উঠলুম সেই ক্ষুদে কবির মতন, যে প্রথমবার ‘এসথার’ নাটক দেখে, ভেবেছিল যে রানিকে ভালোবাসার ঘোষণা হামান-এর পক্ষে স্বাভাবিক ছিল । ব্যাপারটা ছিল, যেমন তুমি আঁচ করেছ, সেই দৃশ্যের যেখানে ও এসথারের পায়ে পড়ে নিজের অপরাধের ক্ষমা চাইছিল । যদি এই প্রণালীতে সব নাটক শোনা হয় তাহলে ওরা সবাই, এমনকি রাসিনের নাটকেরও, প্রচুর লাভ হবে । আমার মনে হচ্ছিল যে অভিনেতাগুলো খুবই ছোট্টো,  সুস্পষ্ট এবং রেখাঙ্ক দিয়ে বাঁধা, অনেকটা মেইসনিয়ারের ছবির আকৃতিগুলোর মতন । আমি একেবারে পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছিলুম ওদের পোশাক, তাদের নকশা, সেলাই, বোতাম, ইত্যাদি, কিন্তু তাদের নকল কপাল আর আসল কপালের তফাতও চোখে পড়ছিল ; শাদা, নীল আর লাল, আর মুখ সাজাবার কায়দা; আর এই লিলিপুটগুলোর পোশাক ছিল শীতল ও ঐন্দ্রজালিকভাবে সুস্পষ্ট, যেমনটা কোনো তৈলচিত্রের ওপরে কাচ থাকলে হয় । শেষ পর্যন্ত যখন আমি এই ঠাণ্ডায় জমাট ছায়াদের গুহা থেকে বেরোলুম, তখন, অন্তরজগতের অলীক ছায়ামূর্তিদের ধারাবাহিক প্রবাহ উবে গেল, আমি নিজেকে ফিরে পেলুম, আমি বড়ো বেশি ক্লান্তি অনুভব করলুম যা তার আগে দীর্ঘক্ষণ যাবত করা কঠিন কাজকর্ম করেও আমার হয়নি।”

সত্যি বলতে কি, নেশার এই পর্বে এক নতুন মাধুর্য দেখা দ্যায়, প্রতিটি ইন্দ্রিয়তে এক উচ্চতর প্রখরতা : গন্ধ, দেখা, শোনা, স্পর্শ এগিয়ে চলায় সমানভাবে যোগ দ্যায় ; চোখ দেখতে পায় অসীমকে ; প্রচণ্ড আওয়াজের মধ্যেও কান শুনতে পায় সূক্ষ্ম শব্দগুলো । এই সময়েই আরম্ভ হয় হ্যালুশিনেশানের কুহক ; বহির্জগতের বস্তুরা একের পর এক অদ্ভুত আকার নিতে থাকে ; তারা বিকৃত হয় আবার নিজের আকারে ফিরে আসে । তারপর — ধারণাদের অস্পষ্টতা, ভুলবোঝা, আর পক্ষান্তরণ ! শব্দেরা নিজেদের রঙে মুড়ে ফ্যালে ; রঙেরা কুসুমিত হয় সঙ্গীতে। যা তুমি বলবে, স্বাভাবিকতা ছাড়া কিছুই নয় । প্রতিটি কাব্যিক মস্তিষ্ক তার সুস্হ, স্বাভাবিক অবস্হায়, এই আনুরূপ্যগুলো সহজেই কল্পনা করতে পারে । কিন্তু আমি পাঠকদের আগেই সতর্ক করেছি যে চরস সেবন করায় কোনোরকম ইতিবাচক অতিপ্রাকৃত ব্যাপার নেই; আনুরূপ্যগুলোতে আছে অপরিচিত প্রাণবন্ততা ; তারা প্রবেশ করে আর তারা বিকশিত হয় ; তারা তাদের দক্ষতা দিয়ে মনকে অভিভূত করে । সঙ্গীতের স্বরলিপি হয়ে যায় সংখ্যা ; আর যদি তোমার মগজ গাণিতিক প্রবণতায় দক্ষ, যে ঐকতান তুমি শোনো, তার সংবেদনাময় ও ইন্দ্রিয়পরায়ণ চরিত্র বজায় রেখে, নিজেকে বিশাল ছন্দময় ক্রিয়াকলাপে বদলে ফ্যালে, যেখানে সংখ্যা থেকে সংখ্যার জন্ম হয়, আর যার স্তরগুলো এবং উৎস এক অনির্বচনীয় স্বাচ্ছন্দ্য ও তৎপরতাকে অনুসরণ করে, যা সঙ্গীতকারের সমান হয়ে ওঠে ।

অনেক সময়ে এমনও হব যে লোকটার ব্যক্তিত্বের বোধ লোপাট হয়ে যায়, আর যে বস্তুনিষ্ঠতা সর্বেশ্বরবাদী কবিদের জন্মগত অধিকার তা তোমার মধ্যে এমন অস্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয় যে বহির্জগতের বস্তুদের সম্পর্কে তোমার চিন্তা তোমাকে নিজের অস্তিত্বের কথা ভুলিয়ে দ্যায় আর তোমাকে তাদের সঙ্গে হতবুদ্ধি করে । তোমার দৃষ্টি একটা গাছে নিবদ্ধ, বাতাস তাকে সুসঙ্গতভাবে বেঁকিয়ে দিয়েছে ; কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে একজন কবির মস্তিষ্কে যা কেবল স্বাভাবিক  উপমা তোমার কাছে বাস্তব হয়ে দেখা দ্যায় । প্রথমে তুমি গাছটাকে তোমার আবেগ, তোমার আকাঙ্খা, তোমার বিষাদ দান করো ; তার কড়কড় শব্দ আর দোল খাওয়া তোমার হয়ে ওঠে, আর শীঘ্রই তুমি নিজেই গাছ হয়ে যাও । ঠিক যেভাবে পাখিরা নীলিমার বিস্তারে ঘুরে বেড়ায় : প্রতীকিস্তরে তা মানুষের যাবতীয় ব্যাপারের ওপর তোমার অমরত্বের ক্ষুধাকে প্রতিনিধিত্ব করে ; কিন্তু শীঘ্রই তুমি পাখি হয়ে যাও । তারপর, মনে করো, তুমি বসে-বসে ফুঁকছো ; তোমার দৃষ্টি বেশ কিছুক্ষণের জন্য নীল মেঘের প্রতি আকৃষ্ট হবে, যা তোমার পাইপ থেকে শ্বাস হয়ে উঠেছিল ; মন্হর, অবিরাম, অনন্তকালীন বাষ্পীভবনের ধারণা দখল করে নেবে তোমার আত্মা, আর এই ধারণা তুমি তোমার ভাবনাচিন্তায়, তোমার চিন্তাধারার নিজস্ব উপকরণে প্রয়োগ করা আরম্ভ করবে। অনন্যসাধারণ অস্পষ্টতার মাধ্যমে, বুদ্ধিমত্তার পরিবহন প্রজাতির অদলবদলের দ্বরা, তুমি নিজের বাষ্পীভবন অনুভব করবে, আর তুমি তোমার পাইপকে দেবে, যাতে তুমি তামাকের মতন কুঁজো আর দাবিয়ে ঠাশা অনুভব করছি, তোমাকে ধোঁয়ায় পরিবর্তনের অদ্ভুত কর্মক্ষমতা !

সৌভাগ্যবশত, এই অন্তহীন কল্পনা শুধু এক মিনিটের জন্য স্হায়ী ছিল । একটা সূক্ষ্ম বিরতির জন্য, অনেক চেষ্টা করে অভিগ্রস্ত, তোমাকে ঘড়ির দিকে তাকাতে উৎসাহিত করেছে । কিন্তু চিন্তাধারার আরেকটি স্রোত তোমাকে বহন করে নিয়ে যায় ; তা তোমাকে আরও এক মিনিট তার ঘুর্ণিতে তোমাকে গড়িয়ে নিয়ে যাবে, আর এই অতিরিক্ত মিনিট হবে অনন্তকালীন। কেননা তোমার অনুভূতি আর ধারণা সময়ের বিপুল অংশের  দ্বারা সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল । কেউ হয়তো বলতে পারে যে একটিমাত্র ঘণ্টার পরিসরে একজন লোক বহুবার বাঁচতে পারে । তাহলে তুমি কি, অসাধারণ উপন্যাসের মতন, লিখিত হবার বদলে জীবন্ত ? দেহিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আর আনন্দ উপভোগের মধ্যে আর কোনও সমীকরণ নেই ; আর সর্বোপরি, এর ফলে যে দোষারোপ উৎপন্ন হয় তাকে ব্যক্তি-স্বাধীনতার বিপজ্জনক প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে ।

যখন আমি হ্যালুশিনেশানের কথা বলি তখন শব্দটা তার যথাযথ বোধে গ্রহণ করতে হবে। বিশুদ্ধ হ্যালুশিনেশানের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব, যে বিষয়ে ডাক্তাররা অধ্যয়ন করে থাকেন, তার সঙ্গে হ্যালুশিনেশনের, বা ইন্দ্রিয়দের ভুল ব্যাখ্যা, ঘটে চরসের দরুন উৎপন্ন মানসিক স্হিতির। প্রথমটির ক্ষেত্রে হ্যালুশিনেশন হয় আচমকা, সম্পূর্ণ, এবং মারাত্মক ; তাছাড়া, তার কোনো পৃষ্ঠভূমি বা ওজর বাইরের জগতে খুঁজে পাওয়া যায় না । অসুস্হ মানুষ দেখতে পায় ছায়া-আকার কিংবা শুনতে পায় এমন সমস্ত আওয়াজ যা আদপে ঘটেনি । দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, যেখানে হ্যালুশিনেশান ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তা প্রায় ইচ্ছাকৃত, আর তা নিখুঁত হয় না, তা কল্পনার আশ্রয়ে পরিপুষ্ট হয় । শেষে, এর একটা অজুহাত আছে । আওয়াজ কথা বলবে, সম্পূর্ণ আলাদা উচ্চারণে ; কিন্তু আওয়াজ যে ছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই । চরস নেশাখোরের উৎসাহী দৃষ্টি অদ্ভুত আকারদের দেখতে পায়, কিন্তু অদ্ভুত আর রাক্ষুসে হবার আগে আকারগুলো সরল আর স্বাভাবিক ছিল । তেজোময়তা, হ্যালুশিনেশনের জীবন্ত সংলাপ এই নেশায় কোনোক্রমেই এই মৌলিক পার্থক্যকে বাতিল করে না : একটির শিকড় রয়েছে অবস্হায়, এবং বর্তমান সময়ে, অন্যটার নেই । তপ্ত ফুটন্ত এই কল্পনাকে বরং ব্যাখ্যা করা যাক, স্বপ্নের এই পরিপক্বতা, আর এই কাব্যিক বালখিল্য যে কারণে চরসের নেশাগ্রস্ত মস্তিষ্ক নিন্দিত হয়, আমি তোমাকে আরেকটা গল্প শোনাবো । এবার কোনো অলস লোক নয় যে কথা বলছে । ইনি একজন মহিলা ; মহিলাটি আর তাঁর প্রথম যৌবনে নেই ; কৌতূহলী, উত্তেজিত হতে চান এমন মনের, এবং যিনি, বিষটির সঙ্গে পরিচিত হবার আগ্রহে আত্মসমর্পণ করেছেন, এইভাবে আরেকজন মহিলার গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলো বর্ণনা করেছেন । আমি হুবহু তুলে দিচ্ছি ।

বারো ঘণ্টার উন্মাদনা থেকে আমার পাওয়া অনুভূতিগুলো যতোই অদ্ভুত হোক বা নতুন– বারো ঘণ্টার ছিল নাকি কুড়ি ? সত্যি বলতে, আমি সঠিক বলতে পারব না — আমি আর কখনও সেই স্হিতিতে ফিরে যেতে চাই না । আত্মিক উত্তেজনা ছিল প্রাণবন্ত, তা থেকে পাওয়া ক্লান্তি বড্ডো বেশি ; আর, এক কথায় বলতে হলে, শৈশবে এইভাবে ফিরে যাওয়া আমার মনে হয়েছে অপরাধ । শেষ পর্যন্ত ( বহুবার ইতস্তত করার পর ) কৌতূহলে আত্মসমর্পণ করলুম, যেহেতু সেটা বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়া বোকামি ছিল, আমার মনে হয়েছিল যৎসামান্য সন্মান নষ্ট হলে খুব বেশি ক্ষতি হবে না । কিন্তু প্রথমেই তোমাকে বলে রাখি অভিশপ্ত এই হ্যাশিস জিনিসটা বড়ো ভয়ঙ্কর বিশ্বাসঘাতক মাদক । অনেক সময়ে লোকে মনে করে যে সে নেশা থেকে মুক্ত হয়ে গেছে ; কিন্তু তা নিছক শান্তির প্রতারণা । বিশ্রামের মুহূর্ত থাকে বটে, আর তারপর পুনঃপ্রকোপ । সন্ধ্যায় দশটার আগে আমি নিজেকে এই রকম এক সাময়িক স্হিতিতে পেলুম ; আমি ভাবলুম জীবনের এই প্রাণপ্রাচুর্য থেকে  পালিয়ে আসাটা, যা আমাকে এতো আনন্দ দিয়েছে, ব্যাপারটা সত্যি, কিন্তু তা উদ্বেগহীন আর ভয়হীন ছিল না। রাতের খাবারের জন্য মহানন্দে বসলুম, সেই ধরণের মানুষের মতন যে দীর্ঘ যাত্রার পর বিরক্তিকর পরিশ্রান্তে ক্লান্ত ; কেননা তার আগে পর্যন্ত, সাবধান হয়ে, আমি খাওয়া থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলুম ;কিন্তু আমি টেবিল থেকে ওঠার আগেই বিভ্রম আমাকে আবার আঁকড়ে ধরেছিল, যেমন কোনো বিড়াল ইঁদুরকে ধরে, আর বিষটা আমার বেচারি মগজে নতুন করে খেলা আরম্ভ করল । যদিও আমার বাড়ি বন্ধুদের বাড়ির কাছেই, আর আমার জন্য ঘোড়ার গাড়িও ছিল, আমি স্বপ্ন দেখার জন্য, আর নিজেকে অপ্রতিরোধ্য উন্মাদনার হাতে ছেড়ে দেবার জন্য একেবারে আবিষ্ট অনুভব করলুম, যে সকাল পর্যন্ত থেকে যাবার তাদের প্রস্তাবে আনন্দে রাজি হয়ে গেলুম । তুমি তো দুর্গের কথা জানো ; তুমি জানো যে ওরা যে অংশে সাধারণত থাকে সেখানে আয়োজন করেছে, সাজিয়েছে, আর আধুনিক কায়দায় সুখস্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্হা করেছে, কিন্তু যে অংশটা সাধারণত যেমনটা আগে ছিল তেমনই খালি পড়ে থাকে, সেই পুরোনো শৈলী আর পুরোনো নকশাগুলো বজায় রেখেছে । বন্ধুরা এই অংশে আমার জন্য একটা শোবার ঘরের ব্যবস্হা করল, আর এই জন্য তারা সবচেয়ে ছোটো ঘরটা বেছে নিলো, এক ধরণের খাসকামরা, যেটা, কিছুটা ফ্যাকাশে আর পলেস্তারা-খসা হলেও মনোমুগ্ধকারী । যতোটা পারি তোমার জন্য বর্ণনা করব, যাতে তুমি টের পাও যা কেমনতর অদ্ভুত দর্শনশক্তিতে আপ্লুত হয়েছিলুম, যে দর্শনশক্তি আমার সারাটা রাতে ছেয়ে গিয়েছিল, সময়ে চলে যাওয়া সম্পর্কে জানার বিশ্রামটুকুও দেয়নি । 

“খাসকামরাটা খুবই ছোটো, বেশ অপ্রশস্ত । ঝালরের উচ্চতা থেকে ছাদের খিলান নেমেছে গম্বুজের মতন ; দেয়ালগুলো সঙ্কীর্ণ, লম্বা আয়নায় ঢাকা, প্যানেল দিয়ে আলাদা-করা, যার ওপর ভূচিত্র, সাজাবার মতন সহজ শৈলীতে, আঁকা । চার দেয়ালের ছাদের কারুকার্যে নানা রকমের রূপকধর্মী মূর্তি আঁকা, কয়েকজন বিশ্রামরত, অন্যেরা দৌড়োচ্ছে বা উড়ছে ; তাদের ওপরে চমৎকার সব ফুল আর পাখি । মূর্তিগুলোর পেছনে জাফরি, চোখকে ফাঁকি দেবার মতন করে আঁকা, আর স্বাভাবিকভাবে ছাদের বাঁককে অনুসরণ করেছে ; ছাদটা সোনালী।

কাঠের কারুকাজ আর জাফরি আর মূর্তিদের মাঝেকার ফাঁকগুলো সোনায় মোড়া, আর একেবারে মধ্যখানে সোনাকে নকল জাফরির জ্যামিতিক নকশায় বিভক্ত করা ; তুমি দেখলে মনে করবে সেটা অনেকটা খানদানি খাঁচার মতন, বেশ বড়ো একটা পাখির জন্যে একটা সুন্দর খাঁচা । আমি একানে যোগ করতে চাইব যে রাতটা ছিল বেশ সুন্দর, বেশ পরিষ্কার, আর চাঁদ ঝলমল করছিল আলোয় ; এমনই যে আমি মোমবাতি নেভাবার পরও সাজানো নকশাগুলো দেখা যাচ্ছিল, আমার মনের চোখ দিয়ে যে আলোকিত তা নয়, তুমি হয়তো তাইই ভাববে, বরং এই সুন্দর রাত দিয়ে, যার আলো সোনার সমস্ত নকশা, আয়না, আর রঙের বাহারকে আঁকড়ে ছিল ।

“আমি প্রথমে খুবই অবাক হয়েছিলুম যে আমার সামনে বিশাল ফাঁকা জায়গা ছড়িয়ে রয়েছে, আমার আসেপাশে, আমার চারিদিকে । রয়েছে অনাবিল নদী, আর সবুজ চারণভূমি যারা নিজেদের সৌন্দর্যকে শান্ত জলে মুগ্ধভাবে প্রশংসা করছে : আয়নায় পপতিফলিত প্যানেলগুলোর প্রভাব তুমি নিশ্চয়ই আঁচ করতে পারছ । চোখ তুলে আমি দেখতে পেলুম সূর্য আস্ত যাচ্ছে, যেন শীতল হয়ে-আসা গলিত ধাতু । তা আসলে ছিল ছাদের সোনা । কিন্তু জাফরিগুলো দেখে আমার মনে হলো আমি এক ধরণের খাঁচায় রয়েছি, কিংবা শূন্যে ঝোলানো একটা বাড়িতে যার সব দিক খোলা, আর এই বিস্ময়গুলো থেকে আমাকে আলাদা করে রেখেছে আমার কয়েদখানার শিকগুলো । যে বিভ্রম আমাকে পাকড়াও করেছিল তাতে প্রথমত তো আমি একচোট হাসলুম ; কিন্তু যতোই দেখতে থাকলুম ততোই তার ম্যাজিক বাড়তে লাগলো, চতুর বাস্তবতায় জীবন্ত ও স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগলো । যে মুহূর্ত থেকে আমার মাথায় বন্দি থাকার ধারণা চেপে বসল, আমি মানতে বাধ্য, যে নানারকম আহ্লাদ আমি চারিদিক এবং ওপর থেকে পাচ্ছিলুম তাতে আর গুরুতরভাবে বাধা দিলো না । আমি নিজের সম্পর্কে ভাবতে লাগলুম যে আমি দীর্ঘকাল যাবত কারারুদ্ধ, হয়তো হাজার বছরের জন্য, এই মহার্ঘ খাঁচায়, পরীদের এই চারণভূমিতে, মনোমুগ্ধকর দিগন্তের মাঝে । আমি কল্পনা করলুম আমি ‘ঘুমন্ত সুন্দরী’ হয়ে গেছি ; স্বপ্ন দেখলুম প্রায়শ্চিত্তের যা আমাকে ভোগ করতে হবে, আগামী উত্তরণের জন্য । আমার মাথার ওপর ডানা ঝাপটাচ্ছিল গ্রীষ্মমণ্ডলের চমৎকার পাখির দল, আর আমার কান যখন শুনতে পেলো প্রধান রাস্তায় বহুদূর হেঁটে যাওয়া ঘোড়ারদের গলার ছোটো ঘণ্টার শব্দ, দুটি ইন্দ্রিয় একত্রিত হয়ে একটি মাত্র ধারণায় তাদের প্রতীতিকে মিশিয়ে ফেললো, আমার মনে হল রহস্যময় বেহায়া মন্ত্রোচ্চারণ করছে পাখির দল ; আমি কল্পনা করলুম যে পাখিগুলো ধাতব কন্ঠে গান গাইছে । প্রত্যক্ষরূপে তারা আমার সঙ্গে কথা বলছিল, আর আমার বন্দিদশা নিয়ে স্তবগান করছিল । তিড়িং-নাচিয়ে বাঁদরেরা, ভাড়ের মতন দেখতে বনদেবতারা এই বন্দির দশা দেখে, যে নড়াচড়া করতে অপারগ, নিজেদের মধ্যে হইহুল্লোড় করছিল ; তবু পুরাণের সব কয়টি দেবী-দেবতারা আমার দিকে মনোরম হাসিমুখে তাকাচ্ছিল, যেন আমাকে ধৈর্য ধরে উৎসাহিত করছিল  যাতে এই ডাকিনি-প্রকোপ সহ্য করতে পারি, আর ওনাদের চোখগুলো চোখের পাতার কোনায় আটকে ছিল যাতে আমাকে কোনঠাশা করা যায় । আমি এই নির্ণয়ে পৌঁছোলুম যে যদি আগেকার কালের কোনো দোষ, যা আমিও জানি না, এই সাময়িক শাস্তিকে জরুরি করে তুলেছিল, আমি তবুও এক উপচে-পড়া শুভত্বে বিশ্বাস করতে পারছিলুম, যা কিনা, আমাকে বুদ্ধিমান কার্যধারায় নিপাতিত করলেও, আমাদের যৌবনের লঘুমস্তিষ্ক আনন্দের চেয়ে আমাকে সত্যকার আনন্দ দেবে । দেখছেন তো যে আমার স্বপ্নে নৈতিক বিবেচনা অনুপস্হিত ছিল না ; কিন্তু স্বীকার করছি যে এই সমস্ত চমৎকার আদল-আদরা আর রঙবাহার পর্যবেক্ষণ করার আনন্দ এবং নিজেকে এক অদ্ভুত নাটকের কেন্দ্র মনে করার ভাবনা আমার অন্যান্য চিন্তাকে অহরহ নিবিষ্ট করে ফেলছিল । এটা দীর্ঘক্ষণ স্হায়ী ছিল, অনেক ক্ষণ । সকাল পর্যন্ত ছিল কি ? আমি ঠিক জানি না । হঠাৎই আমি দেখলুম সকাল বেলাকার সূর্য আমার ঘরে স্নান করছে । আমার এক প্রাণবন্ত বিস্ময়বিমূঢ়তার অভিজ্ঞতা হলো, আর আমি যেটুকু গড়ে ফেলতে পেরেছি, স্মৃতির যাবতীয় প্রয়াস সত্তেও, আমি কখনও নিজেকে নিশ্চিন্ত করতে পারিনি যে আমি ঘুমিয়েছিলুম নাকি ধৈর্যসহকারে এক সুস্বাদু অনিদ্রায় ভুগেছিলুম । এক মুহূর্ত আগে, রাত ; এখন, দিন। আর তবু আমি বহুক্ষণ সময় কাটিয়েছিলুম ; ওহ, অনেকক্ষণ ! সময়ের প্রতীতি, কিংবা বলা যায় নিয়মানুগ সময়, বাতিল করে দেবার কারণে, সমস্ত রাত আমার চিন্তার অজস্রতা দিয়ে কেবল পরিমাপযোগ্য ছিল । এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আমার মনে হয়েছিল এতো দীর্ঘকালীন ক্ষণ, এও মনে হয়েছিল যে তা কেবল কয়েক সেকেণ্ড বজায় ছিল ; এমনকি হয়তো তা আদপে অনন্তকালে ঘটেইনি ।

“আমি আপনাকে আমার ক্লান্তির বিষয়ে কিছু বলিনি ; তা ছিল অপরিমেয় । আমি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলুম, লোকে বলে যে কবিদের আর সৃজনশীল শিল্পীদের উৎসাহের সঙ্গে তার মিল আছে, যদিও আমি চিরকাল বিশ্বাস করেছি যে যাঁদের ওপর আমাদের আলোড়িত করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, নিশ্চয়ই তাঁরা শান্ত ধাতের মানুষ হবেন । কিন্তু কবিদের সৃজনশীল-উন্মাদনা যদি আমার জন্য যোগাড় করা এক চামচ হ্যাশিস মেঠাইয়ের সমান হয়, আমি ভাবতে বাধ্য হচ্ছি যে কবিরা জনগণের খরচে যে আনন্দ বহন করেন, আর তা এক ধরণের ভালো-থাকার বাইরের ব্যাপার নয়, তাহলে আমি অন্তত নিজেকে নিজের আশ্রয়ে রয়েছি বলেই মনে করব, মানে আমার বৌদ্ধিক আশ্রয়ে ; অর্থাৎ, বাস্তব জীবনে।”

মহিলাটির বক্তব্য, স্পষ্টত যুক্তিসঙ্গত ; কিন্তু ওনার গল্প থেকে আমরা কয়েকটা জরুরি তথ্য নেবো, যা  হ্যাশিসের উদ্রেক করা প্রধান অনুভূতিগুলোর কথা পুরো করবে ।

উনি বলছেন রাতের ভোজের সঙ্গে সঠিক সময়ে আনন্দের আগমনের কথা ; এক মুহূর্তে যখন সাময়িক উপশম, চূড়ান্ততার ভানের জন্য সাময়িক, তাঁকে বাস্তব জগতে ফিরে যাবার অনুমতি দিলো । সত্যিই, যেমন আমি বলেছি, সাময়িক বিরতি এবং প্রতারণাময় শান্তি ঘটে, আর হ্যাশিসের নেশা সঙ্গে আনে উদারসর্বস্ব ক্ষুধা, এবং প্রায় সব সময়ের প্রচণ্ড তৃষ্ণা । কেবল সন্ধ্যার খাওয়া বা রাতের ভোজ, স্হায়ী আরাম আনার বদলে, শুরু করে নতুন অভিগ্রহ, যে ঘুর্নিময় সঙ্কটের অভিযোগ মহিলা করছেন, এবং যার পরে ঘটতে থেকেছে একের পর এক জাদুপূর্ণ অল্প আতঙ্ক মেশানো দৃষ্টিপ্রতিভা, যাতে উনি আত্মসমর্পণ করলেন, জগতের সেরা অনুগ্রহের কোলে নিজেকে সোপর্দ করে । আমরা যে স্বৈরাচারী ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কথা বলি তা প্রচুর সমস্যা ছাড়া নিরীক্ষা করা যায় না । কেননা লোকটা নিজেই নিজেকে এমন বস্তুজগতের ঊর্ধে মনে করে যে, কিংবা বলা যায় লোকটা নেশাব এতো আচ্ছন্ন হয়ে যায়, যে একটা বোতল বা কাঁটাচামচ তুলতেও তার সাহসের দীর্ঘ সময় লাগবে । খাবার হজম করার সঙ্কটও বেশ উদ্দাম ; তার বিরুদ্ধে লড়া অসম্ভব । এবং এই স্হিতি যদি দীর্ঘক্ষণ চলে তাহলে তাকে সমর্থন করা যায় না, আর যদি তার জায়গায় নেশার আরেকটা দমক তাড়াতাড়ি দেখা না দ্যায়, যা উপরোক্ত ক্ষেত্রে অসাধারণ ভিশান, মনোরমভাবে আতঙ্কিত স্হিতির মাধ্যমে বর্ণিত, তা একই সঙ্গে সান্তনায় পরিপূর্ণ । এই নতুন স্হিতিকে প্রাচ্যের লোকেরা বলে ‘কায়েফ’। স্হিতিটা আর ঝড়ের ঘুর্ণি নয় ; তা সমাহিত পরম সুখের প্রশান্তি, এক মহিমান্বিত সমর্পণের। বহুক্ষণ যাবত তুমি তোমার নিজের মালিক ছিলে না ; কিন্তু তা নিয়ে তুমি নিজেকে ব্যতিব্যস্ত করো না । ব্যথা, এবং সময়ের বোধ, লোপাট হয়ে গেছে ; কিংবা যদি তারা উঁকি মারার সাহস দেখায়, তা কেবল প্রধান অনুভূতি দিয়ে পালটানো, আর তারা তখন, তাদের সাধারণ প্রকোপের তুলনায়, কাব্যিক বিষাদ । গদ্যের ক্ষোভ নয় ।

কিন্তু সর্বোপরি বলা যাক যে এই মহিলার বর্ণনায় ( এবং সেকারণেই আমি ওনার বক্তব্যের মাধ্যমে উপস্হাপন করেছি ) হ্যালুসিনেশানটা জারজ, আর তার প্রকাশ ঘটছে বহির্জগতের বস্তুদের উপস্হিতির দরুন । আত্মা তো কেবল আয়না যাতে পরিবেশ প্রতিফলিত হচ্ছে, অদ্ভুতভাবে পরিবর্তিত । তারপর, আবার, আমরা দেখছি ঢুকে পড়ছে একটা ব্যাপার যাকে আমি বলব নৈতিক হ্যালুশিনেশান ; রুগি মনে করছেন যে তিনি কিঞ্চিদধিক প্রায়শ্চিত্তে নিপাতিত ; কিন্তু নারীর মেজাজ, যার বিশ্লেষণ করা মনানসই হবে না, হ্যালুশিনেশানের অদ্ভুত ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যকে নজর দিতে পারল না । অলিমপাসের দেবতাদের দয়াময় মুখাবয়বকে কাব্যিক করে তোলা হয় হ্যাশিসের পালিশের দ্বারা । আমি বলব না যে এই মহিলা অনুশোচনার আঁচল ছুঁতে পেরেছেন, কিন্তু ওনার ভাবনাচিন্তা, মুহূর্তের জন্য বিষাদের দিকে মোড় নিয়েছিল এবং গতানুশোচনা বেশ তাড়াতাড়ি আশার রঙে রাঙিয়ে উঠেছিল। এই পর্যবেক্ষণ আমরা আবার বিবেচনা করার সুযোগ পাবো ।

উনি সকালবেলাকার ক্লান্তির কথা বলছেন ল সত্যি বলতে কি, এটা বিরাট ব্যাপার। কিন্তু তা তক্ষুনি দেখা দেয়নি, আর যখন তুমি তার অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিচ্ছ তুমি তা অবাক না হয়ে দিচ্ছ না : কেননা প্রথমে তুমি সত্যিই নিশ্চিন্ত হয়েছ যে তোমার জীবনের দিগন্তে এক নতুন দিন দেখা দিয়েছে, তুমি শুভত্বের অসাধারণ অনুভূতির অভিজ্ঞতা পাচ্ছ ; মনে হচ্ছে তুমি আত্মার চমৎকার ভারহীনতা উপভোগ করছ । কিন্তু তুমি উঠে নিজের পায়ে দাঁড়াবার আগেই নেশার একটা ভুলে যাওয়া টুকরো তোমাকে অনুসরণ করে পেছনে টেনে নিচ্ছে ; এটা তোমার সাম্প্রতিক ক্রীতদাসত্বের নিশানচিহ্ণ । তোমার দুর্বল পা তোমাকে সাবধান করে দেবে, আর তুমি প্রতিমুহুর্তে ভেঙে টুকরো হবার ভয়ে আতঙ্কিত হবে, যেন তুমি পোর্সিলিন দিয়ে গড়া । এক বিস্ময়কর অবসাদের স্নিগ্ধতা — এমন অনেকে আছেন যাঁরা ভান করেন যে এতে চারুতার অভাব নেই — তোমার আত্মাকে দখল করে, আর ছড়িয়ে পড়ে তোমার কর্মক্ষমতা জুড়ে, যেমনভাবে কুয়াশা ছড়িয়ে পড়ে কোনও তৃণভূমিতে । তাহলে, তুমি মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য, সেখানে আটক, কাজ করতে অক্ষম, ক্রিয়াহীন আর তেজোময়তা-বর্জিত । এটা অপবিত্র অপব্যয়িতার শাস্তি ; তুমি তোমার স্নায়বিক তেজ খুইয়েছো । তুমি তোমার ব্যক্তিত্বকে স্বর্গের চারটি বাতাসে উড়িয়ে দিয়েছো — আর এখন, কীই বা হবে আবার কষ্ট করে তাতে নিবিষ্ট হয়ে !

চতুর্থ অধ্যায়

মানবেশ্বর

বালকসুলম মাথার ধোঁয়া থেকে জন্মানো  এই সমস্ত ভোজবাজি, বড়ো-বড়ো পুতুলনাচ এখন একপাশে সরিয়ে রাখার সময় এসেছে। আমাদের কি আরও গুরুতর ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে হবে না — লোকজনের মতামতের পরিবর্তন, এবং, এক কথায়, হ্যাশিসের নিয়মনিষ্ঠা সম্পর্কে?

এখন পর্যন্ত আমি নেশা সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন দিয়েছি ; আমি সীমাবদ্ধ থেকেছি নেশার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর লক্ষণ নিয়ে । কিন্তু যা গুরুত্বপূর্ণ, আমার মনে হয়, আধ্যাত্মিক মানসিকতার মানুষের জন্য, মানুষের যে অংশটা আধ্যাত্মিক তার ওপর এই বিষের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে পরিচয় ; অর্থাৎ, তার অভ্যাসগত ভাবপ্রবণতা এবং তার নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর বৃদ্ধি, বিকৃতি ও অতিরঞ্জন, যা তাদের উপস্হাপন করে, বিরল আবহে, তাদের একটি সত্যকার প্রতিসরণ ।

যে লোকটা দীর্ঘকালের জন্য নিজেকে আফিম বা হ্যাশিসের নেশায় ছেড়ে দেবার পর, হয়ে উঠেছে, অভ্যাসের দাসত্বের দরুণ দুর্বল, তাকে পেতে হবে বাঁধন কেটে বেরোনোর কর্মশক্তি, তাকে আমার মনে হয় ফেরারি কয়েদির মতন । লোকটা আমাকে তার প্রতি অনুরক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে, বিশেষ করে সেই সাবধানী লোকগুলোর তুলনায় যারা কখনও অধঃপতিত হয়নি, সব সময় প্রলোভন এড়াতে যত্নশীল থেকেছে । ইংরেজরা, আফিমখোরদের বিষয়ে আলোচনার সময়ে, প্রায়ই এমন সমস্ত শব্দ ব্যবহার করে যেগুলো অত্যন্ত কঠোর মনে হবে সেই সমস্ত নিরীহ লোকেদের কাছে যারা অধঃপতনের আতঙ্ক সম্পর্কে কিছুই জানে না — ‘শৃঙ্খলিত’,

‘পায়ে বেড়ি পরানো’, ‘ক্রীতদাসত্ব’ ইত্যাদি । শৃঙ্খল, সত্যি বলতে, এর সঙ্গে যদি তুলনা করতে হয়, কর্তব্যের শৃঙ্খলতা, বেপরোয়া প্রেমের শৃঙ্খল — মাকড়সার লুতাতন্তু কিংবা পাতলা কাপড়ের বুনানি ছাড়া আর কিছুই নয় ।

মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের অপপ্রীতিকর বিয়ে ! “আফিমের খাঁচায় আমি কয়েদি ক্রীতদাস হয়ে গিয়েছিলুম, আর আমার শ্রম ও আমার ব্যবস্হা স্বপ্নের রঙে রাঙিয়ে উঠেছিল”, লিজিয়ার স্বামী বলেছিল । কিন্তু কতোগুলো বিস্ময়কর অনুচ্ছেদে এডগার পো, এই অতুলনীয় কবি, এই দার্শনিক যাঁর বিরোধিতা করা হয়নি, যাঁর উদ্ধৃতি, যখনই আত্মার রহস্যময় গোলমালের প্রসঙ্গ উঠবে, দেয়া জরুরি, আফিমের অন্ধকার আর আঁকড়ে-ধরা উজ্বল দীপ্তির কথা বর্ণনা করে গেছেন ! আলোকময়ী বেরেনিসের প্রেমিক ইগোয়াস, অধিবিদ্যায় পণ্ডিত মানুষ, নিজের মৌলিক মানসিক শক্তির পরিবর্তনের কথা বলেন, যা তাঁকে মামুলি ঘটনারও অস্বাভাবিক ও দানবিক মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে । 

“দীর্ঘ ক্লান্তিহীন সময় গভীর চিন্তায় মগ্ন থেকে, কোনো বইয়ের মার্জিন অথবা হরফের অপ্রয়োজনীয়  নকশায় আমার আগ্রহ কেন্দ্রিত ;  গ্রীষ্ম-দিনের বেশিক্ষণ সময়, মেঝের ওপরে কিংবা দেয়াল-ঢাকা পর্দায় মিহি বেঁকে-থাকা ছায়ায় ডুবে থাকা ; সারা রাতের জন্য আমার নিজেকে হারিয়ে ফেলা, বাতির শিখার  কিংবা আগুনের স্ফূলিঙ্গের দিকে একঠায় তাকিয়ে থাকা ; সারাদিন ফুলের সুগন্ধে স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকা ; কোনো প্রচলিত শব্দকে একঘেয়ে বারবার বলে, যতক্ষণ না শব্দ, প্রতিবার বলার কারণে, মনের ভেতরের কোনো ধারণাকে অর্থহীন করে দিচ্ছে ততোক্ষন ; গতিবিধির সমস্ত ধারণা কিংবা দৈহিক অস্তিত্বের সংবেদন  হারিয়ে ফেলা, শরীরের চরম নিশ্চলতায় দীর্ঘক্ষণ ও একগুঁয়েভাবে যত্নশীল হওয়া : এগুলোই ছিল কয়েকটা সাধারণ আর ন্যূনতম ক্ষতিকারক অস্পষ্টতা, যা মানসিক ক্ষমতার এক বিশেষ অবস্হার ফলে প্রণোদিত, যদিও একেবারে নিরুপম নয়, কিন্তু তা নিঃসন্দেহে বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যা করার চেষ্টার প্রতি দৃঢ় অবজ্ঞা ।”

এবং স্নায়ুচাপে পীড়িত অগাস্টাস বেদলো, যিনি প্রতিদিন সকালে হাঁটতে যাবার আগে নিজের আফিমের খোরাক খেয়ে বেরোন, বলেছেন যে এই দৈনিক বিষপান থেকে তিনি যে অন্যতম পুরস্কার পেয়েছেন তা হল মহাআগ্রহে সমস্তকিছুকে নিজের অন্তরে নিয়ে নেওয়া, এমনকি অত্যন্ত মামুলি ব্যাপারও ।

“ইতিমধ্যে মরফিন তার পরিচিত প্রভাব আরম্ভ করে দিয়েছিল — তা হল বহির্জগতকে তীব্র আগ্রহে আত্মস্হ  করা । কোনো পাতার কাঁপুনি — ঘাসের শিসের রঙে — ছাতিম পাতার আকারে — একটা মৌমাছির গুঞ্জনে — এক ফোঁটা শিশিরের আলোকণায় — বাতাসের শ্বাসে — বনানী থেকে আসা মৃদু গন্ধগুলোতে — নিয়ে এলো সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের ইশারা — উচ্ছসিত এবং শৃঙ্খলাহীন চিন্তার এক আনন্দময় ও চিত্রবিচিত্র সারি ।”

এই ভাবেই নিজেকে ব্যক্ত করেছেন, কাঠপুতুলদের মুখ দিয়ে, ভয়ঙ্করতার গুরু, রহস্যের রাজকুমার । আফিমের এই দুটি বৈশিষ্ট্য হ্যাশিসের ক্ষেত্রে হুবহু প্রযোজ্য । একটির ক্ষেত্রে, যেমন অপরটির ক্ষেত্রে, বুদ্ধিমত্তা, যা আগে স্বাধীন ছিল, ক্রীতদাস হয়ে যায় ; কিন্তু ‘মহাকাব্যিক’ শব্দটি, যা বাইরের জগতের  প্ররোচিত ও নির্দেশিত চিন্তার ধারাপ্রবাহ ও পরিবেশের দুর্ঘটনা দ্বারা সুন্দরভাবে সংজ্ঞায়িত, বলতে গেলে সত্য এবং হ্যাশিসের নেশার ক্ষেত্রে আরও বেশি করাল । এক্ষেত্রে যুক্তিবোধের ক্ষমতা কেবল ঢেউয়ের মতন, প্রবাহের দয়ার ওপর নির্ভরশীল এবং চিন্তার শৃঙ্খলা অনেক গতিবেগসম্পন্ন ও বেশি ‘মহাকাব্যিক’; অর্থাৎ, স্পষ্ট করে আমি বলতে চাই যে হ্যাশিস, তার তাৎক্ষণিক ক্রিয়ায়, আফিমের থেকে অনেক বেশি অনুভূতি উৎপন্নকারী, রোজকার জীবনযাপনে বড়োই প্রতিকূল ; এক কথায়, বিপর্যস্তকারী । আমি জানি না টানা দশ বছর হ্যাশিসের নেশা টানা দশ বছর আফিমের নেশার সমান অসুখগুলো সঙ্গে আনবে কিনা ; আমি বলতে চাইছি, খানিক সময়ের জন্য, সেবনের পরের দিনের জন্য, হ্যাশিসের ফলাফল মারাত্মক হয় । একটা হলো মিঠে কথার মায়াবিনী ; অন্যটা তেড়ে আসা রাক্ষস ।

এই শেষ পর্বে আমি সংজ্ঞায়িত ও বিশ্লেষণ করতে চাই এই বিপজ্জনক এবং সুস্বাদু অভ্যাসের কারণে যে নৈতিক সর্বনাশ ঘটে সেই সব কথা ; এই সর্বনাশ এতো ব্যাপক, এক বিপদ যা প্রগাঢ়, যে যারা এর সঙ্গে লড়ে ফিরেছে কিন্তু যৎসামান্য আহত, তাদের দেখে আমার মনে হয় সেই নায়কেরা যারা প্রোটিয়াসের বহুরুপী গুহা থেকে পালাতে পেরেছে, কিংবা অরফিয়াসের মতন, নরকের বিজেতা । তুমি চাইলে, মনে করতে পারো, এই ধরণের ভাষা বাড়িয়ে বলা রূপক, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আমি জোর দিয়ে বলব যে এই উত্তেজক বিষগুলোকে আমার মনে হয় কেবল এক রকমের ভয়ঙ্কর এবং নিশ্চিত উপায় নয় যা অন্ধকারের মায়াপুরুষ বরবাদ মানবদের বন্দি করার জন্য প্রয়োগ করে, বরং তার নিখুঁত অবতারদের অন্যতম । 

এবার, আমার কাজ কমিয়ে এনে বিশ্লেষণকে স্পষ্ট করার খাতিরে, ছড়ানো-ছেটানো গল্প সংগ্রহ করার পরিবর্তে, আমি পর্যবেক্ষণের প্রাচুর্যের মাঝে একটিমাত্র পুতুলকে পোশাক পরাবো। সেক্ষেত্রে আমাকে আবিষ্কার করতে হবে একটি আত্মা যা আমার উদ্দেশ্যের সঙ্গে খাপ খাবে । তাঁর ‘স্বীকৃতি’ বইতে ডি কুইনসি সঠিক বলেছিলেন যে আফিম, মানুষকে ঘুম পাড়াবার বদলে, তাকে উত্তেজিত করে ; কিন্তু তাকে তার স্বাভাবিক পথে উত্তেজিত করে, তাই আফিমের বিস্ময়গুলোকে বিচার করার জন্য কোনো বলদ বিক্রেতার ওপরে তা চেষ্টা করা বাতুলতা হবে, কেননা সেরকম এক স্বপ্ন হবে গবাদি পশুর আর ঘাসের । আমি একজন হ্যাশিসের নেশাগ্রস্ত গরুমোষ প্রজননকারীর জগদ্দল কল্পনা বর্ণনা করতে যাচ্ছি না । কেই বা তা আনন্দে পড়বে, কিংবা পড়বার অনুমতি দেবে ? আমার বিষয়কে আদর্শ হিসাবে উপস্হাপনের জন্য আমাকে যাবতীয় রশ্মিকে একটিমাত্র বৃত্তে কেন্দ্রিত করে সমবর্তিত করতে হবে ; আর যে বিয়োগান্তক বৃত্তে আমি তাদের জড়ো করব তা হলো, যেমন আগেই বলেছি, আমার নিজের পছন্দের একজন মানুষ ; অনেকটা আঠারো শতকে যাকে বলা হতো ‘সংবেদনশীল মানুষ’ ( homme sensible ), যাকে রোমান্টিক গোষ্ঠি নাম দিয়েছিল ‘ভুল বোঝা মানুষ’ ( homme incompris ), আর গৃহস্হ ও বুর্জোয়ারা সাধারণত বলত “মৌলিক।” এই ধরণের নেশায় মাতাল হবার জন্য অনুকূল হলো অর্ধেক স্নায়ুচাপে পীড়িত, অর্ধেক খিটখিটে মনগঠন । এর সঙ্গে যোগ করা যাক এক শিক্ষিত মন, আদরা আর রঙের সাথে পরিচিত, একটি কোমল হৃদয়, দুর্ভাগ্যের দরুন বিষাদগ্রস্ত, কিন্তু তবু আবার যুবক করে তোলা যেতে পারে তাকে ; তোমরা অনুমতি দিলে, আমরা বিগতকালের ভুলগুলো স্বীকার করে নেবো, এবং, এর দরুন  সহজে উত্তেজিত হয় এমন, ইতিবাচক পশ্চাত্তাপ যদি নাও হয়, অন্তত বাজেভাবে খরচ করে ফেলা ও সীমালঙ্ঘিত সময়ের কারণে অনুতাপ করবে।

অধিবিদ্যায় আগ্রহ, মানব নিয়তি সম্পর্কিত দর্শনের বিভিন্ন ধরনের অনুমানের সঙ্গে পরিচয়, নিঃসন্দেহে অপ্রয়োজনীয় শর্ত হবে না ; এবং, তাছাড়া, সততাকে গ্রহণ করা, বিমূর্ত সততাকে, সামাজিক হোক বা নিগূঢ়, যা তাবৎ বইতে রচিত যার ওপর নির্ভর করে আধুনিক বালখিল্য, যার যাকে মনে করা হয় লক্ষে পৌঁছোবার জন্য আত্মার  সর্বোচ্চ শিখর । এই সমস্তের সঙ্গে যদি যোগ করা হয় ইন্দ্রিয়ের পরিশোধন — আর আমি যদি এটা উল্লেখ করতে ভুলে গিয়ে থাকি তাহলে বুঝতে হবে আমি একে মনে করেছিলুম বাহুল্যপূর্ণ — আমি মনে করি যে আমি সাধারণ উপাদান সংগ্রহ করতে পেরেছি যা ‘সংবেদনশীল মানুষদের’ মধ্যে আখছার পাওয়া যায় এবং যাকে বলা যেতে পারে মৌলিকতার সর্বনিম্ন পরিমাপ । এবার দেখা যাক এই ব্যক্তিতার কী ঘটবে যদি তাকে হ্যাশিসের চূড়ান্ত নেশায় ফুসলিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় । মানুষের কল্পনার শেষ এবং অতীব চমৎকার পান্হশালা পর্যন্ত এর ক্রমবৃদ্ধি অনুসরণ করা যাক ; ব্যক্তিটির নিজের দিব্যতায় বিশ্বাসের সীমা পর্যন্ত যাওয়া যাক ।

যদি তুমি এইরকম এক আত্মা হও আদরা এবং রঙ সম্পর্কে তোমার স্বভাবগত ভালোবাসা শুরু থেকেই তোমার প্রাথমিক স্তরের নেশায় পাবে বিশাল এক ভোজসভা । রঙগুলো অপরিচিত তেজোময়তায় আক্রান্ত হবে আর তোমার মস্তিষ্কের ভেতরে বিজয়ের  কেতন উড়িয়ে পরস্পরকে আচ্ছন্ন করবে । তারা সূক্ষ্ম, মামুলি, কিংবা খারাপ হলেও, ছাদে আঁকা ছবিগুলো প্রাণশক্তির পোশাক পরে অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে উঠবে । পান্হশালার দেয়ালগুলোয় যে খসখসে কাগজ সাঁটা তা অসাধারণ পরিদৃশ্যের মতন নিজেদের মেলে ধরবে । ঝিকমিকে মাংসল পরিরা আকাশ ও সাগরের চেয়ে গভীর ও অনাবিল আয়ত চোখে তোমার দিকে তাকাবে । বহু-প্রাচীন চরিত্রেরা, যাজক কিংবা সেনার পোশাকে, একটিমাত্র চাউনি মেলে, তোমার সঙ্গে গোপন কথাবার্তা আদান-প্রদান করবে । সর্পিল রেখেগুলো নিঃসন্দেহে বোধগম্য একটি ভাষা যেখানে তুমি পড়তে পারবে তাদের আত্মার দুঃখ ও আবেগ । তা সত্তেও, এক রহস্যময় অথচ সাময়িক মানসিক স্হিতি আপনা থেকে গড়ে উঠবে ; জীবনের নিগূঢ়তা, বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত, দৃষ্টির সামনে সুস্পষ্ট উদয় হবে, তা যতোই স্বাভাবিক ও মামুলি হোক না কেন, চোখের সামনেই রয়ে যাবে ; যে বস্তুগুলো প্রথমে দেখা দেবে সেগুলো বার্তাবহ প্রতীক । ফুরিয়ার এবং সোয়েডেনবোর্গ, প্রথমজন তাঁর উপমান দিয়ে, এবং দ্বিতীয়জন সংগতি দিয়ে, তোমার চোখের সামনে যাকিছু ভেষজ ও জান্তব দেখা যায়, তাতে নিজেদের মূর্ত করেছেন, এবং কন্ঠস্বরের দ্বারা স্পর্শের পরিবর্তে তাঁরা তোমাকে আঙ্গিক ও রঙে উদ্বুদ্ধ করেন । এই রূপকের বোধ তোমার অন্তরে যে অনুপাত সৃষ্টি করে তা তুমি নিজেই জানো না। প্রসঙ্গক্রমে আমরা বলব যে রূপক, শিল্পের এতো আধ্যাত্মিক অংশ, চিত্রকরদের আনাড়িপনার ফলে যাকে আমরা হেয় জ্ঞান করতে অভ্যস্ত, অথচ যা সত্যিই কবিতার সবচেয়ে স্বাভাবিক ও আদিম আঙ্গিক, তার দৈব অধিকার ফিরে পায় নেশার দ্বারা আলোকিত বুদ্ধিমত্তায়। তখন হ্যাশিস ছড়িয়ে জীবনের সর্বত্র ; বলা যায়, ম্যাজিক পালিশের মতন । তার অসামান্যতা আলোকিত হয় রঙের সুশীল আবছায়ায় ; অসমতল উপত্যকা, ধাবমান দিগন্ত, শহরগুলোর পরিপ্রেক্ষণ যা শাদা হয়ে উঠেছে ঝড়ের শবানুগ বিবর্ণতায় কিংবা সূর্যাস্তের কেন্দ্রিত ব্যকুলতায় উজ্বল ; শূন্য-পরিসরের রসাতল, সময়ের অতলের রূপক ; নৃত্য, অভিনেতাদের অঙ্গভঙ্গী অথবা সংলাপ, যদি তোমি নাট্যালয়ে থাকো ; তোমার চোখ যদি কোনো বইতে পড়ে তাহলে প্রথম প্রবাদ ; এক কথায়, সমস্তকিছু ; অস্তিত্বের বিশ্বজনীনতা নতুন গৌরব নিয়ে তোমার সামনে এসে দাঁড়ায় যা ততোক্ষণ পর্যন্ত ছিল অজানিত । ব্যাকরণ, শুকনো ব্যাকরণ নিজেই, হয়ে দাঁড়ায় “আহ্বানের অশুদ্ধ নাম”-এর বই । শব্দেরা আবার উঠে দাঁড়ায়, মাংস ও হাড়ের পোশাকে ; বিশেষ্য, তার অটল মহিমায় ; রঙ আর ঝিলমিলে জালে মোড়া বিশেষণদের স্বচ্ছ আলখাল্লা ; এবং ক্রিয়াপদ, গতির প্রধান দেবদূত যা বাক্যটিকে দোল খাওয়ানো আরম্ভ করে।

সঙ্গীত, অলসদের কিংবা জ্ঞানী আত্মাদের প্রিয় ভাষা, যারা তাদের কাজ-কারবারকে বদলে-বদলে জিরিয়ে নিতে চায়, তোমাকে তোমার কথাই বলে, তোমার জীবনের কবিতা আবৃত্তি করে শোনায় ; তা তোমার অন্তরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে, এবং তুমি তাতে মুর্ছিত হয়ে পড়ো । এ তোমার কামনার কথা বলে, কেবল অস্পষ্ট, অসংজ্ঞায়িত উপায়ে নয়, যেমনটা অপেরায় তোমার অমনযোগী সন্ধ্যায় করে, কিন্তু বেশ সারগর্ভ ও  ইতিবাচকভাবে, প্রতিটি ঝঙ্কার একটি চলনকে চিহ্ণিত করে যাকে তোমার আত্মা চেনে, স্বরলিপির প্রতিটি স্বর পরিবর্তিত হয়ে যায় শব্দে, এবং সম্পূর্ণ কবিতাটি তোমার মস্তিষ্কে প্রবেশ করে যেন একটা প্রাণপ্রাপ্ত অভিধান ।   

এটা অনুমান করা উচিত হবে না যে এই ব্যাপারগুলো একে অপরের ওপরে উদ্দীপনায় তড়িঘড়ি পড়ে যায়, বাস্তবতার কলরবপূর্ণ স্বরাঘাত ও বহির্জীবনের বিশৃঙ্খলাসহ ; অন্তরজগতের চোখ সমস্তকিছুকে পরিবর্তিত করে, এবং সবাইকে সৌন্দর্যের অভিনন্দন জানায় যা এর নিজের নেই, যাতে সত্যকার আনন্দের যোগ্যতাসম্পন্ন হয় । এই জরুরি ইন্দ্রিয়জ ও সংবেদনের পর্বের সঙ্গে তুলনীয় অনাবিল জলের প্রেম, স্হির বা স্রোতোময়, যা আশ্চর্যজনকভাবে কোনো কোনো শিল্পীর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের নেশায় অভিব্যক্ত হয় । আয়না হয়ে উঠেছে এই স্বপ্নবিহ্বলতার অজুহাত, যা অনেকটা গলায় শুকিয়ে যাওয়া আত্মার তৃষ্ণা ও দেহের তৃষ্ণার মিশেল, এবং যে বিষয়ে আমি আগেই বলেছি । বইতে থাকা জল, খেলতে থাকা জল; সঙ্গীতময় ঝর্ণা ; সমুদ্রের অপার নীল ; সবই বর্ণনার অতীত গড়িয়ে যায়, গান গায়, লাফায়। মোহিনীর মতন দুই বাহু এগিয়ে দ্যায় জল ; এবং যদিও আমি হ্যাশিস-সৃষ্ট উন্মাদ হইচইতে বিশ্বাস করি না, আমি জোর দিয়ে বলতে চাই না যে শূন্য-পরিসর ও স্ফটিকে আকর্যিত মানুষের পক্ষে কিঞ্চিদধিক অনাবিল আবর্তের অনুশীলন একেবারেই বিপজ্জনক হবে না, আর  উনদাইন জলপরীর গল্পটা যে উৎসাহীদের জীবনে বিয়োগান্তক হবে না তাও নিশ্চয় করে বলতে পারি না ।

আমার মনে হয় শূন্য-পরিসর এবং সময়ের বিশাল বৃদ্ধি সম্পর্কে আমি যথেষ্ট বলেছি ; দুটি ধারণা সবসময় মিশ খেয়েছে, সবসময় একে আরেকের সঙ্গে বোনা, কিন্তু  সেই সময়ে আত্মা বিষাদ ও ভয়ের মুখোমুখি হয় না । তা বিশেষ বিষণ্ণ আহ্লাদ নিয়ে বহু বছরের ওপারে তাকিয়ে থাকে, এবং অত্যন্ত সাহসিকতায় অনন্তকালীন পরিপ্রেক্ষণে ডুব দ্যায় । তুমি নিশ্চয়ই ভালো করে বুঝতে পেরেছো, আশা করি, যে এই বিকৃত ও স্বৈরাচারী বাড়বাড়ন্ত যাবতীয় সংবেদন এবং ধারণার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য । আমি মনে করি, আমি তুলে ধরতে পেরেছি হিতৈষিতার যথেষ্ট ন্যায্য উদাহরণ । ভালোবাসার ব্যাপারেও এটা সত্য । আমি যেরকম আত্মিক মেজাজের উদ্ভাবন ঘটিয়েছি, সৌন্দর্যের ধারণা স্বাভাবিকভাবেই তাতে বিশাল একটা পরিসরের দখল নিয়ে নেবে । ঐকতান, পংক্তির ভারসাম্য, গতির সূক্ষ্ম সুরপ্রবাহ, যে স্বপ্ন দেখছে তার কাছে দেখা দ্যায় প্রয়োজনীয় হিসাবে, কর্তব্য হিসাবে, কেবল সৃষ্টির তাবৎ অস্তিত্বের জন্য নয়, কিন্তু তার নিজের জন্যও, যে স্বপ্ন দেখছে, যে এই সঙ্কটের সময়ে নিজের মধ্যে আবিষ্কার করে অমর এবং সর্বজনীন ছন্দের এক চমৎকার প্রবণতা । এবং যদি আমাদের গোঁড়া লোকটির ব্যক্তিগত সৌন্দর্যের অভাব থাকে, তাহলে সে মনে করবে যে  সে দীর্ঘ সময় যাবত যে দোষ করেছে তা স্বীকার করতে অপারগ, কিংবা নিজেকে মনে করবে যে তার কল্পনায় গড়া জগতের ঐকতানে ও সৌন্দর্যে সে একটি বেসুরো কন্ঠস্বর । চরস সম্পর্কিত কুতর্ক অসংখ্য ও প্রশংসনীয়, প্রথাগতভাবে ইতিবাচকতার দিকে তার ঝোঁক, এবং  প্রধান ও প্রভাবশালী ব্যাপার হলো যে তা ইচ্ছাকে উপলব্ধিতে পালটে দিতে পারে । ব্যাপারটা একই, নিঃসন্দেহে, সাধারণ জীবনের বহু ক্ষেত্রে ; কিন্তু এখানে আরও কতো আকুলতা ও তনিমার প্রয়োজন হচ্ছে ! নয়তো, কেমন করেই বা একজন মানুষ যে ঐকতান হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম, যেন সে সৌন্দর্যের যাজক, কেমন করেই বা সে তার নিজেরই তত্বের কলঙ্ক হতে পারে, ব্যতিক্রম হতে পারে ? নৈতিক সৌন্দর্য ও তার ক্ষমতা, গরিমা ও ফুসলিয়ে নেবার গুণ, বাগ্মীতা এবং তার কৃতিত্ব, এই সবকয়টি ধারণা শীঘ্রই নিজেদের উপস্হিত করে যাতে চিন্তাহীন কদর্যতাকে শুধরে নেয়া যায় ; তারপর তারা উদয় হয় সান্ত্বনাদানকারী হিসাবে, এবং সব শেষে এক কাল্পনিক দরবারের যুৎসই সভাসদ, মোসাহেব হিসাবে ।

ভালোবাসার বিষয়ে, আমি অনেকের কাছে স্কুল-বালকসুলভ কৌতূহলের কথা শুনেছি, যারা হ্যাশিসের প্রয়োগের সঙ্গে পরিচিত তাদের কাছ থেকে তথ্য যোগাড় করছে, যা কিনা ভালোবাসার নেশা নয়, নিজের স্বাভাবিক স্হিতিতে এতো ক্ষমতাসম্পন্ন, যখন তা অপর নেশাটিতে আবদ্ধ ; সূর্যের ভেতরে এক সূর্য । আমি যাদের বলি বৌদ্ধিক হাঁ-করা, সেই শ্রেনির লোকের মনে এরকম প্রশ্ন জাগে । যে প্রশ্নের লজ্জাজনক অর্ধেক-অর্থের উত্তর খোলাখুলি আলোচনা করা যায় না, আমি পাঠককে বলব প্লিনি পড়তে, যিনি কোথাও গাঁজাপাতার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এমনভাবে বলেছেন যে যাতে বিষয়টা নিয়ে বিভ্রমের ঘোর কেটে যায় । তাছাড়া লোকে জানে, যে সমস্ত মাদক তাদের উত্তেজিত করে তা সেবন করলে কন্ঠস্বরের ক্ষয় হলো নেশার সবচেয়ে সাধারণ প্রতিফল যা মানুষ তাদের স্নায়ুর ক্ষেত্রে ঘটায় । এখন, যখন আমরা প্রভাবশীল গুণের বিষয়ে আলোচনা করছি, গতি আর গ্রাহীক্ষমতা, আমি পাঠককে শুধুমাত্র ভেবে দেখতে বলব যে হ্যাশিসের নেশাগ্রস্ত একজন সংবেদনশীল মানুষের কল্পনাকে   

চূড়ান্ত স্তরে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে টের পাওয়া তেমনই সহজ যেমন ঝড়েতে বাতাসের গতির তীব্রতা, আর তার ইন্দ্রিয়গুলো এমনই এক বিন্দুতে নিগূঢ়, যাকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন । অতএব এটা বিশ্বাস করা যুক্তিযুক্ত যে আলতো আদর, যতোটা নিষ্পাপ হতে পারে, হ্যাণ্ডশেক, উদাহরণস্বরূপ, আত্মার ও সৌন্দর্যের প্রকৃত স্হিতিকে একশোগুণ ধরে রাখতে পারে, আর হয়তো তাদের পরিচালিত করতে পারে, এবং তাও বেশ দ্রুত, সেই সাময়িক সংজ্ঞাহীনতা পর্যন্ত যাকে আনাড়ি নশ্বররা মনে করে আনন্দের সমাপ্তি ( summum );কিন্তু এটা সংশয়াতীত যে হ্যাশিস জেগে ওঠে এমনই এক কল্পনায় যা নিজেকে কোমল স্মৃতিতে পরিব্যপ্ত করতে অভ্যস্ত, যে অবস্হায় ব্যথা ও আনন্দহীনতা নতুন জেল্লা পায় । মনের এই ধরনের মন্হনক্রিয়ায় এটা কম নিশ্চিত নয় যে তাতে রয়েছে কামনার তীব্র উপাদান ; এবং তাছাড়া, এখানে মন্তব্য করা জরুরি — আর হ্যাশিসের অনৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য এই তর্ক যথেষ্ট বলে মনে হয় — ইশমায়েলাইটদের ( ইশমায়েলাইটদের থেকেই অ্যাসাসিন বা গুপ্তঘাতকদের উৎপত্তি ) একটা একটা উপদল হ্যাশিসের অভিবন্দনা এমন স্তরে নিয়ে গিয়েছিল যে তারা লিঙ্গ-যোনি থেকে বহুদূরে চলে গিয়েছিল ; অর্থাৎ, লিঙ্গের চরম অর্চনায়, নারীপ্রতীকের অর্ধাংশকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে । কিছুই অস্বাভাবিক নয়, প্রতিটি মানুষ যেহেতু ইতিহাসের প্রতীকি প্রতিনিধি, কোনো অশ্লীল বৈধর্ম্য দেখতে পেয়ে, এক দানবিক ধর্ম, মনের মধ্যে জাগ্রত হয় যা ভীরুতার সঙ্গে নারকীয় এক মাদকের দয়ায় আত্মসমপহণ করেছে এবং যা নিজের মৌলিক মানসিক শক্তির অবক্ষয় নিয়ে হাসাহাসি করে ।

যেহেতু হ্যাশিসের নেশায় আমরা প্রত্যক্ষ করেছি মানুষের প্রতি অদ্ভুত সদিচ্ছা, এমনকি অচেনা লোকের প্রতিও, লোকহিতৈষণার একটি প্রজাতি যা ভালোবাসার বদলে পরদুঃখকাতরতায় গড়া ( আর এখানেই শয়তানি আত্মার প্রথম বীজ যা পরবর্তীকালে অসাধারণভাবে বিকশিত হবে তা দেখা দেয় ), কিন্তু যা অন্য কাউকে যন্ত্রণা দেবার ভীতি পর্যন্ত এগোয়, যে কেউ অনুমান করতে পারে যে যা ভালোবাসার পাত্রের ক্ষেত্রে স্হানিক ভাবপ্রবণতা হয়ে দেখা দ্যায়, কিংবা দিয়েছে, হইচইকারীর নৈতিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূজা, অর্চনা, প্রার্থনা, আনন্দের স্বপ্ন, ছিটকে বেরোয় এবং অস্পষ্ট তেজোময়তায় ও অত্যুৎসারিতায় রকেটের মতন উৎসারিত হয় । আতশবাজির মশলা আর রঙবস্তুর মতন, তারা ঝিকমিক করে অন্ধকারে বিলীন হয়ে যায় । এমন কোনোরকম সংবেদনশীল সমন্বয় নেই যাতে হ্যাশিস-গোলামের সূক্ষ্ম ভালোবাসা নিজেকে উপুড় করে দেবে না । রক্ষা করার ইচ্ছা, পিতৃত্বের আকুল ও একনিষ্ঠ অনুভূতি মিশে যেতে পারে অপরাধমূলক কামনার সঙ্গে যা হ্যাশিস সদাসর্বদা জানবে কেমন করে মাফ করে দিতে হয় এবং পাপমুক্ত করতে হয় । ব্যাপারটা আরও প্রসারিত হয় । আমার মনে হয়, অতীতের ভুলগুলো আত্মায় তিক্ত পথচিহ্ণ রেখে যায়, একজন স্বামী অথবা একজন প্রেমিকা স্বাভাবিক পরিস্হিতিতে বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে তার ঝঞ্ঝাময় অতীতের মেঘে ছায়া দিনগুলোর কথা ভাববে ; এই তিক্ত ফলগুলো, হ্যাশিসের নেশাগ্রস্ত থাকার সময়ে, মিষ্টি ফল হয়ে উঠতে পারে । ক্ষমা করে দেবার প্রয়োজন কল্পনাকে আরও চতুর ও আরও মিনতিপূর্ণ করে তোলে, এবং অনুশোচনা স্বয়ং, এই শয়তানি নাটকে, যা নিজেকে দীর্ঘ স্বগতসংলাপে প্রকাশ করে, হৃদয়ের উৎসাহকে প্রাচুর্যে ভরিয়ে প্ররোচিত করতে পারে । হ্যাঁ, অনুশোচনা । সত্যকার দার্শনিক মনে হ্যাশিস নিখুঁত শয়তানি যন্ত্রের মতো মনে হয়, এই কথাটা আমি কি ভুল বলেছিলুম ? অনুশোচনা, আহ্লাদের একমাত্র উপাদান, দ্রুত চাপা পড়ে যায় অনুশোচনার সুস্বাদু প্রত্যাশায় ; এক ধরণের ইন্দ্রিয়পরায়ণ বিশ্লেষণে ; এবং এই বিশ্লেষণ এতো তাৎক্ষনিক যে মানুষ, এই প্রাকৃতিক শয়তান, সোয়েডেনবোর্গের অনুসরণকারীরা যেমন বলেন, বুঝতে পারে না এটা কতো অনৈচ্ছিক, আর কেমন করে, মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে, সে শয়তানের পরিপূর্ণতা লাভ করে । সে তার অনুশোচনাকে প্রশংসা করে, আর নিজেকে করে গৌরবান্বিত, এমনকি যখন সে তার স্বাধীনতা খোয়াতে চলেছে।

তাহলে, আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমার কাল্পনিক মানুষটাকে, যে মন আমি বেছে নিয়েছি, আহ্লাদ এবং প্রশান্তির সেই স্তরে পৌঁছেচে যেখানে সে নিজেকে প্রশংসা করতে বাধ্য । প্রতিটি পরস্পরবিরোধিতা নিজেদের মুছে ফ্যালে ; যাবতীয় দার্শনিক সমস্যা স্পষ্ট হয়ে যায়, অন্তত সেটাই মনে হয় ; আনন্দের জন্য সমস্তকিছুই বস্তুগত ; জীবনের যে প্রাচুর্য সে উপভোগ করে তাকে গর্বান্বিত বোধ করতে উৎসাহ যোগায় ; একটা কন্ঠস্বর তার সঙ্গে কথা বলে ( হায়, তার নিজেরই কন্ঠস্বর ! ) যা তাকে বলে : “এখন তোমার অধিকার জন্মেছে নিজেকে সমস্ত মানুষের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করার । কেউ তোমাকে চেনে না, তুমি যা চিন্তা করো ও যা অনুভব করো তা কেউ বুঝতে পারবে না ; তারা, নিঃসন্দেহে, তোমার অন্তরে জাগরিত কামনাসিক্ত ভালোবাসাকে সমাদর করতে পারবে না । পথচারীর কাছে তুমি অপরিচিত মহারাজা ; যে মহারাজা জীবিত, কিন্তু কেউই টের পায় না সে নিজেই নিজের মহারাজা । কিন্তু তোমার তাতে কীই বা আসে-যায় ? তোমার কি সার্বভৌম অবমাননা নেই, যা আত্মাকে দয়ালু করে তোলে ?”

তুমি হয়তো ভাববে, যে এক সময় থেকে আরেক সময়ে  কোনো তোমাকে স্মৃতি কামড়ে ধরবে আর আনন্দকে মাটি করে দেবে । বহির্জগতের কোনো অপছন্দের প্রসঙ্গ অতীতকে জাগিয়ে তোমার মেজাজ খারাপ করে দেবে । অতীতে কতোই বা বোকা আর ইতর কাজকর্ম রয়েছে ! — চিন্তার মহারাজার পক্ষে যা সত্যিই বেমানান, আর কার বর্মকে তারা নোংরা করে ? বিশ্বাস করো, হ্যাশিস-নেয়া লোকটি এই সমস্ত মানহানিকর ভুতপ্রেতকে সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করবে, এমনকি এই সমস্ত বিরক্তিকর স্মৃতি থেকে সে জানতে পারবে আনন্দ আর গর্বের নতুন উপাদান পাওয়া যায় ।

তার যুক্তিতর্কের উদ্ভব এই ভাবেই ঘটবে । ব্যথার প্রাথমিক সংবেদন ফুরিয়ে যাবার পর, সে কৌতূহলী হয়ে যাচাই করে দেখবে তার বর্তমান গৌরবকে কোন কোন স্মৃতি কষ্ট দিয়েছে ; কোন মানসিকতা অমন করে কাজ করতে প্ররোচিত করেছিল ; কোন পরিস্হিতি তাকে তখন ঘিরে রেখেছিল ; এবং সে যদি ঘটনাগুলোয় যথেষ্ট কারণ খুঁজে না পায়, দোষক্ষালনের জন্য না হলেও, অন্তত তার অপরাধবোধকে প্রশমিত করার খাতিরে, এটা মোটেই মনে করা উচিত নয় যে সে পরাজয় স্বীকার করেছে । আমি তার যুক্তিতর্কে উপস্হিত রয়েছি, যেমন করে স্বচ্ছ কাচের তলায় কোনো যন্ত্রের খেলা দেখা যায় । “এই হাস্যকর, ভীতু, কিংবা ইতর কাজ, যার স্মৃতি আমাকে এক মুহূর্তের জন্য বিপর্যস্ত করেছিল, তা আমার সত্যকার ও বাস্তব প্রকৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত, এবং যে তেজোময়তায় আমি তাকে ভর্ৎসনা করছি, যে বিচার-বিবেচনার সাহায্যে আমি তাকে বিশ্লেষণ আর জেরা করছি, প্রমাণ করে সততার জন্য আমার উত্তুঙ্গ ও দৈব আগ্রহ । মানবজগতে কতোজন বুদ্ধিমান মানুষই বা পারে নিজেদের বিচার করতে ; নিজেদের ভর্ৎসনা করার মতো যথেষ্ঠ কঠোর ?” এবং সে কেবল নিজেকে ভর্ৎসনাই করছে না, বরং নিজেকে গৌরবান্বিতও করছে ; ভয়ঙ্কর স্মৃতি আদর্শ সততার অভিপ্রায়ে, আদর্শ পরার্থিতা, আদর্শ প্রতিভায় অভিনিবিষ্ট হবার পর, সে নিজেকে ছেযে দ্যায় বিজয়ী আত্মিক স্ফূর্তিতে । আমরা তা লক্ষ করেছি, কলুষিতকারীদের  ধর্মসংস্কারের নকল তপস্যা, একই সঙ্গে কলুষিত করছে আর স্বীকৃতি দিচ্ছে, সে নিজেকে এক সহজ পাপমোচনে সোপর্দ করেছে ; কিংবা, আরও খারাপ, নিজের গর্ববোধের খোরাকের জন্য সে তার অভিপ্রায়ের আশ্রয় নিয়েছে । এখন, তার স্বপ্নের অন্তর্গত অভিপ্রায় এবং তার সততার পরিলেখ থেকে সে শেয পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারে  যে সততার ব্যবহারিক দক্ষতা তার আছে ; যে প্রণয়োদ্দীপক তেজোময়তা দিয়ে সে এই সততার প্রেতকে প্রভাবিত করে তা থেকে তার মনে হয় তার কাছে যথেষ্ট ও সুনিশ্চিত প্রমাণ রয়েছে যে নিজের উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য তার আছে পুরুষোচিত বীর্যশক্তি । সে স্বপ্নকে কাজ দিয়ে পুরোপুরি বানচাল করে দ্যায়, আর তার কল্পনা, তার নিজের মোহিনী প্রদর্শনীর সামনে উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয়ে তার প্রকৃতিকে শুধরে দ্যায় আর আদর্শায়িত করে, নিজের কল্পনার প্রতিচ্ছবির জায়গায় স্হাপন করে তার সত্যকার ব্যক্তিত্ব, যা ইচ্ছাশক্তিতে দুর্বল, অহমিকায় ধনী, সে তার মহিমান্বয়নকে এই সুস্পষ্ট ও সরল ঘোষণা দিয়ে শেষ করে, যাতে রয়েছে তার জন্য ন্যক্কারজনক আহ্লাদের সমগ্র জগতসংসার :”আমি সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র।” এ-কথা কি তোমায় মনে করায় না ছোট্ট জাঁ-জাক-এর ব্যাপার, যে, সেও ব্রহ্মাণ্ডের কাছে স্বীকার করেছিল, আনন্দহীন নয়, সাহস দেখিয়েছিল বিজয়ের একই কান্নায় ( কিংবা তফাতটা যৎসামান্য ) একই আন্তরিকতা এবং একই প্রত্যয় নিয়ে ? যে উৎসাহ নিয়ে সে সততার প্রশংসা করেছিল, ভালো কাজ কিংবা ভালো কাজের চিন্তা, যা সে নিজে অর্জন করতে চেয়েছিল, যার দরুন স্নায়বিক আবেগে তার চোখ জলে ভরে উঠেছিল, তার যথেষ্ট ছিল নিজের নৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে বাড়িয়ে-চাড়িয়ে ধারণা গড়ার জন্য । হ্যাশিস ছাড়াই জাঁ-জাক নিজেকে নেশাগ্রস্ত করে ফেলেছিল ।

আমি কি এই বিজয়ী বাতিকের আরেকটু বিশ্লেষণ করব ? আমি কি ব্যাখ্যা করব কেমন করে, বিষটার প্রভাবে, আমার আলোচ্য লোকটা নিজেকে ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র করে ফেলেছে ? কেমন করে সে জীবন্ত আর উড়নচণ্ডী উদাহরণ হয়ে উঠেছে সেই প্রবাদের যা বলে যে কামনা চিরকাল সমস্তকিছু নিজের প্রসঙ্গে উল্লেখ করে ? সে নিজের সততা আর নিজের প্রতিভায় বিশ্বাস করে ; তুমি কি শেষটা আঁচ করতে পারছ না ? তাকে ঘিরে থাকা চারিপাশের বস্তুগুলো এতো বেশি পরামর্শমূলক যে সেগুলো তার অন্তরের চিন্তার জগতে আলোড়ন তোলে, আরও বেশি রঙ নিয়ে, বেশি জিবন্ত, আগের থেকে সূক্ষ্ম, ম্যাজিকের ঠাটঠমকে মোড়া । “এই বিশাল শহরগুলো”, সে নিজেকে বলে, “যেখনে অনন্য অট্টলিকাগুলো একটার ওপরে আরেকটা উঠে গেছে ; স্বদেশে ফেরার জন্য কাতর আলস্যে এই সুন্দর জাহাজগুলো পথের ধারের জলরাশিতে ভারসাম্য নিয়ে ভাসছে, আমাদের চিন্তাকে এইভাবে অনুবাদ করে, ‘কখন আমরা আনন্দের পাল তুলে ভাবো ? ; এই জাদুঘরগুলো সুন্দর প্রতিমা আর মোহক রঙে নেশা ধরায়; এই গ্রন্হাগারগুলো যেখানে রয়েছে বিজ্ঞানের বই আর কবিতার স্বপ্নের সংগ্রহ ; যন্ত্রপাতির এই সমাবেশ যাদের একটিই সঙ্গীত ; এই মোহিনী নারীরা, যাদের আরও সুন্দরী করে তুলেছে সাজসজ্জার বিজ্ঞান ও ভালোবাসার ভান : এই সমস্তকিছুই আমার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, আমার জন্য, আমার জন্য ! আমার জন্য মানব সম্প্রদায় খেটেছে ; শহিদ হয়েছে, ক্রুশকাঠে চেপেছে, চারণভূমিতে কাজ করেছে, আমার অপ্রশম্য আবেগ, জ্ঞান ও সৌন্দর্যের ক্ষুধা মেটাবার জন্য খেটেছে।” গল্প ছোটো করার খাতিরে আমি উপসংহারে লাফ দিই । কেউই আশ্চর্য হবে না স্বপ্ন দেখিয়ের মগজ থেকে এক শেষ ও মহান চিন্তার ঝর্ণা বেরোয় : “আমি ঈশ্বর হয়ে গেছি।”

কিন্তু তার বুক থেকে একটা বুনো আর জ্বলন্ত কান্না এমন জোরে, উৎসারের এমন ক্ষমতায় বেরিয়ে আসে যে, কোনো নেশাগ্রস্ত মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও বিশ্বাস যদি প্রভাবশীল ক্ষমতা রাখতো তাহলে এই কান্না স্বর্গের আশ্রয়ে দেবদূতরা ছত্রখান হয়ে ছড়িয়ে পড়ত : আমি একজন দেবতা।”

কিন্তু বেশ তাড়াতাড়ি গর্বের এই ঝঞ্ঝা শান্ত, নিঃশব্দ, বিশ্রামরত স্বর্গসুখের আবহাওয়ায় পরিবর্তিত হয়, আর অস্তিত্বের সার্বজনীনতা নিজেকে উপস্হিত করে রঙিন আর উজ্বল প্রতিভাময়ী ভোরবেলায় । যদি কোনোক্রমে এই শোচনীয় তিনবার-সুখি আত্মায় এক অস্পষ্ট স্মৃতি  ঢুকে পড়ে — “তাহলে কি আরেক ঈশ্বর হবেন না ?” — বিশ্বাস করো, সে ঈশ্বরের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াবে ; সে ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরোধিতা করবে, এবং বিনা ভয়ে ঈশ্বরের মোকাবিলা করবে ।

কে সেই ফরাসি দার্শনিক যিনি আধুনিক জার্মান তত্বকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন : আমি কি দেবতা যে রাতের ভোজে অখাদ্য খেয়েছে ?” হ্যাশিসের দ্বারা উন্নীত আত্মায় এই বিদ্রূপ কামড় বসাবে না ; সে ঠাণ্ডা মাথায় জবাব দেবে : “হয়তো আমি রাতের ভোজে অখাদ্য খেয়েছি ; কিন্তু আমি একজন দেবতা।”

পঞ্চম অধ্যায়

নৈতিক শিক্ষা

কিন্তু আগামীকাল ; ভয়ানক আগামীকাল ! সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিরুদ্বেগ, ক্লান্ত ; স্নায়ুরা অপ্রসারিত, অশ্রুজলের উত্যক্ত করার প্রবণতা, নিয়মিত কাজে নিজেকে নিয়োগ করার অসম্ভাব্যতা, নিষ্ঠুরভাবে তোমাকে শেখায় যে তুমি একটি নিষিদ্ধ খেলা খেলছিলে । ঘৃণ্য প্রকৃতি, আগের সন্ধ্যার ঔজ্বল্য থেকে বের করে আনা, কোনো উৎসবের মনমরা অবশেষের মতন দেখায় । ইচ্ছাশক্তি, কার্যক্ষমতায় যেটি সবচেয়ে মহার্ঘ, সবার আগে আক্রান্ত হয় । লোকে বলে, এবং সেকথা সত্যি, যে এই মাদক কোনো শারীরিক অসুখ ঘটায় না ; কিংবা অন্তত ভয়ানক কোনো অসুখ ; কিন্তু কেউ কি জোর দিয়ে বলতে পারে যে একজন লোক যে কোনো কাজ করতে অক্ষম এবং কেবল স্বপ্ন দেখার জন্য কর্মক্ষম, সত্যিই সুস্বাস্হ্যে রয়েছে, এমনকি দেহের প্রতিটি অঙ্গ ঠিকঠাক কাজ করলেও ? এখন আমরা মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে ভালো করে জানি যে একজন লোক যে এক চামচ মেঠাই খেয়ে নিজের জন্য স্বর্গের ও জগতের তাবৎ ঐশ্বর্য সংগ্রহ করতে পারে সে কখনও তার হাজার ভাগের এক ভাগও তা পাবার জন্য কাজ করেও পাবে না । তুমি কি এমন এক রাষ্ট্রের কল্পনা করতে পারো যার প্রতিটি নাগরিক চরসখোর ? কেমনতর নাগরিক ! কেমনতর যোদ্ধা ! এমনকি প্রাচ্যদেশেও, যেখানে এর ব্যবহার দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানকার সরকাররা একে নিষিদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবেছে । মানুষের ব্যবহারের জন্য নিষিদ্ধ, বৌদ্ধিক ক্ষয় ও মৃত্যুর শাস্তির আশঙ্কায়, যা মানুষের অস্তিত্বের প্রাথমিক অবস্হাকে বিপর্যস্ত করে, আর যে পরিবেশে সে ঘুরে বেড়ায় এগুলো তার গুণের ভারসাম্যকে নষ্ট করে ফ্যালে ; এক কথায়, নিজের নিয়তিকে ছাপিয়ে যাবার জন্য, নতুন ধরনের এক সর্বনাশকে তার জায়গায় আনার জন্য । মনে করো মেলমথের কথা, ( আরও দেড়শো বছর বাঁচার জন্য মেলমথ নিজের আত্মা শয়তানকে বিক্রি করে দিয়েছিল ) সেই অসাধরণ কাহিনি । তার অতিশয় বেদনাদায়ক যন্ত্রণার কারণ ছিল তার অসাধারণ দক্ষতা, যা সে শয়তানের সঙ্গে আড়ম্বরহীন চুক্তি করে পেয়েছিল এবং তার পরিবেশের ভিন্নতায়, ঈশ্বরসৃষ্ট প্রাণী হিসাবে, বেঁচে থাকতে বাধ্য থাকার চুক্তির ফলে অভিশপ্ত । এবং যাকেই সে অনুরোধ করতো তার কাছ থেকেশয়তানের চুক্তি কিনে নেবার জন্য, সেই একই ভয়ঙ্কর শর্তে, তারা কেউই রাজি হতো না । প্রসঙ্গত, প্রতিটি মানুষ, যে জীবনের অবস্হাকে স্বীকৃতি দিতে চায় না সে নিজের আত্মাকে বিক্রি করে । রূপকটা বুঝতে পারা যায়  কবিদের শয়তানি সৃষ্টি এবং সেই মাদকের কাছে আত্মসমর্পিত জীবন্ত প্রাণীগুলোর উদ্দীপনার পার্থক্যে । মানুষ ঈশ্বর হতে চেয়েছে, এবং তা দ্রুত ? — তবে সে এইখানে, এক অমোঘ নৈতিক আইনের দ্বারা, তার স্বাভাবিক অবস্হার তলায় অধঃপতিত ! সে এমনই এক আত্মা যে নিজেকে টুকরো টুকরো করে বিক্রি করে ।

বালজাক নিঃসন্দেহে ভেবেছিলেন যে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে পরিত্যাগ করার চেয়ে মানুষের আর কোনো বড়ো লজ্জার ব্যাপার হতে পারে না, কোনো বড়ো যন্ত্রণা হতে পারে না । আমি ওনাকে একবার এক বৈঠকখানায় দেখেছিলুম, যেখানে অনেকে হ্যাশিসের বিস্ময়কর প্রভাবের কথা আলোচনা করছিল।  উনি শুনছিলেন এবং মজাদার আগ্রহে ও উৎফুল্ল হয়ে প্রশ্ন করছিলেন । যারা ওনাকে জানতো হয়তো অনুমান করে থাকবে যে বিষয়টা সম্পর্কে উনি আগ্রহী, কিন্তু ‘নিজের উপস্হিতিতেও নিজেকে নিয়ে চিন্তা করার ধারণা’ ওনাকে ভীষণ বিপর্যস্ত করেছিল। কেউ ওনাকে ‘দাওয়ামেস্ক’ সেবন করার জনভ দিয়েছিল । উনি তা নিরীক্ষণ করলেন, শুঁকলেন, এবং বিনা ছুঁয়ে ফেরত দিলেন । ওনার প্রায় শিশুসুলভ কৌতূহল এবং ওনার নিজেকে আত্মসমর্পণ করার ঘেন্না চোখেমুখে অদ্ভুতভাবে ফুটে উঠেছিল । আত্মসন্মানের পপতি তাঁর ভালোবাসা দিনটাকে উৎরে দিয়েছিল । এ ব্যাপারটা কল্পনা করা কঠিন যে যিনি ইচ্ছাশক্তির তত্ব তৈরি করেছিলেন, লুই ল্যামবার্টের পারমার্থিক যমজ, এই দামি মাদকের একটা কণা দিতে রাজি হলেন । মানুষের সেবায় ইথার এবং ক্লোরোফর্ম প্রশংসনীয় কাজ করে থাকলেও, আদর্শবাদী দর্শনের দিক থেকে আমার মনে হয়, সেই একই নৈতিক বদনাম দেয়া হয় প্রতিটি আধুনিক আবিষ্কারকে, যেগুলো মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে ও দেহের যন্ত্রণাকে কম করে । আমি একবার বিশেষ আগ্রহে একজন অফিসারের কাছে ফরাসি সেনাধ্যক্ষ এল-আঘুতের শল্য চিকিৎসায় কূটাভাসের কধা শুনেছিলুম, যে তাঁকে ক্লোরোফর্ম দেয়া সত্বেও তিনি মারা গেলেন । এই সেনাধ্যক্ষ ছিলেন অত্যন্ত সাহসী মানুষ, এমনকি তার থেকেও বেশি: সেই রকম এক আত্মা যাঁর ক্ষেত্রে লোকে স্বাভাবিকভাবে ‘বিক্রমশালী’ শব্দটা ব্যবহার করে । অফিসার আমাকে বলেছিলেন যে, ওনার ক্লোরোফর্মের প্রয়োজন ছিল না, প্রয়োজন ছিল সমগ্র সেনাবাহিনীর দৃষ্টি এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গীত । তা হয়তো তাঁকে বাঁচাতে পারতো ।অফিসারের সঙ্গে শল্যচিকিৎসক একমত হননি, কিন্তু সেনাবাহিনীর যাজক এই ধরণের অনুভূতিতে নিঃসন্দেহে আপ্লুত হতেন ।

ব্যাপারটা নিশ্চয়ই অনাবশ্যক, এই সমস্ত বিবেচনার পর, হ্যাশিসের নৈতিক বৈশিষ্ট্যের ওপর জোর দেয়া জরুরি । তুলনা করা যাক আত্মহত্যার সঙ্গে, মন্হর আত্মহত্যা আর  সদাসর্বদা রক্ত বইয়ে দেওয়া কোনো অস্ত্রের সঙ্গে, সবসময়ে ধারালো, এবং কোনো যুক্তিপূর্ণ মানুষ তাতে আপত্তি করবে না । এবার একে তুলনা করা যাক ডাকিনিবিদ্যা কিংবা ম্যাজিকের সঙ্গে, যা বস্তুর ওপরে গোপন রহস্যের মাধ্যমে সক্রিয় ( যা অসাধুতার চেয়ে নিশ্চিত ফলদানের ক্ষমতাকে হেয় করে না )  এবং এক প্রভূত্বকে জয় করতে চায় যা মানুষের কাছে নিষিদ্ধ অথবা কেবল সেই লোকগুলোকে অনুমতি দেয়া যায় যারা এর যোগ্য, আর কোনো দার্শনিক মন এই তুলনাকে দোষ দেবে না । গির্জা যদি ম্যাজিক আর ডাকিনিবিদ্যাকে নিন্দা করে তা এই জন্য যে এরা ঈশ্বরের অভিলাষে বাগড়া দ্যায় ; এরা সময় বাঁচায় এবং নৈতিকতাকে অনাবশ্যক প্রতিপন্ন করে, এবং গির্জা একনিষ্ঠৈ শুভচিন্তার মাধ্যমে পাওয়া ঐশ্বর্যকে কেবল বৈধ ও সত্য বলে মনে করে । যে জুয়াড়ি জেতার উপায় খুঁজে পেয়েছে তাকে আমরা ঠকাই ; আমরা কেমন করে সেই লোকটার বর্ণনা করব যে মাত্র কিছু পয়সা নিয়ে আনন্দ ও প্রতিভা কিনতে চায় ? উপায়ের আপ্ততা নিজেই অনৈতিকতা সৃষ্টি করে ; ম্যাজিকের অনুমিত আপ্ততা তাকে শয়তানির কালিমালিপ্ত করে ; আমি কি যোগ করব যে হ্যাশিস, একক আনন্দগুলোর মতন, ব্যক্তিকে তার সহযোগিদের কাছে এবং সমাজের কাছে ফালতু করে তোলে, তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় অবিরাম আত্ম-প্রশংসায়, এবং দিনের পর দিন তাকে টেনে নিয়ে যায় এক আলোকময় রসাতলে যেখানে সে নিজের নার্সিসাস মুখাবয়ব দেখে আহ্লাদিত হয় ? কিন্তু তবু তার সন্মান, তার সৎপ্রবৃত্তি, আর তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির দামের বিনিময়ে মানুষ কি হ্যাশিস থেকে পেয়েছে আত্মিক কল্যাণ ; হতে পেরেছে একধরণের চিন্তাযন্ত্র, এক উর্বর সাধিত্র ? এই প্রশ্ন আমি অনেককে করতে শুনেছি, আর আমি উত্তর দিয়েছি  : প্রথমত, যেমন বিস্তারিত আলোচনা করেছি, হ্যাশিস মানুষের কাছে তাকে ছাড়া আর কিছুই মেলে ধরে না । একথা সত্যি যে এই ব্যক্তি ঘণাঙ্কিত হয়, আর যদি তার সীমা পর্যন্ত তাকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হয়, এবং এও সমানভাবে নিশ্চিত যে হইহুল্লোড় সত্তেও স্মৃতিতে ঘটনাগুলো থেকে যায়, এই উপযোগবাদীদের আশায় প্রথম দৃষ্টিতে যা দেখা মেলে তা একেবারে অযৌক্তিক নয় । কিন্তু আমি তাদের লক্ষ করতে অনুরোধ করব যে, যে ভাবনাচিন্তা থেকে তারা দারুন সুফল চাইছে তা তেমন সুন্দর নয় যেমনটা তারা ম্যাজিকের রাংতায় মোড়া সাময়িক রূপান্তরণে দেখতে পাচ্ছে । তা স্বর্গের নয়, পৃথিবীর ব্যাপার, আর স্নায়ুর উত্তেজনা থেকে আহরণ করছে সৌন্দর্য। ফলত এই আশা একটি দুষ্টচক্র । কিছু সময়ের জন্য না-হয় মেনে নেওয়া যাক যে হ্যাশিস সৃষ্টি করে, অন্তত বাড়িয়ে দ্যায় প্রতিভাশক্তি ; তারা ভুলে যায় যে হ্যাশিসের বৈশিষ্ট্যেই রয়েছে ইচ্ছাশক্তিকে হ্রাস করার ক্ষমতা, অর্থাৎ তা এক হাতে দ্যায় এবং আরেক হাতে নেয় ; একথা বলার মানে হলো, কল্পনা গড়ে ওঠে অথচ তা থেকে লাভ করার মতো কর্মশক্তি থাকে না । সব শেষে, মনে রাখা দরকার, একজন লোক হয়তো এই উভয়সঙ্কট এড়াবার মতো যথেষ্ট ধুরন্ধর ও তেজস্বী, কিন্তু আরেকটা বিপদ আছে, মারাত্মক এবং ভয়ঙ্কর, যা প্রতিটি অভ্যাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য । বেশ তাড়াতাড়ি এগুলো অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়ায় । চিন্তা করার জন্য যে লোকটাকে বিষের আশ্রয় নিতে হয় সে দ্রুত বিষ ছাড়া আর চিন্তা করতে পারবে না। সেই ভীতকর লোকটার কথা ভেবে দ্যাখো যার পক্ষাঘাতগ্রস্ত কল্পনা হ্যাশিস কিংবা আফিম ছাড়া আর কাজ করবে না ! দার্শনিক স্হিতিতে মানুষের মন, নক্ষত্রদের যাত্রাপথকে নকল করার জন্য, একটি অর্ধবৃত্তকে অনুসরণ করতে বাধ্য যা বেঁকে ফিরে আসে তার প্রস্হানবিন্দুতে, যখন বৃত্তটি সম্পূর্ণ হবে । শুরুতে আমি এই চমৎকার স্হিতির কথা বলেছি যার মধ্যে মানুষের আত্মা অনেক সময়ে তাকে ছুঁড়ে-ফেলা অবস্হায় আবিষ্কার করে, যেন তা বিশেষ অনুগ্রহ । আমি বলেছি যে অবিরাম নিজের আকাঙ্খাকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াসে এবং নিজেকে অনন্তের দিকে তুলে নিয়ে যাবার চেষ্টায়, সে দেখায় ( প্রতিটি দেশে এবং প্রতিটি সময়ে ) সব রকমের মাদক সম্পর্কে প্রমত্ত ক্ষুধা, এমনকি যেগুলো বিপজ্জনক সেগুলোও, যা তার ব্যক্তিত্বকে উন্নীত করে, মুহূর্তের মধ্যে তার চোখের সামনে বিনিময়ের স্বর্গোদ্যান নিয়ে আসে, তার যাবতীয় আকাঙ্খার উদ্দেশ্য ; এবং সব শেষে তার বেপরোয়া আত্মা, না জেনেই রথ চালিয়ে নিয়ে যায় নরকের দরোজা দিয়ে, এই তথ্যই সাক্ষী হয়ে থাকে তার প্রাথমিক গরিমার । কিন্তু মানুষ তো তেমন ঈশ্বর-ত্যাজ্য নয়, সরাসরি স্বর্গে পৌঁছোবার উপায় থেকে প্রতিভাশূন্য, যে তাকে ম্যাজিক আর ডাকিনিবিদ্যার আশ্রয় নিতে হবে । হুর আলাইনের ( আরব স্বর্গের হুরিপরি) বন্ধুত্ব  এবং নেশার আদর কেনার জন্য নিজের আত্মা বিক্রি করার প্রয়োজন তার নেই । শাশ্বত উত্তরণের জন্য দাম দিয়ে যে স্বর্গোদ্যান পাওয়া যাবে সেটা কী? আমি একজন মানুষের কল্পনা করি ( আমি কি বলব সে একজন ব্রাহ্মণ, একজন কবি, কিংবা একজন খ্রিস্টধর্মী দার্শনিক ?) আধ্যাত্মিকতার অলিমপাসের চূড়ায় বসে আছেন; তাঁর চারিপাশে রাফায়েল কিংবা মাতেঙ্গার মিউজদেবীরা, তার দীর্ঘকালের উপবাস এবং আন্তরিক প্রার্থনার দরুণ সান্ত্বনা দিতে, অভিজাত নৃত্য রচনা করতে, কোমল চাউনি মেলে  ও ঝিকমিকে হাসিতে তাকে দেখতে ; দৈবিক অ্যাপোলো, যাবতীয় জ্ঞানের শিক্ষক ( ফ্রাঙ্কাভিলা, আলবের্ত দুয়েরার, গোল্তজিয়াস, কিংবা অন্য কারোর — তাতে কিই বা আসে-যায় ? প্রতিটি মানুষের জন্য কি একজন অ্যাপোলো নেই, যে মানুষ তার যোগ্য ?), সবচেয়ে সুবেদী তারগুলোকে আদর করছেন তাঁর ধনুক দিয়ে ; তাঁর নীচে, পাহাড়ের পাদদেশে, কাদায় আর কাঁটাঝোপে, মানুষের কলরোল ; হেলট গোষ্ঠী উপভোগের মুখবিকৃতি নকল করে আর চিৎকার করে যার হুল তার বুক থেকে বিষ টেনে বের করে ; এবং কবি, দুঃখে কাতর, নিজেকে বলেন : “এই অভাগা লোকগুলো, যারা উপোস করেনি আর প্রার্থনাও করেনি, যারা খাটুনির মাধ্যমে উত্তরণ প্রত্যাখ্যান করেছে, ডাকিনিবিদ্যার আশ্রয় নিয়ে এক ধাক্কায় উঠে যেতে চেয়েছে তুরীয় জীবনে । তাদের ম্যাজিক তাদের ঠকায়, তাদের মধ্যে জাগায় নকল আনন্দ, নকল আলো ; যখন কিনা আমাদের কবিদের ও দার্শনিকদের ক্ষেত্রে, আমরা আমাদের আত্মাকে অবিরাম খাটাখাটুনি করে এবং মনোনিবেশের মাধ্যমে আবার জন্ম দিয়েছি; ইচ্ছাশক্তির অক্লান্ত প্রয়োগে এবং আকাঙ্খার দ্বিধাহিন গরিমায় আমরা আমাদের জন্য  সৃষ্টি করেছি সত্যের বাগান, যা সৌন্দর্য ; সৌন্দর্য যা সত্য । বিশ্বাস পাহাড় সরাতে পারে এই বাক্যে আত্মবিশ্বাসী, আমরা কেবল সেই অলৌকিকতা অর্জন করেছি যা প্রতিপাদন করার জন্য ঈশ্বর আমাদের অনুজ্ঞাপত্র দিয়েছেন ।”

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Six Haikus of Malay Roychoudhury translated by Arunava Sinha

Spring in Netherlands

Swarms of bees

knock at the door

The girl’s floating corpse~

Leaning out to see

The sky spread across the wind

Taillights just like blood~

Her hands on her hips

Emperor Ashoka weeps

Black and freezing rocks~

Crematorium

Coils of smoke and darting shrimps

The Buddha walks by~

Someone’s dead body

Hanging from the ceiling fan

There’s a male spider ~

Memories of thieves

Tagore’s slippers on the shelf

Much too large in size

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

প্যারিস স্প্লিন [ বিষণ্ণ প্যারিস ] : শার্ল বোদলেয়ার

অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

এক

সেই বিদেশি

“রহস্যময় পুরুষ, কাকে তুমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো ? তোমার বাবা, 

তোমার মা, তোমার বোন না তোমার ভাইকে ?”

“আমার বাবা নেই, মাও নেই, বোন নেই, ভাই নেই।”

“তোমার বন্ধুবান্ধব ?”

“এই যে তুমি একটা শব্দ ব্যবহার করলে তা আমি আজ পর্যন্ত বুঝিনি।”

“তোমার দেশ?”

“আমি জানি না কোন দ্রাঘিমায় তা অবস্হিত ।”

“সৌন্দর্য ?”

“আমি যেচে তাঁকে ভালোবাসবো, তিনি ঈশ্বরী ও অবিনশ্বর।”

“সোনা ?”

আমি তা ঘৃণা করি যেমন ঈশ্বরকে তুমি ঘৃণা করো ।”

“আচ্ছা, তাহলে কীই বা তুমি ভালোবাসো, বিস্ময়কর আগন্তুক ?

“আমি ভালোবাসি মেঘ…যে মেঘ ভেসে যাচ্ছে…ওপরে ওইখানে…ওপরে ওইখানে…

বর্ণনাতীত মেঘমালা !”

দুই

বুড়ির বিষাদ

ছোটোখাটো লোলচামড়া বুড়ি ফুটফুটে বাচ্চাটাকে দেখে আহ্লাদিত হলেন, যাকে নিয়ে সবাই ব্যতিব্যস্ত, যাকে সবাই খুশি করতে চাইছিল ; ওনার মতনই পলকা এই সুন্দর প্রাণী, ছোট্ট বুড়ি, আর — তাঁরই মতন — দাঁত আর চুলহীন ।

উনি বাচ্চাটার কাছে গেলেন, তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি আর হাসিখুশি মুখ দেখাতে চাইলেন ।

কিন্তু বাচ্চাটা জীর্ণ ভালো বুড়ির আদরে ভয় পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিলো, আর সারা বাড়ি নিজের কাঁদুনি দিয়ে ছেয়ে ফেললো ।

তখন ভালো বুড়িটি ফিরে গেলেন নিজের শাশ্বত একাকিত্বে, এককোনে গিয়ে কাঁদতে লাগলেন, নিজেকে শুনিয়ে বললেন :

“আহ, আমাদের মতন অবজ্ঞেয় বুড়িদের জন্য, নিষ্পাপদের আনন্দ দেবার যুগও চলে গেছে ; আর যে শিশুদের আমরা ভালোবাসতে চাই তাদের মনে আতঙ্ক জাগিয়ে তুলি !”

তিন

শিল্পীর পাপস্বীকার

ওহ, হেমন্তের শেষ দিনগুলো কতো কাঁটা ফোঁটায় — এমন ফোটায় যে ব্যথার সীমায় পৌঁছে যায়! 

কেননা, তৃপ্তিকর সংবেদগুলোর মধ্যে এমন কয়েকটা আছে, যাদের অনির্দিষ্টতা প্রাচুর্যকে বাদ দিতে পারে না ; আর অনন্ত ছাড়া অন্য কোনও ক্ষুরধার বিন্দু নেই ।

সমুদ্র ও আকাশের বিশালতার দিকে নিজের চাউনিকে সাঁতরাতে দেয়া যে কি আনন্দময় ! নৈঃশব্দ, একাকীত্ব, ওই আশমানি রঙের অতুলনীয় কৌমার্য ! দিগন্তে কাঁপছে এক ছোটো পর্দা, আর, তার ক্ষুদ্রতা ও নিঃসঙ্গতায়, প্রতিবিধানের অসাধ্য আমার অস্তিত্বকে অনুকরণ করে, ঢেউদের একঘেয়ে সঙ্গীত — এই সবকিছুই আমার মাধ্যমে চিন্তা করে, কিংবা তাদের মাধ্যমে আমি ( কেননা, এই ভাবাবেশের মহনীয়তায়, ওই “আমি” দ্রুত হারিয়ে যায় ) ; ওরা মনে করে, আমি বলতে চাই, কিন্তু তা গানে, ছবি আঁকায়, কোনোরকম তর্ক, ন্যায়সিদ্ধান্ত, ব্যবকলন ছাড়াই ।

কিন্তু এই চিন্তাগুলো, তা আমার মধ্যে থেকে আসুক বা বিভিন্ন বস্তু থেকে উৎসারিত হোক, দ্রুত ঐকান্তিক হয়ে ওঠে । যখন তেজোময়তা মেশে ইন্দ্রিয়সুখের সঙ্গে, তা থেকে জন্মায় এক অসুস্হতা এবং এক উপকারক যন্ত্রণা । আমার অত্যধিক পীড়িত স্নায়ু কেবল কটু আর দুঃখময় কাঁপন জাগিয়ে তোলে । আর এখন আকাশের গভীরতা আমাকে বিক্ষুব্ধ করে, স্হবিরতা আমাকে উত্যক্ত করে । সমুদ্রের উদাসীনতা, দৃশ্যের অপরিবর্তনীয়তা আমাকে বিতৃষ্ণ করে…। ওহ, সারাজীবন কি কাউকে যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে, নাকি সৌন্দর্য থেকে চিরকাল পালিয়ে বেড়াতে হবে ? প্রকৃতি, হে নির্দয় মোহিনী, তুমি সব সময়ে বিজয়ী প্রতিদ্বন্দ্বী, আমাকে একা থাকতে দাও!

আমার আকাঙ্খা আর আমার গর্ববোধকে জাগিয়ে তুলো না ! সৌন্দর্যের পাঠ হলো এক দ্বন্দ্বযুদ্ধ, যা শেষ হয় হেরে যাবার আগে শিল্পীর কান্নামাখা ত্রাসে ।

চার

একজন ভাঁড়

তখন ছিল নববর্ষের বিস্ফোরণ ; কাদা আর তুষারের বিশৃঙ্খলা, হাজার ঘোড়ার গাড়ির চাকায় মাড়ানো, খেলার জিনিশ আর মোমবাতিতে ঝিলমিলে, লোভী কামনা আর বিষাদে একাকার, এক মহান শহরের অনুমোদিত বিকার, সবচেয়ে দৃঢ় নিঃসঙ্গের মনকেও বিরক্ত করার জন্যে পরিকল্পিত ।

এই হইচই আর আওয়াজের মাঝে, চাবুকে হাতে এক গেঁয়ো লোকের ধাতানি খেয়ে, একটা গাধা টগবগিয়ে ভিড়ে ঢুকে গেলো  ।

গাধাটা যখন রাস্তার বাঁক নিতে চলেছে, একজন সাজগোজ করা ভদ্রলোক, হাতে সুন্দর দস্তানা, পালিশ খাওয়া চেহারায় আর চুলে তেল দিয়ে, নিষ্ঠুরভাবে নেকটাই বেঁধে আর নিজের নতুন পোশাকে বন্দী, নম্র প্রাণীটার সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণত হলেন আর , নিজের হ্যাট নামিয়ে বললেন, “আমি আপনার সুস্বাস্হ্য এবং আনন্দ কামনা করি !” তারপর, বন্ধুবান্ধব যারা তাঁর পেছনে আসছিল তাদের দিকে বোকার মতন তাকালেন, যেন আত্মতৃপ্তির জন্য তাদের অনুমোদন চাইছেন ।

গাধাটা এই অসাধারণ ভাঁড়কে দেখতেই পেল না, আর যেদিকে তার কাজ সেই দিকে একান্তভাবে টগবগিয়ে যেতে লাগল ।

যদি আমার কথা ধরা হয়, আমি আচমকাই এই অসাধারণ মূর্খের প্রতি বাঁধভাঙা ক্রোধে আক্রান্ত হলুম, যাকে দেখে  আমার মনে হল সে ফরাসিদেশের আত্মা।

পাঁচ

যুগল ঘর

স্বপ্নের মতন এক ঘর, একটা ঘর যা সত্যই জগৎ-বহির্ভূত, যার স্হির আবহাওয়া ফিকে গোলাপি আর নীল ।

সেখানে আত্মা স্নান করে আলস্যে, সুগন্ধিত হয়ে আছে অনুশোচনা ও কামনায় । — ব্যাপারটা সন্ধ্যাকালের, কিছুটা নীলাভ, গোলাপি ; গ্রহণের সময়কার এক ইন্দ্রিয়ময় স্বপ্ন ।

আসবাবের গড়ন লম্বাটে, শোয়ানো, দুর্বল । মনে হয় আসবাবগুলোও স্বপ্ন দেখছে ; তাদের জীবনে যেন রয়েছে ঘুমের মধ্যে হাঁটাচলার ক্ষমতা, উদ্ভিদ আর খনিজের মতন । পর্দারা মৌনভাষায় কথা বলছে, ফুলের মতন, আকাশের মতন, সূর্যাস্তের মতন । দেয়ালে কোনো শৈল্পিক জঘন্যতা নেই । বিশুদ্ধ স্বপ্নের সঙ্গে তুলনা করলে, অবিশ্লেষিত প্রভাবসহ, একটি নির্দিষ্ট এবং ইতিবাচক শিল্প হল ঈশ্বরনিন্দা । এখানে সবকিছুরই রয়েছে যথেষ্ট স্পষ্টতা, আর সেই সঙ্গে ঐকতানের রুচিকর দুর্বোধ্যতা ।

অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বেছে নেয়া পরিমেয়ভাবে ক্ষুদ্র এক সুগন্ধ, হালকা আর্দ্রতার সঙ্গে মেশানো, এই বাতাবরণের মাঝ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে, যেখানে এক উষ্ণীকৃত ঘরের সংবেদনের মাঝে দোল খাচ্ছে ঘুমন্ত আত্মা । বিছানার সামনে আর জানালায় মসলিন পরম প্রাচুর্যে দুলে ওঠে ;  নিজেকে ছড়িয়ে দেয় তুষারপ্রপাতের মতন । এই বিছানায় শুয়ে আছেন এক প্রতিমা,  স্বপ্নের রানি। কিন্তু কেনই বা তিনি এখানে ? কে তাঁকে এনেছে ? কোন ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা তাঁকে এই ভাবাচ্ছন্ন ও ইন্দ্রিয়সুখী সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছে ?

কীই বা তাতে আসে-যায় : উনি তো রয়েছেন ! আমি ওনাকে চিনতে পারছি ।

হ্যাঁ, এই চোখদুটি  তাদের আগুন দিয়ে সন্ধ্যাকে ছিন্ন করে ; এই তনুকৃত ও ভয়ঙ্কর চোখদুটি, তাদের আতঙ্কজনক অশুভ কামনাকে আমি শনাক্ত করতে পারি । তারা আকর্ষণ করে, তারা বশে আনে, কারোর হঠকারী চাউনি যদি  তার প্রতি মনোযোগ দেয় তাহলে তাকে গিলে খেয়ে ফ্যালে । আমি অনেকসময়ে  নিরীক্ষণ করেছি, কৌতূহল ও বিস্ময়ের দাবিদার এই দুটি কালো নক্ষত্রকে  ।

কোন সেই দয়ালু দানব যার কাছে এরকম রহস্য, স্তব্ধতা, শান্তি আর সুগন্ধে আচ্ছাদিত থাকার জন্য আমি ঋণী ? হে স্বর্গসুখ ! যাকে আমরা সাধারণত বলি জীবন, এমনকি তার আনন্দময় প্রাচুর্যের সময়ে, আমি এখন যে পরম জীবনের কথা জানি, তার সঙ্গে কোনও সাদৃশ্য নেই, আর আমি তা সেকেণ্ডের পর সেকেণ্ড, মিনিটের পর মিনিট উপলব্ধি করি !

না ! আর কোনও সেকেণ্ড নেই, কোনও মিনিট নেই ! সময় উধাও হয়ে গেছে ; এখন অনন্তের শাসন, অনন্তকালীন পরমানন্দ !

কিন্তু এক মৃদু, ত্রাসময় কড়া নাড়ার আওয়াজ দরোজায় শুনলুম এবং, যেমন নারকীয় স্বপ্নে  ঘটে থাকে, আমার মনে হল আমার পেটে কুঠারাঘাত করা হয়েছে । তারপর প্রবেশ করল এক অপচ্ছায়া । সে  বিচারকের প্রতিনিধি, আইনের নামে আমাকে নির্যাতন করতে এসেছে ; একজন নোংরা উপপত্নী “বিপর্যয়ের” কান্না কাঁদতে এসেছে আর নিজের জীবনের তুচ্ছতার সঙ্গে জুড়তে এসেছে আমার দুঃখ ; কিংবা হয়তো কোনো সংবাদপত্র সম্পাদকের স্যাঙাত পাণ্ডুলিপির বাকি অংশ চাইতে এসেছে।

স্বর্গীয় ঘরখানা, প্রতিমা, স্বপ্নের রানি, মহান রেনে শাতোব্রিয়োঁ যেমন বলেছেন ‘সিলফাইড’-এর কথা — যাবতীয় ইন্দ্রজাল মিলিয়ে গেল অপচ্ছায়ার নির্দয় কড়া নাড়ার দরুন ।

আতঙ্কজনক ! এখন আমার মনে পড়েছে ! মনে পড়েছে ! হ্যাঁ ! এই জঘন্য বাসা, অনন্তকালীন একঘেয়েমির এই বাসা, আসলে আমারই । সেই একই বোকা আসবাবপত্র, ধুলোমাখা, বিধ্বস্ত; তাপ পোয়াবার আগুনহীন,  এমনকি স্ফূলিঙ্গও নেই এমন চিমনি, থুতু-গয়েরে নোংরা ; লজ্জাকর জানালা, যার ওপরে ধুলোয় দরানি এঁকেছে বৃষ্টি ; পাণ্ডুলিপি, মুছে-ফেলা বা অসম্পূর্ণ ; ক্যালেণ্ডার, যার ওপরে কাজ নিষ্পন্ন করার ভীতিকর  তারিখগুলোতে পেনসিল দাগানো!

আর সেই ভিনজগতের সুগন্ধ যা আমার অভিজাত সংবেদনকে আচ্ছন্ন করতো, হায়, তার জায়গা নিয়েছে তামাকের সঙ্গে মেশানো, ঈশ্বরই জানেন কোন বমি উদ্রেককারী ছত্রাকের পূতিগন্ধ। এখন, এখানে, তুমি নিঃশ্বাস নেবে কেবল নিঃসঙ্গতার বাসি জীর্ণতা ।

এই জগতে, এতো ঘিঞ্জি তা সত্বেও বিতৃষ্ণায় ঠাশা, কেবল একটি পরিচিত জিনিশই আমার দিকে তাকিয়ে হাসে : আফিমের শিশি , একজন পুরোনো আর ভয়ঙ্কর বন্ধু ; আর সব বন্ধুই যেমন হয়, হায়, আমাকে আদর করতে আর বিশ্বাসঘাতকতা করতে উদারচিত্ত ।

ওহ, হ্যাঁ ! সময় ফিরে এসেছে ; সময় এখন রাজার মতন সাম্রাজ্য চালায় ; আর বীভৎস বুড়োটার সঙ্গে আসে স্মৃতি, আফশোষ, আক্ষেপ, ভয়, উদ্বেগ, দুঃস্বপ্ন, ক্রোধ আর স্নায়বিক পীড়ার দানবেরা । 

আমি তোমাকে আশ্বস্ত করছি যে মিনিটগুলো এখন শক্তিমত্তায়, সমারোহে ঘনঘোর, এবং প্রতিটি, ঘড়ি থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে আসে, বলে : “আমিই জীবন, অসহ্য, অপ্রশম্য জীবন!”

মানবজীবনে একটিমাত্র মিনিট থাকে যার উদ্দেশ্য হল সুসংবাদ ঘোষণা করা, যে সুসংবাদ আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে এক অনির্বচনীয় ভয়কে প্ররোচিত করে ।

হ্যাঁ ! সময় রাজত্ব করে ; সে তার নৃশংস স্বৈরাচারকে দৃঢ়ভাবে জাহির করেছে । আর সে আমাকে ঠেলে নিয়ে যায়, তার দুদিকে ধারালো লাঙল টেনে-টেনে, যেন আমি একটা বলদ : “ চলে এসো, ওহে গাধা ! গায়ের জোর খাটাও, ক্রীতদাস ! বেঁচে থাকো, ঘৃণ্য কোথাকার !”

ছয়

যে যার অসার দানবের পাল্লায়

বিশাল অনুজ্বল  আকাশের নীচে, পথহীন ঘাসহীন কাঁটাগাছহীন বিছুটিহীন এক ধূলিধূসরিত বির্স্তীর্ণ সমতলভূমিতে, কয়েকটা লোককে দেখতে পেলুম যারা ঝুঁকে হাঁটছিল।

তারা প্রত্যেকে নিজের পিঠে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল বিরাট দানব, এক বস্তা আটা কিংবা কয়লার মতন ভারি, কিংবা প্রাচীন রোমের পদাতিক সৈন্যের পিঠের বোঝার মতন । কিন্তু দানবিক জানোয়ারটা নিষ্ক্রিয়  ছিল না ; বরং বিপরীত, সে নিজের পেশির স্হিতিস্হাপকতা আর গায়ের জোরে লোকগুলোকে জড়িয়ে ধরে কষ্ট দিচ্ছিল ; নিজের দুটো বড়ো-বড়ো দাঁড়া দিয়ে বাহকের বুক আঁকড়ে ধরেছিল ; আর তার পৌরাণিক মাথা ছিল বাহকের মাথার ওপরে , সেই আগেকার দিনের ভারি হেলমেটের মতন যা প্রাচীন যোদ্ধারা পরে মনে করত যে সেটা শত্রুদের মনে ভয় জাগিয়ে তুলবে ।

তাদের মধ্যে থেকে একজন লোককে আমি জিগ্যেস করলুম, এই রকম অবস্হায় তারা কোথায় যাচ্ছে । সে বলল যে সে কিছুই জানে না, সেও জানে না অন্যেরাও জানে না ; কিন্তু তারা কোথাও যাচ্ছে, কেননা তারা হাঁটবার অপ্রতিরোধ্য প্রয়োজন-তাড়িত ।

চোখে পড়ার মতন কৌতুহলজনক : এই পর্যটকদের কাউকে দেখেই মনে হচ্ছিল না যে এক ভয়ঙ্কর জানোয়ার তার গলা জড়িয়ে রয়েছে আর পিঠের ওপরে ঝুলে আছে বলে তার অসুবিধা হচ্ছে ; যেন প্রত্যেকে মনে করছে সেটা তার দেহের অংশ ।

এই সমস্ত পরিশ্রান্ত, গম্ভীর মুখগুলো কোনও বিষাদ ব্যক্ত করছে না ; আকাশের বিষণ্ণ গম্বুজের তলায়, আকশের মতোই নিরানন্দ ধূলিধূসর মাটিতে পা পুঁতে, তারা পরাজিত মুখে কুচকাওয়াজ করে এগিয়ে গেল সেই সব লোকের মতন যারা চিরকালীন আশায় দণ্ডপ্রাপ্ত ।

পুরো দলটা আমার পাশ দিয়ে চলে গেল, তাড়াতাড়ি মিলিয়ে গেল আবছা দিগন্তে, সেই দিকে যেখানে গ্রহের গোলাকার পাটাতন মানুষের কৌতূহলময় দৃষ্টির বাইরে হারিয়ে যায়।

এবং কয়েক মিনিটের জন্য আমি জেদের সঙ্গে  রহস্যটা বোঝার চেষ্টা করলুম ; কিন্তু তখনই এক অপ্রতিরোধ্য উদাসীনতা আমার ওপর ভেঙে পড়ল, আর ওই লোকগুলো যে অলীক দানবের ভারি ওজনে নুয়ে পড়েছিল তার চেয়েও ভারি বোঝার ভার আমার ওপর চেপে বসল।

সাত

মূর্খ এবং প্রেমের অধিষ্ঠাত্রী দেবী

কি সুন্দর দিনটা ! সূর্যের জ্বলন্ত চোখের তলায় বিশাল বাগানটা বিবর্ণ হয়ে উঠল, যেমনটা যৌবনে ঘটে প্রেমের প্রভূত্ববিস্তারে ।

বস্তুজগতের সর্বব্যাপী আহ্লাদ কোনও শব্দের দ্বারা অভিব্যক্ত হচ্ছিল না ; মনে হচ্ছিল জলরাশিও  নিজেরা ঘুমিয়ে পড়েছে । মানুষের উৎসবাদির থেকে একেবারে আলাদা, এখানে মহোৎসব ছিল নৈঃশব্দের ।

যেন ক্রমশ ছড়িয়ে পড়া আলো, বস্তুদের আরও বেশি ঝিলমিলে করে তুলছিল ; যেন উত্তেজিত ফুলগুলো, আকাশের নীলাভের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, স্বকীয় রঙের তেজপূঞ্জ দিয়ে নিজের আকাঙ্খায় পুড়ছিল, আর যেন উত্তাপ  সুগন্ধকে করে তুলছিল দৃষ্টিগোচর, বাষ্পের মতন নক্ষত্রদের দিকে উড়ে যাবার কারণ হয়ে উঠছিল ।

যাইহোক, এই সর্বজনীন আমোদপ্রমোদের মাঝে, আমার চোখে পড়ল এক দুর্দশাগ্রস্ত প্রাণী।

প্রেমের অতিকায় অধিষ্ঠাত্রীদেবীর  পায়ের কাছে,  রাজাকে আনন্দ দেবার কাজে আত্মনিয়োজিত ভাঁড়েদের মধ্যে সেই সব কৃত্রিম মুর্খদের একজন, যখন কিনা আত্মগ্লানি কিংবা বিষাদ তাদের মুক্ত করতে পারত, রঙচঙে, হাস্যকর পোশাক পরার ফাঁদে পড়ে, মাথায়  শিঙ আর ঘণ্টা, বেদিতে হেলান দিয়ে অশ্রুভরা চোখ মেলে ধরল অবিনশ্বর ঈশ্বরীর দিকে।

আর তার চোখ বলল : “আমি মানবসমাজে ক্ষুদ্রতম এবং অত্যন্ত একা, ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব থেকে বঞ্চিত, আর তাই ত্রুটিপূর্ণ পশুদের চেয়েও নিকৃষ্ট। কিন্তু তবু আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছিল, আমিও, যাতে অবিনশ্বর সৌন্দর্যকে উপলব্ধি ও অনুভব করতে পারি ! আহ, ঈশ্বরী ! আমার দুঃখ ও উন্মাদনার প্রতি দয়া করো !”

কিন্তু অপ্রশম্য অধিষ্ঠাত্রীদেবী শ্বেতপাথরের চোখ মেলে কোনো কিছুর দিকে তাকিয়ে রইলেন, আমি জানি না কিসের দিকে, দূরে । 

আট

কুকুর আর শিশি

“আমার চমৎকার কুকুর, আমার ভালো কুকুর, আমার ছোট্ট কুকুর, এখানে এসো আর গন্ধ শোঁকো অত্যুৎকৃষ্ট সৌরভের, শহরের শ্রেষ্ঠ সৌরভ প্রস্তুতকারকের কাছে কেনা।”

 কুকুরটা ল্যাজ নাড়ালো, যে ইঙ্গিত, আমি মনে করি, নগণ্য প্রাণীদের মধ্যে থাকে, যারা জোরে বা মৃদু হাসি পাবার যোগ্য, এগিয়ে এলো, কৌতূহলের সঙ্গে ভিজে নাক খোলা শিশিতে ঠেকালো — আর তক্ষুনি, ভয়ে গুটিয়ে গিয়ে, আমাকে উদ্দেশ্য করে ঘেউঘেউ করল, যেন ভর্ৎসনা করছে।

“আহ, তুই বোকা কুকুর, তোকে যদি আমি এক প্যাকেট গু দিতুম, তুই আনন্দে তার গন্ধ শুঁকতিস আর হয়তো খেয়েও নিতিস । এই প্রসঙ্গে আমি তোকে শ্রদ্ধা করি, আমার যন্ত্রণাময় জীবনের অযোগ্য সহচর, জনসাধারণের মতনই তুই, যাদের চটিয়ে দেবে এমন  মিহি সৌরভ কখনও উপহার দেয়া যায় না, তার বদলে তাদের দাও গোবর, ভালোভাবে বাছাই করে।”

নয়

জানালায় কাচ বসাবার খারাপ কর্মী

এমন অনেক বিশেষ চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব আছে, কাজের একেবারে অযোগ্য, যারা তা সত্বেও অনেকসময়ে, কোনো রহস্যময়, অজানা প্রেরণার বশীভূত হয়ে, এমন দ্রুতির সঙ্গে কাজে লেগে পড়ে যে  তারা নিজেরাই বিশ্বাস করবে না অমন ক্ষমতার তারা যোগ্য। 

এই ধরনের লোক যে, দারোয়ান তাকে কোনো হয়রানির খবর দেবে, ভেতরে ঢোকার সাহস যোগাতে না পেরে ঘণ্টাখানেক যাবত নিজের দরোজার বাইরে ভীতুর মতন উঁকিঝুঁকি মারে;

সেই ধরণের লোক যে একটা চিঠিকে দুই সপ্তাহ যাবত খোলে না, কিংবা কোনো নির্ণয় নিতে ছয় মাস নেয় যখন কিনা কাজটা পুরো করতে এক বছর লাগবে — তারপর সে নিজেকে আচমকা আবিষ্কার করে যে কোনো বিবেচনাহীন কাজ তড়িঘড়ি করতে চলেছে, ধনুক থেকে বেরিয়ে যাওয়া তীরের মতন । নীতিবাদী এবং চিকিৎসক, যাঁরা সবজান্তার ভান করেন, এই আচমকা উন্মাদ কর্মশক্তির উৎসের ব্যাখ্যা দিতে পারেন না, যা জেগে ওঠে অলস, সংবেদনময় চরিত্রে, আর কেমন করে, অত্যন্ত সরল ও জরুরি কাজ করার অযোগ্যতা সত্বেও, তারা কোনও মুহূর্তে অসম্ভব এমনকি বিপজ্জনক কাজ করার ঝুঁকি নিয়ে ফ্যালে ।

আমার বন্ধুদের একজন,  অতিনিরীহ স্বপ্নদ্রষ্টা, একবার জঙ্গলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল যাতে ও দেখতে পায়, ও বলেছিল, যে লোকজন যেমন বলে থাকে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, সে কথা সত্যি কিনা তা পরখ করতে চায় । পরপর দশবার,  তা ঘটেনি ; কিন্তু এগারোবারের সময়ে তা ভালোভাবে ঘটেছিল ।

আরেকজন বারুদের বাক্সের পাশে বসে সিগার জ্বালাতো, কেবল দেখার জন্য, যাতে ও জানতে পারে, অদৃষ্টকে লোভ দেখাবার জন্য, নিজের কাছে প্রমাণ করার জন্য, যে একজন জুয়াড়ির উদ্দীপনা তো ওর আছে, যা থেকে ও উদ্বেগের আনন্দ নিতে পারে, কিংবা অকারণেই, খেয়ালখুশিতে, অন্য কোনো কাজ হাতে নেই বলে ।

এই ধরণের কর্মক্ষমতা একঘেয়েমি আর দিবাস্বপ্ন থেকে উৎসারিত হয় ; আর যাদের জীবনে তা অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা দেয় তারা সাধারণত, যেমন আগেই বলেছি, সবচেয়ে শ্রমবিমুখ আর অলীক-কল্পনা করার প্রাণী । আরেকজন, অন্যেরা তার দিকে তাকালে চোখ নামিয়ে নেয় এমন ভীরু, মনের সমস্ত জোর খাটিয়ে কফিহাউসে ঢোকে কিংবা নাট্যমঞ্চকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়, যেখানে ওর মনে হয় যে টকিট বিক্রেতারা গ্রিক পুরাণের মিনোস, এজিনার রাজা ইকস, আর মৃতদের বিচারক রাদামানথুসের মতন ডাঁটে বসে থাকে,  হঠাৎ ঝাঁপিয়ে রাস্তায় ওর পাশ দিয়ে যেতে থাকা একজন বৃদ্ধের গলা আঁকড়ে ধরবে, আর অবাক পথচারীদের সামনে অতিউৎসাহে তাকে আলিঙ্গন করবে । কেন ? কারণ…কেননা সেই বিশেষ চেহারা তার কাছে দুর্নিবার আকর্ষক মনে হয়েছিল বলে ? হয়তো ; কিন্তু এ কথা অনুমান করা বেশি ন্যায়সঙ্গত যে সে নিজেই তার কারণ জানত না ।

আমি এক বারের বেশি এই ধরণের সঙ্কট এবং উত্তেজনার শিকার হয়েছি, যা আমাদের বিশ্বাস করায় যে আমাদের মধ্যে অশুভ দানবেরা চুপিচুপি ঢুকে পড়ে, আমাদের তেমন কাজকর্ম করতে বাধ্য করে, যা আমাদের অজানা, তাদের বিদকুটে ইচ্ছেগুলোকে পুরণ করার জন্য ।

একদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠলুম, খারাপ মেজাজে, হতোদ্যম, আমার আলস্যে বিরক্ত, আর তাড়িত, আমার মনে হল, কোনও গুরুত্বপূর্ণ কিছু করি, কোনও সুন্দর কাজ ; আর, হায়, জানালা খুললুম !

( অনুরোধ করছি, আপনি লক্ষ করুন, লোকজনের সঙ্গে মজা করার উৎসাহ ভাবনাচিন্তার কিংবা সচেতন পরিকল্পনা নয় বরং আকস্মিক প্রেরণা, আর তার সঙ্গে লাগোয়া, উৎসাহবাহিত আকুলতা, যে ঠাট্টা-ইয়ার্কিকে চিকিৎসকরা বলেন বায়ুরোগ আর যাঁরা চিকিৎসকদের তুলনায় আরেকটু গভীর ভাবে চিন্তা করেন তাঁরা বলেন শয়তানি, যা আমাদের অনুপ্রাণিত করে, প্রতিরোধহীন,  অসংখ্য জঘন্য কাজ করতে ।) জানলা খুলে রাস্তায় প্রথম যে লোকটাকে দেখলুম সে ছিল একজন কাচের শার্শি বদলকারী, যার বেসুরো চিল চিৎকার প্যারিসের ঘন, দুর্গন্ধিত বাতাস ভেদ করে উঠে এলো আমার কাছে ।  বলা একেবারে অসম্ভব যে ওই বেচারা লোকটাকে দেখে আমার মন ঘৃণায় ভরে গেল, যা ছিল আকস্মিক আর সেই সঙ্গে হুকুমকারীর মতন । “ওহে ! ওহে !” আমি ওকে ওপরে আসতে বললুম । সেই ফাঁকে ভাবলুম, বেশ মজা করা যাবে, আমার ঘরটা সাত তলায় আর সিঁড়িটা বেশ অপ্রশস্ত হওয়ায়, ওপরে উঠে আসতে লোকটার বেশ খাটুনি হবে, আর ওঠার পথে ওর ঠুনকো জিনিশপত্র নানা জায়গায় ধাক্কা খাবে ।

শেষ পর্যন্ত লোকটা এলো : আমি খুঁটিয়ে ওর শার্শিগুলো দেখলুম, আর ওকে বললুম, “কী ? তোমার কাছে রঙিন কাচ নেই ? গোলাপি কাচ নেই, লাল নেই, নীল নেই, ঐন্দ্রজালিক শার্শি নেই, স্বর্গের শার্শি নেই ? বেহায়া মূর্খ কোথাকার ! তুমি গরিবদের পাড়ায়-পাড়ায় ফিরি করে বেড়াচ্ছ অথচ জীবনকে সুন্দর করে তোলে এমন শার্শি নেই !”  আমি ওকে  সিঁড়ির দিকে ঠেলে দিলুম, যেখানে ও থমকে দাঁড়িয়ে ঘোঁতঘোঁত করল ।

আমি বারান্দায় ফিরে গিয়ে ফুলের একটা ছোট গামলা তুলে নিলুম, আর লোকটাকে যখন নীচে সিঁড়ির বাইরে বেরোতে দেখলুম, আমি আমার যুদ্ধাস্ত্র সোজা নীচে ফেলে দিলুম ওর পিঠের বস্তার ওপর ; ধাক্কায় ও পেছনে হেলে পড়ে গেল, আর তার ফলে ভেঙে ফেলল, নিজের পিঠের চাপে, ওর সমস্ত মর্মন্তুদ ভ্রাম্যমান ঐশ্বর্য, স্ফটিকের তৈরি প্রাসাদে বিদ্যুৎ পড়ার মতন জাঁকালো আওয়াজ করে ।

আর নিজের উন্মাদনায় মাতাল, আমি লোকটার উদ্দেশে হেঁড়ে গলায় চেঁচিয়ে উঠলুম, “জীবনকে সুন্দর করে তোলো ! জীবনকে সুন্দর করে তোলো !”

এই ধরণের বাজে ঠাট্টা বিপদহীন নয়, আর প্রায়ই তার জন্য বড়ো খেসারত দিতে হয় । কিন্তু যে মানুষ একটা ক্ষণের মধ্যে আনন্দের অনন্তকাল আবিষ্কার করেছে, তার কাছে অভিশপ্ত অবিনশ্বরতা কি কোনো ব্যাপার হতে পারে ?

দশ

দুপর একটার সময়ে

শেষ পর্যন্ত, একা ! যা শোনা যাচ্ছে তা কেবল কয়েকটা পুরোনো, ক্লান্ত ঘোড়ার গাড়ির চাকার আওয়াজ । কয়েক ঘণ্টার জন্য, আমাদের থাকবে, আরাম না হলেও, নিস্তব্ধতা । শেষ পর্যন্ত ! আমাকে এখন ছায়ায় স্নান করার ঢিলেমি দেয়া হয়েছে ! কিন্তু প্রথমে, ঘড়িতে দুই বার চাবি দিতে হবে : আমার মনে হয় এই বাড়তি চাবি ঘোরানো আমার একাকীত্বকে বল দেবে আর জগত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পাঁচিলকে পোক্ত করবে ।

ভয়ঙ্কর জীবন ! ভয়ঙ্কর শহর ! সারা দিনের ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যাক : কয়েকজন সাহিত্যিকের সঙ্গে দেখা হল, তাদের একজন আমাকে জিগ্যেস করলে যে স্হলপথে কি রাশিয়ায় যাওয়া যায় ( স্বাভাবিক যে ও রাশিয়াকে একটা দ্বীপ বলে মনে করেছে ) ; এক পত্রিকা সম্পাদকের সঙ্গে অনেকক্ষণ তর্ক হল, যিনি প্রতিটি আপত্তির একটাই জবাব দিচ্ছিলেন, “এই যে, আমরা শোভনতার পক্ষে,” যার মানে দাঁড়ায় যে অন্য সব পত্রিকা চালায় বজ্জাতের দল ; প্রায় কুড়িজন লোককে শুভেচ্ছার অভিবাদন করলুম, যাদের পনেরোজনকে আমি একেবারে চিনি না ; ততোজনের সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করলুম, আর গ্লোভস কেনার পূর্বাহ্ণিক সতর্কতা না নিয়ে ; বৃষ্টির ঝর্ণা বাঁচিয়ে সময় কাটাবার জন্য, একজন ফালতু নর্তকীর কাছে গেলুম, যে আমার কাছে অনুনয় করল যে “ভিস-নিস” অভিনয় করার জন্য তার পোশাকটার নকশা যেন আমি তৈরি করে দিই ; একজন নাটক-পরিচালকের কাছে হাজিরা দিলুম যে বলল, আমাকে বাতিল করে, “তুমি অমুকের সঙ্গে পরিচয় করলে ভালো করবে ; ও সবচেয়ে ভোঁদা, বোকা, আর লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত, ফলে তার কাছে তুমি হয়তো কিঞ্চিদধিক গুরুত্ব পেতে পারো। ওর সঙ্গে কথা বলে দ্যাখো, আর তারপর দেখা যাবে”; বেশ কয়েকটা নীচ কাজ যা আগে করিনি সে সম্পর্কে গর্ববোধ ( কেন ? ) করলুম, আর ভীতুর মতন আমার অনেক দুষ্কর্মকে অস্বীকার করলুম যেগুলো বেশ আনন্দের সঙ্গেই আমি করেছিলুম — দম্ভোক্তি করার আহ্লাদ, মানবিক শোভনতার বিরুদ্ধে অপরাধ ; এক বন্ধুকে অনায়াস সাহায্য করার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান, আর একজন পাক্কা বোকার সুপারিশ করে লিখলুম চিঠি — উফ ! ফিরিস্তি শেষ হল ?

সবকিছু সম্পর্কে অসন্তুষ্ট, নিজের সম্পর্কে অসন্তুষ্ট, আমি সত্যিই প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই, রাতের নৈঃশব্দ ও একাকীত্বে  এক চিলতে গর্ববোধ । যাদের অন্তরাত্মাকে  ভালোবেসেছি, যাদের অন্তরাত্মার গান গেয়েছি, আমাকে শক্তি দেয়, সমর্থন করে, জগতসংসারের মিথ্যা ও ভ্রষ্টাচারের বাষ্প থেকে আমাকে দূরে রাখে, আর তুমি, আমার দেবতাত্মা ঈশ্বর ! কয়েকটা সুন্দর পংক্তি সৃষ্টি করার কৃপা আমাকে দাও যাতে নিজের কাছে প্রমাণ করতে পারি যে মানুষের মাঝে আমি সবচেয়ে হীন নই,  আমি যাদের অবজ্ঞা করি তাদের চেয়ে নিকৃষ্ট নই !

এগারো

অসভ্য নারী আর ছোট্টো রক্ষিতা

সত্যি, হে প্রিয়া, তুমি আমাকে ক্লান্ত করে দিচ্ছ ; তোমার অভিযোগগুলো দয়ামায়াহীন, বেখাপ্পা । তোমার দীর্ঘশ্বাস শুনলে, যে কেউ ভাববে ষাট বছরের বুড়ি জঞ্জাল কুড়ানির চেয়ে কিংবা সেই বুড়ি ভিখারিনীরা যারা রেস্তরাঁর দরোজার বাইরে রুটির টুকরো কুড়োয়, তাদের চেয়ে তুমি বেশি দুঃখযন্ত্রণায় ভুগছ ।

“যদি তোমার দীর্ঘশ্বাস অন্তত অনুশোচনা প্রকাশ করত, তা তোমাকে সন্মান দিত ; কিন্তু তা কেবল ফাঁস করে দেয় যে তুমি ভালোভাবে জীবনযাপনে  পরিতৃপ্ত, আর তুমি অতিরিক্ত বিশ্রাম করে হাঁপিয়ে পড়েছ । আর তারপর, তোমার বকবকানির স্রোত থামে না : ‘আমাকে বেশি করে ভালোবাসো ! আমি তা ভীষণভাবে চাই ! আমাকে এইভাবে সান্ত্বনা দাও, সেইভাবে আদর করো।’ দ্যাখো, আমি চেষ্টা করছি তোমার সুস্বাস্হ ফিরে আসুক ; আর হতে পারে যে আমরা তার উপায় বের করে ফেলব,  কাছাকাছি কোনো মেলায় গিয়ে দুটাকা খরচ করে। 

“দয়া করে, বিবেচনা করো, যে লোহার শক্তপোক্ত খাঁচার ভেতরে বসে, পতিতের মতন খ্যাঁকখ্যাঁক করে, নির্বাসনে পাগল ওরাঙওটাঙের মতন  খাঁচার গরাদ নাড়িয়ে, বাঘের পাক খাওয়ার নিখুঁত অনুকরণ করে, আর এখন শ্বেতভাল্লুকের মতন মূর্খ জবুথবু হাঁটাচলা করে, মনে হয় লোমশ দানবীর চেঁচামেচি আনেকটা তোমারই মতন  ।

“এই দানবী সেইসব জানোয়ারের অন্যতম, যাকে কেউ সাধারণভাবে ‘আমার দেবকন্যা’ বলে ডাকে! — মানে, একজন নারী । তার সঙ্গে যে আরেকটা দানব, যার হাতে ছড়ি রয়েছে, গলার জোর খাটিয়ে চেঁচাচ্ছে,  একজন স্বামী । নিজের আইনসঙ্গত স্ত্রীকে জানোয়ারের মতন শেকল বেঁধে রেখেছে, আর মেলার দিনগুলোয় শহরতলিতে তাকে প্রদর্শন করে বেড়ায় — স্বাভাবিকভাবে,  অফিসারদের অনুমতি নিয়ে ।

“সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ্য করো ! দ্যাখো কেমন গোগ্রাসে ( হয়তো লোকদেখানো নয় ! ) রক্ষকের ছুঁড়ে দেয়া জ্যান্ত খরগোশগুলোকে আর গ্যাঁকগ্যাঁকে  মুর্গিগুলোকে মেয়েটা ছিঁড়ছে । ‘রোসো’, লোকটা ওকে বলে, ‘তোমাকে সব খাবার  এক বারে খেয়ে ফেলতে হবে না,’ আর এই উপদেশ দিয়ে লোকটা সতর্ক হয়ে মেয়েটার কাছ থেকে তার শিকার কেড়ে নেয়, ভয়ঙ্কর জানোয়ারটার দাঁত থেকে কিছু নাড়িভূঁড়ির টুকরো ঝুলতে থাকে — মানে, আমি ওই নারীর কথা বলছি।

“দ্যাখো ! মেয়েটাকে শান্ত করার জন্য ছড়ির এক সুন্দর খোঁচা ! — কেননা মেয়েটা বিস্ফারিত চোখে চেয়ে আছে, কেড়ে নেয়া খাবারের জন্য, লালসায় ক্ষেপে গিয়ে । হায় ঈশ্বর ! ছড়িটা মঞ্চে মজা দেখাবার জন্যে নয় ;  মেয়েটার মাংসে যে সপাং আওয়াজ হল তা শুনলে তো, জটপড়া নকল চুল সত্বেও ? আর মেয়েটার চোখ যেন ওর মুণ্ডু থেকে বেরিয়ে আসছে, ও এবার স্বাভাবিকভাবে চেঁচাচ্ছে । রাগের চোটে, মনে হয় ওর সারা শরীর কাঁপছে, লোহাকে পিটলে যেমন হয় ।

“অ্যাডাম আর ইভের উত্তরসূরীদের এরকমই দাম্পত্যজীবন, তোমার আয়ত্বে এই সমস্ত কাজ, হায় ভগবান ! এই নারী সত্যিই যৎপরোনাস্তি দুঃখযন্ত্রণায় রয়েছে, যদিও, হয়তো, খ্যাতির সুড়সুড়ির আনন্দ ওর অজানা নয় । এর চেয়েও খারাপ দূরপনেয় যন্ত্রণা আছে, এবং তা ক্ষতিপূরণহীন । কিন্তু যে জগতে ওকে ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে, ওর মনে হয়নি যে একজন নারীর এর চেয়ে আলাদা অদৃষ্ট হতে পারে ।

“আর এবার, নিজেদের কথায় ফেরা যাক, আমার দামি প্রাণীটির দিকে ! এই জগতের লোকজন যে নরকে থাকে, তোমার বিশেষ সুন্দর নরক সম্পর্কে আমার কাছে কী আশা করো, তুমি, যে  কখনও   নিজের খসখসে ত্বকের তুলনায় অন্য কোনো জিনিশে হেলান দাওনি, আর যে কেবল অনুগত চাকরের রাঁধা মাংস খাও প্রতিটি গ্রাসে ?

“আর কেমনভাবেই বা আমি এই ছোট দীর্ঘশ্বাসগুলোকে মেনে নেব যা তোমার সুগন্ধিত স্তনকে ফুলিয়ে তোলে, আমার পোক্ত ছোট্ট ছিনাল ? আর বই পড়ে জড়ো করা এই সমস্ত কৃত্রিম আচরণ, আর এই ক্লান্তিহীন বিষাদ, দর্শকের মনে দয়ার বদলে অন্য একরকমের ভাবপ্রবণতা জাগাবার চেষ্টা ? সত্যিই, আমি অনেকসময়ে ভাবি তোমাকে শিখিয়ে দিই কাকে প্রকৃত দুঃখযন্ত্রণা বলে ।

“ আমার তুলতুলে সুন্দরী, তোমার পা কাদায় আর তোমার চোখ গাগনিকভাবে আকাশের দিকে, যেন তোমাকে একজন মহারাজা এনে উপহার দেয়া হবে, যে কেউ তোমাকে মনে করবে একটা কচি ব্যাঙ, সেই আশা পূর্ণ করার প্রয়াস করছ । যদি তুমি বর্তমান রাজাকে অবজ্ঞা করো ( যা বর্তমানে আমি, তা তুমি ভালো করেই জানো ), পরের বার যে আসবে তার সম্পর্কে সাবধান হও, সে তোমাকে চিবোবে, গিলে ফেলবে, আর নিজের ইচ্ছেমতো কোতল করবে !

“হতে পারে আমি একজন কবি, কিন্তু তুমি যেমন ভাবছ আমাকে তেমন ঠকাতে পারবে না, আর যদি তুমি তোমার মূল্যবান কাঁদুনি গেয়ে আমাকে প্রায়ই ক্লান্ত করো, আমি তোমার সঙ্গে অসভ্য মেয়েমানুষের সঙ্গে যেমন করা উচিত তেমন ব্যবহার করব, কিংবা খালি বোতলের মতন জানলা গলিয়ে বাইরে ফেলে দেবো ।”

বারো

ভিড়

টবে স্নান করার মতন করে জনতার ভেতরে  সবাই নিজেকে চোবাতে পারে না ; ভিড়ের মজা নেয়া হলো  শিল্প ; আর কেবল সেই লোকগুলো মানবজাতির শৌর্যকে উৎসবে পরিণত করতে পারে যাদের, তাদের শৈশবের দোলনায়, একজন পরী এসে  ছদ্মবেশে আর মুখোশ পরে এসে, বাড়ির প্রতি ঘৃণার, আর ভ্রমণের নেশার শ্বাস ফেলেছিল ।

জনতা, একাকীত্ব : এই অভিধাগুলোর মর্মার্থ সক্রিয় ও বহুপ্রসূ কবির কাছে একই এবং সমভাবে বিনিমেয় । যে লোক জানে না যে তার একাকীত্বকে কেমন করে জনতা দিয়ে ভরে তুলতে হয়, সে জানতে পারবে না ব্যস্ত ভিড়ে কেমন করে একা থাকা যায় । এই অতুলনীয় সুবিধা উপভোগ করেন একজন কবি, তিনি হয়ে উঠতে পারবেন, যেভাবে তিনি চান, হয় নিজে স্বয়ং কিংবা আরেকজন । যে ভবঘুরে আত্মারা দেহের খোঁজে বেরিয়েছে, তাদের মতন, তিনি প্রবেশ করেন, যখনই তিনি চান, সকলের চরিত্রে । শুধুমাত্র তাঁর কাছে, সবকিছুই ফাঁকা,  তা এইজন্যে যে তাঁর দৃষ্টিতে সেখানে যাওয়ার পরিশ্রম করার কোনো মানে হয় না যেখানে যাওয়ার প্রবেশ নিষিদ্ধ ।

একা, চিন্তামগ্ন পথচারী এই সর্বজনীন অংশীদারিত্বে খুঁজে পান একক মাদকতা । যে মানুষ ভিড়কে বিয়ে করেন, তিনি অতিব্যাকুল মহানন্দ উপভোগ করেন, যা থেকে অহংকারীরা বঞ্চিত, যারা সিন্দুকের মতন তালা দেয়া, আর অলসদের ভাগ্যেও তা জোটে না, যারা ঝিনুকের মতন নিজেতেই আবদ্ধ । তিনি তাঁর কাছে ঘটণাচক্রে উপস্হাপিত যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে, সমস্ত রকমের আনন্দ আর সমস্ত দুঃখযন্ত্রণাকে নিজের করে তোলেন ।

লোকেরা যাকে প্রেম বলে মনে করে তা এতো ক্ষুদ্র, এতো সীমাবদ্ধ, এতো দুর্বল, সেই অনির্বচনীয় মহোল্লাসের তুলনায়, আত্মার পবিত্র বেশ্যাবৃত্তি যা সম্পূর্ণ নিজেকে বিলিয়ে দেয়, তার যাবতীয় কবিতা ও পরার্থবাদিতা, অভাবনীয়দের কাছে, অচেনাদের কাছে, যেমন যেমন তারা দেখা দেয় তাদের কাছে বিলিয়ে দেয় ।

যারা এই জগতের সৌভাগ্যবান তাদের শিক্ষিত করে তোলা অনেক সময়ে ভালো, যদি তাতে তাদের মূর্খ গর্বকে ক্ষণিকের জন্য দমিয়ে দেয়া যায়, অর্থাৎ তারা যা জানে তার চেয়ে আরেক উচ্চতর আনন্দ আছে, বিশাল ও অধিকতর সংস্কৃতিসম্পন্ন ।  বসতের প্রতিষ্ঠাতারা, জনগণের চালকরা, জগতের সীমায় নির্বাসিত মিশনারি যাযকরা, সন্দেহ নেই যে তাঁরা এই রহস্যময় মাদকতা সম্পর্কে যৎসামান্য জানেন ; আর তাঁদের প্রতিভা থেকে তাঁদের হৃদয়ে  যে বিশাল পরিবারের জন্ম হয়েছে,  তাঁরা অনেক সময়ে সেই লোকগুলোকে নিয়ে হাসাহাসি করবেন যারা তাদের কষ্টপূর্ণ ভাগ্য আর পবিত্র জীবন নিয়ে হাহুতাশ করে ।

তেরো

বিধবারা

অভিজাত ভভেনার্গুস বলেছেন যে জনগণের বাগানে এমন সমস্ত হাঁটাপথ আছে যার ওপর  নিরাশ উচ্চাকাঙ্খী, অভাগা আবিষ্কারক, ব্যর্থ সাফল্যের লোক, ভাঙা হৃদয়,  ভুত চরে বেড়ায়, সেই সব বন্ধ আত্মার দল যাদের মধ্যে ঝড়ের শেষ দীর্ঘশ্বাস এখনও গুরুগুরু আওয়াজ তোলে, আর যারা হাসিখুশি ও অলস লোকেদের দুর্বিনীত চাউনি দেখে নিজেদের গুটিয়ে নেয় । এই ধরণের ছায়াময় আশ্রয়গুলো হলো জীবনে মার খাওয়া  সেই সমস্ত মানুষের মিলনস্হল। তাছাড়া, কবি ও দার্শনিকরা নিজেদের প্রিয় অনুমানগুলো এই ধরণের জায়গায় যাচাই করতে চান। এখানে আছে এক বিশেষ ধরণের পুষ্টিসাধক খাবার । কেননা, যদি কোনও একটা জায়গা থাকে যেখানে তাঁরা প্রবেশ করতে ঘৃণা বোধ করেন, তা হল এইটি, যার কথা আমি বললুম, জায়গাটা হলো বৈভবের আনন্দ উপভোগ করার । এই ফাঁকা ঘনঘটায় তাঁদের আকর্ষণ করার কিছুই নেই। বরং বিপরীত, তাঁরা নিজেদের অপ্রতিরোধ্যভাবে আকর্ষিত বোধ করেন তার প্রতি যা দুর্বল, ধ্বংসপ্রাপ্ত, দুর্দশাগ্রস্ত, অনাথ ।

অভিজ্ঞ চোখ কখনও প্রবঞ্চনা করে না । এই সমস্ত অনমনীয় বা পেটানো বৈশিষ্ট্যে, এই সমস্ত শূন্য, ফ্যালফেলে চোখে, বা  ধ্বস্তাধস্তির শেষ আলোয় যা তখনও দীপ্যমান, এই সমস্ত গভীর ও অসংখ্য কুঞ্চনে, এই সমস্ত শ্লথ ও ভাঙাচোরা চলনভঙ্গীতে, ক্ষণিকের মধ্যে অর্থোদ্ধার করা সম্ভব হয় তাদের প্রতারিত প্রেমের, অব্যাখ্যাত আত্মোৎসর্গের, ব্যর্থ প্রয়াসের, ক্ষুধার এবং মুখ বুজে সহ্য করে নেয়া শীতের অসংখ্য কিংবদন্তিগুলোকে ।

তুমি কি কখনও লক্ষ্য করেছ ফাঁকা বেঞ্চে বসে থাকা গরিব বিধবাদের ? তারা শোকপালন না করলেও, সহজেই চেনা যায় । আর তাছাড়া, গরিবদের শোকপালনে সর্বদা কিছুর অভাব থাকে, সমন্বয়ের অনুপস্হিতি যা তাদের হৃদয়কে আরও ভেঙে ফ্যালে । তারা তাদের মর্মযন্ত্রণায় সীমাবদ্ধ থাকতে বাধ্য হয় । ধনীরা নিজেদের মর্মযন্ত্রণাকে সবাইকে দেখিয়ে বয়ে বেড়াতে পারে।

কে সেই সবচেয়ে দুঃখী ও অত্যন্ত মর্মন্তুদ বিধবা, যে একজন শিশুর হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, যার সঙ্গে সে নিজের চিন্তাধারা ভাগাভাগি করতে পারে না, নাকি যে একেবারে একা ? আমি জানি না …। একদিন এমন হয়েছিল যে আমি অনেকক্ষণ ধরে একজন বয়স্ক, ভারাক্রান্ত দেখতে বিধবাকে অনুসরণ করছিলুম ; সে ছিল ঋজু, সোজা পিঠ, পুরোনো ছেঁড়া শালে ঢাকা দেওয়া, তার সমস্ত অস্তিত্ব থেকে নির্বিকার গর্বের ছটা প্রকাশিত হচ্ছিল । দেখে সহজে বোঝা যাচ্ছিল যে বার্ধক্যের কৌমার্যের পরম একাকীত্বের অভ্যাসে সে দণ্ডপ্রাপ্ত, আর  পুরুষালী চলনভঙ্গীর বৈশিষ্ট্য এনে দিয়েছিল কঠোর আত্মসংযমের রহস্যময় কটূতা । আমি বলতে পারব না কোন বাজে রেস্তরাঁয় সে দুপুরের খাবার খেয়েছিল, কিংবা কেমন করে খেয়েছিল । আমি তাকে জনসাধরণের জন্য উন্মুক্ত পাঠাগার পর্যন্ত অনুসরণ করলুম ; আর যখন সে একদা কান্নায় পুড়ে যাওয়া  সক্রিয় চোখ দিয়ে সংবাদপত্রে অনুসন্ধান করছিল, ব্যক্তিগত আগ্রহের কোনো জরুরি খবরের, তখন অনেকক্ষণ ধরে তার দিকে নজর রাখলুম।

শেষ পর্যন্ত, দুপুরবেলা, হেমন্তের মনোরম আকাশের তলায়, সেই ধরণের আকাশ যেখান থেকে ঝরে পড়ে অজস্র পশ্চাত্তাপ আর স্মৃতি, সে পার্কের এক কোনায় বসে, ভিড় থেকে দূরে, শোনার চেষ্টা করছিল, প্যারিসবাসীদের প্রিয় সেনাবাহিনীর কনসার্টের সঙ্গীত ।

সন্দেহ নেই যে এই নিষ্পাপ বুড়ির সাময়িক আমোদ ( অথবা এই বিশুদ্ধিপ্রাপ্ত বুড়ির ), বন্ধুহীন, কথাবার্তাহীন, সঙ্গীহীন,  দুর্বহ দিনগুলোয়, যা ঈশ্বর তাঁর ওপরে হয়তো বহু বছর যাবত চাপিয়ে দিয়েছেন, তা সুঅর্জিত সান্ত্বনা ! বছরে তিনশো পঁয়ষট্টি দিন ।

আরেকজনের কথা :

ভিড়ের ফালতু লোকেরা, যারা বেড়া ঠেলে কোনো প্রকাশ্য কনসার্টে ঢুকে পড়তে চায়, তাদের দিকে কৌতূহলভরে না তাকিয়ে আমি থাকতে পারি না, তা সম্পূর্ণ সমবেদী না হলেও । রাতের আনন্দের গানে, আহ্লাদের বিজয়কেতনে, অর্কেস্ট্রা ছড়িয়ে পড়ে । পোশাক পেছনদিকে ঝোলে আর ঝলমল করে, চাউনির অদলবদল হয় ; যারা অলস, কোনো কাজকর্ম না করেও জীর্ণ, এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়, সঙ্গীত উপভোগ করার শ্রমবিমুখ ভান করে । এখানে ঐশ্বর্য ছাড়া আর কিছু নেই, আনন্দধারা ব্যতীত আর কিছু নেই ; বেঁচে থাকার জন্য যে শ্বাসপ্রশ্বাস বেপরোয়া আনন্দকে উৎসাহিত করে ; কিচ্ছু নয়, ওইখানে ভিড়ের দৃশ্য ছাড়া, যারা বাইরের বেড়ায় হেলান দিয়ে আছে, বিনা পয়সায় সঙ্গীতের সামান্য রেশ শুনতে পাচ্ছে, বাতাসকে ধন্যবাদ, তারা দেখতে পাচ্ছে তাঁবুর ভেতরের ঝকমকানি ।

গরিবের চোখে ঐশ্বর্যশালীদের  আনন্দের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া সব সময়েই বেশ কৌতূহল-উদ্দীপক । কিন্তু সেই দিন, এই লোকগুলো, যারা  তাদের কাজকরার আঙরাখা পরে আছে, আর তাদের সুতির জামা, তাদের ছাপিয়ে আমার চোখে পড়ল এমন একজন অভিজাত মহিলার দিকে যিনি এই ঘিরে-থাকা গেঁয়োগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত । একজন ঢ্যাঙা, মর্যাদাপূর্ণ রমণী, এমন এক মহিমাময়ী চারিত্র্য যে আমি মনে করতে পারলুম না অতীতে অভিজাত সুন্দরীদের জমায়েতে এমন কাউকে দেখেছি । তাঁর উন্নত সততার সুগন্ধ উদ্ভাসিত হচ্ছিল তাঁর সমগ্র অস্তিত্ব থেকে। তাঁর মুখশ্রী ছিল দুঃখী আর রোগা, শোকের যে আনুষ্ঠানিক পোশাক তিনি পরেছিলেন তার সঙ্গে নিখুঁতভাবে খাপ খাচ্ছিল । এবং তিনিও, সাধারণ নাগরিকদের মতন, যাদের মাঝে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন আর যাদের উপস্হিতি তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন না, তিনি আলোকময় জগতকে গভীর আগ্রহে অবলোকন করছিলেন, শোনার সময়ে মৃদু মাথা দোলাচ্ছিলেন।

একটি একক দিব্যদৃশ্য ! “নিঃসন্দেহে”, আমি নিজেকে বললুম, “ওনার দারিদ্র্য, যদি তা দারিদ্র্য হয়, তার জন্য অর্থগৃধ্নুতার মিতব্যয়ীতার প্রয়োজন ছিল না ; ওই মহিমান্বিত মুখশ্রী তার প্রমাণ। কিন্তু কেনই বা উনি জেনেশুনে অমন পরিপার্শ্বের অংশ হতে চাইলেন, যার মাঝে তিনি উজ্বল বিবর্ণতার মতন দাঁড়িয়ে আছেন ?”

কিন্তু কৌতূহলবশত যখন ওনার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলুম, কারণটা আমি আঁচ করতে পারলুম। দীঘাঙ্গী বিধবাটি একটি শিশুর হাত ধরেছিলেন, তাঁর মতনই কালো পোশাকে ; ঢোকার টিকিটের দাম যুক্তিযুক্ত ছিল, সেই টাকাটা হয়তো বাচ্চাটার কোনো প্রয়োজন মেটাতে লাগবে, কিংবা, আরও ভালো হয়তো, বিলাসদ্রব্য বা খেলনা কেনা যাবে।

আর উনি হেঁটে বাড়ি ফিরবেন, নিজের চিন্তা ও স্বপ্নে মগ্ন, একা, সর্বদা একা ; কেননা বাচ্চারা চেঁচামেচি করে, একলষেঁড়ে হয়, শান্তস্বভাব হয় না, ধৈর্যশীল হয় না ; আর একাকীত্বের দুঃখ লাঘবের জন্য বাচ্চাটা, সত্যিকার জানোয়ারের মতন, কুকুর বা বিড়ালের মতন, তাঁর অন্তরঙ্গ হতে পারে না ।

চোদ্দ

বুড়ো সঙ

ছুটির দিনের ভিড় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল সর্বত্র, মৌজমস্তিতে ব্যস্ত । দিনটা সেই ধরণের উৎসবের ছিল যখন রাস্তার মাদারিরা, দড়াবাজিকররা, পশুর খেলা দেখিয়েরা, ভ্রাম্যমান ফেরিঅলারা, সারা বছরের দুরবস্হাকে কাটিয়ে ওঠার জন্য চিরকাল এই দিনটির ওপর নির্ভর করেছে । এই রকম দিনে আমার মনে হয় লোকেরা সবকিছু ভুলে যায়, ভালো দিনকাল আর ব্যস্ত কাজকর্ম থেকে মুক্ত ; তারা হয়ে যায় বাচ্চাদের মতন । ছোটোদের জন্য এটা একদিনের ছুটি, চব্বিশ ঘণ্টার জন্য স্কুলের আতঙ্ক থেকে মুক্তি ; বড়োদের জন্য, দিনটা জীবনের অপকারী ক্ষমতার সঙ্গে ঘোষিত বোঝাপড়ার, শেষহীন সংগ্রামের বিবাদ-বিতর্ক থেকে সাময়িক আরামের। এমনকি সমাজকর্মী আর আধ্যাত্মিক শ্রমে নিযুক্ত মানুষের পক্ষেও এই সর্বাত্মক  বিজয়ানন্দের প্রভাব কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয় । অপেক্ষা না করেই, তাঁরা তাঁদের অংশের বেপরোয়া বাতাবরনে মিশে যান । আমার কথা বলতে গেলে, সত্যিকার একজন প্যারিসবাসীর মতন, আমি এই ধরণের সমারোহপূর্ণ সুযোগে পথের ধারের ঘুপচি-দোকানগুলোকে নিরীক্ষণ করতে ছাড়ি না ।

আর তারা নিজেদের মধ্যে হইচই করে প্রতিযোগীতা করে : তারা তারস্বরে চিৎকার করে, ষাঁড়ের মতন চেঁচায়, নেকড়ের মতন ডাক পাড়ে । তা ছিল সব রকম ধ্বনির মিশেল, বাসনের ঘ্যাঙঘ্যাঙ আর বাজি ফাটাবার আওয়াজ । লাল পোশাকে সারিবদ্ধ দড়াবাজিকর আর ডিগবাজি-খাওয়া ভাঁড়েরা তাদের রোদে-পোড়া , বাতাসে, বৃষ্টিতে আর সূর্যের তাপে ক্ষয়ে যাওয়া মুখে, ভেংচি কাটছিল । আত্মবিশ্বাসী অভিনেতারা  নিজেদের প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত, তারা চালাক-চতুর ঠাট্টার গল্প বলছিল, মলিয়েরের কমেডির মতন যা একঘেয়ে আর আগেই আঁচ করা যায় । পালোয়ানরা, তাদের বড়সড় অঙ্গ সম্পর্কে গর্বিত, ওরাঙওটাঙের মতন কপাল আর করোটি, আঁটোসাঁটো লোকদেখানো পোশাকে ডিগবাজি খেয়ে বেড়াচ্ছিল,  আগেভাগে পোশাক কাচিয়ে নিয়েছিল । নর্তকীরা, পরী কিংবা রাজকন্যার মতন সুন্দরী, দুলছিল আর তিড়িংবিড়িং করছিল, লন্ঠনের আলোয় তাদের ঘাগরা ঝকমক করছিল । সবকিছুতেই ছিল দীপ্তি, ধুলো, চেঁচামেচি, আনন্দ, হই্হল্লা ; কিছু লোক টাকাকড়ি খরচ করল, যখন কিনা অন্যদের লাভ হলো, দুই পক্ষই সমানভাবে খুশি । বাচ্চারা মায়ের পোশাকের খুঁট ধরে লজেঞ্চুশ পাবার আশায় হাঁটছিল, কিংবা তাদের বাবার কাঁধে চেপে ম্যাজিকঅলার দেবতাসূলভ চমৎকারিত্ব দেখছিল । আর সর্বত্র, সব রকমের গন্ধ ছাপিয়ে, চর্বি ভাজার সুবাস ঘুরপাক খাচ্ছিল, যেন তা উৎসবের ধুপধুনো ।

সবার পেছনে, দুই ধারের দোকানসারির একেবারে শেষে, যেন এই সমস্ত ঘনঘটা থেকে নিজেকে লজ্জায় নির্বাসন দিয়েছে, আমি একজন বুড়ো সঙকে দেখতে পেলুম, ঝুঁকে পড়েছে, রুগ্ন, জরাজীর্ণ, একজন মানুষের ধ্বংসাবশেষ, তাঁবুর খুঁটিতে হেলান দিয়ে আছে ;  কোনো বুনো বর্বরের চেয়েও ছেঁড়াখোঁড়া তাঁবু, সেখানে দুটো ফুরিয়ে-আসা মোমবাতি, দপদপ করছিল আর ধোঁয়া ছড়াচ্ছিল, যা থেকে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল তাঁবুর দারিদ্র্য ।

সর্বত্র, উল্লাস আর মুনাফা আর অসংযম ; সর্বত্র কালকের খাবারের আশ্বাস ; সর্বত্র জীবনীশক্তির ব্যস্ত উচ্চরব । এখানে, চরম দুরবস্হা, পোশাক পরানো দুরবস্হা, যাতে আতঙ্ককে তীব্রতর করা যায়, হাস্যকর কাঁথায়, যে অবস্হায় শিল্পের তুলনায় প্রয়োজন তৈরি করেছে বৈপরীত্য । লোকটা, দীনদরিদ্র, হাসেনি ! লোকটা ফোঁপায়নি, লোকটা নাচেনি, লোকটা অঙ্গভঙ্গী করেনি, লোকটা চেঁচায়নি ; লোকটা কোনো গান গায়নি, তা সে মজার হোক বা দুঃখের ; লোকটা ভিক্ষা চায়নি । লোকটা ছিল চুপচাপ আর স্হির । লোকটা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, লোকটা অধিকার ত্যাগ করে দিয়েছিল । ওর নিয়তি ছিল নিশ্চিত । কিন্তু ভিড় আর আলোর স্পন্দিত জোয়ার ওর বীভৎস দারিদ্র্যের কয়েক পা দূরত্বে এসে থেমেছিল,   ওর চাউনি ছিল গভীর জ্ঞানপূর্ণ, ভোলা যায় না এমন ! আমি অনুভব করলুম আমার কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে বায়ুরোগের ভয়ঙ্কর প্রকোপে, আর আমি অনুভব করলুম যে আমার নিজের দৃষ্টি দ্রোহের কান্নায় মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেছে যা থেকে অশ্রু ঝরবে না ।

তাহলে কীই বা করি ? ছেঁড়া পর্দার পেছনে, অভাগা লোকটাকে যদি জিগ্যেস করি যে এই ছায়ার আড়ালে আমাকে দেখাবার মতন কোন আশ্চর্য , কোন কৌতূহল-জাগানিয়া ব্যাপার আছে, তাতে কী উপকার হবে ? আর সত্যি বলতে, আমার সাহস হলো না ; আর যদিও আমার ভীতির কারণ শুনে তুমি হাসবে, আমি দিব্বি করে বলতে পারি যে আমার ভয় করছিল লোকটাকে অপমান করে ফেলব । শেষ পর্যন্ত, নিজেকে বুঝিয়ে, আমি ঠিক করলুম যে লোকটার পাটাতনের পাশ দিয়ে যাবার সময়ে কিছু টাকা তার ওপর রেখে দেব, এই আশায় যে সে আমার অভিপ্রায় হৃদয়ঙ্গম করবে, অথচ সেই সময়েই কোনো অজানা উৎসাহের আকস্মিক ঢেউয়ে ভিড়ের ঠেলায় আমি ওর থেকে অনেকটা দূরে চলে এলুম ।

আর, বাসায় ফেরার পথে, এই দৃশ্যের আচ্ছন্নতায়, আমি আমার আকস্মিক দূঃখকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করলুম, আর নিজেকে বললুম : আমি এক্ষুনি একজন বৃদ্ধ সাহিত্যিকের স্পষ্ট ছবি দেখলুম যে সেই প্রজন্মের চেয়ে অধিককাল বেঁচেছে যে প্রজন্মকে সে এক সময় মেধাবী আনন্দ দিয়েছিল ; বন্ধুহীন একজন বুড়ো কবি, পরিবারহীন, সন্তানহীন, দারিদ্র্যের আর জনগণের অকৃতজ্ঞতা দ্বারা বিধ্বস্ত, তাঁবুর আড়ালে যেখানে ভুলো জগৎ আর ঢুকতে চায় না ! 

পনেরো

কেক

আমি পর্যটনে বেরিয়েছিলুম । যে ভূদৃশ্যে আমি নিজেকে পেলুম তা ছিল চমৎকারিত্ব ও মহনীয়তায় অপ্রতিরোধ্য । এর কিয়দংশ নিঃসন্দেহে আমার অস্তিত্বে প্রবেশ করেছিল । 

আবহের সমান সহজতায় আমার চিন্তাধারা উড়াল পেলো ; গেঁয়ো আবেগ, যেমন ঘৃণা ও নিষিদ্ধ প্রেম, মনে হতে লাগল আমার পায়ের নীচে বহুদূরের মেঘদলের মতন ভেসে  

গেছে গভীর অতলে ; আমার ওপরে ঘিরে থাকা আকাশের গম্বুজের মতন বিশাল আর বিশুদ্ধ অনুভব করছিল আমার আত্মা ; বহুদূরের, পাহাড়ের ঢালে আরেক পর্বতমালায় অদৃশ্য চারণভূমির গরুদের ঘণ্টাধ্বনির মতন আমার স্মৃতির পার্থিব ব্যাপার হৃদয়ে এসে দুর্বল হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছিল । স্হির ছোটো জলাশয়ে, তার অতল গভীরতার কারণে কালো, মেঘের ছায়ারা বয়ে যাচ্ছিল, যেন আকাশে ডানাঅলা উড়ন্ত দৈত্যের আলখাল্লার  ছায়া । আর আমার মনে পড়ছে সেই সমারোহপূর্ণ, বিরল সংবেদন, ব্যপ্ত নিখুঁত স্তব্ধ সঞ্চরণের দ্বারা উদ্ভূত, আমার অন্তরে সৃষ্টি করেছিল মহোল্লাস ও ভয়ের মিশ্রণ । সংক্ষেপে, আমি অনুভব করছিলুম, আমার চতুর্দিকের উদ্দীপনাময় সৌন্দর্যকে ধন্যবাদ, নিজের ও ব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে পরম শান্ত এক সম্পর্ক ; আমি বিশ্বাস করি, আমার পূর্ণ  সুখে, আর পৃথিবীর যাবতীয় শয়তানিকে ভুলে যাওয়ায়, আমার এমনকি মনে হতে লাগল  সংবাদপত্ররা যে দাবি করে যে মানুষ সৎ হয়ে জন্মায় তা তেমন হাস্যকর নয় । — কিন্তু যখন জাগতিক প্রয়োজনীয়তা তার চাহিদা মেটাতে চাইলো, আমার মনে হল এতো উঁচুতে চড়ার দরুণ যে ক্লান্তি আর ক্ষুধা দেখা দিয়েছে তা মেটানো দরকার । পকেট থেকে একটা বড়ো রুটির টুকরো, চামড়ার কাপ, আর তখনকার দিনে ডাক্তাররা পর্যটকদের যে ধরণের টনিক দিতেন আর তাতে গলিত তুষার মেশানো যেতো, তার ফ্লাস্ক বের করলুম। রুটিটা চুপচাপ কাটতে লাগলুম, তখনই একটা মৃদু শব্দ আমাকে ওপরে তাকাতে বাধ্য করল । আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল এক ছোট প্রাণী, ছেঁড়াখোঁড়া পোশাকে আর অবিন্যস্ত, যার ফাঁকা চোখের কোটর, আরণ্যক,  আর যেন মিনতি করছে, রুটিটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছিল। আর আমি তার নিচুস্বর, কর্কশ কন্ঠের দীর্ঘশ্বাস মেশানো, “কেক” উচ্চারণ শুনতে পেলুম ! আমার মামুলি রুটিকে ওই শব্দে সন্মান করার দরুণ না হেসে থাকতে পারলুম না, আর আমি একটা বড়ো টুকরো কেটে ওর দিকে বাড়িয়ে দিলুম । ও ধীরে এগিয়ে এলো , ঈর্ষার বস্তুটি থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই ; তারপর হঠাৎই, রুটির টুকরোটা হাত দিয়ে কেড়ে নিয়ে, তাড়াতাড়ি পেছিয়ে গেলো, যেন ও ভয় পেয়ে গিয়েছিল যে আমার উপহার হয়তো বিশ্বাসযোগ্য নয়, কিংবা বলে ফেলে আমি পশ্চাত্তাপ করছি। 

কিন্তু সেই মুহূর্তে  আরেকজন বুনো কে জানে কোথা থেকে এসে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, আর দুজনকে এমন একইরকম দেখতে যে মনে হচ্ছিল ওরা যমজ ভাই । দুজনে ধুলোয় গড়াগড়ি খেলো, দামি শিকারের লোভে, মনে হচ্ছিল দুজনেই নিজের ভাইকে অংশ দিতে চায় না । প্রথম জন, হতাশায়, দ্বিতীয়জনের চুলের মুঠি ধরল । দ্বিতীয়জন প্রথমজনের কান দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরল, আর অমার্জিত শব্দে গালাগাল দিয়ে  রক্তমাখা থুতু ফেলল । কেকের বৈধ দাবিদার  চেষ্টা করল দখলদারের চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দিতে ; পরবর্তীজন তার হাত দিয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর গলা টিপে ধরতে চাইল, আর অন্য হাত দিয়ে জিতে নেয়া পুরস্কার পকেটে পুরে ফেলতে চাইলো । কিন্তু হতাশায় চাগিয়ে উঠে, পরাজিতজন গায়ের পুরো শক্তি খাটিয়ে বিজয়ীর পেটে মাথার ধাক্কা মেরে তাকে মাটিতে ফেলে দিলো । কিন্তু একটা নোংরা লড়াই, যা তাদের বালকসূলভ চেহারার তুলনায় বেশিক্ষণ বজায় ছিল, তা বর্ণনা করে কীই বা হবে ? মুহূর্তে-মুহূর্তে কেকটার হাতবদল আর পকেটবদল হতে থাকলো ; কিন্তু, হায়, তার পরিমাণেও পরিবর্তন ঘটতে থাকলো ; আর সব শেষে, ক্লান্ত হয়ে, শ্বাসের জন্যে হাঁপিয়ে, রক্তাক্ত, তারা থামলো, কেননা আর লড়াই করা সম্ভব ছিল না তাদের পক্ষে, লড়াই করার জন্যে বাঁচেনি কিছুই ; রুটির টুকরোটা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল, ছড়িয়ে পড়েছিল গুঁড়ো হয়ে, বালুকণায় মিশে গিয়ে আর পার্থক্য করা যাচ্ছিল না ।

ঘটনাটার দরুণ ভূদৃশ্য ঘোলাটে হয়ে গিয়েছিল আমার সামনে, আর এই দুই ক্ষুদে মানুষ আসার আগে আমার আত্মা যে শান্তি উপভোগ করছিল তা সম্পূর্ণ উবে গিয়েছিল; কিছুক্ষণের জন্যে আমার মন বেশ ভারাক্রান্ত ছিল, আমি নিজেকে বলছিলুম : “আচ্ছা, তাহলে, একটা চমৎকার দেশ যেখানে রুটিকে বলা হয় কেক, এক বিরল উপাদেয় যা ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ বাধিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট !”

ষোলো

ঘড়ি

বিড়ালের চোখ দেখে চীনারা সময় বলে দিতে পারে ।

একদিন একজন যাযক, নানকিঙের শহরতলির পথ দিয়ে যাবার সময়ে, তাঁর মনে পড়ল যে ঘড়ি পরে আসতে ভুলে গেছেন, আর একটি ছোটো ছেলেকে জিগ্যেস করলেন এখন কয়টা বেজেছে।

চীন সাম্রাজ্যের লোচ্চা ছোঁড়া প্রথমে ইতস্তত করল ; তারপর ভেবে নিয়ে বলল, “আমি গিয়ে তোমার জন্য জেনে আসছি”। কিছুক্ষণ পরে সে ফিরে এলো, একটা মোটা বিড়ালকে সঙ্গে নিয়ে, আর বিড়ালের চোখ দেখে, তার শাদা অংশের দিকে তাকিয়ে, লোকে যেমন বলে থাকে, কোনো দ্বিধা ছাড়াই ঘোষণা করল : “এখনও দুপুর হয়নি।” কথাটা সত্যি ।

আমার কথা যদি বলি, যখন আমি আমার সুন্দর ফিলিনের দিকে ঝুঁকি, বেশ ভালো নাম, যে তার যৌনতার জন্য সন্মানিত, আমার হৃদয়ের গর্ব, আর আমার আত্মার সুগন্ধ — তা সে রাত হোক বা দিন, ঝলমলে আলোয় কিংবা আবছা ছায়ায় — তার আদরযোগ্য চোখের গভীরতায় আমি নিখুঁত সময় দেখতে পাই, সর্বদা একই সময়, বিশাল একটি সময়, সৌন্দর্যমণ্ডিত, এবং শূন্যতার মতন শৌর্যময়, মিনিট ও সেকেণ্ডের বিভাজন ছাড়াই — স্হির একটা সময় যা ঘড়ি দিয়ে নির্দিষ্ট নয়, কিন্তু দীর্ঘশ্বাসের মতন হালকা, চোখের পাতা ফেলার মতন দ্রুত ।

আর যখন আমি সুন্দর ঘড়িমুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে থাকি সেই সময়ে কেউ এসে যদি আমাকে বিরক্ত করে, যদি কোনো অসৎ ও অসহ্য জিনপরী, খারাপ সময়ের কোনো দানব এসে বলে, “এতো মনোযোগ দিয়ে কী দেখছ ? এই প্রাণীর চোখে তুমি কী খুঁজছ ? তুমি কি সময় দেখছ, ওহে অলস, অপচয়ী নশ্বর ?”– কোনো দ্বিধা না করেই আমি জবাব দেবো : “হ্যাঁ, আমি সময়কে দেখছি ; তা হলো অনন্তকাল !”

সতেরো

মেয়েটির কেশদামের গোলার্ধ

আমাকে তোমার চুলের দীর্ঘ, দীর্ঘ সুগন্ধ নিতে দাও, ঝর্ণার জলে পিপাসার্তের মতন আমার মুখকে সম্পূর্ণ ডুবে জেতে দাও, সুবাসিত রুমালের মতন হাতে নিয়ে খেলতে দাও, বাতাসে স্মৃতিকে উড়িয়ে দিতে দাও ।

আমি যাকিছু দেখি তা তুমি যদি জানতে — যাকিছু আমি অনুভব করি — তোমার চুলে যাকিছু আমি শুনতে পাই ! অন্য লোকেদের আত্মা সঙ্গীতের প্রভাবে যেমন ভ্রমণে বেরোয় তেমনই আমার আত্মা ভ্রমণে বেরোয় এই সুগন্ধে ।

তোমার চুলে রয়েছে একটি পুরো স্বপ্ন, পাল আর মাস্তুলসহ ; তাতে রয়েছে বিশাল সমুদ্র, যেখানে অগুনতি মৌসুমীবায়ু আমাকে বয়ে নিয়ে যায় মোহিনী আবহাওয়ায়, যেখানে আকাশ আরও নীল আর আরও নিগূঢ়, যেখানে বাতাবরণকে সুগন্ধিত করে তুলেছে ফল, পাতা, আর মানুষের ত্বক।

তোমার চুলের সাগরে, আমি দেখতে পাই দুঃখী গানে সমাহিত বন্দর, সব কয়টি দেশের কর্মঠ মানুষ সেখানে, যতো রকম হতে পারে ততো ধরণের জাহাজ, বিশাল আকাশের অলস শাশ্বত তাপের পৃষ্ঠভূমিতে তাদের স্হাপত্য দিয়ে দিগন্তকে তনূকৃত ও জটিল করে তুলেছে। 

তোমার চুলের সোহাগস্পর্শে আমি কাউচে শুয়ে কাটানো দীর্ঘ ধীরুজ সময়কে ফিরে পাই, সুন্দর জাহাজের একটি ঘরে, বন্দরের অনির্ণেয় ঢেউয়ের দ্বারা ক্রমান্বয়ে দোল খাওয়া, তাজা জলের জালা আর ফুলের টবের মাঝে ।

আগুনের পাশে রাখা কম্বলের মতন তোমার চুলে, আমি আফিম আর চিনির সঙ্গে মেশানো তামাকের শ্বাস নিই ; তোমার চুলের রাত্রিতে, আমি দেখতে পাই  অসীম ক্রান্তিবৃত্তের নীলাভ ঔজ্বল্য; তোমার চুলের ঢালের কিনারায়, আমি আলকাৎরা, মৃগনাভি আর নারিকেল তেলের গন্ধে মাতাল হয়ে যেতে থেকি । 

আমাকে একটু-একটু করে খেয়ে ফেলতে থাকে তোমার তন্দ্রাতুর কালো বিনুনি । যখন তোমার স্হিতিস্হাপক, দ্রোহী চুল আমি চিবোতে থাকি, আমার মনে হয় আমি স্মৃতিগুলো খেয়ে ফেলছি। 

আঠারো

সমুদ্রভ্রমণের নিমন্ত্রণ

এক দারুণ দেশ আছে, কোকেইন নামের দেশ, লোকে বলে, সেখানে আমি আমার এক পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে যাবার স্বপ্ন দেখি । তুলনাহীন দেশ, উত্তরের কুয়াশায় ডোবা, যাকে বলা যায় পাশ্চাত্যের প্রাচ্য, ইউরোপের চীন, তেমন অবাধ নিয়ন্ত্রণ তপ্ত, খেয়ালি কল্পনার উৎসার ঘটায় না, আর তাই ধৈর্য ধরে ও জেদে তার গূঢ় ও অপলকা বনানীর  স্বপ্নবিলাস এঁকে রাখেনি।

সত্যকার এক কোকেইন দেশ, যেখানে সমস্তকিছু সুন্দর, বৈভবপূর্ণ, শান্তিময়, নিখুঁত ; যেখানে শৃঙ্খলার সঙ্গে বিলাস নিজেকে মিশিয়ে ফেলতে উদ্বাহু ; যেখানে জীবন শ্বাস নেবার জন্য মোহময় ও মিষ্টি ; সেখান থেকে বিশৃঙ্খলা, উথালপাথাল, এবং যা অচিন্তিতপূর্ব তা নির্বাসিত ; সেখানে নৈঃশব্দের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে আনন্দের ; সেখানে রান্না করার ব্যাপার একই সঙ্গে কাব্যিক, মূল্যবান ও উৎসাহবর্ধক ; সেখানে, হে প্রিয় দিব্যতা, সব কিছু তোমার সদৃশ ।

তুমি তো জানো আমাদের শীতল দুঃখযন্ত্রণার দিনগুলোতে যে জ্বরময় অসুখ ঘিরে ধরে, সেই অজানা দেশের জন্য মনকেমন, কৌতূহলপ্রসূত উদ্বেগ ? একটা দেশ আছে যা তোমার সদৃশ, সুন্দর, বৈভবপূর্ণ, শান্তিময়, এবং নিখুঁত, যেখানে কল্পনা সৃষ্টি করেছে আর সাজিয়েছে এক পাশ্চাত্য চীনদেশ, যেখানে শ্বাস নেবার জন্য জীবন বেশ মিষ্টি, যেখানে আনন্দের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে নৈঃশব্দের । সেখানেই আমাদের সকলের যাওয়া উচিত, আমাদের উচিত সেখানে গিয়ে মারা যাওয়া !

হ্যাঁ, শ্বাস নেবার জন্য, স্বপ্ন দেখার জন্য, এবং সময়কে সংবেদনের অনন্তকালীনতা দেবার জন্য, আমাদের যাওয়া উচিত । একজন সঙ্গীতকার ওয়াল্টজ নৃত্যে নিমন্ত্রণ নামে সুর বেঁধেছিলেন ; কোথায় সেই লোক যিনি সমুদ্রভ্রমণের নিমন্ত্রণ-এর সুর বাঁধবেন, যা প্রিয়তমাকে উপহার দেয়া যায়, নির্বাচিত বোনকে  দেয়া যায় ?

হ্যাঁ, সেই আবহাওয়াতে বেঁচে থাকা হয়ে উঠবে শ্রেয় — সেই দূরদেশে, যেখানে স্তিমিত সময়ে বহু চিন্তা একত্রিত হয়, যেখানে ঘড়িগুলো গভীর, অর্থময় শান্তিতে আনন্দের ঘণ্টাধ্বনি করে । জানালার ঝিকমিকে শার্শিতে, কিংবা গিল্টি-করা দামি কালো চামড়ার ওপরে, চুপচাপ বাস করে আশীর্বাদময়, শব্দহীন, গূঢ় পেইনটিঙ, যেন তা সেই চিত্রকরদের আত্মা যাঁরা সেগুলো সৃষ্টি করেছেন । অস্তগামী সূর্য, যা অভ্যর্থনাঘরের খাবার জায়গায় এমন রঙ এনেছে, সুন্দর পর্দার কাপড়ে সাজানো কিংবা দীর্ঘ জানালায় সীসার পাতলা পটি দিয়ে বাঁধানো একাধিক শার্শি ।

কাঠের আসবাবগুলো বিশাল, কৌতূহলময়, অদ্ভুত, এবং সূক্ষ্ম আত্মার মতন তালা ও গোপনতা দিয়ে বন্ধ । আয়নাগুলো, বাসনকোসন, আচ্ছাদন, সোনার থালা, আর মাটির জিনিসপত্র চাউনির জন্য বাজায় এক মৃদু, রহস্যময় সঙ্গীত ; আর সবকিছু থেকে, কোনাগুলো থেকে, দেরাজের ফাঁকগুলো থেকে, পর্দার ভাঁজ থেকে, এক একক সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, সুমাত্রার এক স্মৃতিচিহ্ণ, গৃহের আত্মার মতন এক সুবাস ।

সত্যকার এক কোকেইন দেশ, আমি বলি, যেখানে সকলে ধনী, পরিচ্ছন্ন, এবং সুস্হ বিবেকের মতন উজ্বল, রান্নার বাসনকোসনের মতন চমৎকার, যেন পেটা সোনার মতন, বহুরঙা অলঙ্কারের মতন অসাধারণ ! জগতের তাবৎ ঐশ্বর্য সেখানে একত্রিত হয়, যেন কোনো এক শ্রমিকের বাসা যে সারা পৃথিবীর ধন্যবাদ অর্জন করেছে । একটি অনুপম দেশ, সবার চেয়ে উন্নত, যেমন প্রকৃতির তুলনায় শিল্প, যেখানে স্বপ্নের মাধ্যমে প্রকৃতিকে নতুন করে গড়া যায়, যেখানে তা পরিশুদ্ধ, সাজানো, পুনর্নির্মিত । ওদের খুঁজতে দাও, ওরা খুঁজতে থাকুক, নিজেদের আনন্দের সীমাকে ওরা অপরিসীম বাড়িয়ে তুলুক, উদ্যানপালনবিদ্যার সেই রাসায়নিকরা ! 

তাদের উচ্চাকাঙ্খী সমস্যার সমাধানের জন্য তারা ষাট কিংবা শতহাজার টাকার পুরস্কার ঘোষণা করুক । আমার কথা যদি বলি, আমি আমার কালো টিউলিপ আর নীল ডালিয়া খুঁজে পেয়েছি !

তুলনাহীন ফুল, পুনরাবিষ্কৃত টিউলিপ, আলঙ্করিক ডালিয়া, সেখানে আছে, নয় কি, সেই সুন্দর দেশে যা শান্তিময় আর স্বপ্নালু, যেখানে আমাদের গিয়ে প্রস্ফূটিত হয়ে ওঠা উচিত ? তুমি কি তোমার নিজের তৈরি উপমা দিয়ে উদ্ভাসিত হতে চাইবে না, এবং তুমি কি সেখানে প্রতিফলিত হতে চাইবে না — অতিন্দ্রীয়বাদীরা যেমন বলে থাকেন — তোমার নিজের প্রতিষঙ্গে ?

স্বপ্ন, সব সময়ে স্বপ্ন ! আর আত্মা যতো উচ্চাকাঙ্খী আর সূক্ষ্ম, সম্ভাব্য থেকে স্বপ্নেরা ততো দূরে সরে যায়। প্রতিটি মানুষ নিজের অন্তরে প্রাকৃতিক আফিমের খোরাক বয়ে বেড়ায়, অশেষভাবে লুকিয়ে রাখা আর অশেষভাবে  নবায়িত, এবং জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে,  প্রকৃত আনন্দের কতোটা সময় আমরা গুণতে পারি, সুচিন্তিত ও সফল কর্মকাণ্ডে ? আমরা কি কখনও বেঁচে থাকব, আমরা কি কখনও  আত্মার  রাঙানো  নাট্যদৃশ্যে প্রবেশ করব, সেই নাট্যদৃশ্য যা তোমার সদৃশ? 

এই ঐশ্বর্য, এই আসবাবপত্র, এই বিলাসদ্রব্য, এই শৃঙ্খলা, এই সুগন্ধরাজি, এই অলৌকিক ফল, তারা সকলেই তুমি । আর তারা সকলেই তুমি, এই বিশাল স্রোত আর এই স্বচ্ছ খাল । জলবাহিত এই বিশাল নৌপোতগুলো, সবই ধনরত্নে ভরা, জাহাজের দড়িদড়া থেকে মন্ত্রের মতন জেগে ওঠা গান, তারা আমার চিন্তাধারা যেমন জাগ্রট করে,  তারা তোমার বুকে ঘুমোয় আর পরিবাহিত হয় ।

তুমি ধীরে তাদের সাগরে নিয়ে যাও যা অনন্তকালীন, তখন তুমি তোমার আত্মার সুন্দর স্পষ্টতায় আকাশের গভীরতাকে প্রতিফলিত করো — আর তখন তারা ঢেউয়ের উথ্থানে ক্লান্ত হয়ে যায়, আর প্রাচ্যের ফলমূলে ভারি হয়ে ওঠে, আর নিজের দেশের বন্দরে ফিরে যায়, তারা তখনও থাকবে আমার চিন্তাধারা হয়ে, ঐশ্বর্যময়, আর তোমার নিমন্ত্রণ থেকে ফিরে আসবে ।

উনিশ

গরিবের খেলনা

আমি একটা নিরীহ ভিন্নমুখের ইঙ্গিত দিচ্ছি । কিছু বিনোদনে অপরাধবোধ নেই!

তুমি যখন সকালে বাইরে বেরোও, মনঃস্হির করে নিয়ে যে কেবল রাজপথে ঘুরে বেড়াবে, পকেটে কয়েকটা ছোটো গ্যাজেট পুরে নাও যাদের দাম এক টাকাও নয় — যেন একটা সুতোয় বাঁধা চ্যাপ্টা নাচ-পুতুল, কামার নেহাইয়ের ওপরে পিটছে, ঘোড়া আর তার সওয়ার, লেজ যেন হুইসিলের কাজ করছে — আর রেস্তরাঁর সামনে, কিংবা গাছতলায়, যে গরিব বাচ্চাদের সঙ্গে তোমার দেখা হয় তাদের উপহার দিয়ে দাও । প্রথমে তাদের নেবার সাহস হবে না ; তারা তাদের সৌভাগ্যকে বিশ্বাস করবে না । কিন্তু তারপর তাদের ব্যগ্র হাত কেড়ে নেবে উপহার, আর নিয়ে পালাবে, যেমন বিড়ালদের তুমি যখন খাওয়াও তারা সেটা খাবার জন্য বেশ দূরে চলে যায়, মানুষকে অবিশ্বাস করার অভিজ্ঞতার দরুণ ।

পথে এগিয়ে, বিশাল এক বাগানের গেট অতিক্রম করে, যার পেছনে দেখা যাচ্ছিল সূর্যের আলোয় ঝলকে-ওঠা সুন্দর এক বাগানবাড়ির ঔজ্বল্য, দাঁড়িয়ে ছিল এক সংস্কৃতিমান ও তরতাজা বালক,  গ্রামীণ পোশাকে যা বেশ নম্র আর আকর্ষক ।

বিলাস, দুশ্চিন্তার অনুপস্হিতি, এবং বৈভবের অভ্যাসগত প্রদর্শনী এই বালকদের এমন শোভন করে তোলে যে মনে হবে সাধারণ ও দারিদ্র্যের ছাঁচে গড়া বালকদের চেয়ে এদের গড়ার ছাঁচ আলাদা।

তার পাশে ঘাসের ওপরে পড়ে আছে এক চমৎকার খেলনা, তার মালিকের মতনই টাটকা, চকচকে আর সোনালী, বেগুনি পোশাক পরানো, ছোটো-ছোটো পালক আর কাচের পুতি দিয়ে সাজানো । কিন্তু ছেলেটি তার প্রিয় খেলনা নিয়ে খেলছিল না ; পরিবর্তে, সে তাকিয়ে ছিল এই দৃশ্যের দিকে :

গেটের অন্য দিকে, রাস্তার ওপর, শেয়ালকাঁটা আর জংলিঝোপের মাঝে ছিল আরেকজন বালক, অপরিচ্ছন্ন, পুঁচকে, তেলচিটে, সেই ধরণের এক অস্পৃশ্য প্রাণী যার অন্তরে,  নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে কেউ দেখলে খুঁজে পাবে, যেমনভাবে একজন বিশেষজ্ঞ আদর্শ পেইনটিঙের ভার্নিশের আবরণের তলায় প্রকৃত শিল্পকর্মকে আবিষ্কার করেন, তেমন করে দারিদ্র্যের বিকর্ষক চাদর ধুয়ে ফেলে তাকে দেখতে পাবে ।

এই প্রতীকি পাঁচিল যা দুটি জগতকে আলাদা করে রেখেছে, রাজপথের আর বাগানবাড়ির, গরিব বালকটি ধনী বালকটিকে নিজের খেলনা দেখাচ্ছিল, যে বেশ উৎসাহ নিয়ে সেটা পরখ করছিল যেন তা কোনো বিরল ও অজানা বস্তু । এখন, নোংরা ছেলেটি যে খেলনা দেখিয়ে প্ররোচিত করছিল, খাঁচার ভেতরে ঝাঁকাচ্ছিল আর দোলাচ্ছিল — তা ছিল এক জ্যান্ত ইঁদুর ! ওর বাবা-মা, নিঃসন্দেহে ব্যয়সঙ্কোচের কারণে, জীবনযাপন থেকেই সরাসরি খেলনা যোগাড় করে ফেলেছিলেন।

আর বালক দুজন ভাতৃত্ববোধে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসাহাসি করছিল, সমান ঔজ্বল্যের সাদা দাঁত মেলে ।

কুড়ি

পরীদের উপহার

সেদিন ছিল পরীদের বিশাল জমায়েত, বিগত চব্বিশ ঘণ্টায় যারা জন্মেছে তাদের উপহার দেবার ব্যবস্হা করার জন্য ।

নিয়তির এই সুপ্রাচীন আর খেয়ালি বোনেরা, আনন্দ আর দুঃখের এই অদ্ভুত মায়েরা,  একে অপরের থেকে একেবারে আলাদা  : কাউকে মনে হচ্ছিল গম্ভীর আর বদমেজাজি ; আবার কেউ  চঞ্চল আর দুষ্টু ; কেউ যুবতী, যারা চিরকালের জন্য যুবতী ; অন্যেরা বয়স্কা, যারা চিরকালই বয়স্কা রয়েছে ।

যে বাবারা পরীর অস্তিত্ব বিশ্বাস করে তারা হাজির হয়েছে, প্রত্যেকের কোলে সদ্যজাত।

উপহারগুলো, সামর্থ্যগুলো, সৌভাগ্যগুলো, অজেয় পরিস্হিতিগুলো জড়ো করা হয়েছে এক সালিশিসভার পাশে, যেমনভাবে সান্মানিক স্নাতক উৎসবে পুরস্কারগুলো একটা টেবিলের ওপরে রাখা থাকে । পার্থক্য হলো যে উপহারগুলো প্রয়াসের পরিশোধ হিসাবে নয় ; বরং বিপরীত, তারা ছিল এমন মানুষদের মর্যাদা দেবার উপলক্ষ যারা তখনও পর্যন্ত জীবনযাপন করেনি, এমন মর্যাদা যা  দুঃখযন্ত্রণা অথবা, তেমনই সহজভাবে, আনন্দের খাতিরে ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে ।

বেচারা পরীরা বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, কেননা দরখাস্তকারিদের সারি ছিল দীর্ঘ, আর মাঝামাঝি জগত, মানবসমাজ ও ভগবানের মাঝে, আমাদের মতনই সময়ের ভয়ঙ্কর আইন  আর তার অগুন্তি সন্তানসন্ততি, দিন, ঘণ্টা, মিনিট, সেকেণ্ডকে মানতে তারা মনে হচ্ছিল বাধ্য। 

সত্যি বলতে, তারা সবাই যাযকদের অধিবেশনের দিনের মতন বিক্ষুব্ধ ছিল, কিংবা  মঁ-দ্য-পিয়েতের তেজারতি কারবারিদের মতন যখন রাষ্ট্রিয় উৎসবের দিন বিনামূল্যে উত্তরণপ্রাপ্তি ঘোষণা করা হয়, তেমন । আমার সন্দেহ হলো যে সময়ে-সময়ে ওনারা ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাচ্ছিলেন ঠিক যেমন মানুষ-বিচারকরা করেন যাঁরা, সকাল থেকে ঠায় চেয়ারে বসে, রাতের ভোজের , পরিবারের কথা, আর তাঁদের প্রিয় চটির ব্যাপারে দিবাস্বপ্ন দেখেন । সেকারণে যদি অতিবাস্তব বিচারের জন্য একটু ব্যস্ততা আর এলোমেলোভাব ঘটে, তাহলে অবাক হওয়া উচিত নয় যে একই ব্যাপার ঘটে থাকে মানুষের বিচারব্যবস্হাতেও । আমরা যদি অবাক হই তাহলে আমরা নিজেরাই অন্যায্য বিচারক হয়ে যাবো ।

সুতরাং, সেদিন কয়েকটা সাঙ্ঘাতিক ভুল হয়েছিল যা মনে হতে পারে অদ্ভুত, যদি খামখেয়াল নয়, বিচক্ষণতা হয় পরীদের নির্দিষ্ট, শাশ্বত চারিত্র্য ।

আর তাই চুম্বকের মতন বৈভব আকর্ষণের ক্ষমতা পুরস্কার হিসাবে দেয়া হলো একটি ঐশ্বর্যশালী পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারীকে, যার না ছিল পরার্থবাদীতার বোধ বা না ছিল দেখিয়ে বেড়াবার জিনিসপত্র সম্পর্কে আগ্রহ, যার ফলে  কোটি কোটি অর্থের ভারে অস্বাভাবিকভাবে বিব্রত তারা  শেষ পর্যন্ত সর্বনাশ ঘটিয়েছিল নিজেদের ।

আর তাই সৌন্দর্য্য এবং কাব্যিক ক্ষমতার প্রতি প্রেম দেয়া হয়েছিল কৌতূকরসবোধহীন এক বুড়ো ইতর দুর্বৃত্ত, পাথরভাঙা মজুরের ছেলেকে, যে নিজের কারিগরি শেখাতে পারেনি ছেলেকে, বা তার নিন্দনীয় সন্তানের সমস্যা লাঘব করতে পারেনি ।

বলতে ভুলে গিয়েছিলুম যে এই পবিত্র দিনগুলোয় বিতরণের প্রক্রিয়া পুনর্বিচারযোগ্য নয়, আর কোনও উপহার প্রত্যাখ্যান করা যায় না ।

পরীরা সকলে উঠে দাঁড়ালো, এই মনে করে যে তাদের উঞ্ছবৃত্তি শেষ হয়েছে ; কেননা কোনো উপহার আর বাঁচেনি, দেবার মতন আর খুদকুঁড়ো ছিল না যা মানুষের ভিড়ে ছুঁড়ে দেয়া যায়, তখন একজন সাহসী লোক — একজন ছোটোখাটো গরিব ব্যবসাদার, দেখে তাই মনে হলো— উঠে দাঁড়ালো আর নিজের কাছের পরীর বহুরঙা বাষ্পময় পোশাক আঁকড়ে, চেঁচিয়ে উঠলো:

“ওহ, ঠাকরুন ! আপনারা আমাদের ভুলে যাচ্ছেন ! আমার ছেলেও রয়েছে ! কিচ্ছু পাবো না বলে আমি এতোদূর আসিনি !”

পরীটি হয়তো সত্যিই বিব্রত হয়ে থাকবে, কেননা আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। কিন্তু তখনই পরীটির একটা সর্বজনবদিত নিয়মের কথা মনে পড়লো যা সচরাচর প্রয়োগ করা হয়না অতিবাস্তব জগতে বসবাসকারী অননুভবনীয় প্রতিমাদের দ্বারা, মানবসমাজের বন্ধু এবং মানুষের আবেগের সঙ্গে খাপ খাওয়াবার জন্য যাদের অনেক সময়ে বাধ্য করা হয়, যেমন পরীরা, যক্ষ-যক্ষিনী, উভচর প্রাণীরা, তন্বীদেবীরা, কৃশকায়াদেবীরা, জলের ভুতেরা, সন্তানবতী মানবাত্মারা আর বনকুমারীরা — আমি বলতে চাইছি সেই আইনের কথা যা পরীদের, এইরকম ক্ষেত্রে, এমন ঘটনায়, যখন উপহারসামগ্রী ফুরিয়ে গেছে, দেবার মতো ক্ষমতা আর নেই, সম্পূরক হোক বা ব্যতিক্রম, পরীটির যথেষ্ট কল্পনাশক্তি ছিল যে তৎক্ষণাত কিছু তৈরি করে ফেলতে পারে ।

অতএব, ভালো পরীটি বলল, তার পদমর্যাদার আত্মনিয়ন্ত্রণ খেয়াল রেখে : “আমি তোমার ছেলেকে দিচ্ছি…আমি তাকে দিচ্ছি…খুশি করার ক্ষমতা !” কিন্তু ছোটোখাটো দোকানদার, যে সাধারণের মতন চিন্তাকারীদের একজন, নিজের মনকে অসম্ভাব্যতার যুক্তিতে উন্নীত করার প্রতিভা যার নেই,  এঁড়ে জেদ করে  জানতে চাইলো, “কিন্তু কেমন করে খুশি করবে ? খুশি…? কেনই বা খুশি ?”

“কেননা ! কেননা !’ বলল ক্রুদ্ধ পরীটি, লোকটির দিকে পেছন ফিরে ; আর নিজের সহকর্মীদের মিছিলে আবার যোগ দিয়ে, পরীটি সঙ্গীদের বলল, “এই আত্মাভিমানী ছোট্ট ফরাসি লোকটার সম্পর্কে কী ভাবো তোমরা, যে সবকিছু বুঝে ফেলতে চায়, আর যে, নিজের ছেলের জন্যে সবচেয়ে ভালো ভাগ্য উপহার পেয়েছে, যা জিগ্যেস করা যায় না তাইই জিগ্যেস করার সাহস দেখাচ্ছে, আর যা নিয়ে তর্ক করা যায় না তাই নিয়ে তর্ক করছে ?”

একুশ

প্রলুব্ধিগুলো : অথবা যৌনতা, ঐশ্বর্য, এবং খ্যাতি

দুজন জাঁকজমকপূর্ণ শয়তান আর প্রেতিনী, কম অসাধারণ নয়, গত রাতে সেই রহস্যময় সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল যে পথে নরক ঘুমন্ত দুর্বল মানুষকে আক্রমণ করে, আর তার সঙ্গে গোপন বার্তালাপ করে । আর তারা আমার সামনে এসে দ্যূতিসহ জাহির দাঁড়ালো, মঞ্চের অভিনেতাদের মতন ঋজু । আর যখন তারা রাতের অস্পষ্ট গভীরতা থেকে নিজেদের আলাদা করে এগিয়ে এলো, এই তিন ব্যক্তিত্ব থেকে গন্ধকের অত্যুজ্বল দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ছিল । তাদের দেখে এতো গর্বোদ্ধত আর এতো বেশি কর্তৃত্বময় লাগছিল যে প্রথমে আমি ভেবেছিলুম তারা সত্যকার দেবতা।

প্রথম শয়তানের মুখ ছিল দ্ব্যর্থক, আর তার দেহের কোমল রেখা আর চেহারা মনে হচ্ছিল প্রাচীনকালের গ্রিকদের আসবদেবতার মতন । তার সুন্দর, ধীরুজ চোখ, ছায়াময়, অবর্ণনীয় রঙসহ, যেন ঝড়ের দেয়া অশ্রুফোঁটায় ভেজা ভায়োলেট ফুল, আর তার দু-ফাঁক করা ঠোঁট যেন তপ্ত ধুনুচির মতন, আতর বিক্রির দোকান থেকে সুগন্ধের শ্বাস ফেলছে ; আর যখনই সে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে, তার অগ্নিময় নিঃশ্বাস থেকে যেন কস্তুরী-সুবাসের কীটেরা উদ্ভাসিত হচ্ছে আর স্পন্দিত হচ্ছে । 

তার বেগুনি রঙের জামায় এক উজ্বল সাপ বেল্টের মতন করে জড়ানো ছিল, আর মাথা তুলে তার দিকে অগ্নিময় অলস চোখে তাকিয়ে ছিল । এই জীবন্ত বেল্ট থেকে ঝুলছিল, ভয়ানক শিশির ফাঁকে ফাঁকে, চকচকে ছুরি আর শল্যচিকিৎসার অস্ত্রপাতি । তার ডানহাতে সে ধরেছিল আরেকটা শিশি যাতে ছিল লাল উজ্বল বস্তু, লেবেলে এই উদ্ভট কথা লেখা : “পান করো, এ হলো আমার রক্ত, উৎকৃষ্ট বলদায়ক” ; বাঁ হাতে ছিল একটা বেহালা যা স্পষ্টত তাকে সাহায্য করছিল নিজের আনন্দের আর নিজের দুঃখের গান গাইতে, আর কর্মবিরতির জন্য শাস্ত্রনির্দিষ্ট রাতে উন্মাদনার ছোঁয়াচে রোগ ছড়িয়ে দিতে ।

তার কমনীয় গোড়ালিতে পরা ছিল সোনার ভাঙা শেকল, আর তার দরুণ যে অস্বাচ্ছন্দ্য তাকে বাধ্য করছিল মাটির দিকে চোখ নামাতে, সে আত্মশ্লাঘায় মুগ্ধ হয়ে নিজের বুড়ো আঙুলের নখ দেখছিল , তা ছিল পালিশ করা মণিরত্নের মতন, 

তার সান্ত্বনাতীত বেদনাময় চোখ, প্রতারণাপূর্ণ  মাদকতায় চুর, সে মেলে ধরল আমার দিকে, আর সে আমাকে সঙ্গীতময় কন্ঠে বলল, “তুমি যদি চাও, তুমি যদি চাও, আমি তোমাকে আত্মাদের প্রভূ করে দেবো, আর তুমি জীবন্ত বস্তুর শিক্ষক হয়ে উঠবে, কাদার ভাস্করের চেয়ে বড়ো ; আর তুমি সুখানুভবের সঙ্গে পরিচিত হবে, যা শেষহীণভাবে নবায়িত হবে, তুমি নিজের কাছ থেকে মুক্তি পাবে আর অন্যদের মাঝে নিজেকে ভুলে যাবে, আর অন্যদের তাদের আত্মা থেকে টেনে বের করতে পারবে, এমন এক অবস্হায় থাকবে যেখানে তুমি তাদের থেকে নিজেকে আলাদা মনে করতে পারবে না।”

আর আমি জবাবে বললুম, “অনেক ধন্যবাদ !  অন্যের জঞ্জাল নিয়ে আমার কিছুই করার নেই, যাদের হয়তো, আমার চেয়ে বেশি মূল্য নেই । আর যখন কিনা আমার রয়েছে বহু লজ্জাজনক স্মৃতি, আমি কিছুই ভুলতে চাই না ; আর আমি যদি আগে থাকতে তোমাকে নাও চিনতুম, পুরোনো দানব কোথাকার, তোমার রহস্যময় ছুরি-চামচ, তোমার সন্দেহজনক শিশিগুলো, যে শেকল তোমার পা বেঁধে রেখেছে সেগুলো সবই এমন প্রতীক যা স্পষ্টভাবে তোমার বন্ধু হওয়ার বিড়ম্বনা ব্যাখ্যা করে । তোমার উপহার তোমার নিজের কাছেই রাখো।”

দ্বিতীয় শয়তানের তেমন বিয়োগান্তক হাসিমুখের হাবভাব ছিল না, তেমন সূক্ষ্ম, পরোক্ষ ইঙ্গিতপূর্ণ  আচরণও নয়, তেমন মোলায়েম আর সুগন্ধিত সৌন্দর্যও ছিল না । লোকটা ছিল পেল্লাই, চোখহীন মস্তবড়ো মুখ, ফোলা ভুঁড়ি ঝুলে পড়েছে উরু পর্যন্ত, আর তার গায়ের চামড়া ছিল সোনালী ও ছবি আঁকা, যেন উলকি দেগে দেয়া হয়েছে, তাতে প্রতিনিধিত্ব করছিল দুঃখদুর্দশার সর্বাত্মক আঙ্গিকে খুদে-খুদে বিচরণশীল প্রাণী । সেখানে ছিল ছোট্ট রোগা মানুষ যারা স্বেচ্ছায় পেরেক থেকে ঝুলছে ; ছিল ছোট্ট, টিঙটিঙে , বিকলাঙ্গ পাতালপ্রেত যাদের মিনতিভরা চোখ তাদের কাঁপতে-থাকা হাতের তুলনায় সার্থকভাবে ভিক্ষা চাইছিল ; আর তারপর তাতে ছিল বুড়ি মায়ের দল যারা নিজেদের চোপসানো বুকে আঁকড়ে রেখেছিল রুগ্ন শিশুদের । আর ছিল অনেক কিছু।

মোটা শয়তান নিজের পেল্লাই ভুঁড়িতে ঘুষি ঠুকলো, যার ফলে শোনা গেল দীর্ঘক্ষণ, ঠুঙঠাঙ, ধাতব আওয়াজ, যা শেষ হলো বহু মানুষের কন্ঠে অস্পষ্ট গোঙানিতে । আর ও হেসে উঠলো, অশ্লীল কায়দায় নিজের ভাঙা দাঁত দেখিয়ে, সে এক চওড়া জড়বুদ্ধি হাসি,  যেমন বহু দেশে দেখা যায়, বেশি খাবার-দাবার খেয়ে কিছু লোক অমন করে থাকে ।

আর ও আমাকে বলল, “আমি তোমাকে এমনকিছু দিতে পারি যার দরুণ তুমি সবকিছু পাবে, যা সবকিছুর দাম মেটাবে, যা প্রতিটি জিনিসকে বদলে দিতে পারবে !” আর সে নিজের দানবিক পেটে ঘুষি ঠুকলো, যার নাকিসুর  প্রতিধ্বনি তার কর্কশ কথাগুলো সম্পর্কে মন্তব্যের মতন শোনালো ।

আমি বিরক্তিতে পেছন ফিরলুম, আর জবাবে বললুম : “আমার আনন্দের জন্যে, আমি অন্যের দুঃখদুর্দশা, চাই না ; আর ওয়ালপেপারের মতন তোমার চামড়ায় আঁকা পাপগুলো, নোংরা মাখানো কোনো ঐশ্বর্য, চাই না ।”

যদি প্রেতিনীর কথা বলি, অস্বীকার করা মিথ্যা হবে, যদি বলি যে তার মধ্যে প্রথমে  অদ্ভুত একটা মনোহারিত্ব আমি পাইনি । এই মনোহারিত্বকে যে একটি মাত্র কথায় বলতে পারি তা হলো সেই সব সুন্দরী রমণীরা, যাদের সৌন্দর্য ঝরে গেছে, কিন্তু তবু যারা বুড়ি হয়নি, যাদের সৌন্দর্য ধ্বংসের তীব্র কৌতূহলের ইন্দ্রজাল ধরে রাখে । প্রেতিনী ছিল একই সঙ্গে উদ্ধত এবং জবুথবু, আর তার চোখদুটো, মেলে-মেলে ক্লান্ত,  তা সত্তেও  মোহিনীশক্তি বজায় রেখেছিল । 

যা আমার সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় মনে হলো তা হলো প্রেতিনীর কন্ঠস্বরের রহস্য, যাতে আমি পেলুম স্তিমিত সুরের মাধুর্যের প্রতিধ্বনি, সেই সঙ্গে বহুক্ষণ ব্র্যাণ্ডি পান করার ফলে গলায় যে খসখসে ভাব থাকে, তাই ।

“তুমি তোমার ক্ষমতা জানতে চাও ?” মেকি ঈশ্বরী বলল তার মনোমুগ্ধকর, স্ববিরোধী কন্ঠস্বরে।

“শোনো ।”

আর প্রেতিনী তার ঠোঁটে একটা বিরাট আড়বাঁশি ঠেকালো, যা থেকে ঝুলছিল একাধিক ফিতে, খেলনার বাঁশির মতন, যার ওপরে ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত সংবাদপত্রের নাম লেখা ছিল, আর নিজের আড়বাঁশি বাজিয়ে প্রেতিনী আমার নাম ঘোষণা করল, যা শতহাজার বজ্রধ্বনির ক্ষমতায় ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র পরিসরে, আর সবচেয়ে দূর থেকে আসা উপগ্রহের প্রতিধবনির মতন  ফিরে এলো আমার কাছে ।

“প্রেতিনী !” আমি বললুম, অর্ধেক পরাভূত, “জিনিসটা দামি বটে !”

কিন্তু ফোসলানো বাঁশিটা খুঁটিয়ে লক্ষ করে, আমার একটা অস্পষ্ট অনুভব হলো যে আমি একে চিনি, আমার জানাশোনা কয়েকজন মূর্খের সাথে কোথাও একে মদ খেতে দেখেছি ; আর আমার কানে ওর কাঁসার কর্কশ আওয়াজ আবছাভাবে মনে করিয়ে দিল এক বারবনিতাসূলভ আড়বাঁশির ।

তাই আমি বললুম, অত্যন্ত তাচ্ছল্যে, “এখান থেকে কেটে পড়ো !  নাম বলতে চাই না এমন লোকেদের রক্ষিতাকে বিয়ে করার জন্যে আমি জন্মাইনি।”

নিঃসন্দেহে আমার সাহসী প্রত্যাখানের জন্যে আমার গর্ববোধ করার অধিকার ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমি জেগে উঠলুম, আর আমার সমস্ত শক্তি আমায় ছেড়ে চলে গেলো। “সত্যি”, আমি নিজেকে বললুম, “এই ধরণের শুদ্ধ বিবেক প্রদর্শন করার সময়ে আমি নিশ্চয়ই গভীর নিদ্রায় ছিলুম । আহ, যখন জেগে ছিলুম তখন যদি ওরা আসতো, তাহলে আমি অতো ভদ্রতা করতুম না!”

আর আমি যতো জোরে পারা যায় চিৎকার করে ওদের বললুম, আমাকে ক্ষমা করে দিতে, তাদের অনুগ্রহ পাবার জন্যে আমি আত্মঅপমানিত হতে রাজি হলুম ; কিন্তু আমি তো ওদের বেশ অপমান করেছি, তাই ওরা আর কখনও ফেরেনি ।

বাইশ

গোধূলীসন্ধ্যা

দিন ফুরিয়ে আসে । সারা দিনের খাটুনির দরুণ ক্লান্ত আত্মাগুলোর অন্তরে এক বিশাল শান্তিময়তা সৃষ্টি হয় । আর এই সময়ে তাদের চিন্তায় ফুটে ওঠে গোধুলীর অভিমানী, অনিশ্চিত রঙ।

কিন্তু পাহাড়ের চূড়া থেকে, এক অত্যুচ্চ আর্তনাদ আমার বারান্দায় পৌঁছোয়, রাতের উঁচু পাতলা মেঘের ভেতর দিয়ে, দূরত্বের সঙ্গে মিশ-খাওয়া বিসদৃশ কান্নায় তালগোল-পাকানো বিষণ্ণ ঐকতান, ঠিক যেমন ফুঁসে-ওঠা জোয়ার কিংবা জেগে-ওঠা ঝড়ে ঘটে ।

সেই অভাগারা কারা যারা সন্ধ্যার দ্বারা শান্ত হয় না আর যারা, পেঁচার মতন, এসে-পড়া রাতকে মনে করে অপবিত্র ডাইনির শাস্ত্রসন্মত ছুটির সংকেত ? এই অমঙ্গলের লক্ষণপূর্ণ উলুধ্বনি আমাদের কাছে আসছে পাহাড়ের ওপরের কালো আতুরাশ্রম থেকে ; আর সন্ধ্যাবেলা — নেশা ফোঁকার সময়ে বিশাল নীরব সমতলভূমির কথা গভীরভাবে বিবেচনা করি, যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে অনেক বাড়ি যার প্রতিটি জানালায় লেখা, “এখন এখানে শান্তি বিরাজ করছে ; এখানে এখন পারিবারিক আনন্দ !” — যখন ওখান থেকে বাতাস বয়ে আসে, আমি আমার চমকে-ওঠা চিন্তাগুলো নরকের ঐকতানের ওই অনুকরণের মাঝে খেলাতে পারি । গোধুলী পাগলদের উত্তেজিত করে। —  মনে পড়ছে আমার দুজন বন্ধু ছিল যারা গোধুলীর কারণে অসুস্হ হয়ে পড়েছিল । একজন, সেই সময়ে, প্রথমে যে তার কাছে পৌঁছোত, বন্ধুত্বের আচরণ আর বিনয়কে ভুল বুঝে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করত । আমি ওকে দেখেছিলুম প্রধান সেবকের দিকে ভালোভাবে রাঁধা মুর্গির মাংস ছুঁড়ে দিতে, ও মনে করেছিল তাতে বুঝি কে জানে কোন অপমানজনক সংকেতলিপিতে লেখা বার্তা আছে । সন্ধ্যায়, সবচেয়ে স্বাদু খানাপিনার প্রথম পাত হেয় করার পর, ওর জন্য নষ্ট হয়ে যেত যাবতীয় রসালো খাদ্যবস্তুগুলো ।

আরেকজন, নিজের উচ্চাকাঙ্খায় আহত, সূর্যাস্ত আরম্ভ হতেই ক্রমশ আরও তিক্ত, আরও বিষণ্ণ, আরও অসন্তুষ্ট হয়ে উঠতো । দিনের বেলায় প্রশ্রয়দানকারী আর বন্ধু, সন্ধ্যায় হয়ে উঠতো নির্দয়, আর তা কেবল অন্যদের ক্ষেত্রেই নয়, গোধূলীর পাগলামি সে নিজের ওপরেও বাঁধনছাড়া ক্রোধে প্রয়োগ করত ।

প্রথমজন পাগল হয়ে মারা গেল, নিজের স্ত্রী আর বাচ্চাকেও চিনতে পারত না ; দ্বিতীয়জন নিজের অন্তরে অবিরাম অসুস্হতার উদ্বেগ বয়ে বেড়ায়, আর আমি বিশ্বাস করি যে রাষ্ট্র আর রাজপুত্ররা তাকে সন্মান জানিয়ে সন্তুষ্ট করতে চাইলেও, গোধুলী তার ভেতরে তবুও কাল্পনিক স্বাতন্ত্রের লোভের আগুন জ্বালিয়ে দিতো । রাত্রি, যা তাদের আত্মায় অন্ধকার পুঁতে দেয়, আমার ক্ষেত্রে আলো আনে ; আর যদিও একই ব্যাপারের দুটি ভিন্ন পরিণতি বিরল নয়, তবু ব্যাপারটা আমাকে একই সঙ্গে বিহ্বল ও সতর্ক করেছে ।

হে রাত্রি, হে তরতাজা করে তোলা ছায়াগণ ! আমার জন্যে তুমি অন্তরের পবিত্র দিনের সংকেত, তুমি মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তিদানকারী ! সমতলভূমির একাকীত্বে, গলিঘুঁজির পাথুরে রাজধানী শহরগুলোয়, তুমি, ঝিলমিলে নক্ষত্রের আর রাস্তার লন্ঠনের ঝরে পড়া আলোয়, স্বাধীনতা-দেবীর আতশবাজি !

গোধূলী, তুমি কতো মিষ্টি আর কোমল ! দিগন্তে এখনও ছড়িয়ে পড়তে থাকা গোলাপি রশ্মি, রাতের বিজয়ী অত্যাচারের চাপে দিনের মৃত্যু-সংঘর্ষের মতন, সূর্যাস্তের শেষ গৌরবের ওপারে ঘন লাল দাগ তৈরি করে দেয় ঝাড়বাতির উজ্বল আলো, পূর্বদিকের নিগূঢ়তা জুড়ে এক অদৃশ্য হাত টাঙিয়ে দেয় ঠাসবুনান কাপড়ের ঝালর — জীবনের ম্লান সময়ে একজন মানুষের হৃদয়ে যুদ্ধরত এগুলো হলো জটিল অনুভূতির অনুকরণ ।

কিংবা, পূনর্বার, নর্তকীরা যেমন অদ্ভুত পোশাক পরেন, যার মলিন স্বচ্ছ কাপড়ের তলায় দেখা যায় একদা বিস্ময়কর স্কার্টের ফিকে হয়ে আসা সৌন্দর্য, তেমনভাবেই বর্তমানের কালোকে  স্বাদু অতীত ভেদ করে ; আর দোদুল্যমান, ছড়িয়ে-পড়া সোনা-রুপোর নক্ষত্ররা কল্পনার সেই শিখাগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে, যা কেবল রাতের গভীর শোকে সুস্পষ্টভাবে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে । 

তেইশ

একাকীত্ব

এক উদার-হৃদয় সাংবাদিক আমাকে বলল যে মানুষের জন্য একাকীত্ব খুব খারাপ ; আর নিজের গবেষণার সমর্থনে ও উদাহরণ দিল, অবিশ্বাসীরা যেমন সদাসর্বদা দিয়ে থাকে, গির্জার যাযকদের উপদেশগুলোও তাই ।

আমি জানি শয়তান সব সময় জনবসতিহীন অঞ্চল পছন্দ করে, আর হত্যা করার উৎসা্হ ও লালসা আশ্চর্যভাবে নিঃসঙ্গ স্হানে প্রতিপালিত হয় । কিন্তু হতে পারে যে এই নিঃসঙ্গ জায়গাগুলো কেবল অলস, নিরানন্দ লোকেদের জন্যই বিপজ্জনক, যারা জায়গাটাকে নিজের আবেগ আর ছায়ামূর্তি দিয়ে ভরে রাখে ।

এটা নিশ্চিত যে একজন বারফট্টাই-হাঁকিয়ে, যার মহানন্দ হলো একটা বেদি বা বেঞ্চের ওপরে দাঁড়িয়ে নিজের মতামতকে অভ্রান্ত ঘোষণা করা, তার পাগল হয়ে গিয়ে চীৎকার চেঁচামেচির ভয়ঙ্কর বিপদ রয়েছে যদি সে রবিনসন ক্রুসোর দ্বীপে থাকে । আমি সাংবাদিককে রবিনসন ক্রুসোর সাহসী সততার কথা জিগ্যেস করিনি, কিন্তু আমি ওকে অনুরোধ করেছিলুম যেন সেইসব লোকেদের বিরুদ্ধে নালিশ না করে যারা একাকীত্ব আর রহস্য ভালোবাসে।

আমাদের বকবককারী জাতিতে কিছু লোক আছে, যদি তাদের ফাঁসির মঞ্চের উচ্চতায়  দাঁড়িয়ে  শব্দবহুল বাগাড়ম্বরের অনুমতি দেয়া হয়, তাহলে তারা ফরাসি বিপ্লবের  গিলোটিনের সময়ে বক্তৃতা থামাবার জন্য বাজানো দামামাকে পরোয়া না করেই,  মৃত্যুদণ্ডকেও সামান্য অনিচ্ছাভরে মেনে নেবে ।

তাদের সম্পর্কে আমার নালিশ নেই, কেননা আমি বুঝতে পারি যে অন্যেরা যেমন নিজেদের নৈঃশব্দ আর ধ্যানে আনন্দ পান, তারাও তেমনি তাদের বক্তৃতার নির্গমন থেকে আনন্দ পায় ; কিন্তু আমি তাদের ঘৃণা করি ।

তাছাড়া, আমি চাইবো যে আমার অভিশপ্ত সাংবাদিক আমাকে আমার মতো করে খেয়ালখুশিতে থাকতে দেবে । “তাহলে, তুমি অনুভব করো না,” ও আমাকে জিগ্যেস করেছিল, যাযকীয় নাকিসুরে, “যে তোমার আনন্দ অন্যের সঙ্গে বাঁটোয়ারা করার প্রয়োজন আছে ?” দ্যাখো এই কৌশলী হিংসুটেকে ! ও জানে যে ওর সুখভোগের ধরণকে আমি অবজ্ঞা করি, তাই ও বিদকুটে রসভঙ্গ করার জন্য আমার মতামত সম্পর্কে ইঙ্গিত দেবার চেষ্টা করছে !

“একা না থাকতে পারার এই অতিঅমঙ্গল হলো…” লা ব্রুয়েরে কোথাও লিখেছেন, নিজেকে ভুলে থাকার জন্য ভিড়ের মধ্যে ঢুকে  লোকগুলোকে অপমান করার জন্য দৌড়ে কোথাও পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করা, এই ভয়ে যে সে একা থাকলে নিজেকে সহ্য করতে পারবে না । 

“আমাদের প্রায় সমস্ত অমঙ্গলের উৎসসূত্র হল নিজের ঘরে না থাকতে পারা,” বলেছেন আরেকজন জ্ঞানী, পাসকাল, আমার বিশ্বাস, এইভাবে নিজের অন্তরজগতের ধ্যানশীলতার কুঠুরীতে সেই সমস্ত উন্মাদ মানুষদের ডাক দেয়ার চেষ্টা করেন যাঁরা নিজেদের আনন্দ এমন কাজকর্মে আর এমন প্রাণীর বেশ্যাবৃত্তিতে খোঁজেন যাকে আমি বলব ভ্রাতৃবৎ, যদি আমার শতকের সুন্দর ভাষায় তা বলতে হয় ।

চব্বিশ

পরিকল্পনা

ও নিজেকে বলল, একা একটা বাগানে বেড়াবার সময়ে : “রাজ দরবারের জটিল সূক্ষ্ম কারুকাজ করা পোশাকে মেয়েটিকে কতো সুন্দর দেখাবে, সুন্দর সান্ধ্য বাতাসে, রাজবাড়ির শ্বেত পাথরের সিঁড়ি দিয়ে নেমে, বিশাল বাগান আর ঝিলগুলোর দিকে যদি ও তাকায় ! কেননা ওর তো রাজকন্যা হবার স্বাভাবিক আভিজাত্য রয়েছে।”

পরে রাস্তায় হাঁটার সময়ে, ও একটা ছাপার দোকানের সামনে দাঁড়ালো, আর একটা দেয়ালে ক্রান্তিবৃত্তের দেশের উপত্যকার ছবি দেখে, নিজেকে বলল : “নাহ ! রাজপ্রাসাদ তেমন জায়গা নয় যেখানে আমি ওর মিষ্টি জীবনকে অধিগ্রহণ করব ! সেখানে আমরা ঘর বাঁধতে পারব না । আর সোনার ছিটে দেয়া দেয়ালগুলোতে ওর ছবি ঝোলাবার মতন জায়গা থাকবে না ; জাঁকালো দরদালানগুলোতে নিরালা অন্তরঙ্গতার নিভৃতি থাকে না । নিঃসন্দেহে, এইটিই সেই জায়গা যেখানে আমার জীবনের স্বপ্নের চর্চা করতে হবে ।”

আর, ছাপা ছবিটি খুঁটিয়ে বিস্তারিত দেখার সময়ে, ও নিজেকে আবার বলল, “সমুদ্রের ধারে, এক সুন্দর কাঠের ঘরে, অদ্ভুত আলোকময় গাছে ঘেরা, যাদের নাম আমি ভুলে গেছি….হাওয়ায়, সেই মাদক, ব্যাখ্যাহীন সুবাস…ঘরের ভেতরে, এক তীব্র সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়বে, কস্তুরীর…আরও দূরে, আমাদের ছোট্ট এলাকার পেছনে, সাগরের ঢেউয়ে দুলতে-থাকা মাস্তুলের শীর্ষ…আমাদের চারিদিকে, খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে গোলাপি আলোয় আলোকিত আমাদের ঘর ছাড়িয়ে, বোনা শীতল চাটাই আর সংবেদনী ফুলে সাজানো, ঘন কালো বিরল পোর্তুগিজ রোকোকো চেয়ার ( যার ওপরে ও এলিয়ে বসবে, হাওয়ায়, আফিমদেয়া তামাকের ধোঁয়া উড়িয়ে ), আর তার ওইদিকে, বারান্দায়, রাতের আলোয় মাতাল পাখিদের কুজন, আর ছোটোখাটো আফরিকি মেয়েদের গল্পগুজব…আর রাতের বেলায়, আমার স্বপ্নকে সঙ্গদানের জন্য, সঙ্গীতময় গাছেদের সবিলাপ গান, সবিষাদ ক্যাসুরিনা গাছ । হ্যাঁ, সত্যি, এই ধরনের দৃশ্যপটই আমি চেয়েছি । কেনই বা আমি রাজপ্রাসাদ সম্পর্কে মাথা ঘামাবো ?”

আর পরে, তরুশ্রেণীর মাঝখানের পথ দিয়ে যখন সে হাঁটছিল, সে একটা ছোটো পরিষ্কার রেস্তরাঁ দেখতে পেলো, সুতির পর্দায় আলোকিত জানালার ভেতরে, দুটি হাসিমুখ দেখতে পেলো। আর সহসা : “আমার মন”, ও নিজেকে বলল, “নিশ্চয়ই একটা সত্যিকার ভবঘুরে যে অনেক দূরে যা খুঁজতে যায় তা এতো কাছে রয়েছে ।  যে প্রথম রেস্তরাঁ আমার চোখে পড়ল, তাতেই রয়েছে আহ্লাদ আর খুশি, ভাগ্যক্রমের রেস্তরাঁ, উপভোগের জিনিসে ঠাশা । তাপ পোয়াবার আগুন, রঙিন থালা, চালু রাত্রিভোজন, আমুদে মদ, আর বড়ো বিছানা তার সঙ্গে কম্বল যদিও লোমশ কিন্তু পরিচ্ছন্ন : এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে ?”

আর একা বাসায় ফেরার সময়ে, যখন পর্যন্ত বাইরের জীবনের জাঁকজমকে জ্ঞানের বার্তা দূরে মিলিয়ে যায়নি, ও নিজেকে বলল : “আজকে আমি কল্পনায় তিনটে বাড়ি পেয়েছিলুম, যার সবকটাতেই পেয়েছি সমান আনন্দ । কেনই বা আমার শরীরকে জায়গা বদলে বাধ্য করব, যখন আমার আত্মা অমন কর্মতৎপরতায় ভ্রমণে বেরোতে পারে ? আর কেনই বা আমার পরিকল্পনাকে রূপ দেবার জন্য মাথা ঘামাবো, যখন কিনা পরিকল্পনাটা নিজেই যথেষ্ট আনন্দের ?”

পঁচিশ

সুন্দরী ডরোথি

সূর্য তার তপ্ত, উল্লম্ব রোদে শহরটাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে ; বালি ঝকমক করছে আর সমুদ্রের ঢেউ কেঁপে উঠছে । হতচেতন জগত দুর্বল আত্মসমর্পণ করে  দুপুরঘুম আরম্ভ করেছে, এক ধরণের প্রিয় মৃত্যুর মতন এমন দুপুরঘুম যে নিদ্রায় ঘুমন্ত মানুষ, অর্ধেক জেগে, নিজের বিলয়নের পরমানন্দ উপভোগ করে ।

কিন্তু ডরোথি, সূর্যের মতনই তেজি আর গর্বিত, ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, ছড়িয়ে-পড়া নীলিমার বিস্তারের তলায় এই সময়ে একমাত্র জীবন্ত প্রাণী, রোদের আলোয় কালো ছায়া ফেলে হাঁটছে ।

মেয়েটা হালকা চালে এগোয়, চওড়া পাছার ওপরে তার একহারা চেহারা দুলতে থাকে । তার ফিকে গোলাপি রেশমের পোশাক তাকে জড়িয়ে ধরে থাকে, তার কালো ত্বকের রূঢ় বৈশাদৃশ্য হিসাবে, তার দীর্ঘ চেহারাকে নিখুঁতভাবে মুড়ে, তার পলকা পিঠ, তার বুক দুটো ছুঁচালো।

রোদ্দুরকে ছেঁকে নিচ্ছে তার লালরঙের ছোট্ট ছাতা, রক্তবর্ণ রুজের প্রলেপ দিচ্ছে তার কৃষ্ণকায় ত্বকে ।

তার প্রচুর চুলের ওজন, প্রায় নীল, তার সুন্দর মাথাকে পেছনদিকে হেলিয়ে রেখেছে, যা তাকে দিয়েছে বিজয়িনীর শ্রমবিমুখ ঔদ্ধত্য । তার ভারি কানের দুল চুপিচুপি  কানে-কানে প্রশংসা করছে।

থেকে-থেকে সাগরের বাতাস তার ভাসমান পোশাকের একটা কোন তুলে ধরছে, দেখা যাচ্ছে তার মসৃণ, অসাধারণ পা দুটি ; আর তার পায়ের পাতা, ইউরোপ মর্মপাথরের তৈরি যে ধরণের ঐশী দেবীদের জাদুঘরে বন্ধ করে রাখে, মিহি বালুকণার ওপরে অনুগত ছাপ ফেলছে । কারণ ডরোথি এমনই অস্বাভাবিক ছিনাল যে তার মুগ্ধ-প্রশংসার আনন্দকে অতিক্রম করে চলে যায় মুক্তি পাওবার গর্বের দিকে, আর সে স্বাধীন হলেও, পায়ে জুতো না পরেই হাঁটে ।

তাই মেয়েটি এগিয়ে যায়, সমন্বয়ে ডগমগ, বেঁচে থাকার আনন্দে, মুখের ঝকঝকে হাসি, যেন সে বহু দূরের কোনো আয়নায় তার চালচলন ও সৌন্দর্য প্রতিফলিত হতে দেখছে ।

এই সময়ে, যখন কুকুররাও রোদ্দুরের কামড়ের নীচে দুঃখে ঘেউঘেউ করে, কোন সে কর্মদ্যোগী উৎসাহ যা শ্রমবিমুখ ডরোথিকে এইভাবে পরিচালিত করছে, ব্রোঞ্জের মতন সুন্দর ও শীতল তরুণী ?

মেয়েটি কেন তার ছোট্ট ঘর ছেড়ে বেরিয়েছে, যত্ন করে সাজানো, যেখানে অত্যন্ত কম খরচে গোছাগোছা ফুল আর মাদুর গড়ে দিয়েছে নিখুঁত এক খাসকামরা ; সেখানে চুল আঁচড়ে, সিগার টেনে, পাখার বাতাস খেয়ে কিংবা পালকের পাখা-আয়নায় নিজেকে দেখে সে আনন্দিত হয়, যখন সমুদ্র, একশো পা দূরে তীরভূমিতে আছড়ে পড়ে, মেয়েটির অস্পষ্ট কল্পনার সঙ্গে সশব্দ তাল মিলিয়ে, আর যখন লোহার পাত্র, যাতে মেয়েটি কাঁকড়া, ভাত, আর জাফরান ভাপে সেদ্ধ করেছে, দালানের পেছন থেকে উদ্দীপক সুবাস ভাসিয়ে দেয় ?

হয়তো মেয়েটি কোনো যুবক অফিসারের সঙ্গে সাক্ষাতের পরিকল্পনা করেছে, যে, বহু দূরের সমুদ্রতীরে, তার বন্ধুদের থেকে শুনেছে ডরোথির প্রসিদ্ধি । অবশ্যই, মেয়েটি যুবকটিকে মিনতি করবে, বেচারা, অপেরার নাচের বর্ণনা করতে, আর মেয়েটি তাকে জিগ্যেস করবে সেখানে কেউ খালি পায়ে যেতে পারে কিনা, যেমন রবিবারের নাচগুলোয় বুড়ি কাফ্রিরাও মাতাল হয়ে নিজের আনন্দে নাচতে পারে ; আর তারপর, জিগ্যেস করবে প্যারিসের সুন্দরীরা তার চেয়েও সুন্দরী কিনা ।

ডরোথিকে সকলেই প্রশংসা আর স্নেহ করে, আর সে খুবই আনন্দ পাবে যদি তাকে তার এগারো বছরের বোনকে, যে এখনই গায়েগতরে তৈরি আর সুন্দরী, তাকে ফেরত কিনে নেবার জন্য প্রতিটি পয়সা বাঁচাতে না হয় ! ও নিঃসন্দেহে সফল হবে, সুকন্যা ডরোথি ; বোনের মালিকটা এতো লোভী, এতো বেশি লোভী যে টাকাকড়ি বোঝে কিন্তু সৌন্দর্য বোঝে না !

ছাব্বিশ

গরিবের চোখ

আহ, তুমি জানতে চাও কেন আজ আমি তোমায় অপছন্দ করছি। আমার ব্যাখ্যা করার তুলনায়, নিঃসন্দেহে, তোমার পক্ষে তা বোঝা কঠিন হবে ; পৃথিবীর মাটিতে নারীর অভেদ্যতার সুন্দরতম উদাহরণে আমি বিশ্বাস করি । 

আমরা দুজনে সারাটা দিন একসঙ্গে কাটিয়েছি, যা আমার বেশ ছোটোই মনে হয়েছে। আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলুম যে পরস্পরের ভাবনাচিন্তাকে সেদিন বিনিময় করব, আর আমাদের দুটি আত্মা এক হয়ে যাবে — এমন স্বপ্ন যাতে কোনো মৌলিকতা ছিল না, যাই হোক, কথা হলো যে সবাই এই স্বপ্ন দেখে থাকলেও, কেউই এ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত করতে পারেনি ।

সেই সন্ধ্যায়, যৎসামান্য ক্লান্ত, নতুন তরুবীথির সদ্য প্রতিষ্ঠিত রেস্তরাঁর সামনে তুমি বসতে চেয়েছিলে, তখনও পর্যন্ত ভাঙাচোরা ইঁটপাথরের মাঝে, কিন্তু বেশ জাঁকজমক করে তাদের অসমাপ্ত জিনিসগুলো তারা সাজিয়েছে । রেস্তরাঁটা ছিল আলো ঝলমলে । গ্যাসবাতিটা নিজেই যেন প্রথম দিনের উত্তেজনাকে অনুভব করছিল, আর নিজের সম্পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করে দেয়ালগুলোকে চোখধাঁধানো আলোয় শ্বেতশুভ্র করে তুলেছিল, ঝকমকে আয়নার সারি, সোনালি কার্নিস আর সাজানো কারুকৃতি, বকলেস বাঁধা কুকুরেরা টান মারছে গালফোলা ছোকরা-বেয়ারাদের, হাতের ওপরে বাজপাখি রেখে হাসছেন মহিলারা, পরীরা আর দেবীপ্রতিমারা মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছে ফলের টুকরি, মাংসপোরা রুটি আর খাবার পাখি, গ্রিক চাকরানি হিবসের দল  আর চাকর গ্যানিমিডের দল নিজেদের হাতে ধরে আছে ফেনিল মুসেকেক  কিংবা বহুরঙা লম্বাটে আইসক্রিম: যাবতীয় ইতিহাস আর যাবতীয় পুরাণকাহিনি নামিয়ে আনা হয়েছে কোটনাগিরি আর খানাপিনার স্তরে।

আমাদের ঠিক সামনে পথের কিনারায়, যেন সেখানে পুঁতে রাখা হয়েছে, চল্লিশ বছর বয়সী এক সজ্জন দাঁড়িয়েছিলেন, মুখময় ক্লান্তি আর শাদা দাড়ি, এক হাতে একটা বাচ্চা ছেলেকে ধরে আর অন্য হাতে কোলে ধরা আরেকটা বাচ্চা, তখন পর্যন্ত যার হাঁটার বয়স হয়নি । লোকটা আয়ার ভূমিকা পালন করছিল, আর নিজের বাচ্চাদের সান্ধ্যভ্রমণ করাতে নিয়ে বেরিয়েছিল । সকলেই ছেঁড়াখোঁড়া পোশাকে । তিনটে মুখই ছিল অত্যন্ত গম্ভীর, আর ছয়টা চোখ সমানভাবে অবাক হয়ে দেখছিল নতুন রেস্তরাঁর শৌর্য, কিন্তু বয়স অনুযায়ী তারতম্য ছিল । বাবার চোখ দুটো বলছিল, “কতো সুন্দর ! কতো সুন্দর ! ঠিক যেন গরিব পৃথিবীর সমস্ত সোনা জড়ো করে এই দেয়ালগুলো সাজানো হয়েছে।” ছোটো ছেলেটার চোখ দুটো : “কতো সুন্দর ! কতো সুন্দর ! কিন্তু এই জায়গাটা এমন যে আমাদের মতন লোকেদের ঢুকতে দেবে না ।” আর সবচেয়ে ছোটো বাচ্চার চোখ দুটো, তারা জাঁকজমকের জৌলুসে এতোই মুগ্ধ যে নির্বাক এবং গভীর আনন্দ ছাড়া আর কিছু ব্যক্ত করতে পারছিল না ।

গানলেখকরা বলেন যে আনন্দ আত্মাকে উন্নীত করে আর হৃদয়কে করে নম্র । সেই সন্ধ্যায় গানগুলো সঠিক ছিল, আমার ক্ষেত্রে । আমি যে কেবল  এই পরিবারের চোখের দ্বারা বিচলিত হয়েছিলুম তাইই নয়, আমাদের তৃষ্ণার চেয়ে বড়ো গেলাস আর মদ্যপানের পাত্র সম্পর্কে একটু লজ্জা বোধ করেছিলুম । প্রিয়তমা, আমি তোমার চোখে চাউনি মেললুম, যাতে সেখানে আমার চিন্তাভাবনাকে পাঠ করতে পারি : আমি গভীরভাবে নেমে গেলুম তোমার দৃষ্টিতে, কতো সুন্দর আর কতো অদ্ভুতভাবে মোলায়েম, তোমার সবুজ চোখের ভেতরে, ওই চোখে বসবাস করে খামখেয়াল, আর চাঁদের প্রেরণা পেয়ে, তুমি আমাকে বললে, “ওইখানে যে লোকগুলো রয়েছে তাদের সহ্য করা যায় না, ওদের চোখগুলো খোলা সিংদরোজার মতন ! তুমি তো প্রধান বেয়ারাকে বলতে পারো ওদের তাড়িয়ে দিতে ?”

কতো কঠিন পরস্পরকে বুঝতে পারা, আমার প্রিয় পরীরানি, এমনকি যে দুজন মানুষ পরস্পরকে ভালোবাসে,  আমাদের চিন্তা একে আরেকজনকে জানানো অসম্ভব ! 

সাতাশ

নায়কোচিত মৃত্যু

ফাঁসিউলে ছিল একজন প্রশংসনীয় জোকার, বস্তুত রাজপুত্রের বন্ধু । কিন্তু সেই সমস্ত লোকেদের ক্ষেত্রে,  যাদের কর্মজীবন হাসিঠাট্টায় বাঁধা, গাম্ভীর্যপূর্ণ বিষয় তাদের বিপজ্জনকভাবে আকর্ষণ করে ; আর একজন জোকারের মস্তিষ্কে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতা যদি স্বেচ্ছাচারীর মতন দখল করে তাহলে তাকে বিটকেল মনে হতে পারে, আর ফাঁসিউলে একদিন কয়েকজন অসন্তুষ্ট অভিজাতদের ষড়যন্ত্রে শামিল হয়ে গেল । সব জায়গাতেই ভালো মানুষেরা থাকে যারা ক্ষমতাসীন কর্তৃত্বের কাছে দুঃখী ধরনের লোকেদের উৎসর্গ করতে চায় যাতে রাজপুত্রদের বেদখল করে পটের পরিবর্তন করে সমাজে পরিবর্তন আনা যায়, আর তা বিচার-বিবেচনা না করেই। অভিজাতের দল তো গ্রেপ্তার হলোই, সেই সঙ্গে ফাঁসিউলেও, পেল নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড ।

আমি বিশ্বাস করতে পারি যে তাঁর প্রিয় অভিনেতাকে বিপ্লবীদের সঙ্গে দেখে রাজপুত্র কিছুটা বিপর্যস্ত বোধ করেছিলেন । অন্যদের মতন রাজপুত্র যেমন ভালো ছিলেন না তেমন খারাপও ছিলেন না ; কিন্তু অত্যধিক সংবেদনে চালিত হয়ে, অনেক ক্ষেত্রে, তিনি তাঁর অভিভাবকদের চেয়ে বেশি নিষ্ঠুর আর বেশি উৎপীড়ক হয়ে যেতেন । সুকুমার শিল্পের অনুরাগী, এবং বিচক্ষণ বোদ্ধা, উপভোগের ক্ষেত্রে তাঁকে তৃপ্ত করা যেতো না । মানুষ আর নৈতিকিতার ক্ষেত্রে ছিলেন যথেষ্ট উদাসীন, এবং নিজেও একজন প্রকৃত শিল্পী, যে একমাত্র ভয়ঙ্কর শত্রুর কথা তিনি জানতেন তা হলো একঘেয়েমির ক্লান্তি, এবং সেই অবস্হা থেকে মুক্তির ও তাকে দাবিয়ে রাখার জন্য তিনি এমন উদ্ভট কাজকারবার করতেন যে কোনো কঠোর ইতিহাস লেখক তাঁকে “দানব” খেতাব দিতো, যদি তাঁর রাজত্বে অমনকিছু লেখার অনুমতি দেয়া হতো, যা  আদপে আনন্দ বা অনুভূতিতে অসহ্য আঘাত দেয় না, আর অনুভূতিতে আঘাত দেয়া হলো আনন্দের সবচেয়ে সূক্ষ্ম আঙ্গিক । এই রাজপুত্রের দুর্ভাগ্য যে তার প্রতিভার সমকক্ষ কোনো বড়ো নাট্যমঞ্চ ছিল না । পৃথিবীতে যুবক নিরোরা আছে যাদের গণ্ডীবাঁধা অবস্হায়  দম বন্ধ হয়ে যায়, আর ভবিষ্যতের শতকগুলোয় তাদের নাম আর সদিচ্ছা অজানা থেকে যায় ।  অসতর্ক ভাগ্যবিধাতা এই রাজপুত্রকে জমিজমার তুলনায় সামর্থ্য বেশি দিয়েছিলেন । হঠাৎই গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে শাসক ষড়যন্ত্রকারীদের মাফ করে দেবেন ; আর এই গুজবের উৎস ছিল এক বড়োসড় নাট্যাভিনয়ের ঘোষণা, যে নাটকে ফাঁসিউলে ওর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট, অতিপরিচিত ভূমিকায় অভিনয় করবে, আর যাতে অভিযুক্ত অভিজাতবৃন্দও অংশ নেবে,  লোকে বলে বেড়াচ্ছিল ; যাদের মগজ ফাঁকা, তারা বলে বেড়াতে লাগল যে অপমানিত রাজপুত্রের দয়ালু চরিত্রের এটা সুস্পষ্ট প্রমাণ।

একজন মানুষের পক্ষে, যে স্বাভাবিকভাবে আর জেনেশুনে খামখেয়ালি, তার পক্ষে সবকিছু করাই সম্ভব, এমনকি সততা, এমনকি ক্ষমাশীলতা, আর বিশেষ করে যদি সে তাতে কোনো অজানা আনন্দ আবিষ্কার করে । কিন্তু সেই সমস্ত মানুষের পক্ষে, যেমন আমার ক্ষেত্রে, যে ওই অদ্ভুত অসুস্হ আত্মার গভীরে প্রবেশ করতে পেরেছে, এটা আরও বেশি বিশ্বাযোগ্য যে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত মানুষের নাট্যপ্রতিভা দেখতে রাজপুত্র বেশি কৌতূহলী ছিলেন । উপলক্ষটাকে কেন্দ্র করে উনি মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞার ইতিবাচক প্রকোপ নিয়ে শারীরবৃত্তীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চাইছেন, আর অনুসন্ধান করতে চাইছেন একজন শিল্পীর অভ্যাসগত সামর্থ্য অসাধারণ অবস্হায় পড়লে কতোটা পালটে যেতে পারে ; এই তর্ক বাদ দিয়ে ওনার চরিত্রে কি সুনির্দিষ্ট ক্ষমাশীলতা ছিল নাকি ? এই তর্কের নিষ্পত্তি কখনও হয়নি ।

শেষ পর্যন্ত সেই দিন এলো, আর ছোটো দরবারকে সাজিয়ে তোলা হলো আত্মম্ভরী আড়ম্বরে, আর কল্পনা করা কঠিন, যদি তুমি না দেখে থাকো, কতোটা জাঁকজমক একটা ছোটো রাজ্যের সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেনি, সীমাবদ্ধ সঙ্গতি নিয়ে, একটা দুঃখজনক উপলক্ষে তুলে ধরতে পারে। আর এটা তো ছিল দ্বিগুণ দুঃখদায়ক, প্রথমত বিস্ময়কর বিলাসদ্রব্যের প্রদর্শন, আর দ্বিতীয়ত এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নৈতিক ও রহস্যময় আগ্রহ  ।

ফাঁসিউলে তো নির্বাক ভূমিকায় কিংবা যাতে সংলাপ অল্প ছিল, সেই ধরণের ভূমিকা যা ঐন্দ্রজালিক নাটকে প্রতীকিস্তরে জীবনের রহস্যের প্রতিনিধিত্ব করে,  তাতে উৎকৃষ্ট অভিনয় করল । ও মঞ্চে প্রবেশ করেছিল হালকা চালে আর নিখুঁত আত্মসংবরণ করে, যা দেখে জনসাধারণের বিশ্বাস হলো যে  ক্ষমা আর দয়া পাবার যথেষ্ট সম্ভাবনা ওর আছে ।

যখন কেউ একজন অভিনেতা সম্পর্কে বলে, “এই লোকটা একজন ভালো অভিনেতা”, তখন সে একটা ফরমুলা প্রয়োগ করে, তা হলো এই যে চরিত্রটির মধ্যে অভিনেতাকে পাওয়া যায় — তার শিল্প, তার প্রয়াস, তার ইচ্ছাশক্তি । এইবার, কোনও অভিনেতাকে যদি হয়ে উঠতে হয়, যে চরিত্র সে উপস্হাপন করতে চলেছে তাই, তাহলে প্রাচীনকালের সুন্দর মূর্তিগুলোর কী ঘটবে যদি তারা অলৌকিকভাবে প্রাণশক্তি পায়, বেঁচে ওঠে, চলাফেরা করে, দ্যাখে,  সৌন্দর্য সম্পর্কে মানুষের সাধারণ ও বিভ্রান্ত ধারণা — তাহলে নিঃসন্দেহে তা হবে একটি একক ও নতুন ব্যাপার । সেই রাতে ফাঁসিউলে ছিল একটি আদর্শের নিখুঁত নিদর্শন, এমনই, যাকে কেউ জীবন্ত নয়, অসম্ভব নয়, বাস্তব নয়, বলতে পারত না । তার মাথা ঘিরে ধ্বংসাতীত জ্যোতি নিয়ে জোকার প্রবেশ করল আর চলে গেল, হাসল আর কাঁদল আর নিজের অঙ্গকে আক্ষিপ্ত করল, সেই জ্যোতি এমনই ছিল যা অন্যেরা দেখতে না পেলেও আমি দেখতে পাচ্ছিলুম, এমনই জ্যোতি যা ছিল শিল্পের রশ্মি আর শহিদের গৌরবের অভাবিত মিশ্রণ । ফাঁসিউলে, কে জানে কোন বিশেষ প্রসংসনীয় গুণে, উপস্হাপন করল, অমিত ভাঁড়ামির মধ্যেও ঐশ্বরিকতা ও অলৌকিকতা । আর ভুলতে পারা অসম্ভব এক সন্ধ্যার বর্ণনা করতে বসে আমার কলম কাঁপছে, আর পোঁছা যায় না এমন অশ্রুর আবেগ জমে ওঠছে আমার চোখে । ফাঁসিউলে আমাকে মানতে বাধ্য করল, অকাট্যভাবে, যে অতলে তলিয়ে যাবার সন্ত্রাসবোধকে ঢেকে ফেলার জন্য শিল্পের মাদকতা অনেক বেশি ক্ষমতাদক্ষ ; কবরের ধারে দাঁড়িয়ে প্রতিভাবানরা পরমানন্দে এমন ঠাট্টাইয়ার্কি করতে পারে যা কবরটাকে আড়াল করে দেয়, এমন এক স্বর্গোদ্যানে হারিয়ে যায় যেখানে তাদের কবরের আর ধ্বংসের কোনো ধারণা নেই ।

দর্শকদের মধ্যে সকলেই, আমোদ-ক্লান্ত আর ছেবলা, শিল্পীর ক্ষমতাশীল প্রভাবের কাছে দ্রুত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হল । মৃত্যুর কথা কেউই আর ভাবছিল না, কিংবা শোকের, কিংবা চরম শাস্তির । সবাই আহ্লাদের ঘনঘটায় এমনভাবে মজে গিয়েছিল যা কেবল শৈল্পিক শ্রেষ্ঠ অবদানই দিতে পারে । আনন্দ আর সমাদরের বিস্ফোরণে, বজ্রবিদ্যুতের তেজোময়তায়,  নাট্যগৃহের খিলানগুলো অনেক বার কেঁপে উঠছিল । রাজপুত্র নিজেই, উদ্বেলিত, দরবারের সকলরব সমর্থনে যোগ দিলেন ।

তা সত্তেও, তীক্ষ্ণ চোখ তাঁর উদ্বেলতায় অন্য কিছুর মিশেলও দেখতে পাচ্ছিল । উনি কি নিজের স্বৈরাচারী ক্ষমতার কাছে পরাজিত ? জনগণের হৃদয়ে সন্ত্রাসী আঘাত  ও শীতল হতবুদ্ধি সৃষ্টি করার উদ্দেশে নিজের শিল্পের  দ্বারা অপমানিত ? নিজের অনুমানের দ্বারা হতাশাক্রান্ত এবং নিজের পরিকল্পনার ফলাফলে বোকা বনে গেছেন ? অমন ভাবনাচিন্তা — যদিও সর্বাংশে ন্যায্য নয়, কিন্তু একেবারে অন্যায্যও নয় — রাজপুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হল, তাঁর মুখের পরিচিত বিবর্ণতার ওপর অনবরত নতুন বিবর্ণতার প্রলেপ পড়ছিল, যেমন তুষারের ওপর তুষার জমতে থাকে । উনি বারবার ঠোঁট কামড়াচ্ছিলেন, আর ওনার চোখে জ্বলছিল ঈর্ষা আর তিক্ততার মতন আগুন, যদিও উনি নিজের পুরোনো বন্ধু আর অদ্ভুত জোকারের প্রতিভাকে লোকদেখানো প্রশংসা করছিলেন, যে মৃত্যুতেও ভালোভাবে ইয়ার্কি করতে পেরেছিল । একটুক্ষণ পরে, আমি দেখলুম সিংহাসন অধিকারী তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে থাকা একজন রাজভৃত্যর দিকে ঝুঁকে কানে-কানে কিছু বললেন । সৌম্যকান্তি ছেলেটির দুষ্টু মুখ হাসিতে আলোকিত হয়ে উঠল ; তারপর সে রাজপুত্রের দরবার ছেড়ে চলে গেল যেন কোনো জরুরি কাজ করতে যাচ্ছে।

কয়েক মিনিট পরে, এক তীক্ষ্ণ, দীর্ঘ হিসহিস-ধ্বনি ফাঁসিউলেকে ওর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মুহূর্তে বিঘ্ন ঘটালো, একই সঙ্গে হৃৎপিণ্ড আর কান ভেদ করে । আর যেখান থেকে এই অপ্রত্যাশিত অননুমোদন ঘোষিত হয়েছিল, সেই বেদি থেকে একজন বালক দৌড়ে দরবারে এসে চাপা হাসি হাসতে আরম্ভ করল ।

ফাঁসিউলে, আঘাতপ্রাপ্ত, স্বপ্ন থেকে জেগে উঠল, প্রথমে চোখ বন্ধ করল, তারপর অস্বাভাবিক ভাবে বড়োবড়ো করে মেলে ধরল, মুখ খুলল যেন শ্বাস নেবার চেষ্টা করছে, হেলেদুলে একটু এগিয়ে, কিছুটা পেছিয়ে, তারপর মঞ্চের ওপর মরে পড়ে গেল ।

সেই হিসহিসধ্বনি, তারোয়ালের আঘাতের মতন দ্রুত, সত্যিই কি ঘাতককে হতাশ করেছিল ? রাজপুত্র কি নিজেই পূর্বাহ্ণে এই ছলনার স্বশ্রেনিঘাতী কার্যকরতা আঁচ করেছিলেন ? এটা সন্দেহ করা অনুমোদিত । উনি কি ওনার প্রিয় এবং শত্রুভাবাপন্ন ফাঁসিউলের অভাব বোধ করেছিলেন? একথা বিশ্বাস করা মধুর ও আইনসঙ্গত । অপরাধী অভিজাতবৃন্দ শেষ বারের মতন মজার প্রদর্শনী দেখেছিলেন । সেই রাতেই জীবন থেকে তাঁদের মুছে ফেলা হয় । সেই সময় থেকে, বহু মূক নাট্যাভিনেতারা, অন্য দেশে সঠিক সমাদৃত হলেও, “অমুকের” দরবারে অভিনয় করতে এলেও, তাদের একজনও ফাঁসিউলের সমকক্ষ প্রতিভার প্রদর্শন কখনও করতে পারেনি, আর তাদের কেউই একই আনুকূল্যের উচ্চতায় উঠতে পারেনি ।

আঠাশ

নকল টাকাকড়ি

তামাকের দোকান থেকে বেরোনোর পর, আমার বন্ধু টাকা-পয়সাগুলো আলাদা করে গুছিয়ে নিলো : তার কোটের বাঁ দিকের পকেটে রাখলো সোনার ছোটো মুদ্রা ; ডান দিকে, চাঁদিরগুলো; প্যাণ্টের বাঁদিকের পকেটে, একমুঠো কাঁসার ; আর সব শেষে, ডান দিকে, রুপোর একটা দুই ফ্রাংক পয়সা যা ও বহুক্ষণ ধরে যাচাই করেছিল ।

“বেশ সূক্ষ্ম পৃথগীকরণ !” আমি নিজেকে বললুম ।

আমরা একজন গরিব ভিখিরির সামনে পৌঁছোলুম, সে কাঁপা হাতে টুপি এগিয়ে দিয়েছিল। ওই  মিনতিময় দুটো চোখের নিঃশব্দ বাগ্মীতার তুলনায় আর কোনো অপ্রতিভ ব্যাপারের সঙ্গে পরিচিত হইনি, একজন সংবেদী মানুষ জানে কেমন করে তা বুঝতে হয়, যে চোখে একই সঙ্গে রয়েছে অবমাননার গভীর বোধ আর ভর্ৎসনা । তাতে এমন কিছু ছিল যা কুকুরের চোখের জলে দেখা যায় যখন কুকুরটাকে কেউ চাবুক মারে । আমার বন্ধু আমার চেয়ে বেশি পয়সা দিয়েছিল, আর আমি ওকে বলেছিলুম, “তুমি সঠিক কাজই করেছো ; নিজে অবাক হবার আনন্দের চেয়ে আরও বেশি আনন্দ হলো অন্য কাউকে অবাক করে দেয়া।” 

“ওটা নকল পয়সা ছিল”, ও শান্তভাবে বলল, যেন নিজের বৈভবকে যুক্তিপূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছে । কিন্তু আমার দুস্হ মস্তিষ্কে, যা সব সময়ে অনভ কিছু দেখতে ব্যস্ত থাকে যা সাদা চোখে দেখা যায় না ( আমার এই ক্লান্তিকর প্রতিভা প্রকৃতি আমাকে দিয়েছে ), একটা ধারণা তৈরি হল যে আমার বন্ধুবরের অমন কাজ তখনই মাফ করা যায় যদি ও ভেবে থাকে বেচারা গরিবটার জীবনে কোনো আকস্মিকতা  সৃষ্টি করবে, আর হয়তো দেখতে চাইছিল কতোরকম প্রতিফল, ভয়ঙ্কর অথবা অন্যরকম বিপদ, একটা নকল পয়সা একজন ভিখারির হাতে দিলে ঘটতে পারে । তা কি ভালো পয়সায় বৃদ্ধি ঘটাবে না ? তা কি ওকে কারাগারে পাঠাবে না ? সরাইখানার মালিক কিংবা কসাই, ধরা যাক, নকল পয়সার জন্য ওকে গ্রেপ্তার করিয়ে দিতে পারে । আর নকল পয়সাটা সহজেই হয়ে উঠতে পারে কোনো ছোটোখাটো বেচারা সাট্টাবাজের বহুদিনের রোজগারের উৎস । আর এই ভাবেই আমার চিন্তাধারা নিজের মতো করে ঘুরে বেড়াতে লাগলো, আমার বন্ধু যা ভাবছিল তাতে হয়তো ডানা যোগালো, কতো রকমের সম্ভাবনার কতো রকমের প্রতিফল । কিন্তু ও হঠাৎই আমার ভাবনাস্রোতে বাধা দিয়ে আমারই কথাগুলো পুনর্বার বলল : “হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ, একজন মানুষকে তার আশার চেয়ে বেশি দিয়ে অবাক করার তুলনায় আর মধুর আনন্দ হয় না ।”

আমি সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকালুম, আর সেই চোখে প্রশ্নাতীত অকপটতার ঔজ্বল্য দেখে আতঙ্কিত বোধ করলুম । আমি এখন স্পষ্ট দেখলুম যে ও যা করতে চাইছিল তা হলো দানকর্ম, আর সেইসঙ্গে এক ধরণের দরাদরি ; চল্লিশ পয়সা জেতা আর তার সঙ্গে ঈশ্বরের হৃদয়কেও জেতা ; যাতে মিতব্যয়ের মাধ্যমে স্বর্গে যেতে পারে ; আর শেষে, মাঙনায়, দানশীল মানুষের পদমর্যাদা পেতে পারে ।  আমি ওর অপরাধী আনন্দকে ক্ষমা করে দিতে পারতুম,  আমি এখনই অনুমান করতে পারছি যে ওর পক্ষে একাজ করা সম্ভব ; গরিব মানুষকে ঠকিয়ে ও মজা নিচ্ছে, তা হয়তো আমার মনে  কৌতূহল সৃষ্টি করত আর তাকে ভাবতুম বিদকুটে ; কিন্তু ওর অবান্তর হিসেবিপনাকে আমি কিছুতেই ক্ষমা করতে পারব না । বজ্জাত হওয়াটা কখনই মার্জনাযোগ্য নয়, কিন্তু একজন যে অমন তা জানতে পারাটা অর্জন ; আর সবচেয়ে ক্ষমাহীন দোষ হল বোকার শয়তানি ।

উনত্রিশ

বদান্য জুয়াড়ি

কালকে একটা ভিড়েভরা উদ্যানপথে আমি অনুভব করলুম এক রহস্যময় অস্তিত্ব আমার পাশ ঘেঁষে চলে গেল,  যার সঙ্গে আমি দেখা করতে চেয়েছি, আর যাকে তক্ষুনি চিনতে পারলুম, যদিও তাকে আমি সত্যিই আগে দেখিনি । সেও আমার সম্পর্কে একই রকম অনুভব করল, কেননা পাশ দিয়ে যাবার সময়ে অর্থপূর্ণ চোখ মারলো, যা আমি দ্রুত স্বীকৃতি দিলুম । আমি ওকে  অনুসরণ করলুম, আর ওর পেছন-পেছন মাটির তলায় একটা ঘরে নামলুম, ঝকমকে জায়গা, বিলাসিতায় এমনই আলোকিত যা প্যারিসের উঁচু স্তরের বাড়িতেও পাওয়া যাবে না । অদ্ভুত মনে হলো যে এই প্রতিপত্তিপূর্ণ আড্ডাঘরের সামনে দিয়ে কতোবার গেছি অথচ প্রবেশপথ নজরে পড়েনি । এক সজ্জাবিলাসী, এমনকি মত্ততাদায়ক বাতাবরণ সেখানে ছেয়ে ছিল, যা তোমাকে প্রায় তৎক্ষণাৎ জীবনের একঘেয়ে গণ্ডোগোলের কথা ভুলিয়ে দেবে ; সেখানে, তুমি শ্বাস নেবে এক বিষণ্ণ স্বর্গসুখে, যেমন পদ্মফুলখোরদের ক্ষেত্রে ঘটেছিল, যখন তারা, সূর্যের আলোয় আলোকিত শাশ্বত দুপুরে মায়াবী দ্বীপে নেমেছিল, তারা নিজের অন্তরে অনুভব করেছিল, সঙ্গীতময় ঝর্ণার মোহক শব্দে, যেন বাড়ির দেবীদেবতাদের, স্ত্রীদের, ছেলেমেয়েদের আর না দেখতে হয়, আর সমুদ্রের উঁচু ঢেউয়ে চেপে পাড়ি দিতে না হয় ।

সেখানে ছিল অদ্ভুত চেহারার পুরুষরা আর নারীরা, মারণ সৌন্দর্যে চিহ্ণিত, যা আমার মনে হলো,  এমন সময়ে আর দেশে এর আগে দেখেছি, যা ঠিক এক্ষুনি মনে পড়ছে না, আর যা আমাকে, সচরাচর অচেনা আগুন্তুক দেখে যে অজানা ভীতি হয়, তার বদলে  দিলো ভাতৃত্বের সহমর্মিতা। ওদের চাউনির অদ্ভুত অভিব্যক্তিকে যদি বর্ণনা করতে হয়, তাহলে আমি বলব এর আগে আমি কখনও এমন দৃষ্টি দেখিনি যা ক্লান্তির যন্ত্রণায় আর বেঁচে থাকার ইচ্ছেতে প্রবল সক্রিয়তায়  পুড়ছে।

আমার নিমন্ত্রণকর্তা আর আমি যতক্ষণে বসলুম, আমরা ততোক্ষণে আমরা দুজনে পুরোনো, সহযোগী বন্ধু হয়ে গিয়েছিলুম । আমরা খেলুম, আমরা অনেক ধরণের মদ বেপরোয়াভাবে পান করলুম আর, সবচেয়ে মজার, কয়েক ঘণ্টা পরেও আমার মনে হচ্ছিল যে ও যতোটা মাতাল হয়েছে আমি ততোটা হইনি । কিন্তু জুয়া, সেই অতিমানবিক আহ্লাদ, মাঝে মাঝে আমাদের মদ খাওয়ায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল, আর আমাকে স্বীকার করতে হবে যে আমি বাজি ধরলুম, আর যে-জিতবে-সে-সবকিছু নেবে খেলায় আমার আত্মাকে নায়কোচিত উদ্বেগহীনতায় আর হালকাচিত্তে হারালুম । আত্মা এমনই এক স্পর্শাতীত জিনিস, বেশির ভাগ সময়ে অকেজো আর অনেক সময়ে এতো বিরক্তিকর, যে তা হারিয়ে ফেলার দরুন আমার কোনো আবেগ হলো না, অনেকটা বেড়াতে বেরিয়ে ভিজিটিঙ কার্ড হারিয়ে ফেলার মতন ।

আমরা আয়েস করে চুরুট ফুঁকলুম যার অতুলনীয় সুস্বাদ আর সুগন্ধ আমাদের আত্মায় এনে দিলো অজানা দেশ আর আনন্দের মনকেমন, আর এই মাতোয়ারায় মাতাল,  সুপরিচিতির তরঙ্গ ওকে অসন্তুষ্ট করেছে বলে মনে হলো না, আমি সাহস করে চেঁচিয়ে বললুম, কানায় কানায় ভরে গেলাসে চুমুক দিয়ে, “প্রিয় নিক ! তোমার চিরন্তন স্বাস্হ্যের প্রতি ।” আমরা জগতসাংসার সম্পর্কে আলোচনা করলুম, অর্থাৎ প্রগতি আর নিখুঁত হয়ে ওঠার বিষয়ে বিশ্বাস সম্পর্কে, আর সাধারণভাবে মানুষের নানা মোহাচ্ছন্নতা নিয়ে আলোচনা করলুম । এই বিষয়ে মান্যবর চতুর এবং অকাট্য ঠাট্টাইয়ার্কিতে কম যায় না, নিজের মতামত ভদ্র বাক্যবিন্যাসে আর স্বচ্ছ রসিকতায় সাজিয়ে এমনভাবে প্রকাশ করছিল যা এর আগে মানবসমাজের নামকরা বাগ্মীদের মুখেও শুনিনি । ও আমাকে বিভিন্ন দর্শনের অসম্ভাব্যতা ব্যাখ্যা করে বোঝালো, যে দর্শন এ-পর্যন্ত মানুষের মস্তিষ্ক দখল করে আছে, এমনকি আমাকে মৌলিক তত্বগুলোর কয়েকটায় শিক্ষিত করে তুলতে চাইলো, যদিও তত্বের জ্ঞান আর লাভ সম্পর্কে আমি যে কোনো কারোর সঙ্গে আলোচনা করি না । দুনিয়া জুড়ে নিজের কুখ্যাতির বদনাম নিয়ে একেবারেই নালিশ করল না, কুসংস্কার দূর করায় ওর সর্বাধিক আগ্রহ নিয়ে বিশ্বাস জাগালো, আর শপথ করে জানালো যে কেবল একবারই ও নিজের ক্ষমতাকে ভয় পেয়েছিল, যেদিন একজন যাযককে বলতে শুনেছিল, সহযাযকদের চেয়ে বার্তাবহ, বেদির ওপরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিল, “আমার প্রিয় ভাতৃবৃন্দ, কখনও ভুলবেন না, যখন আপনি আলোকপ্রাপ্তির প্রগতি নিয়ে গর্ব করেন, বলেন যে,  শয়তানের সবচেয়ে সূক্ষ্ম ছলনা হলো আপনাদের প্রত্যয় জন্মানো যে তার কোনো অস্তিত্ব নেই !”

সেই নামকরা বাগ্মীর স্মৃতি স্বাভাবিকভাবে  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে আমাদের আলোচনাকে নিয়ে গেলো, আর আমার অদ্ভুত নিমন্ত্রণকারী জোর গলায় বলল যে, লেখার কলমকে, বক্তৃতা দেয়াকে, পাতিপণ্ডিতদের ভাবনাচিন্তাকে উৎসাহিত করা ওর মর্যাদার তুলনায় নিম্নস্তরের, আর ও ব্যক্তিগতভাবে সব সময়ে বিদ্যায়তনিক সভায় উপস্হিত থেকেছে, যদিও অদৃশ্য হয়ে । এই সব দয়ালু কথাবার্তায় প্ররোচিত হয়ে, আমি ওকে ঈশ্বরের কথা আর সাম্প্রতিক কালে ওনার সঙ্গে দেখা হয়েছে কিনা জিগ্যেস করলুম । উদাসীন কন্ঠে ও বলল, তাতে একটু দুঃখ মেশানো, “আমাদের যখনই সাক্ষাৎ হয় আমরা পরস্পরকে হ্যালো সম্ভাষণ করি, কিন্তু তা দুজন বৃদ্ধ ভদ্রসন্তানের দেখাসাক্ষাতের মতন হয়, যারা, তাদের জন্মসূত্রে পাওয়া আভিজাত্য সত্ত্বেও, পুরোনো ঝগড়ার স্মৃতি মুছে ফেলতে পারেনি ।”

একজন মামুলি নশ্বরকে মান্যবর এতক্ষণ সময় নিয়ে দর্শন দেননি বলেই মনে হয়, আর বিশ্বাসভঙ্গ যাতে না করে ফেলি সে ভয় আমার ছিল । শেষ পর্যন্ত, জানালায় যখন ভোরের প্রথম আলো দেখা গেল, এই প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব,  না জেনেই যার গুণগান করেছেন বহু কবি আর যার শৌর্যকে  সেবা করেছেন দার্শনিকরা, আমাকে বলল, “আমি চাই আমার সম্পর্কে তোমার স্মৃতি আনন্দময় হোক, আর তা আমি তোমাকে প্রমাণ করে দেখাব, আমার সম্পর্কে তো কতো খারাপ কথা লোকে বলে বেড়ায়, আমি অনেক সময়ে একজন ‘শুভ শয়তান’ হয়ে যাই , যেমন তোমাদের একটা জনপ্রিয় প্রবাদ আছে । তাই, তোমার আত্মার যে অপূরণীয়  ক্ষয়ক্ষতি তুমি ভোগ করলে,  ভাগ্য তোমার সহায় হলে তুমি যে দাঁওগুলো জিততে –অর্থাৎ, তোমার সম্পূর্ণ জীবনে , ক্লান্তির বিটকেল অসুস্হতার সম্ভাবনাকে প্রশমিত ও পরাভূত করার জন্যে, যা তোমার অসুখ আর এগিয়ে যাবার দুঃখময় কারণ, আমি খেসারত দিয়ে তা পুষিয়ে দেবো । এমন কোনো ইচ্ছে তোমার হবে না যা পেতে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারব না ; ফালতু সহযোগীদের ওপর তুমি কর্তৃত্ব করবে ; তুমি পাবে স্তাবকদল এমনকি সমাদর ; চাঁদি, সোনা, হীরে, পরীরা  তোমায় খুঁজে বের করে তাদের গ্রহণ করার জন্য অনুনয়-বিনয় করবে, তার জন্য তোমাকে কোনো প্রয়াস করতে হবে না ; তুমি যখনই চাইবে নিজের দেশ আর জাতীয়তা বদলে ফেলতে পারবে ; আহ্লাদে মাতাল হবে, কখনও তাতে ক্লান্তি আসবে না, সেই সব দেশে যা সর্বদা উষ্ণ আর যেখানে নারীদের গায়ে ফুলের মতন সুগন্ধ — ইত্যাদি, ইত্যাদি….” ও উঠে দাঁড়িয়ে বলতে থাকল , বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি হেসে বিদায় নিলো ।

এরকম জনগণের আড্ডায় নিজেকে অবমানিত করার ভয় যদি না থাকতো, আমি স্বেচ্ছায় এই বদান্য জুয়াড়ির পায়ে পড়ে তার অশ্রুতপূর্ব দানশীলতার জন্যে ধন্যবাদ জানাতুম । কিন্তু ও যাবার পরে, একটু-একটু করে, চিকিৎসার অসাধ্য আমার সন্দেহের অভ্যাস বুকের ভেতরে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকলো ; অমন বৈভবপূর্ণ আনন্দে বিশ্বাস করার সাহস হলো না, আর যখন বিছানায় গিয়ে শুলুম, নীচ অভ্যাসের দরুণ প্রার্থনা করার সময়ে, আধোঘুমে বললুম : “হায় ভগবান ! ওহ আমার দেবতা, আমার ভগবান ! আমাকে দেয়া কথাগুলো শয়তানটা যাতে রাখে তা দেখো !”

ত্রিশ

দড়ি

এদুয়ার মানে’র জন্য

“মায়া”, বন্ধু আমাকে বলল, “যতোরকমের মানব সম্পর্ক হতে পারে ততো অসংখ্য, কিংবা যেমন বস্তু আর জনগণের সম্পর্ক, তেমন । আর মায়া যখন বিলুপ্ত হয়, অর্থাৎ, যখন  প্রাণীটি অথবা ঘটনাটি আমাদের বাইরে অবস্হিত, আমাদের একটা অদ্ভুত, জটিল অনুভব হয়, উবে যাওয়া মায়াপুরুষের জন্য অর্ধেক মনখারাপ, আর বাকি অর্ধেক এই অনন্যতায় অবাক হওয়া, এই বাস্তব ঘটনার জন্য অবাক হওয়া।

এখন, কোনও ব্যাপার যদি নিখুঁতভাবে স্বাভাবিক আর সাধারণ মনে হয়, সব সময়ে একই, যা আমাদের কখনও বোকা বানাতে পারে না, তা হলো মায়ের ভালোবাসা ।  মায়ের মাতৃত্বহীন ভালোবাসা  কল্পনা করা যেমন কঠিন, যেমন তাপহীন আলো ; তাই , মায়ের সব কাজ আর কথাবার্তা, নিজের সন্তান সম্পর্কে, মায়ের ভালোবাসার সঠিক বৈধ কারণ নয়কি ? আর তবু, এই গল্পটার কথা শুনুন, যার দরুন আমি পুরোপুরি প্রাকৃতিক মায়ায় বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলুম।

“চিত্রকর হিসাবে আমার পেশা অন্যের মুখ খুঁটিয়ে দেখতে আমাকে বাধ্য করে, চলার পথে যে চেহারাগুলো আমি প্রত্যক্ষ করি, আর তুমি জানো এই দক্ষতা থেকে আমরা কেমন আনন্দ উপভোগ করি, অন্য লোকেদের দৃষ্টির তুলনায় আমাদের চোখে যা প্রতিভাত হয়, জীবনকে আরও প্রাণবন্ত এবং অর্থবহ করে তোলে । দূরের যে পাড়ায় আমি থাকি, যেখানে বাড়িগুলোকে পরস্পরের থেকে আলাদা করে রেখেছে তৃণভূমি, আমি প্রায়ই একটা বাচ্চাকে দেখতুম যার উষ্ণ, দুষ্টু মুখভাব অন্য বাচ্চাদের চেয়ে আমাকে তৎক্ষণাৎ আকর্ষণ করতো । আমার জন্যে ও অনেকবার পোজ দিয়েছে, আর আমি কখনও ওকে ছোট্ট জিপসি এঁকেছি, কখনও দেবদূত, কখনওবা পূরাণের কামদেব । আমি ওকে ভবঘুরের বেহালা হাতে এঁকেছি, কাঁটার মুকুট আর খৃস্টের শেষযাত্রার আবেগসহ, আর যৌনতার দেবতার আলোকবর্তিকা হাতে । শেষে,  ওর মজা করার ব্যাপারে এমন আনন্দ পেতুম যে একদিন আমি ওর বাবা-মাকে, যারা বেশ গরিব, বললুম যে ছেলেটিকে আমায় দিতে, আমি ভালো পোশাক পরিয়ে রাখবো, যৎসামান্য টাকাকড়ি দেবো,  আমার বুরুশ পরিষ্কার আর এদিক-ওদিকের কাজ ছাড়া দায়িত্বপূর্ণ কোনো কাজ দেবো না । বাচ্চাটা, আমি ওকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে তোলার পর, বেশ সুশ্রী হয়ে উঠল, আর আমার সঙ্গে যে ধরণের জীবন কাটাতে লাগলো তা ওর বাবা-মায়ের জঘন্য বাসার তুলনায়  মনে হয় স্বর্গ । তবে এখানে আমি একটা কথা বলব যে ছোটো ভদ্রলোকটি অনেক সময়ে তার অসাধারণ, অকালপক্ক মর্মযন্ত্রণার আকস্মিক প্রকোপ প্রদর্শন করে আমায় অবাক করে দিতো, আর দ্রুত ও চিনি এবং লিকোয়ার খানিক বেশি করে স্বাদ করার ঝোঁক দেখালো ; এমনই যে একদিন যখন ধরে ফেললুম যে  ও এই রকম চুরি আবার করেছে, আমি ওকে বাবা-মায়ের কাছে ফেরত পাঠাবার ভয় দেখালুম । তারপর কাজে বেরোলুম আর আমার কাজকর্ম আমাকে বাড়ি থেকে কিছু সময়ের জন্যে বাইরে রাখলো ।

“তুমি চিন্তা করতে পারবে না কীরকম আতঙ্ক আর আকস্মিকতায় বাড়ি ফিরে আক্রান্ত হলুম, যখন সবচেয়ে প্রথমে আমার চোখে পড়ল, ছোটো ভদ্রলোকমশায়, আমার জীবনের দুষ্টু সঙ্গী, কড়িকাঠের হুক থেকে ঝুলছে ! ওর পা প্রায় মাটি ছুঁয়ে রয়েছে ; একটা চেয়ার যা দৃশ্যত লাথি মেরে দূরে সরিয়ে দিয়েছে ; এক কাঁধে ঝুলছে ওর আক্ষিপ্ত মাথা ; মুখ ফুলে উঠেছে আর ওর চোখ, ভয়ার্ত চাউনি মেলে খোলা, প্রথমে দেখে আমার ভ্রম হয়েছিল ও এখনও বেঁচে আছে। তুমি যেমন ভাবছো, ওকে নামানো সহজ কাজ ছিল না । ওর দেহ ইতোমধ্যে কাঠ হয়ে গিয়েছিল, আর আবর্ণনীয় আতঙ্কে আমার মনে হচ্ছিল ও মেঝেয় পড়ে যেতে পারে । আমি এক হাতে ওকে তুলে ধরলুম আর অন্য হাত দিয়ে দড়িটা কাটলুম । কিন্তু তখনও পর্যন্ত সব পুরো হয়নি ; ছোটো জানোয়ারটা একটা সরু শক্ত দড়ি ব্যবহার করেছিল যা ওর গলার মাংসকে গভীরভাবে কেটে চেপে বসে গিয়েছিল, তখন, একটা ছোটো কাঁচি নিয়ে, ওর ফুলে ওঠা মাংস আর দড়ির ভেতরে ঢুকিয়ে কেটে ফেলতে হলো, যাতে ওর গলাকে মুক্ত করা যায় ।

“বলতে ভুলে গেছি যে আমি চেঁচিয়ে সাহায্য চাইছিলুম ; কিন্তু কোনো প্রতিবেশি আমাকে সাহায্য করার জন্যে এগিয়ে এলো না, এই ব্যাপারে সভ্য মানুষেরা পরস্পরের আচরণের কাছে একনিষ্ঠ, যারা কখনও, আমি জানি না কেন, গলায় দড়ি দেয়া মানুষের ব্যাপারে নাক গলাতে চায় না। শেষে ডাক্তার এসে জানালেন যে বাচ্চাটা বেশ কয়েক ঘণ্টা আগে মারা গেছে । আর তারপর, যখন ওকে গোর দেবার জন্য ওর পোশাক খোলার প্রয়োজন হলো, শবদেহ এতো শক্ত হয়ে গিয়েছিল যে আমরা ওর অঙ্গ নাড়াতে পারছিলুম না, আর পোশাক খোলার জন্য তা কেটে-ছিঁড়ে ফেলতে হয়েছিল ।

“পুলিশকর্তা, যার কাছে ঘটনার বয়ান  দেবার ছিল, অবশ্যই, চোখের কোন দিয়ে আমাকে দেখে বললেন, ‘এতে কিছু সন্দেহজনক ব্যাপার আছে’ — বলাবাহুল্য, প্রত্যেকের মনে ভয় জাগাবার ওনার জেদি অভ্যাসবশত, তা সে নিষ্পাপ হোক বা অপরাধী, কথাগুলো বললেন ।

“একটা বড়ো কাজ রয়ে গেছে”, যা মাথায় আসা মাত্র নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণায় আক্রান্ত হলুম। আমার কাজ হলো ওর বাবা-মাকে জানানো । সেখানে  যেতে আমার পা দুটো রাজি হচ্ছিল না ।

শেষে সাহস সঞ্চয় করতে পারলুম । কিন্তু, আমাকে অবাক করে দিয়ে, মা ছিলেন অবিচলিত, চোখে জলের একটা ফোঁটাও নেই । এই অদ্ভুত প্রতিক্রিয়ার কারণ  মনে হল ঘটনার আকস্মিকতায় উনি নির্বাক, আর আমার পুরোনো এক প্রবাদ মনে পড়ল : ‘সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শোক প্রকাশিত হয় মৌনতায়।’ বাবা, নিজেকে স্তোক দিলেন, অর্ধেক বিধ্বস্ত, অর্ধেক বিষণ্ণ : ‘যাই হোক, এটা হয়তো ভালোর জন্যই ঘটেছে ; ও তো কোনো কালেই ভালো ছেলে হয়ে উঠতে পারতো না !’

‘ইতোমধ্যে, দেহটা আমার ঘোড়ার গাড়িতে রাখা হয়েছিল আর চাকরের সাহায্য নিয়ে আমি অন্ত্যেষ্টির যোগাড়যন্ত্রে ব্যস্ত ছিলুম, তখন ছেলেটির মা আমার স্টুডিওতে এলেন । উনি বললেন, উনি ওনার ছেলের শব দেখতে চান । আমি ওনার শোক প্রকাশের পরম ও শান্ত সন্তুষ্টির জন্য ওনাকে সত্যই বাধা দিতে পারতুম না । তারপর উনি আমাকে অনুরোধ করলেন  আমি যেন সেই জায়গাটা দেখাই যেখানে ছেলেটি গলায় দড়ি দিয়েছিল । ‘আহ না, ম্যাডাম’, আমি বললুম, ‘তা আপনার পক্ষে অত্যন্ত কষ্টদায়ক হবে !’ কিন্তু অজান্তে আমার দৃষ্টি কড়িকাঠের দিকে গেলো, আর আমি দেখলুম, বিরক্তি আর আতঙ্কের মিশেলে, যে খুঁটিটা তখনও সেখানে ছিল, তা থেকে ঝুলছিল একটা লম্বা দড়ি । আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে দুঃখযন্ত্রণার শেষ প্রমাণ ছিঁড়ে সরিয়ে ফেলতে চাইলুম, আর যখন তা জানলা গলিয়ে বাইরে ফেলতে যাবো, বেচারা মহিলাটি আমার বাহুঁ আঁকড়ে অপ্রতিরোধ্য স্বরে বললেন : ‘ওহ, স্যার ! ওটা আমাকে দিন ! আমি অনুরোধ করছি !’ স্বাভাবিকভাবে, ওনার ব্যথা, আমি ভাবলুম, ওনার মাথা এমন খারাপ করে দিয়েছে যে, যে জিনিসটা ওনার ছেলের মৃত্যুর কারণ, তা প্রত্নবস্তুর মতন যত্নে সামলে রাখতে চাইছেন বলে উনি কোমলতায় নুয়ে পড়েছেন ।  উনি খুঁটি আর দড়ি কেড়ে নিলেন ।

“শেষে, শেষে, সবকিছু সমাধা হলো । যা বাকি রইলো তা হলো আমার নিজের কাজে ফেরা, আগের থেকেও বেশি আগ্রহে, আমার মস্তিষ্কের ভাঁজে-ভাঁজে ঘাপটি মেরে থাকা ছোট্ট শবের সন্মোহন থেকে মুক্তির জন্য যা ছিল জরুরি, সেই মায়াবালক যে তার ছবি আর চাউনি দিয়ে আমাকে ক্লান্ত করে দিচ্ছিল  তাকে আঁকা। কিন্তু পরের দিন আমি এক গোছা চিঠি পেলুম ; কয়েকটা আমার অট্টালিকার নিবাসীদের থেকে, কয়েকটা প্রতিবেশিদের থেকে ; একটা একতলা থেকে, আরেকটা দোতলা, আরেকটা তিনতলা, আর এইরকমই সব ; কয়েকটা ছিল অর্ধেক রসিকতাপূর্ণ, যেন হালকা চালে নিজেদের অনুরোধ লুকোতে চাইছে, কিছু একেবারে নির্লজ্জ আর ভুল বানানে ভরা, কিন্তু সবায়ের উদ্দেশ্য এক,  মৃত্যুময় এবং স্বর্গীয় দড়ির একটা টুকরো পাবার প্রয়াস। সাক্ষরকারীদের মধ্যে, আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, পুরুষদের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি ছিল, কিন্তু তারা সকলেই, আমি তোমাদের নিশ্চিন্ত করে বলছি, গেঁয়ো নিম্ন শ্রেনির ছিল না । চিঠিগুলো আমি সংগ্রহ করে রেখেছি ।

“তারপর হঠাৎই, আমি আঁচ করলুম, আর বুঝতে পারলুম ছেলেটির মা কেন দড়িটা কেড়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, আর নিজের সন্তুষ্টির জন্য কেমনতর বাণিজ্যের পরিকল্পনা করেছিলেন ।

“‘হায় ভগবান’, আমি আমার বন্ধুকে বললুম : ‘গলায় ফাঁসি দেয়া একজন মানুষের এক মিটার দড়ির দাম একশো ফ্রাঁ প্রতি ডেসিমিটার, যার যেমন ক্ষমতা সে তেমন অর্থ দিয়ে কিনবে, যার যোগফল দাঁড়ায় এক হাজার ফ্রাঁ, বেচারা গরিব মায়ের সত্যিকার সান্ত্বনা !”

একত্রিশ

কাজকারবার

এক সুন্দর বাগানে,  যেখানে হেমন্তের রোদ অলস আনন্দে ছড়িয়ে পড়েছিল, ইতোমধ্যে সবুজ আকাশের তলায়, ভেসে যাওয়া মহাদেশগুলোর মতন সোনালি মেঘেরা, চারটে সুন্দর বাচ্চা, চারজনেই ছেলে, খেলে-খেলে ক্লান্ত, নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করছিল ।

একজন বলছিল : “কালকে ওরা আমাকে নাট্যগৃহে নিয়ে গিয়েছিল । সেখানের মঞ্চে বিরাট সব দুঃখি-দুঃখি প্রাসাদ ছিল, যার পেছনে সমুদ্র আর আকাশ দেখা যায়, পুরুষ আর মহিলারা, কেউ গম্ভীর কেউ মনখারাপ, কিন্তু চারপাশে যাদের দেখি তাদের চেয়ে সুন্দর আর দামি পোশাকে, আর তারা এমনভাবে কথা বলছিল যেন গান গাইছে । তারা একে অন্যকে ভয় দেখাচ্ছিল, অনুরোধ করছিল, মনখারাপ করছিল, আর কোমরে গোঁজা ছোরায় নিজেদের একটা হাত রেখে কথা বলছিল । ওহ, কী বলব কতো সুন্দর ! আমাদের বাড়িতে যে মহিলারা বেড়াতে আসেন তাঁদের চেয়ে সুন্দরী আর দীর্ঘাঙ্গী ওখানের মহিলারা, আর তাদের বড়ো দীঘল চোখ আর ফোলা গাল মনে হচ্ছিল ভয়ঙ্কর, কিন্তু তাদের ভালো না বেসে তোমরা থাকতে পারবে না । কখনও তুমি ভয় পাবে, কখনও তোমার কাঁদতে ইচ্ছে করবে, অথচ তা সত্বেও হাসিখুশি থাকবে । তাছাড়া, আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, তোমারও মনে হবে অমন পোশাক পরি, আর অমন কাজকারবারই করি, আর ওইরকম কন্ঠস্বরে কথা বলি…”

চারজন ছেলের মধ্যে একজন, যে তার বন্ধুর কথায় এতোক্ষণ কান দেয়নি, অবাক চোখে দূরের আকাশে কিছু দেখছিল, হঠাৎ বলল, “দ্যাখো, ওপরে তাকিয়ে দ্যাখো ! দেখতে পাচ্ছো ওনাকে ? উনি ছোট্ট আলাদা মেঘে বসে রয়েছেন, আগুনরঙা মেঘটা ধীরে ভেসে যাচ্ছে । উনিও, যেন  আমাদের ওপর লক্ষ রাখছেন।” 

“কে ? উনি কে ?” অন্যেরা জিগ্যেস করল ।

“ঈশ্বর!” ছেলেটা নিশ্চিন্ত গলায় বলল । “ওহ ! উনি তো এখনই অনেক দূরে ; কিছুক্ষণে ওনাকে আর দেখতে পাবে না । উনি বোধহয় বেড়াতে বেরিয়েছেন, অন্য দেশগুলোয় যাচ্ছেন । দাঁড়াও, 

দিগন্তের প্রায় কাছাকাছি গাছের সারির ওপারে চলে যাচ্ছেন…আর এবার উনি গির্জার চূড়ার পেছনে ডুবে যাচ্ছেন…আহ, আর তোমরা ওনাকে দেখতে পাবে না !” এবং ছেলেটা অনেকক্ষণ যাবত সেইদিকে তাকিয়ে রইলো, ওর চোখ আকাশ আর পৃথিবীর সংলগ্নরেখার দিকে,  ভাবাবেশ ও দুঃখের অনির্বচনীয় দৃষ্টি মেলে দেখতে লাগলো ।

“এ  পাগলাটে, এই ব্যাটা, ওর মহান ঈশ্বরকে কেবল ওই দেখতে পাচ্ছে,” তৃতীয়জন বলল, যার সম্পূর্ণ ছোটো দেহ ছিল বিরল জীবনীশক্তি আর উদ্যমের  বহিঃপ্রকাশ । “আমি, আমি তোমাদের এমনকিছু বলতে যাচ্ছি যা আমার জীবনে ঘটেছে কিন্তু তোমাদের জীবনে ঘটেনি, আর যা তোমাদের নাটক এবং মেঘের চেয়ে বেশি কৌতূহল-উদ্দীপক ।— দিনকয়েক আগে, আমার বাবা-মা আমাকে ওনাদের সঙ্গে  প্রমোদ-ভ্রমণে নিয়ে গিয়েছিলেন, আমরা যে হোটেলে ছিলুম তাতে আমাদের সকলের জন্যে বিছানা ছিল না বলে, নির্ণয় নেয়া হলো যে আমি কাজের মেয়ের সঙ্গে একই বিছানায় শোবো ।” ছেলেটি বন্ধুদের আরও কাছে আসতে ইশারা করে নিচু গলায় বলল । “ব্যাপারটা অদ্ভুত ছিল, বিছানায় একা না শুয়ে কাজের মেয়ের সঙ্গে শোয়া, তাও অন্ধকারে । আমার ঘুম আসছিল না, নিজের ভাবনা ভাবছিলুম কিন্তু মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়ল আর আমার হাত নিয়ে ওর নিজের বাহুতে, গলায়, কাঁধে বোলাতে লাগল । ওর বাহু আর কাঁধ অন্য মেয়েদের চেয়ে মাংসল, ত্বক বেশ নরম, এতো নরম, যেন লেখার কাগজ কিংবা সিল্কের কাগজ । আমার তাতে এতো আহ্লাদ হল যে যদি না ভয় করতো আমি অনেকক্ষণ অমনভাবে চালিয়ে যেতে পারতুম , ওর ঘুম ভাঙিয়ে ফেলার ভয়, আর তাছাড়া জানি না আর কি-কি । তারপর ওর পিঠে ছড়ানো ঘোড়ার লেজের মতন এলোচুলে আমি আমার মুখ গুঁজলুম, আর এতো ভালো গন্ধ পেলুম, তোমরা বিশ্বাস করবে না, এখন বাগানে ফুলগুলোর যেমন গন্ধ বেরোচ্ছে তেমন । যদি সুযোগ পাও তাহলে চেষ্টা করে দেখো, তখন বুঝতে পারবে !”

এই অস্বাভাবিক উদ্ঘাটন বর্ণনার তরুণ লেখক, নিজের কাহিনি বলার সময়ে, চোখদুটোকে একধরনের হতচেতন চাউনিতে মেলে ধরেছিল যেন ও তখনও স্মৃতিকে অনুভব করছে, আর সূর্যাস্তের আলো ওর লালচে কোঁকড়ানো চুলের ঢেউকে  লালসার গন্ধকবর্ণ জ্যোতিতে  আলোকিত করে দিয়েছে । বলা সহজ যে  কেউই মেঘ থেকে ঈশ্বরপ্রাপ্তির জন্যে জীবন নষ্ট করবে না, আর তা পাবে অন্য কোথাও ।

শেষে চতুর্থজন বলল : “তোমরা তো জানো যে বাড়িতে আমি তেমন মজা পাই না ; আমাকে নাটক দেখতে নিয়ে যায় না ; আমার গৃহশিক্ষক বড়োই কড়া মেজাজের ; ঈশ্বর আমার আর আমার একঘেয়েমির সময় জুড়ে থাকেন না, আর আমার কোনো সুন্দরী কাজের মেয়ে নেই যে আদর করবে । আমি প্রায়ই ভাবি যে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাবো যদি পালিয়ে যেতে পারি, কোথায় যাচ্ছি তা না জেনেই, আর কাউকে উদ্বিগ্ন না করে, আর সব সময় নতুন দেশ দেখে বেড়াবো । আমি যেখানেই থাকি না কেন সুখি থাকি না, আর সবসময় মনে হয় অন্য কোথাও গেলে ভালোভাবে থাকব । তাই ! পাশের গ্রামে গত মেলার সময়ে, আমি তিনজন লোককে দেখলুম যারা অমনভাবে থাকে, যেমনভাবে আমি থাকতে চাই । তোমরা তাদের দেখোনি, তোমরা সবাই । তারা ছিল বিশালদেহ, ময়লা চামড়া, প্রায় কালো, আর যদিও ছেঁড়া পোশাকে তবুও বেশ গর্বিত, মনে হচ্ছিল আর কোনো মানুষের প্রয়োজন ওদের নেই । যখনই বাজনা বাজাতো  ওদের বড়ো-বড়ো নম্র চোখ আলোকিত হয়ে উঠতো; এমন চমৎকার সঙ্গীত যে তোমাদের কখনও মনে হবে নাচি, কখনও মনে হবে কাঁদি, কিংবা দুটোই একই-সঙ্গে করি, আর বেশিক্ষণ শুনলে তোমরা যেন পাগল হয়ে যাবে । যে বেহালা বাজাচ্ছিল সে যেন কোনো দুঃখের বর্ণনা করছিল, আরেকজন, নিজের কাঁধে ঝোলানো ছোটো পিয়ানোর চাবিতে ঘা মেরে যেন অন্য লোকটার দুঃখকে ঠাট্টা করছিল, আর তৃতীয়জন মাঝে মাঝে তার খঞ্ঝনি বেশ জোরে বাজাচ্ছিল । তারা নিজেদের নিয়ে এতো হাসিখুশি ছিল যে বুনো সঙ্গীত বাজাতেই থাকলো, এমনকি জনগণ বিদায় নেবার পরেও । শেষে, ওদের দেয়া পয়সাকড়ি কুড়িয়ে, পিঠে নিজেদের বস্তা নিয়ে চলে গেলো । আমি, আমি জানতে চাইছিলুম ওরা কোথায় থাকে, আর জঙ্গলের প্রান্ত পর্যন্ত ওদের অনুসরণ করলুম, সেখানে গিয়ে জানতে পারলুম যে ওরা কোথাও থাকে না ।

“ওদের একজন বলল : ‘আমরা কি তাঁবুটা খাটাবো ?’

“‘না, মোটেই নয়,’ আরেকজন বলল, ‘এতো সুন্দর আজকের রাতটা !”

“তৃতীয়জন, দিনের রোজগার গুণে নিয়ে, বলল, ‘এই লোকগুলো সঙ্গীত বোঝেনা, আর ওদের মহিলারা ভাল্লুকের মতন নাচে । ভাগ্য ভালো যে এক মাসের মধ্যে আমরা অস্ট্রিয়ায় গিয়ে থাকবো, সেখানে পছন্দের লোকজন পাওয়া যাবে ।’

“আমরা স্পেনে গেলে ভালো হয়, কেননা ঋতু ক্রমশ পালটাচ্ছে ; বৃষ্টিকে এড়াতে হবে, আর এমন জায়গায় যেতে হবে যেখানে গলা ভেজানো যায়’, আরেকজন বলল ।

“দেখছো তো, আমার সবই মনে আছে । তারপর ওরা এক গ্লাস করে ব্র্যাণ্ডি খেয়ে ঘুমোতে গেল, সেখানে শুয়ে, নক্ষত্রদের দিকে মুখ করে । প্রথমে, আমি ভেবেছিলুম ওদের অনুরোধ করব আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে আর ওদের যন্ত্রসঙ্গীত শেখাতে ; কিন্তু আমার সাহস হলো না, তার কারণ বড়োসড়ো নির্ণয় নেয়া বেশ কঠিন, আর আরও কারণ হলো যে আমার ভয় করতে লাগল ফ্রান্স ছাড়ার আগেই আমি ধরা পড়ে যেতে পারি।”

বাকি তিন জন বন্ধুর অনাগ্রহ আমাকে চিন্তা করতে বাধ্য করল যে এই ছোটো ছেলেটিকে আগে থেকেই ভুল বোঝা হয় । আমি ওকে খুঁটিয়ে দেখলুম ; ওর চোখেমুখে সেই অননুভবনীয়, 

বালপ্রৌঢ় সর্বনাশের রেশ দেখা যাচ্ছে যা সাধারণত সমবেদনাকে বেমানান করে দেয় কিন্তু যা, আমি ঠিক জানি না কেন, উত্তেজিত বোধ করলুম, সহসা অদ্ভুত ভাবনায় আক্রান্ত হয়ে, যে, আমার হয়তো এক ভাই ছিল যার কথা কখনও শুনিনি ।

সূর্য অস্ত গেল । বিষণ্ণ রাত দখল নিলো । ছেলেগুলো যে যার পথে এগোলো, কিন্তু ওরা কেউই জানত না, নিজের-নিজের নিয়তিকে পরিস্হিতি আর ঘটনাক্রম অনুযায়ী কেমন করে হাসিল করতে হয়, বন্ধুকে বদনাম করতে হয়, আর শৌর্যকে ঘিরে পাক খেতে হয় , কিংবা অপমানের পথে যেতে হয়।

বত্রিশ

নাচের ফুলছড়ি ( থায়েরসাস )

ফ্রানৎস লিৎসের জন্য

নাচের ফুলছড়ি কি জিনিস ? নৈতিক আর কাব্যিক দৃষ্টিতে, তা পুরুষ-পুরোহিত ও নারী-পুরোহিতদের হাতে-ধরা দেবী-দেবতাদের উৎসব পালনের যাজকীয় নিশান, যাঁদের তারা ব্যাখ্যাকারী আর চাকর । কিন্তু বাস্তবে তা একটা ছড়ি, কেবল একটা ছড়ি, যেমন আঙুরলতাকে তোলার জন্য ব্যবহার হয়, শুকনো, অনমনীয়, আর ঋজু । ছড়িতে জড়ানো থাকে ডালপালা আর ফুল যা সাপের খেয়ালি ভঙ্গীতে খেলে, দোল খায়, কয়েকটা আঁকাবাঁকা আর আঁকড়ানো, কয়েকটা ঘণ্টার মতন ঝোলা কিংবা যেন ওলটানো কাপের মতন । এবং এক পরমোৎকৃষ্ট চমৎকারিত্ব গড়ে ওঠে রেখা ও রঙের এই জটিলতা থেকে, কখনও কোমল, কখনও সপ্রতিভ । 

মনে হয় না কি যে বেঁকা  আর জড়ানো রেখা সোজা রেখাটাকে সেলাম করছে, মূক সমাদরে তাকে ঘিরে নাচছে ?  মনে হয় না কি এই সমস্ত সূক্ষ্ম পরাগ, এই সমস্ত পাপড়ি, গন্ধে আর রঙে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে, পৌরোহিত্যের ছড়িটার চারিধারে স্পেনীয়দের রহস্যময় ফানডানগো নাচছে?

এবং তবু, কোন সে ধৃষ্ট নশ্বর যে নির্ণয় নেবার সাহস দেখাবে যে ফুলগুলো আর লতাগুলো ছড়িটার জন্যই বানানো, কিংবা ফুলগুলো আর লতাগুলোর সৌন্দর্য প্রকাশের জন্য ছড়িটা কেবল একটা ছুতো ? থায়েরসাস নামের ফুলছড়ি হলো দ্বৈততার আশ্চর্য প্রতিনিধি, ক্ষমতাবান এবং শ্রদ্ধেয় পরিচালক, রহস্যময় ও আবেগপ্রবণ সৌন্দর্যের প্রিয় মদ্যপ । অদৃশ্য মদ্যদেবতার দ্বারা উত্তেজিত কোনও সমুদ্রপরী নিজের উন্মাদ সঙ্গিনীদের মাথার ওপরে ফুলযষ্টি নাড়ায়নি, তোমার মতন কর্মশক্তি আর কামখেয়াল নিয়ে, যখন তুমি তোমার প্রতিভাকে তোমার ভ্রাতৃবৃন্দের হৃদয়কে প্রভাবিত করার কাজে লাগাও । — ছড়িটা তোমার ইচ্ছাশক্তি, ঋজু, শক্ত আর অপ্রতিরোধ্য ; ফুলগুলো তোমার ইচ্ছাশক্তিকে ঘিরে ঘুরে বেড়ানো কল্পনা ; তারা পুরুষের চারিধারে এক পায়ে নৃত্যরতা ঝলমলে নারীউপাদান । সোজা রেখা, জালিদার রেখা, অভিপ্রায় ও অভিব্যক্তি, ইচ্ছাশক্তির ন্যায়পরায়ণতা, শব্দের সর্পিলতা, বিভিন্ন উপায়ে একটি মাত্র লক্ষে পৌঁছানোর প্রয়াস, প্রতিভার সর্বশক্তিময় ও অদৃশ্য মিশ্রণ : কোন সে বিশ্লেষক যার ঘৃণ্য সাহস হবে তোমাকে খণ্ডন ও পৃথক করতে ?

প্রিয় লিৎস, কুয়াশার মধ্যে দিয়ে, নদীদের ওই পারে, শহরের ওপরে পিয়ানোগুলো তোমার গৌরবের গান গায়, যেখানে ছাপার প্রেসগুলো তোমার জ্ঞানের অনুবাদ করে, যে দেশেই তুমি থাকো না কেন, অনন্তকালীন শহরের বৈভবে হোক কিংবা স্বপ্নময় দেশের কুয়াশায়,  তোমাকে সান্ত্বনা দেবেন বিয়ারের রাজা ক্যামব্রিনাস, তোমার মনোরম কিংবা দুঃখের গানকে নতুন সুরে বাঁধবে, কিংবা কাগজকে গোপনে জানাবে তোমার  নিগূঢ় ধ্যানের কথা, শাশ্বত আনন্দ ও ক্ষোভের গায়ক, দার্শনিক, কবি, এবং শিল্পী, তোমার অমরত্বকে আমি সেলাম করি !

তেত্রিশ

নিজেকে মাতাল করে তোলো

তোমার উচিত সদাসর্বদা মাতাল থাকা । এটাই আসল তর্কবিন্দু, একমাত্র প্রশ্ন । সময়ের ভয়ঙ্কর চাপ যাতে তোমার কাঁধ ভেঙে তোমাকে মাটির দিকে নুইয়ে না দেয়, তাই তোমাকে অবিরাম মাতাল থাকতে হবে ।

কিন্তু কিসে মাতাল ? মদে, কবিতায়, সততায়, যা তোমার পছন্দ । কিন্তু তোমাকে মাতাল থাকতে হবে ।

আর কখনও কোনো সময়ে, কোনো প্রাসাদের সিঁড়িতে অথবা অবতলের সবুজ ঘাসে কিংবা তোমার ঘরের নিঃসঙ্গতায়, তুমি যদি জেগে উঠে বোঝো যে তোমার মাতলামি কমে এসেছে বা ফুরিয়ে গেছে, তাহলে বাতাসকে, ঢেউদের, নক্ষত্রদের, পাখিদের, ঘড়িকে, যা-কিছু বয়ে চলে যায় তাদের, যা-কিছু গোঙায়, যা-কিছু গড়িয়ে চলে যায়, যা-কিছু দীর্ঘশ্বাস ফেলে, যা-কিছু কথা বলে, তাদের প্রশ্ন কোরো এখন কয়টা বাজে, আর জবাবে বাতাস, ঢেউ, নক্ষত্র, পাখি, ঘড়ি বলবে : “এটা মাতাল হবার সময় ! তাই যদি তুমি সময়ের একজন  কেনা গোলাম শহিদ হতে না চাও, তাহলে নিজেকে মাতাল করে তোলো ; নিজেকে সদাসর্বদা মাতাল করে রেখো ! মদে, কবিতায়, কিংবা সততায়, যা তোমার পছন্দের ।”

চৌত্রিশ

ইতোমধ্যে !

ইতোমধ্যে একশোবার সূর্য লাফিয়ে উঠেছে, প্রখর বা অন্ধকারাচ্ছন্ন, সমুদ্রের বিরাট চৌবাচ্চা থেকে, যার পরিধি দেখা দুষ্কর ; একশোবার ফেরত ডুব মেরেছে, ঝলমলে বা মনমরা, নিজের সান্ধ্য স্নানে । অনেকদিন যাবত আমরা নভোমণ্ডলের অপর পারকে অনুমান করতে পেরেছি এবং উপজাতিদের গাগনিক অক্ষরমালার মর্মার্থ বের করতে পেরেছি । এবং প্রতিটি যাত্রী বিলাপ করেছে আর কাতরেছে । যেন ডাঙার কাছাকাছি পৌঁছোবার কারণে তাদের দুর্দশা বৃদ্ধি পেয়েছে।

“কখন, কখন,” ওরা জানতে চেয়েছে, আমরা ঢেউদের উথালপাথালে পাওয়া ঘুম আর ঘুমোবো না, বাতাস এমন নাক ডাকছে যা আমাদের নাক ডাকার তুলনায় বেশি আওয়াজ করছে কেন ?

কখন আমরা মাংস খেতে পাবো যা আমাদের বয়ে নিয়ে যেতে থাকা অভিশপ্ত পঞ্চভূতের দেয়া এতো নোনতা নয় ? কখন আমরা স্হির আরামদায়ক চেয়ারে বসে খাবার হজম করতে পারবো?”

তাদের মধ্যে এমন অনেকে ছিল যারা নিজের ভিটেমাটির কথা ভাবছিল, যাদের মনকেমন করছিল তাদের বিশ্বাসঘাতক, গোমড়া বউদের আর এঁড়ে বাচ্চাদের জন্যে । আর অনুপস্হিত ডাঙার জন্য এমন পাগল হয়ে উঠেছিল যে, আমার বিশ্বাস, গবাদি পশুদের চেয়ে বেশি উৎসাহে ওরা ঘাস খেয়ে নিতো । শেষে, তীরভূমি দেখতে পাওয়া গেল ; আর আমরা তার কাছাকাছি পৌঁছোলে, দেখতে পেলুম তা ছিল এক চমৎকার, চোখধাঁধানো দেশ । মনে হলো যেন জীবনের নানা রকম সঙ্গীত এক অস্পষ্ট মর্মরধ্বনিতে সেখানে উৎসারিত হচ্ছে, আর তার তীরভূমি, সব রকমের সবুজে ছত্রালাপ, ফুল এবং ফলের স্বাদু সুবাস চতুর্দিকে ভাসিয়ে দিচ্ছে।

হঠাৎই সবাই আনন্দিত হয়ে উঠলো, প্রত্যেকে নিজেকে তার বাজে মনস্হতি থেকে মুক্ত করল । ভুলে গেল ঝগড়াঝাঁটি, মাফ করে দিল পরস্পরের  দোষ ; যে দ্বন্দ্বযুদ্ধগুলো হবার ছিল সেগুলো স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা হলো, আর ধোঁয়ার মতন উবে গেল গোঁসা ।

আমি একা ছিলুম মনমরা, ধারণার অতীত মনখারাপ । একজন পুরোহিতের মতন, যার কাছে তার দেবতাকে কেড়ে নেয়া হয়েছে, হৃদয়বিদারক তিক্ততা ছাড়া,আমি নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারছিলুম না, সমুদ্রের দানবিক আকর্ষণ থেকে, যে সমুদ্র তার ভয়ানক সারল্যে অসংখ্যপ্রকারে বিভিন্ন, যে সমুদ্রে, মনে হচ্ছিল নিজের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছে আর প্রতিনিধিত্ব করছে তার কৌশলের, লোভনীয়তার, ক্ষোভের, হাসির, মেজাজের, যন্ত্রণার এবং যতো রকমের আত্মা এতাবৎ বেঁচেছিল, বেঁচে আছে কিংবা বেঁচে থাকবে তার আহ্লাদময় সমুদ্র !

সেই তুলনাহীন সৌন্দর্যকে বিদায় জানিয়ে, আমার মনে হলো আমাকে আধমরা করে মেরে ফেলা হয়েছে ; আর সেই জন্যেই, যখন আমার সহযাত্রীদের প্রত্যেকে বলল, “যাক শেষ হলো!” আমি শুধু বলতে পারলুম, “ইতোমধ্যে !”

আর তবু, এইটেই তো পৃথিবী, ধ্বনিময়, আবেগময়, বস্তুময় এবং উৎসবময় এই পৃথিবী ; এ ছিল ঐশ্বর্যময় এবং চমৎকার পৃথিবী, প্রতিশ্রুতিপূর্ণ, আমদের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে গোলাপের, কস্তুরীর এক রহস্যময় সুগন্ধ, তার সঙ্গে প্রণয়লীলার হর্ষধ্বনিতে গুঞ্জরিত জীবনের কতোরকম সঙ্গীত ।

পঁয়ত্রিশ

জানালাগুলো

একজন লোক দাঁড়িয়ে জানালার বাইরে যতো রকমের ব্যাপার দেখতে পায়, তার চেয়ে বেশি ব্যাপার দেখতে পায় সেই মানুষ যে বন্ধ জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে । মোমবাতিতে আলোকিত জানালার মতন আর কোনো বস্তুকে অতো বেশি প্রগাঢ়, অতো বেশি রহস্যময়, অতো বেশি ফলপ্রসূ, অতো বেশি ছায়াময়, অতো বেশি ঝলমলে দেখায় না । যা প্রকাশ্য দিনের আলোয় দেখা যায় তা জানালার পেছনের ঘটনার তুলনায় কম আগ্রহসঞ্চারী । ওই অন্ধকার অথবা আলোকিত গবাক্ষে, জীবন বেঁচে থাকে, জীবন স্বপ্ন দেখে, জীবন যন্ত্রণাভোগ করে।

ছাদের ঢেউগুলোর ওপর দিয়ে, আমি একজন সম্পূর্ণাঙ্গ নারীকে দেখতে পাই, যে এখনই লোলচর্ম, গরিব, সব সময়ে কিছুর দিকে ঝুঁকে আছে, কখনই বাইরে বেরোয় না — আর তার মুখাবয়ব লক্ষ্য করে, পোশাকের মাধ্যমে, অঙ্গভঙ্গী দেখে, কোনো জিনিসপত্র ছাড়াই, আমি এই নারীর ইতিহাস নতুন করে গড়ে নিয়েছি, কিংবা তার কিংবদন্তিকে, আর অনেক সময়ে তা নিজেকে শোনাই, চোখে অশ্রুজল নিয়ে । যদি কোনো গরিব পুরুষ হতো তার ইতিহাসও আমি তাড়াতাড়ি গড়ে ফেলতে পারতুম ।

আমি বিছানায় শুতে যাই, গর্ব বোধ করি যে নিজেকে ছাড়া অন্য লোকেদের জীবনের যন্ত্রণাতে আমি বেঁচে থেকেছি ।

তুমি হয়তো জানতে চাইবে, “তুমি কি নিশ্চিত যে এই কিংবদন্তি সত্য ?” কিন্তু তাতে কীই বা এসে যায়, আমার বাইরে যে বাস্তবের অবস্হান, তা যদি আমাকে অনুভব করতে সাহায্য করে আর আমি কে তা জানায় ?

ছত্রিশ

আঁকার ইচ্ছা

লোকটা হয়তো মানুষ হিসাবে দুর্দশাগ্রস্ত, কিন্তু সে আকাঙ্খায় বিদীর্ণ একজন সুখী শিল্পী !

আমি তাকে আঁকতে চাই যে আমাকে অনেক কম দেখা দিয়েছে, যে আমার কাছ থেকে দ্রুত পালিয়েছে, সেইরকম সুন্দর অনুতাপের জিনিসের মতন যা রাতের দ্বারা প্রভাবিত একজন পর্যটক, ফেলে চলে যায় । কতোকাল হলো সে উধাও হয়ে গেছে !  

সে সুন্দরী, সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি সুন্দরী : সে অবাক-করা । অন্ধকার তার মধ্যে উপচে পড়ে: আর যা-কিছুকে সে অনুপ্রাণিত করে তা নিশিময় ও গভীর । তার চোখ দুটি আশ্রয়নিবাস যার মধ্যে রহস্য আবছাভাবে জ্বলজ্বল করে, আর তার চাউনি বিদ্যুতের মতন ঝলকে ওঠে : যেন ছায়াদের বিস্ফোরণ । যদি কেউ আলো-ছড়ানো ও আনন্দময় কালো নক্ষত্রের কল্পনা করতে পারে, আমি তাকে কালো সূর্ষের সঙ্গে তুলনা করতে পারি । কিন্তু ও সাবললীলতায় আমাকে চাঁদের কথা মনে পড়ায়, যা ওর ওপর নিশ্চয়ই প্রচণ্ড প্রভাব রেখে গেছে ; রাখালি কবিতার শ্বেত চাঁদ নয়, শীতল স্ত্রীর মতন নয়, বরং অমঙ্গলময় নেশাধরানো চাঁদ, ঝড়ের রাতের গভীরতায় নিলম্বিত, এমন এক রাত যে দ্রুতগামী মেঘেদের পরস্পরের রেশারেশি চলছে সেখানে ; শান্তিময়, গোপন চাঁদ নয় যে পবিত্র লোকেদের স্বপ্নে দর্শন দেয়, বরং আকাশ থেকে ছিঁড়ে নামানো চাঁদ, পরাভূত ও দ্রোহী, যাকে  আতঙ্কিত ঘাসের ওপরে নাচতে বাধ্য করেছিল থেসালিয়ার করালদর্শন ডাইনিরা ! তার সরু ভ্রুর তলায় বাস করে এক একগুঁয়ে ইচ্ছা আর শিকারের প্রতি ভালোবাসা । কিন্তু এই অশান্তিকর মুখাবয়বের  তলার দিকে, সর্বদা স্ফূরিত নাসারন্ধ্রের অজানা ও অসম্ভব শ্বাসের কাঁপুনিতে, বিস্তৃত মুখগহ্বরের হাসি  অবর্ণনীয় মাধুর্যে ঝলকায় , লাল এবং শ্বেত, এবং স্বাদু, যা দেখে যে কেউই আগ্নেয়গিরির ঢালে ফুটে থাকা অলৌকিক ফুলের স্বপ্ন দেখবে। এমন নারীরা আছেন যাঁরা তাঁদের জয় ও সঙ্গদান করার প্রেরণা যোগান ; কিন্তু এই নারী জাগিয়ে তোলেন মৃত্যুর আকাঙ্খা, ধীরে, তাঁর দৃষ্টির গভীরে ।

সাঁইত্রিশ

চাঁদের আনুকূল্য

তুমি যখন দোলনায় শুয়েছিলে তখন চাঁদ, খামখেয়ালের মূর্ত প্রতিমা, জানালা দিয়ে তোমাকে দেখেছিল, আর বলেছিল : “আমি এই বাচ্চাটাকে পছন্দ করি।”

এবং ভেড়ার সলোম চামড়ার মতন নরম, মেঘের সিঁড়ি বেয়ে তিনি নেমে এলেন, শব্দ না করে জানালা দিয়ে চলে গেলেন । তারপর মায়ের নমনীয় কোমলতায় তিনি তোমার ওপরে ছড়িয়ে পড়লেন, ওনার রঙগুলো রেখে গেলেন তোমার মুখাবয়বে । এই কারণেই তোমার চোখের তারা সবুজ, আর তোমার গালদুটো অত্যধিক ফ্যাকাশে । আর এই আগন্তুকের কথা মনে করে তোমার চোখদুটো অস্বাভাবিক বড়ো হয়ে উঠলো ; আর এমন কোমলতায় তিনি তোমার গলা জড়িয়ে ধরলেন, যে তবে থেকে তোমার ফোঁপাতে ইচ্ছে করেছে । তবু, তাঁর ছড়িয়ে পড়া আনন্দে, চাঁদ সারা ঘরকে অনুপ্রভার বাতাবরণে ভরে তুললো, আলোকময় বিষের মতন ; আর এই জীবন্ত আলো ভাবলো, আর বললো : “তুমি চিরকাল আমার চুমুর প্রভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করবে। তোমার সৌন্দর্য হবে আমার । যা আমি ভালোবাসি তুমিও তাই ভালোবাসবে, আর যা-কিছু আমাকে ভালোবাসবে : জল, মেঘ, স্তব্ধতা, এবং রাত্রি ; বিশাল সবুজ সমুদ্র ; আঙ্গিকহীন ও বহুআঙ্গিকের জল ; যে জায়গায় তুমি নেই ; যে প্রেমিককে তুমি জানো না ; দানবিক ফুলদল ; বিভ্রম সৃষ্টিকারী সুগন্ধ ; পিয়ানোর ওপর শুয়ে থাকা বিড়ালের নারীসুলভ খসখসে গলায়, মিষ্টি সুরের কাতরানি, সমস্তকিছু !

“আর আমার প্রেমিকরা তোমাকে ভালোবাসবে, যারা আমার সঙ্গ দেয় তারা তোমায় সঙ্গ দেবে। তুমি হবে সবুজ-চোখ পুরুষদের রানি যাদের কন্ঠকে আমি নিশির আদরে জড়িয়ে ধরেছি ; যারা সমুদ্রকে ভালোবেসেছে, বিশাল, প্রাণবন্ত এবং সবুজ সমুদ্রকে, আঙ্গিকহীন ও বহুআঙ্গিকের জল, যে প্রাসাদ নেই, যে নারীদের তারা চেনে না, অজানা ধর্মের ধুপধুনোর মতন ভয়ানক ফুলদল, যে সুরভি ইচ্ছাশক্তিকে বিরক্ত করে, এবং আরণ্যক, কামনাময় পশুরা যারা উন্মাদনার প্রতিনিধি ।”

আর সেই কারণেই, অভিশপ্ত, প্রিয়, নষ্ট আমার শিশু, এখন আমি তোমার পায়ের কাছে শুয়ে আছি, তোমার প্রতিটি অঙ্গে ভয়াবহ ঐশ্বরিকতার প্রতিফলন চাইছি, মারাত্মক ধর্মমাতা, সমস্ত উন্মাদদের বিষাক্ত সেবিকা ।

আটত্রিশ

কোনটা আসল ?

আমি একজন বেনেডিক্টাকে জানতুম, যার থেকে আদর্শময়তার ছটা বিস্ফারিত হতো, যার চোখ মহৎ হবার সদিচ্ছার বীজ বপন করতো, সৌন্দর্ষের জন্য, খ্যাতির জন্য, আর সমস্তকিছু যা আমাদের অবিনশ্বরতায় বিশ্বাস জন্মায় তার জন্য। কিন্তু এই ঐন্দ্রজালিক মেয়েটি বেশিদিন বাঁচার তুলনায় বড়ো বেশি সুন্দরী ছিল ; তার সঙ্গে আমার দেখা হবার কয়েকদিন পরেই সে মারা গেল, আর আমিই তাকে গোর দিয়েছিলুম, তা ছিল বসন্তকাল, গোরস্তানেও তার ধুপধুনো উড়িয়েছিল । আমিই তাকে গোর দিয়েছিলুম, সুগন্ধী ও নিষ্পাপ কাঠের কফিনে বন্ধ করে, ভারত থেকে আসা সিন্দুকের মতন ।

আর আমার ঐশ্বর্য বিদায় নিয়েছিল, যখন সেদিকে তাকিয়ে ছিলুম, আমি হঠাৎ দেখলুম একজন ছোটোখাটো তরুণী যাকে দেখতে হুবহু মৃতার মতন, আর যে, টাটকা মাটিকে পাগলের মতন অদ্ভুত হিংস্রতায় খুঁড়ছিল, হাসিতে ফেটে পড়ে বলে উঠলো : “আমিই, বাস্তবের বেনেডিক্টা! আমিই, একজন বিখ্যাত বারবণিতা ! আর তোমার পাগলামির আর তোমার অন্ধত্বের শাস্তি হিসাবে আমি যেমন তেমনই তুমি আমাকে ভালোবাসবে !”

কিন্তু আমি, ভয়ানক রেগে গিয়ে, জবাবে বললুম, “না ! না ! না !”  এবং আমার প্রত্যাখ্যানকে গুরুত্ব দেবার জন্য, মাটিতে আমার পা এতো জোরে ঠুকলুম যে নতুন কবরের ভেতরে আমার পা হাঁটু পর্যন্ত সেঁদিয়ে গেল, আর ফাঁদে পড়া নেকড়ের মতন, আমি টিকে আছি, বোধহয় চিরকালের জন্য, পরমাদর্শের কবরে বাঁধা অবস্হায় ।

উনচল্লিশ

বিশুদ্ধ বংশজাত

মেয়েটি নিঃসন্দেহে কুৎসিত । তা সত্বেও সে উপাদেয় !

সময় ও প্রেম তাদের নখ দিয়ে তার গায়ে আঁচড় দিয়েছে আর তাকে নিষ্ঠুরভাবে শিখিয়েছে যে প্রতিটি মিনিট ও প্রতিটি চুমু তার যৌবন আর তার নতুনত্বকে ফুরিয়ে দিয়েছে ।

মেয়েটি সত্যিই কুৎসিত ; পিঁপড়ের মতন, মাকড়সার মতন, এমনকি কঙ্কালের মতন, যদি তুমি ওকে চাও ; কিন্তু একই সঙ্গে মেয়েটি একরকম মলম, ইন্দ্রজাল, ডাকিনিবিদ্যা ! সংক্ষেপে, মেয়েটি নিখুঁত চমৎকারীত্বপূর্ণ । সময় ওর চলনভঙ্গীমার ঐকতান ভাঙতে পারেনি বা ওর দেহবল্লরীর অভঙ্গুর সৌষ্ঠব নষ্ট করতে পারেনি । প্রেম ওর শিশুসূলভ শ্বাসের মিষ্টতাকে নষ্ট করতে পারেনি ; এবং ওর কেশরের প্রাচুর্য হ্রাস করতে পারেনি সময়, যা এখনও নিঃশ্বাস ফেলে, কস্তুরি সুগন্ধে, দক্ষিণ ফ্রান্সের আরণ্যক প্রাণবন্ততা : নাইম, একস, আর্লে, অ্যাভিনিও, নাবোন, তুউল, সূর্যের আশীর্বাদপ্রাপ্ত  শহর, প্রণয়লীলার ও পুলকের !

সময় ও প্রেম মেয়েটির অস্তিত্বে তীব্র ক্ষয় ঘটাতে চেয়েছে কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে ; ওর বালকসূলভ বুকের অস্পষ্ট ও শাশ্বত জাদুকে তারা একটুও কমাতে পারেনি ।

হয়তো জীর্ণতাপ্রাপ্ত কিন্তু অব্যবহার্য হয়নি, আর চিরকালের জন্য বীরাঙ্গনা, মেয়েটি তোমাকে সেইসব অভিজাত-বংশজাতদের কথা মনে পড়ায় যা প্রকৃত রসপণ্ডিতেরা সবসময় চিহ্ণিত করতে পারেন, এমনকি কোনো ভাড়াকরা ঘোড়ার গাড়িতে হোক বা ফালতু ঠেলায় সে বসে থাকুক।

আর তাছাড়া  মেয়েটি বেশ  মিষ্ট প্রকৃতির আর কতো ঐকান্তিক ! লোকে যেমন হেমন্তকালকে ভালোবাসে মেয়েটি সেইভাবেই ভালোবাসা জানায় ; যেন আগত শীত তার হৃদয়ে নতুন আগুন জ্বেলেছে, আর তার কোমলতায় যে বশ্যতা তা কখনও ক্লান্তিকর নয় ।

চল্লিশ

আয়না

একজন  বীভৎস লোক ভেতরে ঢুকে এসে আয়নায় নিজের দিকে তাকালো ।

“তুমি কেনই বা নিজেকে আয়নায় দ্যাখো, যখন কিনা তুমি সম্ভবত নিজেকে অপছন্দ করা ছাড়া অন্য কিছু দেখবে না ?’

বীভৎস লোকটি জবাবে আমাকে বলল : “স্যার, ১৭৮৯ সালের অপরিবর্তনীয় আইন অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষের আছে সমান অধিকার ; অতএব, আমারও অধিকার আছে আয়নার দিকে তাকানোর : তা পছন্দের হোক বা অপছন্দের তা অন্য কারোর মাথা ঘামাবার ব্যাপার নয়, কেবল আমার ব্যাপার।”

শুভবুদ্ধির তর্কে আমি নিশ্চয়ই ঠিক ছিলুম ; কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে, লোকটাও ভুল ছিল না।

একচল্লিশ

বন্দর

জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত আত্মার বিশ্রামের জন্যে একটা বন্দর খুবই ভালো জায়গা। আকাশের বিস্তার, মেঘেদের ভ্রাম্যমান স্হাপত্য, বদলাতে থাকা সমুদ্রের রঙ, লাইটহাউসগুলোর ঝিলমিলে আলো চোখদুটোকে ক্লান্তি না দিয়ে তাদের আনন্দ দেবার চমৎকার ত্রিপার্শ্বকাচ । জাহাজগুলোর এগিয়ে চলা আকার, তাদের জটিল দড়িদড়া-মাস্তুলসহ, যা সমুদ্রের ঐকান্তিক ঢেউগুলোর সন্ধান পায়, আত্মার সৌন্দর্য ও ছন্দের স্বাদ বজায় রাখতে সাহায্য করে । আর তাছাড়া, রয়েছে একধরনের রহস্যময়, অভিজাত আনন্দ, বিশেষ করে সেই লোকগুলোর জন্যে মনঃসংযোগ করার জন্য যাদের কৌতূহল বা উচ্চাকাঙ্খা নেই, আচ্ছাদিত জায়গায় শুয়ে কিংবা জেটির খুঁটিতে হেলান দিয়ে, যারা চলে যাচ্ছে আর যারা ফিরে আসছে তাদের চলাফেরা দেখা, যাদের এখনও যা ইচ্ছে চাইবার কর্মশক্তি বজায় আছে, পর্যটনে বেরোবার বা ধনী হবার আকাঙ্খা রয়েছে।

বিয়াল্লিশ

রক্ষিতাদের প্রতিকৃতি

খাসকামরার পুরুষ রূপান্তরণে — অর্থাৎ, জমকালো এক জুয়াখানার লাগোয়া তামাক ফোঁকার ঘরে — চারজন লোক বসে ফুঁকছিল আর কথা বলছিল । তারা ঠিক যুবক নয় আবার বুড়োও নয়, সৌম্যকান্তি নয় কুৎসিতও নয় ; কিন্তু যুবক হোক বা বুড়ো, তাদের চোখেমুখে ছিল মজায় জীবন কাটাবার ঝানুদের নির্ভুল ছাপ, সেই অবর্ণনীয় কিছু-একটা, সেই শীত আর ব্যঙ্গমাখা বিষাদ যা ব্যথায় ঘোষণা করে : “আমরা আশ মিটিয়ে বেঁচে নিয়েছি, আর এখন আমরা খুঁজছি এমনকিছু যা আমরা ভালোবাসতে আর সমাদর করতে পারি ।”

ওদের একজন আলোচনার বিষয়বস্তু নারীদের দিকে নিয়ে গেল । তাদের সম্পর্কে কথা না বলাই দার্শনিকভাবে ভালো ছিল ; কিন্তু কিছু চালাক মানুষ আছে যারা, যৎসামান্য মদ টানার পর, ফালতু আলোচনাকেও বাতিল করবে না । তেমন অবস্হায়, যে কথা বলছে তার দিকে কান দিতে হয়, যেমনভাবে লোকে নৃত্যসঙ্গীত শোনে ।

“প্রতিটি মানুষ”, সে বলছিল, “তার দেবদূতের মতন কালখণ্ড কখনও নিশ্চয়ই কাটিয়েছে ; তা হলো সেই সময় যখন, বনপরীর অভাবে, লোকে জেনেশুনে ওকগাছের গুঁড়িকে জড়িয়ে ধরে । এটা হলো প্রেমের প্রথম ধাপ । দ্বিতীয় ধাপে লোকে বাছবিচার করে । ধীর ও সতর্ক হওয়ার স্তরে ইতোমধ্যে সে সৃজনীশক্তিচ্যুত হয়ে গেছে । এইটাই হল সেই সময় যখন একজন মনঃস্হির করে নিয়ে সৌন্দর্যের অনুসন্ধানে ব্যপৃত হয় । কিন্তু আমার ক্ষেত্রে, বন্ধুগণ, আমি গর্বিত যে শেষ পর্যন্ত যৌবনান্তকালীন পর্বে পৌঁছেচি, তৃতীয় ধাপে, যেখানে সৌন্দর্যই সবকিছু নয় যদি না তা সুগন্ধ, সুশ্রী পোশাক ইত্যাদির দ্বারা পরিপক্ক হয় । এবং আমি স্বীকার করছি যে অনেকসময়ে আমি চেয়েছি, অজানা আশীর্বাদের স্তরে, চতুর্থ ধাপে পৌঁছোতে, যা কিনা পরম শান্তির দ্বারা সংজ্ঞায়িত। কিন্তু আমার সমগ্র জীবনে, বনপরীদের পর্ব ছাড়া, আমি মেয়েদের বিরক্তিকর বোকামি আর অস্বস্তিকর মধ্যমেধা সম্পর্কে অন্য লোকেদের চেয়ে বেশি জানতুম । পশুদের যে ব্যাপারটা আমি বেশি পছন্দ করি তা হলো তাদের সারল্য । তাহলে ভেবে দ্যাখো, আমার শেষ রক্ষিতা আমাকে কতো কষ্ট দিয়েছে । “সে ছিল এক রাজপুত্রের জারজ মেয়ে । সুন্দরী, নিঃসন্দেহে; নয়তো কেনই বা তাকে আমি নিয়ে আসতুম ? কিন্তু মেয়েটা সেই বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে নষ্ট করে ফেললো এক কুরুচিপূর্ণ এবং বিকৃত উচ্চাকাঙ্খার ফলে । সে ছিল এমন নারী যে সবসময় পুরুষের ভূমিকাটা নিতে চাইতো : ‘তুমি তো পুরুষ নও ! আহ, যদি আমি পুরুষ হতে পারতুম ! আমাদের দুজনের মধ্যে, আমিই পুরুষ!’ অমনধারা অসহ্য কথাবার্তা ওর গলা থেকে বেরোতো যে কন্ঠ থেকে আমি চেয়েছিলুম গানের উড়াল । এবং যদি আমার মুখ ফসকে কোনো বই, কবিতা, কিংবা অপেরার সমাদরের কথা বেরোতো, ও তক্ষুনি বলে উঠতো : তুমি কি সত্যিই মনে করো ওটা ভালো ? অবশ্য, তুমি কীই বা জানো কাকে ভালো বলে ?’ আর তারপর তর্কাতর্কি আরম্ভ করে দিতো ।

“একদিন, ও রসায়নের বিষয় আলোচনা করতে চাইলো : আর তারপর থেকে, ওর আর আমার ঠোটের মাঝে কাচের মুখোশ গড়ে উঠলো । তার সঙ্গে শালীনতার ভান । যদি আমি যখন তখন ওর প্রতি সামান্য প্রণয় প্রকাশ করার জন্যে এগোতুম, ও ছিঁড়ে নেয়া ফুলের মতন ঝিমিয়ে পড়তো….”

“ব্যাপারটা কেমন করে শেষ হলো ?” ওদের মধ্যে একজন জানতে চাইলো। “আমি তো তোমার ধৈর্যশীলতা কখনও দেখিনি ।”

“ঈশ্বর,” ও বলল, “রোগের সঙ্গে উপশমও পাঠান । একদিন আমি আমার মিনার্ভাকে দেখতে পেলুম, নিজের জোরালো আদর্শে বুভুক্ষু, আমার চাকরের সঙ্গে দৈহিকভাবে লিপ্ত, যে দৃশ্য দেখে আমি বাধিত হলুম চুপচাপ সরে যেতে যাতে তারা লজ্জায় না ভোগে । সেই সন্ধ্যায় আমি দুজনকেই বরখাস্ত করলুম, তাদের পাওনা টাকাকড়ি মিটিয়ে দিয়ে ।”

“যদি আমার কথা বলি,” যে লোকটা মাঝখানে কথা বলেছিল সে বলল, “আমার তো নিজেকে ছাড়া আর কারোর বিরুদ্ধে নালিশ ছিল না । আনন্দ আমার সঙ্গে বসবাস করতে এলো, অথচ আমি তা বুঝতে পারিনি । বেশিদিন আগের কথা নয়, ভাগ্য আমাকে এক নারীসঙ্গের আনন্দ দান করেছিল যে ছিল খুবই মধুর, অত্যন্ত বশ্য, আর একান্ত অনুরক্ত জীব, আর সবসময় তৈরি ! আর কোনো রকম উৎসাহ ছাড়াই! ‘তোমাকে আনন্দ দেয় বলে আমি একাজ করে খুশি ।’ তা ছিল ওর গতানুগতিক প্রতিক্রিয়া । তুমি ওই দেয়ালে ঠেলে বা এই সোফায় ফেলে ঠুকতে পারো, আর আমার রক্ষিতার ঠোঁট থেকে যে দীর্ঘশ্বাস বেরোতো তার চেয়ে দেয়াল আর সোফা থেকে পাওয়া যেতো একই শ্বাস, এমনকি সঙ্গমের বুনো আস্ফালনের সময়েও । দুজনে এক বছর একসঙ্গে বসবাসের পর, ও স্বীকার করল যে কখনও আনন্দ পায়নি । আমি সেই একতরফা দ্বন্দ্বে ক্লান্ত হয়ে পড়লুম, আর অতুলনীয় মেয়েটি বিয়ে করে ফেললো । পরে, ওকে আবার দেখার রোখ চেপে বসল, আর ও আমাকে ওর ছয়টা সুন্দর বাচ্চা দেখিয়ে বলল, ‘প্রিয় বন্ধু ! স্ত্রী সেরকমই অক্ষতযোনি হয় যেমনটি তোমার রক্ষিতা ছিল।’ ওর কোনো কিছুই বদলায়নি । অনেকসময় আমি আফশোষ করি ; আমার উচিত ছিল মেয়েটিকে বিয়ে করা ।”

অন্য সকলে হেসে উঠলো, আর তৃতীয়জন তার কথা বলা আরম্ভ করলো :

“বন্ধুগণ, আমি কিছু আনন্দ পেয়েছি যা তোমরা হয়তো অবহেলা করেছ । আমি প্রণয়লীলায় হাসিঠাট্টার কথা বলতে চাই, এমন হাসিঠাট্টা যা সমাদর করতে উৎসাহ জাগায় । আমি আমার শেষ রক্ষিতাকে সবচেয়ে বেশি সমাদর করতুম, মনে হয়, যতোটা তোমরা নিজেদের রক্ষিতাকে ঘৃণা করতে বা ভালোবাসতে পারতে । যখনই আমরা কোনো রেস্তরাঁয় ঢুকতুম, কিছুক্ষণ পরে সবাই খাওয়া-দাওয়া ভুলে কেবল ওর দিকেই তাকিয়ে থাকতো । এমনকি বেয়ারারা আর কাউন্টারের মহিলারা ওর ছোঁয়াচে আহ্লাদে প্রভাবিত হতো আর নিজেদের কাজ অবহেলা করতো। সংক্ষেপে, কিছুদিনের জন্য আমি প্রকৃতির একজন জীবন্ত উদ্ভট সৃষ্টির সঙ্গে অন্তরঙ্গ সময় কাটিয়েছি । মেয়েটি খেতো, চিবোতো, কামড়াতো, গোগ্রাসে গিলতো, আর হজম করতো, কিন্তু হালকাভাবে, জগতের সবচেয়ে বেপরোয়া চালে । ও আমাকে অনেককাল যাবত ভাবাবেশে উচ্ছ্বসিত রেখেছিল । ও বলত, মধুর, স্বপ্নালু, ইংরেজি, রোমান্টিক কন্ঠস্বরে ‘আমার খিদে পেয়েছে’ । আর পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দাঁত মেলে, কথাটা দিনের আর রাতের বেলা বারবার বলতো– তোমরা একই সঙ্গে বিচলিত আর আনন্দিত হতে — আমি ওকে মেলায় নিয়ে গিয়ে সর্বগ্রাসী দানবী হিসাবে প্রদর্শনী করে অনেক রোজগার করতে পারতুম । আমি খাইয়ে-দাইয়ে ভালোই রেখেছিলুম ; তবু ও আমাকে ছেড়ে চলে গেল….”

“নির্ঘাৎ কোনো মুদিখানার মালিকের কাছে, নাকি ?”

“সেইরকমই একজন, সৈন্যবাহিনীর মাল সরবরাহকারী কেরানি, কোনো ঐন্দ্রজালিক ছড়ি প্রয়োগ করে লোকটা, বেচারী মেয়েটাকে কয়েকজন সেনার বরাদ্দ খাবারের ব্যবস্হা করে দিতো। আমার তো তাই মনে হয়।”

“আমার কথা যদি বলো”, চতুর্থজন বলল, নারীর অহঙ্কার বলতে সচরাচর যা বোঝায় তার সম্পূর্ণ বিপরীত ব্যাপারের নিষ্ঠুরতা সহ্য করতে হয়েছে আমাকে । আমার মনে হয়, তোমরা বড্ডো ভুল করছ, তোমরা যারা অতিভাগ্যবান নশ্বর মানুষ, তোমাদের রক্ষিতাদের ত্রুটির বয়ান করে-করে !”

এই কথাগুলো বেশ গম্ভীরভাবে বলেছিল,  যে লোকটাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল শান্তস্বভাব এবং আত্মসংবরণশীল, হাবভাব কেরানিদের মতন, ওর মুখাবয়ব ধূসর চোখের পরিষ্কার উজ্বলতায় বলতে চাইছিল : “আমি এটা চাই !” কিংবা, “তোমার ওটা করা উচিত!” কিংবা এমনকি, “আমি কখনও ক্ষমা করি না !” 

“যদি, আমি তোমাকে যতোটা উত্তজক বলে জানি, জি, কিংবা ঢিলেঢালা আর দুর্বল তোমাদের দুজনের মতন, কে আর জে, তোমাদের যদি আমার পরিচিত এক মহিলার সঙ্গে জুটি বেঁধে দেয়া হতো, হয় তোমরা পালিয়ে যেতে কিংবা মারা পড়তে । আমি, আমি টিকে গেলুম, দেখতেই পাচ্ছ। একজন মহিলার কথা ভেবে দ্যাখো যে অনুভব বা বিচারে ভুল করতে অসমর্ধ ; একজন মহিলা যার চরিত্র ভয়ঙ্কর রকম শান্ত, ঠাট্টাইয়ার্কি বা জাঁকজমক ছাড়াই আত্মসমর্পিত, দুর্বলতা ছাড়াই মধুর, উগ্রতা ছাড়াই তেজোময় । আমার প্রেমের কাহিনি আয়নার মতন পালিশকরা পবিত্র পৃষ্ঠতলের ওপর দিয়ে অন্তহীন যাত্রার মতন, মাথাখারাপ-করা একঘেয়েমির, যে আয়নায় আমার নিজের বিবেকের হাস্যকর স্পষ্টতায় প্রতিফলিত হতো আমার যাবতীয় অনুভব আর অঙ্গভঙ্গী, যাতে না আমি আমার অবিচ্ছেদ্য অপচ্ছায়ার তাৎক্ষণিক ভর্ৎসনার যোগ্য কোনো অযৌক্তিক আবেগ বা কাজে জড়িয়ে পড়ি । প্রেমকে মনে হতো শিক্ষার বৈঠক । কতো যে বোকামির কাজ থেকে ও আমাকে বিরত করেছে, যে কাজ না করার দরুন আফশোষ হয় ! আমি রাজি না হওয়া সত্বেও কতো যে ধারদেনা শোধ করিয়েছে ! আমার ব্যক্তিগত মূর্খতা থেকে যে লাভ আমি পেতুম তা থেকে বঞ্চিত করেছে । ভাঙা চলবে না এমন শীতল নিয়মকানুনে বেঁধে সে আমার সমস্ত খামখেয়াল রুদ্ধ করেছে । আর সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হলো যে ও কখনও চায়নি যে বিপদ কেটে যাবার পর ওকে ধন্যবাদ জানাই! কতোবার যে আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছি ওর গলা ধরে চেঁচিয়ে বলি : ‘ওগো দুর্দশাময় নারী, একটু ত্রুটিপূর্ণ হও ! যাতে অসুস্হ আর ক্রুদ্ধ অনুভব না করে তোমাকে ভালোবাসতে পারি !’ অনেক বছর যাবত আমি ওকে সমাদর করেছিলুম, আমার হৃদয়ে ঘৃণা নিয়ে । কিন্তু শেষ পর্যন্ত, আমি সেই ব্যক্তি নই যে মারা পড়ল !”

“হায়”, সবাই বলল, “মেয়েটি মারা গেছে ?”

“হ্যাঁ ! আমি অমনভাবে চালিয়ে যেতে পারছিলুম না । প্রেম আমার কাছে সর্বভূক দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল । বিজয় অথবা মৃত্যু, রাজনীতিকরা যেমন বলে থাকেন, এইটিই ছিল বেছে নেবার পথ যা নিয়তি আমাকে দিয়েছিল । একদিন রাতে, ঝিলের পাশের জঙ্গলে….মনখারাপ করা পায়চারির পর, যে সময়ে ওর দুই চোখে স্বর্গের মাধুর্য প্রতিফলিত হচ্ছিল, আর আমার স্নায়ু ছিঁড়ে যাবার অবস্হায়…”

“কী !”

“ কি বলতে চাইছ !”

“তোমার বক্তব্য কি ?

“ব্যাপারটা ছিল অবশ্যম্ভাবী । অমন ত্রুটিহীন সেবিকাকে পেটানো, অপমান করা, কিংবা ছাঁটাই করা আমার বিবেকের উর্ধ্বে ছিল । কিন্তু সেই বোধের সঙ্গে আমাকে ভারসাম্য রাখতে হলো আমার মধ্যে  প্রাণীটার দেয়া  আতঙ্কের সঙ্গে ; অশ্রদ্ধা না করে প্রাণীটা থেকে মুক্তি পাওয়া দরকার ছিল। তাছাড়া আমি আর কীই বা করতে পারতুম, যখন কিনা মেয়েটা ছিল নিখুঁত ?”

অস্পষ্ট হতচেতন চাউনি মেলে ওর তিন বন্ধু ওর দিকে তাকিয়ে রইলো, যেন না বোঝার ভান করছে এবং যেন অন্তর্নিহিত অর্থোদ্ধার করতে পারছে যে, তাদের কথা যদি বলা হয়, তারা অমন কঠোর কাজ করার যোগ্য নিজেদের মনে করে না, তা যতো বিশ্বাসযোগ্য কথায় ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকুক না কেন ।

তারপর ওরা আরেক প্রস্হ মদ আনতে বলল, সময় নষ্ট করার জন্য, যা জীবনকে নির্দয়ভাবে আঁকড়ে ধরে, আর একঘেয়েমিকে দ্রুতি দিতে পারে ।

তেতাল্লিশ

প্রণায়াভিলাষী লক্ষ্যবেধী

জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ঘোড়ার গাড়িটা যাবার সময়ে, ও চালককে বলল গুলি-চালানো অভ্যাস করার মাঠের কাছে থামতে, বলল যে স্রেফ সময় কাটানোর জন্য কয়েক রাউণ্ড গুলি চালাবার সুযোগের আনন্দ নিতে পারবে । আর দানবটাকে মেরে ফেলা — এটা কি প্রত্যেকের একেবারে মামুলি ও বৈধ পেশা নয় ? — আর ও নিজের প্রণয়াভিলাষী হাত এগিয়ে দিলো ওর প্রিয়, সমধুর, এবং বিরক্তিকর নারীর দিকে, ওর রহস্যময় স্ত্রী যার প্রতি ওর বহু আনন্দদানের দেনা রয়েছে, বহু দুঃখ, এবং ওর প্রতিভার অনেকাংশ ।

লক্ষ্যবিন্দু থেকে দূরে-দূরে কয়েকটা গুলি গিয়ে বিঁধলো, একটা গুলি তো গিয়ে ছাদে আটকে গেলো; আর যখন সুন্দরী প্রাণীটি আপ্রাণ হাসতে আরম্ভ করলো, নিজের স্বামীর অক্ষমতাকে ঠাট্টা করে, লোকটা হঠাৎ নারীটির দিকে ফিরে বলল, “ওখানে ডানদিকে ওই পুতুলটাকে দ্যাখো, বাতাসে নাক উঁচু করে উদ্ধত গোমর দেখাচ্ছে । ওগো ! আমার প্রিয় প্রতিমা, আমি কল্পনা করছি যে ওটা তুমি।” লোকটা চোখ বন্ধ করে ট্রিগার টিপলো । পুতুলটার মাথা সুস্পষ্টভাবে ধড় থেকে আলাদা হয়ে গেল । তারপর নিজের প্রিয়, সমধুর, বিরক্তিকর স্ত্রীর দিকে ঝুঁকে, যে ওর অপরিহার্য এবং নির্দয় অনুপ্রেরণা, হাতে আনত  চুমু খেয়ে বলল, “আহ, আমার প্রিয় প্রতিমা, আমার দক্ষতার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ জানাই !”

চুয়াল্লিশ

সুপ এবং মেঘ

আমার ছোটোখাটো প্রেয়সী ক্ষেপি আমার জন্যে রাতের খাবার রাঁধছিল, আর খাবার ঘরের খোলা জানালা দিয়ে আমি মনোযোগ দিয়ে দেখছিলুম যে বাষ্প থেকে ঈশ্বর কেমন ভাসমান স্হাপত্য গড়ে তোলেন, স্পর্শাতীতের চমৎকার কারুকার্য । আর আমার ভাবনায়, আমি নিজেকে বলছিলুম : “এই সমস্ত মায়ামেঘ ঠিক আমার সুন্দরী প্রেয়সীর সুন্দর চোখের মতন, আমার ক্ষেপির দানবী সবুজ-চোখ যেন ।”

এবং হঠাৎ আমার পিঠে একটা সজোর ঘুষি অনুভব করলুম, আর শুনতে পেলুম এক খসখসে, চমৎকার কন্ঠস্বর, ব্র্যাণ্ডিটানার দরুন গলাভাঙা পাগলি কন্ঠস্বর, আমার ছোটোখাটো প্রেয়সীর কন্ঠস্বর, যে বলছিল, “তাহলে, তুমি তোমার সুপ খেতে চলেছ, মেঘের কারবারী কুত্তির বাচ্চা কোথাকার ?”

পঁয়তাল্লিশ

গুলি চালানো শেখার মাঠ আর গোরস্তান

“এক অসাধারণ সাইনবোর্ড” — গোরস্তান দেখার হোটেল, আমাদের ফেরিঅলা নিজের মনে বলল, “কিন্তু যে কাউকে তৃষ্ণার্ত করে তোলার জন্যে ভালোভাবে তৈরি করা ! নিঃসন্দেহে, হোটেল মালিক হোরেস এবং এপিকিউরাসের কবিশিষ্যদের মর্ম উপলব্ধি করেন । হয়তো প্রাচীন মিশরীয়দের নিগূঢ় বিশোধনের সঙ্গে উনি পরিচিত, যাদের কাছে একটা কঙ্কালের উপস্হিতি ছাড়া কোনো ভোজসভা পূর্ণাঙ্গ হতো না, কিংবা জীবনের স্বল্পস্হায়িতার অন্য কোনো চিহ্ণ।”

আর লোকটা ভেতরে ঢুকে গেল, কবরগুলোর দিকে মুখ করে এক গ্লাস বিয়ার খেলো, এবং ধীরেসুস্হে একটা চুরুট ফুঁকলো । হঠাৎ কোনো খামখেয়ালে আক্রান্ত হয়ে ও গোরস্তানে যাওয়া মনস্হ করল, ঘাসগুলো ছিল উঁচু আর্ আ্‌হ্বায়ক, আর এক ঝকমকে সূর্য সবার ওপর রাজত্ব করছিল ।

সত্যি বলতে কি, মনে হচ্ছিল তীব্র আলো আর তাপ মাতাল সূর্য থেকে ছড়িয়ে পড়ছে, যা চমৎকার ফুলগুলোর ওপরে, যে ফুলগুলোর স্বাস্হ তলাকার পচনের কারণে বেশ পুরুষ্টু, তাদের ওপরে আগাপাশতলা  জাজিম বিছিয়ে দিয়েছে । বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে জীবনের বিস্তৃত মর্মরধ্বনি — সবচেয়ে ক্ষুদ্রের জীবন — যা মাঝেমাঝে কাছাকাছি কোনো গুলিচালানো শেখার মাঠ থেকে রাইফেলের  আওয়াজে বিঘ্নিত হচ্ছিল, শ্যাম্পেনের ছিপিখোলার মতন মৃদু নিচুস্বর ঐকতানের মাঝে ।

তারপর, সূর্যের তলায়,  যা ওর মস্তিষ্ককে পোড়াচ্ছিল, এবং মৃত্যুর উষ্ণ সুগন্ধের বাতাবরণে, যে গোরের ওপরে ও বসেছিল তা থেকে ফিসফিসে গলার আওয়াজ শুনতে পেলো। আর কন্ঠস্বর বলল, “তোমার লক্ষ্যবস্তু আর গুলিগোলা অভিশপ্ত হোক, তোমরা অস্হির জীবন্ত প্রানী কোথাকার, মৃতের  আর তাদের বিশ্রামের পবিত্র জায়গা সম্পর্কে তোমাদের কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই ! অভিশপ্ত হোক তোমাদের উচ্চাকাঙ্খা, তোমাদের পরিকল্পনা অভিশপ্ত হোক, তোমরা ধৈর্যহীন নশ্বর কোথাকার, মৃত্যুর নিভৃত আবাসের কাছে আসো হত্যার শিল্প শেখার জন্য !

হায়, যদি তোমরা জানতে এই পুরস্কার জয় করা কতো সহজ, এই লক্ষ্যবিন্দুকে ভেদ করা কতো সহজ, আর মৃত্যু ছাড়া সবকিছুই শূন্য, তোমরা নিজেদের ওভাবে ফুরিয়ে ফেলতে না, তোমরা শ্রমশীল জীবন্ত প্রাণী কোথাকার, আর যারা বহুকাল আগে লক্ষ্যভেদ করেছে, যা কিনা এই বিরক্তিকর জীবনের প্রকৃত লক্ষ্যবস্তু,  তাদের ঘুমে বিঘ্ন ঘটাবার জন্য তোমরা কম উৎপাত করতে !”

ছেচল্লিশ

মাথার পেছনের হারানো জ্যোতি 

“কী ? তুমি এখানে, আমার প্রিয় দোস্ত ? তুমি, এই রকম একটা নোংরা জায়গায় ! তুমি, যে সবচেয়ে অপরিহার্য পানীয় পান করো, দেবতাদের খাবার খাও ! সত্যি, এটা খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার ।”

“বন্ধুবর, তুমি ঘোড়া আর ঘোড়ারগাড়ি সম্পর্কে আমার আতঙ্কের কথা জানো। ঠিক এক্ষুনি, তাড়াতাড়ি বাগানের রাস্তা পার হবার সময়ে, কাদার ওপরে লাফ মেরে ওই ভ্রাম্যমান বিশৃঙ্খলায়, যেখানে মৃত্যু টগবগিয়ে তোমাকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফ্যালে, আমি আচমকা রূঢ়ভাবে হাঁটছিলুম আর আমার মাথা থেকে জ্যোতিটা খসে গেল, পড়ল গিয়ে রাস্তার কাদায় । ফিরে যাওয়ার ঝঞ্ঝাটের কোনো মানে হয় না । আমার মনে হলো নিজের হাড় ভাঙার চেয়ে নিজের তকমা হারানোটা কম অপ্রীতিকর । আর তারপর মনেমনে বললুম, প্রতিটি খারাপ ব্যাপারের একটা ভালো দিক থাকে । এখন আমি আত্মপরিচয় গোপন করে ঘুরে বেড়াতে পারি, বজ্জাতি করতে পারি, লাম্পট্যে নিজেকে সঁপে দিতে পারি, সাধারণ নশ্বর মানুষদের মতন । আর এখন এই আমি, অবিকল তোমার মতন, দেখতেই পাচ্ছ !”

“তোমার উচিত জ্যোতিটার জন্যে একটা বিজ্ঞাপন দেয়া, কিংবা পুলিশের সাহায্য নিয়ে ফিরে পাবার চেষ্টা করা ।”

“হায় ভগবান, না ! আমার এই ভাবেই ভালো লাগছে । কেবল একমাত্র তুমিই আমাকে চিনতে পেরেছ । আর তাছাড়া, মর্যাদা আমাকে বিরক্ত করে । আর আমার ভাবতে ভালো লাগছে যে কোনো মূর্খ কবি ওটা তুলে নিয়ে নির্লজ্জের মতন নিজের মাথায় পরে নেবে । কাউকে খুশি করা — কতো যে আনন্দের ! আর তার চেয়েও উৎকৃষ্ট, যদি সে এমন কেউ হয় যাকে দেখে তুমি হাসাহাসি করতে পারবে ! ভেবে দ্যাখো, এক্স-এর মাথায়, কিংবা জেড-এর ! ওহ কতো মজার হবে।

সাতচল্লিশ

কুমারী বিসতৌরি

শহরের শেষ প্রান্তে গ্যাসবাতির তলা দিয়ে হাঁটার সময়ে, অনুভব করলুম একটা হাত আস্তে আমার বাহু আঁকড়ে ধরল, আর আমার কানে একটা কন্ঠস্বর বলল, “আপনি একজন ডাক্তার, স্যার ?” আমি চেয়ে দেখলুম ; বেশ দীর্ঘাঙ্গী, স্বাস্হ্যবতী বড়ো-বড়ো চোখের যুবতী, মুখে যৎসামান্য সাজগোজ, শিরাবরণের ফিতের সঙ্গে বাতাসে তার চুল উড়ছে ।

“না, আমি ডাক্তার নই । হতে চাই ।”

“হ্যাঁ ! আপনি একজন ডাক্তার । আমি দেখে বলতে পারি । আমার বাসায় আসুন । আমার সঙ্গ আপনার ভালো লাগবে ; আসুন !!”

“হতে পারে, আমি তোমার বাসায় যাবো, কিন্তু ডাক্তার হবার পরে, ধ্যাৎ !”

“আহা, আহা”, মেয়েটি বলল, আমার বাহু আঁকড়ে থেকে, আর হাসতে লাগলো, “আপনি একজন মজার ডাক্তার । আপনার মতন কয়েকজনকে আমি জানি ! আসুন দিকিনি ।”

আমি রহস্য বেশ পছন্দ করি, কারণ আমার সব সময়ে মনে হয় তার সমাধান করতে পারবো । তাই আমি এই নতুন সঙ্গিনীর টানের সঙ্গে চললুম, কিংবা বলা যায়, এই অপ্রত্যাশিত হেঁয়ালির সঙ্গে ।

আমি ওর বাসার বর্ণনা বাদ দিচ্ছি ; তা বহু নাম-করা পুরোনো কবিদের রচনায় পাওয়া যাবে । যাই হোক, যে বিস্তারিত বর্ণনা অঁরি দ্য রেনিউ দেননি, দেয়ালে দুই বা তিনজন বিখ্যাত ডাক্তারের ছবি ঝুলছিল ।

কতো যে প্রশ্রয় আমাকে দেয়া হলো ! জ্বলজ্বলে তাপ পোয়াবার আগুন, মশলা মেশানো মদ, চুরুট ; আর আমাকে এই জিনিসগুলো দেবার সময়ে এবং নিজে একটা চুরুট ধরিয়ে, মজার মেয়েটি আমাকে বলল: আরাম করে বসুন, বন্ধুবর, আয়েশ করে বসুন । এটা আপনাকে হাসপাতালের  আর যৌবনের ভালো দিনগুলোর কথা মনে পড়িয়ে দেবে — আরে ! আপনার চুল অমন শাদা হয়ে গেছে কেমন করে ? সেসময়ে তো এরকম ছিল না, সেই কতোকাল আগে, যখন আপনি এল-এর শিক্ষানবীশ ছিলেন । আমার মনে আছে জটিল শল্যচিকিৎসায় আপনিই ওনাকে সাহায্য করতেন । তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি কাটাছেঁড়া করতে, কাঁচি চালাতে আর অংশ বাদ দিতে ভালোবাসতেন !

আপনি ওনার হাতে সরঞ্জাম তুলে দিতেন, ক্ষতস্হান সেলাইয়ের সুতো আর স্পঞ্জ দিতেন — আর আমার মনে আছে কেমন করে, যখন শল্যচিকিৎসা শেষ হয়ে যেতো, তিনি নিজের ঘড়ি দেখতেন আর গর্বভরে ঘোষণা করতেন, ‘পাঁচ মিনিট, ভদ্রমহোদয়গণ !’ —ওহ, আমি, মনে পড়ছে । আমি সেই ভদ্রমহোদয়দের ভালোভাবে চিনি ।”

কয়েক সেকেণ্ড পরে, এবার ঘরোয়া ঢঙে, মেয়েটি গল্পের সূত্র এগিয়ে নিয়ে গিয়ে বলল, “আপনি একজন ডাক্তার, নয়কি, আমার প্রিয় বাঘ ?”

মেয়েটির এই পাগলামির ধুয়া আমাকে বাধ্য করল চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠতে ।

“না !” আমি চেঁচিয়ে বললুম ।

“তাহলে একজন শল্যচিকিৎসক ?”

“না, না ! যদি না আমি তোমার মাথা কেটে ফেলার জন্য শল্যচিকিৎসক হই ! পূতচরিত্র ম্যাকেরেল মাছ ঢোকানোর গর্ত কোথাকার !”

“দাঁড়ান, “ মেয়েটি বলল । “আপনি নিজেই জানতে পারবেন ।”

আর মেয়েটি আলমারি থেকে একতাড়া কাগজ বের করল, যেগুলো নামকরা ডাক্তারদের ছবির সংগ্রহ, মরাঁর লিথোগ্রাফ করা, যা কয়েক বছর কোয়ায় ভোলতেয়ারে প্রদর্শিত হয়েছিল ।

“দেখুন ! এনাকে চিনতে পারছেন ?

“হ্যাঁ ! ইনি এক্স । ছবির তলায় ওনার নাম ছাপা রয়েছে ; কিন্তু আমি ওনাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি ।”

“হ্যাঁ আপনি তো চিনবেনই ! এটা, দেখুন ইনি জেড, যে লোকটি এক বক্তৃতায় এক্স সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘এমন দানব যে নিজের আত্মার কালিমা মুখাবয়বে প্রকাশ করে !’ আর তা কেবল এই জন্যে যে বিশেষ এক রোগির ক্ষেত্রে দুজনের মতের মিল হয়নি ! বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই কতো হাসাহাসি করেছিল তখন, আপনার মনে আছে ? — এবার এই যে, কে-এর দিকে দেখুন, যে খবর দিয়েছিল যে তার হাসাপাতালে বিপ্লবীদের সে চিকিৎসা করছে । তা ছিল দাঙ্গার সময়ে । অমন ভদ্রলোকের কেন  অতো কম সাহস ছিল?— আর এই যে ডাবলিউ, বিখ্যাত ইংরেজ ডাক্তার; উনি যখন প্যারিসে এসেছিলেন তখন ওনাকে পাকড়াও করেছিলুম । ওনাকে অনেকটা মেয়েদের মতন দেখতে, তাই না ?”

এবং যখন আমি টেবিলের ওপরে রাখা সুতো বাঁধা একটা তাড়ায় হাত দিলুম, মেয়েটি বলল, “একটু দাঁড়ান ; ওগুলো শিক্ষানবীশদের, আর এই তাড়াটা যারা আবাসিক ছিল না তাদের।”

তারপর মেয়েটি ফোটোগ্রাফের গোছা বের করল, সেগুলোতে মুখগুলো তরুণতরদের।

“আমাদের যখন আবার দেখা হবে, আপনি আপনার ছবি আমাকে দেবেন, বলুন, দেবেন তো, হে প্রিয় ?”

“কিন্তু”, আমি মেয়েটিকে বললুম, আমার ব্যক্তিগত আচ্ছন্নতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে অপারগ, “তুমি কেন মনে করো যে আমি একজন ডাক্তার ?”

“কারণ আপনি কতো ভালো,  নারীদের  কতো সন্মান জানান !”

“অদ্ভুত যুক্তি !” মনে মনে বললুম ।

“ওহ, আমি তেমন ভুল করি না ; আমি ওনাদের অনেককে চিনি । আমি এই ভদ্রলোকদের এতো ভালোবাসি যে অসুস্হ না হলেও, আমি অনেকসময়ে তাঁদের কাছে যাই কেবল তাঁদের দেখবো বলে । ওনাদের কেউ কেউ শীতল কন্ঠে বলেন : ‘তুমি মোটেই অসুস্হ নও !’ কিন্তু কেউ কেউ আমাকে বুঝতে পারেন, যখন ওনারা দেখেন আমি কেমনভাবে তাঁদের দিকে তাকিয়ে হাসছি ।”

“আর যখন ওনারা তোমাকে বুঝতে পারেন না ?”

“হায় ভগবান ! আমি তো তাঁদের কোনোভাবে বিরক্ত করিনি, আমি দশ ফ্রাঁ তাকের ওপরে রেখে দিই ! — ওনারা এতো ভালো আর এতো ভদ্র, ওই লোকজন ! —আমি একজন ছোটো শিক্ষানবীশকে পিটি-তে খুঁজে পেয়েছিলুম, দেবদূতের মতন সৌম্যকান্তি আর কতো নম্র ! কতো পরিশ্রম করতো, বেচারা ! ওর বন্ধুরা আমায় বলেছিল ওর অবস্হা ভালো নয়, কারণ ওর বাবা-মা গরিব আর ওকে টাকাকড়ি পাঠাতে পারেন না । শুনে আত্মবিশ্বাস হলো । আমি তো দেখতে যথেষ্ট ভালো, যদিও ততো কম বয়স নয় । আমি ওকে বললুম : ‘এসো, আমার সঙ্গে দেখা করো, আমার সঙ্গে প্রায়ই তুমি দেখা করবে । আর আমাকে নিয়ে তোমায় চিন্তা করতে হবে না : আমার টাকাকড়ি চাই না !” কিন্তু আপনি বুঝবেন যে  সেসব কথা আমায় নানা উপায়ে বলতে হয়েছিল ; আমি অমার্জিত ঢঙে বলতে চাইনি । ওকে অপমান করে ফেলার ভয় ছিল আমার, আমার খোকাবাবু !”

“আচ্ছা ! তুমি কি বিশ্বাস করবে যে আমার এক ধরণের মজার উদ্দীপনা চাগিয়ে উঠেছিল যা ওকে বলার সাহস আমার হয়নি ?— আমি চেয়েছিলুম ও আমাকে দেখতে আসুক ওর ডাক্তারি ব্যাগ আর শল্যচিকিৎসার যন্ত্রপাতি নিয়ে, এমনকি তাতে লেগে থাকা রক্তসুদ্দু আসুক !”

মেয়েটি এই ক