পাবলো নেরুদা’র প্রেমের কবিতা

pablo-neruda-quote-not-a-child-man

তুমি যদি আমাকে ভুলে যাও

আমি তোমাকে,একটা বিষয়

জানাতে চাই।

তুমি জানো তা কতোভাবে !

আমি যদি ওই স্বচ্ছ চাঁদটার দিকে তাকাই,

আমার জানালায়, শান্ত শরতের লাল শাখায়,

আমি যদি ছুঁয়ে দেখি,

আগুনের কাছে পড়ে থাকা

স্পর্শাতীত ছাই

কিংবা

শুকনো কাঠের গুঁড়ি,

সবকিছুই আমাকে টেনে নিয়ে যায় তোমার দিকে,

যেন সবই প্রাণবন্ত,

সুরভীগুলো, আলো,ধাতুকসমূহ,

ছোট্ট নৌকাগুলোর  পাল,

ছুটে যায় আমার অপেক্ষায়; তোমার দ্বীপমালার দিকে।

বেশ,ভালো তবে এখনই,

যদি একটু একটু করে তোমার অনুরাগ থেমে যায়

তবে’তো আমার ভালোবাসা স্তিমিত হয়ে যাবে।

যদি হঠাৎ

তুমি ভুলে যাও আমায়,

আর নাই’বা খোঁজো !

এই মনে করে যে , আমি তোমাকে ভুলে গেছি ।

তুমি যদি ভাবো এটা বহুক্ষণের আর উন্মাদনা,

উড়ন্ত পতাকার বুকে বয়ে যায় আমার জীবন,

আর তুমি যদি সিদ্ধান্ত নাও

আমাকে হৃদয়ের এই তটরেখায় ফেলে যাবে,

যেখানে  আমার শেকড় বিছিয়েছি

মনে রেখো, সেদিন

ওই সময়

আমি আমার দুহাত ওপরে তুলে ধরব

আমার শেকড় যাত্রা শুরু করবে

অন্য কোনও ভূমণ্ডলের সন্ধানে,

কিন্তু

যদি প্রত্যেকদিন

প্রতি ঘন্টায়,

যদি তুমি অনুভব করো,উপভোগ্য মাধুর্যে,

তুমিই আমার নির্ধারিত নিয়তি,

যদি প্রতিদিন একটি ফুল

তোমার ঠোঁটের মাঝে আমাকেই খুঁজে বেড়ায়,

আহ ! প্রেম আমার, ভালোবাসা ! আমার একান্ত আপনজন,

আমার মাঝে বারবার জ্বলে ওঠে সেই আগুন

এই আমার কোন কিছুই নিঃশেষ হয়নি অথবা ভুলে যাইনি ।

আমার ভালোবাসা পুষ্টি যোগাবে তোমার ভালোবাসকে, প্রিয়তমা,

আর যতদিন তুমি তা নিয়ে বেঁচে থাকবে ; এই দেহমন আমাকে ছাড়বে না

তোমার আলিঙ্গনে বাঁধা থাকবে।

 

ইলা নেগ্রায় ঝরে তুমুল বর্ষণ

ইলা নেগ্রায় ঝরে দক্ষিণের তুমুল বর্ষণ

একটিমাত্র বৃষ্টি ফোঁটার মত স্বচ্ছ আর ভারী

শীতল পদ্মপাতায় তাকে ধরে সমুদ্রের বুক

পৃথিবী শেখে সুগন্ধী মদে কানা ভরে ওঠা।

 

তোমার চুমুতে সেই ভরা বর্ষা আমায় দাও

এত দিনের লবনের স্বাদ, মাঠের মধু

আকাশের হাজার ঠোঁটে ভেজা সৌরভ

আর শীতার্ত সাগরের শীলিত ধৈর্য নিয়ে।

 

কে যেন ডাকে আমাদের নাম, নিজ থেকে সব কপাট খুলে যায়,

জানালার কানে বৃষ্টি তার গুজব ছড়ায়,

আকাশ বাড়ে উল্টো হয়ে, ছুঁতে চেয়ে মাটির শেকড়।

 

এক স্বর্গীয় জাল বোনে আর খোলে এই অবাক প্রহর,

যে জালে জড়ানো থাকে সময়ের ঘন্টাধ্বনি, ফিসফিস স্বর,

 

বর্ধিষ্ণু জীবন, পথ, এক নারী, এক পুরুষ আর পৃথিবীর আমূল শীতকাতুরেপনা।

—————————————————————————————————-

 

আমার কোনো শেষ বার নেই

আমার কোনো শেষ বার নেই, নেই চির প্রতিশ্রুতি;

বালির ওপর জয় তার পায়ের ছাপ ফেলে রেখে গেছে।

আমি এক সাধারণ মানুষ, যে মানুষকে ভালবাসতে চায়।

তোমাকে চিনিনা, অথচ ভালবাসি,  

 

কাঁটার উপহার দিইনা কখনো, বেচিনা তার ধার। 

কেউ হয়ত জানতেও পারে, আমার হাতে তৈরী মুকুট 

রক্ত চায় না, আমি প্রতিরোধ করেছি বিদ্রূপ; হয়ত জানতেও পারে, 

আমার আকণ্ঠ উত্তাল ঢেউ সর্বদা ভরা ছিল সত্যের জোয়ারে। 

 

কদর্যতার প্রতিদানে উড়িয়েছি কপোত। আমার কোনো 

চির প্রতিশ্রুতি নেই, কারণ আমি আজ, কাল এবং ভবিষ্যতে, ভিন্ন মানুষ,

হয়ত তাই, আমার পরিবর্তনশীল ভালবাসায় এক পবিত্রতা আছে

 

আমার কাছে মৃত্যুই চূড়ান্ত নিদান। তোমায় ভালবাসি,

তোমার ঠোঁটে যে আনন্দ খেলা করে, তাকে চুমু দিই আমি। 

চলো, পাহাড়ের গায়ে খড়কুটোয় এক নিশ্চিন্ত আগুন জ্বালাই।

—————————————————————————————————-

কদর্য প্রেম, তুমি রোঁয়া-ওঠা লোমশ বাদাম 

কদর্য প্রেম, তুমি রোঁয়া-ওঠা লোমশ বাদাম 

সুন্দর, তুমি ফুরফুরে রূপসী বাতাস।

কুত্সিত, তোমার বিশাল মুখে ভরে যায় দুইটি অধর,

সুন্দর, তোমার চুমুতে সতেজ তরমুজ।

 

কদাকার, কোথায় রেখে এসেছ দুই স্তন,

গমের দানার মত কৃশ?

তোমার বুক জুড়ে যুগল চাঁদ দেখিনা কেন

আলোকিত, উদ্ধত মহিমায়?

 

কুৎসিত, তোমার পায়ের নখের মত এক চিলতে ঝিনুক

নেই কোনো সাগরে। সুন্দর, তোমার শরীরের প্রতিটি ফুল, নক্ষত্র, ঢেউ, 

কী আশ্চর্য নিয়েছি টুকে, একে একে 

 

কদর্য, তোমার সোনালী কাঁকাল ভালবাসি;

অপরূপ, ভালোবাসি তোমার কপালের ভাঁজ,

সমস্ত আঁধার আর স্বচ্ছতায় আবিস্তার ভালবাসি তোমায়, ভালবাসা।

—————————————————————————————————-

ঝিরঝির বৃষ্টির মত বয়স আমাদের আচ্ছন্ন করে

ঝিরঝির বৃষ্টির মত বয়স আমাদের আচ্ছন্ন করে।

সময় অন্তহীন, বিষাদময়;

তার লবনের একটি পালক তোমার মুখ ছুঁয়ে যায়,

আমার আস্তিন ভেজায় তার ক্ষারময় ঘাম।

 

আমার হাত আর কমলার ঘ্রাণ মাখা তোমার হাতে

সময় কোনো তফাত করে না; 

তুষার ঝরায়, বাছাই করে তার যা প্রয়োজন, 

আমার ব’লে যাকে পাই, সময় খেয়ে নেয় সেই তোমার জীবন।

 

তোমাকে উজাড় করে দেওয়া আমার দিনরাত

স্ফীত হয় বছরের ভারে, যেন থোকাথোকা ফল, 

তারপর, কাদায় ফিরে যায় একদিন সেই সোনালী আঙুর।

 

আর মাটির গহীনেও যেন বয়ে যায় মুহূর্তধারা 

প্রতীক্ষা করে, বৃষ্টি ঝরায় — ধুলি-সার না-থাকাকে

একদিন সে মুছে দিতে চায়।

—————————————————————————————————-

তোমার পায়ের পাতা থেকে চুলে এক আলো

তোমার পায়ের পাতা থেকে চুলে এক আলোর আভাস 

তোমার পেলব শরীরকে যা দেয় অতুল সবলতা 

সে তো ঝিনুকের ঠাণ্ডা ঝিলিক নয়, নয় রুপালি শীতার্ততা,

সে যে অখণ্ড রুটির আভা, আগুনের নিবিড় হাবাস।

 

তোমার ভেতর যে ফসল ফলে উঁচু ক্ষেত ভরে 

সুসময়ে মথিত ময়ান ফুলেছে তিলতিল, 

তোমার স্তনকে সুমণ্ডিত করে সে রুটির ময়ান

আর আমার প্রেম কয়লার আঁচ হয়ে প্রতীক্ষা করে।

 

আহা, স্ফীত রুটি, ভোরের আলোর মত তোমার কপাল, 

চরণযুগল, মুখগহ্বর, গ্রাস করি আমি, 

ভালবাসা, কী নতুন আলো দেখায় তোমার সকাল।

 

আগুন তোমার রক্তে আনে আঁচের প্রত্যাশা,

ঝুরঝুর ময়দা দেয় শুদ্ধতার পাঠ, রুটির কাছে

শেখো তুমি মদির উচ্চারণ, ভালোবাসা।

—————————————————————————————————-

আমার জীবনের রঙ প্রেমের জখমে

আমার জীবনের রঙ প্রেমের জখমে বেগুনি যখন, 

তখন আমি তড়িঘড়ি অন্ধ পাখির মত পালিয়ে 

শেষে তোমার জানলায় পেখম গুটিয়ে বসতেই 

তুমি শুনতে পেলে আমার ভাঙা হৃদয়ের ফিসফিস স্বর।

 

সায়াহ্ন-সাঁতার থেকে উঠে এসে, তোমার বুকে মাথা রেখে 

বেভুলে গমের সুগন্ধী স্তূপে নিবিড় হারিয়ে যেতে যেতে 

তোমার হাতেই বেঁচেছি জীবন, তোমার আনন্দের দিকে 

উঠে গেছি সরল বৃক্ষের মত, সমুদ্রের থৈ থৈ ঠিকানার পর।

 

তাই তোমার কাছে আমার ঋণ কেউ জানবেনা, প্রেম,

কতটা স্বচ্ছতা, কতটা মাটির গন্ধ লেগে আছে, 

আমার দেশের কাদায় বোনা শেকড়ের মত।

 

তোমার কাছে আমার যা কিছু ঋণ, সব মিলে গেলে, 

হয়ত একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হবে, অথবা বালুময় প্রান্তরে সুশীতল জল,   

যেখানে ভবঘুরে বিদ্যুতের দিকে তাকিয়ে থাকে মুহূর্তের চোখ।

—————————————————————————————————-

দুই সুখি প্রেমিক মিলে তৈরি হয় একটা রুটি

দুই সুখী প্রেমিক মিলে তৈরি হয় অখন্ড রুটি 

ঘাসের ওপর এক ফোঁটা টলমলে চাঁদের শিশির। 

হেঁটে যেতে দুই ছায়া ঢেউ খেয়ে মেশে। বিছানায় 

তারা হয়ত এক চিলতে সূর্য ফেলে যায়।

 

সত্য থেকে ছেনে আনে তারা একটি দিবস; 

তাকে বাঁধে দড়ি নয়, সৌরভের টানে; শান্তির পাপড়ি ধরে রেখে

তাদের শব্দ কাঁচের মত হয় না চুরমার 

তাদের সুখ, উঁচুতে বাঁধা কোনো স্বচ্ছ মিনার।

 

বাতাস আর সুগন্ধী মদ বন্ধু হয়ে তাদের সাথে যেতে চায়, 

তারা পায় মাঠ ভরা দেব্পুষ্পের উত্তরাধিকার

রাত তাদের দেহের ওপর ঝুরঝুর পাপড়ি ঝরায় |

 

দুই সুখী প্রেমিক যাদের শেষ নেই, মৃত্যু নেই 

বেঁচে থাকতে গিয়ে তারা বহুবার ফোটে আর ঝরে

তাই প্রকৃতির মত তারা মৃত্যুহীন, অনন্ত ঋতুর পরিসরে।

—————————————————————————————————-

নদীর গাঢ় জল আর কুয়াশা

নদীর গাঢ় জল আর কুয়াশা নিংড়ানো 

যত অযুত নিযুত তারা আকাশে ভীড় করে 

সেখান থেকে ভালবাসার তারাটিকে বেছে 

আমি নিশ্চিন্তে ঘুমুতে যাই রাতের পহরে।

 

সবুজ সাগর, সবুজ শীতার্ততা, 

পাতাময় ডাল আর ঢেউ সুনিবিড়,

এর ভেতর শুধু একটি ঢেউ বেছে নিলাম

— সে তোর অবিভাজ্য শরীর।

 

ফোঁটা ফোঁটা চুঁয়ে পড়া জল, লতানো শেকড়, 

আকাশের যে জরির শেষ নেই, 

সব ঝিলিকেরা একদিন যেখানে মিলবেই

 

সেই তোর দামাল চুল একান্তই চাই। 

স্বদেশের উদার হাতের দান, শত মধুময় 

এখান থেকে নিলাম তোর বন্য হৃদয়।

—————————————————————————————————-

বনভূমির হারানো পথে

বনভূমির হারানো পথে ভাঙা ডাল তুলে

তার ফিসফিস তৃষিত ঠোঁটে নিয়ে শুনতে পাই

বৃষ্টির ক্রন্দন, ভাঙা ঘন্টার ঢং,

অথবা কোনো ছিঁড়ে যাওয়া হৃদয়ের বেদনার ঘাঁই।

 

দূর থেকে মনে হয়, গভীর রহস্য,

মাটির তলায় চাপা পড়ে আছে

যেন এক গুমোট চিত্কার, হেমন্তের ভারে,

ভিজে অন্ধকারে, আধখোলা পাতার নীচে।

 

বনের স্বপ্ন ভেঙে গেলে, পাতাময় হেজেলের ডাল

যেন নাড়া দেয় চেতনার গহন আবহমান,

আমার জিভের ডগায় সুবাসিত গান গেয়ে উঠে।

 

যেন আমার শৈশবের হারানো শেকড় কাঁদে

যেন ফেলে আসা মাটি আকুতি জানায়,

আর আমি সেই ঘ্রাণের আঘাতে, থমকাই নিস্পন্দময়।

—————————————————————————————————-

ভালবাসি, অথচ বাসি না তোমায়

ভালবাসি, অথচ বাসি না তোমায়, 

সব সজীবেরই তো দুই দিক থাকে;

নৈঃশব্দের ডানায় যেমন শব্দের ভার,

যেমন শীতলতার উল্টো পিঠ আগুনকে রাখে।

 

ভালবাসব বলেই বাসতে যে চাই,

ছুঁতে চাই বারবার সে অসীম অনুভব

শেষ মুহূর্ত ধরে বাসব বলেই 

এখনো ভালোবাসিনি যেন তোমার সৌরভ।

 

ভালবাসি অথচ বাসি না তোমায়,

চিরদিন একগোছা চাবি ধরে আছি,

এক দিক খুলে গেলে — আনন্দের হাট, অন্যদিকে — সংসারের তুচ্ছ কানামাছি।

 

ভালোবেসে প্রেম বাঁচে যুগল জীবন,

ভালবাসি তবু, হ’লে প্রেমের আকাল,

ভালবাসি তাই, প্রেম, তোমায় আবার, প্রেমময় যদি হয় সবুজ সকাল।

—————————————————————————————————-

গান, বনভূমির মত ফুরফুরে

গান, বনভূমির মত ফুরফুরে তার সুন্দরতা;

যে ভাবে আলো চলে যায় গন্ধর্বমণি, কাপড়, গম অথবা ফলের ভেতর,

আর একটি ভাস্কর্য তৈরী হয়, লহমায়,

যে ভাবে নারী ঢেউ-এর দিকে তার টাটকা সুবাস মেলে দেয়।

 

তার তামাটে পায়ের কাছে তুলি বোলায় সমুদ্রের ঢেউ,

ফিরে ফিরে পায়ের ছাপ আঁকে বালির ওপর,

আর তার কমনীয়, গোলাপি আগুন তৈরী করে এক স্বকীয় বুদবুদ 

 

যাকে ধরে রাখতে পাল্লা দেয় সূর্য, সাগর।

 

অপরূপ, অফুরান ফেনার প্রতিধ্বনি তুমি। 

তাই, ঠাণ্ডা লবণ ছাড়া কিছুই যেন না ছোঁয় তোমায়,

তোমার অটুট বসন্তে বিঘ্ন না ঘটায় যেন প্রেম।

 

জলের ভিতর তোমার নিটোল নিতম্ব 

তৈরী করুক এক নতুন আয়তন, যেন শাপলা অথবা রাজহাঁস, 

চিরন্তন স্ফটিকে ভাসমান, কোনো অজর ভাস্কর্যের মত।

—————————————————————————————————-

তোমার জাদুময় আঙুল

তোমার জাদুময় আঙুল যতক্ষণ না ফুলের মত 

শান্তির পাখনা ছড়ায়, ততক্ষণ ভুলে থাকি

সেই একই হাত কী ভাবে সেঁচন করে লতার শেকড়,

কী ভাবে গোলাপের মেটায় পিপাসা।

 

গৃহপালিতর মত তোমার পিছু নেয় তোমার 

আচড়া, ঝারি — মাটি চাটে, কাদা কামড়ায়,  

উন্মুক্ত করে দেয় মাটির গভীর সুবাস,

দেব্পুষ্পের গনগনে, সতেজ ঝলক।

 

তোমার আঙুলে মৌমাছির দৃপ্ততা, দরদ মিশুক,

যে আঙুল স্বচ্ছ শাবকের মত ফোঁটা ফোঁটা জল মাটিতে ছড়ায়

যে হাত ফের আবাদ করে আমার হৃদয়।

 

পাথরের মত এই পোড়-খাওয়া বুক

তোমায় কাছে পেলেই তোমার কণ্ঠের কানায় ভরা

 বনভূমির জল পান কোরে, আশ্চর্য গেয়ে ওঠে।

—————————————————————————————————-

গভীর সাগরে গোলাপের মত

গভীর সাগরে গোলাপ-কুঁড়ির  মত লুকিয়ে আছে যে মাটি 

সেই লবণাক্ত, পতিত মাটিতে শুধু নয়,

আমি হেঁটে গেছি নদীর তীর ঘেঁষে, মিহি তুষারে পা ফেলে;

যেখানে উঁচু,  রুখো পাহাড় আমার পায়ের আওয়াজ কান পেতে শোনে।

 

লতায় জড়ানো, বাতাসের সুরেলা শিসে ভরা আদিম স্বদেশ,

লিয়ান লতার বিষাক্ত চুমুর জালে জড়িয়ে যাওয়া বন,

উড়ে যাওয়া পাখির শীত ঝেড়ে ফেলা, ভেজা চিত্কার;

এই তো আমার নির্মম, দুঃখময়, ভুলে-যাওয়া পৃথিবী।

 

তামার বিষাক্ত স্তর, ছড়িয়ে থাকা শোরার লবণ 

ইতস্তত তুষারে গুঁড়িয়ে যাওয়া মূর্তির মত — এরাও আমার;

শুধু এরা নয়, লতানো আঙুর, বসন্তের রেখে যাওয়া রক্তিম চেরী, সব কিছু।

 

আমি পরমাণুর শামিল এইখানে এক অনুর্বর মাটির সন্তান, 

যেখানে আঙুর থেকে ঠিকরায় হেমন্তের রোদ,

বরফের পাহাড়ে গড়ে ওঠে ধাতব পৃথিবী।

—————————————————————————————————-

 

মনে হয়েছিল মৃত্যুর হিমেল আঙুল

মনে হয়েছিল মৃত্যুর হিমেল আঙুল খুব কাছে, 

আর তাবত জীবনে ফেলে যাওয়ার মত আছ শুধু তুমি:

আমার পার্থিব দিনরাত্রি তোমার মুখের কাছে সমর্পিত,

তোমার ত্বক আমার চুম্বনের স্বায়ত্বভূমি, মাটির সীমানা।

 

সে মুহূর্তে লেখনীও থমকে গিয়েছিল

ভরে উঠেছিল অবারিত বন্ধুতা আর সম্পদের আকর,

যে স্বচ্ছ গৃহ গড়েছিলাম আমরা দু’জন

তাও মিলিয়ে গিয়েছিল, ছিল শুধু তোমার দুটি চোখ।

 

কারণ জীবন যখন হিংস্র, তখন ভালবাসা 

সব জলোচ্ছ্বাসের চেয়ে উঁচু ঢেউ

তবু, আহা, মৃত্যু যদি দরজার কপাট নাড়ায়

 

সেই অথৈ শূন্যতার পাশে থাকে শুধু তোমার চাহনি,

বিলুপ্তির পাশে, শুধু তোমার অপরূপ আলো, 

ছায়া নির্বাপিত করা, শুধু তোমার অনিঃশেষ প্রেম।

—————————————————————————————————-

আজ শুধু আজ

অতীতের ওজন নিয়ে, ভবিষ্যতের পালক নিয়ে, 

আজ শুধু আজ।

আজকের ভিতর আমার শৈশবের সমুদ্র পোরা আছে,

যদিও এক আনকোরা কুসুমিত দিনের আঙ্গিকে।

 

আলোর দিকে, চাঁদের কলার দিকে বাড়িয়ে থাকা তোমার মুখে 

যোগ হয় ফুরিয়ে-যাওয়া দিনের বিবর্ণ পাপড়ি

আর অতীত, গতকালের মৃত মুখ চিনে নিতে

এগিয়ে আসে, এক অন্ধকার রাস্তায়, ঘোড়ার খুরের মতো দ্রুত।

 

আজ, কাল, ভবিষ্যৎ সবই

বলির পশুর মতো আগুনের উত্তুঙ্গ শিখায় ঝলসায়,

আমাদের এক-একটি দিন এইভাবে দহনের অপেক্ষায় থাকে।

 

অথচ সময় তার ময়ান গুঁড়ো গুঁড়ো ছড়িয়ে দেয় তোমার হৃদয়ে,

আর আমার ভালোবাসা একটি তন্দুর তৈরি করে, আদিগ্রাম তেমুকোর কাদায়,

তাই তুমি আমার সত্তার অখণ্ড রুটি, প্রতিদিন।

—————————————————————————————————-

বেশি দূর  কোথাও যেও না

বেশি দূর কোথাও যেও না , এক দিনের জন্যেও নয়,

কারণ …কারণ, কি করে বলব তোমায়, একটি দিন দীর্ঘ কতখানি,

কী নিবিড় অপেক্ষায় থাকব তোমার, যেভাবে পড়ে থাকে

একটি ফাঁকা ইস্টিশন, সব রেলগাড়ি এক কাতারে ঘুমুতে চলে গেলে।

 

এক প্রহরের জন্যেও যেও না কোথাও,

কারণ তীব্র যন্ত্রণার ঘর্মাক্ত ফোঁটাগুলি মুহূর্তেই গলগল করে নদী হয়ে যাবে

আর যে গৃহহীন ধোঁয়া ঘর খোঁজে অবিরাম,

তারা আমার নিখোঁজ হৃদয়ে ঢুকে প’ড়ে, শ্বাসরুদ্ধ করবে আমায়।

 

বালিয়াড়ির ওপর হাঁটতে গিয়ে মিলিয়ে যেও না তুমি,

তোমার চোখের কাঁপন যেন পথভ্রষ্ট না হয় শূন্যতায়

এক লহমার জন্যেও যেও না কোথাও প্রিয়তমা।

 

কারণ সেই এক নিমিখে তুমি হয়ত যোজন দূরে হারিয়ে যাবে

আর সমস্ত পৃথিবী হাতড়ে, আমি বিভ্রান্তের মত,

প্রশ্ন করব, আর্তনাদ, তুমি কি আসবে? আমায় কি এইভাবে ফেলে রেখে মরতে দেবে তুমি?

—————————————————————————————————-

বনভূমির আঁশের মত তোমার চুল

বনভূমির আঁশের মত তোমার চুল, যেন দ্বীপপুঞ্জের সবুজ বনানী

তোমার ত্বকে শত বছরের প্রাচীন ইতিহাস

সাগরের আরণ্যক শোঁ শোঁ শব্দ তোমার শিরায়

সবুজ পাতার রক্ত আকাশ থেকে ঝরে, স্মৃতিতে তোমার।

 

বনের শেকড় থেকে, জলের ওপর সূর্য-কণার

এই দারুণ বিচ্ছুরণ – এর টাটকা, কড়া, জৌলুস থেকে

আমার হারানো হৃদয়, কেউ ফেরাতে পারবে না।

যে ছায়াময় অতীত আমার সঙ্গে বাস করেনা আর, সেখানে বসত করে আমার অনুভব।

 

আর তাই যেন তুমি দক্ষিণ থেকে জেগে ওঠো, দ্বীপের মতন,

তোমার মধ্যে ভীড় করে পালক আর বৃক্ষের গুঁড়ি – তোমায় মুকুট পরায়:

আমি সেই ফুরফুরে বনের আঘ্রাণ খুঁজে পাই তোমার ভেতর।

 

অরণ্যের মজ্জায় যে গাঢ় মধু আমাকে টানে – তাই,

আর তোমার কোমর ছুঁয়ে অনুভব করা বুনো অস্বচ্ছ ফুল,

এই সমস্ত উপাদান, আমার সংগে পৃথিবীতে আসে, আমার সত্তার মতন।

—————————————————————————————————-

প্রতিদিন তুমি পৃথিবীর আলো নিয়ে খেলা করো

প্রতিদিন তুমি পৃথিবীর আলো নিয়ে খেলা করো,

ফুরফুরে অতিথির মত ফুলের বিস্ময়ে, জলে, ধরা দাও।

পুঞ্জীভূত ফলের মত যে সফেদ মাথা, আমি দু’হাতের ভেতর 

এতটা নিবিড় আঁকড়ে ধরি, তার চেয়ে অনেক অঢেল তুমি।

 

ভালবাসি বলেই তুমি অনন্য, প্রেম ।

তোমাকে হলদে ফুলের মালায় দেখতে চাই। 

কে যেন তোমার নাম আকাশের নক্ষত্রে লিখে রাখে ধোঁয়াময় আখরে। 

তোমার অস্তিত্বের আগে কেমন ছিলে তুমি, সে কথা স্মরণ করতে চাই!

 

হঠাত্‍, বাতাস তুমুল আছাড় খায় আমার দেয়ালে,

আকাশ একটি ছায়াময় জাল হয়ে লুফে নেয় মাছ।

কোনো না কোনো সময় সব — সব দমকা ঝড় আলগা হয়ে যায়।

বৃষ্টি মেয়েটিকে বিবসনা করে। 

 

পলাতকা পাখি উড়ে যায়।

বাতাস। বাতাস ।

আমি শুধু মানুষের ক্ষমতার সঙ্গে লড়াই ছাড়া কিছুই পারিনা। 

আর ঝড়, ঘুরে ঘুরে কালো পাতা উড়িয়ে নিয়ে আসে, 

গতরাতে আকাশে নোঙর ফেলা ডিঙির বাঁধন ছিঁড়ে যায়।

 

তারপরও তুমি আছ। যাওনি কোথাও।

আমার শেষ কান্নার উত্তর দেবে বলেই যেন, তুমি থেকে যাও,

আমাকে আঁকড়ে ধরো, সে কি ভয়?

তারপরও, কীসের যেন ছায়া সরে যায় তোমার চোখের তারায়।

 

এখনো, ছোট পাখিটি আমার, তুমি মধুমালতীর স্তবক তুলে আনো, 

আমায় দেবে বলে, তোমার স্তনে সেই গন্ধ লেগে থাকে।

যখন এক বিষাদময় বাতাস হনন করে প্রজাপতি, 

তখনও, আমি তোমায় ভালবাসি, আমার আনন্দ 

তোমার মুখের টুকটুকে লাল ফলে দাঁত বসিয়ে দেয় 

 

আমাকে নিয়ে এত কষ্ট তোমার,

আমার এই নিঃসঙ্গ, আদিম সত্তাকে মেনে নিতে — যাকে সবাই ছেড়ে যেতে চায়।

কতবার ভোরের শুকতারা আমাদের চোখে চুমু দেয়, 

কতবার আমাদের মাথার ওপর ধূসর আভা ঘুরে যায় পাখার মত।

 

আমার শব্দরাজি তোমার ওপর বৃষ্টি হয়ে পড়ে, তোমাকে আদর জানায়।

বহুদিন তোমার ঝলসানো শুক্তি-শরীর ভালবাসি আমি।

তোমার করতলে সমস্ত পৃথিবী, কল্পনা করি।

পাহাড় থেকে তোমার জন্য গুচ্ছ গুচ্ছ হেসে-ওঠা ফুল আনব এখন,

নীলাভ ব্লু বেল, বাদামী ঝাড়, গ্রামীণ ঝাঁকায় ভরা চুমু।

একটি রক্তিম চেরী গাছকে বসন্ত যা-কিছু করে, তোমাকে আমি তাই করতে চাই

—————————————————————————————————-

 

ভরাট নারী, ফলন্ত শরীর, গনগনে চাঁদ

ভরাট নারী, ফলন্ত শরীর, গনগনে চাঁদ,

শ্যাওলার গাঢ় ঘ্রাণ, আলো-কাদার ছদ্ম অবয়ব

তোমার প্রাসাদে কোন সে স্বচ্ছ উদ্ভাস আমাকে দেখাও?

কোন সে আদিম রাত, যাকে ছুঁতে পারে কোনো পুরুষ, সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে? 

 

আহা, ভালবাসা, সে তো জল আর তারায় তুমুল সাঁতার,

বাতাসে আকণ্ঠ ডুব, ময়দার সফেদ গুঁড়োয় অবিন্যস্ত ঝড়;

ভালবাসা, সে তো বিদ্যুতের হঠাৎ-সংঘাত, 

এক মধুময়্তায় ভেসে-যাওয়া যুগল শরীর

 

তোমার পেলব অসীমতা আমি চুমুতে বেষ্টন করি 

চিনে নিই তোমার দূর সীমানা, নদীপথ, গ্রাম;

আর তোমার যৌনাঙ্গের আঁচ — পাল্টে-দেওয়া, সরস, মধুর,

 

আমার রক্তের সরু গলি ভেদ করে 

রাতের দেবপুষ্পের  মত, চকিতে নিজেকে উজাড় করে মুহূর্তের নিথরতায়:

তারপর এক ঝলক বিন্দুর মত, হয়ে যায় ছায়াঘেরা, শূন্যময়। 

—————————————————————————————————-

 

 

এক ঋক্ষের ধৈর্য নিয়ে দিয়েগো রিভেরা

এক ঋক্ষের ধৈর্য নিয়ে দিয়েগো রিভেরা 

তাঁর তুলির ডগায় খুঁজে নেন বনের পান্না-গলানো রঙ, 

হৃৎ-গোলাপের সিঁদুর-উদ্ভাসন,

তোমার ছবিতে তিনি পৃথিবীর তাবৎ আলো ভরে দেন ।

 

তোমার অভিজাত নাক

তোমার চোখের চকিত বিদ্যুত

তোমার চাঁদের কলাকে ঈর্ষা-জাগানো নখ,

আর তোমার গ্রীষ্মময় ত্বকে তরমুজের মত সুশীতল, সুস্বাদু মুখ।

 

তোমার আগুন, ভালবাসা, আরাউকো-উত্তরাধিকার গেঁথে 

তিনি তোমাকে দুটি মাথা দেন, আগ্নেয়গিরির সোনালী লাভার মত,

আর উজ্জ্বল কাদাময় তোমার অবয়বের ওপর 

 

তিনি তোমায় বিস্ময়কর আগুনের শিরস্ত্রাণ পরিয়ে দেন:

ওখানেই আমার চোখ গোপনে অঢেল ছুটি নেয়,

তোমার ওই প্রাসাদের মত সুডৌল চুলের রহস্যময়তায়।

 

আমি দুঃখি , আমরা দুঃখময়, প্রিয়তমা

আমি দুঃখি, আমরা দুঃখময়, প্রিয়তমা,

পরস্পরকে ছাড়া, ভালবাসা ছাড়া কিছুই তো চাইনি

অথচ এত গভীর শোকের পরেও ভাগ্যলিখন

আমাদের ব্যথা দেয়, আবার… আবার ।

 

তোমার তুমিকে, আমার আমিকে চেয়ে, নিবিড় একটি চুম্বনে

সেই তুমিকে, একটি গোপন রুটির ভেতর সেই আমিকে পেয়ে

আমরা অসম্ভব এক সরল জীবন রচনা করেছিলাম

যতক্ষণ না জানালা দিয়ে ঘৃণার ঝাপটা এসে পড়ে।

 

যারা এই ভালবাসা দেখে ক্রোধে অন্ধ হয়,

সমস্ত ভালোবাসাকে তারা কী আশ্চর্য ঘৃণা করে

একটি শূন্যময় ঘরে ভাঙাচোরা চেয়ারের মত

 

পাংশু, অর্থহীন, যতক্ষণ না তারা ভস্মীভূত হয়

যতক্ষণ না তাদের অশুভ অদ্ভুত

 

সূর্যাস্তের আলো পুরো শুষে নেয় ।

—————————————————————————————————-

তোমার রাত্রি, বাতাস অথবা সূর্যোদয়

তোমার রাত্রি, বাতাস অথবা সূর্যোদয় আলিঙ্গন করিনি আমি,

শুধু ধরেছি তোমার মৃত্তিকা, থোকাথোকা ফলের পরম অস্তিত্ব,

জলের মিষ্টতা পান করে টুসটুসে হওয়া বৃতিমান আপেল,

তোমার সুরভিত গ্রামের কাদা আর বৃক্ষের আঠালো রজন।

 

তোমার চোখ যেখানে থেকে হেঁটে আসে, সেই আদি গ্রাম 

কুইন্চামালি থেকে ফ্রন্তেরায়, যেখানে তোমার যুগল পা আমার হৃদয় নাড়ায় 

তুমি সেই পরিচিত কালো কাদা আমার:

তোমার কোমর দু’হাতে ধরে ফের অনুভব করি ক্ষেতময় যবের ফসল।

 

আরাউকা থেকে জেগে ওঠা নারী, তুমি জানো কি 

তোমাকে ভালবাসার আগে কী ভাবে তোমার আদর বিস্মৃত থাকি

অথচ না জেনেই আমার হৃদয় হেঁটে যায়, তোমার মুখ মনে করে

 

শুধু হেঁটে যায়, একজন বিক্ষত মানুষের মত,

যতক্ষণ না উপলব্ধি করি ভালবাসা,

যতক্ষণ না সেই চুমু আর আগ্নেয়গিরি-সীমানায় পৌঁছই আমি।

—————————————————————————————————-

রাত এলে, ভালবাসা, তোমার-আমার হৃদয়

রাত এলে, ভালবাসা, ঘুমের ভেতর তোমার-আমার হৃদয় 

একই সুতোয় গেঁথে আঁধার পরাস্ত করুক, গভীর বনান্তে 

দু’টি সুমেদুর দামামার মত

ভিজে পাতার দেয়ালের পুরু গায়ে, অবিরাম স্পন্দনে।

 

রাতের ভ্রমণপথে ঘুমের লকলকে শিখা 

পৃথিবীর আঙুরলতা ছিন্ন করে দেয়,

একটি একরোখা রেলগাড়ির মত নির্ভুল ঘড়ির কাঁটায়

ছায়া আর পাথর ছিটিয়ে যেতে যেতে।

 

তাই ভালবাসা, আমাকে অন্য কোনো বিশুদ্ধ বেগের সংগে 

তোমার বুকের ধ্রুব ছন্দময়তায়, বেঁধে রাখো,

যে ভঙ্গিমায় জল কাটে রাজহাঁসের পাখার ঝাপট।

 

তারপর, একটিমাত্র চাবি দিয়ে আমাদের ঘুম 

রাতের সমস্ত তারা-ঝলসানো প্রশ্নের উত্তর দিক, 

ছায়া-বন্ধ একটি দরজা খুলে।

—————————————————————————————————-

 

মাতিলদা: একটি লতা অথবা বৃক্ষের নাম           

 

মাতিলদা : একটি লতা অথবা বৃক্ষের নাম, বয়সি পাথর কিম্বা সুরভিত মদ 

যা কিছু শুরু হয় মাটির গহন থেকে, যা কিছু থাকে:

এমন একটি শব্দ যেখান থেকে সূর্যের অবাক উন্মীলন 

যার ঝলসানো আঁচে বিচ্ছুরিত হয় লেবুর আভা ।

 

যে নামের ভেতর দিয়ে পুরোনো জাহাজ ভেসে যায়  

আগুন-নীল ঢেউ যাকে ঘেরে 

যে নামের বর্ণমালা একটি নদীর মতন

আমার হৃদয়ের শুষ্কতায়, প্রপাত ঝরায় ।

 

আঙুরলতায় জড়ানো যে নাম ঝলমল করে,

গোপন শুঁড়িপথের মত বেবাক খুলে যায় 

পৃথিবীর অসীম সুবাসের দিকে!

 

তোমার তপ্ত মুখ যদি আমায় গ্রাস করতে চায়, তোমার রাত-জাগা চোখ

যদি খুঁজে নিতে চায়, তবে নিক। তবু তোমার নামের গহনে নাবিকের মত 

ভাসতে দাও আমায়, ওই নামের পালকে আমি ঘুমুতে চাই।

—————————————————————————————————-

 

পৃথিবী চিনেছে তোমাকে অনেক বছর ধরে

পৃথিবী চিনেছে তোমাকে অনেক বছর ধরে :

অখণ্ড রুটি অথবা এক টুকরো কাঠের মত 

কঠিণ তুমি, পদার্থময়, 

সোনাঝুরি গাছের ভারাক্রান্ত সোনালী ভেষজতা।

 

জানালার মত তোমার দু চোখ খুলে গেলে, যা কিছু আছে,

তার ওপর আলো পড়ে – তবু তোমার অস্তিত্বের পরিচয় এই শুধু নয়,

তুমি একতাল মাটির মত, কাদাময়, কঠিণ প্রতিমা

তুমি চিল্লানের আশ্চর্য ভাঁটার আগুন-ঝলসানো।

 

যা কিছু আছে, বাতাস, জলকণা অথবা হিম, গলে, উবে যায়।

যা কিছু আছে, আকারহীন, সময়ের স্পর্শে গুঁড়ো হয়,

ঝুরঝুর ভেঙে পড়ে, গত হয়, মৃত্যুর আগে।

 

কিন্তু আমার সঙ্গে তুমি অক্ষত পাথরের মত

কবরে পতিত হবে: কারণ আমাদের প্রেম

অজর, মৃত্যুহীন, মাটির মত, পৃথিবীর মত।

-অনুবাদ: আনন্দময়ী মজুমদার

—————————————————————————————————-

ভালবাসা, একটি চুমুতে পৌঁছনোর কী দীর্ঘ পথ

 

ভালবাসা, একটি চুমুতে পৌঁছনোর কী দীর্ঘ পথ!

তোমাকে খুঁজে পাওয়ার আগে চলমান নিঃসঙ্গতা।

রেলগাড়িটি এখন, আমাকে ছাড়াই গড়িয়ে যায় বৃষ্টিতে,

তালতালে এখনো বসন্তের সূর্য ওঠেনি।

 

অথচ তুমি, আমি, পোশাক থেকে শেকড় পর্যন্ত

আশরীর, আমূল আসঙ্গময়, 

আমাদের বেদনার জলে, হেমন্তের ধূসরতায়,

যতক্ষণ না আমরা একাকী থেকেও, নিবিড় হতে পারি।

 

বোরোয়ার দুর্বার মোহনা থেকে   

সারাটা পাথর বয়ে আনার নির্মেদ শ্রম,

এত দেশ, রেলপথ আমাদের বিভাজিত করার পর, 

  

তাবৎ বিভ্রান্তি, পুরুষ, নারী, আর যে মাটিতে

দেবপুষ্প ফোটে, তাদের পেরিয়ে,

তবু পাবো বলে, শুধু ভালোবাসতে হয় নিজেদের।

—————————————————————————————————-

মনে পড়ে সেই দুরন্ত নদ

মনে পড়ে সেই দুরন্ত নদ

সুগন্ধে কেঁপে ওঠা নরম মাটি,

একটি জল-ঝরা পাখিকে ঢেকে রাখা 

শ্লথতার কাপড়, শীতের পালক

 

মনে পড়ে সেই মাটির উপহার:

মায়াবী ঝাঁঝালো আঘ্রাণ, সোনালী কাদা,

জট পড়া জংলী আগাছা, আশ্চর্য শেকড়,

ছুরির মতন কাঁটা, জাদুময় 

 

মনে পড়ে তোমার হাতে পুঞ্জীভূত ফুলের স্তবক,

ছায়াময়, শান্ত, জলজ, 

ফেনা ঢাকা পাথরের মত।

 

সেই মুহূর্ত, খুবই নির্বিশেষ অথবা দারুণ অভিনব।

কেউ অপেক্ষা করে নেই বলেই আমরা গিয়েছি সেখানে;

অথচ, দেখেছি সব কিছু সেখানেই অপেক্ষায় আছে।

—————————————————————————————————-

যদি মরে যাই, অমিত দৃপ্ততায় জ্বলে যেও তুমি

যদি মরে যাই, অমিত দৃপ্ততায় জ্বলে যেও তুমি

রক্তশূন্য হিমে আগুন ধরিয়ে দাও

অজর চোখদুটো দক্ষিণ থেকে দক্ষিণে

সূর্য থেকে সূর্যে মেলে রাখো, যতক্ষণ না তোমার কণ্ঠে বেজে ওঠে তামাম গীটার।

 

তোমার হাসি, পায়ের আওয়াজ যেন না থমকায়,

আমার আনন্দের উত্তরাধিকার বেঁচে থাক তোমার ভেতর।

আমার বুকে এসে খুঁজো না আমায়: আমি নেই,

আমার অবর্তমানের ঘরে, তুমি বাস করে যেও।

 

অবর্তমান এমন এক বিশাল ঠিকানা

যে বাতাসের শরীরেও ঘর সাজানো যায়

দেয়াল ভেদ করে যাওয়া যায় অন্য ঘরে।

 

অবর্তমান এমন এক স্বচ্ছ বাড়ি,

আমি মরে গিয়েও সেখানে দেখব তোমায়।

তুমি যদি কষ্ট পাও, সে-ই আমার দ্বিতীয় মৃত্যু হবে।

—————————————————————————————————-

হয়ত সেই ধারালো মুখের পুরুষ

হয়ত সেই ধারালো মুখের পুরুষকে তোমার মনে আছে 

যে একটি ছুরির ফলার মত আঁধার থেকে বেরিয়ে আসে,

আর আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, চিনে নেয়

কী আছে ওখানে: ধোঁয়া দেখে বুঝে নেয় আগুনের আঁচ।

 

সেই রক্তশূন্য নারী, যার চুল কালো 

গহন জলের ভেতর থেকে উঠে আসে মাছের মতন, 

তারপর দুজন মিলে দারুণ প্রহরায় 

ভালবাসার বিরুদ্ধে, আশ্চর্য এক ফাঁদ তৈরী করে।

 

তারা দুজন মিলে পর্বত আর ফুলের বাগান সাফ করে দেয়

নদীর খাদে নেমে, উঁচু দেয়াল বেয়ে 

পাহাড়ের ওপর প্রতিরোধের কামান দাগায় 

 

তারপর, ভালবাসা নিজেকে চিনতে শেখে।

আর তারপর, তোমার নামের দিকে চোখ তুলেই দেখি 

তোমার হৃদয় আমাকে আমার পথ বলে দিয়েছে, আগেই।

—————————————————————————————————-

সমুদ্র যেখানে দুর্বার পাথরে আছাড় খায়

সমুদ্র যেখানে দুর্বার পাথরে আছাড় খায়

স্বচ্ছ আলো পাপড়ি মেলে হয়ে যায় গোলাপের স্তব 

যেখানে সাগরের বলয় ছোট হতে হতে কয়েকটি ফুলের স্তবক,

একটি গভীর নীল লবণের পড়ন্ত দানার মতন শেষ হয় 

 

যেখানে তুমি, ফেনার সাদায় ফুটে ওঠা চাঁপা

চৌম্বকীয়,  ভঙ্গুর, 

মৃত্যুর রহস্যে জন্মানো, হারিয়ে যাওয়া, 

শূন্যময়, টুকরো লবণ, সমুদ্র-ঝলসানো ঢেউ।

 

তুমি-আমি, এই নীরবতাকে তবু আমূল পাল্টাই

যতক্ষণ সাগর তার জলজ ভাস্কর্য, দুরন্ত বেগ, 

সফেদ চুড়ো, নিজের হাতে তছনছ করে। 

 

কারণ ঢেউ-ওঠা অফুরান জল, ঝুরঝুরে বালি,

এইসব অদৃশ্য তাঁত দিয়েই তো 

আমরা আবিস্তার ভালবাসার পোশাক বুনে যাই।

—————————————————————————————————-

 

তোমার আঙুল আমার চোখের ওপরে

তোমার আঙুল আমার চোখের ওপর দিয়ে 

উড়ে যায় দিনের দিকে। আলো এসে থরেথরে 

গোলাপের পাপড়ি খুলে দেয়। ফিরোজা মৌচাকের মত 

স্পন্দিত হয় একাকার হওয়া বালি আর আকাশ।

 

তোমার আঙুল যে বর্ণমালা ছোঁয়, তা বেজে ওঠে, 

ঘণ্টার মত, সেই একই আঙুল ছুঁয়ে যায় পেয়ালা, 

সোনালী তেল ভরা পিপে, পাপড়ি, ঝর্ণা, প্রধানত, প্রেম।

তোমার হাত প্রেমের পানপাত্র পাহারা দেয়।

 

দুপুর …আশ্চর্য নিথরতায় জেগে থাকে। রাত পিছলে চলে যায় 

একটি ঘুমন্ত পুরুষের চোখের ওপর দিয়ে, একটি অপরূপ ছোট আধারের মত।

মধুমালতী তার আদিম, বিষণ্ণ ঝাঁঝ বাতাসে ছড়ায়।

 

তখনই তোমার হাত পাখির মত কেঁপে উড়ে আসে আবার,

যে পালক হারিয়ে গেছে আমার কল্পনায়, সেই ডানা ছড়িয়ে দেয়

আমার আঁধার-গ্রাস-করা চোখের ওপর।

—————————————————————————————————-

 

সমুদ্র-কন্যা তুমি, পাতার সুবাস

সমুদ্র-কন্যা তুমি, পাতার সুবাস,

তুখোড় সাঁতারু তুমি, পরিশুদ্ধ জলের শরীর

রাঁধুনি তুমি, মাটির ঝুরঝুরে চকিত রক্ত শিরায়,

তাবত ছোঁয়ায় তোমার, কী আশ্চর্য লেগে আছে পুঞ্জীভূত, মাটিময়, ফুল।

 

তোমার চোখ সমুদ্রে ধাবিত হলে তুমুল ঢেউ ওঠে 

তোমার হাত মাটিতে ডুবলে বীজ পুষ্ট হয় 

তুমি চেনো মাটি আর জলের গভীর নির্যাস

তোমার মধ্যে মিশে একাকার হয় কাদাময় জীবনের মুখ।

 

জল-পরী, গঙ্গাফড়িং, দেহটিকে নীলকান্তমণির মত ছিন্ন করে দাও,

তারা পুনর্জন্ম পায় ঠিক, তোমার রান্নাঘরে।

এভাবেই তুমি যা কিছু জীবন্ত তার আধার হয়ে থাকো।

 

এভাবেই তুমি ঘুমোও আমার বাহুর বৃত্তময় বৃতির ভেতর 

যখন সমস্ত ছায়াময় অন্ধকার সরে যায়:

যত ভেষজ কালচে উদ্ভিদ, শ্যাওলা আর স্বপ্নালু ফেনা।

—————————————————————————————————-

আলো নয়, পেয়েছি আগুন

আলো নয়, পেয়েছি আগুন । রুটি নয়, তেতো চাঁদ একফালি।

মল্লিকার গহন গন্ধে লুকোনো কান্না ঘিরেছে আমায়।

এক ভয়ার্ত ভালবাসার আকাল থেকে, দুটি সফেদ হাত

আমার চোখে শান্তিময় পালক বোলায়, আমার রন্ধ্রে পূরে দেয় সূর্যের ভাপ।

 

আহা, ভালবাসা, এত চকিতে তুমি আমার নগ্ন জখম জুড়িয়ে দাও

ছিন্ন শরীরে এনে দাও স্নিগ্ধ নিরাময়

আমাকে ঘিরে থাকা হিংস্র নখ হটিয়ে

দুজন হয়ে যাই এক অখন্ড জীবন

 

এমন হয়েছে, হয়, চিরকাল হবে, মাতিল্দে,

মধুর, বন্য ভালবাসা! যতদিন না সময়ের আঙুল

ধরে রাখে শেষ ফুল, বিদায় জানায়

 

সেই আলোহীনতায় তুমি-আমি থাকব না কেউ,

তবু, পৃথিবীর ছায়ার কিনারে, আঁধারের ফাঁকে

জেগে থাকবে এক যুগল ভালবাসা।

—————————————————————————————————-

তোমাকে ফিরে দেখতে চাই অবারিত ডালে

তোমাকে ফিরে দেখতে চাই অবারিত ডালে

একটু একটু করে হয়ে-ওঠা তোমার ফলের আদল,

তপ্ত শেকড় থেকে কত সহজে উঠে আসো তুমি,

শব্দে তোমার, অনুভব করি বনানীর গহন নির্যাস। 

 

তবু এখানে তুমি প্রথম এক মায়াবী মুকুল

তারপর, এক মুহূর্তের নিথরতায়, জমে-যাওয়া চুম্বন,

যতক্ষণ না সূর্য আর পৃথিবী, রক্ত আর আকাশের আঁচ

তোমার মধ্যে সুখের প্রতিশ্রুতি, অমৃতের কলস ভরে দেয়। 

 

ডালের কারুকাজে আমি চিনে নেবো তোমার কেশদাম,

পত্রালী আয়নায় ক্রমশ ফুটে ওঠা তোমার রূপরেখা

আমার তৃষ্ণার দিকে এগিয়ে আসা তোমার পাপড়ির সৌরভ। 

 

আমার মুখ ভরে উঠবে তোমার আস্বাদে

মাটি থেকে উন্মীল সেই চুম্বন, যে চুম্বনে লেগে আছে তোমার,

আর ভালবাসার সুডৌল ফলের রক্তিম ওম।

 

———————————————————————————-

তোমার চোখে যদি চাঁদের রঙ থাকত না লেগে

তোমার চোখে যদি চাঁদের রং থাকত না লেগে,

কাদা-মাখা দিন, শ্রমের ঝলক, লালচে আগুন,

এই সব আঁচ, আভা না থাকত যদি, যদি এতটা জড়ানো থেকেও

না হতে তুমি বাতাসের মতো ফুরফুরে, শিল্পময়, 

 

যদি না হতে হলুদাভ বাদামী পাথর, হরিৎ লহমার মতন 

যে লহমায় হেমন্ত আঙুরের লতা বেয়ে ওঠে

না হতে যদি সুগন্ধী চাঁদের আঙুলে ময়ান দেওয়া সেই অখন্ড রুটি

তোমার সাদা সুরভিত গুঁড়ো না ছড়াতে আকাশের গায়

 

তাহলে হয়ত, প্রিয়তমা, তোমাকে ভালবাসতাম না

ততটা, যতটা বাসা যায় । কিন্তু যে মুহূর্তে তোমাকে ছুঁয়ে থাকি, ধরে থাকি তোমায়,

সে মুহূর্তে যা কিছু আছে, সময়ের করতলে, তাই যেন পাই:

 

বালুকণা, মুহূর্ত-স্পন্দন, বৃষ্টি-ঝরানো বৃক্ষরাজি,

সব কিছু জীবন্ত, আমিও জীবিত তাই : এসব অনুভব করি, নিষ্কম্প থেকে, 

তোমার জীবন আমাকে জীবন শেখায়।

—————————————————————————————————-

 

তুমি অভাব থেকে এসেছ

তুমি অভাব থেকে এসেছ । দক্ষিণের গ্রাম,

এবড়োখেবড়ো, পাথুরে নিসর্গ, ঠাণ্ডা, ভূমিকম্পময়, 

যেখানে মাটির বিগ্রহগুলি হুড়মুড় করে ধসে পড়লেও

আমরা জীবনের কাদা-মাখা পাঠ নিই।

 

একটি ছোট মাটির ঘোড়া, কালো কাদার আদর তুমি।

ভালবাসা, তুমি আমার এঁটেল পপী ফুল, সাঁঝবেলায়

উড়ে যাওয়া পায়রা। শত দারিদ্র্যেও

মৃত্পাত্রে ধরে রাখা শৈশবের সুখময় রুপালি পয়সা।

ছেলেবেলার অভাবী স্মৃতি তোমার হৃদয়ে

তোমার পায়ে যখন ফুটত কর্কশ পাথর,

তোমার জিভ পেত না রুটি অথবা আনন্দের স্বাদ।

 

সেই দক্ষিণের মানুষ তুমি, যেখান থেকে আমারও সত্তা বেরিয়ে এসেছে।তোমার-আমার মা, এখন উঁচু আকাশে কোথাও, রোদ্দুরে কাপড় শুকোতে দিচ্ছেন একসঙ্গে

এইজন্যে তো তোমাকে বেছে নিয়েছি, প্রিয়তমা!

—————————————————————————————————-

ভালবাসা তার নিজস্ব দ্বীপ পার হয়

ভালবাসা তার নিজস্ব দ্বীপ পার হয়

এক দুঃখ থেকে অন্য বেদনায়, চোখের জলে সেঁচ দেওয়া

শেকড় চালায়। আর কেউ, কেউই,

হৃদয়ের শব্দহীন, সর্বগ্রাসী পদক্ষেপ থেকে রেহাই পায় না।

 

তুমি-আমি একটি বিস্তীর্ণ উপত্যকা, একটি ভিন গ্রহের খোঁজ করেছি

যেখানে লবনের তীব্রতা তোমার চুল স্পর্শ করবে না,

যেখানে আমার হাত বেদনা বাড়াবে না।

যেখানে এক খণ্ড রুটি বেঁচে থাকবে অমলিন।

 

এমন একটি খোলামেলা, জলময়, সবুজ গ্রহ,

যেখানে শুধু শক্ত সমতল, পাথর আর জনহীনতা:

পাখির মতন, নিজেদের হাতে একটি মজবুত বাসা তৈরী করতে চেয়েছি আমরা

 

যেখানে বেদনা নেই, আঘাত নেই, প্ররোচনা নেই।

কিন্তু ভালবাসা তো তেমন নয় : ভালবাসা একটি উন্মাদ নগরী

যেখানে বারান্দা থেকে, উঠোন থেকে, উপছে পড়ছে মানুষ।

—————————————————————————————————-

 

মাতিলদা, তুমি কোথায়? 

মাতিলদা, তুমি কোথায়? এইখানে, আমার 

হৃত্পিন্ডের ওপর, বুকের দুই পাঁজরের মাঝখানে, 

চকিত তোমার চলে যাওয়ার সাথে সাথে,

খেয়াল করি শোকের ঘাঁই মেরে ওঠা।

 

সে মুহূর্তে তোমার প্রাণের আশ্চর্য আলো চাই, 

চারিদিকে তাকিয়ে চাই আশা, বুভুক্ষুর মত পান করব বলে।

তোমাকে ছাড়া পোড়ো বাড়ির যে শূন্যতা, তার দিকে তাকিয়ে

দেখি দুঃখময় জানালা ছাড়া আর কিছু নেই।

 

শুধুমাত্র কথা বলবে না বলে বাকরুদ্ধ সিলিঙটা 

পাতা-হীন প্রাচীন বৃষ্টির শব্দ শোনে, শোনে ঝরা পালকের উড়ে যাওয়া 

রাতের কাছে আটক এটা-সেটার গুনগুন।  

 

তাই, একটি প্রাণহীন, শূন্যময় বাড়ির মতন তোমার অপেক্ষায় থাকি আমি।

যতক্ষণ না তুমি আসো, যতক্ষণ না আমার ভেতর বাস করো তুমি।

ততক্ষণ, আমার জানালাগুলি বেদনায় নীল হয়ে থাকে।

—————————————————————————————————-

তোমাকে ভালবাসার আগে 

তোমাকে ভালবাসার আগে নিজের বলে কিছু ছিল না আমার।

রাস্তা আর সামগ্রীর ভেতর টালমাটাল হেঁটে

সব কিছু নামহীন, অপ্রয়োজনীয় মনে হত, 

পৃথিবীটা বায়বীয় ছিল, কার যেন অপেক্ষায় ।

 

কিছু ছাইময় ঘর ছিল, কোনো কোনো সুড়ঙ্গে, 

ছিল চাঁদের বসবাস। কিছু ভাগাড় ছিল, আমাকে চায়নি যারা, 

কিছু হানা-দেওয়া প্রশ্ন ছিল, বালির ভেতর; 

সব কিছু খাঁ খাঁ, মৃত, বোবা, ভাঙাচোরা ক্ষয়িষ্ণু, নির্জীব।

 

পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে সবই আশ্চর্য অচেনা, 

অনাত্মিক মনে হয়েছে, যেন এ সমস্ত অন্য কারুর –

হয়ত বা, বেওয়ারিশ সম্পত্তি সব

 

যতক্ষণ না তোমার সৌন্দর্য্য, তোমার অভাব, এসব এসে 

হেমন্তর প্রকৃতিকে বাঙ্ময়, ভরন্ত করে তোলে 

যতক্ষণ না তোমাকে ভালবাসি আমি।

—————————————————————————————————-

বলেছিলুম, সঙ্গে এসো

বলেছিলুম, সঙ্গে এসো। কেউ জানত না ঠিক কোথায়, 

কেমন করে, আমার বেদনা ধুকপুক করে উঠছিল তখন  

আমার জন্য কোনো সুমধুর কার্নেশন বা নদীর বুক চিরে ওঠা দেহাতী সঙ্গীত 

ছিল না ; শুধু ছিল একটি অনাবৃত ক্ষত, ভালবাসার উপহার।

 

বলেছিলাম, সঙ্গে এসো, যেন আমি বাঁচব না আর, 

কিন্তু কেউ আমার মুখের ভেতর নিঃশব্দ জ্যোৎস্নার রক্তপাত, 

দেখেনি তখন। ভালবাসা, তারার আলোয় যে কাঁটা থাকে, 

সে যন্ত্রণা এখন হয়ত আমরা ভুলতে পারি!

 

তাই তোমার গলায় ফের, `সঙ্গে এসো’ শুনে আমার মনে হয়

তোমার তাবৎ জমে-থাকা শোক, ভালবাসা, উষ্ণ প্রস্রবন, 

ফুঁসে ওঠা মদের পুঞ্জীভূত ক্রোধ, সব যেন বেরিয়ে পড়েছে

 

আর আমার মুখের ভেতর তখন আবার আমি ফিরে পাই 

সেই আগুন, সেই রক্তপাতিত ফুল,

সেই কঠিণ পাথর, দগদগে স্বাদ ।

—————————————————————————————————-

সমুদ্রের নীলাভ নুন

সমুদ্রের নীলাভ নুন, বিপুল ফেনীল ঢেউ 

আর সূর্যকিরণ, যখন তোমার ওপর ঝাপটে পড়ে 

ইসলানেগ্রায়, তখন আমি চেয়ে দেখি কর্মব্যস্ত বোলতাটিকে, 

স্বকীয় পৃথিবীর মধুর কাছে ওর আত্মসমর্পণ।

 

দেখি ওর নিয়ত আসা-যাওয়া; নিয়ন্ত্রিত, সোনালী উড়ান।

যেন কোনো অদৃশ্য, সরল তারে ও পিছলে যায়,

দৃপ্ত নাচে, নিপুণ ভঙ্গিমায়। দেখি ওর পিয়াসী কোমর,

একটি একটি করে ওর সূক্ষ্ম সুঁচ নিঃশেষিত হওয়া।

 

একটি অনচ্ছ কমলা রংধনুর ভেতর 

এক চিলতে বিমানের মত, ঘাসের ওপর শিকার করে ও।

দেখি ওর গজালের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত, লহমায় হারিয়ে যাওয়া।

 

আর এর মধ্যে তুমি সমুদ্র-স্নান শেষে নগ্ন উঠে আসো,

ফিরে যাও লবণাক্ত, সূর্যময় পৃথিবীতে,

যেন অনুনাদী ভাস্কর্য এক, যেন বালিতে ঝলসানো এক শাণিত তরবারি।

—————————————————————————————————-

আমার পেছনে হিংস্রতার ছায়ায়

আমার পেছনে হিংস্রতার ছায়ায় তুমি যেন অভ্যস্ত হও,

তোমার হাত দুটো ধুয়ে নাও ফের

তোমার বাহুতে আসুক ভোরের নদীর সতেজ স্বচ্ছতা 

লবণের কেলাসের মত সফেদ, দ্রাব্য যে তুমি, প্রিয়তমা।

 

ঈর্ষাকে ক্লান্ত, পরাস্ত করে আমার তাবৎ গান,

হিংসার নাবিকেরা একে একে ঢলে পড়ে নিদারুণ বেদনায়। 

আমি যখন উচ্চারণ করি ভালবাসার নাম, আকাশ জুড়ে পারাবত ওড়ে,

প্রতিটি স্তবক আমার, জাগায় বসন্তের কলি।

 

আর তুমি উন্মীল হও আমার হৃদয়ে 

স্বর্গীয় পাতার মত তোমাকে দেখি,

কেমন করে তুমি শুয়ে থাকো মৃত্তিকায়,

 

কেমন করে সূর্যের পাপড়ি বদলে দেয় তোমার অবয়ব,

অনুভব করি তোমার শান্ত পদক্ষেপ আকাশে আকাশে

মাতিল্দে, আমার সূর্য-মুকুট, স্বাগত তোমায়!

 

আলোময় মুহূর্তের জাল

দয়িতা, ফের আলোময় মুহূর্তের জাল, নিঃশেষ করে দেয় 

শ্রম, ঘুরন্ত চাকা, আগুন, গোঙানি, বিদায়ী আওয়াজ।

আর রোদেলা দুপুর গমের যে দুলে-ওঠা সুন্দরতা হাত ভরে আনে, 

মাটি আর সূর্যের কাছ থেকে, আমরা তা রাত্রিকে সমর্পণ করি।

 

শুধু একফালি চাঁদ তার নিজস্ব সফেদ পাতা খুলে 

অবারিত আকাশের স্বর্গীয় থাম ধরে রাখে সাবলীল,

আমাদের শয়নকক্ষ মেখে নেয় সূর্যাস্ত-আভা,

আর তোমার হাত সচল হয় রাতের তড়িৎ আয়োজনে। 

 

আহা প্রেম, আহা রাত্রি, গহীন নদী ঘেরা গম্বুজ,

অপার্থিব ছায়াময়তায় ঝলকায় সে নিবিড় জলধারা, 

আকাশের ঝঞ্ঝাময় রসালো আঙুর, কী আকুল ডুবে থাকে, ছায়া ফেলে সে জলে

 

যতক্ষণ না আমরা হয়ে যাই এক বেবাক আঁধার,

হয়ে যাই স্বর্গীয় ছাই ভরা মৃৎপাত্র কোনো,

হই দীর্ঘ, মন্থর, কোনো স্পন্দিত নদীর গভীরে, এক ফোঁটা জল।

 

এক মুঠো মাটির তলায়

এক মুঠো মাটির তলায় ঠিকরে ওঠা পান্না সরিয়ে 

দেখে নেবো তোমায় সঠিক, 

যেখানে তুমি জল-কলমে নিচ্ছ টুকে 

পৃথিবীর তাবৎ শস্য-মঞ্জরীর রূপকথা।

 

এই আশ্চর্য সাম্রাজ্য, এই তৃণাভ গহন পৃথিবী

যেন এক মধু-সরোবর, ভাসতে থাকা সুখী জাহাজ,

আমরা দু’জন হয়ত সেখানে দু’টি পুষ্পরাগমণি, দুরন্ত আভা, 

আমাদের ঘন্টাধ্বনি একই সুরে বাজবে সেখানে

 

যেখানে শুধু স্বাধীন বাতাস,

হাওয়ায় উড়িয়ে আনা আপেল,

আর বৃক্ষের নির্যাস ভরা নিমগ্ন পাঠ

 

যেখানে নিঃশ্বাস নেয় বর্ণীল দেবপুষ্পের ঘুমন্ত হৃদয়,

সেখানে আমরা হয়ত এমন কোনো পোশাক খুঁজে পাব,

যা মৃত্যুহীন করবে আমাদের বিজয়ী চুম্বন।

 

তুমি পাহাড় কেটে চলে যাও

তুমি পাহাড় কেটে চলে যাও ফুরফুরে বাতাসের মত

হরিণ পায়ে, তুষারের ঘোমটা খুলে, 

যেন বরফ-গলা কিশোরী নদী, 

তোমার নিবিড় চুলে বিম্বিত হয় সূর্য-অলংকার।   

 

একটি স্বচ্ছ ফুলদানির মত তোমার ককেশাস শরীরে 

রংধনুর নিযুত রশ্মিতে ঠিকরে ওঠে রোদ,

যেমন আলোর আয়নায় নিয়ত পোশাক বদলায় ফটিক-জল, 

গান গায়, যেন সাড়া দেয় দূর নদীর উদ্দাম ভঙ্গিমায়।

 

পাহাড়ে পাক খেয়ে ওঠে হাঁটাপথ, যেন প্রাচীন যোদ্ধা 

আর নীচে, খাপ-খোলা তরবারির মত ঝলসে ওঠে 

পাহাড়ের খনিজময় হাতে ধরে রাখা একরোখা জল

 

যতক্ষণ না বনভূমি এক গোছা নীল ফুল পাঠায় তোমায়,

বিদ্ধ করে সেই অচেনা সুবাস, যেন তীর,

যেন নীলচে কোনো বিদ্যুতের হঠাৎ আঘাত।

এক মুঠো পৃথিবীর গাঢ় মাটির মত

এক মুঠো পৃথিবীর গাঢ় মাটির মত তোমাকে ভালবাসি। 

তোমার সবুজ, উদার প্রান্তর যেন এক তামাম গ্রহ,

আকাশ-খসা কোনো নক্ষত্রের প্রয়োজন তাই হয় না আমার,

আমার কাছে তুমি যে নিয়ত বেড়ে-চলা নীল বিশ্ব — অসীম, রহস্যময়।

 

যে অযুত নিযুত নক্ষত্র মরে গেছে আকাশের গায়, 

তাদের ফেলে যাওয়া দ্যুতি তোমার চোখে,

তোমার ভেজা ত্বক, বৃষ্টিতে কোনো উল্কার 

ধুক্পুকে, সূক্ষ্ম ঝলক।

 

তোমার নিতম্ব এক সুডৌল, ভরা চাঁদ, 

তোমার গভীর অধর আর তার নিবিড় আনন্দগুলি, 

সূর্য আমার। তোমার হৃদয়ের লালচে আভার দীর্ঘ বিচ্ছুরণ

 

যেন ছায়ার ভেতর মধুর সতেজতা।

তোমার গ্রহের মতন সম্পূর্ণ, নিটোল, জ্বলন্ত শরীর 

আমি তাই চুমুতে অতিক্রম করি, কপোত আমার, আমার পৃথিবী।

 

ভালবাসি, এ ছাড়া কোনো কারণ

ভালবাসি, এ ছাড়া কোনো কারণ, গোপন উদ্দেশ্য 

তো নেই তোমাকে ভালবাসার; আমার হৃদয় 

ভালো বাসা থেকে না বাসায়, প্রতীক্ষা থেকে 

নির্লিপ্ততায়, শীতলতা থেকে 

 

আগুন-লাল আঁচে যাতায়াত করে। 

ভালবাসার আধার তুমি বলেই তোমায় ভালবাসি;

আর কখনো, আমার অনুভবে অশেষ ঘৃণা লেগে থাকে, 

মুহূর্তে বদলে যায় প্রেমের প্রতিমা, কারণ এ যে অন্ধ প্রেম।

 

যেভাবে গ্রীষ্মের দিন গ্রাস করে নেয় উন্মাতাল আলো,

হয়ত সেভাবেই, এক নিষ্ঠুর বিচ্ছুরণ চুরি করে নেবে 

আমার তাবৎ হৃদয়ের গভীর, নিটোল সুস্থিরতা।

 

এ গল্পে তাই, শুধু আমিই মরে যাব 

মরে যাব তোমার প্রেমে,

যে প্রেম আমার রক্ত আর মজ্জা দিয়ে চেনা।

 

কাঠের মেয়েটি

(জাহাজের মাস্তুলে থাকা আবক্ষ প্রতিমা)

 

কাঠের মেয়েটি এখানে আসেনি কো নিজে;

হঠাৎ সমুদ্রের ধারে পাথুরে নুড়ির ওপর তার হদিশ পেয়ে দেখি,

সমুদ্রের ভেজা ফুল লেগে আছে বেনো চুলে তার,

শরীরে লেগে আছে শেকড়ের বেদনার ছাপ।

 

ওখান থেকেই সে চেয়ে দেখে উন্মুক্ত জীবন, 

বাঁচার ধুকপুক, চলে-যাওয়া অথবা ফিরে-আসা পা, পৃথিবীর মাটির ওপর,

এভাবেই আলোর পাপড়ি নুয়ে আসে সাঁঝের বেলায়। 

আর কাঠের মেয়েটির, বেভুল পলক খোলা থাকে দৃষ্টিহীন।

 

সমুদ্রের ফেনীল মুকুট ঘেরা বালুময় তীর থেকে 

তার ভঙ্গীল, বিপর্যস্ত চোখ নিয়ে দেখে সে, যেন 

আমরা অন্য কোনো মুহূর্তের, ঢেউ-এর, শব্দের, বর্ষণের 

 

ভুবনের অপর প্রান্তে থাকা, যেন উভয়ের মধ্যে আছে জালের দেয়াল, 

কাঠের প্রতিমার তাই জানা নেই আমরা সত্যি কিনা,

নাকি অলীক স্বপ্ন নিছক। এই তো কাঠের মেয়ের সমগ্র গাথা।

 

ভালবাসা তার লম্বা লাঙ্গুলে

ভালবাসা তার লম্বা লাঙ্গুলে 

একরাশ অদম্য, কর্কশ কাঁটার রেখাপথ রেখে যায়,

আর আমরা দু’জন চোখ মুদে পার হই এ বেভুল পথ,

যেন কোনো জখম আমাদের চিরে ফেলতে না পারে দু’খণ্ডে।

 

অপরাধী কোরো না তোমার জলভরা চোখ,

তোমার হাত তো বিদ্ধ করেনি তরবারি,

তোমার পদতল খোঁজেনি এ পথ, 

এক ঘট শ্যামল বিষণ্ণ মধু, নিজেই এসে ভরেছে হৃদয় তোমার।

 

যখন বিপুল ঢেউ-তোলা প্রেম, আমাদের লুফে

আছড়ে ফেলে বিশালকায় পাথরের গায়, সে আঘাতে 

আমরা হয়ে যাই চূর্ণিত ময়দার মত অভিন্ন, এক।

 

এই বেদনার মুখ তখন অন্য রকম মধুময়, 

তাই বাতাসী মরশুমে, উন্মীল আলোময়তায় 

পবিত্র পাঠ পায় বসন্তের এই রক্ত-মোক্ষণ।

 

যারা আমায় জখম করতে চায়

যারা আমায় জখম করতে চায়, তোমায় আহত করে তারা;

আমার কাজের ভেতর দিয়ে সূক্ষ্ম জালের মতো

চুইয়ে যায় তাদের যত বিষ, আর তোমার ওপর  

রেখে যায় পরত পরত জং, ঘুমহীনতা।

 

আমি চাই না, যে ঘৃণা গোপনে আমাকে অনুসরণ করে,

তা তোমার কপালের উন্মীল জ্যোৎস্নাকে ছায়াবৃত করুক, ভালবাসা, 

চাই না কোনো ভিন বিদ্বেষ তোমাকে ছুরির মুকুট পরাক, 

কাঁটায় জড়াক তোমার ফুরফুরে স্বপ্নগুলি।

 

যেখানেই যাই আমি, আমার পেছনে থাকে তিক্ততার ছাপ,

যখন নদীর কাছে আসি, তখনো আতঙ্কের ছায়া দেখি স্বচ্ছতোয়া জলে 

আমার গান শুনে অভিশাপ দেয় হিংসার দাঁতে দাঁত ঘষা হাসি।

 

এ আঁধার তো জীবনেরই দান, প্রিয়তমা,

অশরীরী আলখাল্লা তাড়া করে আমাকে নিয়ত

কাকতাড়ুয়ার মতো — বর্বর, লোলুপ হাসিতে।

 

হতভাগ্য দীনহীন কবিরা সব

(গাব্রিয়েলা মিস্ত্রালকে মনে রেখে)

 

হতভাগ্য দীনহীন কবিরা সব, মৃত্যু এবং জীবন 

দের করেছে নির্মম হয়রানি, তারপর অনুভূতি-শূন্য আড়ম্বর

যাদের শব দিয়েছে ঢেকে, চালান হয়ে গেছেন যারা 

শেষকৃত্যের দাঁতালো গহ্বরে

 

পাথরখণ্ডের মত অজ্ঞাত তারা আজ,

তাদের নিবিড় ঘুম নীরবতাহীন, দাম্ভিক ঘোড়ার খুরে

মিশে গিয়ে তারা হানাদার শত্রুর কাছে হয়েছেন সম্পূর্ণ বিলীন;

আর তাদের ঘিরে থাকা বেবাক চাটুকার

 

তাদের মৃত্যু নিশ্চিত জেনে নিশ্চিন্তে করেছে শেষকৃত্য পালন 

তুমুল ভোজন-বিলাসিতায়, ভোজ্য মাংস আর বাক্যবাগীশ 

বক্তৃতার ঘৃণ্য প্রাচুর্যে।

 

অন্তর্ঘাতক তারা, অথচ কবির মৃত্যু নিয়ে তারা দেয় বহুত অপবাদ,

কারণ তার কণ্ঠস্বর আজ রুদ্ধ চিরতরে,

অন্যথায় তাঁর প্রতিবাদী সংগীতে দিতেন তিনি এর সমুচিত জবাব।

 

দখিন আকাশের চতুষ্পথ নক্ষত্ররাজি

দখিন আকাশের চতুষ্পথ নক্ষত্ররাজি, ত্রয়ীপাতার সুরভিত ফসফরাস:

চারটি চুম্বন তোমার সুন্দরতাকে ভেদ করেছে আজ,

পেরিয়েছে ছায়াময় তাবৎ অঞ্চল, আমার টুপিকেও,

তারপর, শীতল আকাশ ঘুরে এসেছে বিনিদ্র জ্যোৎস্না।

 

তখন ভালবাসা, হীরের আকাশ-নীলাভতা, 

স্বর্গীয় প্রশান্তি, স্বচ্ছ আয়্নার মত তোমাকে পাই,

রাত ভ’রে ওঠে তোমার চারটি থরথর 

মধুময় মদের গহন ভাণ্ডারে।

 

অনাবিল মাছ তুমি, কেঁপে ওঠা, নিকষিত, রুপালি শরীর,

যেন ছায়ায় বেড়ে ওঠা শৈলচন্দ্রিমা, আলোমাখা পাতা,

সবুজ ক্রুশ তুমি, সমগ্র আকাশের বুকে একক জোনাকি,

 

ঘুমিয়ে পড়ো, নীমিলিত হোক চোখ দুজনার

লহমার জন্যে, এই মানবিক রাতের কাছে চেয়ে নাও গভীর বিশ্রাম;

ক্রুশের মত নক্ষত্রের দীপ তোমার, জ্বেলে রাখো আমার ভেতর।

 

সাহিত্যের লৌহ তরবারি যখন আমার সামনে

সাহিত্যের লৌহ তরবারি যখন আমার সামনে উদ্যত,

তখন আমি বিদেশী নাবিকের মত, সমুদ্রের প্রত্যন্ত বাঁকে 

অপরিচিত সাগরপথ ধরে ভেসে যাই, আমার কণ্ঠে বাজে উদাত্ত গান,

কারণ, এমনটাই তো হয় — এছাড়া কীই বা হতে পারে?

 

ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ দ্বীপমালা থেকে এলোমেলো একর্ডিওন, 

আলুথালু বেগবান বৃষ্টি সযত্নে এনেছি আমি, 

এনেছি তাবৎ সামগ্রীর মন্থর স্বাভাবিকতা,

এরাই যে তৈরী করে আমার মাতাল, বন্য হৃদয়।

 

তাই সাহিত্যিক হাঙরের দাঁত 

যখন কামড়ে ধরে আমার সরল গোড়ালি,

আমি তখন বাতাসের শিসে গা ভাসাই, হেঁটে যাই নির্ভার, 

 

আমার বর্ষণময় ছেলেবেলার গুদামের কাছে, 

বর্ণনাতীত, দখিনা বনভূমির শীতল সুন্দরতার কাছে, 

তোমার সৌরভ যেখানে আমাকে টানে, সে মাটির কাছে।

 

উড়ে যেতে হবে আমাদের

উড়ে যেতে হবে আমাদের, কিন্তু কোথায়?

পাখায় ভর ক’রে অথবা বিমানে নয়, 

তবু যেতে হবে নিশ্চিত। বয়সী পায়ের পাতা 

হয়ত বা নিশানা রেখে গেছে, তবু সচল করেনা তারা এ যুগল পা। 

 

যেতে হবে প্রতিটি নিমিখ, 

উড্ডীন ঈগল, নীলাভ মাছি, বাতাসী মুহূর্তের মত,

শনির ধুসর বলয়কে জয় করে নিতে,

বাজিয়ে তুলব ব’লে রুপালি ঘন্টাধ্বনি।

 

কোনো পাদুকা অথবা পথ যথেষ্ট নয়,

পর্যাপ্ত নয় পৃথিবীর চেনা মৃত্তিকা, 

মানুষের শেকড় পেরিয়েছে আঁধারের সহস্র দুয়ার।

 

তাই তুমি ফিরে ফিরে অন্য কোনো নক্ষত্রের গর্ভে জন্ম নেবে

ক্ষণিক জোনাকির মত, অনিবার,

শেষে ফুরফুরে পপি হয়ে ফোটার শিহরণে।

 

চুরচুর ভেঙে পড়া কাচ, বিষাক্ত কণ্টক

চুরচুর ভেঙে পড়া কাচ, বিষাক্ত কণ্টক আর বেদনা

আমাদের মধুময় মুহূর্তকে আক্রমণ করে। 

ঘুমের ফুরফুরে শান্তি মেলেনা কোথাও — 

রাস্তায় অথবা উঁচু গম্বুজে, মেলেনা সুখ, দেয়াল তুলে দিয়ে। 

 

চামচ ভরা বিষাদ ছলকে ওঠে অতর্কিতে

রেহাই পায়না কেউ, সেই ফোঁটা ফোঁটা তীব্রতা থেকে,

তবু শোক ছাড়া, জন্ম-রহস্য, নিরাপদ ঘর, অথবা 

ছাদের মাচান — কিছু কি সৃষ্টি হয়?

 

নিবিড় ভালবাসায় চোখ বুজেও তো এড়ানো যায়না দুঃখকে,

ছিন্নভিন্ন দেহের নিরাময় নেই তুলতুলে বাসর শয্যায়,

বেদনা তার বিজয়ী নিশান নিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে ঠিক।

 

জীবনের আঠালো নির্যাস ছুটে আসে 

শরীরপ্লাবী নদীর মত, খুলে দেয় রক্তাক্ত নালা, সুড়ঙ্গপথ,

আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিষণ্ণতার এক তামাম পরিবার। 

কেন মনে হয়, আমাকে তোমার

কেন মনে হয়, আমাকে তোমার এই ভালবাসার মুহূর্তগুলি

ঝরে যাবে একদিন, অন্য কোনো নীলাভ রঙ বদলে দেবে আকাশ,

অন্য কোনো ত্বক আবৃত করবে অস্থি আমাদের,

অন্য কোনো চোখ দেখে নেবে বাসন্তী ভুবন।

 

মুহূর্তের স্পন্দন যারা বেঁধে রেখেছিল,

করেছিল ধোঁয়াটে আলাপচারিতা,

শাসক, পণ্যজীবি, দর্শক — তারা

মাকড়সার জালে করবে না আর বিচরণ।

 

চশমা-পরা নিষ্ঠুর ঈশ্বর, রোমশ সর্বভুক,

রক্তচোষা জাবপোকা,

পোকাখোর ভরত, চলে যাবে সব।

 

পৃথিবীর মাটি ধুয়ে নেবে নহল বৃষ্টির জল,

তারপর, সরোবরে জন্ম দেবে অন্য নয়ন,

গমের ফলন হবে অশ্রুহীন।

 

রাত্তিরে এভাবে তোমাকে নিবিড় কাছে পেতে

রাত্তিরে এভাবে তোমাকে নিবিড় কাছে পেতে ভালোবাসি, প্রেম, 

ঘুমে যখন অদৃশ্য তুমি, নিশাচর প্রাণীর মত,

আমি তখন দিনভর বিভ্রান্তির জটিল বুনন থেকে 

নিজেকে ধীরে ধীরে ছাড়িয়ে আনি।

 

তোমার আনমনা, আলগা হৃদয় হয়ত তখন 

স্বপ্নীল মেঘে ভেসে গেছে, কিন্তু তোমার পরিত্যক্ত শরীর শ্বাস নেয়; 

না দেখেই, খোঁজে আমাকে, একটি বৃক্ষের লতানো আকুল ডাল

ছায়ার ভেতর যেভাবে প্রসারিত হয়।

 

কাল ভোরের ঋজুতায়, তুমি হয়ত অন্য মানুষ,

তবু থেকে যায় রাতের সীমান্তিক রেশ,

আমাদের নিবিড় মুহূর্তগুলির — সত্তার আর শূন্যতার,

 

আমাদের যা কাছাকাছি আনে, জীবনের অঢেল আলোয়, 

যেভাবে আঁধারের সিলমোহর নিশাচর প্রাণীর শরীরে

এঁকে দেয় আগুনের অভিন্ন উল্কি।

 

ওরা মিথ্যাবাদী, যারা বলেছিল

ওরা মিথ্যাবাদী, যারা বলেছিল আমি হারিয়েছি নিবিড় জ্যোৎস্না,

বলেছিল আমার ভবিষ্যৎ হা হা মরু-বালুময়,

যারা ঠাণ্ডা জিহ্বায় ছড়িয়েছিল নির্দয় গুজব,

নিষিদ্ধ করেছিল বিশ্বের স্বাভাবিক ফুল।

 

`শেষ হয়ে গেছে ওঁর অপরূপ বাতাসী আভা,

জলকন্যার দৃপ্ত তৃণমণি’, ব’লে তারা চর্বন করে গিয়েছিল 

তামাম গবেষণা-পত্র, কৌশলে দিতে চেয়েছিল ঠেলে 

বিস্মৃতির অতল খাদে, আমার দামাল গীটার।

 

আমি তখন তাদের চোখে ছুঁড়ে মেরেছি 

তোমার-আমার হৃদয় বিদ্ধ করা ভালবাসার অব্যর্থ গজাল,

কুড়িয়ে নিয়েছি তোমার পায়ে পায়ে ফেলে যাওয়া সুগন্ধী জুঁই।

 

তোমার নিমিখের দীপদীপে আভা ছাড়া

হারিয়ে গেছি আমি নিকষ আঁধারে, তারপর রাত্রি যখন ঘিরেছে আমায় 

জন্মেছি ফের, হয়ে আপন তিমিরের অধীশ্বর।

 

আমার একটি মাত্র হাতে হাজার হাতের ব্যগ্রতায়

আমার একটি মাত্র হাতে হাজার হাতের ব্যগ্রতায় লেখা 

শব্দস্তবক, ভরে ওঠা সফেদ কাগজ, তোমায় রাখতে পারে না ধ’রে, 

ধরা পড়ে না স্বপ্ন, কবিতার ছেঁড়া পাতা ঝরে যায়

মাটির গভীরে, থেকে যায় প্রাণময় শুকনো পল্লবের মত।

 

পানপাত্র থেকে যতই উপচে পড়ুক 

স্তব, আভা, বিচ্ছুরণ, থাকুক এক অদম্য শিহরণ সেই মদে, 

তোমার ঠোঁট এক চুমুকে হয়ে যাক

পারিজাতের ময়ুরপংখী লাল।

 

আমার শব্দেরা চায় না তো মন্থর বর্ণমালা,

চায় না পাথুরে দেয়ালে ধাক্কা খেতে খেতে 

উঠে আসা স্মৃতির ফেনীল মন্থন

 

তোমার নাম লিখে যাওয়া ছাড়া 

কিছুই চায় না আমার শব্দরাজি, তবু ভালবাসার আবেশ, নিমগ্নতা

তাদের নীরবতা দেয়, বসন্তে শব্দ-মুখর হবে ব’লে।

 

অগাস্টের ভেজা সপসপে রাস্তাটা

অগাস্টের ভেজা সপসপে রাস্তাটা 

এক ফালি কাটা চাঁদের মত ঝকঝক করে 

যেন উপছে পড়ে পাকা আপেলের 

হৈমন্তিক আভা।

 

কুয়াশা, অঢেল শূন্যতা অথবা আকাশের রহস্যের জালে 

ধরা পড়ে স্বপ্ন, শব্দ আর মাছ,

দ্বীপের মৃত্তিকার সংগে বিবাদ বাধায় কুয়াশার জমাট বাষ্পেরা,

চিলির আলোয় কাঁপে থিরথির অথৈ সাগর।

 

সব কিছু ঝলসায় ধাতব কাঠিণ্যে,

পাতারা লুকায়, শীত গোপন করে পল্লবময় উত্তরাধিকার,

একমাত্র আমরা এই শীতার্ততার প্রতি অন্ধ, অনন্ত নির্জনতায়

 

গতিশীল নিঃশব্দ চলা, নিঃঝুম বিদায়ী হাত,

চলে যাওয়া, এসবের সাক্ষ্য নিয়ে আমরা থেকে যাই,

বিদায় জানাই, অশ্রু ঝরে প্রকৃতির।

 

তোমার বাড়িটা দুপুরের রেলগাড়ির মত

তোমার বাড়িটা দুপুরের রেলগাড়ির মত,

মৌমাছির ব্যস্ত গুঞ্জন, ডেকচির বাষ্পীয় শিস

শিশিরের কীর্তিকলাপ প্রপাতের স্বর হয়ে ঝরে,

তোমার কণ্ঠে বেজে ওঠে তালগাছের সমূহ উচ্ছ্বাস।

 

হালকা নীল দেয়ালটি, গ্রামীণ ডাকপিওনের মত

গেয়ে-ওঠা টেলিগ্রাম হাতে, পাথরের ওপর ঝুঁকে কথা বলে,

আর ওই ওখানে, দুটো ডুমুর গাছের সবুজ ধ্বনিময়তার মাঝখানে, 

নিঃশব্দে হেঁটে যান হোমার।

 

এখানে নেই নাগরিক ধ্বনি, নেই কান্না,

নেই কোনো তীক্ষ্ণ অভিপ্রায় অথবা বিশুদ্ধ সোনাটা,

নেই ঠোঁট, নেই ভেঁপু, আছে শুধু প্রপাতের ঝিরঝিরে স্বর, সিংহ-নিনাদ।

 

আর আছ তুমি, তোমার সিঁড়ি বাওয়া, গান গাওয়া, তোমার মৃদু, চঞ্চল পদচারণা,

রোপন, সেলাই, অথবা রান্নার কাজে ব্যস্ত তুমি, কখনো বা হাতুড়ি অথবা লেখনী নিয়ে

আর যখন তুমি নেই, এখানে তখন শীতের স্তব্ধতা নেমে আসে।

 

ইকিকের ভীষণ বালিয়াড়ি

ইকিকের ভীষণ বালিয়াড়ি 

অথবা মিঠে নদের ভরাট মোহনা, যেখানেই যাই, 

পাল্টায় না তোমার আদিগন্ত গম, সোনালী অবয়ব,

আঙুর-গড়ন, উদাত্ত গীটার।

 

দয়িতা আমার, নীরবতার যুগ থেকে শুরু কোরে,

উত্তরে জড়ানো আঙুর-লতা থেকে ধূসর-নীল প্রেইরির 

আপরিসর নির্জন প্রান্তর, নিকষ প্রকৃতির তামাম চালচিত্র 

যেন তোমারই তুলনা দিয়ে গড়া।

 

অথচ বিষণ্ণ খনিজ পাহাড়, তুষার-ঝরা তিব্বতের ঢাল, 

অথবা পোল্যান্ডের পাথর, কিছুই পারেনা পাল্টাতে

তোমার দুর্বার সোনালী শীষ, শস্যের সর্বগামী অজরতা 

 

যেন কাদামাটি, যবের প্রান্তর, থোকাথোকা ফল,

যা-কিছু চিলির নিবিড় আপন, সব তোমার ভেতর স্থান করে নেয় বরাবর

কোনো এক অরণ্য-জ্যোৎস্নার সহজাত নিয়মে।

 

কোনো দৃশ্যমান রক্তপাত ছাড়াই

কোনো দৃশ্যমান রক্তপাত ছাড়াই, গভীর ক্ষত নিয়ে

আমি তোমার জীবনের রশ্মি ধরে হেঁটে গেছি;

হঠাৎ দুর্ভেদ্য বনের মাঝখানে অঝোর বৃষ্টি

এক বুক আকাশ চিরে নেমে আসে আমার ওপর।

 

সেই বৃষ্টিফোঁটায় ঝরে পড়া তোমার হৃদয় ছুঁয়ে জানলাম,

তোমার চোখ আমার বেদনার গহন প্রান্তরকে জেনেছে

নির্ভুল আলোক-শলাকার মত।

চারিদিকে ছায়ারা ফিসফিস করে উঠল,

 

কে? কে ওখানে? কিন্তু সে তো নামহীন বেদনা,

গহীন বনের খসখস পাতা, কালো জলের ধুকপুকে স্পন্দন

শোনার মত কেউ নেই তখন।

 

এভাবেই চিনলাম আমার কষ্টগুলো

সেই ছায়া-ধ্বনির ভেতর, সেই মায়াময় নিবিড় বৃষ্টিতে,

সেই উথালপাথাল বিরহিনী রাতে।

 

সুহৃদ কতাপোস বলে, তোমার হাসি

সুহৃদ কতাপোস বলে, তোমার হাসি 

নাকি পাথুরে দুর্গ থেকে চকিত পৃথিবীতে নামে বাজের দৃপ্ত সুষমায়।

আমি কি জানি না সে কথা? আকাশ-কন্যা তুমি,

তুমি মাটি আর পাতার সবুজতা ফালি ফালি করা হৃৎ-বিদ্যুৎ 

 

সে বিদ্যুৎ যখন স্পর্শ করে মাটি, তখন ভোরের শিশির গায় গান, 

টলমলিয়ে ওঠে হীরের জৌলুস, আলোর মৌমাছিরা হঠাৎ লাফায়,

আর যেখানে নীরবতা বয়েসী দাঁড়ির মত দীর্ঘকায়,

সেখানেই আচমকা বিস্ফোরিত হয় সূর্য, থালা ভরা চাঁদ 

 

আকাশ নেমে আসে বমাল আঁধার, ভরা জ্যোৎস্নার আভায় 

ভাসে দেবপুষ্প, রুপালি ঘন্টাধ্বনি, 

সফেদ মদির বন্যতায় দৌঁড়ায় মাহুতের পোষা ঘোড়া। 

 

তুমি যে তোমার মত ছোট এক মহাজাগতিক বিস্ময়, 

তাই তোমার উল্কাময় হাসি বর্ষিত হোক অবিরাম, 

প্রকৃতির তাবৎ নাম বিদ্যুৎ-আঙ্গিকে ঝলসে উঠুক।

 

দয়িতা, রাতের দরজা ভিড়িয়ে

দয়িতা, রাতের দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে

আমার সংগে ছায়াময় আঙিনায় এসো,

স্বপ্নের কপাট বন্ধ কোরে, সম্পূর্ণ আকাশ নিয়ে উজাড় হও

আমার ধমনীতে, প্রশস্ত নদীর মত।

 

নিষ্ঠুর স্বচ্ছ দিন অতীতের ছালায় চালান যাক,

একটি একটি মুহূর্ত নিয়ে, তাকে বিদায় জানাই,

বিদায় ঘড়ির কাঁটা, কমলার সতেজতা;

বিক্ষিপ্ত ছায়াময়্তা, স্বাগত তোমাকে।

 

এই গহীন জাহাজ, অথবা জলঝর্ণা, অথবা মৃত্যু-মগ্নতা, বা নতুন জীবনে

আমরা আবার এক সংগে ভিড়ি, অঝোর ঘুমাই, পুনর্জন্ম পাই,

আমাদের রক্তের ভেতর রাত্রি সাজায় তার প্রেমের বাসর

 

আমার ভেতর যে জন্ম-মৃত্যুর রহস্য চলে, চিনিনা তার নাম,

বুঝিনা কারা নিঝুম ঘুমায়, কারা বা জাগে, শুধু জানি,

তোমার সূর্যোদয়ী উপহার আমার সমস্ত বুক ভরে রাখে।

আমাদের দৃপ্ত মৌচাকের

প্রেম, আমাদের দৃপ্ত মৌচাকের, দাওয়ার ব্যস্ত রাণী,

চিতার মত তন্বী, ক্ষিপ্র তুমি। তোমার সংসারে ঝোলে পেঁয়াজের দীর্ঘ স্তবক,

তোমার রাজত্ব মুগ্ধ করে চোখ, অস্ত্রের মত ঝলসায় রজন,

মদের লালচে আভা, সোনালী তেল।

 

সফেদ রসুন আর কুচকুচে মাটির কোয়া খুলে যায়

তোমার হাতে, আঙুলে জ্বলে শোরার নীলাভতা,

তোমার স্বপ্নেরা পায় বর্ণীল সালাদের রূপ,

জলের একটি পোষা সরীসৃপ তোমার ঝারিতে পাক খেয়ে থাকে।

 

তোমার নিড়ানি উস্কে দেয় মাটির সৌরভ,

তোমার নির্দেশে ভাসে শুভ্র বুদ্বুদ,

আমার মই আর সিঁড়িতে চলে তোমার চকিত আনাগোনা।

 

আমার হস্তলিপিও যেন তোমার তুখোড় পরিচালনার

অনুচর। আমার উদার কবিতার খাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া তামাম বর্ণমালা

খুঁজে চলে তোমার মুখে সজীবতার স্বাদ।

 

কেই বা আমাদের মতো প্রেম করেছে?

ভালোবেসেছে কে বা আমাদের মত?

যে হৃদয় জ্বলতে জ্বলতে হয়ে গেছে ছাই, 

আমাদের চুম্বনের ঝরে পড়া শিশির ফোঁটায় 

এসো, সতেজ করি তার শূন্যময় ফুল।

 

যে ভালবাসা গ্রাস করেছে তার নিজস্ব শাঁস

তারপর মাটিতে মিশেছে যার মুখ, জৌলুস, 

আমরা তারই রেখে যাওয়া আলোর নির্যাস,

অপরিবর্তনশীল ঝিরঝির শস্য-মঞ্জরী।

 

হিমেল মুহূর্ত, বসন্ত-স্পন্দন, তুষার ঝরানো শীত, হেমন্তের হাত, 

যে করেছে অনুভব, বিস্মৃতির কবরে শুয়ে থাকা সে ভালবাসার 

আরো কাছাকাছি আনি, এসো, নহল আপেলের রক্তাভ উজ্জ্বলতা,

 

আনি টাটকা জখমের গন্ধ সজীবতা — সেভাবে,

যেভাবে প্রাচীন প্রেম নিঃশব্দে হেঁটে যায়, ছুঁয়ে যায় 

মাটিতে অনন্ত মুহূর্ত ধরে ডুবে থাকা মুখ।

 

সকালবেলার বাড়িটা দ্রোহী সত্যের মত

সকালবেলার বাড়িটা দ্রোহী সত্যের মত পড়ে থাকে

কম্বল, পালকের ইতস্তত চিহ্ন নিয়ে,

দিশাহীন হতভাগ্য ডিঙির মতন দোদুল্যমান

শৃংখলার বিন্যাস আর ঘুমের মাঝামাঝি জলরাশিতে।

 

গেরস্থালির ভাঙা টুকরো, অবশেষ,

পুরনো অনুগত সামগ্রী, হিমেল উত্তরাধিকার,

বই-এর পাতায় মুখ লুকানো কুঁকড়ানো বর্ণমালা,

বোতলের বাসি মদ — ধরে রাখে গতকালের গন্ধ।

 

আর তুমি, কিশমিশে সোনালী মৌমাছির দৃপ্ত ব্যস্ততায়, 

সুচারু বিন্যাস ফিরিয়ে আনো ঘরে, আঁধার থেকে খুঁজে আনো বিলুপ্ত অঞ্চল,

তোমার সফেদ চাঞ্চল্য দখল করে নেয় আলোর তাবৎ সুক্ষ্মতা।

 

আর তাই, স্বচ্ছতা আসে,

সব কিছু মেনে নেয় বাতাসের ফুরফুরে নিয়ম

আর শৈল্পিক শৃংখলা পত্তন করে অখণ্ড রুটি, ঘুঘুর উড়ান।

 

আমার হাড় থেকে তুমি এসেছ

আমার হাড় থেকে তুমি এসেছ, প্রিয়তমা 

মহিষী আমার; তোমার মাথায় পরিয়েছি দখিনা বনের পাতা, 

লোতার ঘাস-মুকুট। মাটির বোনা দোপাটি ফুল, 

সুগন্ধী সবুজ সম্মান, তোমার প্রাপ্য বলেই।

 

তোমাকে যে ভালবাসে, সেই পুরুষের মত, তুমিও 

আপরিসর বনভূমির সন্তান। যে মাটি এনেছি আমরা দুজন, 

তার ঘ্রাণ রক্তে আমাদের । আমরা দুটি দেহাতি মানুষ

নগরে বিভ্রান্ত পথ হাঁটি, পৌঁছনোর আগেই বন্ধ না হয় যেন হাট।

 

তোমার ছায়ায় খুঁজে পাই লালচে বরই-এর তাতানো সুবাস,

তোমার দৃষ্টি প্রোথিত সেই আদিগন্ত দখিনা মাটিতে,

তোমার স্নেহজ হৃদয় যেন মাটির পারাবত।

 

শরীর তোমার নদীর জলে ডুবে থাকা পাথরের মত স্নিগ্ধ, নিটোল; 

চুমুতে তোমার টুসটুসে ফল, শিশির-ভেজা সজীবতা, 

তোমার সঙ্গে থাকা যেন মাটির সাথেই নিবিড় সহবাস।

 

এই তো এইখানে, পড়ে আছে অখণ্ড রুটি

এই তো এইখানে, পড়ে আছে অখণ্ড রুটি, পানীয়, টেবিল, 

বসতবাড়ি, এক পুরুষ, এক নারীর তাবৎ প্রয়োজন, সামগ্রী জীবনের; 

শান্তিময়তা ঘূর্ণির মত ঘুরে এইখানে থিতু হয়ে বসেছে এখন,

সাধারণ কোনো আঁচে তৈরী হয়েছে এ বাতির আলো।

 

তোমার দুটি উড্ডীন হাতের কর্ম-চঞ্চলতায় 

তৈরী হয় এ সফেদ ময়ান, সৃষ্টি হয় গান, আহার ব্যঞ্জন,

সংরক্ষিত, তামাম গৃহস্থালি। নৃত্য-পাগল তোমার পা 

তুখোড় নর্তকীর মত নেচে চলে ঝাড়ুর সংগেও, অবাক মর্যাদায়।

 

আমাদের পেছনে উথালপাথাল ঝড়, 

হুমকির রাঙা চোখ, বিরুদ্ধ-ফেনারাশি, 

মৌচাকের জ্বালাময় বিষ, ডুবো পাহাড়, অতলান্তিক।

 

আমরা বিশ্রাম পেয়েছি এখন, তোমার রক্ত মিশেছে 

আমার ধমনীতে, আমাদের পথ এখন তারাময় নীল রাত, 

ঘরে অনন্ত মমতাময়ী ধারা।

 

এই তো সেই ঘর

এই তো সেই ঘর, সেই সমুদ্র, সেই উড্ডীন পতাকা,

দীঘল দেয়াল ধরে অনেক হেঁটেও খুঁজে পাইনি যার

সিংহ-দুয়ার, শুনতে পাইনি আমাদের 

না-থাকার শূন্যতাকে — যেন ও মৃত।

 

অবশেষে বাড়িটি তার নৈঃশব্দের পাল্লা খুলে দেয়, 

আমরা ভেতরে আসি, এলোমেলো পরিত্যক্ত সামগ্রীর

ওপর পা, মেঝেতে মৃত ইঁদুর, শূন্যময় প্রস্থানের 

বিদায়ী চিহ্ন, নলীতে জলের ব্যর্থ কান্না জমে আছে।

 

বাড়িটা কেঁদেছে দিন-রাত, মাকড়সার জালে জুবুথুবু,

আধখোলা, মর্মাহত, পোড় খাওয়া, 

কালশিটে লেগে আছে চোখে ।

 

আমরা এসেছি জেনে জীবন ফিরে পেয়েছে সে, নিমেষে,

অথচ, আমাদের স্থায়ীত্বের পরও হতচকিত বাড়িটা

পারেনা ঠাওরাতে, কী ভাবে হাসতে হয়, কী ভাবে ফোটাতে হয় ফুল।

 

দয়িতা, দেখো আকাশে মেঘের মিনার

দয়িতা, দেখো আকাশে মেঘের মিনার, 

যেন উদ্দাম উল্লাসে ধোপানী কাচে সফেদ কাপড়

নীলচে আভায়, সব কিছু তারা হয়ে জ্বলে,

সমুদ্র, জাহাজ, সব যেন এক নীলাভ দ্বীপান্তর। 

 

সূর্যাস্তের চেরী আর স্বপ্নালু তারার ভীড়ে 

এই তো বিশ্বের রক্তিম গোল চাবি,

ঝটপট এর চকিত নীল আঁচ স্পর্শ করি, এসো,

নিমিখে ঝরবে এর পাপড়ি তাবৎ।

 

থোকা থোকা আঙুরের মত, এত আলো, 

বাতাসের অফুরান শূন্যতা, এত অবকাশ,

দারুণ ঝাপটায় বেরিয়ে পড়া ফেনার গহন রহস্য

 

এত নীল, কখনো আকাশী, কখনো সাগর-গহীন, 

এর তল খুঁজে হারায় আমাদের চোখ,

বাতাসের উদ্দামতায়, সমুদ্রের অতল রহস্যে।

Posted in Pablo Picasso | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

শার্ল বোদল্যের-এর উপন্যাস ‘ফাঁফারলো’র অনুবাদ

79020612_600689270735983_5870919701755854848_o

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

আমার কবিতার ইংরেজি অনুবাদ

82387883_3519962788045641_8461851198285152256_o

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

র‌্যাঁবো’র “নরকে এক ঋতু” কবিতার অনুবাদ এই সংখ্যায়

70667306_1002114770180226_130586157057572864_o

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

চার্লস বুকোস্কির কবিতা : অনুবাদ মলয় রায়চৌধুরী

32FTXiQ5krWJhJDAfptSSponeTwswAX8XdtkwALYuuaTGoj7ksZ1VdWZnwp7AmkpLbkhtodwBF4RKAiFUFa2zqLCbxzg68RR3DAPZgYNeEKhC5LCdLKgLW5rsoDGKCH4W6GErVLNY6rYs4NS

চার্লস বুকোস্কির কবিতা : অনুবাদ মলয় রায়চৌধুরী

প্রেম ও খ্যাতি ও মৃত্যু

এটা আমার জানালার বাইরে বসে থাকে

বাজারে যাচ্ছে এমন এক বুড়ির মতন ;

এটা বসে থাকে আর আমার দিকে লক্ষ রাখে,

ভয়ে গলদঘর্ম হয়

তারের আর কুয়াশার আর কুকুরের ডাকের ভেতর দিয়ে

যখন হঠাৎই

আমি দৃশ্যটা খবরের কাগজ দিয়ে বন্ধ করে দিই

মাছি মারার মতন করে

আর তুমি শুনতে পাবে কাতরানির চিৎকার

মামুলি শহরের ওপর দিয়ে,

আর তারপর সেটা চলে যায় ।

একটা কবিতাকে শেষ করার উপায় ইসাবে

এরকমভাবে

হঠাৎই একেবারে

চুপ মেরে যাওয়া

 

আর চড়ুইপাখিটা

জীবন দিতে হলে তোমাকে জীবন নিতে হবে

আর যেমন-যেমন আমাদের শোক ফালতু হয় আর ফাঁকা

লক্ষকোটি রক্তাক্ত সমুদ্রের ওপরে

আমি ভেতরের দিকে ভেঙে-পড়া মাছের গম্ভীর ঝাঁক পাশ কাটাই

শাদা-পা, শাদা-পেট, পচন্ত প্রাণীদের

দীর্ঘকাল মৃত আর চারিপাশের দৃশ্যের সঙ্গে দাঙ্গার সঙ্গে যুঝে চলেছে ।

 

প্রিয় খোকা, আমি তোমার সঙ্গে তা-ই করেছি যা চড়ুইপাখি

তোমার সঙ্গে করেছিল ; আমি তো বুড়ো যখন কিনা এটা বাজারচালু

যুবক হয়ে ওঠা ; আমি কাঁদি যখন কিনা হাসা হলো চলন ।

 

আমি তোমাকে ঘেন্না করতুম যখন কম সাহসেই

ভালোবাসা যেতো ।

আমার ৪৩তম জন্মদিনের জন্য কবিতা

একাই শেষ হয়ে যাওয়া

একটা ঘরের কবরে

বিনা সিগারেটে

কিংবা মদে–

ঠিক বিজলিবাল্বের মতন

আর ফোলা পেট নিয়ে,

ধূসর চুল,

আর সকালবেলায়

ফাঁকা ঘের পাবার জন্য

বেশ আহ্লাদিত

ওরা সবাই বাইরে

টাকা রোজগারের ধান্দায় :

জজসাহেবেরা, ছুতোরেরা,

কলের মিস্ত্রিরা, ডাক্তাররা,

খবরের কাগজের লোকেরা, ডাক্তাররা,

নাপিতেরা, মোটরগাড়ি যারা ধোয় তারা,

দাঁতের ডাক্তাররা, ফুলবিক্রেতারা,

তরুণীবেয়ারারা, রাঁধিয়েরা,

ট্যাক্সিচালকেরা

 

আর তুমি পালটি খাও

তোমার বাঁদিকে

রোদের তাপ পাবার জন্য

পিঠের দিকে

আর তোমার

চাউনির বাইরে ।

 

অন্ধকারকে যুদ্ধে আহ্বান

চোখে গুলি মারা

মগজে গুলি মারা

পোঁদে গুলি মারা

নাচে ফুলের মতন গুলি মারা

 

অদ্ভুত কেমন করে মৃত্যু বেমালুম জিতে যায়

অদ্ভুত যে জীবনের মূর্খ আদরাকে কতো গুরুত্ব দেয়া হয়

 

অদ্ভুত যে হাসাহাসিকে কেমন করে চুবিয়ে দেয়া হয়

অদ্ভুত যে বদমেজাজ কেমন একটা ধ্রুবক

 

ওদের যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমাকে তাড়াতাড়ি যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে

আমাকে আমার শেষ জমির টুকরো পর্যন্ত দখলে রাখতে হবে

আমাকে আমার ছোট্ট পরিসরটুকু রক্ষা করতে হবে যা আমি গড়েছি যা আমার জীবন

 

আমার জীবন ওদের মৃত্যু নয়

আমার মৃত্যু ওদের মৃত্যু নয়

Posted in Charles Bukowski | Tagged | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

শার্ল বোদলেয়ার – হ্যাশিসের কবিতা : অনুবাদ মলয় রায়চৌধুরী

শার্ল বোদলেয়ার : নকল স্বর্গ – হ্যাশিসের কবিতা

অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

প্রথম অধ্যায়

অমেয়তার সাধ

নিজেদের কেমন করে নিরীক্ষা করতে হয় তা যাঁরা জানেন, এবং যাঁরা তাঁদের প্রতীতির স্মৃতিকে সংরক্ষণ করেন, যাঁরা, হফম্যানের মতন, আধ্যাত্মিক পরিমাপযন্ত্রকে তৈরি করতে জানেন, অনেক সময়ে মনের রসায়ানাগারে লক্ষ্য করে থাকবেন বিভিন্ন ঋতু, আনন্দের দিন, মনোরম মুহূর্তদের । এমন দিনও হয় যখন একজন লোক  অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে যৌবনে জেগে ওঠে । যদিও তার চোখের পাতা তন্দ্রার আচ্ছন্নতা থেকে তখনও মুক্তি দেয়নি তাকে, বাইরের জগত তার কাছে প্রতিভাত হয় এক শক্তিময় উপশম হিসাবে, বহিরায়বের এক স্বচ্ছতা নিয়ে, আর রঙের এমনই এক বৈভব সৃষ্ট করে যা তারিফযোগ্য । নৈতিক জগত মেলে ধরে তার বিশাল পরিপপ্রেক্ষণ, নতুন নির্মলতায় পরিপূর্ণ ।

 

একজন লোক, এই আনন্দে লব্ধকাম, দুর্ভাগ্যবশত বিরল আর সাময়িক, নিজেকে তখনই একজন বড়ো শিল্পী আর বড়ো মানুষ হিসাবে অনুভব করতে থাকে ; যদি এই সবকিছু একটি অভিব্যক্তি প্রয়োগ করে বলতে হয়, তাহলে তখন সে একজন মহৎ সত্তা । কিন্তু আত্মা ও ইন্দ্রিয়ের এই ব্যতিক্রমী অবস্হার একমাত্র ব্যাপার হল — আমি বাড়িয়ে না বলেও তাকে বলব স্বর্গীয়, যদি তাকে আমি প্রতিদিনের ফালতু যাপনের ভারি ছায়ার সঙ্গে তুলনা করি– তাহলে বলব যে তা কোনো দৃশ্যমান ও সহজে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে এমন কোনো সৃষ্টি নয় । তাহলে তা কি সুস্বাস্হ্য এবং বিবেচক জীবনযাত্রার ফলাফল ? প্রথম ব্যাখ্যায় সেরকমটাই মনে হবে ; কিন্তু আমরা মেনে নিতে বাধ্য যে প্রায়ই এই অলৌকিক বিস্ময় ও নিরাময়কারী দানব, সহজ কথায়, নিজেকে এমনভাবে প্রক্রিয়াকরণ করে যেন তা এক উচ্চতর এবং অদৃশ্য ক্ষমতা, যে ক্ষমতা মানুষের বাইরের, তার দৈহিক ক্রিয়াকর্মকে বেশ কিছুকাল যাবত অপব্যবহারের পর ঘটে । আমরা কি বলব যে এটা একনিষ্ঠ প্রার্থনা এবং আধ্যাত্মিক আকুলতার পুরস্কার ? এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে আকাঙ্খার অবিরাম অধিরোহ, স্বর্গাভিমুখী আধ্যাত্মিক পরাক্রমের বিততি, নৈতিক স্বাস্হ্য গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে সঠিক বিধিনিয়ম, যা অতীব উজ্বল এবং অতীব মহিমান্বিত । কিন্তু কোনো এক কিম্ভুত বিধান একে প্রতিভাত করার কারণ হয়ে ওঠে ( যেমন অনেকসময়ে করে ) কল্পনার লজ্জাকর বেলেল্লাপনার পর ; যুক্তিবোধের কুতর্কমূলক অপব্যবহারের পর, যা কিনা, তার সরাসরি ও বিচক্ষণ প্রয়োগে, অনেকটা তুলনীয় বুদ্ধিমান জিমনাস্টিকসের সঙ্গে রাস্তার দড়াবাজিকরদের  স্বশিক্ষিত বোকা-বানানো অঙ্গ-ভাঙনের মতন ? এই কারণে আত্মার এরকম অস্বাভাবিক অবস্হাকে আমি সত্যকার মাধুর্য বলে মনে করব ; একটি ম্যাজিক আয়না যাতে মানুষকে আহ্বান করা হয় নিজেকে সবচেয়ে সুন্দর দেখার জন্য ; অর্থাৎ, যা তার দেখা দরকার, আর যা প্রকৃতপক্ষে হয়তো সে-ই ; এক ধরণের দেবদূতীয় উত্তেজনা ; সবচেয়ে চাটুকার ধরণের একরকম পুনর্বাসন । একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক গোষ্ঠী, যাদের প্রতিনিধিরা ইংল্যাণ্ড ও আমেরিকায় থাকেন, তাঁরা মনে করেন অতিপ্রাকৃত ঘটনা, যেমন ধরা যাক অশরীরীদের প্রেত, ভুত ইত্যাদি হলো ঐশ্বরিক ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ, সদাসর্বদা মানুষের আত্মায় প্রচ্ছন্ন সত্যের স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলার উদ্বেগ ।

 

এই একক ও চমৎকার স্হিতিতে যাবতীয় ওজস্বীতা ভারসাম্য বজায় রাখে ; যেখানে কল্পনা, যদিও অত্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন, নৈতিক বোধকে বিপজ্জনক ঝুঁকিতে টেনে নিয়ে যায় না ; যখন সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতার ওপরে অসুস্হ স্নায়ুরা, যেগুলো সাধারণ অপরাধকে কিংবা বিষাদকে উসকে দ্যায়, তাকে অত্যাচার করে না ; এই অবিশ্বাস্য স্হিতি, আমি বলব, এর কোনো উন্নত লক্ষণ নেই । তা প্রেতের মতনই ধারণাতীত । বদ্ধসংস্কারের কোনো একটা প্রজাতি, তবে বিক্ষিপ্ত বদ্ধসংস্কারের; তা থেকে আমরা এই নির্ণয়ে পৌঁছোতে পারি যে আমরা সঠিক ছিলুম, অভিজাত অস্তিত্বের নিশ্চয়তা, আর আমাদের প্রতিদিনকার ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে তাকে অধিগত করার আশা আমাদের আছে । চিন্তার এই প্রখরতা, ইন্দ্রিয় এবং আত্মার এই উৎসাহ, প্রতিটি যুগে মানুষের কাছে সর্বোচ্চ আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়ে থাকবে ; আর এই কারণে, অন্য কোনো কিছু না ভেবে, যে তাৎক্ষণিক আনন্দ সে পাচ্ছে, নিজের সংবিধানের আইনকে অমান্য করার উদ্বেগে না ভুগে, সে যাচ্ঞা করেছে, ভৌতিক বিজ্ঞানে, ঔষধি-বিজ্ঞানে, সস্তা পানীয়তে, সূক্ষ্ম সুগন্ধে, প্রতিটি আবহাওয়া ও প্রতিটি কালখণ্ডে, পালিয়ে বাঁচার মাধ্যম, তা কয়েক ঘণ্টার হলেও, তার পাঁকের স্বদেশে, এবং, সমালোচক লাজারে যেমন বলেছেন, “প্রথম আক্রমণেই স্বর্গোদ্যান দখল করা” তা করার উদ্দেশ্যে । হায় ! মানুষের অসৎ চরিত্র, আতঙ্কে ঠাশা এবং তাকেই মান্যতা দিতে হয়, তার প্রমাণ আছে, এমনকি তা তাদের অসীম প্রসারণ হলেও, তার শাশ্বতের জন্য ক্ষুধা ; কেবল, এ এমনই এক স্বাদ যা পথ হারিয়ে ফ্যালে।

 

সেই বহুল প্রচারিত রূপকের উল্লেখ করা যেতে পারে, “সব রাস্তাই রোম-এ যায়,” আর তাকে নৈতিক জগতে প্রয়োগ করা যায় : সব রাস্তাই পুরস্কার কিংবা শাস্তি-তে পৌঁছোয় ; শাশ্বতের দুটি বিন্যাস । মানুষের মন প্যাশনে কানায় কানায় ভরা : তার আছে, আমি যদি আরেকটা পরিচিত বাক্য ব্যবহার করি, জ্বলতে থাকার প্যাশন । কিন্তু এই অসুখি আত্মা, যার স্বাভাবিক দুরাচার তার আকস্মিক প্রবণতার সমান, যথেষ্ট আপাতবিরোধী, পরার্থবাদীতা এবং কঠোর গুণাবলীর জন্য, আপাতবিরোধিতায় ঠাশা, যা তার উপচে-পড়া অতিমাত্রিক প্যাশনকে  অন্য উদ্দেশ্যের দিকে ফিরে তাকাবার সুযোগ দ্যায় । সে কখনও আঁচ করতে পারে না যে সে নিজেকে পুরোপুরি বিক্রি করে দিচ্ছে : সে ভুলে যায়, তার প্রমত্ততায়, যে তার চেয়েও ধূর্ত এবং তার চেয়ে শক্তিশালী খেলোয়াড়ের মুখোমুখি হয়েছে সে ; আর পাপের আত্মাকে এক চুল জায়গা ছাড়লে পুরো মাথাটা তুলে নিয়ে যেতে মোটেই বিলম্ব করবে না । এই দৃশ্যমান মালিকের দৃশ্যমান প্রকৃতি — আমি মানুষের কথা বলছি — তাহলে, রসায়নের মাধ্যমে স্বর্গোদ্যান গড়তে চেয়েছে, গ্যাঁজানো পানীয়ের মাধ্যমে ; সেই ক্ষিপ্ত লোকটার মতন যে নিরেট আসবাব আর আসল বাগানকে ফ্রেমে বাঁধানো ক্যানভাসের ওপর আঁকা পেইনটিঙ দিয়ে প্রতিস্হাপন করতে চায় । শাশ্বত সম্পর্কিত সংবেদনের এই অধঃপতনে আছে, আমার মতে, কলুষিত মাত্রাধিক্যের কারণ ; সাহিত্যিকের নিঃসঙ্গ এবং নিবিষ্ট মাতলামি থেকে, যে শারীরিক যন্ত্রণার উপশমের জন্য আফিমে বেদনানাশকের সন্ধান করে, আর এই ভাবে অস্বাস্হ্যকর আহ্লাদের কুয়ো আবিষ্কার করে, একটু একটু করে তাকে বানিয়ে ফ্যালে তার একমাত্র আহার, আর তা হয়ে ওঠে তার আত্মিক জীবনের সমষ্টি ; শহরতলির সবচেয়ে ন্যক্কারজনক নেশাখোরের পর্যায়ে নেমে, তার মস্তিষ্ক অর্চি এবং গরিমায় প্রদীপ্ত, রাস্তার পাঁকে  হাস্যকর গড়াগড়ি খায় ।

 

আমি যাকে বলি নকল আদর্শ, তা গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে ফলপ্রদ মাদক হলো, পানীয়গুলোর কথা বাদ দিচ্ছি, যা দ্রুত স্হূল উত্তেজনাকে তাতিয়ে তোলে আর যাবতীয় আত্মিক শৌর্যকে, সুগন্ধকে, চাপা দিয়ে দ্যায়, যার অত্যধিক সেবন, সবচেয়ে নিগূঢ় মানুষের কল্পনাকে প্রতিদান দিলেও, তার দৈহিক ক্ষমতাকে ক্রমশ ক্ষইয়ে দ্যায় ; দুটি প্রবলভাবে সক্রিয় মাদক, সবচেয়ে সুবিধাজনক আর সবচেয়ে কুশলী, হলো চরস আর আফিম । এই মাদকগুলো যে রহস্যময় প্রতিক্রিয়া এবং অস্বাস্হ্যকর আনন্দ সৃষ্টি করে, বহুকাল যাবত তার সেবনের ফলাফল থেকে যে অবশ্যম্ভাবী শাস্তি হয়, আর সর্বোপরি  এই নকল আদর্শকে পাওয়ার সন্ধানে যে অমরত্বের জরুরি ব্যবহার হয়, সেই বিষয়ে অধ্যয়ন করাই এই রচনার উদ্দেশ্য ।

 

আফিমের বিষয়ে আগেই আলোচনা করা হয়েছে, আর তা একই সঙ্গে এমন চমকপ্রদ, বৈজ্ঞানিক আর কাব্যিকভাবে যে, আমি নতুন করে আর কিছু যোগ করতে চাই না । আমি অতএব আরেকটি বিষয়ে অধ্যয়ন করে নিজেকে সন্তুষ্ট করতে পারব, সেই সঙ্গে অতুলনীয় এই বইটির বিশ্লেষণ করব যা পুরোপুরি ফরাসি ভাষায় অনুদিত হয়নি । তার লেখক, একজন সুপ্রসিদ্ধ মানুষ, যাঁর কল্পনার ক্ষমতা অসাধারণ এবং সূক্ষ্ম, বর্তমানে অবসর নিয়েছেন এবং মৌন অবলম্বন করেছেন, বিয়োগান্তক অমায়িকতার সাহসে একদা আফিমে তিনি যে আহ্লাদ ও পীড়ন সহ্য করেছেন তা লিখে গেছেন, আর তাঁর বইয়ের সবচেয়ে নাটকীয় অংশ হলো যেখানে তিনি ইচ্ছাশক্তির অতিমানবিক প্রয়াসের কথা বলছেন, যা তাঁর মনে হয়েছিল জরুরি, যাতে তিনি অবিচক্ষণতায় করে ফেলা অধঃপতনের পথ থেকে নিস্তার পান ।

 

আজকে আমি কেবল চরসের কথা বলব, আর আমি সেকথা বলব একাধিক অনুসন্ধান আর পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্যাদির পর ; বুদ্ধিমান মানুষদের টীকা কিংবা গুপ্তকথা থেকে পাওয়া সারাংশ থেকে, যাঁরা বহুকাল এই মাদকে নেশা করতেন ; আমি কেবল এই সমস্ত বিভিন্ন তথ্যাদি একত্রিত করব এক ধরনের প্রকরণে, একটি বিশেষ আত্মাকে বেছে নিয়ে, আর যাঁকে ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞায়িত করা সহজ, এই প্রকৃতির অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার পক্ষে যিনি উপযুক্ত ।

দ্বিতীয় অধ্যায়

চরস কাকে বলে ?

মার্কো পোলোর গল্পগুলো, যা নিয়ে অবিবেচকের মতন হাসাহাসি হয়েছে, যেমনটা হয়েছে অন্যান্য পর্যটকদের ক্ষেত্রে, সেগুলো বৈজ্ঞানিকরা যাচাই করেছেন, আমাদের বিশ্বাস দাবি করে । আমি ওনার গল্পগুলো এখানে আরেকবার বলছি না যে কেমন করে, হ্যাশিসে নেশাগ্রস্ত হয়ে ( যা থেকে “অ্যাসাসিন” শব্দের উৎপত্তি ), পর্বতনিবাসী একজন বৃদ্ধ তাঁর আমোদ-প্রমোদে উচ্ছসিত বাগানে কয়েদ করে রাখতেন যুবক শিষ্যদের, যাদের তিনি নিষ্ক্রিয় ও চিন্তাহীন আনুগত্যের  পুরস্কার হিসাবে স্বর্গোদ্যানের ধারণা দিতে চাইতেন । পাঠক ভন হ্যামার-পার্গস্টলের লেখা ‘দি সিকরেট সোসায়টি অফ হ্যাশিসিনস’ বইটি এবং ‘মেমরিজ দ্য লাকাদেমি দেস ইনসক্রিপশানস এত বেলে-লরত্রস” বইটির ষোড়শ খণ্ডে মসিয়ঁ সিলভেসত্রে দ্য সাসির টীকা পড়ে দেখতে পারেন ; আর “অ্যাসাসিন” শব্দের ব্যুৎপত্তির জন্য ১৮০৯ সালে মনতেউর-এর সম্পাদককে লেখা তাঁর ৩৫৯ নম্বর চিঠিটি পড়ে দেখতে পারেন । হেরোডোটাস বলেছেন যে সিরিয়ার লোকেরা গাঁজার বীজ জড়ো করে তার ওপর জ্বলন্ত লাল পাথর রাখতো ; ফলে তা হয়ে উঠতো এক ধরণের বাষ্পীয় স্নান, প্রাচীন গ্রিসের উনোনের চেয়েও সুগন্ধী ; আর তা থেকে যে আনন্দ সবাই পেতো তা এমনই খোশমেজাজি যে সমবেত সবাই আহ্লাদে কাঁদতে আরম্ভ করতো ।

 

হ্যাশিস, বস্তুত, আমাদের কাছে এসেছে পূর্বদেশ থেকে । প্রাচীন মিশরে গাঁজার উত্তেজক গুণের কথা লোকেরা ভালো ভাবেই জানতো, আর তার ব্যবহার বিভিন্ন নামে ভারত, আলজেরিয়া আর আরাবিয়া ফেলিক্স অঞ্চলে বহুল প্রচারিত ছিল ; কিন্তু আমাদের চারিধারে, আমাদের চোখের সামনে, বিভিন্ন উদ্ভিদ থেকে পাওয়া মাদকের উদাহরণ আছে । বাচ্চারা, যারা কাটা গরুর চারা আলফালফার গাদায় গড়াগড়ি খায়, তাদের মাথা ঘোরার অভিজ্ঞতা হয়, তেমনই গাঁজার ফসল কাটার সময়ে নারী-পুরুষ চাষিদের একই প্রতিক্রিয়া হতো । বলা যেতে পারে যে কাটা গাছগুলো থেকে যে অদৃশ্য বাষ্প ওড়ে তা তাদের মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে তুলতো । যারা ফসল কাটে তাদের মাথা ঘুর্ণিতে ভরে ওঠে, অনেক সময়ে তারা ভাবাবেশে আচ্ছন্ন হয় ; কখনও বা তাদের অঙ্গ সাময়িক দুর্বল হয়ে পড়ে আর কাজ করতে চায় না ।

আমরা রুশদেশের চাষিদের মধ্যে প্রায়শই স্বপ্নচারিতার সঙ্কটের কথা শুনেছি, যার কারণ, ওদের মতে, খাবার রান্নায় গাঁজাবীজের তেলের ব্যবহার । কেই বা মুর্গিদের অস্বাভাবিক আচরণের কথা জানে না যে মুর্গিগুলো গাঁজাবীজ খেয়েছে, আর সেইসব ঘোড়াদের বুনো উৎসাহের কথা, যেগুলোকে চাষিরা, বিয়ে উপলক্ষে আর পৃষ্ঠপোষক সন্তদের ভুরিভোজের উৎসবে, খানাখন্দে-ভরা মাঠে ঘোড়দৌড়ের জন্য যৎসামান্য গাঁজাবীজ খাওয়ায় না, অনেকসময়ে মদের সঙ্গে মিশিয়ে ? যাই হোক, ফরাসি গাঁজা চরস তৈরির জন্য উপযুক্ত নয়, অন্তত, বারংবার নিরীক্ষার পর দেখা গেছে, সেই মাদকের ক্ষমতা চরসের সমান নয় । চরস, বা ভারতীয় গাঁজা ( ক্যানাবিস ইনডিকা ), উরটিকেশিয়া পরিবারের গাছ, দেখতে হুবহু আমাদের অক্ষাংশে যেমন গজায় তেমনই, ব্যতিক্রম হল যে ততো উঁচু হয় না । তাতে নেশা ধরার অসাধারণ উপাদান আছে, যার দরুণ ফরাসিদেশের আর পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের আকর্ষণ করতে পেরেছে । বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে তা কম-বেশি উঁচুদরের বলেই গণ্য করা হয় : আসলে ইউরোপীয়দের কাছে বঙ্গদেশের গাঁজা সবচেয়ে দামি ; যদিও, মিশরের, কন্সটান্টিনোপলের, পারস্যের এবং আলজিরিয়ার গাঁজার উপাদানও এক, তবে এগুলো নিকৃষ্ট স্তরের ।

 

হ্যাশিস বা চরস ( কিংবা পাতাঘাস ; অর্থাৎ, সর্বোচ্চ স্তরের পাতাঘাস, যেন আরব দেশের লোকেরা একটি মাত্র শব্দ দিয়ে একে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছে, পাতাঘাস হলো পার্থিব আনন্দের উৎস ) বিভিন্ন নামে চেনা যায়, যে সমস্ত দেশে তার ফসল সংগ্রহ করা হয়, তার মিশ্রণের উপাদান আর তৈরির কায়দা অনুযায়ী : ভারতে ‘ভাঙ’ ; আফ্রিকায় ‘তেরিয়াকি’ ; আলজেরিয়া এবং আরাবিয়া ফেলিক্সে ‘মাদজৌন্দ’, ইত্যাদি । বছরের কোন ঋতুতে তা সংগ্রহ করা হচ্ছে তা অনেকটা পার্থক্য ঘটায় । সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা থাকে যখন তা ফুলের অবস্হায় । বিভিন্ন প্রস্তুতি-মিশ্রণে ফুলটা কেমন করে প্রয়োগ করা হচ্ছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ, আর সে-বিষয়েই আমরা আলোচনা করব । চরসের পাতার নিষ্কাশন, যেভাবে আরবরা তৈরি করে, তা হলো তাজা গাছের চুড়োকে মাখনে ফোটানো, সামান্য জল মিশিয়ে । বাষ্পীকরণের ফলে শুকিয়ে এলে, তাকে ছেঁকে নেয়া হয়, যে অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায় তাকে দেখতে পমেটমের মতন, সবুজ-হলুদ রঙের, আর যাতে পাওয়া যাবে চরস আর বিস্বাদ মাখনের অনুপভোগ্য গন্ধ । এ থেকে তৈরি করা হয় দুই থেকে চার গ্রাম ওজনের ছোটো-ছোটো গুলি, কিন্তু বিটকেল গন্ধের দরুণ, যা সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে, আরবরা এক একটা গুলি এক একটা মিষ্টান্নর ভেতরে পুরে রাখে । সচরাচর যে মিষ্টান্নে পোরা হয় তার নাম ‘দাওয়ামেস্ক’, তা হলো চরস, চিনি, আর বিভিন্ন সুগ্ধের মিশ্রণ, যেমন ভ্যানিলা, দালচিনি, পেস্তাবাদাম, কাগজিবাদাম, কস্তুরী । অনেক সময়ে একটু ক্যানথারাইড মেশানো হয়, যার সঙ্গে সাধারণ চরসের প্রতিক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই । এই নতুন চেহারায় চরসের আর কোনো বদগন্ধ থাকে না, আর পনেরো, কুড়ি, তিরিশ গ্রাম ওজনের মাদক সেবন করা যায়, পানপাতায় মুড়ে কিংবা কফিতে গুলে ।

 

স্মিথ, গ্যাস্টিনেল এবং দেকুরতিভের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চরসের সক্রিয় উপাদান আবিষ্কারে নিয়োজিত ছিল । তাদের প্রয়াস সত্বেও, চরসের রাসায়নিক মিশ্রণের উপাদান বিশেষ জানা যায়নি, কিন্তু সাধারণত মনে করা হয় যে এর মধ্যে রজন জাতীয় গঁদের উপস্হিতি হলো প্রধান উপাদান যে কেবল দশ শতাংশ থাকে । এই রজন পাবার জন্য শুকনো গাছটাকে পাউডার করে ফেলা হয়, যা বেশ কয়েকবার অ্যালকোহলে ধুয়ে নেয়া হয় ; সামান্য চোলাই আর বাষ্পীয়করণের পর দেখা হয় অবশিষ্টাংশে ঘনত্ব একইরকম কিনা ; এই অবশিষ্টাংশকে জলে ধোয়া হয়, যার ফলে চটচটে জিনিসটা বেরিয়ে যায়, আর বেঁচে থাকে কেবল বিশুদ্ধ রজন ।

 

উৎপাদিত জিনিসটা নরম, ঘন সবুজ রঙের, আর তাতে অনেকাংশে পাওয়া যায় চরসের বিশিষ্ট গন্ধ । পাঁচ, দশ, পনেরো সেন্টিগ্রাম বিস্ময়কর ফলাফল দেবার জন্য যথেষ্ট । কিন্তু হ্যাশচিশাইন, যা চকোলেটের বরফির মতো কিংবা বড়ির আকারে আদার সঙ্গে মেশানো, তা ‘দাওয়ামেস্ক’ আর ‘পাতাঘাস’-এর মতন কম-বেশি কার্যকর, আর তা সম্পূর্ণ আলাদা প্রকৃতির, যে চরস নিচ্ছে তার ব্যক্তিগত পছন্দ আর স্নায়বিক গ্রাহীক্ষমতার ওপর নির্ভর করে; আর, তার থেকেও বেশি, একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ফলাফল হতে পারে। কখনও বা সে অপ্রতিরোধ্য এবং সীমাতিরিক্ত উল্লাসের অভিজ্ঞতা পাবে আবার কখনও স্বপ্নালু তন্দ্রায় আচ্ছন্ন বোধ করবে । এমনকিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা প্রায়ই ঘটে থাকে ; সর্বোপরি, সাধারণ মানসিক ধাত আর শিক্ষিত মানুষের ক্ষেত্রে । বৈভিন্নের ক্ষেত্রে এক ধরণের ঐক্য থাকে যা আমায় চরস-মাতলামির মোনোগ্রাফ সম্পাদনা করার সুযোগ দিচ্ছে, যে ব্যাপারে আমি একটু আগেই বলেছি ।

 

কন্সটানটিনোপলে, আলজেরিয়ায়, এমনকি ফরাসিদেশেও, কিছু লোক তামাকের সঙ্গে চরস মিশিয়ে ধোঁয়া ফোঁকেন, কিন্তু প্রাসঙ্গিক ব্যাপারটা ঘটে মাত্রা বজায় রেখে, আর, সেহেতু, আলস্যে । আমি সম্প্রতি একজনকে বলতে শুনেছি, চোলাই করার মাধ্যমে, চরস থেকে একটা প্রয়োজনীয় তেল বের করা হয়, যার ক্ষমতা এতাবৎ শোনা মিশ্রণগুলোর থেকে অনেক বেশি সক্রিয়, কিন্তু এই বিষয়ে আমি তেমন গভীর অধ্যয়ন করিনি বলে ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত বলতে পারছি না । একথা বলা কি বাহুল্য নয় যে চা, কফি, নানারকম মদ বেশ শক্তিশালী সহায়ক যেগুলো রহস্যময় নেশার সঙ্ঘটনকে কম বা বেশি দ্রুততর করে ?

 

তৃতীয় অধ্যায়

আলোকময় দেবদূতের খেলার বাগান

কেমন হয় একজন লোকের অভিজ্ঞতা ? সে কী দেখতে পায় ? অবিশ্বাস্য জিনিসপত্র, নয় কি? বিস্ময়কর দৃশ্যাবলী ? তা কি খুবই সুন্দর ? আর অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ? আর অত্যন্ত বিপজ্জনক? চরস সম্পর্কে অনবগত লোকেরা চরসসেবিদের কৌতূহলমিশ্রিত ভয়ে এই ধরণের প্রশ্ন করেন। ব্যাপারটা, বস্তুত, জানবার শিশুসুলভ ব্যগ্রতা থেকে করা হয়, সেই সব লোকেদের মতন যারা তাদের আগুন পোয়াবার জায়গা থেকে কখনও নড়েনি তারা বহুদূরের অজানা দেশ থেকে আসা কোনো মানুষের মুখোমুখি হয় । তারা মনে করে তাদের কাছে চরসের নেশা এক অস্বাভাবিক বিস্ময়কর দেশ, হাতসাফাই ম্যাজিকের আর ভেলকি দেখাবার বিশাল নাটমঞ্চ যেখানে সবকিছুই অলৌকিক, সবকিছুই অপ্রত্যাশিত । — তা হলো পূর্বধারণা, সম্পূর্ণ ভ্রান্তিকর । আর যেহেতু সাধারণ পাঠক এবং প্রশ্নকারীর কাছে “চরস” বা হ্যাশিস গড়ে তোলে অদ্ভুত আর ওলোট-পালোট জগতের ধারণা, আশ্চর্যময় স্বপ্নের প্রত্যাশা ( হ্যালুশিনেশান বা অমূলপ্রত্যক্ষ বললে ভালো হবে, যা ব্যাপারটা, লোকে যা ভাবে তেমন পৌনঃপুনিক নয় ), আমি এখনই দুটোর গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য  স্পষ্ট করে দিতে চাই, যে চরসের প্রভাব স্বপ্ন থেকে একেবারে আলাদা । স্বপ্নে আমরা যে অ্যাডভেঞ্চার যাত্রায় প্রতি রাতে যাই, তাতে রয়েছে কিছু ইতিবাচক বিস্ময় । এই অলৌকিক ব্যাপারটা নিয়মিত ঘটার দরুণ এর রহস্য ভোঁতা হয়ে গেছে । মানুষের স্বপ্ন দুই ধরণের হয়। কিছু স্বপ্ন তার প্রতিদিনের ঘটনা, তার কাজকারবার, তার ইচ্ছা, তার দোষ, সব মিলেমিশে গিয়ে মোটামুটি স্মৃতির বিশাল ক্যানভাসে দেখা দেয় । এটা স্বাভাবিক স্বপ্ন ; এক্ষেত্রে লোকটা নিজেই তাতে থাকে । কিন্তু অন্য ধরণের স্বপ্নে, যে স্বপ্ন অদ্ভুত আর অপ্রত্যাশিত, স্বপ্নদ্রষ্টার চরিত্র, জীবন, আবেগের সঙ্গে সম্পর্কহীন আর ব্যাখ্যাহীন : এই স্বপ্ন, যাকে আমি বলব এয়ারোগ্লিফিক, প্রত্যক্ষরূপে জীবনের অতিপ্রাকৃত দিকটির প্রতিনিধিত্ব করে, এবং তা উদ্ভট বলেই প্রাচীন যুগের মানুষেরা একে দৈবী বলে বিশ্বাস করতো । স্বাভাবিক কার্যকারণে ব্যাখ্যাহীন বলে, তাঁরা মনে করতেন ব্যাপারটা একজন মানুষের বাইরে থেকে ঘটে, এবং এমনকি আজকের দিনেও, দার্শনিকদের রোমান্টিক ও মূর্খ গোষ্ঠীকে বাদ দিলেও, তাঁরা এই ধরণের স্বপ্নের মধ্যে অনেক সময়ে আবিষ্কার করেন ভর্ৎসনা, অনেক সময়ে হুঁশিয়ারি ; সংক্ষেপে, এক প্রতীকি এবং নৈতিক ছবি যা ঘুমন্ত লোকটার আত্মায় বাসা বেঁধেছে । এটা এক অভিধান যার অধ্যয়ন প্রয়োজন ; এমনই এক ভাষা যার চাবিকাঠি সন্তরা যোগাড় করতে পারেন ।

 

চরসের নেশায় এরকম কিছুই নেই । আমরা সাধারণ স্বপ্নের বাইরে যাবো না । নেসাটা, যতোক্ষণ থাকে, একথা সত্য, অপরিমেয় স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়, তার জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য এই নেশার রঙবাহুল্যের আতিশয্য আর এর নিষেকের দ্রুতি । কিন্তু তা সব সময়ে ব্যক্তিটির মেজাজের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রাখে । মানুষটা স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিল ; স্বপ্নটা লোকটাকে নিয়ন্ত্রণ করবে । কিন্তু এই সপ্ন হবে সত্যকার বাপের সন্তান । অলস লোকটা নিজের উদ্ভাবন কুশলতাকে চাপ দিয়েছে তার জীবনে আর তার চিন্তাধারায় নকল অতিপ্রাকৃতকে প্রবর্তন করার জন্য ; কিন্তু, তার অভিজ্ঞতার আকস্মিক সক্রিয়তার প্রাবল্য সত্তেও, সে সেই একই মানুষ যে এখন অতিরঞ্জিত, সেই একই সংখ্যা যাকে অত্যন্ত বেশি তেজপূঞ্জে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাকে আনা হয়েছে অধীনতায়, কিন্তু, তার পক্ষে দুঃখের ব্যাপার, সে তা নিজে আনেনি ; অর্থাৎ, তার সেই অংশের দ্বারা যা আগে থেকেই প্রভাবশালী । “সে হতে পারতো দেবদূত ; অথচ সে হয়ে গেলো পশু।” সাময়িকভাবে অত্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন বলা যেতো, যদি নিয়ন্ত্রণহীন ও সহনীয় সংবেদনের বাড়বাড়ন্তকে ক্ষমতার নাম দেয়া হয় ।

 

তাহলে ব্যাপারটা ভালোভাবে বুঝে নিক, মামুলি আর অজ্ঞ লোকেরা, যারা অসাধারণ আনন্দের সঙ্গে পরিচয়ের জন্য কৌতূহলী, যে তারা হ্যাশিস বা চরসে কোনোরকম অলৌকিক ব্যাপার পাবে না,  কেবল প্রকৃতিকে তার মাত্রাধিক্য ছাড়া কিচ্ছু পাবে না । মস্তিষ্ক এবং যে জৈবদেহে চরস কাজ করে তা কেবল সাধারণ আর ব্যক্তিগত ইন্দ্রিয়-পরিমণ্ডলকে বিবর্ধিত করে তুলবে, একথা সত্যি, পরিমাণ ও গুণমান উভয় ক্ষেত্রে, কিন্তু সদাসর্বদা তাদের উৎসের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে । মানুষ তার নৈতিক ও শারীরিক মেজাজের সর্বনাশ থেকে পালাতে পারে না । চরস হবে, বস্তুত, মানুষের পরিচিত ভাবনাচিন্তা ও প্রতীতির আয়না, যে আয়না বাড়িয়ে প্রতিফলন ঘটায়, অথচ আয়না ছাড়া আর কিছুই নয় ।

 

মনে করুন আপনার চোখের সামনে মাদকটা রয়েছে : একটা সবুজ রঙের মিষ্টি, প্রায় বাদামের সমান মাপের, তাতে এক অদ্ভুত গন্ধ ; এমনই অদ্ভুত যে মনোভাব বা রুচিকে বিকর্ষিত করে, বমিও পেতে পারে — যেমন, ধরুন, কোনো সূক্ষ্ম এবং অমায়িক সুরভির ক্ষেত্রে, তাকে যদি তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং ঘনত্বে উন্নত করা হয়, তা যা ঘটাবে, তেমনই।

প্রসঙ্গক্রমে বলার অনুমতি দিন যে প্রস্তাবটা বিপরীতও হতে পারে, এবং সবচেয়ে বিতৃষ্ণাজনক ও বিকর্ষক সুরভিও শুঁকে অপার আনন্দ পাওয়া যাবে যদি তার পরিমাণ ও ঘনত্ব কমিয়ে আনা হয় ।

 

সে-ই ! তাতে রয়েছে আনন্দ ; একটা চামচে স্বর্গ ; যাবতীয় নেশাসহ আনন্দ, তার দোষ, তার বালখিল্য । তুমি বিনা ভয়ে এটা গিলে ফেলতে পারো ; এটা মেরে ফেলবে না ; তোমার দেহের অঙ্গকে জখম করবে না । হয়তো ( পরে ) মায়াবিদ্যার ঘনঘন প্রয়োগ তোমার ইচ্ছাশক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে ; হয়তো মানুষ হিসাবে আজকে তুমি যে লোকটি তার থেকে কম-মানুষ হয়ে যাবে ; কিন্তু প্রতিশোধ তো বহু দূরের ব্যাপার, আর পরিণামস্বরূপ বিপর্যয়কে সংজ্ঞায়িত করা বেশ কঠিন ! তুমি কিসের ঝুঁকি নিচ্ছ ? আগামীকাল যৎসামান্য ক্লান্তি — তার বেশি কিছু নয় । তুমি কি প্রতিদিন কম পুরস্কারের বিনিময়ে এর চেয়ে বড়ো শাস্তির ঝুঁকি নাও না ? তাহলে খুবই ভালো ; তুমি যদি চাও যে এটা দ্রুত আর প্রগাঢ় প্রভাব ফেলুক, তাহলে এক কাপ কালো কফিতে তোমার চরসের খোরাক গুলে নাও । তুমি আগে থেকে তোমার পেট খালি রাখার সাবধানতা নিয়েছো, রাতের খাবার নয়টা বা দশটা পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছ, যাতে বিষটা সক্রিয় হবার জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পায় । বড়ো জোর ঘণ্টাখানেক পরে একটু সুপ খেতে পারো । একটা অদ্ভুত দীর্ঘ যাত্রায় বেরোবার জন্য তুমি যথেষ্ট ব্যবস্হা করে রেখেছ ; স্টিমার ভোঁ বাজিয়ে দিয়েছে, পাল তুলে দেয়া হয়েছে ; আর সাধারণ যাত্রীদের চেয়ে তোমার সুবিধা এই যে তুমি জানো না কোথায় চলেছ । তুমি তোমার যাত্রাপথ বেছে নিয়েছ ; ভাগ্য প্রসন্ন হোক !

 

আমি আশা করি তুমি সতর্ক হয়ে অ্যাডভেঞ্চারে বেরোবার সময়টা সাবধানে  বেছে নিয়েছ, কেননা সর্বগুণান্বিত লম্পটের জন্য প্রয়োজন পূর্ণ অবসর । তাছাড়া তুমি জানো, চরস অতিরঞ্জিত করে, কেবল লোকটির অনুভূতি ও সংবেদন নয়, কিন্তু তার পরিবেশ এবং পরিস্হিতিও । তোমার এমন কোনো কর্তব্য নেই যে সমায়ানুবর্তীতা কিংবা তৎপরতা দরকার ; কোনো গার্হস্হ দুশ্চিন্তা নেই ; প্রেমিকের দুঃখ নেই । এসব ব্যাপারে সাবধান হতে হবে । অমন কোনো নিরাশা, কোনো উদ্বেগ, ভেতরে-ভেতরে চিন্তা যা তোমার ইচ্ছা ও আগ্রহ দাবি করে, কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে, শোকের ঘণ্টার মতন তোমার নেশা জুড়ে বাজতে থাকবে আর আনন্দকে বিষাক্ত করে দেবে । উদ্বেগ হয়ে উঠবে যন্ত্রণা, আর নিরাশা হয়ে উঠবে অত্যাচার । কিন্তু, যদি এই সমস্ত প্রাথমিক অবস্হা পরখ করার পর, আবহাওয়া যদি ভালো থাকে, তুমি যদি মনের মতন পরিবেশে থাকো, যেমন ধরো ছবির মতো ভূদৃশ্যে কোথাও কিংবা সুন্দরভাবে সাজানো একটা ঘরে, আর বিশেষ করে তোমার আয়ত্তে যদি সঙ্গীতের আবহ থাকে, তাহলে তার চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না ।

 

মোটামুটি, চরসের নেশার তিনটি স্তর আছে, যাদের পার্থক্য করা সহজ, আর যারা শুরু করছে তাদের পক্ষে বেমানান নয় যে প্রথম স্তরে তারা কেবল প্রাথমিক লক্ষণগুলোর সন্মুখীন হবে । তুমি শুনে থাকবে চরসের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে লোকেদের ফালতু কথাবার্তা ; তোমার কল্পনাতে বিশেষ কোনো ধারণে এই ব্যাপারে ঘর করে থাকবে, এক আদর্শ নেশার ধারণা । তুমি আশা করো যে বাস্তব সত্যিই তোমার আকাঙ্খার স্তরে পৌঁছোবে ; সেটাই একা শুরুতেই তোমাকে উদ্বেগের স্হিতিতে পৌঁছে দেবে, যা বিষটার ঘিরে ধরার চারিত্র্য আর বিজয় করে ফেলার জন্য যথেষ্ট অনুকূল । বেশির ভাগ আনাড়িরা, তাদের প্রথম দীক্ষায়, প্রভাবের মন্হরতার অভিযোগ করে : তারা বালসুলভ অধীরতায় অপেক্ষা করে, আর তাদের পছন্দমতন মাদকের দ্রুত প্রভাব না ঘটলে, তারা অবিশ্বাসের অনর্থক বুকনি হাঁকে, যা অভিজ্ঞদের কাছে, যারা চরসের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপার ভালো করে জানে, বেশ মজার । প্রথম ঝাপটা, বহুক্ষণ আটক ঝড়ের মতন যার লক্ষণ, দেখা দেয়া আরম্ভ করে আর ওই অবিশ্বাসীর বুকে জমে-জমে প্রাচুর্যে ঘনিয়ে ওঠে । তখন তা এক ধরণের আহ্লাদের, অপপতিরোধ্য অসম্ভাব্যতার, যা তোমাকে কব্জা করে ফ্যালে । উল্লাসের এই উপলব্ধিগুলো, কোনো কারণ ছাড়াই, যা নিয়ে তুমি লজ্জাবোধ করতে পারো, পর্যায়ক্রমে ঘটতে থাকে আর তন্দ্রায় মাঝে-মাঝে বিরাম ঘটাতে থাকে, যে সময়টায় তুমি নিজেকে সামলে নিতে চাও। সহজ কথায়, একেবারে মামুলি ধারণাগুলো, নতুন আর অদ্ভুত বাহ্যিক গঠন পায় । যখন এগুলো ঘটতে থাকে তুমি নিজের সম্পর্কে অবাক হও যে ব্যাপারটা আসলে কতো সহজ। বেখাপ্পা প্রতিচ্ছায়া আর সঙ্গতিসমূহ, আগে থাকতে আঁচ করা অসম্ভব, অন্তহীন শ্লেষ, কৌতূকপ্রদ নকশা, তোমার মস্তিষ্ক থেকে অবিরাম ঝর্ণার মতন বেরোতে থাকে । দানবটা তোমাকে আষ্টেপৃষ্টে ধরে রেখেছে ; আহ্লাদের খোঁচা, যা কাতুকুতুর মতন, তার বিরুদ্ধতা করা তখন বোকামি ! মাঝে-মাঝে তুমি নিজেই তোমার বোকামি আর তোমার পাগলামি নিয়ে হাসতে থাকো, আর তোমার বন্ধুবান্ধব, যদি তুমি আরও অনেকের সঙ্গে থাকো, তারাও হাসে, তোমার আর তাদের নিজেদের অবস্হা নিয়ে তোমরা হাসাহাসি করো ; কিন্তু তারা যেমন কোনো অসূয়া ছাড়াই হাসে, তুমিও তাদের প্রতি বিরক্ত না হয়েই হাসো ।

 

এই আহ্লাদ, একবার আলস্যে আর একবার তীব্রতায়, খোশমেজাজের এই অস্বস্তি, অসুরক্ষার বোধ, এই নির্ণয়হীনতা, শেষ পর্যন্ত, নিয়মমতো, বেশ কম সময়ের জন্য ঘটে । তোমার ধারণাগুলোর মর্মার্থ তাড়াতাড়ি অস্পষ্ট হয়ে যায়, যে আবহের সুতো দিয়ে তোমার ধৃতি একসঙ্গে বাঁধা তা এমন ভঙ্গুর হয়ে যায় যে তোমার দুষ্কর্মের সহযোগীরা  কেউ তোমাকে বুঝতে পারবে না । আর তাছাড়া, এই বিষয়ে এবং এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে, তাকে যাচাই করার কোনো উপায় নেই ! হয়তো তারা ভাবে যে তারা তোমাকে বুঝতে পারছে, আর ভ্রমটা পারস্পরিক । এই চাপল্য, হাসিতে ফেটে পড়া, বিস্ফোরণের মতন, যে লোকেরা তোমার স্হিতিতে নেই তাদের মনে হবে যেন এক সত্যকার খেদোন্মত্ততা, কিংবা অন্তত একজন ক্ষিপ্ত মানুষের বিভ্রম ঘটছে । আরও একটা ব্যাপার, যে লোকটা দেখছে অথচ সতর্কতা অবলম্বন করে নেশা করেনি, তার বিচক্ষণতা এবং সুবুদ্ধির দরুণ, তোমাকে আনন্দ দেয় আর তোমাকে নিয়ে মজা করে যেন তুমি স্মৃতিভ্রংশে ভুগছ । ভূমিকা পালটে যায় ; তার আত্মস্হতা তোমাকে বিদ্রূপের শেষ সীমা পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে যায় । কতোটা রাক্ষুসে মজার এই অবস্হাটা, এমন একজন লোকের ক্ষেত্রে যে আহ্লাদ উপভোগ করছে আর অন্য লোকটা  যে সেই অবস্হায় নেই সে মজা করছে ! পাগলেরা সন্তদের কৃপা করে, আর তখন থেকেই নিজেকে উন্নত মনে করার ধারণা পাগলের মগজে বাসা বাঁধে । দ্রুত তা বিরাট হয়ে উঠবে আর উল্কার মতন ফেটে ঝরে পড়বে ।

 

আমি একবার এই রকম এক দৃশ্যের সাক্ষী ছিলুম আর যা অনেকক্ষণ যাবত টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, আর যার সৃষ্টিছাড়া চাপ কেবল তারাই টের পাচ্ছিল যারা পরিচিত ছিল, অন্তত অন্য লোকেদের দেখে, মাদকের প্রতিক্রিয়া আর পূর্ণ-স্বরগ্রামের ওপর প্রভাব কতো বিশাল পার্থক্য ঘটায় দুই বুদ্ধমত্তার মাঝে যারা আপাতদৃষ্টিতে সমান । একজন বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ, যিনি চরসের প্রভাব সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন, যিনি সম্ভবত বিষয়টা সম্পর্কে শোনেননি কখনও, নিজেকে কয়েকজনের মধ্যে বেমানান মনে করেন, যখন দ্যাখেন আশেপাশে সবাই মাদকটা নিয়েছে । তারা ওনাকে মাদকটার চমৎকার প্রভাবের কথা বোঝাবার চেষ্টা করে ; এই সমস্ত গালগল্প শুনে তিনি সৌজন্যবশত চওড়া একখানা হাসি হাসেন, একজন মানুষের কিছুক্ষণের জন্য বোকার ভান করার শিষ্টতা । এই আত্মাগুলো তাঁর অবজ্ঞায় দ্রুত উত্তেজিত হয়ে ওঠে, ধারালো বিষের দরুণ, আর এদের হাসাহাসি তাঁকে আহত করে ; আহ্লাদের এই সমস্ত বিস্ফোরণ, শব্দ নিয়ে খেলাখেলি, বদলে যাওয়া মুখভঙ্গী — এই  ক্ষতিকর আবহ তাঁকে বিরক্ত করে, আর তাঁকে ঘোষণা করতে বাধ্য করে, হয়তো, যে তাঁর মতে এই আচরণ অত্যন্ত ক্ষুদ্রের, আর যারা এই মাদক নিয়েছে তাদের পক্ষে নিশ্চয়ই ক্লান্তিকর । তাঁর মন্তব্যের মিলনানন্তকতা সকলকে এক ঝটকায় হালকা করে দিলো ; তারা তখন আহ্লাদে টইটুম্বুর। “এই ভূমিকা তোমাদের পক্ষে ভালো হতে পারে.” উনি বললেন, “কিন্তু আমার জন্যে, নয়।” অন্যেরা অহংকারে চেঁচিয়ে বলল, “আমাদের জন্য এটা ভালো ; আর আমরা কেবল তাইই পরোয়া করি।” প্রকৃত পাগলদের মাঝে রয়েছেন নাকি পাগলের ভান করছে এমন লোকজনেরা তাঁকে ঘিরে রয়েছে তা বুঝতে না পেরে উনি নির্ণয় নিলেন যে সেখান থেকে চলে যাওয়াই ভালো ; কিন্তু কেউ একজন দরোজা বন্ধ করে চাবিটা লুকিয়ে রাখে । আরেকজন, তাঁর সামনে হাঁটুগেড়ে বসে, ক্ষমা চায়, সহযোগী হবার দরুণ, আর অহংকার মিশিয়ে বলে, চোখে জল নিয়ে, যে সে মানসিকভাবে নিকৃষ্ট হলেও, যা বলার ফলে কিছুটা সমবেদনা জাগায় ওনার মনে, আর উপস্হিত সবায়ের ওনার সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব হয়ে যায় । উনি সেখানে থেকে যাওয়া মনস্হ করেন, এমনকি ধরাধরি করার কারণে, প্রসন্ন হয়ে বাজনা বাজাতে রাজি হন ।

 

কিন্তু বেহালার আওয়াজ, নতুন রোগের মতন সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে, ছুরি মারে — শব্দটা বড়ো বেশি কঠিন নয় — প্রথমে একজন মাতালকে, পরে আরেকজনকে । আরম্ভ হয়ে যায় একটানা ফ্যাসফেসে দীর্ঘশ্বাস, আচমকা ফোঁপানি, নিঃশব্দ কান্নার অশ্রূজল । ভয়ে সঙ্গীতকার বেহালা বাজানো বন্ধ করেন, এবং, যার আহ্লাদ সবচেয়ে বেশি হইচই-মাখানো ছিল তার কাছে গিয়ে জিগ্যেস করেন যে অতোই যদি কষ্ট হচ্ছে, তাকে যন্ত্রণামুক্ত করতে হলে কী করতে হবে ? উপস্হিত একজন, সাধারণ জ্ঞান আছে এমন একজন, পরামর্শ দ্যায় লেমোনেড আর টক খাওয়াবার ; কিন্তু “অসুস্হ লোকটা”, তার চোখ আহ্লাদে তখন ঝলমল কর‌্ছে, তাদের দুজনের দিকেই ভাষাতীত অবমাননার দৃষ্টিতে তাকায় । একজন “অসুস্হ” মানুষকে তার জীবনপ্রাচুর্যের জন্য সারিয়ে তোলার প্রয়াস, আনন্দধারায় যে “অসুস্হ” !

 

এই অনুকাহিনি থেকে বোঝা যাচ্ছে, চরসের নেশায় উত্তেজিত লোকেদের অনুভূতিতে মানুষের মঙ্গলকামনার একটা বড়ো জায়গা থাকে । একটা কোমল, অলস, মুক হিতৈষিতা যা জেগে ওঠে স্নায়ুগুলোর শিথিলকরণ থেকে । এই মতামতের সমর্ধনে একজন আমাকে একটা অ্যাডভেঞ্চারের কথা বলেছিল, যা তার ঘটেছিল যখন সে চরসের নেশায় চুর, আর নিজের অনুভূতির হুবহু স্মৃতি ধরে রেখেছিল বলে আমি ভালো করে বুঝতে পেরেছিলুম যে তাকে কেমন বিদকুটে আর নাছোড় বিব্রত অবস্হায় পড়তে হয়েছিল,সমবেদনার পাল্লায় পড়ে । আমার মনে নেই প্রাসঙ্গিক লোকটির নেশা প্রথমবার নাকি দ্বিতীয়বারের নিরীক্ষা ছিল; লোকটা যদি আরেকটু কড়া মাত্রায় নিতো, কিংবা চরসটা যদি প্রতিক্রিয়া করে থাকে, কোনো কারণ ছাড়াই, সাধারণের চেয়েও যার প্রভাব অনেক বেশি– তাহলে তা কি বিরল ঘটনা নয়?

 

লোকটা আমাকে বলেছিল যে তার আহ্লাদের পুরো সময়টা জুড়ে, নিজেকে প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ অনুভব করা আর নিজেকে প্রতিভাসম্পন্ন বিশ্বাস করার পরম আনন্দময়তায়, হঠাৎ কামড় বসিয়েছিল প্রচণ্ড ভীতির আতঙ্ক । প্রথমে নিজের সংবেদনের সৌন্দর্যে ঔজ্বল্যে ভেসে, ওর আচমকা ভীতির গহ্বরে পড়ে গিয়েছিল । লোকটা নিজেকে প্রশ্ন করেছিল : “এই স্হিতিতে আমার বুদ্ধিমত্তা আর দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কেমন দশা হবে” ( যে স্হিতিকে ও মনে করেছিল অতিপ্রাকৃত )” যদি এই স্হতি চলতেই থাকে আর অসুস্হ অবস্হায়  আত্মার চোখ উন্মোচিত হয়, এই ভয় এমনই যে তার যন্ত্রণা কথা বলে বোঝানো যাবে না । “আমি যেন এক পলাতক ঘোড়া হয়ে উঠেছিলুম”, বলল লোকটা, “টগবগিয়ে রসাতলের দিকে ছুটছি, থামতে চাইছি কিন্তু পারছি না । সত্যিই আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা, আর আমার ভাবনাচিন্তা, ঘটনাক্রমের, দুর্ঘটনার, প্রতিবেশের গোলাম, আর এই সবকিছুই একটা কথায় বলা যায়, তা হলো ঝুঁকি, যা বিশুদ্ধ, পরম গীতোচ্ছাসের আদল নিয়েছিল । আমি কাতর হয়ে নিজেকে বারবার বলতে থাকলুম, ‘অনেক দেরি হয়ে গেছে, অনেক দেরি হয়ে গেছে !’ যখন এই মেজাজ, যা আমার মনে হচ্ছিল অনন্তকালীন, আর আমি সাহস করে বলছি যে তা কেবল কয়েক মিনিটের ছিল, পালটে গেলো, যখন আমি ভাবলুম যে প্রাচ্যের মানুষদের প্রিয় আনন্দের সাগরে আমি ডুব দিতে পারি, যা এই ভয়ঙ্কর অবস্হায় সফল হয়, নতুন একটা দুর্ভাগ্য আমাকে জড়িয়ে ধরল; এক নতুন উদ্বেগ, যদিও মামুলি, আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল । আমার হঠাৎ মনে পড়ল রাতে আমাকে একটা ভোজে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে, অভিজাত লোকেদের সান্ধ্য জমায়েতে। আমি আগাম দেখতে পেলুম যে আমি ভদ্র সুশীল সম্ভ্রান্ত লোকেদের মধ্যে রয়েছি, যেখানে প্রত্যেকে নিজের প্রতিভূ, যেখানে আমার মনের অবস্হা ঝলমলে আলোর মাঝে সাবধানে গোপন করতে হবে । আমি নিশ্চিত ছিলুম যে সফল হবো, কিন্তু ইচ্চাশক্তির প্রয়াসের কথা মনে আনতেই আমার হৃদয় প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিল । কিন্তু ভাগ্যক্রমে, কারণ ঠিক মনে নেই, গসপেলের উপদেশ, “যে দুর্ভোগে ভোগে তার কাছে অপরাধ আসে!” আমার স্মৃতিতে লাফিয়ে এলো, আর তা ভুলে যাবার চেষ্টায়, তাকে ভুলে যাবার জন্য চিন্তাকে কেন্দ্রিত করতে গিয়ে, আমি কথাটা বারবার নিজেকে শোনাতে লাগলুম । আমার বিপর্যয়, ব্যাপারটা সত্যিই বিপর্যয় ছিল, বিশাল আকার নিয়ে ফেললো : আমার দুর্বলতা সত্তেও, আমি সক্রিয় হবার নির্ণয় নিলুম, আর একজন ডাক্তারের পরামর্শের জন্য গেলুম,  আমি প্রতিষেধক ওষুধগুলো জানতুম না, আর বেপরোয়া স্বাধীন মেজাজে জমায়েতে পৌঁছোতে চাইছিলুম, যেখানে আমাকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে ; কিন্তু দোকানটার চৌকাঠে অকস্মাৎ একটা চিন্তা আমাকে কাবু করে ফেললো, ভুতে পাওয়ার মতন, ভেবে দেখতে বাধ্য করলো । আর যেতে-যেতে একটা দোকানের জানলায় নিজেকে দেখতে পেয়েছিলুম, আর আমার মুখটা আমাকে চমকে দিলো । ফ্যাকাশেপনা, চাপা দুটো ঠোঁট, এই ফ্যালফেলে চোখ ! — আমি সজ্জন লোকটাকে ভয় পাইয়ে দেবো, নিজেকে বললুম, আর সামান্য হেলাফেলার খাতিরে ! আর তার সঙ্গো যোগ করো তামাশা যা আমি এড়াতে চাইছিলুম, ওষুধের দোকানে লোকজন থাকারও আশঙ্কা ছিল । কিন্তু অচেনা ডাক্তারটার প্রতি আমার আচমকা সমবেদনা আমার অন্য অনুভূতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে নিলো । আমি কল্পনা করলুম যে এই লোকটা আমার এই মারাত্মক মুহূর্তে আমার মতনই সংবেদনশীল, আর যেমন-যেমন কল্পনা করলুম, এও ভাবলুম যে লোকটার কান আর আত্মা, আমার মতনই, সামান্য আওয়াজে কেঁপে ওঠে, আমি পা টিপে টিপে এগোবার কথা ভাবলুম।

‘ব্যাপারটা অসম্ভব’, নিজেকে বললুম, ‘আমি যে লোকটার সহানুভূতিতে গলা ঢোকাতে যাচ্ছি, তার সঙ্গে আচরণে বড়ো বেশি সতর্কতা নিয়ে ফেলবো।’ তারপর নির্ণয় নিলুম যে নিজের কন্ঠস্বরকে একেবারে স্তব্ধ করে ফেলবো, আমার পায়ের আওয়াজের মতন । তুমি তো জানোই, চরস-নেয়া গলার আওয়াজ : গম্ভীর, ঘড়ঘড়ে, রাশভারি ; আফিমখোর নেশাড়ুদের মতন নয় । যা চেয়েছিলুম ফলাফল হলো তার একেবারে উল্টো ; ডাক্তারকে বিশ্বাস করাবার প্রয়াসে, আমি তাঁকে ভড়কে দিলুম । উনি এই অসুস্হতার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না ; এমনকি এই অসুখের কথা শোনেনওনি কখনও ; তবু উনি আমার দিকে তাকিয়ে দেখলেন কৌতূহল আর অবিশ্বাস মিশ্রিত চাউনি মেলে । উনি কি আমাকে পাগল, অপরাধী বা ভিখারি বলে মনে করলেন ? নিঃসন্দেহে, কোনোটাই নয়, কিন্তু এইসমস্ত বিদঘুটে চিন্তা আমার মগজে লাঙল চালাচ্ছিল । আমি ওনাকে বিস্তারিতভাবে খোলোশা করতে বাধ্য ছিলুম ( কী ক্লান্তিকর ! ) চরসের মেঠাই ঠিক কী বস্তু আর কি জন্য নেয়া হয়, বারবার বোঝাচ্ছিলুম যে তাতে কোনো বিপদ হয় না, আর যাঁহাতক ওনার ব্যাপার, আঁৎকে ওঠার প্রয়োজন নেই, আর আমি যা চাইছিলুম তা স্রেফ প্রভাবটাকে কমাবার বা প্রতিরোধ করার উপায়, মাঝে মাঝে যোগ করছিলুম যে ওনাকে বিরক্ত করার জন্য আমি আন্তরিক দুঃখিত । আমার বলা শেষ হয়ে গেলে ( এই কথাগুলোয় নিজেকে কতোটা ছোটো করলুম সেদিকে খেয়াল দিতে বলব তোমাকে ) উনি বেমালুম চলে যেতে বললেন । আমার ভাবনাচিন্তাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্হাপনের আর শুভচিন্তার এই ছিল পুরস্কার । আমি সন্ধ্যার নিমন্ত্রণে গেলুম ; আমি কাউকেই অপদস্হ করলুম না । কেউই আঁচ করতে পারলো না অন্য লোকেদের মতন হবার জন্য আমাকে কতো কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে ; কিন্তু আমি কখনও ভুলবো না অতিকাব্যিক নেশার অত্যাচার যা শালীনতা দিয়ে সীমাবদ্ধ আর কর্তব্যের চিন্তায় স্বভাববহির্ভূত ।” যদিও কল্পনাপ্রসূত প্রতিটি যন্ত্রণার প্রতি আমি সমবেদনা জানিয়ে ফেলি, এই ঘটনা শুনে আমি নিজের হাসি থামাতে পারিনি । যে লোকটা আমাকে গল্পটা বলেছিল সে সেরে ওঠেনি । লোকটা অভিশপ্ত মেঠাইতে উত্তেজনা পাবার ঝোঁক বজায় রেখেছিল যা কিনা সে জ্ঞান থেকেই পেতে পারতো ; কিন্তু যেহেতু লোকটা বিচক্ষণ আর সংসারি, পার্থিব মানুষ, ও মাত্রা কমিয়ে এনেছে, যার দরুণ বেড়ে গেছে পুনরাবৃত্তি । লোকটা পরে টের পাবে “বিচক্ষণতার” পচা ফলের স্বাদ কেমন হয় !

 

এবার ফিরে যাই নেশার স্বাভাবিক অগ্রগতির বিষয়ে । প্রথম পর্বের বালকসূলভ আহ্লাদের পরে, বস্তুত, সাময়িক শিথিলতা আসে ; কিন্তু নতুন ঘটনাবলী এসে হাজির হয় সংবেদনের অতিমাত্রিক শীতলতায় — যা এমনকি হয়ে উঠতে পারে, কোনো কোনো লোকের ক্ষেত্রে, তিক্ত-শীতল — আর অঙ্গে-প্রত্যঙ্গে প্রচণ্ড দুর্বলতা । তখন তোমার হবে “মাখনের আঙুল”; আর তোমার মগজে, তোমার সমগ্র অস্তিত্বে, তুমি বোধ করবে এক হতবুদ্ধিকর তন্দ্রা আর স্তম্ভন । তোমার মাথা থেকে এগোতে থাকে তোমার চোখ ; যেন সেগুলোকে প্রতিটি দিকে টান মারছে অনবদ্য পরিতোষ । তোমার মুখাবয়ব ঢেকে যাবে ফ্যাকাশেপনায় ; ঠোঁট ঢুকে যাবে ভেতরে, শ্বাসহীনতার টানে, সেই ধরণের উচ্চাকাঙ্খী মানুষদের মতন যারা নিজেদের বড়ো-বড়ো প্রকল্পনার শিকার হয়, পেল্লাই ভাবনাচিন্তার পাহাড়ের তলায় চাপা, কিংবা দীর্ঘ শ্বাস নেয় যেন ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে । বলা যায়, গলা বন্ধ হয়ে আসে ; তৃষ্ণায় টাকরা শুকিয়ে যায়, যাকে তৃপ্ত করা হয়ে উঠবে অত্যন্ত মিষ্টি, যদি তখনও  আলস্যের আনন্দ মজাদার বলে মনে না হয়, আর দেহে কোনোরকম তোলপাড় না ঘটায় । গভীর অথচ কর্কশ দীর্ঘশ্বাস বেরোয় তোমার বুক থেকে, যেন পুরোনো বোতলের মতন তোমার দেহ, নতুন মদের, তোমার আত্মার, সক্রিয় আবেগ সইতে পারছে না । সময়ে-সময়ে অঙ্গবিক্ষেপ তোমাকে অসাড় করে তোলে আর শিহরণ ঘটায়, অনেকটা প্রচণ্ড দৈহিক খাটুনির পর দিনের শেষে মাংসপেশিতে যেমন খিঁচুনি হয় কিংবা রাতের বেলায় ঝড়ের আগে নিশ্চিন্ত তন্দ্রায় যেমন হয়।

 

আরও এগোবার আগে আমি ওপরে যে শীতলতার সংবেদনের কথা বলেছি, সেই প্রসঙ্গে আরেকটা কাহিনি বলব, যা পরিষ্কার করে দেবে যে ঠিক কতোখানি প্রভাবগুলো, এমনকি নিছক দৈহিক প্রভাব, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে বদলাতে পারে । এবারে যিনি কথা বলছেন তিনি  একজন সাহিত্যিক, আর তাঁর গল্পের কোনো কোনো অংশে যে কেউ ( আমি মনে করি ) সাহিত্যিক মেজাজের ইঙ্গিত পাবেন । “আমি নিয়েছিলুম”, উনি আমাকে বলেছিলেন, “যৎসামান্য পাতাঘাসের মাত্রা, আর সব কিছুই ভালোভাবে চলছিল । আহ্লাদের সঙ্কট বেশিক্ষণ স্হায়ী হয়নি, আর আমি নিজেকে পেলুম অবসন্নতা আর বিস্ময়ের স্হিতিতে যা প্রায় ছিল মহানন্দের । আমি আশা করছিলুম এক শান্তিময় আর উদ্বেগহীন সন্ধ্যা : দুর্ভাগ্যবশত, সুযোগ আমাকে উৎসাহিত করলো এক বন্ধুর সঙ্গে নাটক দেখতে যাবার । আমি নায়কোচিত পথ বেছে নিলুম, আমার অপার আলস্য আর চুপচাপ বসে থাকার স্হিতিকে কাটিয়ে উঠতে চাইলুম । আমাদের পাড়ার প্রতিটি ঘোড়ার গাড়ি লোকে ভাড়া করে নিয়েছিল ; আমি রাস্তার ভিড়ের কর্কশ আওয়াজ, বোকা পথচারীদের মূর্খ কথাবার্তা, একটা পুরো সাগর ফালতু লোকে ঠাশা, তার ভেতর দিয়ে অনেকটা হাঁটতে বাধ্য হলুম । আমার আঙুলের ডগাগুলো আগে থাকতেই একটু ঠাণ্ডা ছিল, যেন আমি দুটো হাত বরফের জলে চুবিয়েছি । কিন্তু একে যন্ত্রণাবোধ বলব না ; ধারালো ছুঁচ ফোটানোর মতন অনুভূতি বরং আমাকে আনন্দ দিচ্ছিল। তবু যতো হাঁটতে লাগলুম ততো এই শীতলতা আমার ওপর ছেয়ে যেতে লাগলো । যাঁর সঙ্গে আমি ছিলুম তাঁকে কয়েকবার জিগ্যেস করলুম যে সত্যিই কি খুব ঠাণ্ডা লাগছে । উনি উত্তরে বললেন যে, বরং উলটো, অন্য দিনের তুলনায় তাপ বেশ উষ্ণ । শেষ পর্যন্ত নাটকে পৌঁছে, যে বক্স আমার জন্য নির্ধারিত ছিল সেখানে বসে, তিন-চার ঘণ্টা বিশ্রাম নেয়া যাবে আঁচ করে মনে হলো বাইবেল বর্ণিত ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’তে পৌঁছে গেছি । আসার সময়ে যে অনুভূতিগুলো আমি যৎসামান্য কর্মশক্তি দিয়ে মাড়িয়ে এসেছিলুম তা এবার ফেটে পড়ল, আর আমি নিজেকে ছেড়ে দিলুম আমার নিঃশব্দ প্রমত্ততায় । শীতলতা বাড়ছিল, অথচ দেখলুম লোকেরা হালকা পোশাকে এসেছে, এমনকি ঘেমে গিয়ে ক্লান্তি কাতাবার জন্য কপাল পুঁচছে । এই মজাদার ধারণাটা আমাকে পেয়ে বসল, যে আমি একজন বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষ, যাকে নাটকের হলঘরে গ্রীষ্মকালে শীত উপভোগ করার অধিকার দেয়া হয়েছে । ভীতিকর মনে না হওয়া পর্যন্ত শীতলতা বাড়তেই থাকলো ; কিন্তু কতো বেশি শীতলতায় আচ্ছন্ন হতে পারি সেই কৌতূহল আমাকে কাবু করে ফেলেছিল । শেষ পর্যন্ত এমন একটা সময় এলো যখন তা অনেক বেশি হয়ে পড়লো, সার্বত্রিক, যে আমার ধারণাগুলো জমে বরফ হয়ে যেতে লাগলো ; আমি হয়ে গিয়েছিলুম চিন্তান্বিত একতা বরফের চাঙড় । আমি কল্পনা করছিলুম যে বরফ কেটে আমার মূর্তি গড়া হয়েছে, আর এই উন্মাদ বিভ্রম আমাকে এতো গর্বান্বিত করলো, নিজের মধ্যে এক নৈতিক শুভত্বের বোধ জাগিয়ে তুললো, যে তোমাকে তা বর্ণনা করার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না । আমার জঘন্য আহ্লাদকে যা উঁচুতে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল তা হল নিশ্চয়তার এই বোধ যে বাদবাকি উপস্হিত লোকজন আমার অবস্হা আর তাদের তুলনায় আমার নায়কত্ব তারা অজ্ঞতার কারণে টের পাচ্ছে না, আর এই আনন্দে বিহ্বল হয়ে যে আমার সঙ্গী এক মুহূর্তের জন্যেই সন্দেহ করতে পারেনি যে কেমন অদ্ভুত অনুভূতিতে আমি টইটুম্বুর । আমি

আমার কৈতবের পুরস্কার চুপচাপ গ্রহণ করলুম, আর আমার অসাধারণ আনন্দ হয়ে রইলো যথার্থ গোপনতা ।

 

“তাছাড়া, আমি সবে বক্সে ঢুকেইছিলুম আর আর আমার চোখ অন্ধকারের প্রকোপে ছেয়ে গেলো যার সঙ্গে, আমার মনে হলো, আমার শীত করার ধারণার সম্পর্ক আছে ; হতে পারে যে এই দুটো ধারণা একে অপরকে শক্তি যুগিয়েছিল । তুমি তো জানো হ্যাশিস সদাসর্বদা আলোর চমৎকারিত্বের উদ্রেক করে, রঙের বাহার, তরল সোনার গড়িয়ে পড়া ; সমস্ত ধরণের আলোই এর প্রতি সমবেদী, যা আলো চাদরের মতন ভাসতে থাকে আর যে আলো আঁটা থেকে আবছা ঝুলে থাকে, উভয় ক্ষেত্রেই ; সামাজিক মহিলাদের আয়োজিত সালোঁর ঝাড়বাতিদান, মোমবাতি যা লোকেরা মে মাসে জ্বলায়, সূর্যাস্তের গোলাপি সম্প্রপাত । মনে হয় যে বেচারা ঝাড়বাতি এতো আলো ছড়ায় যে ঔজ্বল্যের তৃপ্তিহীন তৃষ্ণা মেটাতে অকিঞ্চিৎকর হয়ে পড়ে । আমি ভাবলুম, তোমাকে যেমন বলেছি, আমি ছায়ার জগতে প্রবেশ করছিলুম, যা, উপরন্তু, ক্রমশ ঘন হয়ে উঠছিল, আর আমি স্বপ্ন দেখতে লাগলুম মেরুঅঞ্চলের আলো আর অনন্তকালীন শীতের । আর মঞ্চের কথা বলতে গেলে, নাটকটা ছিল মজার দেবীকে নিয়ে ; তা নিজেই ছিল আলোকময় ; প্রথম দিকে ছোটো এবং অনেকটা দূরে, যেন টেলিসকোপের উলটো দিক দিয়ে কোনো ভূদৃশ্য দেখছি । আমি তোমাকে বলব না যে আমি অভিনেতাদের সংলাপ শুনছিলুম ; তুমি জানো যা তা অসম্ভব । থেকে থেকে আমার চিন্তা কোনো সংলাপের টুকরো খুবলে আনছিলো, আর চতুর নাচিয়ে মেয়ের মতন তাকে বহুদূরের হর্ষোল্লাসে লাফিয়ে পৌঁছোবার পাটাতন হিসেবে ব্যবহার করছিল । তুমি হয়তো ভাববে যে এইভাবে একটা নাটক শোনা যুক্তিহীন আর সঙ্গতিহীন । নিজের ভ্রান্তি দূর করো! আমি আবিষ্কার করলুম যে আমার চিত্তবিক্ষেপ নাটকটা  আমার সূক্ষ্ম অনুভূতিকে ছাপিয়ে গেছে । কিছুই আমাকে বিক্ষুব্ধ করলো না, আর আমি যেন হয়ে উঠলুম সেই ক্ষুদে কবির মতন, যে প্রথমবার ‘এসথার’ নাটক দেখে, ভেবেছিল যে রানিকে ভালোবাসার ঘোষণা হামান-এর পক্ষে স্বাভাবিক ছিল । ব্যাপারটা ছিল, যেমন তুমি আঁচ করেছ, সেই দৃশ্যের যেখানে ও এসথারের পায়ে পড়ে নিজের অপরাধের ক্ষমা চাইছিল । যদি এই প্রণালীতে সব নাটক শোনা হয় তাহলে ওরা সবাই, এমনকি রাসিনের নাটকেরও, প্রচুর লাভ হবে । আমার মনে হচ্ছিল যে অভিনেতাগুলো খুবই ছোট্টো, সুস্পষ্ট এবং রেখাঙ্ক দিয়ে বাঁধা, অনেকটা মেইসনিয়ারের ছবির আকৃতিগুলোর মতন । আমি একেবারে পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছিলুম ওদের পোশাক, তাদের নকশা, সেলাই, বোতাম, ইত্যাদি, কিন্তু তাদের নকল কপাল আর আসল কপালের তফাতও চোখে পড়ছিল ; শাদা, নীল আর লাল, আর মুখ সাজাবার কায়দা; আর এই লিলিপুটগুলোর পোশাক ছিল শীতল ও ঐন্দ্রজালিকভাবে সুস্পষ্ট, যেমনটা কোনো তৈলচিত্রের ওপরে কাচ থাকলে হয় । শেষ পর্যন্ত যখন আমি এই ঠাণ্ডায় জমাট ছায়াদের গুহা থেকে বেরোলুম, তখন, অন্তরজগতের অলীক ছায়ামূর্তিদের ধারাবাহিক প্রবাহ উবে গেল, আমি নিজেকে ফিরে পেলুম, আমি বড়ো বেশি ক্লান্তি অনুভব করলুম যা তার আগে দীর্ঘক্ষণ যাবত করা কঠিন কাজকর্ম করেও আমার হয়নি।”

 

সত্যি বলতে কি, নেশার এই পর্বে এক নতুন মাধুর্য দেখা দ্যায়, প্রতিটি ইন্দ্রিয়তে এক উচ্চতর প্রখরতা : গন্ধ, দেখা, শোনা, স্পর্শ এগিয়ে চলায় সমানভাবে যোগ দ্যায় ; চোখ দেখতে পায় অসীমকে ; প্রচণ্ড আওয়াজের মধ্যেও কান শুনতে পায় সূক্ষ্ম শব্দগুলো । এই সময়েই আরম্ভ হয় হ্যালুশিনেশানের কুহক ; বহির্জগতের বস্তুরা একের পর এক অদ্ভুত আকার নিতে থাকে ; তারা বিকৃত হয় আবার নিজের আকারে ফিরে আসে । তারপর — ধারণাদের অস্পষ্টতা, ভুলবোঝা, আর পক্ষান্তরণ ! শব্দেরা নিজেদের রঙে মুড়ে ফ্যালে ; রঙেরা কুসুমিত হয় সঙ্গীতে। যা তুমি বলবে, স্বাভাবিকতা ছাড়া কিছুই নয় । প্রতিটি কাব্যিক মস্তিষ্ক তার সুস্হ, স্বাভাবিক অবস্হায়, এই আনুরূপ্যগুলো সহজেই কল্পনা করতে পারে । কিন্তু আমি পাঠকদের আগেই সতর্ক করেছি যে চরস সেবন করায় কোনোরকম ইতিবাচক অতিপ্রাকৃত ব্যাপার নেই; আনুরূপ্যগুলোতে আছে অপরিচিত প্রাণবন্ততা ; তারা প্রবেশ করে আর তারা বিকশিত হয় ; তারা তাদের দক্ষতা দিয়ে মনকে অভিভূত করে । সঙ্গীতের স্বরলিপি হয়ে যায় সংখ্যা ; আর যদি তোমার মগজ গাণিতিক প্রবণতায় দক্ষ, যে ঐকতান তুমি শোনো, তার সংবেদনাময় ও ইন্দ্রিয়পরায়ণ চরিত্র বজায় রেখে, নিজেকে বিশাল ছন্দময় ক্রিয়াকলাপে বদলে ফ্যালে, যেখানে সংখ্যা থেকে সংখ্যার জন্ম হয়, আর যার স্তরগুলো এবং উৎস এক অনির্বচনীয় স্বাচ্ছন্দ্য ও তৎপরতাকে অনুসরণ করে, যা সঙ্গীতকারের সমান হয়ে ওঠে ।

 

অনেক সময়ে এমনও হব যে লোকটার ব্যক্তিত্বের বোধ লোপাট হয়ে যায়, আর যে বস্তুনিষ্ঠতা সর্বেশ্বরবাদী কবিদের জন্মগত অধিকার তা তোমার মধ্যে এমন অস্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয় যে বহির্জগতের বস্তুদের সম্পর্কে তোমার চিন্তা তোমাকে নিজের অস্তিত্বের কথা ভুলিয়ে দ্যায় আর তোমাকে তাদের সঙ্গে হতবুদ্ধি করে । তোমার দৃষ্টি একটা গাছে নিবদ্ধ, বাতাস তাকে সুসঙ্গতভাবে বেঁকিয়ে দিয়েছে ; কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে একজন কবির মস্তিষ্কে যা কেবল স্বাভাবিক  উপমা তোমার কাছে বাস্তব হয়ে দেখা দ্যায় । প্রথমে তুমি গাছটাকে তোমার আবেগ, তোমার আকাঙ্খা, তোমার বিষাদ দান করো ; তার কড়কড় শব্দ আর দোল খাওয়া তোমার হয়ে ওঠে, আর শীঘ্রই তুমি নিজেই গাছ হয়ে যাও । ঠিক যেভাবে পাখিরা নীলিমার বিস্তারে ঘুরে বেড়ায় : প্রতীকিস্তরে তা মানুষের যাবতীয় ব্যাপারের ওপর তোমার অমরত্বের ক্ষুধাকে প্রতিনিধিত্ব করে ; কিন্তু শীঘ্রই তুমি পাখি হয়ে যাও । তারপর, মনে করো, তুমি বসে-বসে ফুঁকছো ; তোমার দৃষ্টি বেশ কিছুক্ষণের জন্য নীল মেঘের প্রতি আকৃষ্ট হবে, যা তোমার পাইপ থেকে শ্বাস হয়ে উঠেছিল ; মন্হর, অবিরাম, অনন্তকালীন বাষ্পীভবনের ধারণা দখল করে নেবে তোমার আত্মা, আর এই ধারণা তুমি তোমার ভাবনাচিন্তায়, তোমার চিন্তাধারার নিজস্ব উপকরণে প্রয়োগ করা আরম্ভ করবে। অনন্যসাধারণ অস্পষ্টতার মাধ্যমে, বুদ্ধিমত্তার পরিবহন প্রজাতির অদলবদলের দ্বরা, তুমি নিজের বাষ্পীভবন অনুভব করবে, আর তুমি তোমার পাইপকে দেবে, যাতে তুমি তামাকের মতন কুঁজো আর দাবিয়ে ঠাশা অনুভব করছি, তোমাকে ধোঁয়ায় পরিবর্তনের অদ্ভুত কর্মক্ষমতা !

 

সৌভাগ্যবশত, এই অন্তহীন কল্পনা শুধু এক মিনিটের জন্য স্হায়ী ছিল । একটা সূক্ষ্ম বিরতির জন্য, অনেক চেষ্টা করে অভিগ্রস্ত, তোমাকে ঘড়ির দিকে তাকাতে উৎসাহিত করেছে । কিন্তু চিন্তাধারার আরেকটি স্রোত তোমাকে বহন করে নিয়ে যায় ; তা তোমাকে আরও এক মিনিট তার ঘুর্ণিতে তোমাকে গড়িয়ে নিয়ে যাবে, আর এই অতিরিক্ত মিনিট হবে অনন্তকালীন। কেননা তোমার অনুভূতি আর ধারণা সময়ের বিপুল অংশের  দ্বারা সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল । কেউ হয়তো বলতে পারে যে একটিমাত্র ঘণ্টার পরিসরে একজন লোক বহুবার বাঁচতে পারে । তাহলে তুমি কি, অসাধারণ উপন্যাসের মতন, লিখিত হবার বদলে জীবন্ত ? দেহিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আর আনন্দ উপভোগের মধ্যে আর কোনও সমীকরণ নেই ; আর সর্বোপরি, এর ফলে যে দোষারোপ উৎপন্ন হয় তাকে ব্যক্তি-স্বাধীনতার বিপজ্জনক প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে ।

 

যখন আমি হ্যালুশিনেশানের কথা বলি তখন শব্দটা তার যথাযথ বোধে গ্রহণ করতে হবে। বিশুদ্ধ হ্যালুশিনেশানের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব, যে বিষয়ে ডাক্তাররা অধ্যয়ন করে থাকেন, তার সঙ্গে হ্যালুশিনেশনের, বা ইন্দ্রিয়দের ভুল ব্যাখ্যা, ঘটে চরসের দরুন উৎপন্ন মানসিক স্হিতির। প্রথমটির ক্ষেত্রে হ্যালুশিনেশন হয় আচমকা, সম্পূর্ণ, এবং মারাত্মক ; তাছাড়া, তার কোনো পৃষ্ঠভূমি বা ওজর বাইরের জগতে খুঁজে পাওয়া যায় না । অসুস্হ মানুষ দেখতে পায় ছায়া-আকার কিংবা শুনতে পায় এমন সমস্ত আওয়াজ যা আদপে ঘটেনি । দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, যেখানে হ্যালুশিনেশান ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তা প্রায় ইচ্ছাকৃত, আর তা নিখুঁত হয় না, তা কল্পনার আশ্রয়ে পরিপুষ্ট হয় । শেষে, এর একটা অজুহাত আছে । আওয়াজ কথা বলবে, সম্পূর্ণ আলাদা উচ্চারণে ; কিন্তু আওয়াজ যে ছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই । চরস নেশাখোরের উৎসাহী দৃষ্টি অদ্ভুত আকারদের দেখতে পায়, কিন্তু অদ্ভুত আর রাক্ষুসে হবার আগে আকারগুলো সরল আর স্বাভাবিক ছিল । তেজোময়তা, হ্যালুশিনেশনের জীবন্ত সংলাপ এই নেশায় কোনোক্রমেই এই মৌলিক পার্থক্যকে বাতিল করে না : একটির শিকড় রয়েছে অবস্হায়, এবং বর্তমান সময়ে, অন্যটার নেই । তপ্ত ফুটন্ত এই কল্পনাকে বরং ব্যাখ্যা করা যাক, স্বপ্নের এই পরিপক্বতা, আর এই কাব্যিক বালখিল্য যে কারণে চরসের নেশাগ্রস্ত মস্তিষ্ক নিন্দিত হয়, আমি তোমাকে আরেকটা গল্প শোনাবো । এবার কোনো অলস লোক নয় যে কথা বলছে । ইনি একজন মহিলা ; মহিলাটি আর তাঁর প্রথম যৌবনে নেই ; কৌতূহলী, উত্তেজিত হতে চান এমন মনের, এবং যিনি, বিষটির সঙ্গে পরিচিত হবার আগ্রহে আত্মসমর্পণ করেছেন, এইভাবে আরেকজন মহিলার গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলো বর্ণনা করেছেন । আমি হুবহু তুলে দিচ্ছি ।

 

বারো ঘণ্টার উন্মাদনা থেকে আমার পাওয়া অনুভূতিগুলো যতোই অদ্ভুত হোক বা নতুন– বারো ঘণ্টার ছিল নাকি কুড়ি ? সত্যি বলতে, আমি সঠিক বলতে পারব না — আমি আর কখনও সেই স্হিতিতে ফিরে যেতে চাই না । আত্মিক উত্তেজনা ছিল প্রাণবন্ত, তা থেকে পাওয়া ক্লান্তি বড্ডো বেশি ; আর, এক কথায় বলতে হলে, শৈশবে এইভাবে ফিরে যাওয়া আমার মনে হয়েছে অপরাধ । শেষ পর্যন্ত ( বহুবার ইতস্তত করার পর ) কৌতূহলে আত্মসমর্পণ করলুম, যেহেতু সেটা বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়া বোকামি ছিল, আমার মনে হয়েছিল যৎসামান্য সন্মান নষ্ট হলে খুব বেশি ক্ষতি হবে না । কিন্তু প্রথমেই তোমাকে বলে রাখি অভিশপ্ত এই হ্যাশিস জিনিসটা বড়ো ভয়ঙ্কর বিশ্বাসঘাতক মাদক । অনেক সময়ে লোকে মনে করে যে সে নেশা থেকে মুক্ত হয়ে গেছে ; কিন্তু তা নিছক শান্তির প্রতারণা । বিশ্রামের মুহূর্ত থাকে বটে, আর তারপর পুনঃপ্রকোপ । সন্ধ্যায় দশটার আগে আমি নিজেকে এই রকম এক সাময়িক স্হিতিতে পেলুম ; আমি ভাবলুম জীবনের এই প্রাণপ্রাচুর্য থেকে  পালিয়ে আসাটা, যা আমাকে এতো আনন্দ দিয়েছে, ব্যাপারটা সত্যি, কিন্তু তা উদ্বেগহীন আর ভয়হীন ছিল না। রাতের খাবারের জন্য মহানন্দে বসলুম, সেই ধরণের মানুষের মতন যে দীর্ঘ যাত্রার পর বিরক্তিকর পরিশ্রান্তে ক্লান্ত ; কেননা তার আগে পর্যন্ত, সাবধান হয়ে, আমি খাওয়া থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলুম ;কিন্তু আমি টেবিল থেকে ওঠার আগেই বিভ্রম আমাকে আবার আঁকড়ে ধরেছিল, যেমন কোনো বিড়াল ইঁদুরকে ধরে, আর বিষটা আমার বেচারি মগজে নতুন করে খেলা আরম্ভ করল । যদিও আমার বাড়ি বন্ধুদের বাড়ির কাছেই, আর আমার জন্য ঘোড়ার গাড়িও ছিল, আমি স্বপ্ন দেখার জন্য, আর নিজেকে অপ্রতিরোধ্য উন্মাদনার হাতে ছেড়ে দেবার জন্য একেবারে আবিষ্ট অনুভব করলুম, যে সকাল পর্যন্ত থেকে যাবার তাদের প্রস্তাবে আনন্দে রাজি হয়ে গেলুম । তুমি তো দুর্গের কথা জানো ; তুমি জানো যে ওরা যে অংশে সাধারণত থাকে সেখানে আয়োজন করেছে, সাজিয়েছে, আর আধুনিক কায়দায় সুখস্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্হা করেছে, কিন্তু যে অংশটা সাধারণত যেমনটা আগে ছিল তেমনই খালি পড়ে থাকে, সেই পুরোনো শৈলী আর পুরোনো নকশাগুলো বজায় রেখেছে । বন্ধুরা এই অংশে আমার জন্য একটা শোবার ঘরের ব্যবস্হা করল, আর এই জন্য তারা সবচেয়ে ছোটো ঘরটা বেছে নিলো, এক ধরণের খাসকামরা, যেটা, কিছুটা ফ্যাকাশে আর পলেস্তারা-খসা হলেও মনোমুগ্ধকারী । যতোটা পারি তোমার জন্য বর্ণনা করব, যাতে তুমি টের পাও যা কেমনতর অদ্ভুত দর্শনশক্তিতে আপ্লুত হয়েছিলুম, যে দর্শনশক্তি আমার সারাটা রাতে ছেয়ে গিয়েছিল, সময়ে চলে যাওয়া সম্পর্কে জানার বিশ্রামটুকুও দেয়নি ।

 

“খাসকামরাটা খুবই ছোটো, বেশ অপ্রশস্ত । ঝালরের উচ্চতা থেকে ছাদের খিলান নেমেছে গম্বুজের মতন ; দেয়ালগুলো সঙ্কীর্ণ, লম্বা আয়নায় ঢাকা, প্যানেল দিয়ে আলাদা-করা, যার ওপর ভূচিত্র, সাজাবার মতন সহজ শৈলীতে, আঁকা । চার দেয়ালের ছাদের কারুকার্যে নানা রকমের রূপকধর্মী মূর্তি আঁকা, কয়েকজন বিশ্রামরত, অন্যেরা দৌড়োচ্ছে বা উড়ছে ; তাদের ওপরে চমৎকার সব ফুল আর পাখি । মূর্তিগুলোর পেছনে জাফরি, চোখকে ফাঁকি দেবার মতন করে আঁকা, আর স্বাভাবিকভাবে ছাদের বাঁককে অনুসরণ করেছে ; ছাদটা সোনালী।

কাঠের কারুকাজ আর জাফরি আর মূর্তিদের মাঝেকার ফাঁকগুলো সোনায় মোড়া, আর একেবারে মধ্যখানে সোনাকে নকল জাফরির জ্যামিতিক নকশায় বিভক্ত করা ; তুমি দেখলে মনে করবে সেটা অনেকটা খানদানি খাঁচার মতন, বেশ বড়ো একটা পাখির জন্যে একটা সুন্দর খাঁচা । আমি একানে যোগ করতে চাইব যে রাতটা ছিল বেশ সুন্দর, বেশ পরিষ্কার, আর চাঁদ ঝলমল করছিল আলোয় ; এমনই যে আমি মোমবাতি নেভাবার পরও সাজানো নকশাগুলো দেখা যাচ্ছিল, আমার মনের চোখ দিয়ে যে আলোকিত তা নয়, তুমি হয়তো তাইই ভাববে, বরং এই সুন্দর রাত দিয়ে, যার আলো সোনার সমস্ত নকশা, আয়না, আর রঙের বাহারকে আঁকড়ে ছিল ।

 

“আমি প্রথমে খুবই অবাক হয়েছিলুম যে আমার সামনে বিশাল ফাঁকা জায়গা ছড়িয়ে রয়েছে, আমার আসেপাশে, আমার চারিদিকে । রয়েছে অনাবিল নদী, আর সবুজ চারণভূমি যারা নিজেদের সৌন্দর্যকে শান্ত জলে মুগ্ধভাবে প্রশংসা করছে : আয়নায় পপতিফলিত প্যানেলগুলোর প্রভাব তুমি নিশ্চয়ই আঁচ করতে পারছ । চোখ তুলে আমি দেখতে পেলুম সূর্য আস্ত যাচ্ছে, যেন শীতল হয়ে-আসা গলিত ধাতু । তা আসলে ছিল ছাদের সোনা । কিন্তু জাফরিগুলো দেখে আমার মনে হলো আমি এক ধরণের খাঁচায় রয়েছি, কিংবা শূন্যে ঝোলানো একটা বাড়িতে যার সব দিক খোলা, আর এই বিস্ময়গুলো থেকে আমাকে আলাদা করে রেখেছে আমার কয়েদখানার শিকগুলো । যে বিভ্রম আমাকে পাকড়াও করেছিল তাতে প্রথমত তো আমি একচোট হাসলুম ; কিন্তু যতোই দেখতে থাকলুম ততোই তার ম্যাজিক বাড়তে লাগলো, চতুর বাস্তবতায় জীবন্ত ও স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগলো । যে মুহূর্ত থেকে আমার মাথায় বন্দি থাকার ধারণা চেপে বসল, আমি মানতে বাধ্য, যে নানারকম আহ্লাদ আমি চারিদিক এবং ওপর থেকে পাচ্ছিলুম তাতে আর গুরুতরভাবে বাধা দিলো না । আমি নিজের সম্পর্কে ভাবতে লাগলুম যে আমি দীর্ঘকাল যাবত কারারুদ্ধ, হয়তো হাজার বছরের জন্য, এই মহার্ঘ খাঁচায়, পরীদের এই চারণভূমিতে, মনোমুগ্ধকর দিগন্তের মাঝে । আমি কল্পনা করলুম আমি ‘ঘুমন্ত সুন্দরী’ হয়ে গেছি ; স্বপ্ন দেখলুম প্রায়শ্চিত্তের যা আমাকে ভোগ করতে হবে, আগামী উত্তরণের জন্য । আমার মাথার ওপর ডানা ঝাপটাচ্ছিল গ্রীষ্মমণ্ডলের চমৎকার পাখির দল, আর আমার কান যখন শুনতে পেলো প্রধান রাস্তায় বহুদূর হেঁটে যাওয়া ঘোড়ারদের গলার ছোটো ঘণ্টার শব্দ, দুটি ইন্দ্রিয় একত্রিত হয়ে একটি মাত্র ধারণায় তাদের প্রতীতিকে মিশিয়ে ফেললো, আমার মনে হল রহস্যময় বেহায়া মন্ত্রোচ্চারণ করছে পাখির দল ; আমি কল্পনা করলুম যে পাখিগুলো ধাতব কন্ঠে গান গাইছে । প্রত্যক্ষরূপে তারা আমার সঙ্গে কথা বলছিল, আর আমার বন্দিদশা নিয়ে স্তবগান করছিল । তিড়িং-নাচিয়ে বাঁদরেরা, ভাড়ের মতন দেখতে বনদেবতারা এই বন্দির দশা দেখে, যে নড়াচড়া করতে অপারগ, নিজেদের মধ্যে হইহুল্লোড় করছিল ; তবু পুরাণের সব কয়টি দেবী-দেবতারা আমার দিকে মনোরম হাসিমুখে তাকাচ্ছিল, যেন আমাকে ধৈর্য ধরে উৎসাহিত করছিল  যাতে এই ডাকিনি-প্রকোপ সহ্য করতে পারি, আর ওনাদের চোখগুলো চোখের পাতার কোনায় আটকে ছিল যাতে আমাকে কোনঠাশা করা যায় । আমি এই নির্ণয়ে পৌঁছোলুম যে যদি আগেকার কালের কোনো দোষ, যা আমিও জানি না, এই সাময়িক শাস্তিকে জরুরি করে তুলেছিল, আমি তবুও এক উপচে-পড়া শুভত্বে বিশ্বাস করতে পারছিলুম, যা কিনা, আমাকে বুদ্ধিমান কার্যধারায় নিপাতিত করলেও, আমাদের যৌবনের লঘুমস্তিষ্ক আনন্দের চেয়ে আমাকে সত্যকার আনন্দ দেবে । দেখছেন তো যে আমার স্বপ্নে নৈতিক বিবেচনা অনুপস্হিত ছিল না ; কিন্তু স্বীকার করছি যে এই সমস্ত চমৎকার আদল-আদরা আর রঙবাহার পর্যবেক্ষণ করার আনন্দ এবং নিজেকে এক অদ্ভুত নাটকের কেন্দ্র মনে করার ভাবনা আমার অন্যান্য চিন্তাকে অহরহ নিবিষ্ট করে ফেলছিল । এটা দীর্ঘক্ষণ স্হায়ী ছিল, অনেক ক্ষণ । সকাল পর্যন্ত ছিল কি ? আমি ঠিক জানি না । হঠাৎই আমি দেখলুম সকাল বেলাকার সূর্য আমার ঘরে স্নান করছে । আমার এক প্রাণবন্ত বিস্ময়বিমূঢ়তার অভিজ্ঞতা হলো, আর আমি যেটুকু গড়ে ফেলতে পেরেছি, স্মৃতির যাবতীয় প্রয়াস সত্তেও, আমি কখনও নিজেকে নিশ্চিন্ত করতে পারিনি যে আমি ঘুমিয়েছিলুম নাকি ধৈর্যসহকারে এক সুস্বাদু অনিদ্রায় ভুগেছিলুম । এক মুহূর্ত আগে, রাত ; এখন, দিন। আর তবু আমি বহুক্ষণ সময় কাটিয়েছিলুম ; ওহ, অনেকক্ষণ ! সময়ের প্রতীতি, কিংবা বলা যায় নিয়মানুগ সময়, বাতিল করে দেবার কারণে, সমস্ত রাত আমার চিন্তার অজস্রতা দিয়ে কেবল পরিমাপযোগ্য ছিল । এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আমার মনে হয়েছিল এতো দীর্ঘকালীন ক্ষণ, এও মনে হয়েছিল যে তা কেবল কয়েক সেকেণ্ড বজায় ছিল ; এমনকি হয়তো তা আদপে অনন্তকালে ঘটেইনি ।

 

“আমি আপনাকে আমার ক্লান্তির বিষয়ে কিছু বলিনি ; তা ছিল অপরিমেয় । আমি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলুম, লোকে বলে যে কবিদের আর সৃজনশীল শিল্পীদের উৎসাহের সঙ্গে তার মিল আছে, যদিও আমি চিরকাল বিশ্বাস করেছি যে যাঁদের ওপর আমাদের আলোড়িত করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, নিশ্চয়ই তাঁরা শান্ত ধাতের মানুষ হবেন । কিন্তু কবিদের সৃজনশীল-উন্মাদনা যদি আমার জন্য যোগাড় করা এক চামচ হ্যাশিস মেঠাইয়ের সমান হয়, আমি ভাবতে বাধ্য হচ্ছি যে কবিরা জনগণের খরচে যে আনন্দ বহন করেন, আর তা এক ধরণের ভালো-থাকার বাইরের ব্যাপার নয়, তাহলে আমি অন্তত নিজেকে নিজের আশ্রয়ে রয়েছি বলেই মনে করব, মানে আমার বৌদ্ধিক আশ্রয়ে ; অর্থাৎ, বাস্তব জীবনে।”

 

মহিলাটির বক্তব্য, স্পষ্টত যুক্তিসঙ্গত ; কিন্তু ওনার গল্প থেকে আমরা কয়েকটা জরুরি তথ্য নেবো, যা  হ্যাশিসের উদ্রেক করা প্রধান অনুভূতিগুলোর কথা পুরো করবে ।

 

উনি বলছেন রাতের ভোজের সঙ্গে সঠিক সময়ে আনন্দের আগমনের কথা ; এক মুহূর্তে যখন সাময়িক উপশম, চূড়ান্ততার ভানের জন্য সাময়িক, তাঁকে বাস্তব জগতে ফিরে যাবার অনুমতি দিলো । সত্যিই, যেমন আমি বলেছি, সাময়িক বিরতি এবং প্রতারণাময় শান্তি ঘটে, আর হ্যাশিসের নেশা সঙ্গে আনে উদারসর্বস্ব ক্ষুধা, এবং প্রায় সব সময়ের প্রচণ্ড তৃষ্ণা । কেবল সন্ধ্যার খাওয়া বা রাতের ভোজ, স্হায়ী আরাম আনার বদলে, শুরু করে নতুন অভিগ্রহ, যে ঘুর্নিময় সঙ্কটের অভিযোগ মহিলা করছেন, এবং যার পরে ঘটতে থেকেছে একের পর এক জাদুপূর্ণ অল্প আতঙ্ক মেশানো দৃষ্টিপ্রতিভা, যাতে উনি আত্মসমর্পণ করলেন, জগতের সেরা অনুগ্রহের কোলে নিজেকে সোপর্দ করে । আমরা যে স্বৈরাচারী ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কথা বলি তা প্রচুর সমস্যা ছাড়া নিরীক্ষা করা যায় না । কেননা লোকটা নিজেই নিজেকে এমন বস্তুজগতের ঊর্ধে মনে করে যে, কিংবা বলা যায় লোকটা নেশাব এতো আচ্ছন্ন হয়ে যায়, যে একটা বোতল বা কাঁটাচামচ তুলতেও তার সাহসের দীর্ঘ সময় লাগবে । খাবার হজম করার সঙ্কটও বেশ উদ্দাম ; তার বিরুদ্ধে লড়া অসম্ভব । এবং এই স্হিতি যদি দীর্ঘক্ষণ চলে তাহলে তাকে সমর্থন করা যায় না, আর যদি তার জায়গায় নেশার আরেকটা দমক তাড়াতাড়ি দেখা না দ্যায়, যা উপরোক্ত ক্ষেত্রে অসাধারণ ভিশান, মনোরমভাবে আতঙ্কিত স্হিতির মাধ্যমে বর্ণিত, তা একই সঙ্গে সান্তনায় পরিপূর্ণ । এই নতুন স্হিতিকে প্রাচ্যের লোকেরা বলে ‘কায়েফ’। স্হিতিটা আর ঝড়ের ঘুর্ণি নয় ; তা সমাহিত পরম সুখের প্রশান্তি, এক মহিমান্বিত সমর্পণের। বহুক্ষণ যাবত তুমি তোমার নিজের মালিক ছিলে না ; কিন্তু তা নিয়ে তুমি নিজেকে ব্যতিব্যস্ত করো না । ব্যথা, এবং সময়ের বোধ, লোপাট হয়ে গেছে ; কিংবা যদি তারা উঁকি মারার সাহস দেখায়, তা কেবল প্রধান অনুভূতি দিয়ে পালটানো, আর তারা তখন, তাদের সাধারণ প্রকোপের তুলনায়, কাব্যিক বিষাদ । গদ্যের ক্ষোভ নয় ।

 

কিন্তু সর্বোপরি বলা যাক যে এই মহিলার বর্ণনায় ( এবং সেকারণেই আমি ওনার বক্তব্যের মাধ্যমে উপস্হাপন করেছি ) হ্যালুসিনেশানটা জারজ, আর তার প্রকাশ ঘটছে বহির্জগতের বস্তুদের উপস্হিতির দরুন । আত্মা তো কেবল আয়না যাতে পরিবেশ প্রতিফলিত হচ্ছে, অদ্ভুতভাবে পরিবর্তিত । তারপর, আবার, আমরা দেখছি ঢুকে পড়ছে একটা ব্যাপার যাকে আমি বলব নৈতিক হ্যালুশিনেশান ; রুগি মনে করছেন যে তিনি কিঞ্চিদধিক প্রায়শ্চিত্তে নিপাতিত ; কিন্তু নারীর মেজাজ, যার বিশ্লেষণ করা মনানসই হবে না, হ্যালুশিনেশানের অদ্ভুত ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যকে নজর দিতে পারল না । অলিমপাসের দেবতাদের দয়াময় মুখাবয়বকে কাব্যিক করে তোলা হয় হ্যাশিসের পালিশের দ্বারা । আমি বলব না যে এই মহিলা অনুশোচনার আঁচল ছুঁতে পেরেছেন, কিন্তু ওনার ভাবনাচিন্তা, মুহূর্তের জন্য বিষাদের দিকে মোড় নিয়েছিল এবং গতানুশোচনা বেশ তাড়াতাড়ি আশার রঙে রাঙিয়ে উঠেছিল। এই পর্যবেক্ষণ আমরা আবার বিবেচনা করার সুযোগ পাবো ।

 

উনি সকালবেলাকার ক্লান্তির কথা বলছেন ল সত্যি বলতে কি, এটা বিরাট ব্যাপার। কিন্তু তা তক্ষুনি দেখা দেয়নি, আর যখন তুমি তার অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিচ্ছ তুমি তা অবাক না হয়ে দিচ্ছ না : কেননা প্রথমে তুমি সত্যিই নিশ্চিন্ত হয়েছ যে তোমার জীবনের দিগন্তে এক নতুন দিন দেখা দিয়েছে, তুমি শুভত্বের অসাধারণ অনুভূতির অভিজ্ঞতা পাচ্ছ ; মনে হচ্ছে তুমি আত্মার চমৎকার ভারহীনতা উপভোগ করছ । কিন্তু তুমি উঠে নিজের পায়ে দাঁড়াবার আগেই নেশার একটা ভুলে যাওয়া টুকরো তোমাকে অনুসরণ করে পেছনে টেনে নিচ্ছে ; এটা তোমার সাম্প্রতিক ক্রীতদাসত্বের নিশানচিহ্ণ । তোমার দুর্বল পা তোমাকে সাবধান করে দেবে, আর তুমি প্রতিমুহুর্তে ভেঙে টুকরো হবার ভয়ে আতঙ্কিত হবে, যেন তুমি পোর্সিলিন দিয়ে গড়া । এক বিস্ময়কর অবসাদের স্নিগ্ধতা — এমন অনেকে আছেন যাঁরা ভান করেন যে এতে চারুতার অভাব নেই — তোমার আত্মাকে দখল করে, আর ছড়িয়ে পড়ে তোমার কর্মক্ষমতা জুড়ে, যেমনভাবে কুয়াশা ছড়িয়ে পড়ে কোনও তৃণভূমিতে । তাহলে, তুমি মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য, সেখানে আটক, কাজ করতে অক্ষম, ক্রিয়াহীন আর তেজোময়তা-বর্জিত । এটা অপবিত্র অপব্যয়িতার শাস্তি ; তুমি তোমার স্নায়বিক তেজ খুইয়েছো । তুমি তোমার ব্যক্তিত্বকে স্বর্গের চারটি বাতাসে উড়িয়ে দিয়েছো — আর এখন, কীই বা হবে আবার কষ্ট করে তাতে নিবিষ্ট হয়ে !

 

চতুর্থ অধ্যায়

মানবেশ্বর

বালকসুলম মাথার ধোঁয়া থেকে জন্মানো  এই সমস্ত ভোজবাজি, বড়ো-বড়ো পুতুলনাচ এখন একপাশে সরিয়ে রাখার সময় এসেছে। আমাদের কি আরও গুরুতর ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে হবে না — লোকজনের মতামতের পরিবর্তন, এবং, এক কথায়, হ্যাশিসের নিয়মনিষ্ঠা সম্পর্কে?

 

এখন পর্যন্ত আমি নেশা সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন দিয়েছি ; আমি সীমাবদ্ধ থেকেছি নেশার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর লক্ষণ নিয়ে । কিন্তু যা গুরুত্বপূর্ণ, আমার মনে হয়, আধ্যাত্মিক মানসিকতার মানুষের জন্য, মানুষের যে অংশটা আধ্যাত্মিক তার ওপর এই বিষের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে পরিচয় ; অর্থাৎ, তার অভ্যাসগত ভাবপ্রবণতা এবং তার নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর বৃদ্ধি, বিকৃতি ও অতিরঞ্জন, যা তাদের উপস্হাপন করে, বিরল আবহে, তাদের একটি সত্যকার প্রতিসরণ ।

 

যে লোকটা দীর্ঘকালের জন্য নিজেকে আফিম বা হ্যাশিসের নেশায় ছেড়ে দেবার পর, হয়ে উঠেছে, অভ্যাসের দাসত্বের দরুণ দুর্বল, তাকে পেতে হবে বাঁধন কেটে বেরোনোর কর্মশক্তি, তাকে আমার মনে হয় ফেরারি কয়েদির মতন । লোকটা আমাকে তার প্রতি অনুরক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে, বিশেষ করে সেই সাবধানী লোকগুলোর তুলনায় যারা কখনও অধঃপতিত হয়নি, সব সময় প্রলোভন এড়াতে যত্নশীল থেকেছে । ইংরেজরা, আফিমখোরদের বিষয়ে আলোচনার সময়ে, প্রায়ই এমন সমস্ত শব্দ ব্যবহার করে যেগুলো অত্যন্ত কঠোর মনে হবে সেই সমস্ত নিরীহ লোকেদের কাছে যারা অধঃপতনের আতঙ্ক সম্পর্কে কিছুই জানে না — ‘শৃঙ্খলিত’,

‘পায়ে বেড়ি পরানো’, ‘ক্রীতদাসত্ব’ ইত্যাদি । শৃঙ্খল, সত্যি বলতে, এর সঙ্গে যদি তুলনা করতে হয়, কর্তব্যের শৃঙ্খলতা, বেপরোয়া প্রেমের শৃঙ্খল — মাকড়সার লুতাতন্তু কিংবা পাতলা কাপড়ের বুনানি ছাড়া আর কিছুই নয় ।

 

মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের অপপ্রীতিকর বিয়ে ! “আফিমের খাঁচায় আমি কয়েদি ক্রীতদাস হয়ে গিয়েছিলুম, আর আমার শ্রম ও আমার ব্যবস্হা স্বপ্নের রঙে রাঙিয়ে উঠেছিল”, লিজিয়ার স্বামী বলেছিল । কিন্তু কতোগুলো বিস্ময়কর অনুচ্ছেদে এডগার পো, এই অতুলনীয় কবি, এই দার্শনিক যাঁর বিরোধিতা করা হয়নি, যাঁর উদ্ধৃতি, যখনই আত্মার রহস্যময় গোলমালের প্রসঙ্গ উঠবে, দেয়া জরুরি, আফিমের অন্ধকার আর আঁকড়ে-ধরা উজ্বল দীপ্তির কথা বর্ণনা করে গেছেন ! আলোকময়ী বেরেনিসের প্রেমিক ইগোয়াস, অধিবিদ্যায় পণ্ডিত মানুষ, নিজের মৌলিক মানসিক শক্তির পরিবর্তনের কথা বলেন, যা তাঁকে মামুলি ঘটনারও অস্বাভাবিক ও দানবিক মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে ।

 

“দীর্ঘ ক্লান্তিহীন সময় গভীর চিন্তায় মগ্ন থেকে, কোনো বইয়ের মার্জিন অথবা হরফের অপ্রয়োজনীয়  নকশায় আমার আগ্রহ কেন্দ্রিত ; গ্রীষ্ম-দিনের বেশিক্ষণ সময়, মেঝের ওপরে কিংবা দেয়াল-ঢাকা পর্দায় মিহি বেঁকে-থাকা ছায়ায় ডুবে থাকা ; সারা রাতের জন্য আমার নিজেকে হারিয়ে ফেলা, বাতির শিখার  কিংবা আগুনের স্ফূলিঙ্গের দিকে একঠায় তাকিয়ে থাকা ; সারাদিন ফুলের সুগন্ধে স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকা ; কোনো প্রচলিত শব্দকে একঘেয়ে বারবার বলে, যতক্ষণ না শব্দ, প্রতিবার বলার কারণে, মনের ভেতরের কোনো ধারণাকে অর্থহীন করে দিচ্ছে ততোক্ষন ; গতিবিধির সমস্ত ধারণা কিংবা দৈহিক অস্তিত্বের সংবেদন  হারিয়ে ফেলা, শরীরের চরম নিশ্চলতায় দীর্ঘক্ষণ ও একগুঁয়েভাবে যত্নশীল হওয়া : এগুলোই ছিল কয়েকটা সাধারণ আর ন্যূনতম ক্ষতিকারক অস্পষ্টতা, যা মানসিক ক্ষমতার এক বিশেষ অবস্হার ফলে প্রণোদিত, যদিও একেবারে নিরুপম নয়, কিন্তু তা নিঃসন্দেহে বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যা করার চেষ্টার প্রতি দৃঢ় অবজ্ঞা ।”

 

এবং স্নায়ুচাপে পীড়িত অগাস্টাস বেদলো, যিনি প্রতিদিন সকালে হাঁটতে যাবার আগে নিজের আফিমের খোরাক খেয়ে বেরোন, বলেছেন যে এই দৈনিক বিষপান থেকে তিনি যে অন্যতম পুরস্কার পেয়েছেন তা হল মহাআগ্রহে সমস্তকিছুকে নিজের অন্তরে নিয়ে নেওয়া, এমনকি অত্যন্ত মামুলি ব্যাপারও ।

 

“ইতিমধ্যে মরফিন তার পরিচিত প্রভাব আরম্ভ করে দিয়েছিল — তা হল বহির্জগতকে তীব্র আগ্রহে আত্মস্হ  করা । কোনো পাতার কাঁপুনি — ঘাসের শিসের রঙে — ছাতিম পাতার আকারে — একটা মৌমাছির গুঞ্জনে — এক ফোঁটা শিশিরের আলোকণায় — বাতাসের শ্বাসে — বনানী থেকে আসা মৃদু গন্ধগুলোতে — নিয়ে এলো সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের ইশারা — উচ্ছসিত এবং শৃঙ্খলাহীন চিন্তার এক আনন্দময় ও চিত্রবিচিত্র সারি ।”

 

এই ভাবেই নিজেকে ব্যক্ত করেছেন, কাঠপুতুলদের মুখ দিয়ে, ভয়ঙ্করতার গুরু, রহস্যের রাজকুমার । আফিমের এই দুটি বৈশিষ্ট্য হ্যাশিসের ক্ষেত্রে হুবহু প্রযোজ্য । একটির ক্ষেত্রে, যেমন অপরটির ক্ষেত্রে, বুদ্ধিমত্তা, যা আগে স্বাধীন ছিল, ক্রীতদাস হয়ে যায় ; কিন্তু ‘মহাকাব্যিক’ শব্দটি, যা বাইরের জগতের  প্ররোচিত ও নির্দেশিত চিন্তার ধারাপ্রবাহ ও পরিবেশের দুর্ঘটনা দ্বারা সুন্দরভাবে সংজ্ঞায়িত, বলতে গেলে সত্য এবং হ্যাশিসের নেশার ক্ষেত্রে আরও বেশি করাল । এক্ষেত্রে যুক্তিবোধের ক্ষমতা কেবল ঢেউয়ের মতন, প্রবাহের দয়ার ওপর নির্ভরশীল এবং চিন্তার শৃঙ্খলা অনেক গতিবেগসম্পন্ন ও বেশি ‘মহাকাব্যিক’; অর্থাৎ, স্পষ্ট করে আমি বলতে চাই যে হ্যাশিস, তার তাৎক্ষণিক ক্রিয়ায়, আফিমের থেকে অনেক বেশি অনুভূতি উৎপন্নকারী, রোজকার জীবনযাপনে বড়োই প্রতিকূল ; এক কথায়, বিপর্যস্তকারী । আমি জানি না টানা দশ বছর হ্যাশিসের নেশা টানা দশ বছর আফিমের নেশার সমান অসুখগুলো সঙ্গে আনবে কিনা ; আমি বলতে চাইছি, খানিক সময়ের জন্য, সেবনের পরের দিনের জন্য, হ্যাশিসের ফলাফল মারাত্মক হয় । একটা হলো মিঠে কথার মায়াবিনী ; অন্যটা তেড়ে আসা রাক্ষস ।

 

এই শেষ পর্বে আমি সংজ্ঞায়িত ও বিশ্লেষণ করতে চাই এই বিপজ্জনক এবং সুস্বাদু অভ্যাসের কারণে যে নৈতিক সর্বনাশ ঘটে সেই সব কথা ; এই সর্বনাশ এতো ব্যাপক, এক বিপদ যা প্রগাঢ়, যে যারা এর সঙ্গে লড়ে ফিরেছে কিন্তু যৎসামান্য আহত, তাদের দেখে আমার মনে হয় সেই নায়কেরা যারা প্রোটিয়াসের বহুরুপী গুহা থেকে পালাতে পেরেছে, কিংবা অরফিয়াসের মতন, নরকের বিজেতা । তুমি চাইলে, মনে করতে পারো, এই ধরণের ভাষা বাড়িয়ে বলা রূপক, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আমি জোর দিয়ে বলব যে এই উত্তেজক বিষগুলোকে আমার মনে হয় কেবল এক রকমের ভয়ঙ্কর এবং নিশ্চিত উপায় নয় যা অন্ধকারের মায়াপুরুষ বরবাদ মানবদের বন্দি করার জন্য প্রয়োগ করে, বরং তার নিখুঁত অবতারদের অন্যতম ।

 

এবার, আমার কাজ কমিয়ে এনে বিশ্লেষণকে স্পষ্ট করার খাতিরে, ছড়ানো-ছেটানো গল্প সংগ্রহ করার পরিবর্তে, আমি পর্যবেক্ষণের প্রাচুর্যের মাঝে একটিমাত্র পুতুলকে পোশাক পরাবো। সেক্ষেত্রে আমাকে আবিষ্কার করতে হবে একটি আত্মা যা আমার উদ্দেশ্যের সঙ্গে খাপ খাবে । তাঁর ‘স্বীকৃতি’ বইতে ডি কুইনসি সঠিক বলেছিলেন যে আফিম, মানুষকে ঘুম পাড়াবার বদলে, তাকে উত্তেজিত করে ; কিন্তু তাকে তার স্বাভাবিক পথে উত্তেজিত করে, তাই আফিমের বিস্ময়গুলোকে বিচার করার জন্য কোনো বলদ বিক্রেতার ওপরে তা চেষ্টা করা বাতুলতা হবে, কেননা সেরকম এক স্বপ্ন হবে গবাদি পশুর আর ঘাসের । আমি একজন হ্যাশিসের নেশাগ্রস্ত গরুমোষ প্রজননকারীর জগদ্দল কল্পনা বর্ণনা করতে যাচ্ছি না । কেই বা তা আনন্দে পড়বে, কিংবা পড়বার অনুমতি দেবে ? আমার বিষয়কে আদর্শ হিসাবে উপস্হাপনের জন্য আমাকে যাবতীয় রশ্মিকে একটিমাত্র বৃত্তে কেন্দ্রিত করে সমবর্তিত করতে হবে ; আর যে বিয়োগান্তক বৃত্তে আমি তাদের জড়ো করব তা হলো, যেমন আগেই বলেছি, আমার নিজের পছন্দের একজন মানুষ ; অনেকটা আঠারো শতকে যাকে বলা হতো ‘সংবেদনশীল মানুষ’ ( homme sensible ), যাকে রোমান্টিক গোষ্ঠি নাম দিয়েছিল ‘ভুল বোঝা মানুষ’ ( homme incompris ), আর গৃহস্হ ও বুর্জোয়ারা সাধারণত বলত “মৌলিক।” এই ধরণের নেশায় মাতাল হবার জন্য অনুকূল হলো অর্ধেক স্নায়ুচাপে পীড়িত, অর্ধেক খিটখিটে মনগঠন । এর সঙ্গে যোগ করা যাক এক শিক্ষিত মন, আদরা আর রঙের সাথে পরিচিত, একটি কোমল হৃদয়, দুর্ভাগ্যের দরুন বিষাদগ্রস্ত, কিন্তু তবু আবার যুবক করে তোলা যেতে পারে তাকে ; তোমরা অনুমতি দিলে, আমরা বিগতকালের ভুলগুলো স্বীকার করে নেবো, এবং, এর দরুন  সহজে উত্তেজিত হয় এমন, ইতিবাচক পশ্চাত্তাপ যদি নাও হয়, অন্তত বাজেভাবে খরচ করে ফেলা ও সীমালঙ্ঘিত সময়ের কারণে অনুতাপ করবে।

অধিবিদ্যায় আগ্রহ, মানব নিয়তি সম্পর্কিত দর্শনের বিভিন্ন ধরনের অনুমানের সঙ্গে পরিচয়, নিঃসন্দেহে অপ্রয়োজনীয় শর্ত হবে না ; এবং, তাছাড়া, সততাকে গ্রহণ করা, বিমূর্ত সততাকে, সামাজিক হোক বা নিগূঢ়, যা তাবৎ বইতে রচিত যার ওপর নির্ভর করে আধুনিক বালখিল্য, যার যাকে মনে করা হয় লক্ষে পৌঁছোবার জন্য আত্মার  সর্বোচ্চ শিখর । এই সমস্তের সঙ্গে যদি যোগ করা হয় ইন্দ্রিয়ের পরিশোধন — আর আমি যদি এটা উল্লেখ করতে ভুলে গিয়ে থাকি তাহলে বুঝতে হবে আমি একে মনে করেছিলুম বাহুল্যপূর্ণ — আমি মনে করি যে আমি সাধারণ উপাদান সংগ্রহ করতে পেরেছি যা ‘সংবেদনশীল মানুষদের’ মধ্যে আখছার পাওয়া যায় এবং যাকে বলা যেতে পারে মৌলিকতার সর্বনিম্ন পরিমাপ । এবার দেখা যাক এই ব্যক্তিতার কী ঘটবে যদি তাকে হ্যাশিসের চূড়ান্ত নেশায় ফুসলিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় । মানুষের কল্পনার শেষ এবং অতীব চমৎকার পান্হশালা পর্যন্ত এর ক্রমবৃদ্ধি অনুসরণ করা যাক ; ব্যক্তিটির নিজের দিব্যতায় বিশ্বাসের সীমা পর্যন্ত যাওয়া যাক ।

 

যদি তুমি এইরকম এক আত্মা হও আদরা এবং রঙ সম্পর্কে তোমার স্বভাবগত ভালোবাসা শুরু থেকেই তোমার প্রাথমিক স্তরের নেশায় পাবে বিশাল এক ভোজসভা । রঙগুলো অপরিচিত তেজোময়তায় আক্রান্ত হবে আর তোমার মস্তিষ্কের ভেতরে বিজয়ের  কেতন উড়িয়ে পরস্পরকে আচ্ছন্ন করবে । তারা সূক্ষ্ম, মামুলি, কিংবা খারাপ হলেও, ছাদে আঁকা ছবিগুলো প্রাণশক্তির পোশাক পরে অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে উঠবে । পান্হশালার দেয়ালগুলোয় যে খসখসে কাগজ সাঁটা তা অসাধারণ পরিদৃশ্যের মতন নিজেদের মেলে ধরবে । ঝিকমিকে মাংসল পরিরা আকাশ ও সাগরের চেয়ে গভীর ও অনাবিল আয়ত চোখে তোমার দিকে তাকাবে । বহু-প্রাচীন চরিত্রেরা, যাজক কিংবা সেনার পোশাকে, একটিমাত্র চাউনি মেলে, তোমার সঙ্গে গোপন কথাবার্তা আদান-প্রদান করবে । সর্পিল রেখেগুলো নিঃসন্দেহে বোধগম্য একটি ভাষা যেখানে তুমি পড়তে পারবে তাদের আত্মার দুঃখ ও আবেগ । তা সত্তেও, এক রহস্যময় অথচ সাময়িক মানসিক স্হিতি আপনা থেকে গড়ে উঠবে ; জীবনের নিগূঢ়তা, বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত, দৃষ্টির সামনে সুস্পষ্ট উদয় হবে, তা যতোই স্বাভাবিক ও মামুলি হোক না কেন, চোখের সামনেই রয়ে যাবে ; যে বস্তুগুলো প্রথমে দেখা দেবে সেগুলো বার্তাবহ প্রতীক । ফুরিয়ার এবং সোয়েডেনবোর্গ, প্রথমজন তাঁর উপমান দিয়ে, এবং দ্বিতীয়জন সংগতি দিয়ে, তোমার চোখের সামনে যাকিছু ভেষজ ও জান্তব দেখা যায়, তাতে নিজেদের মূর্ত করেছেন, এবং কন্ঠস্বরের দ্বারা স্পর্শের পরিবর্তে তাঁরা তোমাকে আঙ্গিক ও রঙে উদ্বুদ্ধ করেন । এই রূপকের বোধ তোমার অন্তরে যে অনুপাত সৃষ্টি করে তা তুমি নিজেই জানো না। প্রসঙ্গক্রমে আমরা বলব যে রূপক, শিল্পের এতো আধ্যাত্মিক অংশ, চিত্রকরদের আনাড়িপনার ফলে যাকে আমরা হেয় জ্ঞান করতে অভ্যস্ত, অথচ যা সত্যিই কবিতার সবচেয়ে স্বাভাবিক ও আদিম আঙ্গিক, তার দৈব অধিকার ফিরে পায় নেশার দ্বারা আলোকিত বুদ্ধিমত্তায়। তখন হ্যাশিস ছড়িয়ে জীবনের সর্বত্র ; বলা যায়, ম্যাজিক পালিশের মতন । তার অসামান্যতা আলোকিত হয় রঙের সুশীল আবছায়ায় ; অসমতল উপত্যকা, ধাবমান দিগন্ত, শহরগুলোর পরিপ্রেক্ষণ যা শাদা হয়ে উঠেছে ঝড়ের শবানুগ বিবর্ণতায় কিংবা সূর্যাস্তের কেন্দ্রিত ব্যকুলতায় উজ্বল ; শূন্য-পরিসরের রসাতল, সময়ের অতলের রূপক ; নৃত্য, অভিনেতাদের অঙ্গভঙ্গী অথবা সংলাপ, যদি তোমি নাট্যালয়ে থাকো ; তোমার চোখ যদি কোনো বইতে পড়ে তাহলে প্রথম প্রবাদ ; এক কথায়, সমস্তকিছু ; অস্তিত্বের বিশ্বজনীনতা নতুন গৌরব নিয়ে তোমার সামনে এসে দাঁড়ায় যা ততোক্ষণ পর্যন্ত ছিল অজানিত । ব্যাকরণ, শুকনো ব্যাকরণ নিজেই, হয়ে দাঁড়ায় “আহ্বানের অশুদ্ধ নাম”-এর বই । শব্দেরা আবার উঠে দাঁড়ায়, মাংস ও হাড়ের পোশাকে ; বিশেষ্য, তার অটল মহিমায় ; রঙ আর ঝিলমিলে জালে মোড়া বিশেষণদের স্বচ্ছ আলখাল্লা ; এবং ক্রিয়াপদ, গতির প্রধান দেবদূত যা বাক্যটিকে দোল খাওয়ানো আরম্ভ করে।

সঙ্গীত, অলসদের কিংবা জ্ঞানী আত্মাদের প্রিয় ভাষা, যারা তাদের কাজ-কারবারকে বদলে-বদলে জিরিয়ে নিতে চায়, তোমাকে তোমার কথাই বলে, তোমার জীবনের কবিতা আবৃত্তি করে শোনায় ; তা তোমার অন্তরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে, এবং তুমি তাতে মুর্ছিত হয়ে পড়ো । এ তোমার কামনার কথা বলে, কেবল অস্পষ্ট, অসংজ্ঞায়িত উপায়ে নয়, যেমনটা অপেরায় তোমার অমনযোগী সন্ধ্যায় করে, কিন্তু বেশ সারগর্ভ ও  ইতিবাচকভাবে, প্রতিটি ঝঙ্কার একটি চলনকে চিহ্ণিত করে যাকে তোমার আত্মা চেনে, স্বরলিপির প্রতিটি স্বর পরিবর্তিত হয়ে যায় শব্দে, এবং সম্পূর্ণ কবিতাটি তোমার মস্তিষ্কে প্রবেশ করে যেন একটা প্রাণপ্রাপ্ত অভিধান ।

 

এটা অনুমান করা উচিত হবে না যে এই ব্যাপারগুলো একে অপরের ওপরে উদ্দীপনায় তড়িঘড়ি পড়ে যায়, বাস্তবতার কলরবপূর্ণ স্বরাঘাত ও বহির্জীবনের বিশৃঙ্খলাসহ ; অন্তরজগতের চোখ সমস্তকিছুকে পরিবর্তিত করে, এবং সবাইকে সৌন্দর্যের অভিনন্দন জানায় যা এর নিজের নেই, যাতে সত্যকার আনন্দের যোগ্যতাসম্পন্ন হয় । এই জরুরি ইন্দ্রিয়জ ও সংবেদনের পর্বের সঙ্গে তুলনীয় অনাবিল জলের প্রেম, স্হির বা স্রোতোময়, যা আশ্চর্যজনকভাবে কোনো কোনো শিল্পীর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের নেশায় অভিব্যক্ত হয় । আয়না হয়ে উঠেছে এই স্বপ্নবিহ্বলতার অজুহাত, যা অনেকটা গলায় শুকিয়ে যাওয়া আত্মার তৃষ্ণা ও দেহের তৃষ্ণার মিশেল, এবং যে বিষয়ে আমি আগেই বলেছি । বইতে থাকা জল, খেলতে থাকা জল; সঙ্গীতময় ঝর্ণা ; সমুদ্রের অপার নীল ; সবই বর্ণনার অতীত গড়িয়ে যায়, গান গায়, লাফায়। মোহিনীর মতন দুই বাহু এগিয়ে দ্যায় জল ; এবং যদিও আমি হ্যাশিস-সৃষ্ট উন্মাদ হইচইতে বিশ্বাস করি না, আমি জোর দিয়ে বলতে চাই না যে শূন্য-পরিসর ও স্ফটিকে আকর্যিত মানুষের পক্ষে কিঞ্চিদধিক অনাবিল আবর্তের অনুশীলন একেবারেই বিপজ্জনক হবে না, আর  উনদাইন জলপরীর গল্পটা যে উৎসাহীদের জীবনে বিয়োগান্তক হবে না তাও নিশ্চয় করে বলতে পারি না ।

 

আমার মনে হয় শূন্য-পরিসর এবং সময়ের বিশাল বৃদ্ধি সম্পর্কে আমি যথেষ্ট বলেছি ; দুটি ধারণা সবসময় মিশ খেয়েছে, সবসময় একে আরেকের সঙ্গে বোনা, কিন্তু  সেই সময়ে আত্মা বিষাদ ও ভয়ের মুখোমুখি হয় না । তা বিশেষ বিষণ্ণ আহ্লাদ নিয়ে বহু বছরের ওপারে তাকিয়ে থাকে, এবং অত্যন্ত সাহসিকতায় অনন্তকালীন পরিপ্রেক্ষণে ডুব দ্যায় । তুমি নিশ্চয়ই ভালো করে বুঝতে পেরেছো, আশা করি, যে এই বিকৃত ও স্বৈরাচারী বাড়বাড়ন্ত যাবতীয় সংবেদন এবং ধারণার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য । আমি মনে করি, আমি তুলে ধরতে পেরেছি হিতৈষিতার যথেষ্ট ন্যায্য উদাহরণ । ভালোবাসার ব্যাপারেও এটা সত্য । আমি যেরকম আত্মিক মেজাজের উদ্ভাবন ঘটিয়েছি, সৌন্দর্যের ধারণা স্বাভাবিকভাবেই তাতে বিশাল একটা পরিসরের দখল নিয়ে নেবে । ঐকতান, পংক্তির ভারসাম্য, গতির সূক্ষ্ম সুরপ্রবাহ, যে স্বপ্ন দেখছে তার কাছে দেখা দ্যায় প্রয়োজনীয় হিসাবে, কর্তব্য হিসাবে, কেবল সৃষ্টির তাবৎ অস্তিত্বের জন্য নয়, কিন্তু তার নিজের জন্যও, যে স্বপ্ন দেখছে, যে এই সঙ্কটের সময়ে নিজের মধ্যে আবিষ্কার করে অমর এবং সর্বজনীন ছন্দের এক চমৎকার প্রবণতা । এবং যদি আমাদের গোঁড়া লোকটির ব্যক্তিগত সৌন্দর্যের অভাব থাকে, তাহলে সে মনে করবে যে  সে দীর্ঘ সময় যাবত যে দোষ করেছে তা স্বীকার করতে অপারগ, কিংবা নিজেকে মনে করবে যে তার কল্পনায় গড়া জগতের ঐকতানে ও সৌন্দর্যে সে একটি বেসুরো কন্ঠস্বর । চরস সম্পর্কিত কুতর্ক অসংখ্য ও প্রশংসনীয়, প্রথাগতভাবে ইতিবাচকতার দিকে তার ঝোঁক, এবং প্রধান ও প্রভাবশালী ব্যাপার হলো যে তা ইচ্ছাকে উপলব্ধিতে পালটে দিতে পারে । ব্যাপারটা একই, নিঃসন্দেহে, সাধারণ জীবনের বহু ক্ষেত্রে ; কিন্তু এখানে আরও কতো আকুলতা ও তনিমার প্রয়োজন হচ্ছে ! নয়তো, কেমন করেই বা একজন মানুষ যে ঐকতান হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম, যেন সে সৌন্দর্যের যাজক, কেমন করেই বা সে তার নিজেরই তত্বের কলঙ্ক হতে পারে, ব্যতিক্রম হতে পারে ? নৈতিক সৌন্দর্য ও তার ক্ষমতা, গরিমা ও ফুসলিয়ে নেবার গুণ, বাগ্মীতা এবং তার কৃতিত্ব, এই সবকয়টি ধারণা শীঘ্রই নিজেদের উপস্হিত করে যাতে চিন্তাহীন কদর্যতাকে শুধরে নেয়া যায় ; তারপর তারা উদয় হয় সান্ত্বনাদানকারী হিসাবে, এবং সব শেষে এক কাল্পনিক দরবারের যুৎসই সভাসদ, মোসাহেব হিসাবে ।

 

ভালোবাসার বিষয়ে, আমি অনেকের কাছে স্কুল-বালকসুলভ কৌতূহলের কথা শুনেছি, যারা হ্যাশিসের প্রয়োগের সঙ্গে পরিচিত তাদের কাছ থেকে তথ্য যোগাড় করছে, যা কিনা ভালোবাসার নেশা নয়, নিজের স্বাভাবিক স্হিতিতে এতো ক্ষমতাসম্পন্ন, যখন তা অপর নেশাটিতে আবদ্ধ ; সূর্যের ভেতরে এক সূর্য । আমি যাদের বলি বৌদ্ধিক হাঁ-করা, সেই শ্রেনির লোকের মনে এরকম প্রশ্ন জাগে । যে প্রশ্নের লজ্জাজনক অর্ধেক-অর্থের উত্তর খোলাখুলি আলোচনা করা যায় না, আমি পাঠককে বলব প্লিনি পড়তে, যিনি কোথাও গাঁজাপাতার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এমনভাবে বলেছেন যে যাতে বিষয়টা নিয়ে বিভ্রমের ঘোর কেটে যায় । তাছাড়া লোকে জানে, যে সমস্ত মাদক তাদের উত্তেজিত করে তা সেবন করলে কন্ঠস্বরের ক্ষয় হলো নেশার সবচেয়ে সাধারণ প্রতিফল যা মানুষ তাদের স্নায়ুর ক্ষেত্রে ঘটায় । এখন, যখন আমরা প্রভাবশীল গুণের বিষয়ে আলোচনা করছি, গতি আর গ্রাহীক্ষমতা, আমি পাঠককে শুধুমাত্র ভেবে দেখতে বলব যে হ্যাশিসের নেশাগ্রস্ত একজন সংবেদনশীল মানুষের কল্পনাকে

চূড়ান্ত স্তরে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে টের পাওয়া তেমনই সহজ যেমন ঝড়েতে বাতাসের গতির তীব্রতা, আর তার ইন্দ্রিয়গুলো এমনই এক বিন্দুতে নিগূঢ়, যাকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন । অতএব এটা বিশ্বাস করা যুক্তিযুক্ত যে আলতো আদর, যতোটা নিষ্পাপ হতে পারে, হ্যাণ্ডশেক, উদাহরণস্বরূপ, আত্মার ও সৌন্দর্যের প্রকৃত স্হিতিকে একশোগুণ ধরে রাখতে পারে, আর হয়তো তাদের পরিচালিত করতে পারে, এবং তাও বেশ দ্রুত, সেই সাময়িক সংজ্ঞাহীনতা পর্যন্ত যাকে আনাড়ি নশ্বররা মনে করে আনন্দের সমাপ্তি ( summum );কিন্তু এটা সংশয়াতীত যে হ্যাশিস জেগে ওঠে এমনই এক কল্পনায় যা নিজেকে কোমল স্মৃতিতে পরিব্যপ্ত করতে অভ্যস্ত, যে অবস্হায় ব্যথা ও আনন্দহীনতা নতুন জেল্লা পায় । মনের এই ধরনের মন্হনক্রিয়ায় এটা কম নিশ্চিত নয় যে তাতে রয়েছে কামনার তীব্র উপাদান ; এবং তাছাড়া, এখানে মন্তব্য করা জরুরি — আর হ্যাশিসের অনৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য এই তর্ক যথেষ্ট বলে মনে হয় — ইশমায়েলাইটদের ( ইশমায়েলাইটদের থেকেই অ্যাসাসিন বা গুপ্তঘাতকদের উৎপত্তি ) একটা একটা উপদল হ্যাশিসের অভিবন্দনা এমন স্তরে নিয়ে গিয়েছিল যে তারা লিঙ্গ-যোনি থেকে বহুদূরে চলে গিয়েছিল ; অর্থাৎ, লিঙ্গের চরম অর্চনায়, নারীপ্রতীকের অর্ধাংশকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে । কিছুই অস্বাভাবিক নয়, প্রতিটি মানুষ যেহেতু ইতিহাসের প্রতীকি প্রতিনিধি, কোনো অশ্লীল বৈধর্ম্য দেখতে পেয়ে, এক দানবিক ধর্ম, মনের মধ্যে জাগ্রত হয় যা ভীরুতার সঙ্গে নারকীয় এক মাদকের দয়ায় আত্মসমপহণ করেছে এবং যা নিজের মৌলিক মানসিক শক্তির অবক্ষয় নিয়ে হাসাহাসি করে ।

 

যেহেতু হ্যাশিসের নেশায় আমরা প্রত্যক্ষ করেছি মানুষের প্রতি অদ্ভুত সদিচ্ছা, এমনকি অচেনা লোকের প্রতিও, লোকহিতৈষণার একটি প্রজাতি যা ভালোবাসার বদলে পরদুঃখকাতরতায় গড়া ( আর এখানেই শয়তানি আত্মার প্রথম বীজ যা পরবর্তীকালে অসাধারণভাবে বিকশিত হবে তা দেখা দেয় ), কিন্তু যা অন্য কাউকে যন্ত্রণা দেবার ভীতি পর্যন্ত এগোয়, যে কেউ অনুমান করতে পারে যে যা ভালোবাসার পাত্রের ক্ষেত্রে স্হানিক ভাবপ্রবণতা হয়ে দেখা দ্যায়, কিংবা দিয়েছে, হইচইকারীর নৈতিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূজা, অর্চনা, প্রার্থনা, আনন্দের স্বপ্ন, ছিটকে বেরোয় এবং অস্পষ্ট তেজোময়তায় ও অত্যুৎসারিতায় রকেটের মতন উৎসারিত হয় । আতশবাজির মশলা আর রঙবস্তুর মতন, তারা ঝিকমিক করে অন্ধকারে বিলীন হয়ে যায় । এমন কোনোরকম সংবেদনশীল সমন্বয় নেই যাতে হ্যাশিস-গোলামের সূক্ষ্ম ভালোবাসা নিজেকে উপুড় করে দেবে না । রক্ষা করার ইচ্ছা, পিতৃত্বের আকুল ও একনিষ্ঠ অনুভূতি মিশে যেতে পারে অপরাধমূলক কামনার সঙ্গে যা হ্যাশিস সদাসর্বদা জানবে কেমন করে মাফ করে দিতে হয় এবং পাপমুক্ত করতে হয় । ব্যাপারটা আরও প্রসারিত হয় । আমার মনে হয়, অতীতের ভুলগুলো আত্মায় তিক্ত পথচিহ্ণ রেখে যায়, একজন স্বামী অথবা একজন প্রেমিকা স্বাভাবিক পরিস্হিতিতে বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে তার ঝঞ্ঝাময় অতীতের মেঘে ছায়া দিনগুলোর কথা ভাববে ; এই তিক্ত ফলগুলো, হ্যাশিসের নেশাগ্রস্ত থাকার সময়ে, মিষ্টি ফল হয়ে উঠতে পারে । ক্ষমা করে দেবার প্রয়োজন কল্পনাকে আরও চতুর ও আরও মিনতিপূর্ণ করে তোলে, এবং অনুশোচনা স্বয়ং, এই শয়তানি নাটকে, যা নিজেকে দীর্ঘ স্বগতসংলাপে প্রকাশ করে, হৃদয়ের উৎসাহকে প্রাচুর্যে ভরিয়ে প্ররোচিত করতে পারে । হ্যাঁ, অনুশোচনা । সত্যকার দার্শনিক মনে হ্যাশিস নিখুঁত শয়তানি যন্ত্রের মতো মনে হয়, এই কথাটা আমি কি ভুল বলেছিলুম ? অনুশোচনা, আহ্লাদের একমাত্র উপাদান, দ্রুত চাপা পড়ে যায় অনুশোচনার সুস্বাদু প্রত্যাশায় ; এক ধরণের ইন্দ্রিয়পরায়ণ বিশ্লেষণে ; এবং এই বিশ্লেষণ এতো তাৎক্ষনিক যে মানুষ, এই প্রাকৃতিক শয়তান, সোয়েডেনবোর্গের অনুসরণকারীরা যেমন বলেন, বুঝতে পারে না এটা কতো অনৈচ্ছিক, আর কেমন করে, মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে, সে শয়তানের পরিপূর্ণতা লাভ করে । সে তার অনুশোচনাকে প্রশংসা করে, আর নিজেকে করে গৌরবান্বিত, এমনকি যখন সে তার স্বাধীনতা খোয়াতে চলেছে।

 

তাহলে, আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমার কাল্পনিক মানুষটাকে, যে মন আমি বেছে নিয়েছি, আহ্লাদ এবং প্রশান্তির সেই স্তরে পৌঁছেচে যেখানে সে নিজেকে প্রশংসা করতে বাধ্য । প্রতিটি পরস্পরবিরোধিতা নিজেদের মুছে ফ্যালে ; যাবতীয় দার্শনিক সমস্যা স্পষ্ট হয়ে যায়, অন্তত সেটাই মনে হয় ; আনন্দের জন্য সমস্তকিছুই বস্তুগত ; জীবনের যে প্রাচুর্য সে উপভোগ করে তাকে গর্বান্বিত বোধ করতে উৎসাহ যোগায় ; একটা কন্ঠস্বর তার সঙ্গে কথা বলে ( হায়, তার নিজেরই কন্ঠস্বর ! ) যা তাকে বলে : “এখন তোমার অধিকার জন্মেছে নিজেকে সমস্ত মানুষের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করার । কেউ তোমাকে চেনে না, তুমি যা চিন্তা করো ও যা অনুভব করো তা কেউ বুঝতে পারবে না ; তারা, নিঃসন্দেহে, তোমার অন্তরে জাগরিত কামনাসিক্ত ভালোবাসাকে সমাদর করতে পারবে না । পথচারীর কাছে তুমি অপরিচিত মহারাজা ; যে মহারাজা জীবিত, কিন্তু কেউই টের পায় না সে নিজেই নিজের মহারাজা । কিন্তু তোমার তাতে কীই বা আসে-যায় ? তোমার কি সার্বভৌম অবমাননা নেই, যা আত্মাকে দয়ালু করে তোলে ?”

 

তুমি হয়তো ভাববে, যে এক সময় থেকে আরেক সময়ে  কোনো তোমাকে স্মৃতি কামড়ে ধরবে আর আনন্দকে মাটি করে দেবে । বহির্জগতের কোনো অপছন্দের প্রসঙ্গ অতীতকে জাগিয়ে তোমার মেজাজ খারাপ করে দেবে । অতীতে কতোই বা বোকা আর ইতর কাজকর্ম রয়েছে ! — চিন্তার মহারাজার পক্ষে যা সত্যিই বেমানান, আর কার বর্মকে তারা নোংরা করে ? বিশ্বাস করো, হ্যাশিস-নেয়া লোকটি এই সমস্ত মানহানিকর ভুতপ্রেতকে সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করবে, এমনকি এই সমস্ত বিরক্তিকর স্মৃতি থেকে সে জানতে পারবে আনন্দ আর গর্বের নতুন উপাদান পাওয়া যায় ।

 

তার যুক্তিতর্কের উদ্ভব এই ভাবেই ঘটবে । ব্যথার প্রাথমিক সংবেদন ফুরিয়ে যাবার পর, সে কৌতূহলী হয়ে যাচাই করে দেখবে তার বর্তমান গৌরবকে কোন কোন স্মৃতি কষ্ট দিয়েছে ; কোন মানসিকতা অমন করে কাজ করতে প্ররোচিত করেছিল ; কোন পরিস্হিতি তাকে তখন ঘিরে রেখেছিল ; এবং সে যদি ঘটনাগুলোয় যথেষ্ট কারণ খুঁজে না পায়, দোষক্ষালনের জন্য না হলেও, অন্তত তার অপরাধবোধকে প্রশমিত করার খাতিরে, এটা মোটেই মনে করা উচিত নয় যে সে পরাজয় স্বীকার করেছে । আমি তার যুক্তিতর্কে উপস্হিত রয়েছি, যেমন করে স্বচ্ছ কাচের তলায় কোনো যন্ত্রের খেলা দেখা যায় । “এই হাস্যকর, ভীতু, কিংবা ইতর কাজ, যার স্মৃতি আমাকে এক মুহূর্তের জন্য বিপর্যস্ত করেছিল, তা আমার সত্যকার ও বাস্তব প্রকৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত, এবং যে তেজোময়তায় আমি তাকে ভর্ৎসনা করছি, যে বিচার-বিবেচনার সাহায্যে আমি তাকে বিশ্লেষণ আর জেরা করছি, প্রমাণ করে সততার জন্য আমার উত্তুঙ্গ ও দৈব আগ্রহ । মানবজগতে কতোজন বুদ্ধিমান মানুষই বা পারে নিজেদের বিচার করতে ; নিজেদের ভর্ৎসনা করার মতো যথেষ্ঠ কঠোর ?” এবং সে কেবল নিজেকে ভর্ৎসনাই করছে না, বরং নিজেকে গৌরবান্বিতও করছে ; ভয়ঙ্কর স্মৃতি আদর্শ সততার অভিপ্রায়ে, আদর্শ পরার্থিতা, আদর্শ প্রতিভায় অভিনিবিষ্ট হবার পর, সে নিজেকে ছেযে দ্যায় বিজয়ী আত্মিক স্ফূর্তিতে । আমরা তা লক্ষ করেছি, কলুষিতকারীদের  ধর্মসংস্কারের নকল তপস্যা, একই সঙ্গে কলুষিত করছে আর স্বীকৃতি দিচ্ছে, সে নিজেকে এক সহজ পাপমোচনে সোপর্দ করেছে ; কিংবা, আরও খারাপ, নিজের গর্ববোধের খোরাকের জন্য সে তার অভিপ্রায়ের আশ্রয় নিয়েছে । এখন, তার স্বপ্নের অন্তর্গত অভিপ্রায় এবং তার সততার পরিলেখ থেকে সে শেয পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারে যে সততার ব্যবহারিক দক্ষতা তার আছে ; যে প্রণয়োদ্দীপক তেজোময়তা দিয়ে সে এই সততার প্রেতকে প্রভাবিত করে তা থেকে তার মনে হয় তার কাছে যথেষ্ট ও সুনিশ্চিত প্রমাণ রয়েছে যে নিজের উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য তার আছে পুরুষোচিত বীর্যশক্তি । সে স্বপ্নকে কাজ দিয়ে পুরোপুরি বানচাল করে দ্যায়, আর তার কল্পনা, তার নিজের মোহিনী প্রদর্শনীর সামনে উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয়ে তার প্রকৃতিকে শুধরে দ্যায় আর আদর্শায়িত করে, নিজের কল্পনার প্রতিচ্ছবির জায়গায় স্হাপন করে তার সত্যকার ব্যক্তিত্ব, যা ইচ্ছাশক্তিতে দুর্বল, অহমিকায় ধনী, সে তার মহিমান্বয়নকে এই সুস্পষ্ট ও সরল ঘোষণা দিয়ে শেষ করে, যাতে রয়েছে তার জন্য ন্যক্কারজনক আহ্লাদের সমগ্র জগতসংসার :”আমি সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র।” এ-কথা কি তোমায় মনে করায় না ছোট্ট জাঁ-জাক-এর ব্যাপার, যে, সেও ব্রহ্মাণ্ডের কাছে স্বীকার করেছিল, আনন্দহীন নয়, সাহস দেখিয়েছিল বিজয়ের একই কান্নায় ( কিংবা তফাতটা যৎসামান্য ) একই আন্তরিকতা এবং একই প্রত্যয় নিয়ে ? যে উৎসাহ নিয়ে সে সততার প্রশংসা করেছিল, ভালো কাজ কিংবা ভালো কাজের চিন্তা, যা সে নিজে অর্জন করতে চেয়েছিল, যার দরুন স্নায়বিক আবেগে তার চোখ জলে ভরে উঠেছিল, তার যথেষ্ট ছিল নিজের নৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে বাড়িয়ে-চাড়িয়ে ধারণা গড়ার জন্য । হ্যাশিস ছাড়াই জাঁ-জাক নিজেকে নেশাগ্রস্ত করে ফেলেছিল ।

 

আমি কি এই বিজয়ী বাতিকের আরেকটু বিশ্লেষণ করব ? আমি কি ব্যাখ্যা করব কেমন করে, বিষটার প্রভাবে, আমার আলোচ্য লোকটা নিজেকে ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র করে ফেলেছে ? কেমন করে সে জীবন্ত আর উড়নচণ্ডী উদাহরণ হয়ে উঠেছে সেই প্রবাদের যা বলে যে কামনা চিরকাল সমস্তকিছু নিজের প্রসঙ্গে উল্লেখ করে ? সে নিজের সততা আর নিজের প্রতিভায় বিশ্বাস করে ; তুমি কি শেষটা আঁচ করতে পারছ না ? তাকে ঘিরে থাকা চারিপাশের বস্তুগুলো এতো বেশি পরামর্শমূলক যে সেগুলো তার অন্তরের চিন্তার জগতে আলোড়ন তোলে, আরও বেশি রঙ নিয়ে, বেশি জিবন্ত, আগের থেকে সূক্ষ্ম, ম্যাজিকের ঠাটঠমকে মোড়া । “এই বিশাল শহরগুলো”, সে নিজেকে বলে, “যেখনে অনন্য অট্টলিকাগুলো একটার ওপরে আরেকটা উঠে গেছে ; স্বদেশে ফেরার জন্য কাতর আলস্যে এই সুন্দর জাহাজগুলো পথের ধারের জলরাশিতে ভারসাম্য নিয়ে ভাসছে, আমাদের চিন্তাকে এইভাবে অনুবাদ করে, ‘কখন আমরা আনন্দের পাল তুলে ভাবো ? ; এই জাদুঘরগুলো সুন্দর প্রতিমা আর মোহক রঙে নেশা ধরায়; এই গ্রন্হাগারগুলো যেখানে রয়েছে বিজ্ঞানের বই আর কবিতার স্বপ্নের সংগ্রহ ; যন্ত্রপাতির এই সমাবেশ যাদের একটিই সঙ্গীত ; এই মোহিনী নারীরা, যাদের আরও সুন্দরী করে তুলেছে সাজসজ্জার বিজ্ঞান ও ভালোবাসার ভান : এই সমস্তকিছুই আমার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, আমার জন্য, আমার জন্য ! আমার জন্য মানব সম্প্রদায় খেটেছে ; শহিদ হয়েছে, ক্রুশকাঠে চেপেছে, চারণভূমিতে কাজ করেছে, আমার অপ্রশম্য আবেগ, জ্ঞান ও সৌন্দর্যের ক্ষুধা মেটাবার জন্য খেটেছে।” গল্প ছোটো করার খাতিরে আমি উপসংহারে লাফ দিই । কেউই আশ্চর্য হবে না স্বপ্ন দেখিয়ের মগজ থেকে এক শেষ ও মহান চিন্তার ঝর্ণা বেরোয় : “আমি ঈশ্বর হয়ে গেছি।”

 

কিন্তু তার বুক থেকে একটা বুনো আর জ্বলন্ত কান্না এমন জোরে, উৎসারের এমন ক্ষমতায় বেরিয়ে আসে যে, কোনো নেশাগ্রস্ত মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও বিশ্বাস যদি প্রভাবশীল ক্ষমতা রাখতো তাহলে এই কান্না স্বর্গের আশ্রয়ে দেবদূতরা ছত্রখান হয়ে ছড়িয়ে পড়ত : আমি একজন দেবতা।”

 

কিন্তু বেশ তাড়াতাড়ি গর্বের এই ঝঞ্ঝা শান্ত, নিঃশব্দ, বিশ্রামরত স্বর্গসুখের আবহাওয়ায় পরিবর্তিত হয়, আর অস্তিত্বের সার্বজনীনতা নিজেকে উপস্হিত করে রঙিন আর উজ্বল প্রতিভাময়ী ভোরবেলায় । যদি কোনোক্রমে এই শোচনীয় তিনবার-সুখি আত্মায় এক অস্পষ্ট স্মৃতি  ঢুকে পড়ে — “তাহলে কি আরেক ঈশ্বর হবেন না ?” — বিশ্বাস করো, সে ঈশ্বরের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াবে ; সে ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরোধিতা করবে, এবং বিনা ভয়ে ঈশ্বরের মোকাবিলা করবে ।

 

কে সেই ফরাসি দার্শনিক যিনি আধুনিক জার্মান তত্বকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন : আমি কি দেবতা যে রাতের ভোজে অখাদ্য খেয়েছে ?” হ্যাশিসের দ্বারা উন্নীত আত্মায় এই বিদ্রূপ কামড় বসাবে না ; সে ঠাণ্ডা মাথায় জবাব দেবে : “হয়তো আমি রাতের ভোজে অখাদ্য খেয়েছি ; কিন্তু আমি একজন দেবতা।”

পঞ্চম অধ্যায়

নৈতিক শিক্ষা

কিন্তু আগামীকাল ; ভয়ানক আগামীকাল ! সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিরুদ্বেগ, ক্লান্ত ; স্নায়ুরা অপ্রসারিত, অশ্রুজলের উত্যক্ত করার প্রবণতা, নিয়মিত কাজে নিজেকে নিয়োগ করার অসম্ভাব্যতা, নিষ্ঠুরভাবে তোমাকে শেখায় যে তুমি একটি নিষিদ্ধ খেলা খেলছিলে । ঘৃণ্য প্রকৃতি, আগের সন্ধ্যার ঔজ্বল্য থেকে বের করে আনা, কোনো উৎসবের মনমরা অবশেষের মতন দেখায় । ইচ্ছাশক্তি, কার্যক্ষমতায় যেটি সবচেয়ে মহার্ঘ, সবার আগে আক্রান্ত হয় । লোকে বলে, এবং সেকথা সত্যি, যে এই মাদক কোনো শারীরিক অসুখ ঘটায় না ; কিংবা অন্তত ভয়ানক কোনো অসুখ ; কিন্তু কেউ কি জোর দিয়ে বলতে পারে যে একজন লোক যে কোনো কাজ করতে অক্ষম এবং কেবল স্বপ্ন দেখার জন্য কর্মক্ষম, সত্যিই সুস্বাস্হ্যে রয়েছে, এমনকি দেহের প্রতিটি অঙ্গ ঠিকঠাক কাজ করলেও ? এখন আমরা মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে ভালো করে জানি যে একজন লোক যে এক চামচ মেঠাই খেয়ে নিজের জন্য স্বর্গের ও জগতের তাবৎ ঐশ্বর্য সংগ্রহ করতে পারে সে কখনও তার হাজার ভাগের এক ভাগও তা পাবার জন্য কাজ করেও পাবে না । তুমি কি এমন এক রাষ্ট্রের কল্পনা করতে পারো যার প্রতিটি নাগরিক চরসখোর ? কেমনতর নাগরিক ! কেমনতর যোদ্ধা ! এমনকি প্রাচ্যদেশেও, যেখানে এর ব্যবহার দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানকার সরকাররা একে নিষিদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবেছে । মানুষের ব্যবহারের জন্য নিষিদ্ধ, বৌদ্ধিক ক্ষয় ও মৃত্যুর শাস্তির আশঙ্কায়, যা মানুষের অস্তিত্বের প্রাথমিক অবস্হাকে বিপর্যস্ত করে, আর যে পরিবেশে সে ঘুরে বেড়ায় এগুলো তার গুণের ভারসাম্যকে নষ্ট করে ফ্যালে ; এক কথায়, নিজের নিয়তিকে ছাপিয়ে যাবার জন্য, নতুন ধরনের এক সর্বনাশকে তার জায়গায় আনার জন্য । মনে করো মেলমথের কথা, ( আরও দেড়শো বছর বাঁচার জন্য মেলমথ নিজের আত্মা শয়তানকে বিক্রি করে দিয়েছিল ) সেই অসাধরণ কাহিনি । তার অতিশয় বেদনাদায়ক যন্ত্রণার কারণ ছিল তার অসাধারণ দক্ষতা, যা সে শয়তানের সঙ্গে আড়ম্বরহীন চুক্তি করে পেয়েছিল এবং তার পরিবেশের ভিন্নতায়, ঈশ্বরসৃষ্ট প্রাণী হিসাবে, বেঁচে থাকতে বাধ্য থাকার চুক্তির ফলে অভিশপ্ত । এবং যাকেই সে অনুরোধ করতো তার কাছ থেকেশয়তানের চুক্তি কিনে নেবার জন্য, সেই একই ভয়ঙ্কর শর্তে, তারা কেউই রাজি হতো না । প্রসঙ্গত, প্রতিটি মানুষ, যে জীবনের অবস্হাকে স্বীকৃতি দিতে চায় না সে নিজের আত্মাকে বিক্রি করে । রূপকটা বুঝতে পারা যায়  কবিদের শয়তানি সৃষ্টি এবং সেই মাদকের কাছে আত্মসমর্পিত জীবন্ত প্রাণীগুলোর উদ্দীপনার পার্থক্যে । মানুষ ঈশ্বর হতে চেয়েছে, এবং তা দ্রুত ? — তবে সে এইখানে, এক অমোঘ নৈতিক আইনের দ্বারা, তার স্বাভাবিক অবস্হার তলায় অধঃপতিত ! সে এমনই এক আত্মা যে নিজেকে টুকরো টুকরো করে বিক্রি করে ।

 

বালজাক নিঃসন্দেহে ভেবেছিলেন যে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে পরিত্যাগ করার চেয়ে মানুষের আর কোনো বড়ো লজ্জার ব্যাপার হতে পারে না, কোনো বড়ো যন্ত্রণা হতে পারে না । আমি ওনাকে একবার এক বৈঠকখানায় দেখেছিলুম, যেখানে অনেকে হ্যাশিসের বিস্ময়কর প্রভাবের কথা আলোচনা করছিল।  উনি শুনছিলেন এবং মজাদার আগ্রহে ও উৎফুল্ল হয়ে প্রশ্ন করছিলেন । যারা ওনাকে জানতো হয়তো অনুমান করে থাকবে যে বিষয়টা সম্পর্কে উনি আগ্রহী, কিন্তু ‘নিজের উপস্হিতিতেও নিজেকে নিয়ে চিন্তা করার ধারণা’ ওনাকে ভীষণ বিপর্যস্ত করেছিল। কেউ ওনাকে ‘দাওয়ামেস্ক’ সেবন করার জনভ দিয়েছিল । উনি তা নিরীক্ষণ করলেন, শুঁকলেন, এবং বিনা ছুঁয়ে ফেরত দিলেন । ওনার প্রায় শিশুসুলভ কৌতূহল এবং ওনার নিজেকে আত্মসমর্পণ করার ঘেন্না চোখেমুখে অদ্ভুতভাবে ফুটে উঠেছিল । আত্মসন্মানের পপতি তাঁর ভালোবাসা দিনটাকে উৎরে দিয়েছিল । এ ব্যাপারটা কল্পনা করা কঠিন যে যিনি ইচ্ছাশক্তির তত্ব তৈরি করেছিলেন, লুই ল্যামবার্টের পারমার্থিক যমজ, এই দামি মাদকের একটা কণা দিতে রাজি হলেন । মানুষের সেবায় ইথার এবং ক্লোরোফর্ম প্রশংসনীয় কাজ করে থাকলেও, আদর্শবাদী দর্শনের দিক থেকে আমার মনে হয়, সেই একই নৈতিক বদনাম দেয়া হয় প্রতিটি আধুনিক আবিষ্কারকে, যেগুলো মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে ও দেহের যন্ত্রণাকে কম করে । আমি একবার বিশেষ আগ্রহে একজন অফিসারের কাছে ফরাসি সেনাধ্যক্ষ এল-আঘুতের শল্য চিকিৎসায় কূটাভাসের কধা শুনেছিলুম, যে তাঁকে ক্লোরোফর্ম দেয়া সত্বেও তিনি মারা গেলেন । এই সেনাধ্যক্ষ ছিলেন অত্যন্ত সাহসী মানুষ, এমনকি তার থেকেও বেশি: সেই রকম এক আত্মা যাঁর ক্ষেত্রে লোকে স্বাভাবিকভাবে ‘বিক্রমশালী’ শব্দটা ব্যবহার করে । অফিসার আমাকে বলেছিলেন যে, ওনার ক্লোরোফর্মের প্রয়োজন ছিল না, প্রয়োজন ছিল সমগ্র সেনাবাহিনীর দৃষ্টি এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গীত । তা হয়তো তাঁকে বাঁচাতে পারতো ।অফিসারের সঙ্গে শল্যচিকিৎসক একমত হননি, কিন্তু সেনাবাহিনীর যাজক এই ধরণের অনুভূতিতে নিঃসন্দেহে আপ্লুত হতেন ।

 

ব্যাপারটা নিশ্চয়ই অনাবশ্যক, এই সমস্ত বিবেচনার পর, হ্যাশিসের নৈতিক বৈশিষ্ট্যের ওপর জোর দেয়া জরুরি । তুলনা করা যাক আত্মহত্যার সঙ্গে, মন্হর আত্মহত্যা আর  সদাসর্বদা রক্ত বইয়ে দেওয়া কোনো অস্ত্রের সঙ্গে, সবসময়ে ধারালো, এবং কোনো যুক্তিপূর্ণ মানুষ তাতে আপত্তি করবে না । এবার একে তুলনা করা যাক ডাকিনিবিদ্যা কিংবা ম্যাজিকের সঙ্গে, যা বস্তুর ওপরে গোপন রহস্যের মাধ্যমে সক্রিয় ( যা অসাধুতার চেয়ে নিশ্চিত ফলদানের ক্ষমতাকে হেয় করে না )  এবং এক প্রভূত্বকে জয় করতে চায় যা মানুষের কাছে নিষিদ্ধ অথবা কেবল সেই লোকগুলোকে অনুমতি দেয়া যায় যারা এর যোগ্য, আর কোনো দার্শনিক মন এই তুলনাকে দোষ দেবে না । গির্জা যদি ম্যাজিক আর ডাকিনিবিদ্যাকে নিন্দা করে তা এই জন্য যে এরা ঈশ্বরের অভিলাষে বাগড়া দ্যায় ; এরা সময় বাঁচায় এবং নৈতিকতাকে অনাবশ্যক প্রতিপন্ন করে, এবং গির্জা একনিষ্ঠৈ শুভচিন্তার মাধ্যমে পাওয়া ঐশ্বর্যকে কেবল বৈধ ও সত্য বলে মনে করে । যে জুয়াড়ি জেতার উপায় খুঁজে পেয়েছে তাকে আমরা ঠকাই ; আমরা কেমন করে সেই লোকটার বর্ণনা করব যে মাত্র কিছু পয়সা নিয়ে আনন্দ ও প্রতিভা কিনতে চায় ? উপায়ের আপ্ততা নিজেই অনৈতিকতা সৃষ্টি করে ; ম্যাজিকের অনুমিত আপ্ততা তাকে শয়তানির কালিমালিপ্ত করে ; আমি কি যোগ করব যে হ্যাশিস, একক আনন্দগুলোর মতন, ব্যক্তিকে তার সহযোগিদের কাছে এবং সমাজের কাছে ফালতু করে তোলে, তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় অবিরাম আত্ম-প্রশংসায়, এবং দিনের পর দিন তাকে টেনে নিয়ে যায় এক আলোকময় রসাতলে যেখানে সে নিজের নার্সিসাস মুখাবয়ব দেখে আহ্লাদিত হয় ? কিন্তু তবু তার সন্মান, তার সৎপ্রবৃত্তি, আর তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির দামের বিনিময়ে মানুষ কি হ্যাশিস থেকে পেয়েছে আত্মিক কল্যাণ ; হতে পেরেছে একধরণের চিন্তাযন্ত্র, এক উর্বর সাধিত্র ? এই প্রশ্ন আমি অনেককে করতে শুনেছি, আর আমি উত্তর দিয়েছি  : প্রথমত, যেমন বিস্তারিত আলোচনা করেছি, হ্যাশিস মানুষের কাছে তাকে ছাড়া আর কিছুই মেলে ধরে না । একথা সত্যি যে এই ব্যক্তি ঘণাঙ্কিত হয়, আর যদি তার সীমা পর্যন্ত তাকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হয়, এবং এও সমানভাবে নিশ্চিত যে হইহুল্লোড় সত্তেও স্মৃতিতে ঘটনাগুলো থেকে যায়, এই উপযোগবাদীদের আশায় প্রথম দৃষ্টিতে যা দেখা মেলে তা একেবারে অযৌক্তিক নয় । কিন্তু আমি তাদের লক্ষ করতে অনুরোধ করব যে, যে ভাবনাচিন্তা থেকে তারা দারুন সুফল চাইছে তা তেমন সুন্দর নয় যেমনটা তারা ম্যাজিকের রাংতায় মোড়া সাময়িক রূপান্তরণে দেখতে পাচ্ছে । তা স্বর্গের নয়, পৃথিবীর ব্যাপার, আর স্নায়ুর উত্তেজনা থেকে আহরণ করছে সৌন্দর্য। ফলত এই আশা একটি দুষ্টচক্র । কিছু সময়ের জন্য না-হয় মেনে নেওয়া যাক যে হ্যাশিস সৃষ্টি করে, অন্তত বাড়িয়ে দ্যায় প্রতিভাশক্তি ; তারা ভুলে যায় যে হ্যাশিসের বৈশিষ্ট্যেই রয়েছে ইচ্ছাশক্তিকে হ্রাস করার ক্ষমতা, অর্থাৎ তা এক হাতে দ্যায় এবং আরেক হাতে নেয় ; একথা বলার মানে হলো, কল্পনা গড়ে ওঠে অথচ তা থেকে লাভ করার মতো কর্মশক্তি থাকে না । সব শেষে, মনে রাখা দরকার, একজন লোক হয়তো এই উভয়সঙ্কট এড়াবার মতো যথেষ্ট ধুরন্ধর ও তেজস্বী, কিন্তু আরেকটা বিপদ আছে, মারাত্মক এবং ভয়ঙ্কর, যা প্রতিটি অভ্যাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য । বেশ তাড়াতাড়ি এগুলো অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়ায় । চিন্তা করার জন্য যে লোকটাকে বিষের আশ্রয় নিতে হয় সে দ্রুত বিষ ছাড়া আর চিন্তা করতে পারবে না। সেই ভীতকর লোকটার কথা ভেবে দ্যাখো যার পক্ষাঘাতগ্রস্ত কল্পনা হ্যাশিস কিংবা আফিম ছাড়া আর কাজ করবে না ! দার্শনিক স্হিতিতে মানুষের মন, নক্ষত্রদের যাত্রাপথকে নকল করার জন্য, একটি অর্ধবৃত্তকে অনুসরণ করতে বাধ্য যা বেঁকে ফিরে আসে তার প্রস্হানবিন্দুতে, যখন বৃত্তটি সম্পূর্ণ হবে । শুরুতে আমি এই চমৎকার স্হিতির কথা বলেছি যার মধ্যে মানুষের আত্মা অনেক সময়ে তাকে ছুঁড়ে-ফেলা অবস্হায় আবিষ্কার করে, যেন তা বিশেষ অনুগ্রহ । আমি বলেছি যে অবিরাম নিজের আকাঙ্খাকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াসে এবং নিজেকে অনন্তের দিকে তুলে নিয়ে যাবার চেষ্টায়, সে দেখায় ( প্রতিটি দেশে এবং প্রতিটি সময়ে ) সব রকমের মাদক সম্পর্কে প্রমত্ত ক্ষুধা, এমনকি যেগুলো বিপজ্জনক সেগুলোও, যা তার ব্যক্তিত্বকে উন্নীত করে, মুহূর্তের মধ্যে তার চোখের সামনে বিনিময়ের স্বর্গোদ্যান নিয়ে আসে, তার যাবতীয় আকাঙ্খার উদ্দেশ্য ; এবং সব শেষে তার বেপরোয়া আত্মা, না জেনেই রথ চালিয়ে নিয়ে যায় নরকের দরোজা দিয়ে, এই তথ্যই সাক্ষী হয়ে থাকে তার প্রাথমিক গরিমার । কিন্তু মানুষ তো তেমন ঈশ্বর-ত্যাজ্য নয়, সরাসরি স্বর্গে পৌঁছোবার উপায় থেকে প্রতিভাশূন্য, যে তাকে ম্যাজিক আর ডাকিনিবিদ্যার আশ্রয় নিতে হবে । হুর আলাইনের ( আরব স্বর্গের হুরিপরি) বন্ধুত্ব  এবং নেশার আদর কেনার জন্য নিজের আত্মা বিক্রি করার প্রয়োজন তার নেই । শাশ্বত উত্তরণের জন্য দাম দিয়ে যে স্বর্গোদ্যান পাওয়া যাবে সেটা কী? আমি একজন মানুষের কল্পনা করি ( আমি কি বলব সে একজন ব্রাহ্মণ, একজন কবি, কিংবা একজন খ্রিস্টধর্মী দার্শনিক ?) আধ্যাত্মিকতার অলিমপাসের চূড়ায় বসে আছেন; তাঁর চারিপাশে রাফায়েল কিংবা মাতেঙ্গার মিউজদেবীরা, তার দীর্ঘকালের উপবাস এবং আন্তরিক প্রার্থনার দরুণ সান্ত্বনা দিতে, অভিজাত নৃত্য রচনা করতে, কোমল চাউনি মেলে ও ঝিকমিকে হাসিতে তাকে দেখতে ; দৈবিক অ্যাপোলো, যাবতীয় জ্ঞানের শিক্ষক ( ফ্রাঙ্কাভিলা, আলবের্ত দুয়েরার, গোল্তজিয়াস, কিংবা অন্য কারোর — তাতে কিই বা আসে-যায় ? প্রতিটি মানুষের জন্য কি একজন অ্যাপোলো নেই, যে মানুষ তার যোগ্য ?), সবচেয়ে সুবেদী তারগুলোকে আদর করছেন তাঁর ধনুক দিয়ে ; তাঁর নীচে, পাহাড়ের পাদদেশে, কাদায় আর কাঁটাঝোপে, মানুষের কলরোল ; হেলট গোষ্ঠী উপভোগের মুখবিকৃতি নকল করে আর চিৎকার করে যার হুল তার বুক থেকে বিষ টেনে বের করে ; এবং কবি, দুঃখে কাতর, নিজেকে বলেন : “এই অভাগা লোকগুলো, যারা উপোস করেনি আর প্রার্থনাও করেনি, যারা খাটুনির মাধ্যমে উত্তরণ প্রত্যাখ্যান করেছে, ডাকিনিবিদ্যার আশ্রয় নিয়ে এক ধাক্কায় উঠে যেতে চেয়েছে তুরীয় জীবনে । তাদের ম্যাজিক তাদের ঠকায়, তাদের মধ্যে জাগায় নকল আনন্দ, নকল আলো ; যখন কিনা আমাদের কবিদের ও দার্শনিকদের ক্ষেত্রে, আমরা আমাদের আত্মাকে অবিরাম খাটাখাটুনি করে এবং মনোনিবেশের মাধ্যমে আবার জন্ম দিয়েছি; ইচ্ছাশক্তির অক্লান্ত প্রয়োগে এবং আকাঙ্খার দ্বিধাহিন গরিমায় আমরা আমাদের জন্য সৃষ্টি করেছি সত্যের বাগান, যা সৌন্দর্য ; সৌন্দর্য যা সত্য । বিশ্বাস পাহাড় সরাতে পারে এই বাক্যে আত্মবিশ্বাসী, আমরা কেবল সেই অলৌকিকতা অর্জন করেছি যা প্রতিপাদন করার জন্য ঈশ্বর আমাদের অনুজ্ঞাপত্র দিয়েছেন ।”

 

( ১৮৬০ সালে প্রকাশিত Les Paradis artificiels -এর অংশ । সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের জন্ম হয়েছিল এই রচনাটি প্রকাশের পাঁচ বছর পরে । )

 

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

জাঁ জেনে : চোরের জার্নাল

জাঁ জেনে : চোরের জার্নাল 

অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

যারা জেল খাটে তাদের পোশাক গোলাপি আর শাদা ডোরাকাটা । যদিও আমার হৃদয়ের ওসকানিতে আমি সেই জগৎ বেছে নিয়েছি যেখানে আহ্লাদিত হই, আমি অন্তত সেখানে সেই সমস্ত মর্মার্থের ইশারা খুঁজে পাবার ক্ষমতা রাখি, যা আমি জানতে চাই : ফুল আর দণ্ডিতদের মাঝে একটা কাছাকাছি সম্পর্ক আছে । প্রথমটার যেমন অপলকাভাব আর সূক্ষ্মতা, তেমনই প্রকৃতির, যেমন দ্বিতীয়টার নির্দয় সংবেদনহীনতা । যদি আমাকে একজন দণ্ডিতের — কিংবা অপরাধীর বর্ণনা করতে হয় — আমি তাকে ফুলে এমনভাবে সাজাবো যে সে তার তলায় চাপা পড়ে যাবে, সে নিজেই ফুল হয়ে উঠবে, বিশাল আর নতুন ফুল । যাকে আমি পাপ বলে জানি তার জন্য, আমি আরামে এক অভিযানে বেরোলুম যা আমাকে কারাগারে পৌঁছে দিলো । যদিও তারা সব সময়ে সুপুরুষ নয়, যে মানুষেরা পাপে পর্যবসিত,  তাদের পৌরুষের প্রচুর সততা থাকে । তারা নিজে থেকেই, কিংবা কোনও অঘটনের কারণে, যা তাদের জন্য বাছাই করা হয়েছে, তারা বিনা নালিশে কলঙ্কের, ঘৃণ্য ঘটনায় ঝাঁপিয়ে পড়ে, যেমন প্রেমে, যদি তা গভীর হয়, মানুষকে তার মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দ্যায় । যৌনতার খেলা এক নামহীন জগতকে ফাঁস করে, যা প্রেমিকদের রাতের ভাষায় প্রকাশিত হয় । সেই ভাষাকে লিখে রাখা যায় না । তা রাতের বেলায় কানে-কানে কর্কশস্বরে ফিসফিস করে বলা হয় । ভোর বেলায় তা লোকে ভুলে যায় । তোমাদের জগতের সদগুণকে প্রত্যাখ্যান করে, অপরাধীরা এক নিষিদ্ধ ব্রহ্মাণ্ডকে আশাহীনভাবে সঙ্গঠিত করার জন্য একমত হয় । তারা তার ভেতরে বসবাস করার জন্য আত্মসমর্পণ করে । সেখানকার হাওয়ায় বমি পায় : তারা তবু সেখানে শ্বাস নিতে পারে । কিন্তু — অপরাধীরা তোমার ধরাছোঁয়ার বাইরে– যেমন ভালোবাসায়, তারা পেছন ফেরে আর আমাকেও জগতসংসার আর তার আইনকানুন থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে বাধ্য করে । তাদের ঘাম, বীর্য, আর রক্তের গন্ধ । সংক্ষেপে, আমার দেহকে আর আমার তৃষ্ণার্ত আত্মাকে তা একনিষ্ঠতা উপহার দ্যায় । তাদের জগতের এই যৌনতার দরুন আমি অশুভের প্রতি আকৃষ্ট হই । আমার দুঃসাহসিক অভিযান, কখনও দ্রোহ বা অবিচারের অনু্ভূতির দ্বারা প্ররোচিত হয়নি, তা যেন এক দীর্ঘ সময়ের সঙ্গম, দুঃসহ, অদ্ভুত, যৌন উৎসব ছিল ( কাল্পনিক উৎসব যা কারাগারে নিয়ে যায় আর যাকে আগাম অনুমান করা যায় ) । যদিও তা অনুমোদিত, আমার দৃষ্টিতে তার ন্যায্যতা প্রতিপাদনও, জঘন্য অপরাধের, তা হবে অত্যন্ত অবক্ষয়ের নিদর্শন ।    সেই চরম বিন্দু যেখানে পুরুষদের জুগুপ্সাকে নিয়ে যায়, তাকে আমার মনে হতো বিশুদ্ধতার আদর্শ জায়গা, অর্থাৎ, সবচেয়ে ঘোলা প্রেমাত্মক সাদৃশ্য,  যেখানে উদযাপিত হয় মেকি বিয়ে ।    তাকে সুরে বাঁধবার ইচ্ছায়, আমি ব্যবহার করি স্বাভাবিক সংবেদনের আঙ্গিকে আমাকে দেয়া উপহার, যা দণ্ডিতের চেহারায় আগে থেকেই উত্তেজিত করে তোলে । ব্যাপারটা জাগিয়ে তোলে, তার রঙে আর তার বন্ধুরতায়, এক ধরণের ফুল যার পাপড়িগুলো কিছুটা কোঁকড়া, যার বর্ণনা আমার পক্ষে যথেষ্ট, শক্তিমত্তার ধারণাকে লজ্জার জুড়িদার করা ; লজ্জা যা কিনা প্রাকৃতিক স্তরে অত্যন্ত অপলকা আর মহার্ঘ । এই অনুষঙ্গ, যা আমাকে আমার সম্পর্কে অনেক কথা বলে, তা নিজের সম্পর্কে অন্য কোনো মনের কথা প্রস্তাব করবে না, আমার মন তা এড়াতে পারে না । এইভাবে আমি আমার কোমলতা দণ্ডিতদের উপহার দিয়েছি ; আমি তাদের মনোরম নামে ডাকতে চেয়েছি, তাদের অপরাধকে অভিহিত করতে চেয়েছি, শালীনতার কারণে, সূক্ষ্ম রূপকে ( যার আড়ালে আমি জানতে পারতুম না খুনির বৈভবী পৌরুষ, তার লিঙ্গের হিংস্রতা ) । এই ছবির মাধ্যমে আমি কি তাদের গিয়ানার পেনাল কলোনিতে কল্পনা করতে পারিনা : সবচেয়ে পালোয়ান, মাথায় শিঙ, সবচেয়ে কঠিন, মশারির ঢাকনার আড়ালে ? আর আমার ভেতরের প্রতিটি ফুল এমন এক বিষাদ ছড়ায় যে তার সবই দুঃখ আর মৃত্যুর নিদর্শন । এইভাবে আমি ভালোবাসা চাইলুম,  যেন তা বন্দিশিবিরের ব্যাপার । আমার প্রতিটি কামেচ্ছা আমাকে তার আশায় আকৃষ্ট করলো, তার একটা আভাস আমায় দিলো, আমাকে অপরাধীদের উপহার দিলো, তাদের কাছে আমাকে উপহার দিলো কিংবা আমাকে অপরাধ করার জন্য অনুপ্রাণিত করলো । যখন আমি এই বইটা লিখছি, শেষ অপরাধীরা ফ্রান্সে ফিরছে । সংবাদপত্রে সেই খবর প্রকাশিত হচ্ছে । রাজার উত্তরাধিকারীরা এক শূন্যতায় ভোগে যদি তাকে অভিষেক থেকে প্রজাতন্ত্র বঞ্চিত করে । বন্দিশিবিরের সমাপ্তি আমাদের জীবন্ত মননকে পৌরাণিক অতল জগতে উত্তীর্ণ হওয়ায় বাধা দ্যায় । আমাদের সবচেয়ে নাটকীয় আন্দোলনকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে । আমাদের অভিনিষ্ক্রমণ, নৈপূণ্য, সমুদ্রের পথে মিছিল, মাথা নত করে ক্রিয়ান্বিত হয়েছিল । ফিরে যাওয়া, সেই একই মিছিলের প্রত্যাবর্তন, তা অর্থহীন হয়ে গেছে । আমার অন্তরজগতে, বন্দিশিবিরের ধ্বংস হয়ে দাঁড়িয়েছে শাস্তির শাস্তি : আমাকে খোজা করা হয়েছে, আমি আমার কলঙ্ক থেকে কর্তিত । আমাদের স্বপ্নকে তাদের গৌরব থেকে মুণ্ডহীন করার ব্যাপারে উদাসীন, ওরা আমাদের আগেই ঘুম ভাঙিয়ে দ্যায় । পেনাল কলোনির তুলনায় দেশের কারাগারগুলোর নিজেদের ক্ষমতা থাকে : পেনাল কলোনির মতো তা  নয় । তা ছোটোখাটো । তাতে সেরকম সৌষ্ঠব, কিছুটা বিনীত মহিমা নেই । আবহাওয়া সেখানে এমন গুমোটভরা যে তোমায় নিজেকে হিঁচড়ে বেড়াতে হবে । তুমি হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াও । দেশের কারাগারগুলো বেশ উঁচু, আরও অন্ধকার আর কড়া মেজাজের ; পেনাল কলোনির ধীর, বিষণ্ণ যন্ত্রণাবোধ ছিল চরম দুর্দশার নিখুঁতভাবে কুসুমিত হবার জায়গা । তাই এখন দেশের জেলগুলো, বজ্জাত পুরুষে ফেঁপে ওঠা, পোশাক কালচে, অনেকটা রক্তের মতন, যা কার্বনিক গ্যাস দিয়ে ভেজানো । ( আমি “কালচে” লিখেছি । দণ্ডিতদের পোশাক — যারা ধরা পড়েছে, বিচারাধীন, এমনকি জেলবন্দিরাও, আমাদের নামকরণের জন্য যে শব্দগুলো বেছে নিয়েছে তা বেশ অভিজাত — আমার ওপরে শব্দটা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে : পোশাকগুলো সাদাসিধে বাদামি রঙের ।) আমার হ্যাংলামি তাদের জন্য। আমি জানি পেনাল কলোনি হোক বা দেশের কারাগার, তা প্রায়ই ব্যঙ্গাত্মক অনুকরণের মতন হয়। আওয়াজ-করা ভারি কাঠের জুতোয়, শাস্তি-পাওয়া লোকগুলো সব সময়েই যেন ভার সামলাতে পারে না । মাল নিয়ে যাবার ঠেলাগাড়ির সামনে হঠাৎ বোকার মতন ভেঙে পড়ে । কোনো পাহারাদারের উপস্হিতিতে ওরা মাথা নামায়, আর হাতে ধরে থাকে খড়ের তৈরি রোদ থেকে মাথা বাঁচাবার বড়ো টুপি — যা কমবয়সীগুলো সাজিয়ে নেয় ( আমার তাই মনে হয়েছে ) পাহারাদারের অনুমতি-দেয়া চুরি করা গোলাপফুলে — কিংবা বাদামি কাপড়ের বেরেটুপি। ওরা হতভাগা, বিনয়ের অভিনয় করে । যদি তাদের মারধর করা হয়, তাদের মগজে কোনো ব্যাপার নিশ্চয়ই কঠিন আকার নেবে : যারা ভিতু, তারা গুটিসুটি কেটে পড়ে, ভয় পাওয়া, কেটে পড়া, এগুলো হলো — যখন সবচেয়ে কঠিন অবস্হায় রাখা হয়, বিশুদ্ধ ভয় আর কেটে পড়া– তাদের শক্ত করে তোলা হয় “সুসিক্ত” করার মাধ্যমে, যেমন নরম লোহাকে শক্ত করা হয় সুসিক্ত করা হয় । এসব সত্বেও তারা চাটুকারিতা বজায় রাখে । যদিও আমি বিকলাঙ্গ আর দুর্ঘটনাগ্রস্তদের দুরছাই করি না, যারা সুপুরুষ অপরাধী,  আমার নমনীয়তা তাদের আকর্ষণ করে ।

 

অপরাধ, আমি নিজেকে বললুম, পিলোরগে বা অ্যাঞ্জেল সান-এর মতন নিখুঁত সফলদের গড়ে তোলার আগে তাকে বহুকাল অপেক্ষা করতে হয় । তাদের সংহার করার আগে ( শব্দটা নিষ্ঠুর ) জরুরি হলো একযোগে কিছু ঘটনার সংশ্লেষ : তাদের মুখের সৌন্দর্য, তাদের দেহের শক্তি আর সৌষ্ঠব আর তার সঙ্গে যোগ করতে হবে অপরাধ সম্পর্কে তাদের প্রবৃত্তি, পরিস্হিতি যা অপরাধীকে গড়ে তোলে, অমন অদৃষ্ট বেছে নেবার নৈতিক প্রাণশক্তির ধারণক্ষমতা, আর সব শেষে, শাস্তি, তার নিষ্ঠুরতা, স্বকীয় বৈশিষ্ট্য যা একজন অপরাধীকে তাতে গৌরবান্বিত বোধ করার অধিকার দ্যায়, আর, এই সমস্ত কিছু ছাপিয়ে, অন্ধকারের এলাকাগুলো । নায়ক যদি রাতের সঙ্গে লড়াই করে জিতে যায়, তাহলে তার কাছে থেকে যায় বিজয়ের টুকরো-টাকরা ! সেই একই সংশয়, খোশমেজাজ পরিস্হিতির একই কেলাসন, একজন খাঁটি গোয়েন্দার সফলতাকে দিশানির্দেশ দ্যায় । আমি উভয়কেই সন্মান করি । কিন্তু আমি তাদের অপরাধকে ভালোবাসি, তার জন্য যে শাস্তি বরাদ্দ, “সেই পেনালটি” ( আমার মনে হয় না তারা এর আগাম আঁচ করেনি। তাদের একজন, প্রাক্তন মুষ্ঠিযোদ্ধা লেডো, হাসিমুখে তদন্তকারীদের জবাব দিয়েছিল : “আমার অপরাধগুলো ? সেগুলো করার আগে হয়তো আমি তা নিয়ে অনুতাপ করতুম” ) যাতে আমি তাদের সঙ্গে যেতে চাই , যাইই হয়ে যাক না কেন, আমার ভালোবাসা উপচে পড়বে।

 

এই জার্নালে আমি অন্য কারণগুলো লুকোতে চাই না, যা আমাকে চোর বানিয়েছে, সবচেয়ে সহজ কারণ হলো ক্ষুধা, যদিও দ্রোহ, তিক্ততা, ক্রোধ কিংবা তেমন ধরণের ভাবপ্রবণতা আমার বাদবিচারে ঢোকেনি । গোঁড়ামিভরা যত্নে, “ঈর্ষান্বিত যত্নে”, আমি আমার দুঃসাহসিক অভিজানের খাতিরে নিজেকে গড়ে তুললুম, যেমনভাবে কেউ তার বিছানা বা ঘরকে ভালোবাসাবাসির আগে সাজায় ; অপরাধ করার  জন্য আমি ছিলুম গরম । আমার উত্তেজনা হলো এক থেকে আরেক জনের মাঝে দোল খাওয়া । তাকে বাতিল করে আমার যে কতো বড়ো ক্ষতি হয়েছে তা আমি গোপনে আবার কল্পনা করি, নিজের অন্তরে আর কেবল একা নিজের জন্য, গিয়ানার পেনাল কলোনির চেয়েও পঙ্কিল এক পেনাল কলোনি। আমি বলব যে দেশের কারাগারগুলোকে বলা চলে “ছায়াময়”। পেনাল কলোনিতে রয়েছে চড়া রোদে। সেখানে সবকিছু ঘটে নিষ্ঠুর আলোতে,  যাকে আমি প্রাঞ্জলতার নিদর্শন হিসাবে বেছে নেয়া ছাড়া আর কিছু বলতে পারব না ।

 

আমি সেই সাহসকে হিংস্রতার নাম দেবো,  যা অলস হয়ে অপেক্ষা করছে আর বিপদের অঙ্কশায়ী । তা দেখা যেতে পারে এক চাউনিতে, হাঁটাচলায়, এক হাসিতে, আর তোমার মধ্যেই যা আছে তা ফলত মুচড়ে ওঠে । তা তোমাকে কাবু করে ফ্যালে । হিংস্রতা হলো এক প্রশান্তি যা তোমাকে বিপর্যস্ত করে । বলাবলি করা হয় : “লোকটার আভিজাত্য আছে !” পিলোরগের অপলকা বৈশিষ্ট্য ছিল উদ্দাম হিংস্রতার । স্তিলিতানোর একটি মাত্র হাতের হিংস্রতার অভিসন্ধি, স্রেফ টেবিলের ওপরে রাখা, স্হির, নীরবতাকে বিঘ্নিত করেছে আর তা বেশ বিপজ্জনক । আমি চোরেদের আর কুটনিদের সঙ্গে কাজ করেছি, যাদের কর্তৃত্ব আমাকে তাদের ইচ্ছের কাছে ঝুঁকিয়েছে, কিন্তু কয়েকজনই সত্যিকারের সাহসী হিসাবে প্রমাণ করতে পেরেছে নিজেদের, তাদের মধ্যে যে জন সবচেয়ে বেশি সাহসী ছিল — গি — সে ছিল হিংস্রতাহীন । স্তিলিতানো, পিলোরগে আর মিশাই ছিল ভিতু । জাভাও তাই । এমনকি যখন বিশ্রাম নিচ্ছে, স্হির আর হাসিমুখ, তাদের চোখে, নাকের ফুটোতে, হাঁ-মুখে, হাতের তালুতে আর হাতে ধরা পড়তো, ফুলে ওঠা ঝুড়ি, সোয়েটার কিংবা ডেনিমের তলায় পেশির নিষ্ঠুর ঢিবি, এক উজ্বল আর নিরানন্দ ক্রোধ, দেখে মনে হতো আবছায়া।

কিন্তু, প্রায় সব সময়েই, ব্যাপারটাকে  চিহ্ণিত করার মতো কিছু নেই, স্বাভাবিক ইঙ্গিতের অনুপস্হিতি ছাড়া । রেনের মুখ প্রথম দর্শনে মনোরম । ওর নিচু বেঁকা নাক দেখে মনে হতো যেন চতুর দুর্বৃত্ত, যদিও ওর মুখের সীসার মতন ফ্যাকাশে উদ্বেগ তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলবে ।  ওর চোখদুটো ক্ষর, ওর ঘোরাফেরা শান্ত আর অসন্দিগ্ধ । স্নানের ঘরে ও ঠাণ্ডা মাথায় সমকামীদের পিটুনি দ্যায় ; তাদের পোশাক তল্লাসি করে, যা পায় কেড়ে নেয়, অনেক সময়ে, শেষ বার্তা হিসেবে, গোড়ালি দিয়ে পোঁদে লাথি মারে । আমি ওকে পছন্দ করি না, কিন্তু ওর ঠাণ্ডা মেজাজ আমাকে ওস্তাদি শেখায় । ও গভীর রাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে, পেচ্ছাপখানা, বাগান, ঝোপঝাড়, শঁজে লিজের গাছের তলায়, স্টেশনগুলোর কাছে, পোর মাইলোতে, বোয় দ্য বুলোনে ( সব সময়ে রাতের বেলায় ) এমন এক গাম্ভীর্য নিয়ে থাকে যা থেকে কল্পনাপ্রবণতা একেবারে বাদ । যখন ও ফেরে, ভোর দুটো বা তিনটের সময়ে, আমার মনে হয় আমি দুঃসাহসিক অভিযানে ফুলেফেঁপে উঠেছি । ওর দেহের প্রতিটি অঙ্গ, যা নিশাচরের, ওর কাজে অংশ নেয় : ওর হাত, ওর বাহু, ওর পা , ওর ঘাড়ের পেছন দিক । কিন্তু ও, এই সমস্ত বিস্ময় সম্পর্কে অনবহিত, আমাকে সেগুলো সম্পর্কে সোজাসুজি  বলে । পকেট থেকে বের করে আঙটি, বিয়ের আঙটি, ঘড়ি, সন্ধ্যাবেলাকার লুটের মাল। একটা বড়ো কাচের পাত্রে রাখে যা তখনই ভরে উঠবে । রাস্তায় পায়ুকামীদের বা তাদের কাজ কারবার দেখে ও অবাক হয় না, তা বরং ওর কাজকে সাহায্য করে । ও যখন আমার বিছানায় বসে, আমি উৎকর্ন হয়ে উঠি, ওর অভিযানের টুকরো টাকরা শোনার জন্য : জাঙিয়া পরা একজন অফিসার যার মানিব্যাগ ও চুরি করেছিল সে তার আঙুল তুলে চিৎকার করেছিল : “বেরিয়ে যাও !” রেনে ব্যাটা বিজ্ঞের উত্তর : “তুই কি মনে করিস তুই সৈন্যবাহিনীর কেউ ?” বুড়ো লোকের খুলিতে একখানা কড়া ঘুষি । সে লোকটা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল যখন রেনে, বেশ উত্তেজিত, দেরাজ খুলে একগাদা মরফিনের শিশি পেয়েছিল । অনেক গল্প, যেমন, যে সমকামীর পয়সাকড়ি ছিল না আর যাকে ও নিজের সামনে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেছিল । আমি এইসব ঘটনা শুনি বেশ একাগ্র হয়ে । আমার অ্যান্টওয়ের্পের জীবন মজার হয়ে ওঠে, ঋজু দেহের কাঠামোয়, আমার পুরুষালি ধরনধারন অনুযায়ী । আমি রেনেকে উৎসাহ দিই, আমি ওকে পরামর্শ দিই, ও আমার কথায় কান দ্যায় । আমি ওকে বলি যে নিজে প্রথমে কথা বলবে না । “লোকটাকে তোমার কাছে আসতে দাও, তাকে ঝুলিয়ে রাখো । অবাক হবার ভান করো, যখন সে বলবে, নাও করো। কার কাছে বোবা সাজতে হবে তা আঁচ করে নিও ।”

প্রতি রাতে আমি তথ্যের অংশবিশেষ যোগাড় করি । আমার কল্পনা তাতে হারিয়ে যায় না । আমার উত্তেজনার কারন আমি নিজের মধ্যে শিকার আর অপরাধী উভয়ের ভূমিকা খুঁজে পাই। সত্যি বলতে কি, আমি নিঃসরণ করি, রাতের বেলায় আমি আমার থেকে পয়দা হওয়া শিকার আর অপরাধীকে উদ্ভাবন করি ; আমি তাদের দুজনকে একই জায়গায় আনি, আর সকালের দিকে আমি জানতে পেরে উৎফুল্ল হই যে শিকার মৃত্যুদণ্ডের আদেশের মুখে পড়েছিল আর অপরাধীকে পাঠানো হচ্ছিল পেনাল কলোনিতে বা আরেকটু হলে গিলোটিনে চাপানো হচ্ছিল । এই ভাবে আমার উত্তেজনা আমার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, যা গিয়ানার পেনাল কলোনি ।

ওরা না চাইলেও, এই লোকগুলোর ভাবভঙ্গী আর নিয়তি ঝঞ্ঝাময় । তাদের আত্মা এমন হিংস্রতা সহ্য করে যা তারা চায়নি আর যাকে তারা মানিয়ে নিয়েছে । যাদের স্বভাবগত পরিবেশ হিংস্রতার, অথচ তারা নিজেদের কাছে সহজ-সরল । এই দ্রুত আর ধ্বংসাত্মক জীবনকে যে গতিবিধিগুলো গড়ে তোলে তা সরল আর সরাসরি, একজন নামকরা নকশাকারের আঁকা রেখার মতন পরিষ্কার — কিন্তু যখন রেখাগুলো চলন্ত অবস্হার মুখোমুখি হয়, তখনই ঝড় ওঠে, বিদ্যুতে তারা মারা পড়ে কিংবা আমি বিপদে পড়ি । তবু, তাদের হিংস্রতার সঙ্গে আমার হিংস্রতার কীই বা তুলনা, যার মানে তাদের হিংস্রতাকে মেনে নেয়া, তাকে আমার করে তোলা, তাকে আমার ইচ্ছে অনুযায়ী গড়ে নেয়া, তাকে থামিয়ে দেয়া, তাকে ব্যবহার করা, তাকে আমার ওপরে চাপিয়ে নেয়া, তাকে জানা, তাকে অনুমান করা, তার অনিষ্টপাতকে অনুধাবন আর উপলব্ধি করা ? কিন্তু যা আমার ছিল, আমার আত্মরক্ষার জন্য অভিলাষিত আর জরুরি, আমার বলিষ্ঠতা, আমার অনমনীয়তা, তাদের হিংস্রতার তুলনায়, যা তারা একটা অভিশাপের মতন পেয়েছে, যুগপৎ অন্তরজগতের আগুন আর বহির্জগতের আলো, যা তাদের পুড়িয়ে ছারখার করে আর আমাদের উদ্ভাসিত করে ? আমরা জানি যে তাদের অভিযানগুলো বালকসুলভ । তারা নিজেরা মূর্খ । তারা তাস খেলার হারজিত নিয়ে খুন করার জন্য বা খুন হবার জন্য তৈরি থাকে, যখন একজন প্রতিপক্ষ — কিংবা তারা নিজেরা — জোচ্চুরি করছিল । তা সত্বেও, অমন লোকেদের ধন্যবাদ, বিয়োগাত্মক ঘটনা সম্ভব হয় ।

এই ধরণের সংজ্ঞা — বহু পরস্পরবিরোধী উদাহরণ দিয়ে — হিংস্রতা সম্পর্কে তোমাকে অবহিত করছি।  আমি এমন শব্দ প্রয়োগ করব না কোনো ঘটনার নায়ককে তুলে ধরার খাতিরে, বরং তারা আমার সম্পর্কে কিছু  বলুক । আমাকে বুঝে ওঠার জন্য, কুকর্মে পাঠকের অংশগ্রহণ জরুরি । তবু আমি তাকে সতর্ক করে দেবো যখনই আমার ভাবোচ্ছাস আমার পদক্ষেপকে টলমলে করে তোলে ।

স্তিলিতানো ছিল দীর্ঘদেহী আর পালোয়ান । ওর চলনভঙ্গী ছিল একযোগে নমনীয় আর গোদা, প্রাণবন্ত আর ঢিমেতালে, সর্পিল ; লোকটা ছিল চটুল । আমার ওপরে ওর ক্ষমতার বেশির ভাগ — আর বারিও চিনোর বেশ্যাদের ওপর — কারণ হলো এক গাল থেকে আরেক গালে চালান করা ওর মুখের লালা, যা ও অনেকসময়ে হাঁ-মুখের সামনে আনতো পরদা টানার মতন । “কিন্তু কোথা থেকে এতো থুতু যোগাড় করে,” আমি নিজেকে জিগ্যেস করতুম, “কোথা থেকেই বা আনে? আমার তো কখনও ওর মতন তেলালো আর রঙিন হবে না । তা হবে পাকানো কাচের মতন মামুলি, স্বচ্ছ আর অপলকা ।” আমার পক্ষে কল্পনা করা স্বাভাবিক ছিল যে ওর লিঙ্গটা কেমন হবে যদি আমার সুবিধার জন্য তাতে অমন সুন্দর একটা জিনিস মাখায়, ওই দামি মাকড়সার তন্তু, এমন এক পাতলা-জাল যা আমি গোপনে প্রাসাদের আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করেছি । ও একটা পুরোনো ধূসর টুপি পরতো যার সামনে দিকটা ভাঙা । যখন ও সেটা আমাদের ঘরের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলতো, তা হঠাৎ হয়ে উঠতো যেন বেচারা কোনো ডানা কাটা মরা পায়রার মতন, কিন্তু যখন ও ওটা পরে নিতো, কান পর্যন্ত টেনে নামিয়ে, টুপির অন্য কিনারাটা ওপর দিকে উঠে যেতো আর দেখা যেতো ওর গৌরবান্বিত সোনালি চুল । ওর উজ্বল চোখের কথা যদি বলতে হয়, নম্রভাবে নামানো — তবু স্তিলিতানো সম্পর্কে বলতে হবে : “ওর হাবভাব অবিনয়ী” — যার ওপরে চোখ বন্ধ হয়ে আসতো আর চোখের পাতা এতো সোনালি, এতো উজ্বল আর ঘন, যে তা সন্ধ্যার ছায়া আনতো না বরং নিয়ে আসতো শয়তানের ছায়া। মোটের ওপর, কী মানে হয় যখন একটা দৃষ্টি আমাকে বন্দরের কাছে টলমলিয়ে দ্যায়, আমি দেখি জাহাজের পাল, একটু একটু করে, থেকে-থেকে, ছড়িয়ে পড়ে আর মাস্তুলের ওপর পর্যন্ত কষ্ট করে উঠে যায়, প্রথমে ইতস্তত, তারপর সুসংকল্পিত, যদি এই বিচলনগুলো স্তিলিতানোর প্রতি আমার প্রেমের বিচলনের প্রতীক না হয় তাছাড়া আর কীই বা হবে ? ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল বারসেলোনাতে । ও ভিখারি, চোর, পরী আর বেশ্যাদের জমঘটে বসবাস করছিল। ও ছোল সৌম্যকান্তি, কিন্তু এটা দেখার ছিল যে আমার অধঃপতনের সঙ্গে ওর সৌন্দর্যের কতোটা যোগাযোগ । আমার পোশাক ছিল নোংরা আর ছেঁড়া । আমি ছিলুম শীতে কাতর আর ক্ষুধার্ত। এই সময়টা ছিল আমার জীবনে সবচেয়ে দৈন্যপীড়িত ।

১৯৩২. স্পেন সে সময়ে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল ইঁদুর-ছুঁচোয়, তার ভিখারিতে । তারা গ্রাম থেকে গ্রামে যেতো, আন্দালুসিয়াতে কেননা জায়গাটা উষ্ণ, ক্যাটালোনিয়াতে কেননা জায়গাটা ধনী অধ্যুষিত, কিন্তু পুরো দেশটা ছিল আমাদের জন্য অনুকূল । ফলে আমি ছিলুম একটা উকুন আর সে ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিলুম । বারসেলোনাতে আমরা কালে মেদিওদিয়া আর কালে কারমেন-এ ঘুরে বেড়াতুম । অনেক সময়ে আমরা বিনা চাদরের বিছানায় ছয়জন শুতুম, আর সকালে উঠে বাজারে যেতুম ভিক্ষা করার জন্য । আমরা দল বেঁধে বারিও চিনো ছাড়তুম আর ছড়িয়ে পড়তুম প্যারালেলোতে, হাতে বাজারের সাজি নিয়ে, কেননা বাড়ির বউরা পয়সার বদলে একটা পেঁয়াজ বা শালগম দিতেন । দুপুরে আমরা ফিরতুম, আর কুড়িয়ে বাড়িয়ে পাওয়া সবজি দিয়ে সুপ বানাতুম । ইঁদুর-ছুঁচোর জীবনের কথাই বলব । বারসেলোনাতে আমি পুরুষদের জুটি দেখতে পেতুম যার দুজনে মধ্যে একজনের ভালোবাসা বেশি সে অন্যজনকে বলত:

“আজকে সকালের সাজিটা আমি নিয়ে যাবো।”

সে তুলে নিয়ে বেরিয়ে যেতো । একদিন সালভাদোর আমার হাত থেকে সাজিটা আলতো করে টেনে নিয়ে বলল, “আমি তোমার হয়ে ভিক্ষা চাইতে যাবো।”

বাইরে তুষার পড়ছিল । ও বরফজমা ঠাণ্ডা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল, ছেঁড়া আর ফর্দাফাঁই জ্যাকেট পরে — পকেটগুলো ছেঁড়া আর ঝুলন্ত — আর তেলচিটে ময়লায় অনমনীয় শার্ট । ওর মুখটা ছিল গরিব আর দুঃখি, ছলনাভরা, ফ্যাকাশে আর নোংরা, কেননা ঠাণ্ডার দরুন আমরা কখনও ধুতুম না । দুপুরবেলায়, ও সবজি নিয়ে ফিরলো আর কিছুটা চর্বি । এখানে আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করব এক ধরণের ক্ষতের দিকে — ভয়াবহ, কেননা বিপদ সত্বেও আমি উত্তেজিত করে দিতে পারতুম — যার মাধ্যমে আমার সামনে মেলে ধরা হতো সৌন্দর্য । আর তীব্র — ভাতৃসুলভ — ভালোবাসা আমার দেহকে তাতিয়ে তুললো আর টেনে নিয়ে গেলো সালভাদোরের কাছে । ওর পেছন পেছন হোটেল ছেড়ে, আমি ওকে দেখতুম একজন মহিলাকে মিনতি করছে । আমি ফরমুলাটা জানতুম, কেননা আমি নিজের জন্য আর অন্যের জন্য ভিক্ষা করেছি : এতে খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে হিতৈষিতা মিশ খায় ; ঈশ্বরের সঙ্গে গরিব লোকটাকে মেলায় ; ব্যাপারটা হৃদয় থেকে বেরোনো এমন এক নিরহঙ্কার যে আমার মনে হয় তা থেকে সরাসরি সুগন্ধের প্রকাশ ঘটে, ভিখারির হালকা শ্বাস যে তা উচ্চারণ করে । সারা স্পেন জুড়ে সে-সময়ে ওরা বলতো:

“ঈশ্বরের জন্য।”

ওর কথা শুনতে না পেলেও, আমি বুঝতে পারতুম যে প্রতিটি দোকানে, প্রতিটি গৃহবধূর কাছে এই কথাটাই ওগরাচ্ছা সালভাদোর । কোটনারা যেমন নিজেদের বেশ্যার দিকে নজর রাখে আমি ওর ওপর নজর রাখতুম, কিন্তু হৃদয়ে ওর জন্য কোমলতা পুষে ! এইভাবে, স্পেন আর আমার ভিখারির জীবন আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলো অপমানের মহিমার সঙ্গে, কেননা তার জন্য দরকার ছিল গর্ববোধ ( অর্থাৎ, ভালোবাসার ) ওই সমস্ত নোংরা, ঘৃণ্য প্রাণীদের সুশোভিত করার জন্য । দরকার ছিল কর্মদক্ষতার, যা আমি একটু-একটু করে হাসিল করলুম । যদিও তোমাকে এর কায়দা আমি ঠিকমতন বলতে পারবো না, অন্তত এটুকু বলতে পারি যে আস্তে আস্তে আমি নিজেকে বাধ্য করলুম এই দুস্হ জীবনকে স্বেচ্ছাকৃত প্রয়োজনীয়তা হিসাবে মেনে নিতে । ব্যাপারটা যা আমি ঠিক তাই মেনে নেওয়া ছাড়া আর কিছু ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করিনি, আমি একে উঁচুতে তুলিনি, মুখোশ পরাইনি, বরং উল্টোটা, আমি এর অপরিচ্ছন্নতাকে হুবহু সত্যাপন করতে চেয়েছি, আর সবচেয়ে নোংরা নিদর্শনগুলো আমার কাছে হয়ে উঠলো জাঁকজমকের নিদর্শন ।

এক সন্ধ্যায়, আমি আতঙ্কিত বোধ করলুম, যখন পুলিশের হানার পর আমার খানাতল্লাস করা হচ্ছিল — আমি সেই সময়ের কথা বলছি যা এই বইয়ের শুরুতে লেখা ঘটনাগুলোর আগের — অবাক গোয়েন্দা আমার পকেট থেকে টেনে বের করলো, অন্যান্য টুকিটাকির মধ্যে, ভেসলিনের একটা টিউব । আমরা এটা নিয়ে ঠাট্টা করতুম কেননা ভেসলিনটা ছিল মেনথল দেয়া । পুরো নথি দপতর, সেই সঙ্গে আমিও, যদিও কষ্ট করে, এইভাবে হাসিতে মুচড়ে উঠলুম :

“তুমি এটা নাকে শোঁকো ?”

“দ্যাখো, তোমায় আবার না সর্দিকাশিতে ধরে । তুমি তোমার জুড়িকে হুপিং কাফ দিয়ে ফেলবে।”

আমি ভাসা-ভাসা অনুবাদ করলুম, প্যারিসের একজন জোচ্চোরের ভাষায়, সুস্পষ্ট আর বিষাক্ত স্প্যানিশ প্রবাদের বিদ্বেষপরায়ন বিড়ম্বনাটুকু । ব্যাপারটা একটা ভেসলিন টিউবের যার পেছন দিকটা মোড়া ছিল । যার মানে দাঁড়ায় যে তা ব্যবহার করা হয়েছে । পুলিশ হানায় পুরুষদের পকেট থেকে যে সমস্ত চমৎকার টুকিটাকি বের করা হয়েছিল, এটা ছিল তার মধ্যে অপমানের নিখুঁত প্রতীক, যা বেশ সাবধানে লুকিয়ে রাখা হয়, তবু তা গোপন মহিমার চিহ্ণ, যা আমাকে পরে অবমাননা থেকে বাঁচিয়েছে । যখন আমাকে লকআপে পোরা হলো, আর আমি আমার তেজোময়তা ফিরে পেলুম যাতে গ্রেপ্তারির দুর্ভাগ্য কাটিয়ে উঠতে পারি, ভেসলিনের টিউবের ছবিটা আমাকে ছেড়ে যায়নি । পুলিশের লোকটা আমাকে ওটা বেশ ক্রুরভাবে দেখিয়েছিল, যাতে তারা তাদের প্রতিশোধস্পৃহায়, ঘৃণায়, অবমাননায় আহ্লাদে আটখানা হতে পারে । কিন্তু, দ্যাখো দ্যাখো ! সেই নোংরা, অপকৃষ্ট জিনিসটা যার উদ্দেশ্য দুনিয়ার কাছে মনে হয়েছিল — পৃথিবীর ওই প্রতিনিধি জমঘটের কাছে যা কিনা পুলিশের দল আর, তাছাড়া, ওই বিশেষ পুলিশের স্প্যানিশ দলটা, মুখে রসুনের দুর্গন্ধ, গায়ে ঘাম আর তেলের, কিন্তু দেখতে শাঁসালো, পেশি বেশ পালোয়ানি আর নিজেদের নৈতিক চালচলনে অটল — অত্যন্ত জঘণ্য, আমার কাছে হয়ে উঠলো বেশ মহার্ঘ । যেসব জিনিস আমার কোমলতাকে ফাঁস করে তাদের থেকে আলাদা, এই জিনিসটা মোটেই অলৌকিক মহিমাদীপ্ত ছিল না ; তা পড়ে রইলো টেবিলের ওপরে ভেসলিনের ধূসর টিউব হয়ে, ভাঙা আর বিবর্ণ, যার বিস্ময়কর বিচক্ষণতা, আর কারাগারের মহাফেজখানায় মামুলি জিনিসপত্রের সঙ্গে তার অত্যাবশ্যক সংগতি ( বেঞ্চ, কালির দোয়াত, নিয়মের বই, মাপার স্কেল, দুগন্ধ ), সাধারণ উদাসীনতার মাঝে, আমাকে মর্মপীড়িত করতে পারতো, যদি না টিউবের ভেতরের মাল আমাকে মনে করিয়ে দিতো একটা তেলের কুপির কথা ( হয়তো তার প্রাণবন্ত বৈশিষ্ট্যের জন্য ), রাতের বেলায় একটা কফিনের পাশে রাখা।

তা বর্ণনা করার জন্য, আমি আরেকবার একটা ছোটো লক্ষ্যবস্তু গড়ে তুলি, কিন্তু এই ছবিটা তাতে ঢুকে পড়ে : ল্যাম্পপোস্টের তলায়, যে শহরে বসে আমি লিখছি, একজন বুড়ির ম্লান মুখ, গোল, ছোটো, চাঁদের মতন, খুবই ফ্যাকাশে ; বলতে পারছি না আমি দুঃখ পেয়েছিলুম নাকি ভণ্ড সেজেছিলুম । বুড়ি এগিয়ে এলো আমার দিকে, বলল যে ও ভীষণ গরিব আর কিছু পয়সা চাইলো। ওই চাঁদামাছের মতন মুখের ভদ্রতা আমাকে তক্ষুনি বলল : বুড়িটা এখনই কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছে ।

“বুড়িটা চোর”, আমি নিজেকে বললুম । আমি যখন ওর কাছ থেকে চলে যাচ্ছি, এক ধরণের  তীব্র ভাবাবেশ, আমার অন্তরের গভীরে ঘুমিয়ে, আর তা আমার মনের কিনারায় নয়, আমাকে ভাবতে প্ররোচিত করল যে হয়তো বুড়িটা আমার মা যার সঙ্গে আমার এখন দেখা হলো । আমি তাঁর সম্পর্কে কিছুই জানি না যিনি আমাকে দোলনায় ফেলে চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু আশা করলুম যে রাতের বেলায় যে ভিক্ষা চাইছিল সেই বুড়িই আমার মা ।

“যদি তিনিই হতেন তাহলে কী হতো?” আমি বুড়ির থেকে দূরে যেতে যেতে ভাবতে লাগলুম । ওহ! যদি তাই হতো, আমি ওনাকে ফুলে ঢেকে দিতুম, গ্ল্যাডিওলি আর গোলাপে, আর চুমু দিয়ে ! ওই চাঁদ-মাছ চোখের ওপরে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে ফোঁপাতুম, ওই গোল, বোকা মুখের ওপরে ! “কিন্তু কেন”, আমার ভাবনা এগিয়ে চললো, “ কেনই বা তা নিয়ে কাঁদবো?” আবেগপ্রবণতার এই গতানুগতিক ছাপ আমার মগজ থেকে সরে যেতে বেশিক্ষণ লাগলো না, তার জায়গায় অন্য ব্যাপার এলো, সবচেয়ে নোংরা আর নিকৃষ্ট, যাকে আমি মর্মার্থের ক্ষমতা দিলুম চুমুর, কিংবা কান্নার কিংবা ফুলের ।

আমি ভাবলুম, “আমি ওনার কাঁধে মাথা রেখে আবোলতাবোল বলতে পারলে আনন্দিত হবো”, ভেসে যাবো ভালোবাসায় ( এক্ষুনি যে গ্ল্যাডিওলি ফুলের কথা বলেছি তা কি বাচ্চার লালার কথা মনে পড়ায় ? )। ওনার চুলেতে লালা ফেলবো কিংবা ওনার হাতে দুধ ওগরাবো । কিন্তি আমি সেই চোরকে আদর করতে চাইবো যা আমার মা ।

ভেসলিনের টিউব, যা আমার লিঙ্গকে তেলালো করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করি কিংবা আমার প্রেমিকদের লিঙ্গ, তাঁর মুখ মনে পড়িয়ে দিল যিনি, এক স্বপ্নবিহ্বলতার সময়ে যা শহরের অন্ধকার গলিতে ঘোরাফেরা করতো, তিনি ছিলেন মায়েদের মধ্যে সবচেয়ে অভীষ্ট । তা আমাকে আমার গোপন আনন্দগুলোর জন্যে গড়েপিটে তৈরি করেছিল, এমন সমস্ত জায়গায় যা অসম্বদ্ধ তুচ্ছতার, যা হয়ে উঠেছিল আমার খেয়ালখুশির শর্ত, এই যেমন আমার বীর্যের ছিটেফোঁটা লাগা রুমাল প্রমাণ করে । টেবিলের ওপরে শুয়ে, তা ছিল পুলিশের বিরুদ্ধে আমার ওড়ানো অদৃশ্য বিজয়কেতন । কারাগারের এক কুঠুরিতে । আমি জানতুম যে আমার ভেসলিনের টিউবটা সারারাত ধরে অপমানের মুখে পড়বে — চিরকালীন উপাসনার উলটো ব্যাপার — একদল সশক্ত, সৌম্যকান্তি, খসখসে কন্ঠে পুলিশের । এমনই তারা পালোয়ান যে তাদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল লোকটা সবকয়টা আঙুল মোচড়ায়, তা থেকে ফেটে বেরোবে, প্রথমে একটা ঠুসকি পাদ, ক্ষণিক আর পচা, গঁদের একটা ফিতে বেরিয়ে আসতে থাকবে হাস্যকর নৈঃশব্দে । যাই হোক, আমি জানতুম যে এই ছোটো আর বিনয়ী বস্তুটা ওদের বিরুদ্ধে নিজেই লড়ে যাবে ; তার সামান্য উপস্হিতি দিয়ে পৃথিবীর সমস্ত পুলিশকে বেশ চটিয়ে ফেলতে পারবে ; জিনিসটা নিজের দিকে টেনে আনবে অপমান, ঘৃণা, শাদা আর বোবা ক্রোধ । হয়তো জিনিসটা সামান্য বিদ্রুপ করবে– বিয়োগান্ত নায়কের মতন যে দেবতাদের চটিয়ে মজা পায় — তার মতনই অবিনাশী, আমার আনন্দে আত্মসমর্পিত, আর গর্বিত । আমি ফরাসি ভাষার নতুন শব্দে গান গাইতে চাইবো । কিন্তু আমি তার জন্য লড়তেও রাজি, তার সন্মানে সর্বসংহারের অনুষ্ঠান করতেও রাজি আর কোনো একটা গ্রামকে গোধুলীবেলায় লাল নিশান দিয়ে সাজিয়ে তুলতে চাইবো ।

কোনো নৈতিক কাজের সৌন্দর্য নির্ভর করে তার প্রকাশ করার মধ্যে । একথা বলা যে এই জিনিসটা সুন্দর তার মানে হলো যে তা সত্যিই সুন্দর । তাকে প্রমাণ করে দেখাতে হবে । এটা হলো ছবির করণীয় কাজ, অর্থাৎ, বাস্তব জগতের প্রভার সঙ্গে তার একাত্মতা । কাজটা সুন্দর হবে যদি তা প্ররোচিত করে, আর আমাদের কন্ঠে বিকশিত হয়, গান । অনেক সময়ে যে চেতনার সাহায্যে আমরা একটা বিখ্যাত কুকর্মের কথা ভেবেছি, প্রকাশ করার ক্ষমতার জন্য জরুরি তাকে জ্ঞাপন করা, আমাদের গান গাইতে বাধ্য করা । এর মানে হলো প্রতারণা ব্যাপারটা সুন্দর হবে যদি তা আমাদের দিয়ে গান গাওয়ায় । চোরদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে তা যে আমাকে আবার নৈতিক জগতে নিয়ে গিয়ে ফেলবে, তা নয়, আমি ভাবলুম, তার ফলে আমি আরেকবার নিজেকে সমকামীতার জগতে পাবো । আমার গায়ে যতো জোর বাড়ে, আমি আমার শুভ হয়ে উঠি । আমি হুকুম জারি করি। পুরুষদের ক্ষেত্রে সৌন্দর্য বলতে আমি বুঝি একটা মুখের আর শরীরের সমন্বয়পূর্ণ বৈশিষ্ট্য আর তার সঙ্গে অনেক সময়ে যোগ করতে হয় পুরুষালি চারুতা ।  সৌন্দর্যের সঙ্গে তখন যোগ হয় দুর্দান্ত সৌষ্ঠব, প্রবলপ্রতাপ আকার-ইঙ্গিত। আমরা মনে করি তারা নির্ধারিত হয় বিশেষ নৈতিক আচরণের মাধ্যমে, আর নিজেদের ভেতর তেমন সদগুণ চর্চা করে যা আমাদের শুকনো মুখ আর অসুস্হ শরীরকে সেই ওজস্বিতা দেবে যা প্রেমিকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে থাকে । হায়, এই সমস্ত সদগুণ, যা তাদের কখনও থাকে না, তা আমাদের দুর্বলতা ।

এই যে আমি লিখতে বসেছি, আমি আমার প্রেমিকদের নিয়ে ভাবি । আমি তাদের আমার ভেসলিন মাখিয়ে দিতে চাইবো, সেই মোলায়েম, মিহি মেনথলগন্ধ জিনিসটা ; আমি চাইবো তাদের পেশিগুলো স্নান করুক স্বচ্ছ হালকা জিনিসটায় যেটা ছাড়া সবচেয়ে সৌম্যকান্তির সাধনীটিও কম প্রণয়োদ্দীপক ।

যখন কোনো প্রত্যঙ্গ বাদ দেয়া হয়, বলা হয় যে অন্য অঙ্গটা তখন শক্তপোক্ত হয়ে বেড়ে ওঠে। আমি আশা করেছিলুম যে স্তিলিতানোকে যে হাতটা খোয়াতে হয়েছিল তার প্রাণক্ষমতা ওর লিঙ্গে একত্রিত হবে । অনেককাল যাবত আমি কল্পনা করেছি একজন সারবান সদস্যের, সোঁটার মতন, যা সবচেয়ে সাংঘাতিক অর্ন্তদৃষ্টির ক্ষমতা রাখে, অথচ যা আমাকে প্রথমে উৎসুক করলো তাহলো এই যে স্তিলিতানো আমাকে ব্যাপারটা জানতে দিলো : মামুলি ভাঁজের দাগ, যদিও আশ্চর্যজনকভাবে বাঁ পায়ে, ওর নীল ডেনিম ট্রাউজারে । এই ব্যাপারটা আমায় দুঃস্বপ্নে দেখা দিতো যদি না স্তিলিতানো উদ্ভট মুহূর্তগুলোয়, ওর হাত জায়গাটায় না রাখতো, আর যদি না ও, মহিলারা যেমন সৌজন্য দেখান, ভাঁজের দাগটা দেখিয়ে নখ দিয়ে কাপড়ের ওপর চিমটি কাটতো। আমার মনে হয় না ও কখনও আত্মাভিমান হারিয়েছে, কিন্তু আমার কাছে ও থাকতো বিশেষভাবে প্রশান্ত । নির্লজ্জের মতন হেসে, যদিও বেশ নিস্পৃহ, ওকে আমার আদর করার পানে চেয়ে থাকতো । আমি জানতুম ও আমাকে ভালোবাসবে ।

হাতে সাজি নিয়ে সালভাদোর, আমাদের হোটেলের চৌহদ্দি পেরোবার আগে, আমি এমন উত্তেজিত বোধ করছিলুম যে রাস্তাতেই ওকে চুমু খেলুম, কিন্তু ও আমাকে ঠেলে এক পাশে সরিয়ে দিলো :

“তোমার মাথা খারাপ ! লোকেরা ভাববে আমরা গাণ্ডু !”

ও ফরাসিভাষা ভালোই বলতে পারতো, পেরিপিয়াঁয় আঙুর ক্ষেতে কাজ করার সময়ে শিখেছিল। গভীর আঘাত পেয়ে আমি পেছন ফিরলুম । ওর মুখ বেগুনি হয়ে উঠলো। ওর গায়ের রঙ ছিল শীতের বাঁধাকপির মতন । সালভাদোর হাসলো না । ও মর্মাহত হয়েছে টের পেলুম । “আমি এরকম ব্যবহারই পাই”, ও নিশ্চয়ই ভেবেছিল, “সাতসকালে উঠে তুষারের মধ্যে ভিক্ষা করার বদলে। ও জানেই না কেমন আচরণ করতে হয়।” ওর চুল ভিজে গিয়েছিল আর জটপাকানো। জানালার ভেতর থেকে, মুখগুলো আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল, কেননা হোটেলের একতলায় একটা কাফে ছিল যা ফুটপাত পর্যন্ত প্রসারিত, যার মধ্যে দিয়ে যেতে হতো ওপরের ঘরে যাবার জন্য। আস্তিনে মুখ পুঁছে সালভাদোর ভেতরে চলে গেলো । আমি ইতস্তত করছিলুম । তারপর ওর পেছন পেছন ঢুকলুম । আমার তখন কুড়ি বছর বয়স । যদি নাকের ডগায় একটা ফোঁটা চোখের জলের মতন অনাবিল হয় তাহলে কেনই বা তা একই আগ্রহে চেটে নেবো না ? আমি আগে থেকেই যথেষ্ট জড়িয়ে পড়েছিলুম নীচকুলোদ্ভবদের পুনর্বাসনে । যদি না বেয়াড়া সালভাদোরের ভয়ের ব্যাপার হতো, আমি কাফেতেই ওকে চুমু খেতে পারতুম । ও, যদিও, নাকের জল ফেলছিল, আমি বুঝতে পারলুম ও নিজের শ্লেষ্মা গিলছিল । হাতে সাজি নিয়ে, ভিখারি আর ভবঘুরে নিরাশ্রয়দের পাশ কাটিয়ে ও রান্নাঘরের দিকে এগোলো । আমার আগে-আগে ।

“তোমার সঙ্গে ব্যাপারটা কি বলোতো ?” আমি বললুম ।

“তুমি লোকেদের মনোযোগ আকর্ষণ করছ।”

“তাতে দোষের কি?”

“লোকে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ওইভাবে চুমু খায় না । আজ রাতে, তুমি যদি চাও…”

ও ঠোঁট ফাঁক করে এমনভাবে কথাগুলো বললো মনে হলো তা কমনীয়তাহীন আর সেই সঙ্গে একইরকম অবজ্ঞার সুরে । আমি শুধু আমার কৃতজ্ঞতা জানাতে চেয়েছিলুম, আমার দারিদ্রের স্নেহে উষ্ণতা দিতে চেয়েছিলুম ।

“কিন্তু তুমি কি ভাবছিলে ?”

কেউ একজন ওর সঙ্গে ধাক্কা খেলো আর দুঃখ প্রকাশ করলো না, ওকে আমার থেকে আলাদা করে দিলো । আমি ওকে রান্নাঘরের ভেতর পর্যন্ত অনুসরণ করিনি ।আমি স্টোভের কাছে একটা ফাঁকা বেঞ্চে গিয়ে বসলুম । যদিও আমি সতেজ সৌন্দর্যের প্রশংসা করি, আমি এখন আর মাথা ঘামালুম না যে এই গেরস্হ ধরণের লোকটাকে ভালোবাসার জন্যে নিজেকে কেমনভাবে উপস্হিত করব ; এমনই এক দারিদ্র্যপীড়িত ভিখারি যার ওপর কম সাহসীরাও তর্জন-গর্জন করতে পারে, কেমন করেই বা ওর তেকোনা পাছাকে আদর করতে পারবো…আর যদি, দুর্ভাগ্যবশত, ওর সাধনীটা প্রণয়োদ্দীপক হয় ?

বারিও চিনো জায়গাটা, সে-সময়ে, ছিল একধরণের আস্তানা যেখানে স্পেনের লোকেরা কম আর বিদেশিরা বেশি ভিড় করতো, তাদের সব কয়টা ছাঁটাই মাল । আমরা অনেকসময়ে কাগজি-বাদাম সবুজ পোশাক পরতুম কিংবা নার্সিসাস-হলুদ রেশমের শার্ট আর ছেঁড়া ক্যাম্বিশ জুতো, আর আমাদের চুল এমন পেছন দিকে চেকনাই দেয়া থাকতো যে মনে হতো তাতে চিড় ধরবে । আমাদের কোনো নেতা ছিল না বরং পরিচালক ছিল । আমি বলতে পারছি না কেমন করে তারা অমন ক্ষমতা পেলো । বোধহয় আমাদের সামান্য মালপত্রের ভালো দাম যোগাড় করতে পারতো বলে । ওরা আমাদের সমস্যার খেয়াল রাখতো আর কাজকারবারের ব্যাপারে খবর দিতো, তার জন্য ওরা মোটামুটি একটা অংশ নিতো । আমরা ঢিলেঢালা দল গড়িনি, কিন্তু সেই বিরাট নোংরা বিশৃঙ্খলায়, যে পরিবেশে তেলকুটে দুর্গন্ধ, পেচ্ছাপ আর গুয়ের ছড়াছড়ি, কয়েকজন বাজে আর ইতর লোক নিজেদের চেয়ে চালাক-চতুরদের ওপর বেশি নির্ভর করতো। কলুষ আর কল্মষ আমাদের যুবকদের সঙ্গে ঝিলমিলিয়ে উঠতো আর হাতেগোণা কয়েকজনের রহস্যময় প্রতিভা, যারা সত্যিই স্ফূলিঙ্গ ছড়াতো, যুবকেরা যাদের দেহ, চাউনি আর ইশারা-ইঙ্গিত এমন এক চৌম্বকশক্তিতে আকর্ষণীয় ছিল যে আমাদের করে তুলতো তাদের শিকারী । এই ভাবেই আমি ওদের একজনের দ্বারা টলে গিয়েছিলুম । এক হাতের স্তিলিতানো সম্পর্কে লেখার জন্য আমি কয়েক পৃষ্ঠা অপেক্ষা করবো । শুরুতেই বলে ফেলা যাক ওর কোনো খ্রিস্টধর্মী মূল্যবোধ ছিল না । ওর পুরো ধীশক্তির, ওর পুরো ক্ষমতার, উৎস ছিল ওর দুই উরুর ফাঁকে । ওর লিঙ্গ, আর যা তাকে সম্পূর্ণ করে, সম্পূর্ণ যন্ত্রপাতি, এতোই সুন্দর ছিল যে আমি তাকে সৃজক অবয়ব বলতে পারি । যে কেউ মনে করতে পারতো যে ও মরে পড়ে আছে, কেননা ও কদাচিৎ, আর বেশ ধীরেসুস্তে, উত্তেজিত হতো : ও কেবল দেখতো । অন্ধকারে ভালোভাবে বোতামদেয়া অবস্হায় ও নিষ্পাদনের জন্য তৈরি হতো, যদিও কেবল এক হাতে বোতাম পরানো, যে আলোকময়তায় জিনিসটার বাহক উজ্বল হয়ে উঠবে ।

সালভাদোরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছয় মাস বজায় ছিল । এটা সবচেয়ে মোহক ভালোবাসা ছিল না, ছিল বহুপ্রসূ ভালোবাসাগুলোর অন্যতম । আমি ওই অসুস্হ দেহ, ধূসর মুখ, আর কয়েকটা চুলের হাস্যকর দাড়ির লোকটাকে ভালোবাসার জন্য নিজেকে বাগ মানিয়ে নিয়েছিলুম । সালভাদোর আমার যত্ন করতো, কিন্তু রাতের বেলায়, মোমবাতির আলোয়, আমি হুকুন বাছতুম, আমাদের পোষা প্রাণী, যেগুলো বাসা বাঁধতো আমাদের ট্রাউজারের খাঁজে-খাঁজে । উকুনগুলো আমাদের সঙ্গে বসবাস করতো । আমাদের জামাকাপড়কে প্রাণবন্ত করতো, এক উপস্হিতি, আর যখন ওরা বিদায় নিতো, আমাদের পোশাক হয়ে যেতো প্রাণহীন । আমরা জানতে চাইতুম — আর অনুভব করতে — যে এই আধা-স্বচ্ছ পোকাগুলো ঝাঁক বেঁধে রয়েছে, যদিও পোষা নয়, ওগুলো আমাদের জীবনের এমন অংশ হয়ে গিয়েছিল যে তৃতীয় কোনো লোকের উকুন আমাদের বিতৃষ্ণা জাগাতো ।  আমরা ওগুলোকে তাড়াতুম কিন্তু দিনের বেলায় ভাবতুম ডিমগুলো থেকে কচি উকুন বেরিয়েছে । ওগুলোকে নখে পিষে মারতুম, কোনোরকম বিতৃষ্ণা আর ঘৃণা ছাড়াই । লাশগুলোকে ফেলে দিতুম না — বা অবশিষ্টাংশ — জঞ্জালে ; ওগুলোকে পড়ে যেতে দিতুম, আমাদের রক্তে রক্তাক্ত, আমাদের অপরিচ্ছন্ন জাঙিয়ায় । আমাদের উন্নতির একমাত্র প্রমাণ ছিল উকুনগুলো, উন্নতির পাতালের নিদর্শন, কিন্তু ব্যাপারটা যুক্তিযুক্ত ছিল এই কারণে যে আমাদের অবস্হা একটা অপারেশান করতে পারলো যা ন্যায্যতা প্রমাণ করে, যে আমরা, একই শর্তে, আমাদের অবস্হার চিহ্ণগুলোকে ন্যায্যতা দিচ্ছি । উকুনগুলো ছিল দামি, কেননা আমাদের অবসানের জরুরি জ্ঞানের জন্য এই মণিরত্নগুলোকে, বলা যেতে পারে, আমাদের বিজয় । তারা চিল একযোগে আমাদের গৌরব ও লজ্জা । আমি বহুদিন একটা ঘরে থাকতুম যাতে জানালা ছিল না, কেবল দালানে একটা ঘুলঘুলি, যেখানে, সন্ধ্যাবেলায়, পাঁচটা চোটো মুখ, নিষ্ঠুর আর কোমল, হাসতো কিংবা গুমোট জায়গাটাকে আঁটার অযোগ্য করে তুলতো, টপটপে ঘাম ফেলে, ওই পোকাগুলো শিকার করতো যেগুলোর সুকৃতিতে আমরা অংশ নিয়েছি । ভালো ছিল যে অমন দুর্দশার গভীরে, আমি ছিলুম গৃহস্হের মধ্যে সবচেয়ে গরিবের প্রেমিক । আমি তাই পেয়েছিলুম এক বিরল সুবিধা । মুশকিল হতো বটে, কিন্তু আমার প্রতিটি বিজয় — আমার নোংরা হাত, গর্বে মেলে ধরা, আমার দাড়ি আর দীর্ঘ চুলকে সদম্ভে প্রকাশ করতে পারতো — আমাকে দিতো শক্তি — কিংবা দুর্বলতা, আর এখানে দুটো ব্যাপারই এক– কেননা বিজয় অনুসরণ করে, যা আমাদের ভাষায় বলা হতো অপমানপূর্ণ হতাশা । তবু, আমাদের জীবনে আলো আর প্রতিভা জরুরি হওয়ার কারণে, শার্শি আর জঞ্জালের ভেতর দিয়ে একটা সূর্যরশ্মি আসতো আর ঢুকে পড়তো নিষ্প্রভতায় ; এই উপাদানগুলোর জন্য আমাদের ছিল শিশির জমে তৈরি তুষার, মেঝের ওপরে বরফের পাতলা প্রলেপ, যদিও তারা দুর্যোগ সৃষ্টি করতে পারে, আমাদের কাছে যথেষ্ট ছিল, আনন্দের উৎস, যার চিহ্ণ, আমাদের ঘরে অনন্বিত : ক্রীসমাস আর নববর্ষ উৎসব সম্পর্কে আমরা যেটুকু জানতুম তা হল তার সঙ্গে যাকিছু থাকে আর যা উল্লাসিত লোকদের কাছে প্রিয় : তুষার ।

নিজেদের ক্ষতকে চর্চা করাটাও ভিখারিদের কাছে বাড়তি পয়সা রোজগারের একটা উপায় — যার ওপর নির্ভর করে জীবন চালানো যায় — যদিও তারা হয়তো এই পথে চলে যায় তাদের দারিদ্র্যের হালতের  আলস্যের দরুণ, গর্বে মাথা তুলে দাঁড়ানো, অবজ্ঞাকে পরোয়া না করে, সেই জিনিসটা হলো পুরুষালি সততা । নদীতে পাথরের মতন, গর্বও ভেঙে পড়ে আর অবহেলায় চূর্ণ হয়, ফেটে যায় । আরও অপমানে প্রবেশ করলে, গর্ববোধ উন্নত হবে ( যদি সেই ভিখারিটা আমি হই ) যখন আমি জানি — শক্তি বা দুর্বলতা — অমন অদৃষ্টের সুযোগ নেবার জন্য । এটা খুবই জরুরি, যেমন এই কুষ্ঠরোগ আমাকে কাবু করছে, আমাকেও তাকে কাবু করতে হবে আর, শেষে, আমাকে জিততে হবে । তাহলে কি আমি ক্রমশ  করে জঘন্য হয়ে উঠবো, বেশির থেকে বেশি, বিতৃষ্ণার পাত্র, সেই অন্তিম বিন্দু পর্যন্ত যা এখনও অজানা কিন্তু যা এক নান্দনিকতা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হবে আর সেই সঙ্গে নৈতিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে ? বলা হয় যে কুষ্ঠরোগ, যার সঙ্গে আমি আমাদের অবস্হার তুলনা করি, টিশ্যুগুলোতে চুলকানির সৃষ্টি করে ; রোগি নিজেকে চুলকাতে থাকে ; তার লিঙ্গোথ্থান হয় । স্বমেহন হয়ে দাঁড়ায় পৌনোঃপুনিক । তার নিঃসঙ্গ যৌনতায় কুষ্ঠরোগি নিজেকে সান্তনা দ্যায় আর নিজের রোগের স্তবগান গায় । দারিদ্র্য আমাদের ঋজু করেছে । সারা স্পেন জুড়ে আমরা এক গুপ্ত ব্যাপার বয়ে বেড়িয়েছি, ঔদ্ধত্বের সঙ্গে মিশেল না দেয়া অবগুন্ঠিত চমৎকারীত্ব । আমাদের অঙ্গভঙ্গী হয়ে উঠলো নম্র থেকে আরও নম্র, মিনমিনে থেকে আরও মিনমিনে, যেমন যেমন আমাদের নীচাবস্হার স্ফূলিঙ্গ আমাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য আরও দীপ্ত হতে থাকলো । এইভাবে আমার ভিখারির চেহারাকে মহিমায় মুড়ে তোলার জন্য আমার মধ্যে বিকশিত হলো বিশেষ কর্মদক্ষতা । ( আমি এখনও সাহিত্যিক প্রতিভার কথা বলিনি ।) এটা একটা কাজে লাগাবার শৃঙ্খলা বলে আমার মনে হয়েছে আর এখনও তার দরুণ আমি মৃদু হাসি হাসতে পারি সবচেয়ে নম্র পেঁকোদের মাঝে, তা মানুষ হোক বা জিনিসপত্র, এমনকি বমিও, এমনকি যে লালা আমি আমার মায়ের মুখের ওপর উগরে আবোলতাবোল বকতে পারতুম, এমনকি তোমার গু-পেচ্ছাপ । ভিখারি হবার অবস্হানের ধারণা আমি আমার মধ্যে সংরক্ষণ করে রাখবো ।

আমি হতে চেয়েছিলুম মহিলাদের মতন যাঁরা, বাড়িতে, লোকেদের দৃষ্টির আড়ালে, নিজের মেয়েকে সামলে রাখে, এক ধরণের বীভৎস কদাকার দানব, বোকা আর শ্বেতাঙ্গ, যে চার পায়ে ঘোঁৎঘোৎ করে বেড়ায় । মা যখন জন্ম দিয়েছিলেন, তখন ওনার বিষাদ সম্ভবত এমন ছিল যা তা তাঁর জীবনের একমাত্র সারসত্তা হয়ে উঠেছিল । উনি এই দানবকে ভালোবাসবার নির্ণয় নিলেন, তাঁর পেট থেকে যে কদর্যতা বেরিয়ে এসেছিল, শ্রমের দ্বারা সুসম্পন্ন, আর তাকে ভক্তিভরে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন । তাঁর নিজের ভেতরে তিনি এক বেদিকে সাজিয়ে তুলেছিলেন যার ওপরে তিনি দানবের ধারণাকে সংরক্ষণ করেছিলেন । স্নেহে উৎসর্গ করে, আলতো হাতে, তাঁর প্রতিদিনের পরিশ্রমে তাতে কড়া পড়ে গিয়ে থাকলেও, আশাহীনের স্বেচ্ছাকৃত উদ্দীপনায়, তিনি নিজেকে পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিলেন আর পৃথিবীর বিরুদ্ধে তিনি দাঁড় করিয়ে দিলেন দানবটাকে, যা জগতের আর তার ক্ষমতার সমানুপাত নিয়ে নিলো । দানবকে বনিয়াদ করে নতুন রীতিনীতি প্রতিপাদন করা হলো, যে রীতিনীতি কে অবিরাম লড়ে যেতে হয়েছে জগতের পরাক্রমের সঙ্গে যা তাঁকে বিদ্ধস্ত করতে এগিয়ে এসেছে কিন্তু থেমে গেছে তাঁর বাসার দেয়ালের কাছে পৌঁছে যেখানে তাঁর মেয়ে অবরুদ্ধ ছিল ।

কিন্তু, অনেকসময়ে চুরি করা দরকার ছিল, আমরা জানতুম সাহসের সুস্পষ্ট পার্থিব সৌন্দর্যের কথা । ঘুমোতে যাবার আগে, সরদার, মানে দলের কর্তা, আমাদের পরামর্শ দিতো । যেমন ধরা যাক, আমরা জাল কাগজ নিয়ে নানা কনসুলেটে যাবো যাতে আমাদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানো হয় । দেশের দূত, আমাদের দুঃখকষ্ট আর দুর্দশায় প্রভাবিত হয়ে বা চটে গিয়ে, আমাদের টিকিট কেটে দেবেন সীমা পর্যন্ত । আমাদের নেতা সেগুলো বারসেলোনা স্টেশানে বিক্রি করে দেবে । সে আমাদের বলতো গির্জায় কেমন করে চুরি করতে হবে — যা স্পেনের লোক করতে সাহস পায় না — কিংবা বড়োলোকদের ভিলায় ; আর ও নিজে নিয়ে আসতো নেদারল্যাণ্ড আর ইংরেজ নাবিকদের যাদের কাছে আমরা খুচরো পয়সার জন্য গাণ্ডুগিরি করতুম ।

এইভাবে আমরা কখনও চুরি করতুম, আর প্রতিটি লুটতরাজ আমাদের কিছুদিনের জন্য খোলা জায়গায় স্বাস নিতে দিতো । রাতের তৎপরতার জন্য আমাদের আগে থেকে খবর রাখতে হতো অস্ত্রশস্ত্রের । ভয়ের চোটে তৈরি স্নায়বিক দুর্বলতা, আর অনেক সময়ে উদ্বেগ,  ধার্মিকের মতন মেজাজ গড়ে তোলে । সেরকম সময়ে আমি সামান্য দুর্ঘটনাতেও অশুভের সংকেত পেতুম । সুযোগের ইশারা হয়ে ওঠে অনেক ব্যাপার । অজানা ক্ষমতাগুলোকে আমি জাদুমুগ্ধ করে দিতে চাই যার ওপর আমাদের অভিযানের সফলতা নির্ভর করে । আমি নৈতিক কাজ দিয়ে তাদের জাদুমুগ্ধ করতে চাই, মূলত দান-খয়রাতের মাধ্যমে । আমি ভিখারিদের বেশি করে আর হাত খুলে দিত চাই, আমি বুড়ো লোকেদের আমার আসন ছেড়ে দিই, আমি একপাশে সরে দাঁড়াই যাতে তারা যেতে পারে, আমি অন্ধদের রাস্তা পার হতে সাহায্য করি, আরও কতো কি। এইভাবে, মনে হয় আমি মেনে নিই যে চুরিচামারির কাজের ওপর একজন দেবতার শাসন কাজ করে যাঁর কাছে নৈতিক কাজ গ্রহণযোগ্য । এই প্রয়াসগুলো হলো সুযোগের ওপরে জাল ফেলার কাজ যাতে এই দেবতা, যার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না, জালে ধরা পড়বে, আমাকে ক্লান্ত করবে, বিঘ্ন সৃষ্টি করবে আর ধার্মিক মনঃস্হিতি তৈরি করতে সাহায্য করবে । চুরি করার ব্যাপারে তারা আনুষ্ঠানিক কাজের গাম্ভীর্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করে । তা সত্যিই অন্ধকারের হৃদয়ে অনুষ্ঠিত হয়, তার সঙ্গে যোগ হব যে তা রাতে হলে ভালো, যখন লোকেরা ঘুমোয়, এমন জায়গা যা বন্ধ আর হয়তো কালোর মুখোশে ঢাকা । পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে হাঁটা, নৈঃশব্দ্য, দিনের বেলাতেও যে অদৃশ্যতা আমাদের দরকার হয়, হাতড়ানো হাতের অন্ধকারে ইশারা কোনো আসন্ন জটিলতা বা সতর্কতার । কেবল একটা দরোজার হাতল ঘোরানোতেও দরকার হয় অনেকগুলো প্রক্রিয়া, প্রতিটি পলকাটা মণিরত্নের মতন দীপ্তিমান । যখন আমি সোনা খুঁজে পাই, তখন মনে হয় আমি তা মাটির তলা থেকে বের করেছি ; আমি বহু উপমহাদেশকে, দক্ষিণ-সমুদ্রের দ্বীপগুলো লুট করেছি ; আমাকে নিগ্রোরা ঘিরে রেখেছে ; তারা আমার অসুরক্ষিত দেহকে বিষমাখানো বর্শা দিয়ে খোঁচা দেবার হুমকি দ্যায়, কিন্তু তখন সোনার সততা কাজ করা আরম্ভ করে, আর আমাকে দারুণ একটা বলিষ্ঠতা পিষে ফ্যালে কিংবা উল্লসিত করে । বর্শাগুলো নামানো হয়, নিগ্রোরা আমাকে চিনতে পারে আর আমি উপজাতির একজন সদস্য হয়ে যাই ।

নিখুঁত কাজ : ভুল করে আমার হাত সৌম্যকান্তি এক ঘুমন্ত নিগ্রোর পকেটে ঢুকে যায়, আমার আঙুলে তার শক্ত হতে থাকা লিঙ্গ অনুভব করি আর হাত বের করে তার পকেট থেকে চুরি করা সোনার মুদ্রা আবিষ্কার করি — বিচক্ষণতা, ফিসফিসে কন্ঠস্বর, উৎকর্ণ কান, অদৃশ্য, কোনো দোসরের স্নায়বিক দুর্বল উপস্হিতি আর তার ইশারা বুঝতে পারা, সবকিছু আমাদের নিজেদের মধ্যে কেন্দ্রিত করে, আমাদের একজুট করে, আমাদের করে তোলে উপস্হিতির নাচের দল, যা গি-এর মন্তব্য ভালো ব্যাখ্যা করে :

“তুমি অনুভব করো যে তুমি জীবন্ত।”

কিন্তু আমার অন্তরজগতে, এই সামগ্রিক উপস্হিতি, যা আমার মনে হয় কাজের গাম্ভীর্যকে অসাধারণ ক্ষমতার বোমায় পালটে দিয়েছে, তা যেন এক অন্তিক ভালোথাকা— লুটতরাজ, যখন চলছে, সব সময়ে মনে হয় এটাই শেষ, এমন নয় যে তুমি ভাবো যে এর পর আরেকটা করবে না — বস্তুত তুমি ভাবোই না — বরং অমন অহং-এর একত্রীকরণ হতে পারে না ( জীবনে তো নয়ই, কেননা একে আরও চাপ দিলে জীবন থেকে কেটে পড়তে হবে ) ; আর কাজের এই একতা যা বিকশিত হয় ( যেমন গোলাপফুল তার দলমণ্ডল মেলে ধরে ) তা সচেতন ইঙ্গিত-ইশারার, তাদের নৈপূণ্য সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী, তাদের দুর্বলতা সম্পর্কেও আর তবু কাজটায় যে হিংস্রতা আছে, এখানেও তাকে ধার্মিক আচার-আচরণের মূল্য দ্যায় । প্রায়ই আমি তা কাউকে উৎসর্গ করি । প্রথমবার ছিল স্তিলিতানো যার অমন সন্মান ছিল প্রাপ্য । আমার মনে হয় ওর দ্বারাই আমি অভিষিক্ত হয়েছিলুম, মানে, ওর দেহ সম্পর্কে আমার আবেশ আমাকে পিছিয়ে আসতে দ্যায়নি। ওর সৌন্দর্যের প্রতি, ওর খোলাখুলি দুর্বিনয়ের প্রতি, আমি প্রথম দিকের চুরিগুলো উৎসর্গ করেছিলুম । ওই অসাধারণ বিকলাঙ্গের এককত্বও, যার হাত, কবজির কাছ থেকে কাটা, কোথাও পচছে, কোনো চেস্টনাট গাছের তলায়, ও আমাকে তাইই বলেছিল, মধ্য ইউরোপের জঙ্গলে । চুরি করার সময়ে, আমার শরীর ফাঁস হয়ে যায় । আমি জানি তা আমার ইশারা-ইঙ্গিতে ঝলমল করে । পৃইবী আমার সমস্ত চলাফেরা সম্পর্কে একাগ্র, যদি তা আমায় ল্যাঙ মারতে চায় । সামান্য ভুলের জন্য আমাকে বড়ো খেসারত দিতে হবে, কিন্তু যদি ভুল হয়ও আর আমি তা সময়মতো টের পাই, তাহলে আমাদের বাপের আস্তানায় সবাই আহ্লাদে আটখানা হবে । কিংবা, যদি ফেঁসে যাই, তাহলে বিপর্যয়ের পর বিপর্যয় আর তারপর কারাগার । কিন্তু বুনো অমার্জিতদের ক্ষেত্রে, যে দণ্ডপ্রাপ্ত পালাবার ব্যবস্হা করার ঝুঁকি নেয় সে তাদের সঙ্গে সেই উপায়ে দেখা করবে যা আমি সংক্ষেপে আমার অভ্যন্তরিক অভিযানে বর্ণনা করেছি । যদি অচেনা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে-যেতে, সে প্রাচীন উপজাতিদের পাহারা-দেওয়া কোনো মাল পাচারকারীর মুখোমুখি হয়, তাহলে তারা তাকে মেরে ফেলবে কিংবা বাঁচাবে । আদিম জীবনে ফিরে যাবার জন্য আমি দীর্ঘ, বহু দীর্ঘ পথ বেছে নিয়েছিলুম । যা আমি সবচেয়ে আগে চাই তা হল আমাদের জাতির দ্বারা নিন্দা ।

সালভাদোর আমার কাছে গর্ববোধের উৎস ছিল না । ও যখন চুরি করতো, ও কেবল দোকানগুলোর সামনের জানলার তাক থেকে মামুলি জিনিস তুলে নিতো । রাতের বেলায়, যে কাফেতে আমরা সবাই জড়ো হতুম, ও আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সৌম্যকান্তির পাশে দুঃখি মুখে সেঁদিয়ে যেতো । অমন জীবন ওকে হাঁপিয়ে তুলতো । যখন আমি ঢুকতুম, আমি ওকে কুঁজো হয়ে বসে থাকতে দেখে লজ্জা পেতুম, কোনো বেঞ্চে বসে, ওর কাঁধ সবুজ আর হলুদ সুতির কাঁথায় জড়োসড়ো, যেটা গায়ে জড়িয়ে ও শীতকালে ভিক্ষা করতে বেরোতো । ও একটা পুরোনো কালো শালও গায়ে জড়াতো, যেটা আমি নিতে চাইনি । সত্যিই, যদিও আমার মন সহ্য করতো, এমনকি চাইতো, নম্রতা প্রকাশ করি, কিন্তু আমার তেজি দেহ তা প্রত্যাখ্যান করতো । সালভাদোর দুঃখি, চাপা গলায় বলতো :

“তুমি কি চাও আমরা ফ্রান্সে ফিরে যাই ? আমরা গ্রামের দিকে কাজ করবো।”

আমি বললুম, না । ও আমার অপছন্দ বুঝতে পারেনি — না, আমার ঘৃণা — ফ্রান্সের প্রতি, এমন নয় যে আমার অভিযান, যদি বারসেলোনায় থেমে যায়, গভীরভাবে চলতেই থাকবে, বেশি বেশি করে গহনভাবে, আমার অন্তরজগতের প্রত্যন্ত এলাকায় ।

“কিন্তু আমি সব কাজ করে দেবো । তোমাকে কষ্ট করতে হবে না ।”

“না।”

আমি ওকে ওর আনন্দহীন দারিদ্র্যে ওর বেঞ্চে ফেলে চলে যেতুম । আমি স্টোভের কাছে যেতুম কিংবা মদের জমায়েতে আর দিনের বেলায় কুড়িয়ে পাওয়া সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ফুঁকতুম, একজন দাঁত-খেঁচানো আন্দালুসীয়ের সঙ্গে, যার নোংরা শাদা পশমের সোয়েটার ওর ধড় আর পেশিকে ফুলিয়ে তুলতো । নিজের দুহাত কচলে, যেমন বুড়োরা করে, সালভাদোর ওর বেঞ্চ ছেড়ে সার্বজনিক রান্নাঘরে ঢুকে সুপ তৈরি করতে আরম্ভ করতো কিংবা গ্রিলের ওপরে একটা মাছ বসিয়ে দিতো । একবার ও প্রস্তাব দিলো যে হেউলভাতে যাওয়া যাক কমলালেবু তোলার মজুরের কাজ করতে । তখন সন্ধ্যা আর ও অনেকের কাছে অপমানিত হয়েছিল, আমার হয়ে ভিক্ষা করার জন্যে অনেক ধমক খেয়েছিল, তবুও আমাকে ভর্ৎসনা করে ক্রিয়োলায় আমার যৎসামান্য সফলতার কথা বলতে পারলো ।

“সত্যিই, তুমি যখন কোনো খদ্দেরকে বেছে নাও, তোমার উচিত তাকে পারিশ্রমিক দেওয়া।”

আমরা হোটেলের মালিকের সামনেই ঝগড়া করছিলুম, যে আমাদের বাইরে বের করে দিতে চাইছিল । সালভাদোর আর আমি তাই ঠিক করলুম পরের দিন দুটো কম্বল চুরি করবো আর দক্ষিণে যাবার মালগাড়িতে লুকিয়ে রাখবো । কিন্তু আমি এমন চালাক-চতুর ছিলুম যে সেদিন সন্ধ্যাতেই একজন কাস্টমস অফিসারের হাফকোট গেঁড়িয়ে আনলুম । যখন ডক দিয়ে যাচ্ছিলুম, যেখানে ওদের পাহারাদাররা থাকে, একজন অফিসার আমাকে ডাকলো । সে যা চাইলো আমি তাইই করলুম, সান্ত্রি কুঠরির ভেতরে । বীর্যপাতের পর ( সম্ভবত, আমাকে সেকথা বলার সাহস ছিল না লোকটার, ও একটা ফোয়ারার কাছে ধুতে চলে গেলো ), এক মুহূর্তের জন্য ও আমাকে একা ছেড়ে গিয়েছিল, সেই ফাঁকে আমো ওর পশমের বড়ো কালো উর্দি নিয়ে কেটে পড়লুম । আমি হোটেলে ফেরার আগে সেটা পরে নিলুম, আমি আমি জানতুম দ্ব্যর্থকতার মজা, তখনও পর্যন্ত বিশ্বাসভঙ্গের আনন্দ নয়, যদিও যে প্রতারণামূলক বিভ্রান্তি আমাকে বুনিয়াদি পরস্পরবিরোধিতাকে অস্বীকার করতে বাধ্য করবে তার বিরচন  ইতিমধ্যে আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল । কাফের দরোজাটা খোলার সময়ে সামনেই দেখলুম সালভাদোর । ভিখারিদের মধ্যে ও ছিল সবচেয়ে বিষণ্ণ । ওর মুখের বৈশিষ্ট্য, এমনকি গঠনবিন্যাস ছিল অনেকটা কাঠের গুঁড়োর মতন যা দিয়ে কাফের মেঝে ঢাকা থাকতো । তক্ষুনি আমি স্তিলিতানোকে দেখতে পেলুম জুয়াড়িদের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে । আমাদের চোখাচোখি হলো । ওর চাউনি আমার দিকে রইলো কিছুক্ষণ, একটু লজ্জিতও হলো । আমি কালো উর্দিটা খুলে ফেললুম, আর সবাই মিলে সেটা নেবার জন্য দরাদরি আরম্ভ করে দিলো । তাতে অংশ না নিয়ে স্তিলিতানো তাকিয়ে থাকলো তুচ্ছ দর-কষাকষির দিকে ।

“যদি চাও, তাহলে তাড়াতাড়ি করো,” আমি বললুম । “তোমরা মনোস্হির করো, কাস্টমসের লোকটা নির্ঘাৎ আমার খোঁজে আসবে ।”

তাস-খেলুড়েরা তৎপর হয়ে উঠলো । ওরা সবাই এরকম অজুহাতের ব্যাপার জানে । যখন তাসের শাফল আমাকে ওর দিকে নিয়ে এলো, স্তিলিতানো ফরাসি ভাষায় বলল :

“তুমি প্যারিস থেকে ?”

“হ্যাঁ । কেন ?”

“না, এমনিই, কোনো কারণ নেই ।”

যদিও ও-ই প্রথম এগিয়ে এসেছিল, আমি জানতুম, যখন উত্তর দিলুম, একজন অন্তমূখী মানুষের মরিয়া আচরণের ইঙ্গিত-ইশারা, যখন সে কোনো যুবককে চায় । আমার বিভ্রান্তিকে লুকোবার জন্য, আমি শ্বাসরুদ্ধ হবার ভান করলুম, আমার চারপাশে মুহূর্তটার হইচই ছিল । ও বলল, “নিজের জন্যে তুমি বেশ ভালোই কাজ করছ।”

আমি বুঝতে পারলুম যে এই প্রশস্তি বেশ চালাকি করে দেয়া হলো, কিন্তু ভিখারিদের মাঝে কতো সৌম্যকান্তি যে স্তিলিতানো ছিল ( আমি তখনও ওর নাম জানতুম না ) ! ওর একটা হাতে বেশ বড়ো ব্যাণ্ডেজ বাঁধা আর বুকের কাছে ঝোলানো, কিন্তু আমি জানতুম ওই হাতটা ওর নেই । স্তিলিতানোকে কাফে বা রাস্তায় কোনোটাতেই ঘন ঘন দেখা যেতো না ।

“উর্দিটার জন্য কতো দাম দিতে হবে ?”

“তুমি আমাকে এর দাম দিতে চাও ?

“কেন দেবো না ?”

“কিসের মাধ্যমে দেবে ?”

“তুমি কি ভয় পাচ্ছো ?”

“তুমি কোথা থেকে এসেছো ?”

“সার্বিয়া । আমি ফরাসি সৈন্যবাহিনীর লোক । আমি বাহিনী থেকে পালিয়ে এসেছি।”

আমি স্বস্তি পেলুম । বিপর্যস্ত । যে আবেগ আমার মধ্যে গড়ে উঠলো তা এক শূন্যতার, যাতে ভরে গেল বিয়ের দৃশ্যের এক স্মৃতি । নাচের হলঘরে সৈন্যরা দলবেঁধে নাচছিল, আমি ওদের ওয়ালৎজ নাচ দেখছিলুম । সে সময়ে আমার মনে হচ্ছিল দুজন সৈনিকের অদর্শন সেখানে সামগ্রিক । ওরা আবেগে বয়ে যাচ্ছিল । যদিও প্রথম দিকে ‘রামোনা’ পর্বে তাদের নাচ ছিল অপাপবিদ্ধ, কিন্তু তাইই কি থাকবে আমাদের উপস্হিতিতে, ওরা হাসি বদল করে বিয়ে করে নিলো, যেমন প্রেমিক-প্রেমিকারা আঙটি বদল করে ? অদৃশ্য যাজকদের অনুজ্ঞা সত্বেও সৈন্যরা উত্তর দিল, “আমি দায়িত্ব গ্রহণ করছি।”   প্রত্যেকে ছিল দম্পতি, উভয়ই মুখের ওপরে কালো জাল ঢেকে আর এক উর্দি ( শাদা চামড়া, কাঁধের লাল আর সবুজ দড়ি )। ওরা থেমে-থেমে পরস্পরের কোমলতা আর স্ত্রীসুলভ শিষ্টতা অদলবদল করছিল । আবেগকে উঁচু স্তরে বজায় রাখার জন্য, ওরা নিজেদের নাচকে ধিমেতালে করছিল, যখন কিনা তাদের লিঙ্গ, দীর্ঘ কুচকাওয়াজে ক্লান্ত, পরস্পরকে রুক্ষ ডেনিমের ব্যারিকেডের আড়াল থেকে বিপজ্জনকভাবে ভয় দেখাচ্ছিল আর চ্যালেঞ্জ করছিল । পালিশ-করা চামড়া তৈরি শিরস্ত্রাণের মুখাবরণে ঠোকাঠুকি লাগছিল । আমি বুঝতে পারছিলুম স্তিলিতানো আমাকে আয়ত্ত করতে চাইছিল । আমি সেয়ানার খেলা খেলছিলুম:

“তা থেকে প্রমাণ হয় না যে তুমি দাম দিতে পারবে।”

“আমাকে বিশ্বাস করো।”

অমন কঠিন মুখ, অমন শক্তপোক্ত দেহের মানুষ, আমাকে বলছে বিশ্বাস করতে । সালভাদোর আমাদের দেখছিল । ও আমাদের বোঝাপড়া সম্পর্কে জানতো আর টের পেলো যে আমরা ওর ওর একাকীত্বের, সর্বনাশের নির্ণয় নিয়ে ফেলেছি । কোপনস্বভাব আর বিশুদ্ধ, আমি ছিলুম জীবনে ফিরিয়ে দেয়া পরীর দেশের নাটক । যখন ওয়ালৎজ নাচ থামলো, সৈন্য দুজন নিজেদের থেকে দূরে সরে গেলো । আর জাঁকজমকভরা ও বিহ্বল দুটি অর্ধাংশের প্রত্যেকে ইতস্তত করলো, আর, অদর্শন এড়ানোর আনন্দে, চলে গেলো, মাথা নামিয়ে, পরের ওয়ালৎজের জন্য কোনো যুবতীর দিকে ।

“দাম দেবার জন্য আমি তোমাকে দুদিন সময় দেবো,” আমি বললুম । “আমি মালকড়ি চাই। আমিও সৈন্যবাহিনীতে ছিলুম । পালিয়ে এসেছি । তোমার মতন।”

“তুমি পেয়ে যাবে ।”

আমি উর্দিটা দিয়ে দিলুম ওকে । ও নিজের একটা হাতে নিলো আর আমাকে ফেরত দিয়ে দিলো। ও মৃদু হাসলো, যদিও উদ্ধতভাবে, আর বলল, “ওটা গুটিয়ে ফ্যালো।” আর তার সঙ্গে  রহস্যোচ্ছলে যোগ করলো, “ততক্ষণে আমি একটা গুটিয়ে নিই ।”

অভিব্যক্তিটা সকলেই জানে : “স্কেটিংবোর্ড গুটিয়ে ফেলা ।” চোখের পাতা না ফেলে, ও যা বলল আমি তাই করলুম । উর্দিটা হোটেল মালিকের মালপত্র লুকোবার জায়গায় তক্ষুনি লোপাট হয়ে গেলো । হয়তো এই মামুলি চুরি আমার মুখকে উজ্বল করে থাকবে, কিংবা স্তিলিতানো ভালো সাজার অভিনয় করছিল ; ও যোগ করলো : “তুমি তাহলে বেল-অ্যাব-এর একজন প্রাক্তনীকে মদ খাওয়াচ্ছো ?”

এক গেলাস মদের দাম দুই সউ । আমার পকেটে ছিল চারটে, কিন্তু আমি সেগুলো সালভাদোরকে ধার দিলুম যে আমাদের দেখছিল ।

“আমি কপর্দকশূন্য,” স্তিলিতানো গর্বভরে বলল ।

তাস খেলুড়েরা নতুন গোষ্ঠী তৈরি করছিল যার দরুণ কিছু এক মুহূর্তের জন্যে আমি সালভাদোর থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলুম । আমি দাঁতের ফাঁকে বিড়বিড় করলুম, “ আমার কাছে চার সউ আছে আর আমি সেগুলো তোমাকে পাচার করে দিচ্ছি, কিন্তু দাম তোমাকেই দিতে হবে ।”

স্তিলিতানো মৃদু হাসলো । আমি পরাজিত । আমরা একটা টেবিলে বসলুম । ও সৈন্যবাহিনীর কথা বলা আরম্ভ করেছিল, কড়া চোখে আমার দিকে তাকিয়ে, কিন্তু অন্য কথা বলা শুরু করলো।

“আমার কেমন মনে হচ্ছে আমি তোমাকে আগে কোথাও দেখেছি।”

আমার কথা বলতে হলে, আমি স্মৃতিতে সবকিছু ধরে রেখেছিলুম।

আমার অদৃশ্য দড়িদড়া আঁকড়ে ধরা জরুরি ছিল । আমি কূজন করতে পারতুম । শব্দাবলী, কিংবা আমার স্বরভঙ্গী, কেবল আমার আকুলতাকে  প্রকাশ করতে পারতো না, আমি শুধু গান শোনাতে পারতুম না, আমার কন্ঠ থেকে বেরোতে পারতো বুনো প্রণয়খেলার ডাক । হয়তো আমার ঘাড়ে শাদা পালকগোছা গজিয়ে উঠেছিল । একটা আকস্মিক দুর্ঘটনা সব সময়ে সম্ভব। আমাদের জন্য অপেক্ষা করে রূপান্তরিত আকৃতি ।  আতঙ্ক আমাকে রক্ষা করলো।

আমি আকৃতির রূপান্তরের ভয়ে বসবাস করেছি । পাঠককে পুরো সচেতন করার জন্য, তারা দেখছে যে প্রেম আমার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে চলেছে — এটা কেবল বাগ্মীতার ব্যাপার নয় যার জন্য তুলনা দরকার — বাজপাখির মতন — সবচেয়ে সূক্ষ্ম ভীতির জন্য আমি কাছিমঘুঘুর উদাহরণ ব্যবহার করি । জানি না সেই মুহূর্তে কেমন অনুভব করেছিলুম, কিন্তু আজকে আমি যা চাই তা হলো স্তিলিতানো সম্পর্কে আমার কল্পনাশক্তি, কেননা আমার দুর্দশার তুলনা করা যায় একটা নিষ্ঠুর পাখি আর তার শিকারের পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্গে । ( আমি যদি আমার ঘাড় মৃদু কূজনে ফুলে ওঠা অনুভব না করতুম তাহলে আমি বরং লালবুক রবিনপাখির কথা বলতুম)।

এক বিদকুটে প্রাণী দেখা দেবে যদি আমার প্রতিটি আবেগ একটা পশু হয়ে দেখা দ্যায় : আমার ঘাড়ে কেউটের  ক্রোধ হিসহিস করে ; সেই একই কেউটে আমার লিঙ্গকে ফোলায় ; আমার বিনয়ের অভাব থেকে পয়দা হয়েছে আমার ঘোড়াগুলো আর নাগরদোলা….এক কাছিমঘুঘুর যার খসখসে স্বর আমি ধরে রেখেছি, যা স্তিলিতানো লক্ষ্য করেছিল । আমি কাশলুম।

প্যারালেলোর পেছনে একটা ফাঁকা জায়গা ছিল যেখানে মাস্তানরা তাস খেলতো। ( প্যারালেলো হলো বারসেলোনার একটা অ্যাভেনিউ যা বিখ্যাত রামব্লাসের সমান্তরাল। আই দুই প্রশস্ত রাস্তার মাঝে, আক অন্ধকার, নোংরা, সরু গলি গযে তুলেছে বারিও চিনো জায়গাটাকে ।) মেঝেতে বসে, ওরা তাস-টাস খেলতে থাকে ; ধুলোর ওপরে চারচৌকো কাপড় বিছিয়ে তাসগুলো সাজিয়ে রাখে । এক তরুণ জিপসি তার মধ্যে একটা খেলা চালাতো, আর আমি আমার পকেটের কয়েকটা সউয়ের ঝুঁকি নিলুম। আমি জুয়াড়ি নই । ধনীদের ক্যাসিনো আমাকে আকৃষ্ট করে না । বিজলিবাতির ঝাড়লন্ঠনে আমি সিঁটিয়ে যাই । মার্জিত জুয়াড়ির মেকি ঘনিষ্ঠতা দেখে আমার বমি পায় । আর বল, রুলেট আর ছোট্টো ঘোড়াগুলো নিয়ে খেলার অসম্ভাব্যতা আমাকে অনুৎসাহিত করে, কিন্তু আমার ভালো লাগতো মাস্তানদের ধুলো, নোংরা আর চালবাজি ।

আমি সামনে দিকে ঝুঁকে জিপসিটাকে পাশ থেকে দেখলুম, বালিশে চাপা, কোনও বেদনার কারণে। আমি ওর দৈহিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে দেখি ওর মুখবিকৃতি, কিন্তু ওর ব্যথার প্রভাও। আমি এটা প্রায়ই দেখেছি রাস্তায় বসে থাকা ছোঁড়াদের তেলচিটে মুখে । এখানকার পুরো জনসমপ্রদায় জেতা কিংবা হারার সঙ্গে যুক্ত । প্রতিটি উরু ক্লান্তি কিংবা উদ্বেগে কাঁপছে । সেইদিনকার আবহাওয়া ছিল আশঙ্কাজনক । আমি তরুণ স্পেনিয়দের যৌব অধীরতায় আটক পড়ে গিয়েছিলুম । আমি খেললুম আর জিতলুম । আমি প্রত্যেকটা দান জিতলুম । খেলার সময়ে আমি একটাও কথা বলিনি । তাছাযা, জিপসিটা ছিল আমার অচেনা । নিয়ম অনুযায়ী জেতা টাকাকড়ি নিয়ে আমার কেটে পড়ার কথা । ছেলেটাকে দেখতে আতো সুন্দর যে ওইভাবে ওকে ছেড়ে কেটে পড়াটা হবে সৌন্দর্যের অবহেলা । ও হঠাৎ দুঃখি হয়ে উঠলো, গরম আর অবসাদের মাঝে দাঁড়িয়ে ও মুখ নত করে নিয়েছিল । আমি দয়া করে ওকে টাকাটা ফেরত দিয়ে দিলুম। আচমকা অবাক হয়ে, ও সেগুলো নিয়ে নিলো আর আমাকে ধন্যবাদ জানালো ।

“হ্যালো, পেপে,” একজন পাগলাটে কালচে চেহারার খোঁড়া লোক ডাক দিয়ে উঠলো আমার পাশ দিয়ে লেংচে যেতে যেতে ।

“পেপে,” আমি নিজেকে বললুম, “ওর নাম পেপে।” জায়গাটা ছাড়লুম, কেননা আমি ওর কৃশকায়, প্রায় নারীসুলভ কমনীয় ছোটো হাত দুটো দেখেছিলুম । কিন্তু সবে কয়েক পা এগিয়েছি চোর, বেশ্যা, ভিখারি আর পায়ুকামীদের ছেড়ে, কেউ একজন আমার কাঁধে হাত রাখলো । ও ছিল পেপে। ও খেলা ছেড়ে চলে এসেছে। ও আমাকে স্প্যানিশে বলল :

“আমার নাম পেপে।”

“আমি হুয়ান।”

‘চলো, মদ খাওয়া যাক।”

ও আমার চেয়ে লম্বা ছিল না । ওর মুখ, যা আমি ওপর থেকে দেখেছিলুম যখন ও মাটিতে বসেছিল, কম পুষ্ট মনে হলো । দেহ কাঠামো সুশীল ।

“ছেলেটা একটা মেয়ে,” আমি ভাবলুম, ওর কোমল হাতের কথা মনে করে, আর আমি অনুভব করলুম ওর সঙ্গ আমাকে বিরক্ত করবে । ও এখনই ঠিক করে নিলো যে টাকাটা আমি জিতেছিলুম তা মদ খেয়ে ওড়াবে । আমরা শুঁড়িখানাগুলোয় চক্কর মারলুম, আর যতোক্ষণ একসঙ্গে ছিলুম ওকে বেশ কমনীয় লাগছিল । ওর পরনে ছিল, শার্টের বদলে, নিচু গলা নীল জার্সি। খোলা জায়গাটা থেকে দেখা যাচ্ছিল একটা মোটা ঘাড়, ওর মাথার মতনই চওড়া । যখন ও মাথা ঘোরালো, বুক না ঘুরিয়ে, একটা মোটা পেশিতন্তু জেগে উঠলো । আমি ওর দেহটা কল্পনা করার চেষ্টা করলুম, আর, কোমল প্রায় নরম হাত সত্বেও, মনে হলো তা বেশ পুরুষ্টু, কেননা ওর উরুগুলো ট্রাউজারের পাতলা কাপড়কে ভরে দিয়েছিল। আবহাওয়া ছিল উষ্ণ । ঝড় ওঠেনি । আসপাশের তাস খেলুড়েদের স্নায়ুচাপ হয়ে উঠেছিল তীব্র । বেশ্যাগুলোকে মনে হচ্ছিল গাগতরে ।ধুলো আর রোদ ছিল কষ্টকর । আমরা তেমন মদ খাইনি, খেলুম লেমোনেড । আমরা হকারদের কাছে বসলুম আর মাঝেসাজে এক-আধটা কথা বললুম । ও হাসি বজায় রেখেছিল, একধরনের ক্লান্তিময়তায় । মনে হচ্ছিল ও আমাকে প্রশ্রয় দিতে চাইছে । ও কি সন্দেহ করছিল যে ওর সুন্দর মুখ আমার ভালো লেগেছে ? আমি জানতে পারলুম না, কিন্তু ও আর এগোলো না । তাছাড়া, আমারও ওর মতন একই ধূর্ত চাউনি ; ভালো পোশাক পরে যারা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল তাদের কাছে আমি বোধহয় অমঙ্গলের সংকেত হয়ে দেখা দিয়েছি ; ছেলেটার যৌবন আর কলুষ আমার মতনই, আর আমি ছিলুম ফরাসি । সন্ধ্যার দিকে ও জুয়া খেলতে চাইলো, কিন্তু সব জায়গাগুলো দখল হয়ে গিয়েছিল বলে দেরি হয়ে গিয়েছিল । আমরা খেলুড়েদের আসেপাশে ঘুরে বেড়ালুম । বেশ্যাগুলোর গা ঘেঁষে ও যখন যাচ্ছিল, পেপে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করলো ওদের সঙ্গে । কাউকে-কাউকে চিমটি কাটলো । গরম হয়ে উঠছিল অসহ্য । আকাশ আর মাটি হয়ে উঠেছিল ঘনিষ্ঠ । ভিযের স্নায়ুচাপ বিরক্তিকর লাগছিল । জিপসি ছোঁড়াটার ওপর ছেয়ে গিয়েছিল ধৈর্যচ্যুতি কেননা ও নির্ণয় নিতে পারছিল না কোন খেলাটায় যোগ দেবে । নিজের পকেটের টাকাগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল । হঠাৎ ও আমার বাহু আঁকড়ে ধরলো ।

“এসো !”

প্যারালেলোতে কয়েক পা দূরে একটা বিশ্রামাগারে ও আমাকে নিয়ে এলো । সেটা চালাচ্ছিল বুড়িরা । হঠাৎ অমন নির্ণয়ে অবাক হয়ে আমি জিগ্যেস করলুম :

‘কী করতে চলেছ তুমি ?”

“আমার জন্য অপেক্ষা করো ।”

“কেন ?”

ও স্প্যানিশ একটা শব্দ ব্যবহার করে উত্তর দিলো যা আমি বুঝতে পারলুম না । সে কথা ওকে বললুম, এক বুড়ির সামনে, যে তার দুটো সউয়ের জন্য অপেক্ষা করছিল, শুনে হাসিতে ফেটে পয। ছোঁড়াটা আর স্বমেহনের ইঙ্গিত করলো । যখন ও বেরিয়ে এলো, ওর মুখে রঙ ধরে গিয়েছিল । ও তখনও হাসছিল ।

“এখন সব ঠিক আছে । আমি তৈরি ।”

ঘটনাটা থেকে আমি শিখলুম যে, বড়ো দাঁও মারার আগে, খেলোয়াড়রা ওখানে ঢুকে স্বমেহন করে যাতে নিজেদের শান্ত করে খেলতে পারে । আমরা জুয়ার জমঘটে ফিরে গেলুম । পেপে একটা গোষ্ঠীকে বেছে নিলো । ও হেরে গেলো । ওর কাছে যতো টাকা ছিল সব হেরে গেলো । আমি ওকে থামাতে চেষ্টা করেছিলুম ; ততক্ষণে সব হেরে বসে আছে । খেলার যেমন নিয়ম, যে লোকটা টাকাকড়ি ধার দিচ্ছিল বা জমা রাখছিল তাকে বলল তহবিল থেকে ওকে পরের খেলার জন্য ধার দিতে । লোকটা প্রত্যাখ্যান করলো । আমার তখন মনে হলো যা বৈশিষ্ট্যে জিপসির ভদ্রতা গড়া তা টকে গেল, যেমন দুধ ছানা কেটে যায়, আর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলো যেরকম ক্রোধ আমি আগে কারোর দেখিনি । জিপসি ছেলেটা মহাজনটার টাকাকড়ি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তুলে নিলো । মহাজন ওর পেছনে ছুটে লাথি মারার চেষ্টা করলো । পেপে পাশ কাটিয়ে নিলো । ও টাকাগুলো আমার হাতে দিলো, কিন্তু যতোক্ষণে আমি সেগুলো পকেটে রাখতে যাবো ছোঁড়াটার ছুরি বেরিয়ে এসেছে । ছুরিটা ও বসিয়ে দিলো মহাজনের বুকে, একজন ঢ্যাঙা, তামাটে লোক, যে পড়ে গেলো মাসটিতে আর যে, তার ত্বকের তামাটে রঙ সত্বেও, ফ্যাকাশে হয়ে গেলো, গুটিয়ে গেলো, ছটফট করে ধুলোর ওপরে মরে গেলো । জীবনে প্রথমবার আমি কাউকে পটল তুলতে দেখলুম । পেপে সেখান থেকে অদৃশ্য  হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু যখন আমি লাশ থেকে দৃষ্টি ঘোরালুম, ওপর দিকে চাইলুম, সেখানে, মুখে মৃদু হাসি নিয়ে, দাঁড়িয়ে রয়েছে স্তিলিতানো । সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে । মৃত লোকটা আর সৌম্যকান্তি মানুষেরা যেন একই সোনালি ধুলোতে মিশে গেছে, পৃথিবীর সব জায়গা থেকে এসে উপস্হিত নাবিক, সৈন্য, মাস্তান আর চোরেদের সঙ্গে । পৃথিবী আর ঘুরছিল না : স্তিলিতানোকে নিয়ে তা সূর্যের কাছে কাঁপছিল । একই সময়ে আমি পরিচিত হলুম মৃত্যু আর ভালোবাসার সঙ্গে । এই দর্শনশক্তি, যদিও ক্ষণিকের, তবু আমি সেখানে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলুম না কেননা আমার ভয় ধরে গিয়েছিল যে আমাকে পেপের সঙ্গে দেখে মৃত লোকটার বন্ধুরা আমার পকেটে রাখা টাকাকড়ি কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু আমি যখন কেটে পড়ছি, আমার স্মৃতি জীবন্ত হয়ে উঠলো আর পরবর্তী দৃশ্যের কথা মনে পড়িয়ে দিলো, যা আমার মনে হয়েছিল সমারোহপূর্ণ : “হত্যাটা, এক সৌম্যকান্ত বালকের দ্বারা, একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষকে যার রোদেপোড়া ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যেতে পারে, মৃত্যুর রঙ ধরে গেলো, আর তা আরাম করে দেখলো একজন দীর্ঘদেহী ফর্সা লোক যার সঙ্গে আমি সম্প্রতি গোপনে বাগদত্ত হয়েছি।” আমার চাউনি ওর দিকে দ্রুত হলেও, আমার হাতে সময় ছিল স্তিলিতানোর পালোয়ানি পৌরুষকে স্বীকার করা আর দেখা, দুই ঠোঁটের মাঝে, আধখোলা মুখে, একটা শাদা, থুতুর গোলা, শাদা পোকার মতন মোটা, যা ও ঘোরাচ্ছিল, ওপর থেকে নিচে যতক্ষণ না তা ওর হাঁ-মুখ ঢেকে ফেলছে। ও ধুলোর ওপরে খালি পায়ে দাঁড়িয়েছিল । ওর ঠ্যাঙ ঢাকা ছিল ছেঁড়া নোংরা ফ্যাকাশে ডেনিম ট্রাউজারে। ওর সবুজ শার্টের হাতা ছিল গোটানো, তার একটা ওর কাটা হাতেরর ওপর পর্যন্ত ; কবজিটা, যেখানে সেলাই করা চামড়ায় একটা ফ্যাকাশে গোলাপি ক্ষতচিহ্ণ দেখা যাচ্ছিল, তা ছিল সঙ্কুচিত।

বিয়োগাত্মক আকাশের তলায়, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রাকৃতিক ভূচিত্র পার হয়ে যাবার ছিল যখন রাতের বেলায় স্তিলিতানো আমার হাত ধরলো । কী ছিল সেই তরল জিনিসটার বৈশিষ্ট্য যা ওর কাছ থেকে আমার কাছে ধাক্কা দিয়ে চালান করা হতো ? আমি বিপজ্জনক নদীতীরে হেঁটেছি, উদয় হয়েছি বিষণ্ণ সমভূমিতে, শুনেছি সমুদ্রের আওয়াজ । যখন সিঁড়িবদল হলো, বলা চলে আমি ওকে ছুঁইনি : ও ছিল জগতের ওস্তাদ । সেই সংক্ষিপ্ত মুহূর্তগুলোর স্মৃতি নিয়ে, আমি তোমাদের কাছে বর্ণনা করতে পারি, শ্বাসহীন উড়াল, অনুসৃতি, পৃথিবীর সেই সব দেশের যেখানে আমি কখনও যাবো না ।

 

 

 

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

জাঁ জেনে-র কবিতা ‘শবযাত্রার কুচকাওয়াজ’

জাঁ জেনে’র কবিতা ( ১৯১০ – ১৯৮৬ )  ‘শবযাত্রার কুচকাওয়াজ’

অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

এক কোনে আবদ্ধ, একটুখানি রাত রয়ে গেছে।

আমাদের ভিতু আকাশে নির্মম আঘাতে স্ফূলিঙ্গ উগরে

( নৈশব্দের গাছেরা কিছু দীর্ঘশ্বাস ঝুলিয়ে রেখেছে )

এই শূন্যতার শীর্ষে গরিমার এক গোলাপ জেগে।

ঘুম বড়োই বিশ্বাসঘাতক যেখানে জেলখানা আমায় নিয়ে এসেছে

যদিও আমার গোপন দালানে বেশ আস্পষ্টভাবে

ওই অহংকারী ছোঁড়া গভীরভাবে নিজের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে

নাবিকদের আলোয় ঝলমলিয়ে যারা শব-সুন্দরী  গড়ে তোলে ।

 

ও আমাকে নিজের ভেতরে শেকল পরিয়ে রাখে

জেলখানার এই কুড়ি বছর বয়সী পরিদর্শক

আর ও আমায় চিরকালের জন্য শেকল পরিয়ে রাখে !

একটিমাত্র ইঙ্গিত, ওর চোখ, দাঁতে চুল চিবোয় :

আমার হৃদয় খুলে যায়, আর পরিদর্শক, উৎসবময় উল্লাসে

আমাকে নিজের অন্তরে জেলবন্দী করে ।

এই অসূ্য়াভরা দরোজা আবার বন্ধ হবার সুযোগ পায় না

অনেক বেশি দয়ায়

আর তুমি তো ইতোমধ্যেই ফিরেছো । তোমার পরিপূর্ণতা আমাকে আতঙ্কিত করে

আর আমি আজকে শুনতে পাই আমাদের ভালোবাসা বর্ণিত হচ্ছে

তোমার মুখে যা গান গায় ।

এই ছোরামারা ট্যাঙ্গো যা জেলখুপরি শুনতে পায়

বিদায়বেলার এই ট্যাঙ্গোনাচ ।

তাহলে কি তুমি, হে প্রভূ, এই উজ্বল বাতাসে ?

তোমার আত্মা গোপন পথে এগিয়েছে

দেবতাদের থেকে পার পাবার জন্য ।

 

যখন তুমি ঘুমোও রাতের আস্তাবল ভেঙে ঘোড়ারা

তোমার চ্যাটালো বুকে নামে, আর জানোয়ারগুলোর টগবগ

অন্ধকারকে ছত্রভঙ্গ করে তোলা যেখানে ঘুম নিজের

ক্ষমতার যন্ত্র চালায়, আমার মগজ থেকে ছিঁড়ে

একটুও শব্দ না করেই ।

ঘুম অনেক শাখা তৈরি করে

তোমার পা থেকে ফুল

তাদের কান্নায় কন্ঠরুদ্ধ হয়ে মারা যেতে আমি ভয় পাই ।

তোমার মোলায়ের পাছার বাঁকের ওপরে, মিলিয়ে যাবার আগে

তোমার শাদা ত্বকে তা নীলাভ।

কিন্তু একজন জেল পরিদর্শক কি তোমাকে জাগিয়ে তুলতে পারে, আমার কচি চোর

যখন তুমি তোমার হাত ধুয়ে নাও ( ওই পাখিগুলো তোমার দস্তানায়

ডানা ঝাপটায়, একশো দুঃখের ভারে )

তারপর তুমি নির্দয়ভাবে নক্ষত্রদের আলোকরশ্মিকে ছারখার করে দাও

তোমার কাঁদতে-থাকা মুখের ওপরে ।

তোমার শোকেভরা অবশিষ্টাংশে

মহিমাময় অঙ্গভঙ্গী ধরে রাখা হয়

তোমার হাত যেটা একে ছুঁড়ে দিয়েছিল, রশ্মি দিয়ে বীজ পুঁতেছিল।

তোমার গেঞ্জি, তোমার শার্ট, আর তোমার কালো বেল্ট

আমার জেলখুপরিকে অবাক করে আর আমাকে হতবুদ্ধি করে তোলে

তোমার সুন্দর হস্তিদন্তের সামনে ।

 

সারাদিনের সুন্দর রাতগুলো

পিলর-এর অন্ধকার

তোমার কালো পাকের ভেতরে

আমার ছুরি জাল করা হয় ।

ঈশ্বর, এখানে আমি উলঙ্গ

আমার ভয়ঙ্কর লুভরেতে ।

কেউ চিনতে পারে না

তোমার বন্ধ মুঠো আমায় খুলে দ্যায় ।

আমি ভালোবাসা ছাড়া কিছু নই

আমার সমস্ত শাখা জ্বলে

যদি আমি দিনটাকে অন্ধকার করে দিই

তারপর আমার ভেতরের ছায়া নিজেকে গুটিয়ে নেয় ।

বিশুদ্ধ হাওয়ায় এটা সম্ভব

আমার শুকনো দেহ গুঁড়িয়ে ধুলোয় মেশার জন্য

দেয়ালে পিঠ দিয়ে

আমি বিদ্যুতের চমকের দখল নিই ।

হৃদয় আমার সূর্য

মোরগের ডাকে চৌচির হয়ে যায়

ঘুম কখনও সাহস দেখায় না

এখানে তার স্বপ্নগুলোকে উথলে দিতে।

আমার আকাঙ্খায় শুকিয়ে যাওয়া

আমি স্তব্ধতাকে মেরামত করে দিই

পাখিদের আগুন দিয়ে

যা আমার গাছ থেকে জেগেছে ।

 

নিষ্ঠুর প্রকৃতির মনে হয় এমন মহিলাদের থেকে

তাদের খবরিয়ারা গয়না পরে থাকে ।

গলির এই ছিঁচকে চোরগুলো রাতের বেলায় জেগে ওঠে

আর তাদের ইশারা পেয়ে তুমি সাহসে বেরিয়ে পড়ো।

অমন এক কচিখোকা, নিজের মায়াময় পোশাকে কাঁপে

ও ছিল আমার কাছে পাঠানো দেবদূত, যার আলোময় দিশা

আমি অনুসরণ করি বিভ্রান্ত হয়ে, যাত্রায় পাগল হয়ে

এই জেলখুপরি পর্যন্ত যেখানে তার প্রত্যাখ্যান ছিল জ্যোতির্ময়।

যখন আমি অন্য সুরে গাইতে চাইলুম

আমার পালক আলোকরশ্মিতে জড়িয়ে পড়লো

এক ঝিমধরা শব্দে, মাথা নিচু করে

আমি বোকার মতন পড়ে গেলুম, এই ভুলের মাশুল হিসেবে

এই খাদের তলায় ।

 

আর কিছুই গোলমাল

বাধাবে না অনন্তকালীন ঋতুতে

যেখানে আমি নিজেকে আটক আবিষ্কার করছি ।

একাকীত্বের স্হির জলাশয়

আমাকে পাহারা দেয় আর জেলখানা ভরে রাখে ।

আমি চিরকালের জন্য কুড়ি বছর বয়সী

তোমাদের নিরীক্ষণ সত্বেও ।

তোমাদের মন রাখতে, ওহ বধির সৌন্দর্যের অনাথ

মারা না যাওয়া পর্যন্ত আমি পোশাক পরে থাকবো

আর তোমার আত্মা তোমার মুণ্ডকাটা ধড়কে ছেড়ে গিয়ে

আমার ভেতরে খুঁজে পাবে এক শাদা আশ্রয় ।

ওহ একথা জানতে পারা যে তুমি আমার মামুলি ছাদের তলায় শোও!

তুমি আমার মুখ দিয়ে কথা বলো

আমার চোখ দিয়ে দ্যাখো

এই ঘর তোমার আর আমার কবিতা তোমার।

যা ভালো লাগে তার জন্য আরেকবার বেঁচে নাও

আমি নজর রাখছি ।

 

হয়তো তুমিই ছিলে সেই দানব যে কেঁদেছিল

আমার উঁচু দেয়ালের পেছনে ?

রেশমি ফিতের চেয়েও মোলায়েম তুমি ফিরে এসেছো

আমার দৈব দুর্বৃত্ত

এক নতুন মৃত্যুর মাধ্যমে নিয়তি আবার তছনছ করে

আমাদের নিরানন্দ ভালোবাসাগুলো

কেননা তুমিই তো ছিলে আবার, পিলর, মিথ্যা বোলো না

এই চুরিকরা ছায়াগুলো !

 

যে খোকাটাকে আমি খুঁজছিলুম

বাচ্চাদের মধ্যে খেলছে

নিজের বিছানায় মরে পড়ে আছে, একা

এক রাজকুমারের মতন ।

নিজের আলতো পায়ে ইতস্তত করে

এক মহিমা ওর পায়ে জুতো পরায়

আর দেহ ঢেকে দ্যায়

রাজকীয় পতাকায় ।

হাতে গোলাপ ধরে-থাকা মিষ্টি ভঙ্গীতে

শবগুলো কে যে হাত লুটপাট করছিল তা চিনতে পারলুম।

একজন সেনা অমন কাজ করবে না

যা তুমি, একা, করেছিলে

আর তুমি তাদের মধ্যে নেমে গেলে

ভয়ও পেলে না

পশ্চাত্তাপও নয় ।

তোমার দেহের মতন

একটা কালো গেঞ্জি তোমার আত্মাকে দস্তানায় ঢুকিয়ে রাখলো

আর যখন তুমি নির্দিষ্ট সমাধিকে অপবিত্র করলে

তুমি ছুরির ডগা দিয়ে খোদাই করে দিলে

শব্দ আন্দাজ করার ধাঁধা

বিদ্যুৎ দিয়ে নকশাকাটা ।

আমরা তোমার উথ্থান দেখেছি, উন্মাদনায় বয়ে যাওয়া

নিজের চুলে ঝুলছ

লোহার মুকুটে

মুক্ত-বসানো ফিতেয় আর বাসি গোলাপে

জীবন্ত ধরবার জন্যে মোচড়ানো হাত ।

তোমার মৃদু হাসি আমাদের দেখাবার জন্য সবেই ফিরেছ

তুমি দ্রুত উধাও হয়ে গেলে আমার মনে হয়

আমাদের কিছু না জানিয়ে, তোমার ঘুমন্ত গরিমা

আরেক মুখের সন্ধানে অন্যান্য আকাশে ঘুরে বেড়িয়েছে।

পথচলতি এক বালককে লক্ষ করি

তোমার সুগঠিত দেহের ঝলক

আমি তার মাধ্যমে তোমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছি

কিন্তু তার এক সামান্য ইশারা

তার কাছ থেকে তোমাকে উধাও করে দিলো

আর তোমাকে আমার কবিতায় ছুঁড়ে ফেললো

যেখান থেকে তুমি পালাতে পারবে না ।

কোন দেবদূত তাহলে

তোমাকে পাশ দিয়ে যাবার অনুমতি দিলো

অকাতরে বস্তুর ভেতর দিয়ে যেতে

হাত দিয়ে বাতাসকে দুফাঁক করে

ক্ষেপণাস্ত্রের ডগার সূক্ষ্ম ঘূর্ণনের মতো

যা নিজের দামি পথ খুঁজে নিজেই তাকে নষ্ট করে ?

তোমার পালাবার সংকীর্ণতা আমাদের নিরানন্দ করেছিল ।

এক দ্যুতিময় পিছুটান তোমাকে আমাদের আলিঙ্গনে এনে দিয়েছিল।

তুমি আমাদের গলায় টোকা মেরে আমাদের মন ভরাতে চাইলে

আর তোমার হাত ছিল ক্ষমাময়

কামানো চুলের দরুণ ।

কিন্তু তুমি আর দেখা দাও না, ফর্সা খোকা যাকে আমি খুঁজি।

আমি কোনো শব্দে হুঁচোট খাই আর তোমাকে তার বিপরীতে দেখি।

তুমি আমার কাছ থেকে সরে যাও, কবিতা আমাকে রক্ষা করে।

কান্নার কাঁটাঝোপের ভেতর দিয়ে আমি বিপথগামী হই ।

তোমাকে ধরার জন্য আকাশ নানা ফাঁদ পেতেছিল

করাল আর নতুন, মৃত্যুর সঙ্গে ষড় করে

এক অদৃশ্য সিংহাসন থেকে নজর রাখছিল

সুতোগুলো আর গিঁটগুলো

সোনার ববিনে পরানো ।

আকাশ এমনকি মৌমাছিদের যাত্রাপথ ব্যবহার করেছিল

কতোরকমের রশ্মি আর কতোরকমের সুতোর পাক খুলে

যে সেষ পর্যন্ত ওকে গোলাপের সৌন্দর্য ধরে ফেললো :

ছবিতে দেখানো এক শিশুর মুখ ।

এই খেলা যদি নিষ্ঠুর হয় তাহলে আমি নালিশ করব না

তোমার সুন্দর চোখ খুলে ফেলার জন্য

দুঃখের এক গান তোমাকে দেখার জন্য পাগল হয়ে গেল

অতো সন্ত্রাসকে আয়ত্ত করে

আর এই গান, হাজার বছরের জন্য

তোমার কফিনকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল ।

দেবতাদের ফাঁদে আটক, তাদের রেশমিসুতোয় কন্ঠরুদ্ধ

কেন আর কেমন করে না জেনেই তুমি মারা গেলে ।

তুমি আমাকে ছাপিয়ে জিতে গেছ

কিন্তু সাপসিঁড়ি লুডোখেলায় হেরে গেছ

যেখানে আমি তোমাকে ধর্ষণ করার সাহস দেখাই

ওগো আমার পলাতক প্রেমিকা ।

কালো সেনারা তাদের বন্দুক নত করলেও

তুমি ওই বিছানা ছেড়ে পালাতে পারো না যেখানে লোহার মুখোশ

তোমাকে শক্ত করে বেঁধে রেখেছে — কিন্তু হঠাৎ তুমি উঠে দাঁড়াও

নড়াচড়া না করেই পেছনে পড়ে যাও

আর নরকে ফেরো ।

 

১০

আমার ভালোবাসার কালকুঠুরি

তোমার স্পন্দিত ছায়ায়

আমার চোখ, আচমকা, এক গোপনকথা আবিষ্কার করেছে ।

আমি কতো রকম শোয়া শুয়েছি তা জগত জানে না

যেখানে সন্ত্রাস নিজেই গিঁট পাকায় ।

তোমার অন্ধকার হৃদয়ের দর-দালানগুলো আঁকাবাঁকা পথ

আর তাদের জড়োকরা স্বপ্নগুলো স্তব্ধতাকে সঙ্গঠিত করে

কবিতার সঙ্গে মিল আছে এমন এক যান্ত্রিক প্রক্রিয়া

আর তার হুবহু তীব্রতা ।

আমার চোখ আর আমার কপাল থেকে

তোমার রাত কালির বন্যা বয়ে যেতে দ্যায়

এমন ঘন পালক যার ওপরে আমি এখানে শুই

নিয়ে আসবে কুসুমিত নক্ষত্রদের

যেমন কেউ গোলাগুলির বেড়াজালে দেখতে পায় ।

আমি তরল অন্ধকারের দিকে এগোই

যেখানে অবয়বহীন ষড়যন্ত্রেরা

ধীরে ধীরে আকার পাওয়া আরম্ভ করে ।

কেনই বা আমি সাহায্যের জন্য আর্তনাদ করব ?

আমার সমস্ত অঙ্গবিক্ষেপ ভেঙে টুকরো হয়

আমার আমার কান্নাগুলো

খুবই সুন্দর ।

আমার চাপা দুর্দশা থেকে শুধু তুমিই জানতে পারবে

দিনের মেলে দেয়া অদ্ভুত সৌন্দর্যগুলো ।

ওদের হাজার রকমের ভেলকিবাজির পর

যে বজ্জাতদের কথা আমি শুনি

খোলা বাতাসে ভিড় জমায় ।

পৃথিবীতে তারা একজন কোমল প্রতিনিধি পাঠায়

এক শিশু যে কারোর পরোয়া করে না, আর নিজের যাত্রাপথ চিহ্ণিত করে

অনেকরকমের চামড়া ফাটিয়ে

আর ওর খোশমেজাজি বার্তা

এখানে পায় নিজের জাঁকজমক ।

কবিতাটা পযে তুমি লজ্জায় ফ্যাকাশে হয়ে যাও

অপরাধী অঙ্গভঙ্গী দিয়ে একজন বয়ঃসন্ধির লেখা

কিন্তু তুমি কখনও জানতে পারবে না

মৌলিক গিঁটগুলোর কোনও ব্যাপার

যা আমার মলিন ক্রোধের ফসল

কেননা ওর রাতে যে গন্ধগুলো গড়াচ্ছে তা খুবই তীব্র।

ও সই করবে পিলর আর ওর মহিমান্বয়ন হবে

গোলাপ-স্রোতের উজ্বল ফাঁসিমঞ্চ

মৃত্যুর সুন্দর কর্মফল ।

 

১১

সম্ভাবনা — সবচেয়ে মহার্ঘ সম্ভাবনা !

প্রায়ই আমার পালককে তৈরি করতে বাধ্য করেছে

আমার সমস্ত কবিতার হৃদয়কেন্দ্র

সেই গোলাপ যার ওপরে শাদা শব্দে লেখা মৃত্যু

বাহুর ফেট্টিতে নকশা করা

যে কালো যুদ্ধাদের আমি ভালোবাসি তাদের নাম।

আমার রাতের ভেতর দিয়ে কোন বাগানই বা ফুল ফোটাতে পারে

কোন যন্ত্রণাময় খেলা এখানে হয় যে

এই কেটে নেয়া গোলাপ থেকে পাপড়ি ছেঁড়া হয়

আর কে তাকে নিঃশব্দে ফাঁকা কাগজে নিয়ে যায়

যেখানে তোমার হাসি তাকে অভিবাদন করে ?

কিন্তু মৃত্যুর ব্যাপারে বিশেষকিছু আমি জানি না

মেয়েটির বিষয়ে এতো কথা বলার পরও

আর গুরুতর উপায়ে

তাহলে মেয়েটি আমার ভেতরেই বাস করে

যাতে সহজে জেগে উঠতে পারে

আমার আমার আবোলতাবোল থেকে বইতে পারে

অন্তত আমার শব্দগুলো ।

মেয়েটির বিষয়ে আমি কিছুই জানি না

বলা হয় যে ওর সৌন্দর্যের ইন্দ্রজাল

অনন্তকালকে খেয়ে ফ্যালে

কিন্তু এই বিশুদ্ধ বিচরণ পরাজয়ে বিদীর্ণ হয়

আর এক বিয়োগান্তক বিশৃঙ্খলার গোপনীয়তাকে ফাঁস করে ।

অশ্রুবিন্দুর আবহাওয়ায় ঘুরে বেড়িয়ে ফ্যাকাশে

মেয়েটি খালি পায়ে আসে ফুৎকারে আত্মপ্রকাশিত হয়ে

আমার উপরিতলে যেখানে ফুলের এই তোড়াগুলো

আমাকে শেখায়  মৃত্যুর

কন্ঠরোধী কোমলতা।

আমি নিজেকে তোমার আলিঙ্গনে ছেড়ে দেবো, হে বর্ণোজ্বল মৃত্যু

কেননা আমি জানি কেমন করে আবিষ্কার করতে হয়

আমার উন্মুক্ত শৈশবের চলমান চারণভূমি

যেখানে তুমি আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে যাবে

অপরিচিত লোকটার ফুলেফুলে সাজানো লিঙ্গের কাছে ।

আর এই শক্তিতে বলবান, হে রানি, আমি হবো

তোমার ছায়াদের নাটকের গোপন মন্ত্রী ।

মিষ্টি মৃত্যু, আমাকে নাও, আমি তৈরি

এই যে আমি এখানে, আমি যাচ্ছি

তোমার নিরানন্দ শহরে ।

 

১২

একটা শব্দে আমার কন্ঠস্বর হুঁচোট খায়

আর অভিঘাত থেকে তুমি উৎসারিত হও

এই অলৌকিকতার জন্য ততোটা উৎসাহী

যতোটা তুমি তোমার অপরাধগুলোর জন্য !

কেই বা তাহলে অবাক হবে

যখন আমি আমার নথিগুলো খুলে ধরব

যাতে পূঙ্খানুপূঙ্খভাবে অন্বেষণ করা যাব

শব্দের ঝোপঝাড়গুলো ?

আমার হাতে আরও দড়ি ধরিয়ে দেবার জন্য বন্ধুরা লক্ষ রাখে

জেলখানার ছড়ানো ঘাসে তুমি ঘুমিয়ে পড়ো ।

তোমার জন্য, এমনকি তোমার বন্ধুত্বের জন্য

আমি পরোয়া করি না ।

আমি এই সৌভাগ্যকে আগলে রাখি

যা বিচারকরা আমাকে দেন ।

এটাকি তুমি, অন্য আমি, তোমার রুপোর চটি ছাড়াই

সালোম, যে আমাকে একটা গোলাপ কেটে এনে দ্যায় ?

এই রক্তাক্ত গোলাপ, শেষ পর্যন্ত তার ব্যাণ্ডেজ থেকে খোলা

তা কি মেয়েটির, নাকি এটা জাঁ জেনের মাথা ?

উত্তর দাও পিলর ! তোমার চোখের পাতাকে পিটপিট করতে দাও

আমার সঙ্গে তির্যক কথা বলো, তোমার গলায় গান গাও

তোমার চুলের কাছে কাটা আর গোলাপঝাড় থেকে পড়ে যাওয়া

হুবহু শব্দে, হে আমার গোলাপ

আমার প্রার্থনাকে মেনে নাও ।

 

১৩

হে আমার কারাগার যেখানে আমার বয়স না বাড়লেই আমি মারা পড়ি

আমি তোমাকে ভালোবাসি ।

জীবন, মৃত্যু দিয়ে সাজানো, আমাকে শুষে নেয় ।

তাদের ধীর কঠিন ওয়ালৎজ উল্টোদিকে নাচা হয়

প্রত্যেকে নিজের মহিমান্বিত কার্যকারণের পাক খোলে

অন্যের বিরোধীতায় ।

তবু, আমার অনেকটা জায়গা আছে, এটা আমার সমাধি নয়

আমার জেলখুপরি বেশ বড়ো আর আমার জানালা অতিবিশুদ্ধ ।

আবার জন্ম নেবার জন্য অপেক্ষা করছি জন্মের আগের রাতে

আমি নিজেকে তেমনভাবে বাঁচার অনুমতি দিয়েছি যাতে আমাকে

মৃত্যু চিনতে পারে

উচ্চতর ইশারার মাধ্যমে ।

আকাশ ছাড়া আর সকলের জন্য আমি আমার দরোজা চিরকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছি

আর আমি কেবল বন্ধুত্বপূর্ণ মুহূর্তের অনুমতি দিই

খোকা চোরগুলোকে যাদের ফিসফিসানিতে আমার কান গুপ্তচরগিরি করে

নিষ্ঠুর আশায়, আমার সাহায্যের ডাকের জন্য

তাদের সমাপ্ত গানের মাধ্যমে ।

যদি আমি ইতস্তত করি আমার গান নকল নয়

কেননা আমি আমার গভীর মাটির তলায় খোঁজ করি

আর আমি প্রতিবার একই ধ্বনন নিয়ে উঠে আসি

জীবন্ত কবর দেয়া ঐশ্বর্যের টুকরো-টাকরা

যা জগতের আরম্ভ থেকে ছিল ।

যদি তুমি দ্যাখো আমার টেবিলের ওপরে ঝুঁকে আছি

সাহিত্যে বরবাদ আমার মুখাবয়ব

তাহলে বুঝবে যে এটা আমাকেও পীড়িত করে

এই ভয়ঙ্কর দুঃসাহসিক কাজ

আবিষ্কার করার স্পর্ধা

সেই লুকোনো সোনার

এই প্রচুর

পচনের তলায় ।

এক আনন্দময় জ্যোতি আমার চোখে উদ্ভাসিত হয়

যেন উজ্বল ভোরবেলায় এক জাজিম

পাথরের ওপরে বেছানো

তোমার চলাফেরায় বাধা দেবার জন্য

গোলোকধাঁধা জুড়ে

কন্ঠরুদ্ধ দর-দালানগুলোতে

তোমার চৌকাঠ থেকে

ভোরের

সিংহদ্বার পর্যন্ত ।

 

( কবিতাটি মরিস পিলর [ Maurice Pilogre ] নামে একজন নামকরা অপরাধীকে উদ্দেশ্য করে। জেলে তার সঙ্গে জাঁ জেনের পরিচয় ।  ১৯৩৯ সালে গিলোটিনে তার মাথা কাটা হয়েছিল । মরিস পিলর হাসিমুখে গিলোটিনে মাথা দিয়েছিল ; রাষ্ট্রপতির ক্ষমাভিক্ষা চায়নি । )

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

জাঁ জেনে-র কবিতা ‘রণতরী’

 

জাঁ জেনের কবিতা 

অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

রণতরী

একজন মুক্ত কয়েদি, জেদি আর ভয়ঙ্কর, ছুঁড়ে ফেলে দিলো

পাটাতনের ওপরে একজন কেনা-গোলাম নাবিককে

কিন্তু তরোয়ালের এক ঝটকায়

কোটনা, দক্ষিণের ক্রস

আর খুনি. উত্তরমেরু

আরেকজনের কান থেকে

তার সোনার মাকড়ি হাতিয়ে নিলো ।

সবচেয়ে সুন্দর হলো তারা

যাদের চরিত্রে আছে অদ্ভুত গোলমাল ।

গিটার বেজে ওঠে সুরে ।

সমুদ্রের ফেনা থুতুকে ভিজিয়ে দ্যায় ।

আমরা কি একজন পাশার

মুখ থেকে

ফেলে দেয়া মানুষ ?

«

ওরা আমাকে পিটুনির কথা বলে আর আমি তোমার ঘুষির আওয়াজ শুনি।

কে আমাকে গড়িয়ে নিয়ে যায়, হারকামোন, আর আমাকে সেলাই করে দিলো

তোমার পরতের সঙ্গে ?

«

সবুজ-বাহু হারকামোন, উড়ন্ত রানি

তোমার রাতের গন্ধে

আর বনানি জেগে ওঠে

তার নামের আতঙ্কে

এই দুঃখি কয়েদি গান গায়

আমার রণতরীতে

আর ওর গান

আমাকে বিধ্বস্ত করে।

«

দাঁড়গুলো শেকল আর লজ্জার ভারে

ফেননিভ, নৌডাকাত, সমুদ্রের এই ষাঁড়গুলো

আর তোমার অঙ্গভঙ্গী হাজার বছরের পরিশ্রমে

তোমার স্মৃতিকে মনে পড়ায়

আর নৈঃশব্দ

রয়েছে তোমার স্পষ্ট চোখের রাতে ।

«

মৃত্যুর সুতো দিয়ে

এই রাতের অস্ত্রগুলো

মদে পক্ষাঘাতগ্রস্ত আমার বাহুকে ধরে নিয়ে গেল

নাসারন্ধ্রের নীলাভ

বিপথগামী গোলাপের চালনায়

যেখানে ঝোপের তলায় কাঁপতে থাকে এক সোনালী হরিণী

আমি নিজেকে অবাক করে তুলি আর নিজেকে হারাই

তোমার পথ ধরে

অবাক নদী

কথাবার্তার শিরা থেকে বয়ে যায় ।

«

এই চিন্তাগুলো যা তুমি পাহারা দাও তার গন্ধ আমার রসনায়

দুই মোড়া বাহুতে তোমার জুলফিতে বাঁধা

তোমার সোনার তলপেট খুলে দাও যাতে তাদের দেখতে পাই

তোমার  নুন মাখানো বুকের মধ্যে।

«

এখানে একটা কুপি জ্বলে

আমার আধখোলা কফিনের ওপরে

ভিজে ফুলে সাজানো

আর তাদের দেখতে থেকে

যেগুলো ডুবে গেছে  ।

«

একটা ইঙ্গিত করো, হারকামোন

তোমার বাহুকে একটু ছড়িয়ে দাও

আমাকে পথ দেখাও

যে পথে তুমি উড়ে যাবে ।

তুমি ঘুমোও কিংবা মারা পড়ো

কিন্তু তুমি আবার যোগ দেবে

এই পাগলিটার সঙ্গে

যেখানে  শেকলখোলা

কেনা-গোলাম নাবিকরা ওড়ে

আমার মতন ফিরে আসে

কারাগারে, বন্দরে

অসাধারণ পাতালকুঠুরিতে

উষ্ণ মদ খেয়ে টলমল করতে করতে ।

«

যে সুরেলা পাদ তুমি চেপে যাও

একদল রোগা কোটনাকে সবুজ ফুলে কারারুদ্ধ করে দ্যায়

নাসারন্ধ্র ফোলা, আমরা ওদের জন্য অপেক্ষা করবো

আর পৌঁছোবো ওদের কাছে

ঢাকা দেয়া রথে ।

«

আমার শৈশব রাতের ওপরে সবেমাত্র বেছানো

জ্বলতে থাকা কাগজে, এই রেশমকে মিশিয়ে

যা এক মোটা কোটনা  পিঙ্গলরঙা দ্যুতিতে মেলে ধরেছে

বহুদূরের শান্ত বাতাসে

আমার শরীর থেকে পালিয়ে গিয়েছিল।

«

তা সত্তেও, হরিণী ধরা পড়ে তার পাতার ফাঁদে

ভোরবেলায় জেগে ওঠে, এক স্বচ্ছ বিদায়

«

তোমার চোখের মধ্যে দিয়ে চলে যায়, তোমার স্ফটিক, আর প্রেমে পড়ে

সমুদ্রে একবিন্দু চোখের জল পড়ার পর, স্বাগত জানায় ।

«

বিপদে-পড়া একজন চোর, একজন চোর সমুদ্রে গেছে।

আর লোহার মুখ নিয়ে কতো কালো হারকামোন

ফিতে আর চুল ওকে টেনে কাদায় নামায়

কিংবা সমুদ্রে ? আর মৃত্যুর ?

তার ভাঙাচোরা গম্বুজকে সাজায়

পতাকার সেলাই-করা সুতোয়

মজায় হাসে কোটনাটা ।

মৃত্যু, যদিও, চালাক

আমি ঠাট্টা করার সাহস পাচ্ছি না ।

«

আমাদের গল্পের অতলে আমি ঘুমন্ত লাফ দিই

আর তোমার গলা দিয়ে নিজেকে কন্ঠরুদ্ধ করি

বেচারা সুগন্ধিত হারকামোন ।

মিষ্টি-মটরের মতন এক সমুদ্রে

মৃত্যু থেকে চুরি করা তোমার কেবিন-বয় সাহায্যের ডাক দ্যায়

মুখে তার পরিষ্কার ফেনা

আকাশের কালো সৈন্যরা যা ছিঁড়ে ফেলেছে

ফিরে গেছে ওই জলে ।

ওরা তাকে ফেনা আর মখমল জলপানায় সাজায়।

প্রেম তাদের পাগড়ি-পরা লিঙ্গকে নাচায়

( হরিণী, নীলাভ আর ফুটন্ত গোলাপকে সামলায় )

দড়িদড়া আর দেহগুলো গিঁটে শক্ত হয়ে গেছে ।

আর রণতরী নিরেট হয়ে উঠছিল ।

এক বিহ্বল শব্দ

জগতের শেষ প্রান্ত

সুন্দর ব্যবস্হাকে শেষ করে দিলো ।

আমি দেখলুম প্রবেশপথ কামড়ে ধরছে

বেড়ি আর জরি ।

«

হায়, আমার কয়েদি-হাত না মরেই মারা গেছে ।

বাগানগুলো বলে না হরিণীকে কোথায়  পরানো হচ্ছে

তুষারের পোশাক, আমার মহিমায় নিহত

ফেনার আলখাল্লায় ভালো করে পোশাক পরানো যেতো ।

«

কারাগার যা আমাদের ধরে রাখে তা পিছিয়ে যায় ।

নিজের বিপর্যয়ে চিৎকার করে

তোমার আঙুরলতায় এক নিশ্চল মুঠি

তোমার পাতাগুলোয় জড়িয়ে ধরে

তোমার শীতল সাজানো কন্ঠস্বরের

মূল পর্যন্ত

হারকামোন ।

চলো ফ্রান্সকে আমাদের রণতরীতে ছেড়ে দিই..

আমি যে কেবিন-বয় ছিলুম নিশ্চয়ই বজ্জাতদের আনন্দ দিয়েছে।

আমি অসাধারণ ফাঁসুড়ের সামনে দাঁড় বাইছিলুম

এই হাসিমুখ সৌন্দর্য আমাকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করেছিল

যেমনভাবে ফুলগুলো জড়িয়ে ধরে

( রোকেটের সেই গোলাপফুল, জংলিঘাসের ফাঁস খুলে )

আর ওর ঢাকনার তলায় গড়ে তুলেছে

এক আদরের কুঞ্জবন যেখানে গায়ক পাখিরা ওড়ে ।

মৃদু গানের সুরে পালিয়ে গেলো হরিণী

একজন রণতরীর কেনা-গোলাম নাবিকের ওপরে ঝুঁকে

স্বপ্নগুলো ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে চলে গেলো।

«

গাছের নীল শাখাগুলো

নুন থেকে আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে ।

আমার নিঃসঙ্গতা গান গায়

আমার রক্তের শুকতারাকে শুনিয়ে

সোনার বুদবুদে ভরা হাওয়া

আমার ঠোঁট চিপে গান বের করে ।

«

প্রেমের এক বালক গোলাপি পোশাক পরে

নিজের বিছানায় মোহসঞ্চারী অঙ্গবিক্ষেপ করছিল ।

মার্সাইয়ের এক ফ্যাকাসে মাস্তান, তার দাঁতে নক্ষত্র

আমার সঙ্গে প্রেমে হেরে গেলো ।

আমার হাত আফিমের বস্তার চোরাচালান করছিল

বিপর্যয়ের ভার — আর ঘন জঙ্গল থেকে

পরের পর চারণভূমিতে

ছিল ভ্রাম্যমাণ পথ

তোমার চোখের আলোয়

তোমার হাত পুনরাবিষ্কার করার জন্য

তোমার পকেটগুলো, ঈগলের বাসা

আর সেই বিখ্যাত জায়গা যেখানে  নৈঃশব্দ তুলে নিয়ে যায়

অন্ধকারের ঐশ্বর্য ।

বাতাসের বিরুদ্ধে আমার হাসি নিজেকে ভাঙচুর করছিল ।

আমি বিরক্ত হয়ে আমার ঘেয়ো মাড়ি উৎসর্গ করি

কারাগারের মশার ডিমগুলোকে

যেখানে আমাকে সম্প্রতি ঢোকানো হয়েছে ।

«

দেয়ালের ওপরের ছায়ায়, যা থেকে নৌচালক–

নুনে ক্ষয়ে যাওয়া ওর নখ

যদিও আমার মাপের লম্বা

রক্তাক্ত হৃদয়ের মাঝে চিন্তাকে বিভ্রান্ত করছিল

পরিলেখগুলো, অস্ত্র নামিয়ে রেখে

আমাদের কান্না হায়

তার কাছে দুর্বোধ্য

যে রাতের বেলায় লড়তে পারে না

যেখানে শব্দগুলো নেকড়ে—

ঝকঝকে নখ কি অনুমতি দেবে

আমার উন্মাদ চোখ যা গিলে ফেলতে চাইছে, তাকে

হাড় পর্যন্ত মাংস তুলে নেয়া
অ্যান্দোভোরান্তের নাম ?

«

গর্বিত লোকটা

যে লজ্জায় ভুগছিল

তাকে কাছাকাছি ধরে রেখেছিল একজন কাউন্টের সদস্যদল ।

ওরা তাকে হাঁটু আর ঘুষি মেরে পিটুনি দিচ্ছিল।

বজ্রাহত লোকেরা আমাদের চারপাশে গড়াগড়ি দিচ্ছিল ।

( আলোয় উজ্বল হাঁটু, কাদায়

হাঁটু থেকে হাঁটুতে, ডেকের ওপরে ছড়াচ্ছিল

হাঁটু, জলেতে যে ঘোড়াগুলো মাথা তুলছিল

বেঁকা হাঁটু, নাবিকদের হইচই )

সূর্য গোলাপ পাপড়ি ছড়াচ্ছিল দ্বীপপূঞ্জে ।

জাহাজ পাক খাচ্ছিল রহস্যময় মাইলের পর মাইল ।

নিচু গলায় ওরা হাঁকছিল

এক ঘোষণা যেখানে চুমু পাগলের মতন ফেরাফিরি করছিল

বিশ্রাম নিতে অসমর্থ । ফেনার ওপরে

আমার ভেতরে এক স্হির জলরাশি ছড়িয়ে দিচ্ছিল

ঠুনকো প্রতিবিম্বটাকে

যা এক অবিনাশী কেবিন-বয়ের ।

«

তোমার দাঁত, প্রভু, তোমার চোখ, আমাকে ভেনিসের কথা বলো !

তোমার কঠিন ঠ্যাঙের গর্তে ওই পাখিগুলো !

আমার আলস্য তোমার পায়ের শেকলকে

আমাকে এখানে ব্যবহার করার জন্য

ভুলের চেয়েও ভারি করে তোলে !

«

বালিশের কিনারা মিটিমিটি হাসে আর পর্দাগুলো যেন ইঁদুর ।

শার্শি থেকে তুমি আঙুল দিয়ে বাষ্প সংগ্রহ করো ।

তোমার কোমল ঘুম নিজেকে গিঁটে বেঁধে ফেলছে

আর তোমার মুখ কুঁচকে যায়

যখন তোমার সুন্দর চোখ উধাও হয়ে যায়

সমুদ্রের ছাদের ওপরে ।

«

ফাটা ঠোঁটের কিনারায়

একটা ছেলে যে ঢেউ আর বাতাসে খাপ খায়

নিশানগুলোর ভেতর দিয়ে অদ্ভুতভাবে বেরিয়ে যায়

আমি প্রায়ই দেখেছি একটা সিগারেটের মোচড়

আমার মেয়েলি স্কার্টের ভেতরে ।

কুড়ি বছর বয়সী এক কেনা-গোলাম নাবিক

যাকে নিয়ে মশকরা আর  ঠাট্টা করা হয়

দেখলো নিজেই মরছে

নৌকোর দেয়ালে গেঁথে দিয়ে ।

«

হারকামোন, তুমি কি ঘুমোও, তোমার মুণ্ডু ঘোরানো

তোমার মুখ জলেতে, স্বপ্ন দেখে ফিরেছে কি ?

তুমি আমার বালির ওপরে হাঁটো যেখানে ভারি ফলগুলো ঝরে পড়ে

যখন কিনা অদ্ভুতভাবে তোমার মখমল অণ্ডকোষ

আমার চোখে ফেটে পড়ে

এক ইন্দ্রজালিক গাছের ফুলে-ফুলে কুসুমিত ।

তোমার রুদ্ধকন্ঠের স্বরে মরে যাওয়া সম্পর্কে যা আমি ভালোবাসি

তা হল এই আঁটো ক্যানেস্তারায় গরম জল ফুটতে থাকা ।

অনেক সময়ে তুমি বলো একটা শব্দ আর তার মানে হারিয়ে যায়

যদিও যে কন্ঠস্বর তা ওগরায় তা বেশ ফুলে ওঠে

যা এই আহত কন্ঠস্বরে ভেঙে পড়ে ।

«

তোমার থুতনি থেকে কুষ্ঠরক্তের বন্যা বইতে থাকে

কোনো যোদ্ধার ক্রোধের চেয়েও ভয়ানক

আমার গর্বিত ম্যানড্রিন ।

«

সবে মাত্র জোড়া লাগানো হয়েছে

এমন গাছের শাখাগুলো

আমি অন্য ফুলেদের থেকে চুরি করেছি

যাদের পা একসময়ে দৌড়োতো

আমার বাগানে হাসতে-হাসতে

যেখানে পড়ে আছে আমার ছায়া

গোলাপগুলোকে স্নান করাচ্ছে

আমার গায়ে ছেটাচ্ছে জলরাশি ।

«

( একমুঠো চারাডাঁটা, উথ্থিত দলমণ্ডল

পালকের দলমণ্ডল আর নেতৃত্বের সদস্যরা )

তাদের দ্রুত আদরে এক মারাত্মক বাতাসের আওয়াজ

জল পড়ে যায়

আমার গোড়ালির ধাক্কায় ।

«

গলির ভেতর থেকে, গরম ফুলগুলো

সন্ধ্যাবেলায় ছেড়ে চলে যায়

আমি একা, স্যাঁতসেতে পতাকায় মোড়া

তোমাদের মধ্যে কে আমাকে খুলে দেবে

এই স্যাঁতসেতে ভাঁজগুলো থেকে

যেগুলো নির্দয় আগুনের ?

«

তোমার হাসির মতন কোনো শীতল দেশ কি আছে ?

তোমার জিভ চেটে নিচ্ছে প্রবালের ওপরের তুষার

জলের পানার নুন আর তলপেটের নীলাভ

আর জলতরঙ্গের মতন তোমার স্পন্দিত দেহের গান ।

«

হরিণীকে  অনুসরণ করার জন্য

আমি যেতে যেতে খেলাটা তৈরি করি।

একজন উত্তেজিত রানি, নির্বাসিত আর বেশ মিষ্টি

প্রতিটি পদক্ষেপে যে কুমারীত্ব হারিয়েছে

তাকে  জটিলতামুক্ত করেছে

এক হরিণীর ভিজে পোশাক ।

শ্রদ্ধায় জমে বরফ

আমি তোমার মুখের রেখায় দেখি

সমুদ্রের তীরে শেকলবাঁধা রানি ।

ঘুমোও, সুপুরুষ হারকামোন

যে খুনি গিরিসঙ্কট পেরিয়ে যায়

আমার ডানা-লাগানো জুতো পরে ।

«

সেই ভঙ্গুর মুহূর্তে যখন সবকিছু সম্ভব ছিল

আমরা হাঁটছিলুম অবাক অথচ

শান্তিময় নীলাভে ।

রণতরীর বিশৃঙ্খলা এক সৌন্দর্যের

মিষ্টতার চেয়ে কম অদ্ভুত

এক মোহমুগ্ধ গ্রাম

এক বিষাদের বাতাস

তার উৎসবগুলোকে নিয়ে

( তুষার পড়ছিল, কি যে শান্তি

এই স্হির ঝড়েতে ! )

ভায়োলিনের আর ওয়ালৎস নাচের ।

বাহু এগিয়ে দ্যায় নিরানন্দ দেহজ্যোতিতে

মেয়েটির ছিল পবিত্র বোঝা

মাস্তুলের, থামের, দড়ির আর ধড়ের ।

ওর পাতলা ত্বকের তলায় ও মুচড়ে উঠছিল ।

আকাশ তার খ্রিস্টবন্দনা গাইছিল

আর আমাদের হৃৎস্পন্দন গুনছিল ।

এই ভয়ানক ব্যবস্হার অনমনীয়তা বেশ কঠিন

যেখানে কাঁপছিল সৌন্দর্য ।

আমরা প্রাসাদগুলোর ভেতরে নিঃশব্দে চলাফেরা করলুম

যেখানে মৃত্যু বিধিসন্মত  জীবন কাটিয়েছে ।

আমার আর ইচ্ছে ছিল না, গায়ে জোরও ছিল না

বাতাসে উঠে পড়ার, তার দরকারই বা কি ?

সবচেয়ে সুন্দর বন্ধুরা

পৃথিবীর সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে

আর সমাধিগুলো

বাতাসের সঙ্গে ।

«

আর সেই সব উজ্বল শিশুরা নৌকোর পালে উড়ছিল ।

পুরো গতিতে, স্বপ্ন তোমাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল

পাক খেয়ে সরে যাচ্ছিল ।

ছেঁড়া মালাটা ছিল প্রেমের গিঁটে বাঁধা

মৃত্যুর পায়ের সঙ্গে

আর মৃত্যুকে করা হয়েছিল প্রতারিত ।

আমি অনুভব করলুম এক আতঙ্কময় নিশ্চল মুহূর্ত

কেননা আমি এই সুন্দর ছলনাময় জগতের কথা জানতুম

যাকে ধরে রেখেছে অনন্তকাল

বেশি কঠিন আর বেশি ঘন

মিশরের তুলনায়

কম নোংরা নয় ।

গিঁট দিয়ে গলা টিপে মেরে ফেললো ওরা কয়েকটা ষাঁড়কে

তিনজন মানুষের তৈরি

আর নোনা বাতাসের হাত

তাদের পাপকে মাফ করে দিয়েছে ।

রণতরীটা ছিল একটা নাগরদোলা

এক সন্ধ্যার ক্রোধে ভেঙে ফেলা ।

আর তবু কিন মহিমা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো !

জাঁকজমকভরা স্মৃতিস্তম্ভ :

দেহের জন্য সাধারণ কফিনও নেই

স্বপ্নের মাঝে

আমাদের যত্নে সুবাসিত করা হয়েছিল !

তোমার স্পঞ্জের হাত দিয়ে টেপো

বের করে আনো তোমার ভালোবাসার আঙুলগুলো ।

আমি জানি কেমন করে ফিরে আসতে হয়

আঙ্গিকহীন পরিবর্তনে ।

যদি তুমি তোমার পোশাককে ছোঁও

আমার আঙুলের ডগায় কুয়াশা জমে যাবে

তুমি আমাকে নীল বাতাস থেকে বিগলিত করে আনো, পশু

আর বদলে দাও অশ্রুবিন্দুতে

তোমার অদ্ভুত অক্ষিগোলক থেকে ঝরে পড়ে

তোমার শুকনো পায়ে

তোমার থেকে আমার বাঁধন খুলে দ্যায়

আমার হরিণী ।

«

উত্তাপ এমন গোলাপি, তোমার গালে বাতাস করো

নৈঃশব্দকে স্ফীত করে তোলে এক দীর্ঘশ্বাস ।

ধীরেসুস্তে চলমান ছায়ায় বাসা বানায় কাঁটাগাছ

তাই আমি একা থাকি ।

কে দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে আসে, রাত্রি ?

তোমার বনানীর ওপরে বাঁধা

অসংলগ্ন এক নৌকো

আকাশে জেগে ওঠে ।

হে অবলা হরিণী,

তোমার কানের কথা শুনতে পায়

শাখাদের অনুচ্চ মর্মর

যেমন সে সোনালী বাতাসের গান শোনে

বরফকে ভেঙে ফেলছে…

«

যারা বিষ দ্যায় তাদের দল দড়ি থেকে ঝুলছে

অপরাধীরা পরস্পরের পোঁদ মারছে

বয়সের তফাত ঘুচিয়ে ।

পরম ক্লান্তি থেকে এক ঘুমন্ত শিশু

উলঙ্গ ফিরে এলো, বমি-করা বীর্যে নোংরা ।

নৌকোর পালের সবচেয়ে হৃদয়-বিদারক কান্না

তীর ছাড়ার জন্য তৈরি হয়েছিল

কোনো নক্ষত্রের বিন্দুর মতন

যখন এক বালকের হৃদয় আর ঠোঁট

আমার কাঁধে বিশ্রাম নিচ্ছিল

যেন আমাকে মুকুট পরিয়ে দিচ্ছে

আর সম্পূর্ণ করছে ভাঙচুরগুলো ।

তোমার দেশ খুঁজে পাবার  প্রয়াস আমার বিফলে গেলো ।

পূতিগন্ধময় আর একান্তবাসী আমার মাথা ডুবে যাচ্ছিল

সুগন্ধিত স্বপ্নের সমুদ্রের তলদেশে

আমি জানি না কতোটা অবিশ্বাস্য গভীরতায় ।

আচমকা এক গ্রিক বাগবিতণ্ডায় দুলে উঠলো জাহাজ

আর শেষ হাসি হেসে

আমি তা মুছে ফেললুম ।

গালাগালের আকাশে ফুটে উঠলো প্রথম নক্ষত্র ।

সেই রাত ছিল যার নাম

নৈঃশব্দ, আর চিৎকার

এক সুপুরুষ কেনা-গোলাম নাবিকের

যে জায়গাটা জানতো

আমাদের অসন্তুষ্ট কুঞ্জবনে

যেখান হরিণী কেঁদে ফ্যালে

রাতের এক প্রাণী, যার অলস ট্রাউজার

আমার ফাঁকা নৌকোর জন্য পতাকা নামিয়ে নিলো ।

আমার নীল হাতের মুঠোয় জলের গোলাপ বন্ধ হলো ।

( ইথার স্পন্দিত হলো অনুগত হয়ে

আমার লিঙ্গের লাফালাফিতে ।

এই প্রাসাদগুলো ঝুলে আছে রাতের মখমলে

যার ভেতর দিয়ে প্রবেশ করলো আমার শিশ্ন

আর তুমি চলে গেলে নিঃসঙ্গ

সরাসরি উলঙ্গ নক্ষত্রের দিকে ঝাঁপিয়ে

শীতল বনপথে দ্রুত ঘুরে বেড়াতে লাগলে )

হারকামোন, তুমি নিজেকে আকাশে ছড়িয়ে দাও !

আর ক্ষুব্ধ হয়ে, উজ্বল আকাশ ঢেকে যায়

মজার ইশারায় ।

«

গান গাইছিল একজন আমোদপ্রিয়

রণতরীর স্বর্গ থেকে

বরফজমাট নক্ষত্র থেকে

সৌরজগতের জন্য ।

«

স্বর্গে  আর শাশ্বত রাতে আরোহণ করে

যে রণতরীকে আকাশের বিশুদ্ধ বিষাদ আটকে দিয়েছে

একজন কুমারীর পায়ের কাছে সে নিজের মৌমাছিদের ডাকছিল ?

«

নক্ষত্রেরা, আমি তোমাদের বমি করি, আর আমার যন্ত্রণাও একইরকম

হারকামোন, তোমার মৃত ঝুলন্ত হাতের মতন ।

তোমার পাদুটো আর বাহু দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরো

ওহ আমার এলোমেলো গোলাপ

কিন্তু তোমার ডানা আবার বন্ধ করো ।

আমরা পেছনে কিছু ফেলে যাবো না

কোনো নথি, কোনো দড়ি, কোনো সূত্র

চলো লাফিয়ে উঠি রথে

আমি শুনতে পাচ্ছি তোমার

পাতলা গেঞ্জির তলার স্পন্দন ।

«

কিন্তু আমার আর আশা নেই

ওরা আমার থেকে  ডাঁটাগুলো ছেঁটে ফেলেছে ।

বিদায় সতেরো বছর থেকে

কুড়ি বছরের ফেনা

এই সন্ধ্যার ফেনাদের বিদায় ।

«

চাঁদ পর্যন্ত সমুদ্রযাত্রা

নাকি সমুদ্র আমি জানি না

গোলাপি গলার হারকামোন

ফাঁসির দড়িতে বাঁধা ।

«

ওহ আমার কোতলকরা সৌন্দর্য, তুমি হেঁটে যাও

সমুদ্রের তলদেশে

প্রতিটি পদক্ষেপ তোমাকে নিয়ে যায়

তোমার তীব্র সুগন্ধের ঢেউয়ের ওপর দিয়ে

যা কুঁকড়ে যায় আর পতাকা ওড়ায়

যেমন যেমন তুমি অতিক্রম করো

খিলানগুলোর গোলোকধাঁধা ।

«

তোমার পুকুরের জলে, কালো উলুখাগড়া অনুসরণ করে

তোমার ধড় আর তোমার বাহু থেকে

মৃত্যু সম্পর্কিত গুজবের জট পাকিয়ে

ঘোড়াদের চেয়েও শক্তিশালী

পরস্পরের সঙ্গে বিজড়িত

একজন রানির

জঙ্ঘায় ।

 

টীকা : রণতরী অর্থাৎ পায়ু ; জেনেকে যে মেত্রে পেনাল কলোনিতে পাঠানো হয়েছিল সেখানে মাঠের মাঝখানে একটা রণতরীর মডেল ছিল কয়েকদিদের নাবিকের শিক্ষানবিশীর জন্য । যাদের গায়ে জোর ছিল তারা এই রণতরীতে কমজোরদের পায়ুসঙ্গম করতো  । হারকামোন ছিল মৃত্যুদণ্ড পাওয়া কয়েদি । কোটনা অর্থাৎ সমকামিদের মধ্যে যে সক্রিয়। সোনালী হরিণী অর্থাৎ কচি ছেলে, যা মেত্রে কলোনিতে জেনেকে মনে করা হতো । সুগন্ধের প্রসঙ্গ সমকামের সময়ে ব্যবহার করা সুগন্ধ, যেমন মেনথল দেয়া ভেসলিন । সৌন্দর্য সব সময়ে সৌম্যকান্তি পুরুষের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত । হাতের তালু অর্থাৎ সমকামের জন্য ফোসলানো । অবিনাশী অর্থাৎ ধর্ষণ । সিগারেট স্ল্যাঙ হিসাবে ব্যবহৃত লিঙ্গের কথা বলতে । ম্যানড্রিন শব্দটা দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে– একজন দুর্ধর্ষ দস্যু ছিল ম্যানড্রিন নামে আর পেনাল কলোনিতে লেদ মেশিনের ব্লেডকে বলা হতো ম্যানড্রিন ।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

জাঁ জেনে-র কবিতা : ‘মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত কয়েদি’

Image result for jean genet

জাঁ জেনের কবিতা : মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত কয়েদি 

অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

 

কবিতাটি সম্পর্কে জাঁ জেনের বক্তব্য : “আমি এই কবিতাটি আমার বন্ধু মরিস পিলোর্গেকে উৎসর্গ করেছি, যার উজ্বল মুখ আর দেহ আমার ঘুমহীন রাতগুলোয় ঘাপটি মেরে ঢোকে। আত্মার আত্মীয় হিসাবে তার জীবনের শেষ চল্লিশ দিন তার সঙ্গেই আমি বেঁচেছি । সে ছিল পায়ে চেন বাঁধা অবস্হায় এবং অনেকসময়ে দুই হাতেও, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের অন্ধকার কুঠুরিতে, সাঁ-ব্রিয়েক কারাগারে । সংবাদপত্রগুলো আসল ব্যাপারটাই ধরতে পারেনি । তারা নির্বোধ প্রবন্ধগুলোর সঙ্গে সায় দিয়েছে যেগুলো পিলোর্গের মৃত্যু নিয়ে আহ্লাদ করেছিল । ইউভ্রে সংবাদপত্র লিখেছিল, ‘এই বালক ছিল আরেক নিয়তির উপযুক্ত’ । সংক্ষেপে, তারা পিলোর্গেকে হেয় করেছিল । আমি তাকে চিনতুম, সে ছিল দেহ ও আত্মায় সৌম্যদর্শন ও মহৎ । প্রতিদিন সকালে যখন আমি আমার কুঠুরি থেকে তার কুঠুরিতে যেতুম, ওর জন্য কয়েকটা সিগারেট নিয়ে — জেলার সাহেবকে ধন্যবাদ, কেননা তিনি পিলোর্গের সৌন্দর্য, যৌবন ও অ্যাপোলোর মতন মাধুর্যে বিমোহিত ছিলেন — পিলোর্গে গুনগুন করে গান গাইতো আর হেসে আমাকে বলতো, সেলাম সকালবেলার জনি । পিলোর্গের বাড়ি ছিল পুই দ্য দোমে, সেখানকার টান ছিল ওর কথাবার্তায় । পিলোর্গের ঐশ্বর্ষময় করুণার সৌষ্ঠবে ঈর্ষান্বিত জুরিরা, অদৃষ্টের ভূমিকা নিয়ে, ওকে কুড়ি বছরের জন্যে সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছিল, কেননা ও সমুদ্রের ধারে কয়েকটা বাড়িতে ডাকাতি করেছিল আর পরের দিন নিজের প্রেমিক এসকুদেরোকে খুন করেছিল ; এসকুদেরো পিলোর্গের এক হাজার ফ্রাঁ চুরি করে নিয়েছিল । এই একই আদালত পরে আদেশ দিয়েছিল যে পিলোর্গের মাথা গিলোটিনে রেখে ধড় থেকে আলাদা করে দেয়া হোক । ১৭ মার্চ ১৯৩৯ সালে পিলোর্গেকে রাষ্ট্র ওইভাবে হত্যা করে । মাত্র ২৫ বছর বয়সে মারা যায় মরিস পিলোর্গে ।”

এই কবিতাটিতে কয়েদি ও সমকামীদের জগতে প্রচলিত বহু ইশারা প্রয়োগ করেছেন জাঁ জেনে । জেনে তাঁর কবিতায় পাঠকদের নৈতিক ও ঐতিহ্যগত মূল্যবোধে অন্তর্ঘাত ঘটাবার কাজ করেছেন । তিনি পাপ, পতন, ক্লেদ ইত্যাদিতে পেয়েছেন সৌন্দর্য এবং তার গুণকীর্তন করেছেন, গুরুত্ব আরোপ করেছেন নিজের অসাধারণত্বে, নিষ্ঠুর ও বেপরোয়া অপরাধীদের করে তুলেছেন নিরুপম আইকন,  সমকামের বিশেষ আচার-আচরণ ও শব্দভাঁড়ারকে নির্দিধায় ব্যবহার করেছেন এবং হিংস্রতা ও বিশ্বাসঘাতকতার বর্ণনাকে উপভোগ করেছেন ।

—————————————————————————————————————–

জেলের উঠোনে বাতাস একটি হৃদয়কে গড়িয়ে নিয়ে চলেছে

গাছ থেকে ঝুলছে  ফোঁপাতে থাকা এক দেবদূত

শ্বেতপাথরকে পাকিয়ে  নভোনীল থাম

গড়ে তুলছে জরুরি দরোজা

তা আমার রাতের জন্য খোলা ।

এক বেচারা পতনরত পাখি আর ছাইয়ের স্বাদ

দেয়ালে ঘুমন্ত চোখের স্মৃতি

আর এই দুঃখে ঠাশা মুঠো যা নভোনীলকে হুমকি দিয়ে

তোমার মুখ নামিয়ে আনে

আমার হাতের

গহ্বরে ।

 

এই কঠিন মুখ, মুখোশের চেয়েও হালকা

দামি মণিরত্নের চেয়েও আমার হাতে ভারি ঠেকছে

প্রতিরোধের আঙুলে ; ভিজে গেছে কান্নায়

অন্ধকারাচ্ছন্ন ও ভয়ঙ্কর

এক সবুজ চাদর তাকে

ঢেকে রেখেছে ।

তোমার মুখ কঠোর । একজন গ্রিক মেষপালকের মতন

আমার বন্ধ দুই হাতের মধ্যে কাঁপছে

তোমার মুখ এক মৃত নারীর মতন

তোমার চোখ দুটো গোলাপ

আর তোমার নাক হতে পারে

এক শ্রেষ্ঠ দেবদূতের ঠোঁট ।

যদি তোমার মুখ গান গায়, তাহলে কোন নারকীয় পাপ

তোমার দূষিত বিনয়ের ঝিলমিলে তুষারকে গলিয়ে দিয়েছে

ইস্পাতের উজ্বল নক্ষত্র দিয়ে তোমার চুলের ধুলো ঝেড়েছে

আর কাঁটার মুকুট পরিয়েছে তোমার মাথায় ?

আমাকে বলো কোন উন্মাদ দুর্ভাগ্য আচমকা তোমার চোখকে  মেলে ধরে

এক বিষাদ যা এতো তীব্র যে বুনো দুঃখ

তোমার শীতল চোখের জল সত্বেও

তোমার গোল মুখকে আদর করতে আতঙ্কিত হয়

শোকের মিষ্টি হাসি হেসে ?

আজ রাতে, সোনালী বালক, “চাঁদের ফেনা” গানটা গেও না

তার বদলে মিনারবাসিনী এক রাজকন্যা হও যে স্বপ্ন দেখছে

আমাদের দুর্ভাগা প্রেমের — কিংবা ফরসা কেবিন বালক

যে উঁচু মাস্তুল থেকে নজর রাখছে ।

আর সন্ধ্যায় জাহাজ-পাটাতনে গান গাইবার জন্যে নেমে আসবে

নাবিকদের মাঝে গইবে ‘সমুদ্রের নক্ষত্রদের জয়’

ন্যাড়ামাথা আর হাঁটুগেড়ে, ধরে রেখেছে

তাদের বজ্জাত হাতে

লাফখোর লিঙ্গকে ।

তোমাকে ধর্ষণ করার জন্য, সুন্দর হঠকারী কেবিন বালক

পালোয়ান নাবিকরা এতোক্ষণে তাদের ট্রাউজারের মধ্যে টনটন করে উঠছে

আমার প্রেম, আমার প্রেম, তুমি কি আমার চাবি চুরি করবে

আমার জন্য মেলে ধরবে

শিহরিত মাস্তুলের আকাশ ?

যেখানে তুমি রাজকীয় কায়দায় পোঁতো শাদা পাগলকরা তুষার

আমার পৃষ্ঠতলে, আমার নিঃশব্দ কারাগারে :

আতঙ্কিত, মৃতের মাঝে ফুটে ওঠা ল্যাভেণ্ডার

মৃত্যু তার গৃহিণীদের নিয়ে আসবে

আর আনবে মায়াপুরুষ প্রেমিকদের…

নিজের মখমল পদক্ষেপে, একজন শিকারি পাহারাদার পাশ কাটায়

আমার চোখের খোদলে তোমার স্মৃতি রয়ে গেছে

আমরা ছাদের ওপর চড়ে হয়তো পালিয়ে যেতে পারি

ওরা বলে গিয়ানা

ভীষণ গরম জায়গা ।

ওহ দ্বীপান্তরের কলোনির মিষ্টতা

অসম্ভব আর বহুদূর

ওহ পালাবার আকাশ, সমুদ্র আর নারিকেলসারি

স্বচ্ছ ভোরবেলা, মোহময় সন্ধ্যা

শান্ত রাত, কামানো মাথা

আর চিকনত্বক গাণ্ডু !

ওহ প্রেম, চলো দুজনে মিলে এক বলিষ্ঠ প্রেমিকের স্বপ্ন দেখি

ব্র্‌হ্মাণ্ডের মতন বিশাল

যদিও তার দেহ ছায়ার ময়লামাখা

সে আমাদের এই স্বর্গীয় কারা-আশ্রয়ে ল্যাংটো করে শেকলে বাঁধবে

ওর সোনার দুই উরুর মাঝে

ওর পেটের ওপরে

সিগারেট ফুঁকতে-ফুঁকতে

দেবদূতের দেহ থেকে কেটে গড়ে নেয়া এক ঝলমলে কোটনা

ফুলের তোড়ার ওপরে শক্ত হয়ে ওঠে

কারনেশন আর জুঁইফুলের তোড়া

যেগুলো তোমার উজ্বল হাত কাঁপতে কাঁপতে নিয়ে যাবে

ওর অভিজাত মর্যাদায়, বিকৃতমস্তিষ্ক

তোমার চুমুর ছোঁয়ায় ।

আমার মুখগহ্বরে দুঃখ ! উথলে উঠছে তিক্ততা

আমার অসুখি হৃদয়কে ফুলিয়ে তুলছে ! আমার সুগন্ধী ভালোবাসাগুলো

দ্রুতই বিদায় নেবে, বিদায় ! বিদায়

প্রিয়তম অণ্ডকোষ ! আমার অবরুদ্ধ কন্ঠস্বরকে

থামিয়ে, বিদায়

হে বেহায়া লিঙ্গ !

গান গেও না, তুমি ফন্দিবাজ, বর্বরতা দেখাও !

পবিত্র উজ্বল গলার  কচি মেয়ে হয়ে ওঠো

আর যদি তুমি ভয় না পাও, সঙ্গীতময় বালিকা

আমার অন্তরজগতে বহুকাল আগে মৃত

কুঠার দিয়ে কেটে বিচ্ছিন্ন

আমার মাথা ।

আদরের বালক, কতো সুন্দর, লিলাকফুলের মুকুট তোমার মাথায় !

আমার বিছানায় নত হও, আমার জাগ্রত লিঙ্গকে

তোমার সোনালি গালের পরশ নিতে দাও । শোনো

সেই খুনি, যে তোমার প্রেমিক

হাজার স্ফূলিঙ্গ জরিয়ে

নিজের গল্প শোনায় ।

ও গান গেয়ে বলে যে তোমার দেহকে পেয়েছিল, তোমার মুখ

আর তোমার হৃদয় — যা এক দ্রুতগতি

শক্তিশালী অশ্বারোহীও

কখনও ফাঁক করতে পারবে না । ওহ বালক

তোমার গোলাকার হাঁটু পাবার জন্য

তোমার শীতল গলা, নরম হাত

তোমার বয়সী হতে হবে !

উড়তে হলে, তোমার রক্তাক্ত আকাশে উড়তে হলে

আর মৃতদের নিয়ে অনন্যসাধারণ মূর্তি গড়তে হলে,

এখানে আর সেখানে জড়ো করা , চারণভূমিতে, ঝোপে,

ওর মৃত্যুর জন্যে তৈরি করা ঔজ্বল্যে

আছে ওর বয়ঃসন্ধির আকাশ…।

বিষণ্ণ সকালগুলো, মদ, সিগারেট…

তামাকের ছায়া, নাবিকদের কলোনি

আমার জেলকুঠুরিতে খুনির প্রেত আসে

এক বিশাল লিঙ্গ দিয়ে আমাকে ঠেলে দ্যায়

আমাকে আঁকড়ে ধরে ।

«

এক কালো জগতকে যে গান অতিক্রম করে যায়

তা হলো এক কোটনার কান্না যে তোমার সঙ্গীতে আনমনা

তা ফাঁসিতে লটকানো একজন মানুষের

যে কাঠের মতন শক্ত

তা এক কামার্ত চোরের

মায়াময় আহ্বান ।

ষোলো বছরের এক কয়েদি সাহায্য চায়

কোনো নাবিক ওই আতঙ্কিত কয়েদিকে সাহায্য করতে এগোয় না

আরেকজন কয়েদির পা মুচড়ে

শেকলে বাঁধা ।

আমি নীল চোখের জন্য খুন করেছি

এক উদাসীন সৌন্দর্যকে

ও আমার শ্বাসরুদ্ধ ভালোবাসা কখনও বোঝেনি

তার কালো শকটে, এক অচেনা প্রেমিক

আমাকে পুজো করে মৃত

জাহাজের মতন সুন্দর ।

যখন তুমি অপরাধ করার জন্য তৈরি

নির্দয়তার মুখোশ পরে, সোনালি চুলে ঢাকা

বেহালার মিহি পাগলকরা সুরে

তোমার কেলেঙ্কারির সমর্থনে

কচুকাটা করো এক মহিলাকে ।

এরকম সময় সত্বেও, লোহাব গড়া এক রাজকুমার

হৃদয়হীন আর নিষ্ঠুর, পৃথিবীতে দেখা দেবে

যেন কোনো বুড়ি কাঁদছে ।

সর্বিপরি, ভয় পেও না

চোখ ধাঁধানো ঔজ্বল্যের সামনে ।

এই প্রেত ভিতু আকাশ থেকে নেমে আসে

অপরাধের কামোন্মাদনায় । এক বিস্ময়কর বালক

অনন্যসাধারণ সৌন্দর্য নিয়ে ওর দেহ থেকে জন্মাবে

ওর বিস্ময়কর লিঙ্গের

সুগন্ধিত ধাতুরস থেকে ।

পশমের জাজিমের ওপরে কালো গ্র্যানিট পাথর

এক হাত পাছায়, শোনো ও কেমন করে কথা বলে

সূর্যের দিকে ওর পাপহীন শরীর

আর ফোয়ারার কিনার পর্যন্ত

শান্তিময়তায় প্রসারিত ।

রক্তের প্রতিটি উৎসব এক টগবগে ছোকরাকে উৎসর্গ করে

যাতে প্রথম পরীক্ষায় বালকটি সমর্থন যোগাড় করতে পারে

তোমার মানসিক যন্ত্রণা আর ভয়কে তুষ্ট করো

ওর শক্ত প্রত্যঙ্গকে শোষণ করো

কাঠিবরফের মতন ।

তোমার গালে স্পন্দিত হতে-থাকা লিঙ্গকে আলতো চিবোও

তার ফোলা মুখকে চুমু খাও, ঝাঁপ নিতে দাও

আমার প্রত্যঙ্গকে

তোমার গলার ভেতরে, এক শোষণেই গিলে নাও

ভালোবাসার রুদ্ধকন্ঠ, ফেলে দাও থুতুর সঙ্গে

মুখ খুলে !

হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা করো টোটেম-গাছের মতন

আমার উল্কিদাগা ধড়, কান্না না পাওয়া পর্যন্ত তাকে পুজো করো

আমার যৌনতা তোমাকে চুরমার করে দেবে

প্রহার করবে অস্ত্রের চেয়ে বেশি

যা তোমার ভেতরে প্রবেশ করবে ।

জিনিসটা তোমার চোখের সামনে লাফিয়ে ওঠে

সামান্য মাথা নামিয়ে দ্যাখো কেমন লাফিয়ে ওঠে

এতো সুন্দর দেখতে যে চুমু খেতে ইচ্ছে করে

তুমি ঝুঁকে ফিসফিস করে তাকে বলো :

“মাদাম” !

মাদাম, আমার কথা শোনো ! মাদাম, আমরা এখানে মারা যাবো ।

খামারবাড়িটা ভুতুড়ে ! জেলখানা ভয়ে কাঁপছে !

সাহায্য করো, আমরা যাচ্ছি ! আমাদের তুলে নিয়ে চলো

আকাশে তোমার ঘরে

হে দয়ার ম্যাডোনা !

সূর্যকে হাঁক পেড়ে ডাকো যাতে সে এখানে এসে আমাকে সান্ত্বনা দেয়

গলাটিপে মারে এই গেরস্ত মোরগগুলোকে !

জল্লাদকে ঘুম পাড়াও !

আমার জানালায়  নষ্টামির হাসি হাসে দিন

জেলখানা হলো মারা যাবার বিস্বাদ পাঠশালা ।

«

তোমার হাসিমাখা নেকড়েদাঁতকে আমার ঘাড়ে বিশ্রাম নিতে দাও

আমার ঘাড়ে আস্তরণ নেই আর ঘৃণাহীন

বিধবার হাতের চেয়েও হালকা আর ঐকান্তিক আমার হাত

আমার কলারের ভেতরে হাত বুলোও

এমনকি তা তোমার হৃদয়কে স্পন্দিতও করে না

ওহ এসো আমার সুন্দর সূর্য

ওহ এসো আমার স্পেনের রাত

আমার দৃষ্টির সামনে এসো যা কাল মারা যাবে

আমাকে এখান থেকে অনেক দূরে নিয়ে চলো

যাতে বিকারের উন্মত্ততায় ঘুরে বেড়াতে পারি ।

আকাশ জেগে উঠতে পারে, নক্ষত্রেরা ঝংকার তুলতে পারে

ফুলেরা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে পারে, আর চারণভূমিগুলোতে

কালো ঘাসগুলো আহ্বান করতে পারে শিশিরকে

যেখানে সকাল তৃষ্ণা মেটাতে আসে

হয়তো ঘণ্টাধ্বনি হবে : আমি একা

মারা যাবো ।

ওহ এসো গো আমার গোলাপি আকাশ, ওহ এসো আমার সোনালি ঝুড়ি !

রাতে শাস্তিপ্রাপ্ত তোমার জেলবন্দীকে দেখে যাও

মাংস খুবলে নাও, মেরে ফ্যালো, ওপরে ওঠো, কামড়াও

কিন্তু এসো । তোমার গাল রাখো

আমার গোল মাথার ওপরে ।

আমরা এখনও ভালোবাসার কথা বলা শেষ করিনি

আমরা এখনও শেষ করিনি আমাদের চুরুট ফোঁকা

আমরা অবাক হই কেন আদালত দণ্ড দ্যায়

একজন সৌম্যদর্শন খুনিকে

যার তুলনায় দিনকেও ফ্যাকাশে মনে হয় ।

হে প্রেম, আমার মুখগহ্বরে এসো । হে প্রেম, দরোজা খুলে দাও !

নেমে পড়ো, আলতো হাঁটো, দালানগুলো পেরিয়ে যাও

মেষপালকের চেয়েও আলতো পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে উড়ে যাও

মৃত পাতাদের ঝটিতি চলে যাবার বদলে

বাতাস তুলে নিয়ে যাবে ।

ওহ দেয়ালের ভেতর দিয়ে যাও, আর যদি চলে যেতে  হয়

আলসের ওপর হাঁটো — ছাদের ওপরে, সাগরের ওপরে

আলোয় ঢেকে নাও নিজেকে, হুমকি প্রয়োগ করো, প্রার্থনা ব্যবহার করো

কিন্তু এসো, আমার কুক্কুরি

আমার মৃত্যুর এক ঘণ্টা আগে এসো।

«

আমার দোলখাবার কুঠুরিতে, ঝাউগাছের গানের সামনে উন্মুক্ত

( নাবিকদের গিঁটপাকানো দড়িতে ঝুলছে

যাদের সকালের স্বচ্ছতা সোনালী করে তোলে ) দেয়ালের ওপরের খুনিরা

নিজেদের ভোরবেলা দিয়ে মুড়ে রাখে ।

কে পলেস্তারার ওপরে বাতসের গোলাপ খোদাই করেছে ?

কে আমার বাড়ির স্বপ্ন দ্যাখে

হাঙ্গেরির তলদেশ থেকে ?

কোন বালক আমার পচা খড়ের ওপরে শুয়েছে

ঘুমভাঙার মুহূর্তে

বন্ধুদের কথা মনে করে ?

আমার উন্মাদনাকে অস্হিরতা দাও, জন্ম দাও আমার আনন্দ থেকে

সৌম্যকান্তি সেনায় ঠাশা এক সান্তনাদায়ক নরক

কোমর পর্যন্ত নগ্ন — আর স্বকামী পুরুষের ট্রাউজার থেকে

টেনে নামাও গন্ধের অদ্ভুত ফুল

যা আমাকে বিদ্যুতের মতন আঘাত করবে ।

কে জানে কোথা থেকে উপড়ে তোলো উন্মাদ অঙ্গভঙ্গীগুলো–

বালকদের পোশাক খোলো, অত্যাচার আবিষ্কার করো,

তাদের মুখের সৌন্দর্যকে বিকৃত করো

আর গিয়ানার জেলখানা দিয়ে দাও বালকদের

যাতে তারা দেখাসাক্ষাৎ করতে পারে ।

হে আমার বুড়ি মারোনি নদী, হে মিষ্টি কেয়েনের জল !

পনেরো থেকে কুড়িজন কয়েদির

আমি অবনত দেহগুলো দেখতে পাই

ফরসা বালকটিকে ঘিরে ধরেছে

পাহারাদারদের ফেলে-দেয়া সিগারেট ফুঁকছে

ফুলের মাঝে আর শ্যাওলায় ।

একটা ভিজে আধা-সিগারেট সবাইকে দুঃখিত করার জন্য যথেষ্ট

ঋজু, একা, শক্ত ফার্নের ওপরে

তাছাড়া মার্জিত এবং খাঁটি একটি ভ্রাম্যমান কামড় ।

সবচেয়ে যে কমবয়সী সে স্হির হয়ে বসে

নিজের সুন্দর পোঁদ রেখে

অপেক্ষা করে

গৃহিনী হবার জন্য ।

আর পুরোনো খুনিরা রাতের বেলায় উবু হয়ে

আচার অনুষ্ঠানের জন্য জড়ো হয়

একটা শুকনো কাঠি থেকে টেনে বের করবে

কোনো চটপটে কয়েদি

চুরি করা এক টুকরো আগুন

উথ্থিত লিঙ্গের চেয়েও যা

পবিত্র ও মার্জিত ।

চকচকে পেশির পালোয়ান ডাকাতও

এই কচি তরুণের সামনে নত হয়ে শ্রদ্ধা জানায়

চাঁদকে তুলে নিয়ে যায় আকাশে

হাতাহাতি প্রশমিত হয়

যখন কালো পতাকার

রহস্যময় ভাঁজগুলো

ঢেউ খেলতে থাকে ।

তোমার অঙ্গভঙ্গী তোমাকে কতো ভালো করে মুড়ে নেয় !

রক্তিম হাতের তালুতে রাখা একদিকের কাঁধ

তুমি সিগারেট ফোঁকো । আর গলায় ধোঁয়া নেমে যায়

তখন কয়েদিরা গম্ভীরমুখে নাচতে থাকে

গুরুত্ব দিয়ে, নিঃশব্দে, পারাপারি করে

তোমার মুখ থেকে ওরা এক সুগন্ধী ফোঁটা নেবে

দুটো নয়, গোল হয়ে বেরিয়ে আসা ধোঁয়ার

তোমার জিভ থেকে ওদের জিভে

হে বিজয়ী ভাই ।

ভয়ানক দিব্যতা, অদৃশ্য আর বজ্জাত

তুমি তখন ঝকঝকে ধাতুতে গড়া উদাসীন ও তীক্ষ্ণ

একা নিজের কথা ভাবছ, মারাত্মক ব্যবসাদার

তোমার হ্যামক থেকে দড়ি খুলে

গান গায় ।

তোমার অপলকা আত্মা পর্বতমালার ওপরে ভেসে যায়

সঙ্গে আবার যায় জাদুমথিত উড়াল

জেলকলোনি থেকে পলাতক এমন কেউ

উপত্যকার প্রান্তসীমায় মারা গেছে

ফুসফুসে গুলি খেয়ে

এমনকি তোমার কথা

না ভেবেই ।

হে বালক, চাঁদের বাতাসে জেগে ওঠো

আমার মুখের ভেতরে ঝরাও কয়েকফোটা ধাতুরস

তোমার গলা থেকে তোমার দাঁত পর্যন্ত গড়িয়ে-আসা, হে প্রেম

গর্ভবান করার জন্য, শেষ পর্যন্ত

আমাদের মহাসমাদরে বিয়ে হচ্ছে।

তোমার পরমানন্দিত দেহকে আমার দেহের সঙ্গে জুড়ে দাও

তা জঘন্যতার কারণে মারা যাচ্ছে

হে তুলতুলে মিষ্টি ইতর

তোমার গোল সোনালী অণ্ডকোষদের বিস্ময়ে

আমার কালো শ্বেতপাথরের লিঙ্গ

তোমার হৃদয়কে বিদ্ধ করবে ।

ওর যে সূর্যাস্ত পুড়ছে তাতে নিশানা করো

যেটা আমাকে খেতে চাইছে !

আমার শিকারের আত্মারা, আমার হাতে বেশি সময় নেই

এসো, সাহস থাকলে, তোমাদের পুকুর

তোমাদের জলাজঙ্গল, কাদা ছেড়ে যাও

যেখানে তুমি বুদবুদ ওড়াও ! আমাকে খুন করো ! পোড়াও !

একজন ফুরিয়ে-যাওয়া মিকেলাঞ্জেলো, আমি জীবন থেকে গড়েছি

কিন্তু প্রভু, আমি চিরকাল সৌন্দর্যের সেবা করেছি :

আমার তলপেট, আমার হাঁটু, আমার রক্তিম হাত

সবই বিপদাশঙ্কার ।

মুর্গিখামারের মোরগেরা, ফরাসিদেশের ক্রীড়াকৌতূক

দুধঅলার বালতি, বাতাসে একটা ঘণ্টা

পাথরকুচিতে এক পদক্ষেপ

আমার শার্শি শাদা আর স্বচ্ছ

এক আনন্দময় ঔ্রজ্বল্য আছে

লিখনস্লেটের কারাগারে ।

মহাশয়গণ, আমি ভীত নই !

যদি আমার মাথা গিলোটিনের চুবড়িতে গড়িয়ে পড়ে

তোমার ফ্যাকাশে মাথা নিয়ে, আমার ভাগ্যের কারণে

তোমার কৃশতনু পাছায় ।

কিংবা আরো ভালোভাবে বলতে হলে :

তোমার গলার ওপরে

হে প্রিয়…।

চেয়ে দ্যাখো ! অর্ধেক খোলা মুখের বিয়োগান্তক রাজা

তোমার উষর বাড়িয়াড়ির বাগানে আমার ঢোকার অধিকার আছে

যেখানে তুমি শক্ত হও, ঋজু, একা

দুই আঙুল তুলে

নীল কাপড়ের পর্দা

তোমার মাথা ঢেকে রেখেছে ।

আমার তন্দ্রার ভেতর দিয়ে আমি তোমার পবিত্র সদৃশকে দেখি !

ভালোবাসা ! গান ! আমার রানি !

তোমার ফ্যাকাশে চোখের মণিতে কি পুরুষের এক প্রেত

খেলার সময়ে

আমাকে যাচাই করছিল

দেয়ালের পলেস্তরার ওপরে ?

গোঁ ধরে থেকো না, প্রভাতসঙ্গীত গাইতে দাও

তোমার ভবঘুরে হৃদয় থেকে, আমাকে একা একটা চুমু দাও…।

হা ঈশ্বর, আমার গলা চিরে যাবে

যদি আমি তোমাকে চটকিয়ে হৃদয়ে পুরতে না পাই

আর ধর্ষণ করতে পারি !

«

ক্ষমা করুন ঈশ্বর কেননা আমি পাপ করেছি !

আমার কন্ঠস্বরের অশ্রু, আমার জ্বর, আমার দুঃখদুর্দশা

ফ্রান্সের মতন সুন্দর দেশকে ছেড়ে পালিয়ে যাবার পাপ

তা কি যথেষ্ট নয়, প্রভু, আমার বিছানায় গিয়ে

আশায় উপুড় হয়ে পড়ার ?

আপনার সুগন্ধী বাহুতে, আপনার তুষারের দুর্গে !

অন্ধকার জগতের প্রভু, আমি এখনও জানি কেমন করে প্রার্থনা করতে হয়

হে পিতা, এটা আমিই, যে এক সময়ে কেঁদে বলেছিল :

“সর্বোচ্চ স্বর্গের জয়,

চৌর্য ও ব্যবসায়ের পৌরাণিক

আলতো পায়ের গ্রিক দেবতা হারমেসের জয়

যিনি আমাকে রক্ষা করেন !”

মৃত্যু থেকে আমি শান্তি আর দীর্ঘ ঘুম চাইছি

ঈশ্বরের সিংহাসন রক্ষদের গান

তাদের সুগন্ধ, তাদের গলার মালা

বড়ো তপ্ত পোশাকে ক্ষুদে দেবদূতদের লোমাবরণ

আমি চাই চাঁদহীন সূর্যহীন রাত

বিস্তীর্ণ প্রান্তরের আকাশে ।

আমার মাথা গিলোটিনে কাটার সময় এটা নয়

আমি আরামে ঘুমোতে পারি ।

ওপরের ছাদে, আমার অলস প্রেম

আমার সোনালি বালক, আমার মুক্তা জেগে উঠবে

ভারি জুতো দিয়ে পিষে ফেলার জন্য

ন্যাড়া করোটির ওপর ।

«

যেন পাশের বাড়িতে কোনো মৃগিরোগি বাস করে

জেলখানাটা দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ঘুমোয়

একজন মৃত মানুষের গানের অন্ধকারে ।

জলে ভাসমান নাবিকরা যদি বন্দর দেখতে পায়

তাহলে আমার লোকলস্কর উড়াল নেবে

আরেক

আমেরিকার দিকে ।

 

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান