জাঁ-লুক গোদার-এর প্রেমিকা ও প্রথম স্ত্রী আনা কারিনার সাক্ষাৎকার । অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

জাঁ-লুক গোদার-এর প্রেমিকা ও প্রথম স্ত্রী আনা কারিনার সাক্ষাৎকার

অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

কাভে জাহেদি একজন মার্কিন চিত্র পরিচালক । তাঁর বাবা-মা ইরান থেকে আমেরিকায় চলে গিয়েছিলেন, সেখানে কাভে জাহেদির জন্ম হয় ; জাহেদির জন্মের বছরই জাঁ-লুক গোদারের ‘ব্রেথলেস’ ফিল্মটি মুক্তি পেয়েছিল । তিনি ছিলেন গোদারের ভক্ত । আনা কারিনা ( ১৯৪০ – ২০১৯ ) যখন বার্ধক্যে পৌঁছে গেছেন তখন এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন কাভে জাহেদি ।

জাহেদি : আপনি কি এখনও অভিনয় করছেন ?

কারিনা : জানো, আমি এখন বুড়ি হয়ে গেছি তো, তাই আর অভিনয়ের প্রস্তাব বেশি পাই না, কিন্তু তা থেকেও আমি যে চরিত্র পছন্দ করি তাতেই কেবল অভিনয় করি । আমি চিরকাল এই রকমই ছিলুম । আমি টাকার পেছনে বা ওই ধরনের ব্যাপারের পেছনে ছুটিনি । যদি ভালো হয়, তাহলে অভিনয় করি, এমনকি ছোটো ভূমিকাতেও । কিন্তু আমার পছন্দ না হলে, আমি বলে দিই, “হ্যালো, গুডবাই”, ব্যাস ।

জাহেদি : আপনি কি আরও কিছু করতে চান, যতোদিন বেঁচে আছেন, মারা যাবার আগে ?

কারিনা : মারা যাবার আগে ? দেখবো…( হাসতে থাকেন ) । তুমি বেশ মজার লোক ! না, আমি জানি না । অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা করে আমি খুশি আর, তোমাকে বলি, লোকে হাসে। আমি লোকেদের হাসাই । বেশ ভালো ব্যাপার । বেশ ভালো সময় কাটে । আর যেখানে আমি থাকি, প্রতিবেশীদের সবাইকে আমি চিনি । আমি তিন পা হেঁটেছি কি, কেউ বলে ওঠে, “আনা, কেমন আছেন ?” বুঝলে, অনেকটা গ্রামের মতন ।

জাহেদি : তার মানে আপনি জীবন উপভোগ করছেন ?

কারিনা : বুঝলে, আমি চিরকালই উপভোগ করেছি । অনেকসময়ে উথ্থান-পতন তো থাকেই। কিন্তু আমি দিব্বি টিকে গেছি ।

জাহেদি : তাহলে এখন কোন ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে আপনি আগ্রহী ?

কারিনা : আমি তিনটে বই লিখেছি — দুটো বাচ্চাদের জন্য । আমি “আগলি ডাকলিঙ” আবার নতুন করে লিখেছি । তুমি জানো তো, হ্যান্স খ্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন । আমি নতুন করে লিখেছি, আধুনিক ভার্শান । তারপর আমি লিখেছি ‘দি লিটল মারমেইড’ যেটা পরের বছর প্যারিসে সঙ্গীতনাট্য হবে ।

জাহেদি : আপনার ভারশানের ?

কারিনা : হ্যাঁ, আমার ভারশানের ।

জাহেদি : দারুণ । তার মানে আজকাল আপনি লেখালিখি করছেন ?

কারিনা : আমি লিখছি, আমি গান গাইছি, আমি যা করছি, জানো তো…

জাহেদি : আপনি যে ফিল্মগুলো পরিচালনা করেছিলেন, আমি সেগুলো খুঁজছিলুম । আমি সেগুলো কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না ।

কারিনা : কে জানে, জানি না । জীবন এই রকমই । হয়তো তুমি জানতে পারার আগে মারা যেতে পারো ।

জাহেদি : ( হেসে ) : হ্যাঁ, হয়তো, আপনার তেমনই ঘটার সম্ভাবনা ।

কারিনা : প্রথমটার নাম ছিল “একসঙ্গে থাকা”। Vivre Ensemble. আমি নিজে প্রযোজনা করেছিলুম ।

জাহেদি : আশা করি একদিন সেটা খুঁজে পাবো ।

কারিনা : আমিও তাই ভাবি ।

জাহেদি : গোদার আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিলেন । আর আপনারা দুজনে যে ফিল্মগুলো করেছিলেন সেগুলো ওনার সবচেয়ে ভালো ফিল্ম । আর অনেক গৌ্ররবজনক । আমি চিরকাল ভেবেছি আপনার আর গোদারের সম্পর্ক নিয়ে একটা ফিল্ম করব । আমি জানি, একজন পরিচালক এখন গোদার আর অ্যানে উইয়াজেমস্কির সম্পর্ক নিয়ে একটা ফিল্ম করছেন, ঠিক কি না ?

কারিনা : ওহ, আমি সে ব্যাপারে জানি না তো ।

জাহেদি : হ্যাঁ, যে ভদ্রলোক ‘দি আর্টিস্ট’ তৈরি করেছিলেন ।

কারিনা : আচ্ছা ?

জাহেদি : হ্যাঁ, উনি একটা ফিল্ম করছেন, আর আমার মনে হয় লুই গারেল তাতে গোদারের ভূমিকায় অভিনয় করছেন ।

কারিনা : লুই গারেল গোদারের ভূমিকায় অভিনয় করছেন ? উনি তো আমার বন্ধু ! আমি জানতুম না !

জাহেদি : দু দিন আগে অ্যানাউন্স করা হয়েছে ।

কারিনা : দুদিন আগে ? আমি তো এখানে দশ দিনের বেশি রয়েছি । দারুণ খবর ।

জাহেদি : অ্যানে উইয়াজেমস্কি একটা বই লিখেছিলেন ।

কারিনা : হ্যাঁ, আমি সেটা পড়েছি ।

জাহেদি : ফিল্মটা সেই বই থেকেই তৈরি হবে । কিন্তু, আমি বলতে চাই, গোদারের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ফিল্মের ইতিহাসে তো আরও গুরুত্বপূর্ণ ।

কারিনা : সেটা…আমি অবাক । আমি সত্যই বিস্মিত । ওরা ওই বইটা থেকে ফিল্ম তৈরি করছে?

জাহেদি : হ্যাঁ ।

কারিনা : হ্যাঁ, বইটার নাম…

জাহেদি : উন অন আপরেস ( এক বছর পরে )।

কারিনা : হ্যাঁ ।

জাহেদি : গোদারের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক নিয়ে কেউ ফিল্ম তৈরি করতে চাইলে আপনি কি রাজি হবেন ?

কারিনা : ওহ, না । আমি তা চাইব না ।

জাহেদি : কেন ?

কারিনা : কেননা, তুমি জানো, ব্যাপারটা ব্যক্তিগত ।

জাহেদি : আপনাদের সম্পর্ক নিয়ে স্মৃতিকথা বা তেমন কিছু লিখতে চান না ?

কারিনা : মানে, সেটা আলাদা ব্যাপার । তুমি তো ফিল্মের কথা বলছ, নয়কি ?

জাহেদি : হ্যাঁ । আপনি যদি স্মৃতিকথা লেখেন তাহলে শেষ পর্যন্ত কেউ না কেউ একটা ফিল্ম করবেই ।

কারিনা : মানে, আমি মারা গেলে হয়তো ঠিকই হবে । আমি ভাবছি ব্যাপারটা বেশ মজার, কেননা বইটা, আমি জানি না, ওটা বিচ্ছিরি, নয়কি ?

জাহেদি : ওহহো । আপনি ওই মহিলাকে চিনতেন ?

কারিনা : হ্যাঁ, ও তো এখন লেখিকা । ও আর অভিনেত্রী নয় । অ্যানে উইয়াজেমস্কির সঙ্গে জাঁ-লুক গোদারের বিয়ে হয়েছিল, আমার পরে ।

জাহেদি : আপনাদের দুজনকে ছাড়া আর কারোর সাথে ওনার বিয়ে হয়েছিল কি ?

কারিনা : না । ও আমাকে বিয়ে করেছিল তারপর সোজা গিয়ে বিয়ে করল অ্যানেকে।

জাহেদি : আপনাদের বিচ্ছেদের পর ?

কারিনা : সবায়ের নামই অ্যানে । বেশ মজার ব্যাপার ।

জাহেদি : আর অ্যানে-মারি মেলভিল, ঠিক বলছি তো ?

কারিনা : হ্যাঁ, সেই মেয়েটার নামও অ্যানে । আর প্রথমজন যাকে ও জানতো তার নাম ছিল অ্যানে কোলেত ।

জাহেদি : তাই নাকি ? আপনাকে দেখার আগে যে মেয়েটির সঙ্গে ওনার সম্পর্ক ছিল তার নামও অ্যানে ?

কারিনা : হ্যাঁ ।

জাহেদি : ওহ, মজার ব্যাপার । আপনাদের এখনও নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা হয় ?

কারিনা : ও কারোর সঙ্গেই কথা বলে না ।

জাহেদি : হয়তো উনি বিরক্ত কিংবা হয়তো উনি…

কারিনা : না, ও চায় না, আমার ধারণা । কে জানে, ঠিক জানি না । আমি কীই বা জানি ? আমি তো আর ওর মাথার ভেতরে থাকি না ।

জাহেদি : শেষ কবে ওনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল ?

কারিনা : অনেক, অনেক কাল আগে । কিন্তু এক সময়ে ও একজনকে বলেছিল, “আনা কারিনার সঙ্গে যোগাযোগ করো, কারণ আমার সম্পর্কে ওই সবচেয়ে ভালো জানে ।”

জাহেদি : সে কথা সত্যি, তাই না ?

কারিনা : মানে, ওর সম্পর্কে কোনো খারাপ কিছু বলার নেই আমার ।

জাহেদি : ওনার মধ্যে কী এমন দেখে আপনি প্রেমে পড়েছিলেন ?

কারিনা : জানো তো, আমি তখন আঠারো বছর বয়সী, বা তার কাছাকাছি ।

জাহেদি : ১৯৫৯ ?

কারিনা : হ্যাঁ, ঠিক বলেছ ।

জাহেদি : “ব্রেথলেস”-এর সময়ে ?”

কারিনা : হ্যাঁ । ও আমাকে একটা ছোটো ভূমিকায় অভিনয় করতে বলেছিল কিন্তু আমি তা করিনি কেননা আমার পোশাক খুলে ফেলতে হতো ।

জাহেদি : উনি আপনার চেয়ে দশ বছরের বড়ো ছিলেন ?

কারিনা : দশ বছর পুরো ।

জাহেদি : উনি ছিলেন ২৮ বছরের আর আপনি ১৮, ঠিক তো ?

কারিনা : হ্যাঁ, সেই সময়ে বয়সের ক্ষেত্রে সেটাকে অনেক বেশি তফাত মনে করা হতো।

জাহেদি : এখনও অনেক তফাত মনে করা হয় ।

কারিনা : ততোটা নয় আজকাল । সবকিছু পালটে গেছে । কিন্তু সেই সময়ে, তুমি যদি একজন নারী হতে, তোমার কোনও কন্ঠস্বর থাকতো না । তুমি যদি নারী হতে, তাহলে ব্যাপারটা স্রেফ : “সুন্দরী হও আর মুখ বুজে থাকো।”

জাহেদি : কিন্তু আপনারা প্রেমে পড়লেন Le Petit Soldat ( ছোটো সৈনিক ) করার সময়ে, তাই তো ? গোদারের কোন ব্যাপার আপনাকে প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছিল ?

কারিনা : ও অত্যন্ত চিত্তহারী ছিল, আর আমি ওর প্রতি আকর্ষিত হই । আমি কখনও টের পাইনি । ব্যাপারটা এমন যে তুমি সামলাতে পারছ না । আমি অনেকটা, কী বলব, তুমি কী বলো ব্যাপারটাকে ?

জাহেদি : চৌম্বকত্ব ?

কারিনা : মানে, আর কোনো কিছু না ভেবেই । ও আমাকে একট ছোটো প্রেমপত্রে লিখেছিল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, মাঝরাতে কাফে দ্য লা পাইতে দেখা করো”– এমন ছিল যে আমি তাছাড়া আর কিছু করতে পারতুম না । আমি তার কারণ ব্যাখ্যা করতে পারব না ।

জাহেদি : আর আপনার সেসময়ে একজন বয়ফ্রেণ্ড ছিল, তাই না ?

কারিনা : হ্যাঁ, ওর খুব খারাপ লেগেছিল ।

জাহেদি : তার মানে গোদার আপনাকে ওই চিঠি লেখার আগেই আপনি ওনার প্রেমে পড়েছিলেন?

করিনা : হ্যাঁ, কারণ আমরা তিন মাস ধরে শুটিঙ করছিলুম । সেটা ছিল দীর্ঘ ফিল্ম কেননা আমরা সাধারণত তিন সপ্তাহে শুটিঙ শেষ করে ফেলতুম ।

জাহেদি : ঠিক, ওনার জন্য সময়টা দীর্ঘ্য ।

কারিনা : ঠিক, বেশ দীর্ঘ্য । আর আমরা শুটিঙ থামিয়ে দিলুম, আর দুজনে দুজনের দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকতুম । ব্যাপারটা ছিল একটু একটু করে পরস্পরের দিকে টান । ব্যাখ্যা করা কঠিন । অনেক সময়ে ব্যাপারটা এরকমই ( দুই হাতে তালি বাজান কারিনা ) বুঝলে ? কিন্তু তা ছিল অত্যন্ত ধীর, একটু একটু করে, প্রেমে পড়া একটু একটু করে, ওর প্রতি আকর্ষিত হওয়া, কাছাকাছি হওয়া । জানি না কেমন করে সেটা বোঝাবো । বোধহয় আমার কাছে উপযুক্ত শব্দ নেই । কিন্তু, হ্যাঁ, আমি সেখানে গেলুম, কাজের পর, মাঝরাতে কাফে দ্য লা পাইতে । ও সেখানে বসে একটা কাগজ পড়ছিল, আর আমি ওর সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলুম। আর আমার মনে হচ্ছিল তা ঘণ্টার পর ঘণ্টা । যদিও তা হয়তো তিন মিনিট বা দুই মিনিট ছিল। আর ও হঠাৎ বলে উঠল, “ওহ এসে গেছো তুমি । চলো যাওয়া যাক।”

জাহেদি : তারপর কোথায় গেলেন আপনারা ?

কারিনা : আমরা ওর হোটেলে গেলুম । পরের দিন সকালে, আমার ঘুম ভাঙেনি, আর ও আমার আগেই বেরিয়ে গেল আর ফিরল একটা সুন্দর ধবধবে ড্রেস নিয়ে । আমি সেটা Le Petit Soldat-এ পরেছিলুম । শুধু আমার জন্য । বিয়ের পোশাকের মতন, বুঝলে ?

জাহেদি : তার মানে আপনারা দুজনে এক সঙ্গে রাত কাটালেন আর সকাল বেলায় যখন আপনার ঘুম ভাঙল আপনার জন্য একটা ড্রেস কিনে এনে উনি হাজির হলেন ?

কারিনা : হ্যাঁ । তুমি যদি ফিল্মটা আবার দ্যাখো, শাদা ফুলের নকশাকাটা ড্রেসটা তোমার মনে পড়বে ।

জাহেদি : আর উনি সকালবেলায় কিনে আনলেন, আপনারা দুজনে একসঙ্গে রাত কাটাবার পর?

কারিনা : মানে, যখন আমার ঘুম ভাঙলো, তখন ও ছিল না ।

জাহেদি : হতে পারে উনি আগেই কিনে রেখেছিলেন ?

কারিনা : না, আমার মনে হয় ও কিনতে গিয়েছিল । রাতের আগে সেটা ঘরে ছিল না ।

জাহেদি : ওই ফিল্মটা অপরূপ, কেননা আপনাকে ওনার ভালোবাসা প্রতিটি শটে দেখতে পাওয়া যায়, যেমনভাবে উনি আপনাকে ফিল্মে উপস্হাপন করেছেন । ওটা যেন কেউ একজন প্রেমে পড়ছে আর দর্শক তা ঘটতে দেখছেন । ওটা একটা গুরুত্বপূর্ণ নথি ।

কারিনা : আমরা প্রেমে পড়ছিলুম । কিন্তু জানো, আমি রাশেসগুলো কখনও দেখিনি । সেই সময়ে আমি জানতুম না তুমি যে বিষয়ে কথা বলছ । কিন্তু ফিল্মে হয়তো, এখন মনে হয়, হ্যাঁ, তাই।

জাহেদি : আমি বলতে চাইছি, দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় ।

কারিনা : নিশ্চয়ই, আমার স্মৃতিতে রয়ে গেছে ।

জাহেদি : ঠিক আছে, La Petit Soldat-এর পর আপনার যুগল হয়ে উঠলেন, তাই তো ? আপনার বয়ফ্রেণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে গেল ?

কারিনা : হ্যাঁ, আর তারপর আমার কোনও বন্ধু হয়নি ।

জাহেদি : কোনও বন্ধু নয় ?

কারিনা : না, কোনও বন্ধু নয় । কেননা আমি জাঁ-লুক গোদারের কাছে গিয়েছিলুম, তাই আমার কোনও বন্ধু জোটেনি ।

জাহেদি : তার মানে আপনি একরকমভাবে একঘরে হয়ে গিয়েছিলেন ?

কারিনা : হ্যাঁ । আমরা যখন ওর গাড়ি করে প্যারিসে ফিরলুম, ও বলল, “তোমাকে কোথায় ছেড়ে দেবো ?” আর আমি বললুম, “তুমি আমাকে ছেড়ে দিতে পারো না, কেননা আমার আর কেউ নেই । আমার শুধু তুমি আছ ।”

জাহেদি : তার কারণ আপনাকে আগের জীবন সম্পূর্ণ ছেড়ে আসতে হয়েছিল ?

কারিনা : হ্যাঁ, ঠিক তাই । আর তারপর ও বলল ঠিক আছে ।

জাহেদি : তখন আপনি ওনার সঙ্গে থাকা আরম্ভ করলেন ?

কারিনা : হ্যাঁ, হ্যাঁ, শঁজে লিজের কাছে রু শাতুব্রিয়াঁয় ইতালিয়া নামে একটা হোটেলে ।

জাহেদি : আর তারপর ?

কারিনা : আমরা সেখানে থাকা আরম্ভ করলুম, আর মাঝে মাঝে এসে ও বলত, “তুমি কি কাটিঙ রুমে যেতে চাও ?” বুঝলে, উনি ফিল্মটার কাটিঙ করছিলেন । আমি বলতুম যে হ্যাঁ । তারপর একদিন ও এসে বললে, “আমাদের জন্য তোমাকে একটা ফ্ল্যাট খুঁজতে হবে।” তাই আমাদের জন্য লা ম্যাদেলিয়েঁর পেছনে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিলুম । আমরা কিছুদিন সেখানে ছিলুম আর তারপর Le Petit Soldat ফ্রান্সে ব্যান হয়ে গেল, তুমি তো জানো, আর মনে হল যেন আমি এতোদিন কিছুই করিনি । কিন্তু তারপর আমি মিশেল দেভিলের কা্ছ থেকে আরেকটা ফিল্মের প্রস্তাব পেলুম । ( ১৯৬৩ সালে ব্যান তুলে নেয়া হয়েছিল ) ।

জাহেদি : ওহ, হ্যাঁ, মিশেল দেভিলে, হ্যাঁ, বেশ বড়ো চিত্রনির্মাতা । কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন করার ছিল, আমাদের হাতে আর বেশি সময় নেই । ( হাতঘড়ি দ্যাখে )। আমাদের আর সময় নেই।

কারিনা : তুমি যতক্ষণ ইচ্ছে সময় নিতে পারো ।

জাহেদি : আমার তিনবার বিয়ে হয়েছে, আর আমি যখন ভাবি কোন কারণে বিয়ে ভেঙে গেল, আমি বলতে পারি আমাদের বিয়ে ভেঙে গেছে এই কারণে বা ওই কারণে । আপনিও তো কয়েকবার বিয়ে করেছেন, তাই না ?

কারিনা : হ্যাঁ । ( গোদারকে ডিভোর্সের পর তিনবার বিয়ে করেছিলেন )

জাহেদি : আপনি যখন গোদারের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাবার কথা ভাবেন, তার প্রধান কারণ কী বলবেন ?

কারিনা : ওহ, আমি যে-কোনো একজনকে চাইছিলুম, বুঝলে, নিছক একজন বন্ধু । আমি ভেবেছিলুম আমার জীবন চিরকালের জন্য বরবাদ হয়ে গেছে, আমার প্রেমের জীবন । তাই আমি একজন বন্ধুর মতন মানুষকে বিয়ে করলুম ।

জাহেদি : আপনি কি এখন গোদারের বিষয়ে বলছেন না অন্য কোনো লোকের সম্বন্ধে ?

কারিনা : না, জাঁ-লুকের পরে । যখন জাঁ-লুককে বিয়ে করি তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলুম, জানো তো?

জাহেদি : তার মানে A Woman is a Woman ফিল্ম করার সময়ে আপনার কুড়ি বছর বয়স ছিল ?

কারিনা : হ্যাঁ ।

জাহেদি : ওই ফিল্মটা খুব সুন্দর । কিন্তু আমার প্রশ্ন হল : আপনারা দুজনে আলাদা হলেন কেন ? সম্পর্কটা বেশ ঝামেলার আর কঠিন ছিল । প্রধান কারণ নিয়ে আপনি কী বলবেন ?

কারিনা : বড়ো, বড়ই দুর্বহ ।

জাহেদি : উনিই দুর্বহ ছিলেন নাকি…

কারিনা : ওর ওজন অনেক ছিল ( হাসেন ) । বড্ডো দুর্বহ ছিল, সমস্ত পরিস্হিতিতে । ও ছিল বড়োই…বড়োই একপেশে চিন্তার মানুষ ।

জাহেদি : ব্যাপার তো কোনো একরকমভাবে হতে হবে ? উনি কি সমস্ত ব্যাপারে অনড় থাকতেন? পজেসিভ ?

কারিনা : না, ও অনেকসময়ে চলে যেত আর ফিরত না ।

জাহেদি : আর তা আপনাকে ক্ষুব্ধ করত ? মানে, আমি বলতে চাইছি, তা আমাকেই ক্ষুব্ধ করে তুলবে ।

কারিনা : হ্যাঁ, বলতে চাই, কোনো টেলিফোন ছিল না । এখনকার মতো ছিল না ।

জাহেদি : ( হাসে ) ঠিক, যেমন, “তুমি এখন কোথায় ?”

কারিনা : ব্যাপারটা সত্যিই সমস্যাজনক ছিল, আর আমি তখন একেবারে একা, বুঝেছ, আর তা সত্যিই মাথা খারাপ করে দেবার মতন ছিল । ও উধাও হয়ে যেত আর বলত, “আমি সিগারেট কিনতে যাচ্ছি”, আর ফিরত তিন সপ্তাহ পর ।

জাহেদি : আর কোথায় যেতেন উনি ?

কারিনা : ও বেশ জটিল । ওহ, ও আমেরিকায় চলে গেল ফকনারের সঙ্গে দেখা করতে ।

জাহেদি : উইলিয়াম ফকনার ?

কারিনা : হ্যাঁ, কিংবা ও চলে যেত সুইডেনে ইঙ্গমার বার্গম্যানের সঙ্গে দেখা করতে । ও চলে যেত ইতালিতে রোবের্তো রোসেলিনির সঙ্গে দেখা করতে । বুঝলে, চলে যেত এখানে সেখানে ।

জাহেদি : তো উনি ফকনারের সঙ্গে দেখা করলেন ?

কারিনা : আর কেমন করে আমি তা জানতে পারতুম জানো ? ও উপহার নিয়ে ফিরত ( হাসলেন ) আর আমি দেখতুম মোড়কটা ইতালীয় নাকি সুইডিশ বা যাহোক ।

জাহেদি : তাহলে আপনারা  একসঙ্গে কতোকাল দুজনে সুখি ছিলেন বলে মনে হয় ?

কারিনা : আমরা যখন শুটিঙ করতুম তখন আমরা বেশ সুখি থাকতুম, সব সময়ে ।

জাহেদি : আর তারপর যখন শুটিঙ বন্ধ হল, তখন আপনার আবার খারাপ লাগতো ?

 

কারিনা : হ্যাঁ, জানো, তারপর ও চলে যেত । ও হয়তো বলত, “আমি তোমাকে দক্ষিণ ফ্রান্সে নিয়ে যেতে চাই।” আমি বলতুম, “দারুণ হবে”। আর আমরা গাড়ি চালিয়ে দক্ষিণ ফ্রান্সে গিয়ে কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচতুম । আর আমরা দুশো কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে যেতুম, আর ও বলতেন, “ওহ আমি  দক্ষিণ ফ্রান্সে যেতে চাই না ।”

জাহেদি : উনি মত বদলে ফেলতেন ?

কারিনা : আমি বলতুম, “কী বলতে চাইছ তুমি ? মানে, তুমি বললে আমরা সেখানে আনন্দ করতে যাবো।” আর আমি ওকে ভালোবাসতুম। আর ও বলত, “আমাকে ফিরে যেতে হবে ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর সঙ্গে কথা বলার জন্য।”

জাহেদি : আপনার সঙ্গে ত্রুফোর বন্ধুত্ব ছিল ?

কারিনা : হ্যাঁ, গভীর ।

জাহেদি : আপনি ওনাকে পছন্দ করতেন ?

কারিনা : হ্যাঁ, অনেক ।

জাহেদি : ওনাকে মনে হয় ভালো লোকদের মধ্যে একজন ।

কারিনা : হ্যাঁ । তারপর বলল, “আর জাক রিভেত । আমাকে ওদের সঙ্গে কথা বলতে হবে কারন ওদের কয়েকটা কথা বলব, আমাকে কাজ করতে হবে ।” তাই আমি বললুম, “ঠিক আছে, তাহলে ফেরা যাক ।” তাই আমরা প্যারিসে ফেরার জন্য রওনা দিলুম । তারপর ও বলল, “তোমাকে বেশ মন খারাপ দেখাচ্ছে…।” আমি বললুম, “না তো, আমি একটু হতাশ হয়েছি, তুমি তো জানো, তুমিই বললে, আমরা দক্ষিণ ফ্রান্সে যাবো । আমি তো তোমার কাছ থেকে কিছুই চাইনি — তুমিই আমাকে বললে দক্ষিণ ফ্রান্সে যেতে।” ও তখন বলল, “আসলে, তুমি যদি তেমন অনুভব করো, তাহলে আমরা এক্ষুনি দক্ষিণ ফ্রান্সে যাবো।” তাই আমরা আবার পেছন ফিরলুম, আর ব্যাপারটা চলতেই থাকল, চব্বিশ ঘণ্টা ধরে, কেননা তখনকার দিনে ফ্রিওয়ে ছিল না, জানো তো, কোনো হাই ওয়ে ছিল না, কোনো ফ্রিওয়ে ছিল না । আর তারপর হঠাৎই, ও বলল, “আমরা প্যারিসে ফিরে যাচ্ছি ।” আর তারপর ও আমাকে বলল, “তোমাকে এখন বেশ ক্রুদ্ধ দেখাচ্ছে।” আমি বললুম, “হ্যাঁ।” আর তাই বললুম, “গাড়িটা থামাও,” আর আমি গাড়ি থেকে নেমে পড়লুম।  রাস্তায় চব্বিশ ঘণ্টা কাটিয়ে আমি ভীষণ চটে গিয়েছিলুম, বুঝলে তো ? আমরা পেছিয়ে আসছিলুম আর ফিরে এগিয়ে যাচ্ছিলুম দক্ষিণ ফ্রান্সের দিকে। আমি চললুম, “আমি দক্ষিণ ফ্রান্সে যাবার প্রস্তাবে হেগে দিই।” আর গাড়িতে আঘাত করতে আরম্ভ করলুম।

জাহেদি : আপনার ব্যাগ দিয়ে ?

কারিনা : না, পা দিয়ে ।

জাহেদি: ওহ, লাথি মেরে ?

কারিনা : হ্যাঁ, লাথি মেরে, গাড়িটাকে । ও বলল, “তুমি হিস্টিরিয়াগ্রস্ত হয়ে পড়েছ।” আর জবাবে আমি বললুম, “হ্যাঁ, তুমি আমাকে মোটর চালিয়ে-চালিয়ে মাথা খারাপ করে দিয়েছ।” আর আমরা সত্যিই লা কোতের দাজুরে গেলুম না । আমরা পরের সকালে ওর বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গেলুম ।

জাহেদি : শুনে মনে হচ্ছে বিয়ে করার পক্ষে উনি একজন জটিল মানুষ ।

কারিনা : হ্যাঁ । ও তাইই…বলা যেতে পারে অন্য কারোর সঙ্গে থাকার মতো মানুষ ও নয়।

জাহেদি : ঠিক ।

কারিনা : ঠিক ।

জাহেদি : তাহলে Le Petit Soldat করার সময়ে সব কিছু ভালো কেটেছিল । আপনারা প্রেম করছিলেন । Une Femme Est Une Femme শুটিঙ করার সময়ে আপনারা দুজনে মানিয়ে চলছিলেন, তারপর একটা ঘটনা ঘটল, রাগারাগি হল । আপনি পোয়াতি হলেন, আর আপনার গর্ভপাত হয়েছিল, ঠিক তো ?

কারিনা : হ্যাঁ। ফিল্মটা করার সময়ে আমি পোয়াতি হয়ে গিয়েছিলুম ।

জাহেদি : Une Femme Est Une Femme করার সময়ে ?

কারিনা : হ্যাঁ ।

জাহেদি : তার কারণ ফিল্মটা ছিল সন্তান পাবার আশা নিয়ে ।

কারিনা : আমার মনে হয় আমার আরজেনটিনা যাওয়া একেবারে উচিত ছিল না…কেননা তার আগে আমি মিশেল দেভিলের ফিল্ম Tonight or Never করেছিলুম । তারপর আমরা গেলুম মার দ্য প্লাতা ফিল্ম ফেসটিভালে । আমার অতো দীর্ঘ্য যাত্রা করা একেবারে ঠিক হয়নি ।

জাহেদি : আর আপনি এই সারাটা সময় পোয়াতি ছিলেন ?

কারিনা : হ্যাঁ । আমি ছিপছিপে ছিলুম বলে বোঝা যেতো না । আর আমার মনে হয় আমার যাওয়া উচিত ছিল না, কেননা যখন ফিরলুম তখন আমি অসুখে পড়লুম ।

জাহেদি : আপনি সন্তান হারালেন ?

কারিনা : হ্যাঁ, বেশ কয়েক মাস পরে । আমি শয্যাশায়ী ছিলুম । তখন ওরা কিছুই টের পায়নি।

জাহেদি : কতো মাসের পোয়াতি ?

কারিনা : প্রায় সাড়ে ছয় মাসের । আমি সত্যিই ভয়ানক অসুস্হ ছিলুম । আমি তখন অসুখে, আর তারপর আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল কারণ আমাকে শল্য চিকিৎসা করাতে হল আর আমি আত্মহত্যা করতে চাইলুম আর সেইসব ব্যাপার । তারপর আমরা করলুম Bande a part.

জাহেদি : ঠিক তার পরেই ?

কারিনা : ঠিক তার পরেই নয় । তার মাঝে আরও ফিল্ম করেছিলুম ।

জাহেদি : গোদারের পরবর্তী ফিল্ম ?

কারিনা : হ্যাঁ, আমি সব সময়েই অসুস্হ থাকতুম ।

জাহেদি : পোয়াতি হওয়া কি পরিকল্পনা করে করা হয়েছিল? আপনি সন্তান চাইছিলেন ?

কারিনা : হ্যাঁ ! নিঃসন্দেহে !

জাহেদি : আপনি সন্তান পাবার চেষ্টা করছিলেন ?

কারিনা : না, আমরা সন্তান পাবার চেষ্টা করিনি, এমনিই এসে গিয়েছিল ।

জাহেদি : আর তারপর, তা ছিল একরকম শেষের শুরু ?

কারিনা : মানে, যেহেতু ও তখনও ছিল, বুঝলে, আর তারপর পরের দিকে ও হাসপাতালে আসত আর আবার চলে যেত । ব্যাপারটা বেশ জটিল ছিল । হ্যাঁ, বুঝলে, তখন আমাদের কথা বলার মতন বিশেষ কিছু ছিল না, মানে মহিলাদের ।

জাহেদি : আপনি তা ফিল্মেও দেখতে পাবেন ।

কারিনা : আমাদের কোনো অধিকার ছিল না । তাই, বুঝলে, বেঁচে থাকার জন্য টাকাকড়ির প্রয়োজন হলে, বেশ কঠিন, বুঝলে, তোমার কাজ ছিল স্রেফ বসে থাকা আর শোনা আর সুন্দরী সেজে থাকা কেননা, সেটা বাদ দিলে, আর কোনো কিছু করার ছিল না ।

জাহেদি : হ্যাঁ, ব্যাপারটা একরকম মারাত্মক ।

কারিনা : “Sois belle et tais-toi.” এইটাই হল সারকথা । “সুন্দরী সেজে থাকো আর মুখ বন্ধ রাখো।”

জাহেদি : ওটা তো ফিল্মের টাইটেল, তাই না ?

কারিনা : হ্যাঁ ! ওই নামে একটা ফিল্ম আছে !

[ ফিল্মমেকার পত্রিকায় প্রকাশিত । ২০১৬ সালের ৯ মে নেয়া সাক্ষাৎকার ]

ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মলয় রায়চৌধুরী

 

About anubadak

আমি একজন অনুবাদক । এতাবৎ রেঁবো, বদল্যার, ককতো, জারা, সঁদরা, দালি, গিন্সবার্গ, লোরকা, ম্যানদেলস্টাম, আখমাতোভা, মায়াকভস্কি, নেরুদা, ফেরলিংঘেট্টি প্রমুখ অনুবাদ করেছি ।
This entry was posted in Jean-Luc Godard and tagged . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s