লুইস গ্লিক-এর কবিতা

লুইস গ্লিক-এর কবিতা : অনুবাদ মলয় রায়চৌধুরী

লাল পপিফুল

বড়ো ব্যাপার হল

একটা মন

না থাকা । অনুভূতি :

ওহ, আমার তা আছে ; ওগুলো

আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমার রয়েছে

স্বর্গে একজন মালিক

যার নাম সূর্য, আর মেলে ধরি

তার জন্য, তাকে দেখাই

আমার হৃদয়ের আগুন, আগুন

তার উপস্হিতির মতন ।

অমন গৌরব আর কীই বা হতে পারে

হৃদয় ছাড়া ? হে আমার ভাইরা আর বোনেরা,

তোমরা কি এককালে আমার মতন ছিলে, বহুকাল আগে,

তোমরা মানবজাতি হয়ে ওঠার আগে ? তোমরা কি

তোমাদের অনুমতি দিয়ে্ছ

একবার অন্তত মেলে ধরার, কেই বা চাইবে না

আরেকবার মেলে ধরতে ? কেননা সত্যি কথা

যা আমি এখন বলছি

তা তোমাদেরই মতন । আমি বলছি

কেননা আমি বিধ্বস্ত ।

অতীত

ফিকে আলো আকাশে ফুটে উঠছে

হঠাৎই পাইন গাছের

দুটি ডালের ফাঁকে, তাদের সূক্ষ্ম ছুঁচগুলো 

ঝলমলে পাতার ওপর খোদাই করা

আর এর ওপরে

উঁচুতে, পালকময় স্বর্গ–

বাতাসের সুবাস নাও । গন্ধটা শাদা পাইনগাছের,

বেশ তীব্র হয়ে ওঠে যখন এর ভেতর দিয়ে হাওয়া বয়

আর যে ধ্বনি জাগায় তাও সমানভাবে অদ্ভুত,

কোনো ফিল্মে বাতাসের শব্দের মতন–

ছায়ারা সরে যাচ্ছে । দড়িগুলো

নিজেদের আওয়াজ তুলছে । তুমি এখন যা শুনতে পাচ্ছ

তা পাপিয়ার ডাক, যৌনতার,

পুরুষ পাখি মাদি পাখিকে প্রণয় নিবেদন করছে–

দড়িগুলো সরে যায় । শোবার দোলনা

বাতাসে দোল খায়, বাঁধা রয়েছে

শক্ত করে দুটো পাইনের গাছে ।

বাতাসের সুবাস নাও । গন্ধটা শাদা পাইনগাছের ।

তুমি যে কন্ঠস্বর শুনছ তা আমার মায়ের

কিংবা গাছেরা যে আওয়াজ তুলছে কেবল তাইই

যখন বাতাস তাদের ভেতর দিয়ে বয়

কেননা কোন শব্দই বা তুলবে

যদি কোনোকিছুর ভেতর দিয়ে না যায় ?

প্রথম স্মৃতি

বহুদিন আগে, আমি জখম হয়েছিলুম । আমি বেঁচে রইলুম

নিজে প্রতিশোধ নিতে

আমার বাবার বিরুদ্ধে, এই জন্য নয় যে

তিনি কেমন লোক ছিলেন—

এই জন্য যে আমি কী ছিলুম : সময়ের আরম্ভ থেকে,

শৈশবে, ভেবেছিলুম

ব্যথার অর্থ

আমাকে ভালোবাসা হয় না ।

এর অর্থ আমিই ভালোবাসতুম ।

আনন্দ

একজন পুরুষ আর একজন নারী শুয়ে আছে শাদা বিছানায় ।

এখন সকাল । আমার মনে হয়

ওরা তাড়াতাড়িই জাগবে ।

বিছানার পাশে টেবিলের ওপরে একটা ফুলদানি

তাতে লিলিফুলের গোছা ; সূর্যের আলো

তাদের কন্ঠে জমে ওঠে ।

আমি দেখি পুরুষ নারীটির দিকে পাশ ফিরল

যেন তার নাম ধরে ডাকবে

কিন্তু নিঃশব্দে, নারীটির মুখের গভীরে–

জানালার প্রান্তে,

একবার, দু’বার

একটা পাখি ডেকে ওঠে ।

আর তারপর নারীটি নড়ে ওঠে ; তার দেহ

ভরে ওঠে পুরুষের শ্বাসে ।

.

আমি চোখ খুলি ; তুমি আমায় দেখছ ।

এই ঘরের ওপরই প্রায়

সূর্য সাবলীলভাবে সরে যাচ্ছে ।

তোমার মুখ দ্যাখো, তুমি বলো

নিজেরটা আমার সামনে তুলে ধরে

যেন আয়না গড়ে তুলছ ।

তুমি কতো শান্ত । আর জ্বলতে-থাকা চাকা

আমাদের ওপর দিয়ে মৃদুতায় অতিক্রম করে যায় ।

হ্যালোউইন-এর অল হ্যালোজ

এমনকি এখনও এই ভূদৃশ্য একসঙ্গে মিশছে ।

অন্ধকার হয়ে উঠছে পাহাড় । বলদেরা

ঘুমোচ্ছে তাদের নীল জোয়ালে,

খেতগুলোকে

পরিষ্কার করে ফেলার পর, আঁটিদের

সমানভাবে বেঁধে পথের পাশে ডাঁই করে রাখা ।

পঞ্চমুখি পাতার মাঝে, দেঁতো চাঁদের উদয় হয় :

.

এ হল বন্ধ্যাত্ব

ফসল তোলার পর বা মহামারীর

আর বউটি জানালার বাইরে ঝুঁকে 

হাত দুটো বাইরে, দাম চোকাবার মতন,

আর বীজগুলো

স্পষ্ট, সোনালী, ডাক দিচ্ছে

এদিকে এসো

এদিকে এসো, ছোট্ট খোকা

.

আর আত্মা গুটি মেরে বেরিয়ে পড়ে গাছের বাইরে ।

টেলিসকোপ

চোখ সরিয়ে নেবার পর একটা মুহূর্ত আসে

যখন তুমি ভুলে যাও কোথায় রয়েছ

কেননা তুমি বেঁচে ছিলে, মনে হয়

অন্য কোথাও, রাতের আকাশের নৈঃশব্দে ।

তুমি এখানে পৃথিবীতে বসবাস তুলে দিয়েছিলে।

তুমি রয়েছ অন্য কোনো জায়গায়,

এমন জায়গা যেখানে মানবজীবনের কোনো অর্থ নেই ।

তুমি দেহধারী কোনো প্রাণী নও ।

যেমন নক্ষত্ররা রয়েছে তেমনই রয়েছ তুমি,

অংশ নিচ্ছ তাদের স্হিরতায়, তাদের বিশালতায় ।

তারপর আবার তুমি পৃথিবীতে । 

রাতের বেলায়, শীতল পাহাড়ের ওপর

টেলিসকোপটা দূরে সরিয়ে রাখো ।

পরে তুমি টের পাও

এই নয় যে দৃশ্যটা নকল ।

তুমি আবার দেখতে পাও কতো দূরে রয়েছে

প্রতিটি জিনিস অন্য জিনিসগুলো থেকে ।

প্রেমের কবিতা

ব্যথা দিয়ে সব সময় কিছু গড়ে তোলা যায় ।

তোমার মা বুনতে ব্যস্ত ।

উনি আমাদের গায়ের চাদর সব রকমের লাল রঙে বোনেন ।

সেগুলো ছিল ক্রিসমাসের জন্য, আর তা তোমাকে উষ্ণ রেখেছিল

যখন কিনা উনি য়ে বারবার বিয়ে করলেন, তোমাকে

সঙ্গে নিয়ে । কীভাবে তা কাজ করতো,

যখন সেই সব বছরগুলোয় উনি নিজের বিধবা হৃদয়কে পুষে রাখলেন

যেন মৃত লোকটি ফিরে আসবে ।

আশ্চর্য নয় যে তুমি যেরকম আছ সেরকমই,

রক্তের ভয় পাও, তোমার নারীরা

যেন একটা ইঁটের দেয়ালের পর আরেকটা ।

অ্যানিভার্সারি 

আমি বলেছিলুম তুমি আশ্লেষে জড়িয়ে ধরতে পারো । তার মানে এই নয় যে

তোমার শীতল পা দুটো আমার কুঁচকি জুড়ে রাখবে ।

.

বিছানায় কেমন আচরণ করা উচিত তা কারোর কাছে শেখা দরকার তোমার ।

আমি মনে করি তোমার উচিত 

নিজের বাড়াবাড়ি নিজের কাছেই রাখো ।

.

দ্যাখো তুমি কী কাণ্ড করলে–

তুমি বিড়ালটাকে সরে যেতে বাধ্য করলে।

.

আমি চাইনি তুমি এখানে হাত দাও

আমি চেয়েছিলুম তুমি ওইখানে হাত রাখো ।

.

তোমার উচিত আমার পায়ের প্রতি আগ্রহ দেখানো ।

তুমি তা মনে করতে পারবে

পরের বার যখন কোনো পঞ্চদশীর সাথে সাক্ষাৎ ঘটবে ।

কেননা পাগুলো কোথা থেকে আসে তার আরও ব্যাপার আছে ।

ডুবে যাওয়া শিশুরা

বুঝলে, ওদের কোনো বিচারবুদ্ধি নেই।

তাই ওরা যে ডুবে যাবে সেটাই স্বাভাবিক।

প্রথমে, বরফ ওদের টেনে নেয়,

আর তারপর, সারা শীত জুড়ে, ওদের পশমের চাদরগুলো

ওরা যখন ডুবছে তখন ওদের পেছনে ভাসতে থাকে

যতক্ষণ না ওরা নীরব হয়ে যাচ্ছে ।

আর  হরেকরকম অন্ধকার হাত দিয়ে পুকুর তাদের তুলে ধরে ।

.

কিন্তু মৃত্যু নিশ্চয়ই তাদের কাছে অন্যভাবে আসে,

আরম্ভের কতো কাছাকাছি।

যেন ওরা সবসময়ই  ছিল

অন্ধ আর ওজনহীন । অতএব

বাকিটুকু স্বপ্নে দেখা, কুপি,

যে সুন্দর চাদর টেবিলটাকে ঢেকে রেখেছে,

ওদের দেহগুলোকেও ।

.

আর তবু ওরা শুনতে পায় ওদের রোজকার নামগুলো

যেন পুকুরের ওপর দিয়ে ভেসে যাওয়া প্রলোভন :

কীসের জন্য অপেক্ষা করছো তোমরা?

বাড়ি এসো, বাড়ি এসো, হারিয়ে গেছ,

জলে,  নীল আর চিরকালীন।   

একটি উপকথা

দুজন মহিলা

একই দাবি নিয়ে

বিজ্ঞ রাজার 

পায়ে পড়ল । দুজন মহিলা,         

কিন্তু একটিই শিশু । 

রাজা জানতেন   

একজন মিথ্যা কথা বলছে ।

উনি যা বললেন তা হল

বাচ্চাটাকে করা হোক

দু’টুকরো ; তা করলে 

কেউই খালি হাতে

ফিরবে না । উনি

তরোয়াল বের করলেন ।

তারপর, দু’জনের মধ্যে

এক মহিলা, একজন 

নিজের অংশ ত্যাগ করল :

তা ছিল

ইঙ্গিত, শিক্ষা ।

মনে করো

তুমি তোমার মাকে দেখলে

দুটি মেয়ের মধ্যে বিপর্যস্ত :

তুমি তখন কী করবে

তাঁকে রক্ষা করার জন্য

নিজেকে ধ্বংস করে ফেলার

ইচ্ছে ছাড়া — উনি জানতে পারবেন

কোন মেয়েটা সৎ, 

যে সহ্য করতে পারবে না

মায়ের বিভক্ত হয়ে যাওয়া ।

বুনো আইরিস ফুল

আমার দুর্ভোগের শেষে

ছিল একটা দরোজা ।

.

আমার কথা শোনো : যাকে তোমরা বলো মৃত্যু

তা মনে রেখেছি ।

.

কানাঘুষো শুনেছি, আওয়াজ, পাইন গাছের শাখা দোল খাচ্ছে ।

তারপর কিচ্ছু নয় । দুর্বল সূর্য

শুকনো ভূতলের ওপরে টিমটিম করেছে ।

.

টিকে থাকা ভয়ঙ্কর

চেতনার মতন

অন্ধকার মাটিতে কবর দেয়া ।

.

তারপর সব শেষ : যাকে তুমি ভয় পাচ্ছ, একটি

আত্মা হয়ে, আর পারছ না

কথা বলতে, আচমকা থেমে, কঠিন মাটি

সামান্য ঝুঁকে পড়ে । আর যা আমি ভেবেছিলুম

পাখিরা নিচু ঝোপে ঢুকছে-বেরোচ্ছে ।

.

তুমি যে মনে রাখতে পারোনি

অন্য জগত থেকে ফিরে এসে

আমি তোমাকে বলছি যে আমি আবার কথা বলতে পারি : যা-কিছু

বিস্মৃতি থেকে ফেরে তা ফিরে আসে

একটা কন্ঠস্বর পাবার জন্য :

.

আমার জীবনের কেন্দ্র থেকে এলো

এক বিশাল ফোয়ারা, ঘন নীল

ছায়ারা আশমানি সমুদ্রের জলে ।

নিষ্ঠা বিষয়ক একটি মিথ

যখন পাতালপুরীর দেবতা হাদিস নির্নয় নিলেন যে তিনি মেয়েটিকে ভালোবাসেন

তিনি তার জন্য পৃথিবীর একটা নকল গড়ে দিলেন,

সবকিছু একইরকম, চারণভূমি পর্যন্ত,

কিন্তু তার সঙ্গে একটা বাড়তি বিছানা ।

সবকিছু একইরকম, সূর্যের আলো পর্যন্ত,

কেননা একজন যুবতীর পক্ষে কঠিন হবে

ঝলমলে আলো থেকে দ্রুত ঘন অন্ধকারে যাওয়া ।

উনি ভাবলেন, একটু-একটু করে, রাত্রির প্রচলন করবেন,

প্রথমে গাছের পাতার ঝাঁকুনির মতন ছায়া ।

তারপর চাঁদ, তারপর নক্ষত্র । তারপর চাঁদ থাকবে না, নক্ষত্র থাকবে না ।

পারসিফোনি নিজেকে এর সঙ্গে ক্রমশ মানিয়ে নিক ।

সব শেষে, উনি ভাবলেন, যুবতীটি একে আরামপ্রদ মনে করবে ।

পৃথিবীর একটা অবিকল প্রতিরূপ

তফাত এই যে এখানে ভালোবাসা থাকবে ।

সবাই কি ভালোবাসা চায় না ?

উনি বহু বছর অপেক্ষা করলেন,

একটা জগত গড়ে তোলার জন্য, লক্ষ্য করতে লাগলেন

পারসিফোনি চারণভূমিতে ।

পারসিফোনি, যে সুবাস নেয়, স্বাদ নেয় ।

তোমার যদি খিদে থাকে, উনি ভাবলেন,

তুমি সবকিছু পাবে ।

সবাই কি রাতের বেলায় অনুভব করতে চায় না

প্রিয় শরীর, কমপাস, মেরুনক্ষত্র, 

ফিকে শ্বাস শোনার জন্য যা বলতে থাকে

আমি বেঁচে আছি, যার মানে এইও হয় যে

তুমি বেঁচে আছ, কেননা তুমি আমায় শুনতে পাচ্ছ,

তুমি এখানে আমার সঙ্গে রয়েছ । আর যখন একজন পাশ ফেরে,

অন্যজনও পাশ ফেরে—

উনি তেমনটাই অনুভব করলেন, অন্ধকারের মালিক,

পারসিফোনির জন্য গড়া 

পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে । তাঁর একথা মনে এলো না

যে ওখানে সুবাস নেয়া যাবে না,

খাওয়ার কথা তো ওঠেই না ।

অপরাধবোধ ? সন্ত্রাস ? প্রেমের আতঙ্ক ?

এগুলো উনি কল্পনা করতে পারেননি ;

কোনো প্রেমিকই ওগুলো ভাবে না ।

উনি স্বপ্ন দেখেন, জায়গাটার কী নাম দেবেন ভেবে পান না ।

প্রথমে উনি ভাবেন : নতুন নরক । তারপর : বাগান

সব শেষে উনি নির্ণয় নেন জায়গাটার নাম দেবেন

পারসিফোনির মেয়েবেলা

সমতল চারণভূমির ওপর থেকে একটা হালকা আলো উঠে আসছিল,

বিছানার পেছন দিকে । উনি যুবতীটিকে আলিঙ্গনে নেন,

উনি বলতে চান আমি তোমায় ভালোবাসি, কোনোকিছু তোমায় আঘাত করবে না

কিন্তু উনি ভাবেন

এটা ডাহা মিথ্যা, তাই শেষে উনি বলেন

তুমি মারা গেছ, কোনোকিছু তোমায় আঘাত করবে না

যা ওনার মনে হয়

এ আরও বেশি আশাব্যঞ্জক সূচনা, আরও বেশি সত্য ।

About anubadak

আমি একজন অনুবাদক । এতাবৎ রেঁবো, বদল্যার, ককতো, জারা, সঁদরা, দালি, গিন্সবার্গ, লোরকা, ম্যানদেলস্টাম, আখমাতোভা, মায়াকভস্কি, নেরুদা, ফেরলিংঘেট্টি প্রমুখ অনুবাদ করেছি ।
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s