জাঁ-লুক গোদার-এর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গ্যাভিন স্মিথ । অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

জাঁ-লুক গোদার-এর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গ্যাভিন স্মিথ

গ্যাভিন : ‘সিনেমার ইতিহাসগুলো’তে  (Histoire(s) du cinema ) সিনেমার শুরু থেকে আপনি যে ফিল্মগুলো তৈরি করেছেন সেগুলো আপনার আগের কাজগুলোর চেয়ে বেশি সংবেদনশীল । প্রত্যেকটাই  সিনেমার সাথে সমঝোতা করার চেষ্টা বলে মনে হয় ।

গোদার : হ্যাঁ । আমিও তাই মনে করি, যদি আমি তা  বলতে পারি, তবে এটা পিকাসোর একটিা কথার মতন আমাকে একবার চোট দিয়েছিল : “চিত্রকর্মটি আমাকে প্রত্যাখ্যান না করা পর্যন্ত আমি আঁকা পছন্দ করি।” আমি বলব যে সিনেমা আমাকে আরও কয়েকটা ফিল্ম, আরও কয়েক দশক ধরে অস্বীকার করবে না, সুতরাং এটা একটা সমঝোতা। আমি যা চাই তা দিয়ে নয়, কারণ আমি কী চাই তা আমি নিজেই জানি না, তবে আমার যা আছে তা থেকে আমি যা চাই তা তৈরি করতে পারবো।  আরও কিছু প্রশ্ন তুলতে সক্ষম না হওয়ার জন্য, কিন্তু যা আমি সত্যিই পছন্দ করি তা করার জন্য, আমার যা আছে তাই দিয়ে মোকাবেলা করতে পারি। এটা একটা শান্তিপূর্ণ মনোভাব। আমি যখন কোনও ফিল্ম করি, তখন তা ভালভাবে করা না হলেও আমি আর ক্রুদ্ধ হই না। রাগ করা উচিত নয়, কেননা যে ছবিটা এইভাবে বা অন্য কোনও ভাবে হওয়া উচিত ছিল , তা চিন্তা না করে কেবল নিজের মতো করে চালিয়ে যেতে হবে ।

গ্যাভিন : তবুও আপনার ফিল্ম নির্মাণের কাজটা সর্বদা একটা বিপরীত চলচ্চিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে।

গোদার : আজকাল এটা ঘটনা, তবে আমি আর তা নিয়ে চিন্তা করি না। আমি যখন একটি বড় ফিল্ম তুলি, তখন আমি নিজেকে বলি না, এটা হলিউডের কোনো জাতীয় চলচ্চিত্র-প্রথার বিরুদ্ধে, এই ধরণের ফরাসি ছবি — এটা আমি করছি কেবল ফিল্মে । আমি জানি যে আমি অবশ্যই বিরোধীপক্ষে, তবে এটা একটি বড় এলাকা।

গ্যাভিন :  সমালোচক হিসাবে আপনার কাজসহ পুরো ক্যারিয়ার, তাকে দেখা যেতে পারে আলোচনার প্রক্রিয়া হিসেবে , সিনেমার সাথে বোঝাপড়ার পদক্ষেপ হিসেবে।

গোদার: আমি পরিচালনা এবং সমালোচনার মধ্যে পার্থক্য করি না। আমি যখন প্রথমফিল্ম দেখতে শুরু করি, তা তখনই চলচ্চিত্র নির্মাণের অংশ ছিল। আমি যদি এখন হাল হার্টলির ছবি দেখতে যাই, তাও সিনেমা তৈরির অংশ। তাতে  কোনও পার্থক্য নেই । আমি ফিল্ম নির্মাণের অংশ আর যা এই এলাকায় ঘটে চলেছে, আমাকে তা অবশ্যই দেখতে হবে। আমেরিকান ছবিগুলোর ব্যাপারে, প্রতি বছর কমবেশি একটা দেখাই যথেষ্ট: সেগুলো কমবেশি সব একইরকম হয়। তবে এটা আমাদের দেখার  একটা অংশ কেননা আমরা তো এই জগতে বসবাস করছি।

 

গ্যাভিন : চলচ্চিত্র নির্মাণ কি এক অর্থে আপনার কাছে একটি ইউটোপিয়ান কার্যকলাপ ?

গোদার: আমার ফিল্ম যেভাবে হওয়া উচিত তা ইউটিপিয়া , তবে সিনেমা বানানো, তৈরি করা, ইউটিপিয়া নয়।

গ্যাভিন : “জার্মানি বছর ৯০ নয় শূন্য” [ Germany Year 90 Nine Zero] এবং “সিনেমার ইতিহাসগুলো”[Histoire (s) du cinemaতে] আপনি সিনেমাকে একটি পতিত মাধ্যম হিসাবে বিবেচনা করেছেন।

গোদার : হ্যাঁ, সেটাই আমার মতামত ।

গ্যাভিন : কোন মুহুর্তগুলো সেই পতনকে  সংজ্ঞায়িত করেছে?

গোদার: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আমেরিকান ফিল্মগুলোর ফরাসি ফিল্মগুলোকে পরাস্ত করার একটা সুযোগ ছিল, যা সেই সময়ে আরও শক্তিশালী এবং সুপরিচিত ছিল। প্যাথে, গাউমঁ, মেলিস, ম্যাক্স লিন্ডার ছিলেন বড়ো একজন তারকা। যুদ্ধের পরে ফরাসিরা দুর্বল ছিল এবং আমেরিকানদের পক্ষে প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় সিনেমাতে ঢুকে পড়ার রাস্তা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আর তারা জার্মান ফিল্মের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। অর্ধেক হলিউড ভরে ফেলেছিল জার্মানরা; ইউনিভার্সাল  প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কার্ল ল্যামেল।

নরম্যান্ডির সৈকত ছিল দ্বিতীয় আক্রমণ; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল ইউরোপকে নিশ্চিতভাবে দখল করার উপায় । আর  এখন, তুমি রাজনীতিতে দেখতে পাও যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার নির্দেশ না দিলে ইউরোপ স্বেচ্ছায় কিছু করতে অক্ষম। এখন ফিল্মগুলোতে আমেরিকা পুরো পৃথিবীর দখল নিয়েছে। সুতরাং  যে সমস্ত গণতান্ত্রিক ধারণা ছিল তা লোপাট হয়ে গেল । আমি আমার পরবর্তী “সিনেমার ইতিহাসগুলো” [Histiore (s) cinema]তে – এক বিশেষ সময়ের, কনসেনট্রেশান শিবিরের সত্যতা দেখাবো, যা এখনও ফিল্মে প্রদর্শিত হয়নি ।  সিনেমায় , এর জবাব দেওয়া হয়নি।

গ্যাভিন : এই প্রসঙ্গে ‘শিন্ডলার্স  লিস্ট’ ফিল্মটা আপনার কাছে কী বোঝায়?

গোদার : ফিল্মটার কোনোই মানে হয় না। কিছুই দেখানো হয়নি, এমনকি সেই আগ্রহসঞ্চারী জার্মান শিন্ডলার-এর গল্পও নয় ফিল্মটা।আসল গল্পটা বলা হয়নি। ওটা একটি মেলানো-মেশানো ককটেল।

গ্যাভিন : আপনি কি মনে করেন যে ইতালীয় নিওরিয়ালিজম এবং ফরাসী নিউ ওয়েভ যুদ্ধের পরের পুনরুদ্ধারের প্রতিনিধিত্ব করেছিল?

গোদার : না, তারা ছিল সর্বশেষ বিদ্রোহ। আমরা যেটাকে আভাঁ গার্দ বলি তা আসলে ‘আরিয়ের গার্দ’ [রিয়ার গার্ড] ছিল।

গ্যাভিন : আপনি কি বলছেন যে ফ্রান্সের ষাটের দশকে আপনাদের সিনেমা আমেরিকান আধিপত্যের অধীন ছিল?

গোদার : আমরা তা ভাবিনি, কারণ একই সময়ে আমরা বেশিরভাগ নিজেরা তর্ক  করেছি কোনো এক ধরণের আমেরিকান সিনেমার পক্ষ নিয়ে । আমরা উইলিয়াম ওয়াইলার বা জর্জ স্টিভেন্সের চেয়ে স্যামুয়েল ফুলার বা বাড বোয়েটিচারকে পছন্দ করেছি। আমাদের ইচ্ছে, অন্তত রিভেতে আর আমার ইচ্ছে ছিল যে , একটা বড় সেটে  সংগীতচিত্র তৈরি করতে আমরা সক্ষম হব। সেটা এখনও একটা আশা! আমরা বলেছিলুম যে হিচকক হলেন একজন দুর্দান্ত চিত্রশিল্পী, দুর্দান্ত ঔপন্যাসিক, কেবল মাত্র খুনের গল্পের পরিচালকই নন, তাই ব্যাপারটা আরও গণতান্ত্রিক ছিল। তবে তা ইউটোপিয়ান ছিল, কারণ সত্যিকার অর্থে কী ঘটে চলছে তা বুঝতে পারার পক্ষে আমরা বয়সে খুব ছোট ছিলাম। আমি আজ এই কথা বলছি কারণ  সম্ভবত আমিই একমাত্র এই জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গী দেখাচ্ছি। আমি ইতিহাস পড়ার জন্য আমার চোখ এবং কান ব্যবহার করছি। শব্দ পড়ার জন্য অন্য লোকেরা তাদের চোখ ব্যবহার করে।

গ্যাভিন : কিন্তু আমেরিকান সিনেমার কয়েকটি বিষয়কে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আপনি কি তাহলে  তখন শত্রুদের ডেকে আনছিলেন ?

গোদার : একেবারেই না. আমরা হিচককের পক্ষে ছিলুম, তবে আমরা শর্লি ক্লার্ক বা জন ক্যাসাভেস বা এড এমশওইলারের পক্ষেও ছিলুম। আমি  সম্প্রতি যখন পড়েছিলুম যে একজন আমেরিকান সমালোচক লিখেছেন যে “হায় আমার জন্য” ( Hélas pour moi )  স্ট্যান ব্রাখাজের ছবির মতো লাগছিল, তখন আমি খুব খুশি হয়েছিলুম। কাইয়ে দ্যু সিনেমায় যোগদানের অনেক আগে থেকে গ্রেগরি মার্কোপৌলোসের সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিল। পরে  তাঁর ছবিগুলো আমার ভাল লাগেনি, তবে ওনাকে আর অন্যান্য লোকদের যারা অকপট সিনেমার পক্ষে ছিলেন তাঁদের আমার মনে আছে। তা ছিল গণতন্ত্র। আমরা বুঝতে পারি নি যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র আর রাশিয়ার কমিউনিস্ট সরকারের  মধ্যে তফাত নেই।

গ্যাভিন : ‘সিনেমার ইতিহাসগুলো’ [Histoire (s) du cinema]র দ্বিতীয় কিস্তিতে আপনি বলেছেন, “প্রযুক্তি জীবন থেকে প্রাণ এবং পরিচয় পুনরুৎপাদন ও নিকাশ করতে চেয়েছিল।” তার মানে কী ?

গোদার: আমাদের এই সত্যটি বিশ্লেষণ করা উচিত যে, যখন ফটোগ্রাফি আবিষ্কার হয়েছিল, তা প্রথম থেকেই রঙিন হতে পারতো, তা সম্ভব ছিল। তবে  এটি দীর্ঘকাল ধরে কালো এবং সাদা হওয়ার কারণ, তা আকস্মিকতাজনিত নয়। তাতে নৈতিক দিক থাকতে পারে, কেননা ইউরোপীয় ও পশ্চিমাবিশ্বের  শোকের রঙ হলো কালো। সুতরাং আমরা প্রকৃতি থেকে তার পরিচয়টি নিচ্ছিলুম এবং একটি নির্দিষ্ট উপায়ে তাকে হত্যা করছিলুম—

গ্যাভিন : সাদা-কালোয় তার ফোটো তুলে ?

গোদার : কেবল ফটোগ্রাফির মাধ্যমে, ভান করছিলুম যে পাসপোর্টে থাকা ছবিটা সেই ব্যক্তির পরিচয় — তা কেবল তার ফোটো , পরিচয় নয়। এবং তারপরে এটা  পেইনটিঙের ক্ষেত্রে একটা বড় পরিবর্তন আনে : আরও বিশদ করে আঁকা আরম্ভ হয় , তথাকথিত বাস্তবতার আরও বাস্তব চিত্র। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা প্রকৃতির পরিচয়কে টেনে বের করে নিচ্ছিলুম, আর যেহেতু  সংস্কৃতিতে কিছুটা নৈতিকতা ছিল, তাই সাদা-কালো রঙে করা হয়েছিল, শোকের রঙে । আমি আরও যোগ করতে চাইব যে, প্রথম টেকনিকালার এবং টেকনিকালার আজও, কম-বেশি আসল ফুলের মতন নয়, বরং তা শবযাত্রার ফুল।

গ্যাভিন : ১৯৭৯ সালে আপনার সিনেমায় ফিরে আসার পর থেকে সিনেমাটিক সৌন্দর্যের ওপর নতুন করে জোর দিয়েছেন । দেখে মনে হয় আপনি ব্যাপারটাকে ফিল্মে রহস্যের ধারণার সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছেন।

গোদার : হ্যাঁ. বেশিরভাগ সময় কোনও রহস্য থাকে না, আর কোনও সৌন্দর্য থাকে না — কেবল মেকআপ থাকে । ‘শিণ্ডলার্স লিস্ট’ বাস্তবতা গড়ে তোলার একটা ভাল উদাহরণ। তা হল ম্যাক্স ফ্যাক্টর। তার রঙের স্টক বর্ণনা করা হয়েছে কালো এবং সাদায়, কারণ ল্যাবগুলোর আসল কালোরঙ এবং সাদা করে তোলার মতন সামর্থ আর নেই। স্পিলবার্গ ভেবেছেন রঙের চেয়ে কালো এবং সাদা বেশি সিরিয়াস দেখায় ।  আপনি আজও কালো এবং সাদা ফিল্ম নিঃসন্দেহে করতে পারেন, কিন্তু তা কঠিন, তাছাড়া কালো এবং সাদা ফিল্ম করার খরচ রঙিনের চেয়ে বেশি। সুতরাং তিনি সিস্টেমের প্রতি বিশ্বস্ত — এটা একটা ফালতু চিন্তা। ওনার কাছে ব্যাপারটা কৌতুকপূর্ণ নয়, আমি মনে করি তিনি নিজের প্রতি সৎ, তবে তিনি খুব বুদ্ধিমান নন, যার দরুন ফল হয়েছে ফালতু । যেন আমি একটি তথ্যচিত্র দেখছি, যা ভাল নয়, তবে শিন্ডলার লোকটা সম্পর্কে  আপনি আসল তথ্য জানতে পারছেন। স্পিলবার্গ সেই মানুষটাকে আর এই গল্পকে এবং সমস্ত ইহুদি ট্র্যাজেডিকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যেন তা এক বিশাল অর্কেস্ট্রা, এক সহজ গল্প থেকে একটা স্টেরিওফোনিক আওয়াজ তৈরি করেছেন।

গ্যাভিন : মানে, উনি ঐতিহাসিক তথ্য দেননি–

গোদার : উনি সক্ষম নন। হলিউড সক্ষম নয়। আসলে, ব্যাপার হল, আমি যে ছবিটি করতে চাই,  তা করতে আমি সক্ষম নই। আমি তার জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারি এবং এর অংশ তৈরি করতে পারি, দুই তৃতীয়াংশ বা কখনও কখনও নয়-দশ অংশ। স্পিলবার্গ একজন নিয়মনিষ্ঠ পরিচালকের মতন ‘শিণ্ডলার্স লিস্ট’ করতে সক্ষম নন ।  প্রতিভাবান নন, বরং যেমন উইলিয়াম ওয়াইলারের মতো পরিচালক, যিনি যুদ্ধের ঠিক পরে, ‘আমাদের জীবনের সেরা বছরগুলি’ ফিল্মটি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন । আজ আপনি যখন ফিল্মটা দেখবেন, আপনি এই বিষয়টি দেখে অবাক হবেন যে হলিউডে কিছু সৎ লোক এবং ভাল কারিগর কারও-কারও কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিলেন।  ওয়াইলারের ফিল্মের চেয়ে সামগ্রিকভাবে সিনেমার সম্ভাবনা অনেক বেশি, তিনি সম্ভাবনার শতভাগ অবদান দিয়েছিলেন। আজ, এটি লোপাট হয়ে গেছে। যদি কোনও একশো গজের দৌড় হয়, উইলিয়াম বারো সেকেন্ডের মধ্যে তা সম্পূর্ণ করবেন; স্পিলবার্গ দৌড়োতে দুই মিনিট সময় নেবেন।

গ্যাভিন : ‘হায় আমার জন্য’( Helas pour moi )-এর একটি প্রধান বিষয় হ’ল যে ন্যারেটিভগুলো সভ্যতার মঙ্গলের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ হলেও,  সত্য ও সত্যকে নথিবদ্ধ করা ও যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে এটি অপ্রতুল ।

গোদার : ‘হায় আমার জন্য’-তে সেই জিনিসটি মিস করেছি, তবে আমি যেহেতু স্পিলবার্গের চেয়ে কিছুটা ভাল, আমার ছবি আরও ভাল হয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে  ততটা সফল হয়নি। আমি পয়েন্টটা মিস করে গিয়েছিলুম। ছবিটি শুরু হওয়ার আগে যা ছিল তা থেকে একেবারে আলাদা হয়ে হাজির হল।

গ্যাভিন : সাক্ষীদের সাক্ষাৎকার দিয়ে ন্যারেটিভের পুনর্গঠন যিনি করছেন তাঁর সঙ্গে তদন্তকারী / বর্ণনাকারীর ভূমিকা আমাকে ওয়েলস-এর আরকাদিন-এর ( Mr. Arkadin ) কথা মনে পড়িয়ে দেয়।

গোদার : হ্যাঁ, আমি, ‘মিঃ আরকাদিন’ আমার মনে আছে, আর  আমি সেকথা ভেবেছিলুম। তদন্তকারী চরিত্রটা সম্পাদনা অর্ধেক করে ফেলার পরে যোগ করা হয়েছিল, কেননা তা নাহলে ফিল্মটা একসঙ্গে বেঁধে রাখা যেতো না । এটা একটা ভাল চলচ্চিত্র তবে তা হতে পারতো আরও.…।  ফিল্মটার উদ্দেশ্য তা ছিল না। ‘মিঃ আরকাদিন’ ফিল্মে সেই উদ্দেশ্য ছিল। এ কারণেই আমি বলছি এটা একটা আরও ভাল ছবি, কারণ অরসন ওয়েলস, যদিও তাঁর কাজ করার পদ্ধতি সেই সময়ে ছিল আশি শতাংশ , শেষ পর্যন্ত তা ছিল ফিল্মের অংশ ।

গ্যাভিন : ‘জেএলজি দ্বারা জেএলজি’র কথা বলা যাক ।

গোদার : সঠিক টাইটেল হল ‘জেএলজি / জেএলজি’। কোনও ‘দ্বারা’ নেই । আমি জানি না কেন গৌমঁ শব্দটাকে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। যদি সেখানে একটি “দ্বারা” থাকে তবে এর অর্থ হবে এটা জেএলজি সম্পর্কে একটা গবেষণা, আমার নিজের সম্পর্কে নিজের দ্বারা  যেন একধরনের জীবনী, যাকে ফরাসী ভাষায় বলা হয় ‘বিবেকের পরীক্ষা’ ( un examen de conscience ); যা ফিল্মটা একেবারেই নয়। এজন্য আমি বলি ‘জেএলজি / জেএলজি আত্ম-পোর্ট্রেট’। নিজের প্রতিকৃতিতে কোনও “আমি” থাকে না । তার মর্মার্থ  কেবল পেইনটিঙে থাকে, অন্য কোথাও নয় । শুধু পেইনটিঙে নয়, চলচ্চিত্রেও তা থাকতে পারে কিনা তা জানতে আমি আগ্রহী ছিলুম।

গ্যাভিন : ফিল্মটি আপনাকে বেশিরভাগ সময় নিঃসঙ্গ হিসাবে তুলে ধরে — এটি কি আপনার জীবনের প্রতিচ্ছবি নাকি স্ব-প্রতিকৃতি ঘরানার  ফিল্ম ?

গোদার : আমি খুবই নিঃসঙ্গ, এটাই — আমি তা বাতিল করতে পারি না। অন্তরজগতে, আমি প্রচুর মানুষ এবং জিনিসপত্রের সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছি, যাঁরা একেবারেই জানেন না যে আমি তাঁদের সাথে যোগাযোগ করে চলেছি। তবে বাইরে, হ্যাঁ, এটা আমার চরিত্র এবং এটাই আমার জীবনের সত্য, যা মানুষের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে  অত্যন্ত একাকী । মাঝে মাঝে আমি সেই মানুষদের বুঝতে পারি যাঁরা ওয়াল্ডেনের বা থোরোর মতো জীবন কাটিয়েছেন। তবে এটাও হতে পারে যে আমি যখন ছোট ছিলুম তখন আমি এক বিশাল ধনী পরিবারের সদস্য ছিলুম, অনেক খুড়তুতো ভাই আর কাকারা ছিলেন। আমার যৌবনে অনেক কিছুই ছিল যে আজকে আমি মনে করি এটা একরকম ন্যায়বিচার যে আজকে  আমার কাছে সমস্তকিছু কম।

গ্যাভিন : আপনি কী ‘জেএলজি / জেএলজি’ ফিল্মকে মৃত্যুচিন্তা হিসাবে দেখছেন? মৃত্যুর অনেক কথা আছে।

গোদার: মৃত্যুর? না, একদম না ।  অন্য যে কোনও সময়ে হলেও ফিল্মটা খুব আলাদা হত না। তোমার যদি একটা ফাঁকা ঘর থাকে, তাহলে  আমি এই কথা ভেবে অপরাধবোধ এবং বেদনা উভয়ই অনুভব করতে পারি না, যে দেয়ালগুলো ফাঁকা, আমার পরিবার নেই, কিংবা কোনও পারিবারিক ফোটো দেয়ালে ঝোলানো, কেননা আমার পরিবার নেই, মাত্র একজন বা দুইজন বন্ধু আছে । কিন্তু ফিল্মটায় যদি অন্য লোকেদের রাখতুম তাহলে সেটা আত্মজীবনীমূলক হয়ে উঠতো আর তারপরে তা অন্যরকম কিছু হয়ে যেতো,  আর স্ব-প্রতিকৃতি থাকতো না। একটা স্ব-প্রতিকৃতি মূলত আয়নাতে বা ক্যামেরায় কেবল একটি মুখ। নয়তো তা হাস্যকর, কারণ তখন তুমি একটা শিশুকে অভিনয়ের জন্য নিতে, তোমার শৈশব দেখাবার জন্য আর…এটা হাস্যকর । অমন করা যায় না।

গ্যাভিন : ” মৃত্যুর পথে জীবন একটি বাধা, এবং এই ফিল্মটি আমার অন্তিম বিচার নির্ধারণ করবে” – এটি কি মৃত্যুর স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি নয়?

গোদার : হ্যাঁ…. না, কারণ যখন আমি আমার এই ছোট ছবিটি [চলচ্চিত্রের উদ্বোধনী চিত্র] আবিষ্কার করলুম, তখন আমি ভাবছিলুম যে কেন আমি ছয় বছর বয়সেই এতো মনমরা দেখাচ্ছি। তা এইজন্য নয় যে  আমার মা আমাকে চড় মেরেছিলেন; আমি মনে করি তাতে গভীরতর কিছু ছিল। তাই সেই সময়েই আমি পৃথিবী সম্পর্কে খুশি ছিলুম না!

গ্যাভিন : আপনার বলা চূড়ান্ত কথা হ’ল: “আমি বেঁচে থাকব। আমাকে ভালবাসার মাধ্যমে আত্মত্যাগ করতে হবে যাতে পৃথিবীতে প্রেম থাকে। ” ওগুলো কি আপনার নিজস্ব কথা না উদ্ধৃতি ?

গোদার : আমার মনে হয় ওটা একটৱা উদ্ধৃতি, তবে এখন আমার কাছে উদ্ধৃতি আর আমার কথা প্রায় একইরকম। আমি জানি না তা কার কাছ থেকে এসেছে; কখনও কখনও আমি তা  না জেনে ব্যবহার করছি।

গ্যাভিন :  উদ্ধৃতিটির  পুনরাবৃত্তি করে, এক অর্থে আপনি তা নিজেই বলছেন।

গোদার : এর সঙ্গে নিশ্চয়ই আমার কোনও কিছু করার আছে,  তবে তা ঠিক কী বলতে পারব না। ব্যাপারটা রঙের মতন, তবে শব্দ দিয়ে তৈরি।

গ্যাভিন : আমার কাছে, ‘জেএলজি / জেএলজি’ যাত্রা করে শীতকাল, নির্জনতা এবং ঘেরাটোপ থেকে বসন্তঋতু, খোলামেলা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার পুনর্নবীভূত বোধের দিকে ।

গোদার : হ্যাঁ ।

গ্যাভিন : শেষ শটগুলির মধ্যে একটা হ’ল বসন্তকালের অবিশ্বাস্য সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ। এটা জীবনের পূর্ণ প্রতিশ্রুতি  বলে মনে হয়।

গোদার : হ্যাঁ। আমি মনে করি বিশ্বের একখানা রূপক তৈরি করা ভাল ছিল, আর তারপরে ছায়া নেমে আসে । তবে  তার মানে দুঃখজনক নয় — তা হল কেবল দিনশেষের কথা ।

গ্যাভিন : ফিল্মের শুরুতে আপনি বলেছেন, “যে জায়গাগুলোয় দৃশ্য চিত্রায়িত হয়েছে তাতে শৈশবের প্রাকৃতিক-ভূদৃশ্যগুলো কারও অন্তরজগতে নেই ।” প্রতিটি প্রাকৃতিক-ভূদৃশ্যে কি  একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিগত অনুরণন আছে?

গোদার: না, আমি নিজে ওটার শুটিঙ করিনি; একজন ফটোগ্রাফার গিয়ে ওগুলো শুটিঙ করে এনেছিল, আর আমি সেগুলো থেকে বেছে নিয়েছিলুম । উনি ছিলেন জেনেভার ফটোগ্রাফার, ইভস পলিকুয়েন, যিনি প্রাকৃতিক-ভূদৃশ্যের শুটিঙ করতে  ভালোবাসেন। বেশিরভাগ ফটোগ্রাফার প্রাকৃতিক-ভূদৃশ্যের শুটিঙ করতে পছন্দ করেন না, তাঁরা আলোর কাছে আত্মসমর্পণ করতে চান না [অর্থাৎ — obéir] । ব্যাপারটা আলোকসজ্জার পক্ষে ভাল নয়, তবে উনি তথ্যচিত্র নির্মাণকারী মানুষ  হিসাবে একা যেতে পছন্দ করেন। তিনি কেবল মেঘের ছায়ার ছবি নেওয়ার জন্য তিন ঘন্টা ব্যয় করতে দ্বিধা করেন না, এবং তার ফলে প্রাকৃতিক দৃশ্যটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

গ্যাভিন : তা কি আপনি নিজেই করতে চাইতেন না?

গোদার : হ্যাঁ, তবে তখন আমি খুব দুর্বল ছিলুম। যাইহোক, আমি সেই জায়গাগুলো খুব ভাল করে জানি, কারণ তা আমার আসপাশের, কারণ এই বিশেষ ফিল্মটার জন্য আমি খুব বেশি দ্বিধা বোধ করছিলুম — এটা করব নাকি ওটা ? যেহেতু উনি নতুন ছিলেন এবং অনেকগুলো শট তুলে আনার আদেশ দেওয়া হয়েছিল, সেটা বেশ ভালভাবে কাজে দিয়েছিল। আমার এমন অনুভূতি ছিল যে আমি ফিল্মটা একা তৈরি করছিলুম না, বেশ কয়েকজন লোক ছিলেন, শুধু আমি একা নই, তথাকথিত প্রতিভাবান বা নৈরাজ্যবাদী ।

গ্যাভিন : ‘জেএলজি / জেএলজি’-তে একটি ভিজ্যুয়াল মোটিফ হ’ল স্কুলর এক্সারসাইজ খাতাগুলো: প্রথমে আপনি তাতে শিরোনাম লেখেন, তারপরে বাচ্চাদের নামগুলি লেখেন  যাদের খাতার পৃষ্ঠাগুলো ফাঁকা , তারপরে সবশেষে আপনার নিজের বইতে ফিরে যান, যাতে তখনও খালি পৃষ্ঠা ছিল । এই ফাঁকা পৃষ্ঠাগুলো ভবিষ্যতের আরেকখানা ছবির মতন মনে হয়, যে ইতিহাস এখনও লেখা বাকি ।

গোদার : হ্যাঁ ।

গ্যাভিন : তার মানে এই ফিল্মটা ফেয়ারওয়েল বা এপিটাফ নয়, যা কারও কারও  মনে হয়েছে । আপনি কি বলতে চাইছেন যে আপনার ভবিষ্যত একজন শিশুর  সম্ভাবনা বা প্রত্যাশার ক্ষেত্রে একইরকম ?

গোদার : আমার তেমন অনুভূতি আছে, হ্যাঁ । হতে পারে  যখন তুমি বুড়ো হয়ে যাবে, একরকম ভাবে তুমি নিজেকে আরও কমবয়সী বোধ করবে অথচ বুড়ো হয়ে গেছ — অল্প বয়স্ক বার্ধক্য, যদি সেকথা বলা যায়, যা খুবই… সান্ত্বনাময়।

গ্যাভিন : শিশুদের সঙ্গে আইডেনটিফাই করার জন্য ?

গোদার:  হ্যাঁ, তবে তুমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছ সেই  সত্যকে এড়িয়ে নয় । তোমার কাছে এখনও আবিষ্কারের জন্য সমস্ত কিছু পড়ে রয়েছে। সাধারণত তাদের দ্বিতীয় ফিল্মের ক্ষেত্রে, চলচ্চিত্র নির্মাতারা বলেন, “আমি কী করতে পারি? আমি সবই করে ফেলেছি।” এখন আমি বলি, “আমি কিছুই করিনি,  আরও অনেককিছু করতে হবে।” কিন্তু আমি তা করার সময় পাবো কী না তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন নই। আমি জানি যে প্রচুর ব্যাপার করার থাকলেও আমি আগে ভাবিনি যে ফিল্মে তা করা সম্ভব হতে পারে — যা-কিছু মোশন পিকচারে ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির ফলে ঘটছে — পুরানো বইয়ের শেলফের একটা শট  অনেক কথা বলতে পারে।

গ্যাভিন : শেষ অবধি, আপনি নিজের বাড়ি না ছেড়ে একটা চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারেন।

গোদার : তেমনটাই তো কমবেশি করেছি ।.

গ্যাভিন : ‘জেএলজি / জেএলজি’-র উদ্বোধনী শট চলাকালীন, ক্যামেরা যখন  আপনার অল্পবয়সী ছবিতে আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ক্যামেরার আর  ক্যামেরাম্যানের ছায়া বেশ স্পষ্ট দেখা যায় ।

গোদার : কেবল একবারের জন্য, আমি দর্শকদের কথা মনে রেখে করেছিলাম –বেশ সংক্ষিপ্ত, যাতে  বুঝতে পারা যায় যে এটি “আমি এবং আমি”। চিত্রশিল্পীদের স্ব-প্রতিকৃতিগুলির সাথে যেমন ঘটে, প্যালেট এবং পেইন্টব্রাশ হাতে ছবি আঁকছেন । 

গ্যাভিন : ভিডিও ক্যামেরায় পেছন থেকে জানালার বাইরের বেশ কয়েকটি শট নেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ ইমেজের  চেয়ে ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে পাওয়া শটটিতে ফোকাস কেন?

গোদার : মানে, দর্শকদের ফোকাস করার কথা ভাবানোর জন্য, ফোকাসের ধারণা দেবার খাতিরে। সাহিত্য, চিত্রকলা বা সংগীতে  ফোকাস করার কোনও ধারণা নেই; ফিল্ম তার বিষয়বস্তুতে ফোকাস করে।

গ্যাভিন : একইভাবে, “হায় আমার জন্য” ( Helas pour moi)তে,  রাশেলের (লরাঁ মাসলিয়াহ) একটি অসাধারণ শট রয়েছে মিডিয়াম লঙ শটে নেয়া, বেশ আউট অফ ফোকাস; মেয়েটি ক্যামেরার দিকে এগিয়ে যান এবং ক্লোজ-আপ হলে ফোকাসে আসেন ।

গোদার : হ্যাঁ, আমি অমনটা পছন্দ করি । ‘সিনেমার ইওতিহাসগুলো’[Histoire ( s ) du cinema]র ছবিগুলোতে ‘বিউটি অ্যাণ্ড দ্য বিস্ট’ [ La Belle et la bete]এর শট আছে, যখন জোসেটি ডে দীর্ঘ করিডোর ধরে হেঁটে আসেন ; ককতো কোনও ট্র্যাকিং শট তৈরি করেননি, তিনি তাকে একটি ছোট্ট ডলিতে রেখে ক্যামেরার দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। বাস্তবে এটি একই ব্যাপার, তবে অর্থ একই নয়। “হায় আমার জন্য” [Helas pour moi]-এর শটে তুমি মর্মার্থ খুঁজে পাচ্ছ: মেয়েটি ফোকাসে আসছে। ব্যাপারটা এমন, কেউ যেন জলের তলদেশ থেকে ওপরে পৃষ্ঠতলে ভেসে উঠছে,  কারণ সর্বোপরি, পর্দা হল একটা পৃষ্ঠতল । আমাকে দর্শকদের চিন্তা করতে প্ররোচিত করতে হবে। এটি সংগীতের মতো – যা নির্দিষ্ট নয় ; এমন বা অমন বোঝানোর ভান করা নয়। আমেরিকান লোকেরা বলতে পছন্দ করে, “আপনি ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন?” আমি উত্তর দেব: “আমি বলতে চাইছি বটে তবে ‘ঠিক’ তা নয়।” [ গোদার হাসেন]

গ্যাভিন :  “হায় আমার জন্য”[Helas pour moi ]তে  একটা স্তরে আপনি সিনেমার প্রযুক্তিগত শব্দভাঁড়ার অন্বেষণ করছেন বলে মনে হয়েছিল: ফোকাস, এক্সপোজার, ক্যামেরা মুভমেন্ট, মন্তাজ এমনকি একটা জুম আউট এবং ইন, যা আমি মনে করি আপনি প্রায় কখনও করেন না–

গোদার : না । খুবই কম ।

গ্যাভিন : প্রথম থেকেই  কি তেমন অভিপ্রায়  ছিল?

গোদার : না, শুটিংয়ের সময় সেটা ছিল। কারণ ফিল্মটা আমার আয়ত্ব থেকে পালাচ্ছিল, সম্ভবত আমি কিছু কিছু করার চেষ্টা করলুম যেগুলো আমি করতে সক্ষম নই তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যাচ্ছিল।  বাক্যটির থেকে ব্যকরণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বা ব্যাকরণ হয়ে যাচ্ছিল বাক্যগুলোর [un souvenir] একটা স্মৃতি । বাক্য তৈরি করা হয়নি, ব্যাকরণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এটা গাণিতিক উপপাদ্যের মতো যা বিজ্ঞানীদের কাছে একেবারেই সাফল্য পায় না, কারণ উপপাদ্যের যোগ, বিয়োগ, সমান চিহ্ণ ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

গ্যাভিন : কিন্তু মাধ্যমটার ব্যাকরণের  শুদ্ধ নিশ্চয়তা দেখার বিষয়ে উত্তেজক কিছু আছে নিশ্চয়ই, তা কেবলমাত্র  জ্ঞানীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও।

গোদার : হ্যাঁ, এটাই সিনেমার শুরু। এই ক্ষমতাটাকে আরও একবার সম্মান জানাতে পর্যাপ্ত পরিমিত হয়ে আমরা সময়ে সময়ে তা করতে পারি। তুমি যদি তা গণিতের ক্ষেত্রে করো, তবে এর কোনও অর্থ পাওয়া যাবে না । তুমি এটা সাহিত্যে করতে পারবে না, কারণ বাক্য এবং ব্যাকরণটি এতটা নিবিড়ভাবে সংযুক্ত , তুমি তাদের কেটে আলাদা করতে পারবে না। তবে সিনেমায় তুমি তা পারবে। আর কিছু না করে তুমি যদি কেবল কোনও ট্র্যাকিং শট বা ভূপ্রকৃতির দৃশ্য তোলো…। এই কারণেই আমি কিছু আনডারগ্রাউণ্ড আমেরিকান ফিল্ম পছন্দ করি, উদাহরণস্বরূপ মাইকেল স্নোর দুর্দান্ত ফিল্ম, ‘লা রিজিওন সেন্ত্রালে’, যা কেবল একটি দীর্ঘ প্যান। তা হল একটা ছবি, একেবারে খাঁটি সিনেমা।

গ্যাভিন : কিন্তু “হায় আমার জন্য” [Helas pour moi]তে  ব্যকরণগত অনুশীলনগুলো মনে হয় “ন্যারেটিভের” সঙ্গে সমন্বিত ।

গোদার : আমি ভেবেছিলুম আমার হাতে একটা ভাল চিত্রনাট্য আছে,  কিন্তু তাড়াতাড়ি শুট করা হয়ে গিয়েছিল । প্রথম খসড়াটা আমি প্রায় ১০০-১২০ পাতা লিখেছিলুম, আর আমাদের তিন সপ্তাহ পরে শুটিং করতে হয়েছিল। তাই আমি প্রযোজক এবং তারকাকে বলেছিলুম, “এটা সম্ভব নয়, আমাদের আরও তিন মাস বা সম্ভবত আরও তিন বছর সময় দরকার । তোমরা রাজি আছো?”  কেউ রাজি ছিল না, তাই আমি ফিল্মটা করলুম, কারণ সর্বোপরি একটা ফিল্ম মানে তো একটা ফিল্ম, ব্যাপারটা জীবনের মতন। আমরা প্রতিদিন যখন খেতে পারি, তখন খাই। তাছাড়া আমাকে কয়েকটা নির্দিষ্ট ব্যাপার সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হয়, তাই সম্ভবত অবচেতনায় আমি সেই ব্যাকরণগত সিনেমাটিক প্রতিমাগুলোকে আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করেছি।

গ্যাভিন : “সিনেমার ইতিহাসগুলো” [Histoirte ( s ) du cinema] দেখার আগে আমি কখনও ভাবিনি যে ভিডিওর ছবি অতো সুন্দর আর প্রলোভনসঙ্কুল হতে পারে । আপনি মনে হয় সম্ভাবনাকে আয়ত্ব করার উপায় আবিষ্কার করে ফেলেছেন ।

গোদার : আমি সোনি কোম্পানির চালু যন্ত্র ব্যবহার করি [ হাসেন ] — আমি ওটা ব্যবহার করছি আর আশা করি comme un aspirateur ( নতুন ভ্যাক্যুয়াম ক্লিনারের মতন ) জিনিসটা ভালো । আমি দেখতে ভালো আর পরিচ্ছন্ন জিনিস পছন্দ করি ; সাইকেল হোক কিংবা মোটরগাড়ি, দেখতে ভালো হওয়া চাই । টেলিভিশন ভালো করে তৈরি হয় না কিন্তু তুমি টেলিভিশনে দারুন সুন্দর প্রতিচ্ছবি তৈরি করতে পারো — জিনিসটা যেমনকার তেমনই, নিজের কাজ যতোটা পারে ভালোভাবে করে । কিন্তু আমি মনে করি যে তা এমন প্রতিচ্ছবি যেন কোনো পেইনটারের আঁকা স্কেচ, যা অসাধারণ পেইনটিঙের মতনই ভালো দেখতে লাগবে ।

গ্যাভিন : আপনার আগের ভিডিওর কাজগুলো ততো পেইনটারসুলভ ছিল না । “সিনেমার ইতিহাসগুলো” [Histoire ( s ) du cinema] যেন বয়নবিন্যাসের ব্যাপারে পেইনটিঙে ।

গোদার : সেটা ঠিক ।এটা চিত্রাঙ্কনের ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত আর এটা খাঁটি চিত্রাঙ্কন, কিন্তু সিনেমাটিক পেইন্টিং—এটা সিনেমার একটা দিক , যা বেশিরভাগ লোক বাতিল করে দিয়েছে। আর শুধু বিজ্ঞাপনই নয়। বিজ্ঞাপনগুলোও পেইন্টিঙ করে, বা সেই পোলিশ ভিডিও নির্মাতা রাইবজাইন্স্কি — সেগুলো কেবল বিজ্ঞাপন, তার কোনও মানে হয় না, স্রেফ সাজসজ্জা। আমি মাঝে মাঝে বিজ্ঞাপনগুলোকে পছন্দ করি,  কারণ ওই এক মিনিটের মধ্যে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়, আর তারা এমন জিনিস তৈরি করে যা মোশন পিকচারে অসম্ভব, কারণ ব্যাপারটা খুব ব্যয়বহুল হবে। তবে এগুলো বিক্রি করার জন্য তাদের মর্মার্থ এবং সেগুলোর বোধবুদ্ধি এবং তাদের লক্ষ্য, এটা বিক্রি সেটা বিক্রি — তা মোটেও ভালো নয় । ৩০ সেকেন্ডে এক মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা ভাল নয় … আমি জানি না, একটি জেনারেল মোটরসের গাড়িও তো মিলিয়ন  ডলার দাম নয়।

তবে আমি  মানি : এটি চিত্রাঙ্কন এবং উপন্যাস। আমার কাছে সিনেমা কেবল আমার লক্ষ্য, তবে তা সম্ভব নয়, কারণ সিনেমা পেইনটিঙ নয় ।  আমার কাছে সিনেমা হ’ল [ একটি পেইনটিঙের পত্রিকায় ভূদৃশ্যের বেশ কয়েকটি চিত্রের একটি চিত্রকর্মের দিকে নির্দেশ করে ] তবে আমি সেই লোকগুলোর সঙ্গে [ যাদের আঁকা]  কথা বলতে ভালোবাসি, আর তারপরে আছে নাটক — তবে সেইরকম পেইন্ট-করা নাটক। কোনও উপন্যাসের মতো নয়। আমি প্রায়শই পেইনটিঙগুলোর দিকে তাকাই আর নিজেকেই বলি, ও কী বলছে? এই লোকগুলো — তারা কী ভাবছে? আমার মনে আছে আমার প্রথম নিবন্ধটা, একটি প্রিমিনজার ছবি এবং ইমপ্রেশনিস্ট পেইন্টিংয়ের মধ্যে  তুলনা ছিল। হয়তো তা সম্ভব নয়, তবে আমার কাছে এটা সম্ভব বলে মনে হয় — ফিল্মটা তো আমার। সেই জন্যই তা পেইনটিঙের কাছাকাছি এবং আরও কাছাকাছি চলে আসছি।

এখন যদি আমি  ফিল্মে [আর্ট ম্যাগাজিনে পেইন্টিং] রাখি, তাহলে আগের প্রতিচ্ছবি কী হওয়া উচিত এবং এর পরের প্রতিচ্ছবি কী হওয়া উচিত? চিত্রকলাতে আমি যা পছন্দ করি, তা হ’ল এটি কিছুটা ফোকাসের বাইরে হয় আর তুমি তার পরোয়া করো না। সিনেমায় তুমি আউট অফ ফোকাস থাকতে পারবে না, তবে তুমি যদি সংলাপ যোগ করো, যদি তুমি ফিল্মে তা দেখাও,   বাস্তবতার দিকে ওই ভাবে চেয়ে দেখা, তবে তোমার ফোকাস-করা সিনেমাটোগ্রাফিক প্রতিচ্ছবি এবং শব্দের মধ্যে এমন একটা জমি রয়ে যায় যা আউট অফ ফোকাস , আর এই আউট অফ ফোকাস হল আসল সিনেমা।

গ্যাভিন : ‘সিনেমার ইতিহাসগুলোর’ ভিজ্যুয়াল টেক্সচারগুলি প্রায়শই এমনভাবে স্তরান্বয়ন করা হয়েছে যে প্রায়ই কিছু জায়গায় যেন একটি পেইনটিঙ ইন্দ্রিয়জ আর ঐশ্বর্য্যময় হয়ে উঠেছে ।

গোদার : হ্যাঁ, ইন্দ্রিয়জ একটি ভাল শব্দ। চিত্রকলার সংবেদনশীলতা, যা উপন্যাসগুলিতে থাকে না, তা ভাল, কারণ প্রতিটি রূপের প্রকাশের নিজস্ব আঙ্গিক থাকা উচিত যা অন্য জনারদের হাতে নেই, অন্যথায়  প্রকাশের শুধু একইরকম রূপ থাকবে। শুরু থেকেই ফিল্মগুলো প্রতিটি পরিবারের অংশ। আমার কাছে ফিল্মগুলো হ’ল শৈল্পিক পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য যার জন্ম সব শেষে হয়েছে, মানে ব্ল্যাক শিপ । কিন্তু তা একটা সাদা ভেড়া — কেননা পর্দাগুলো  তো সাদা [হাসি]। সংবেদনশীলতা এমন কিছু, যা সিনেমায় পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই, যা নীরব যুগে বেশি ছিল এবং স্বাভাবিকভাবে টকিজের সাথে অদৃশ্য হয়ে গেল।

গ্যাভিন : তা সিনেমাকে বন্দি করল না ইমেজকে ?

গোদার : হ্যাঁ, একভাবে দেখতে গেলে তাইই । আমি প্রায়ই প্রযুক্তি ব্যবহার করার  চেষ্টা করি, যেমন ডলবির কথা ধরা যাক, আওয়াজকে ছবি থেকে আলাদা করতে, আর হঠাৎ যখন নাট্যদৃশ্যের সেটার প্রয়োজন হয়, তখন তারা আবার দুজনেই একসঙ্গে হয়ে যায় । এটা [স্পষ্ট], বিশেষত আমেরিকান সিনেমায়, তুমি ক্যামেরা নিয়ে বিশেষ কাজ করো না, এই তথ্যে নির্ভর করে যে,  তা আরও বেশি করে কৃত্রিম হয়ে যাচ্ছে । আমি সম্প্রতি The Pelican Brief দেখেছি। ওটা স্রেফ বিজ্ঞাপন। ক্যামেরা চলতে থাকে, অথচ ক্যামেরার চলাচল বা স্থিরতার সঙ্গে বা শট পরিবর্তনের সঙ্গে ভন স্ট্রোহিম বা ভন স্টার্নবার্গের কোনও যোগসূত্র নেই। এর কোনও মর্মার্থ গড়ে ওঠে না, কেবল আমরা ফিল্ম করছি এরকম ভান করা ছাড়া আর কিছুই নয়।

গ্যাভিন : আপনি অনুভব করেন না যে এটি যৌনতার অন্য রূপ?

গোদার : না, ওটা বেশ্যাবৃত্তি ।

গ্যাভিন : ‘জেএলজি / জেএলজি’-র আরেকটি উদ্ধৃতি: “একটি ইমেজ গড়ে ওঠে মনের দুটি পৃথক বাস্তবকে একত্রিত করে ; বাস্তব যতো দূরে যায় আরও নিখুঁত হয়, ইমেজ ততই শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

গোদার : ওটা একটা পুরানো উদ্ধৃতি। ‘জেএলজি / জেএলজি’তে আমার নিজস্ব প্রায় একটি শব্দও নেই, তবে যেহেতু আমি সেগুলি পড়ছিলুম আর তা নোট কর রাখছিলুম, সেগুলো আমার হয়ে গেল।

গ্যাভিন : Passion ফিল্মের পরিচালক সে-কথা বলেন ।

গোদার : ওটা  ‘কিং লিয়ারে’ [King Lear] রয়েছে। এটা পিয়ের রেভেরদির একটি কবিতা,  ডাডার পরাবাস্তববাদীদের প্রথম একজন, ১৯২১ সালে জুরিখে যখন ডাডার সূত্রপাত হয়েছিল তখন থেকে । কবিতাটা আমার মতামত খুব ভালভাবে প্রকাশ করেছিল যে, কোনও ইমেজ এই জন্যে শক্তিশালী নয় কারণ আপনি একজন মৃত ব্যক্তিকে দেখছেন…। অনেকসময়ে, বলতে গেলে কম সময়েই,  কেবল একজন মৃত ব্যক্তির প্রভাব গড়ে ওঠে । ভিয়েতনাম যুদ্ধ এইজন্যে শেষ হয়ে যায়নি যে আমরা অনেক মৃত মানুষকে দেখেছিলুম ,বরং এই কারণে যে একবার আমেরিকান জনগণ একটি আমেরিকান ছাত্রকে কেন্ট রাজ্যে খুন হতে দেখেছিল — কেবলমাত্র একজন,হাজার নয় — তাই ছিল যথেষ্ট । পরের দিন সকালে তারা আর সক্ষম হয় নি, [তবে] তিন বা চার বছর সময় লেগেছিল আর তারপরে হ্যানয়তে বোমা ফেলা হলো।

গ্যাভিন : কীভাবে আপনি এই আইডিয়াকে ব্যবহার করবেন,  সম্পূর্ণ বিপরীতে দিক থেকে একটি নির্দিষ্ট ইমেজ তৈরি করবেন?

গোদার : কিন্তু  একটি ইমেজ তো বিদ্যমান থাকে না। এটা কোনও ইমেজ  নয়, এটা একটা ছবি। ইমেজ হ’ল আমার সাথে সম্পর্কিত আর সেই দিকে তাকিয়ে অন্য কারোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার স্বপ্ন দেখছি । ইমেজ হল একটা অনুষঙ্গ।

গ্যাভিন : আপনার সত্যিকারের মন্তাজ সম্পর্কে ধারণাটি এখানেই ঘটে?

গোদার : হ্যাঁ । La vrai mission, সিনেমার আসল লক্ষ্য  ছিল মন্তাজ কী তা বিশদ করা আর তা প্রয়োগ করা। কিন্তু আমরা সেখানে কখনও পৌঁছোইনি; অনেক পরিচালক বিশ্বাস করেছিলেন যে তাঁরা সেখানে পৌঁছে গেছেন, কিন্তু তাঁরা করেছিলেন অন্য কাজ । বিশেষত আইজেনস্টাইন। উনি মন্তাজের  পথে এগিয়েছিলেন কিন্তু সেখানে পৌঁছোতে পারেননি। উনি তো সম্পাদক ছিলেন না, উনি কোনাকুনি ছবি তুলতেন। আর যেহেতু কোনাকুনি নেওয়ার ক্ষেত্রে উনি বেশ ভাল ছিলেন বলে, সেখানে মন্তাজের আইডিয়া ছিল। অক্টোবরের তিনটি সিংহ, একই সিংহ কিন্তু তিনটি ভিন্ন কোণ থেকে নেওয়া, তাই সিংহটিকে দেখে মনে হচ্ছে প্রাণীটা  চলমান । আসলে বিভিন্ন কোণের অনুষঙ্গের কারণেই মন্তাজ এসেছিল । মন্তাজ অন্য কিছু, কখনও আবিষ্কার হয়নি। টকিজ আসার ফলে তা বন্ধ হয়ে যায়; টকিজগুলো তাকে কেবল থিয়েটারের মতন ব্যবহার করেছিল ।

গ্যাভিন : আপনি যখন এলিজাবেথ টেইলরের ইমেজকে Place in the Sun-এ উনোনের ভেতরের দেহগুলোর ওপর ‘ইতিহাসের সিনেমাগুলো’তে [Histoire ( s ) cinema] সুপারইমপোজ করেন —তখন তা মন্তাজ।

গোদার :  ওটা ঐতিহাসিক মন্তাজ। এটা একটা সমালোচনামূলক কাজ: এলিজাবেথ টেলরের হাসিখানা কেন এমন হাসি তা ব্যাখ্যা করে—

গ্যাভিন : হলোকস্টের কারণে–

গোদার : হলোকস্টের কারণে। এবং যেহেতু জর্জ স্টিভেনস হলোকস্টের শুটিঙ করেছিলেন, অনেক অনেক  বছর ধরে সেটা তাঁর সেলারে লুকিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু তিনি যখন A Place in the Sun  শুটিং করছিলেন তখন তাতে একইসঙ্গে একধরণের হাসি এবং বিপর্যয় দেখা দেয়। এমনকি তা কোনও অসাধারণ চলচ্চিত্র না হলেও, অত্যন্ত তীব্র আর তুমি তা ব্যাখ্যা করতে পারবে না। জর্জ স্টিভেন্স পরে যে  ছবিগুলো করলেন তার কোনওটিই অতো ভাল ছিল না। মিলি পার্কিন্সকে নিয়ে The Diary of Anne Frank, যা শিণ্ডলার্স লিস্ট-এর চেয়ে ভাল কিন্তু খুব ভাল ফিল্ম নয়; উনি মিলি পার্কিন্সের হাসি সেইভাবে নিতে পারেননি  যেভাবে এলিজাবেথ টেইলর মৃদু হেসেছিলেন ।

গ্যাভিন : পুরো ‘ইতিহাসের সিনেমাগুলো’ [ Histoire (s) du cinema] জুড়ে আপনি অসাধারণ সৌন্দর্য্য ও মাহাত্ম্যের ইমেজের বিপরীতে আতঙ্ক ও  নৃশংসতার ইমেজগুলো উপস্হাপন করেছেন । মনে হয় আপনি বলতে চাইছেন যে সিনেমা এই দুটির মাঝে তৈরি হয়।

গোদার : হ্যাঁ, অতিক্রম করার ধারণা তাতে রয়েছে। আমি যখন থামে-বাঁধা চোখবন্ধ বন্দির নিউজরিল ফুটেজ মেশাচ্ছিলুম — তুমি তো জানো তিন মিনিটের মধ্যেই তাকে গুলি করে মারা হবে  — আমি ওটাকে মিশিয়েছিলুম An American in Paris, জিন কেলি এবং লেসিলি কারন সিন নদীতে নাচের সঙ্গে। এটা অবচেতন কাজ ছিল, কিন্তু পরে আমি নিজেকে বলেছিলুম, যে, হ্যাঁ, আমার তা করার অধিকার আছে কেননা An American in Paris সম্ভবত একই সময়ে তোলা হয়েছিল।

গ্যাভিন : ‘ইতিহাসের সিনেমাগুলো’র [ Histoire (s) du cinema] প্রথম অংশে আপনি ভিডিও প্রয়োগ করেছেন যাতে সম্পাদনার প্রভাবগুলোয় লক্ষণীয় বৈচিত্র্য অর্জন করা যায় — দুটি শট দ্রুত পরস্পরকে কাটতে পারে, কোনো ওয়র্ড প্রসেসরে একটা বাক্য টাইপ করার ছন্দ দিয়ে কাটতে পারা যায়। আপনি ঠিক কী জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করছিলেন?

গোদার : না কেটেই ইমেজগুলোকে মেশানোর চেষ্টা করা হয়েছিল — খুব দ্রুত আরোপন, যাতে কেবল একটা ইমেজ থাকে, কিন্তু আমরা বুঝতে পারলুম যে দুটো আছে।

গ্যাভিন : ওটা আমাকে ফিল্মে ২৪-ফ্রেম-প্রতি সেকেন্ডের প্রভাব বজায় রাখা সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করেছিল। আমি ভেবেছিলাম আপনি চেষ্টা করছেন —

গোদার : বিশদে তা বলতে হলে বলব, হ্যাঁ ।

গ্যাভিন : অত্যন্ত ধিমে তালে চলা ডিজলভগুলো সম্পর্কে কী বলবেন ?

গোদার : সেই সমস্ত পুরোনো কৌশল  মোশন পিকচার ব্যবসার শুরু থেকেই ছিল , যা আমরা নিউ ওয়েভে ভেঙে ফেলতে সক্রিয় ছিলুম — আর এখন ভিডিও আসার ফলে ওটা ফিরে এসেছে, তবে ভালভাবে।

গ্যাভিন : কিন্তু ‘সিনেমার ইতিহাসগুলো’ [ Histoire (s) du cinema] এর মধ্যেও সংক্রমণগত প্রভাব রয়েছে, যার কোনও সিনেমাটিক নজির নেই: যেমন ধরা যাক, যখন কোনও ইমেজ ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে আর শেষে আগের ইমেজটাকে মুছে ফ্যালে। মোশন পিকচারগুলোতে ওয়াইপস আর স্প্লিট-স্ক্রিন প্রভাব আছে, কিন্তু এরকম বিস্তারিত কিছু নেই। সেই ব্যাকরণটা অনন্যভাবে ভিডিওর।

গোদার : হ্যাঁ, তবে এটা তো সিনেমা। আমার কাছে ভিডিও মোশন পিকচারের একটা বিভাগ। যখন তুমি ‘সিনেমার ইতিহাসগুলো’ [ Histoire (s) du cinema] দেখো, তখন তোমার স্বাভাবিক ভিডিওর অনুভূতি হয় না না, তখন তোমার সিনেমার অনুভূতি হয়।

গ্যাভিন : আমি ‘সিনেমার ইতিহাসগুলো’ [Histoire (s) cinema] ভিডিওতে দেখেছি আর টিভির টেপেও দেখেছি—

গোদার : ওটা টিভিতে দেখা ভাল, যদি তোমার টিভি সেটটায় ঠিকমতো সামঞ্জস্য করা থাকে আর  মোটামুটি ভাল স্টেরিও সরঞ্জাম থাকে । টিভিতে কোনও প্রজেকশান নেই । একটা প্রত্যাখ্যান আছে—তুমি তোমার আরামকেদারা্য বা  বিছানায় প্রত্যাখ্যাত হয়ে আছো।সিনেমায় তুমি প্রজেকটেড, কিন্তু তা সত্বেও তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে কী হয়ে উঠতে চাও । টিভিতে কেবল কোনও কিছুর ট্রানসমিশন থাকে ।  সিনেমায় প্রজেক্ট করার ব্যাপারটা অদ্ভুত, হ্যাঁ।

গ্যাভিন : আবার, ‘সিনেমার ইতিহাসগুলো’ [ Hisdtoire (s) du cinema] থেকে একটা উক্তি: “থিয়েটার ব্যাপারটা বেশ পরিচিত; সিনেমা খুবই অচেনা।”

গোদার : রবার্ট ব্রেসঁ ?…

গ্যাভিন : আমি এটিকে আপনার “histoire de la nuit” , রাতের গল্প, আর ইমেজ সম্পর্কে বর্ণনার সঙ্গে যুক্ত করি এবং এই দুটি বাক্যাংশ থেকে আমি যে আইডিয়া পাই  তা এই যে সিনেমা একখানা রহস্যের এলাকা । আপনি কেন মনে করেন যে আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে তৈরি আপনার ফিল্মগুলো রহস্য ন্যারেটিভের রূপ সম্পর্কে ক্রমশ জড়িয়ে পড়েছে? ডিটেক্টিভ [Detective], হেইল মেরি [Hail Mary], নভেল ভিগ [Nouvelle Vague], হেলাস পোর মোই [ Helas pour moi] সব কয়টাই কোনও কেন্দ্রীয়, অদৃশ্য রহস্য বা ধাঁধাকে  ঘিরে আবর্তিত হয়।

গোদার :  তুমি যখন বয়স্ক হয়ে যাও, তখন কাঠামোর বিশ্লেষণ উপন্যাসেরই একটা অংশ। এটা হ’ল জেমস জয়েসের ইউলিসিস এবং এরেল স্ট্যানলি গার্ডনার মধ্যে পার্থক্য। পেরি ম্যাসনে রহস্যটি বর্ণনা করার রহস্য মাত্র, [যেখানে জয়েসের কাছে ] লেখার রহস্য নিজেই উপন্যাসের অংশ। পর্যবেক্ষক এবং মহাবিশ্ব একই মহাবিশ্বের অঙ্গ।  এই শতাব্দীর শুরুতে বিজ্ঞান সেটাই আবিষ্কার করেছিল, যখন তারা বলল যে তুমি পারমাণবিক কণা কোথায় তা বলতে পারবে না। তুমি জানো যে তারা কোথায়, কিন্তু তাদের গতি জানো না ; বা তুমি তাদের গতি জানো কিন্তু তাদের অবস্থান জানো না, কারণ তা তোমার ওপর নির্ভর করে। যিনি বর্ণনা করেন তিনি সেই বর্ণনার অংশ ।

গ্যাভিন : ষাটের দশক ও সত্তরের দশকে আপনি যে রহস্যগুলি সমাধান করার চেষ্টা করছিলেন তা ধর্মনিরপেক্ষ বস্তুবাদ ভিত্তিক ছিল আর আকাঙ্খা, আদর্শ, ভাষা এবং শক্তিক্ষমতার মতো ব্যাপারগুলোর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল। আশির দশকের পর থেকে, যদিও আপনার ফিল্মগুলো এই বিতর্কমূলক প্রশ্ন অব্যাহত রেখেছে, এখন ফিল্মগুলো দর্শন আর অধিবিদ্যার চিরন্তন রহস্যগুলোর সাথে বেশি সম্পৃক্ত।

গোদার : আমিও তাই মনে করি,  আর তুমি যদি সাধারণ ব্যাপারের মাধ্যমে অধিবিদ্যাটা আনতে পারো তাহলে খুব ভাল হয়। এটা শিল্পীর একটা দায়িত্ব। সেজানের আঁকা একটা সাধারণ আপেল একটা সাধারণ আপেলের চেয়ে বেশিকিছু । বা কেবল একটা সাধারণ আপেল।

গ্যাভিন : Nouvelle Vague এবং Helas pour moi ফিল্মে প্রকৃতিকে ব্যবহারের পেছনে কি তাইই আছে ?

গোদার : হ্যাঁ ।

গ্যাভিন : এই দুটো ফিল্মে আপনার উজ্জ্বল প্রাকৃতিক আলোর ব্যবহার অস্বাভাবিক — ক্যামেরা ভেতরে থাকলেও,  বা দিগন্তের জন্য, মনে হয় যেন তা বাইরে শুটিঙ করা । বৈসাদৃশ্যে কেন এমন জোর দিয়েছেন ?

গোদার : কারণ আমি বৈশাদৃশ্য দেখছি। এটা দুটো ইমেজ রাখার উপায়, একে অপরের থেকে অনেক দূরে, একটা অন্ধকারময় এবং একটা রোদযুক্ত । আমি আলোর মুখোমুখি হতে চাই, আর তুমি যদি আলোর মুখোমুখি হও তবে বৈপরীত্য দেখা যায় এবং তারপরে তুমি  রূপগুলো দেখতে সক্ষম হও… যা সর্বদা ইউরোপীয় চিত্রকলার সমস্যা ছিল, তবে রোমান্টিকদের আর দেলাক্রয়ার সময় থেকে আরও সচেতনভাবে। আমি চাই পেছনে আলো থাকবে না, কারণ পেছনের আলো প্রজেক্টরের অন্তর্গত, ক্যামেরার সামনে আলো থাকা জরুরি, যেমন আমরা নিজেরাই জীবনে তা পাই। আমরা গ্রহণ করি এবং [পরে] তা প্রজেক্ট করি।

গ্যাভিন : তার মানে ক্যামেরার পেছনদিকে আপনি নকল আলো কখনও রাখেননি ?

গোদার : কখনই নয় ।

গ্যাভিন : কিন্তু আপনি তো নকল আলো ব্যবহার করেন ?

গোদার : শুধুমাত্র এই কারণে যে আমার তেমন কোনও ফটোগ্রাফার নেই যিনি ৫০ বছর আগের দুর্দান্ত ফটোগ্রাফারদের মতো ভাল । সুতরাং আমি কৃত্রিম আলো ব্যবহার করতে পছন্দ করি,  তবে জিনিসগুলি পরিবর্তন না করে: আমাদের প্রয়োজন হলে ফোকাস করার জন্য শক্তিশালী আলো প্রয়োজন হবে। আমার মতে আর প্রায় ফটোগ্রাফার বলতে কেউ নেই। তাদের মেরে ফেলা হয়েছে, যেভাবে পুরো সেট জুড়ে তারা  টিভির ছবি তোলে আর একই লোকজন দিয়ে ভরাট করে, কোনও ছায়া থাকে না, কিছুই না । আমি সিনেমাটোগ্রাফারদের ব্যবহার করি যারা অতিরিক্ত লাইট ব্যবহার করতে ইচ্ছুক নয় আর প্রধানত ভাল অ্যাপারচার খোলার ক্ষেত্রে কাজ করার চেষ্টা করেন।

গ্যাভিন : ‘ডিটেক্টিভ’ ফিল্মে একটি লাইন  আছে: “এখানে কখনও কোনও আলো হয় না, কেবল কঠিন  আলোর ব্যবস্হা ।” 

গোদার: ‘ডিটেক্টিভ’ বেশ ভাল আলোকিত ছিল, একজন ভাল ফটোগ্রাফার [ব্রুনো নুয়াইটেন]। তিনি অজানা অভিনেতাদের ভাল করে আলোকিত করেছিলেন কারণ দৃশ্যটায় তাদের দেখা না গেলেও তারা ভয় পেতো না। কিন্তু  নাথালি বে বা জনি হ্যালিডের মতো তথাকথিত বিখ্যাত তারকারা আসার সাথে সাথে তিনি কৃত্রিম আলো ফেলেছিলেন আর তা মোটেই ভাল হয়নি। তিনি তাদের প্রতি আলোকপাত করেছিলেন কারণ তারা টিভিতে স্পিকার দেখতে চান। স্পিকার দেখার গুরুত্ব কী? আমাদের কেবল দরকার তারা যা বলছে তা শোনা।

গ্যাভিন : আর আপনি তার সাথে একমত হতে পারেননি ।

গোদার : ওহ, পুরোপুরি [হাসি]। একটা জবরদস্ত তর্কাতর্কি হয়েছিল। কিন্তু আমি তা এড়াতে পারিনি কারণ  চুক্তিতে স্বাক্ষরিত ছিল ব্যাপারটা। একটি সমঝোতা করতে হয়েছিল। একটা ফিল্ম সব সময়েই একখানা আপস ।

[ফিল্ম কমেন্ট পত্রিকার মার্চ-এপ্রিল ১৯৯৬ সংখ্যায় প্রকাশিত । ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মলয় রায়চৌধুরী]

About anubadak

আমি একজন অনুবাদক । এতাবৎ রেঁবো, বদল্যার, ককতো, জারা, সঁদরা, দালি, গিন্সবার্গ, লোরকা, ম্যানদেলস্টাম, আখমাতোভা, মায়াকভস্কি, নেরুদা, ফেরলিংঘেট্টি প্রমুখ অনুবাদ করেছি ।
This entry was posted in Jean-Luc Godard and tagged . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s