শার্ল বোদলেয়ার – হ্যাশিসের কবিতা : অনুবাদ মলয় রায়চৌধুরী

শার্ল বোদলেয়ার : নকল স্বর্গ – হ্যাশিসের কবিতা

অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

প্রথম অধ্যায়

অমেয়তার সাধ

নিজেদের কেমন করে নিরীক্ষা করতে হয় তা যাঁরা জানেন, এবং যাঁরা তাঁদের প্রতীতির স্মৃতিকে সংরক্ষণ করেন, যাঁরা, হফম্যানের মতন, আধ্যাত্মিক পরিমাপযন্ত্রকে তৈরি করতে জানেন, অনেক সময়ে মনের রসায়ানাগারে লক্ষ্য করে থাকবেন বিভিন্ন ঋতু, আনন্দের দিন, মনোরম মুহূর্তদের । এমন দিনও হয় যখন একজন লোক  অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে যৌবনে জেগে ওঠে । যদিও তার চোখের পাতা তন্দ্রার আচ্ছন্নতা থেকে তখনও মুক্তি দেয়নি তাকে, বাইরের জগত তার কাছে প্রতিভাত হয় এক শক্তিময় উপশম হিসাবে, বহিরায়বের এক স্বচ্ছতা নিয়ে, আর রঙের এমনই এক বৈভব সৃষ্ট করে যা তারিফযোগ্য । নৈতিক জগত মেলে ধরে তার বিশাল পরিপপ্রেক্ষণ, নতুন নির্মলতায় পরিপূর্ণ ।

 

একজন লোক, এই আনন্দে লব্ধকাম, দুর্ভাগ্যবশত বিরল আর সাময়িক, নিজেকে তখনই একজন বড়ো শিল্পী আর বড়ো মানুষ হিসাবে অনুভব করতে থাকে ; যদি এই সবকিছু একটি অভিব্যক্তি প্রয়োগ করে বলতে হয়, তাহলে তখন সে একজন মহৎ সত্তা । কিন্তু আত্মা ও ইন্দ্রিয়ের এই ব্যতিক্রমী অবস্হার একমাত্র ব্যাপার হল — আমি বাড়িয়ে না বলেও তাকে বলব স্বর্গীয়, যদি তাকে আমি প্রতিদিনের ফালতু যাপনের ভারি ছায়ার সঙ্গে তুলনা করি– তাহলে বলব যে তা কোনো দৃশ্যমান ও সহজে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে এমন কোনো সৃষ্টি নয় । তাহলে তা কি সুস্বাস্হ্য এবং বিবেচক জীবনযাত্রার ফলাফল ? প্রথম ব্যাখ্যায় সেরকমটাই মনে হবে ; কিন্তু আমরা মেনে নিতে বাধ্য যে প্রায়ই এই অলৌকিক বিস্ময় ও নিরাময়কারী দানব, সহজ কথায়, নিজেকে এমনভাবে প্রক্রিয়াকরণ করে যেন তা এক উচ্চতর এবং অদৃশ্য ক্ষমতা, যে ক্ষমতা মানুষের বাইরের, তার দৈহিক ক্রিয়াকর্মকে বেশ কিছুকাল যাবত অপব্যবহারের পর ঘটে । আমরা কি বলব যে এটা একনিষ্ঠ প্রার্থনা এবং আধ্যাত্মিক আকুলতার পুরস্কার ? এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে আকাঙ্খার অবিরাম অধিরোহ, স্বর্গাভিমুখী আধ্যাত্মিক পরাক্রমের বিততি, নৈতিক স্বাস্হ্য গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে সঠিক বিধিনিয়ম, যা অতীব উজ্বল এবং অতীব মহিমান্বিত । কিন্তু কোনো এক কিম্ভুত বিধান একে প্রতিভাত করার কারণ হয়ে ওঠে ( যেমন অনেকসময়ে করে ) কল্পনার লজ্জাকর বেলেল্লাপনার পর ; যুক্তিবোধের কুতর্কমূলক অপব্যবহারের পর, যা কিনা, তার সরাসরি ও বিচক্ষণ প্রয়োগে, অনেকটা তুলনীয় বুদ্ধিমান জিমনাস্টিকসের সঙ্গে রাস্তার দড়াবাজিকরদের  স্বশিক্ষিত বোকা-বানানো অঙ্গ-ভাঙনের মতন ? এই কারণে আত্মার এরকম অস্বাভাবিক অবস্হাকে আমি সত্যকার মাধুর্য বলে মনে করব ; একটি ম্যাজিক আয়না যাতে মানুষকে আহ্বান করা হয় নিজেকে সবচেয়ে সুন্দর দেখার জন্য ; অর্থাৎ, যা তার দেখা দরকার, আর যা প্রকৃতপক্ষে হয়তো সে-ই ; এক ধরণের দেবদূতীয় উত্তেজনা ; সবচেয়ে চাটুকার ধরণের একরকম পুনর্বাসন । একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক গোষ্ঠী, যাদের প্রতিনিধিরা ইংল্যাণ্ড ও আমেরিকায় থাকেন, তাঁরা মনে করেন অতিপ্রাকৃত ঘটনা, যেমন ধরা যাক অশরীরীদের প্রেত, ভুত ইত্যাদি হলো ঐশ্বরিক ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ, সদাসর্বদা মানুষের আত্মায় প্রচ্ছন্ন সত্যের স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলার উদ্বেগ ।

 

এই একক ও চমৎকার স্হিতিতে যাবতীয় ওজস্বীতা ভারসাম্য বজায় রাখে ; যেখানে কল্পনা, যদিও অত্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন, নৈতিক বোধকে বিপজ্জনক ঝুঁকিতে টেনে নিয়ে যায় না ; যখন সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতার ওপরে অসুস্হ স্নায়ুরা, যেগুলো সাধারণ অপরাধকে কিংবা বিষাদকে উসকে দ্যায়, তাকে অত্যাচার করে না ; এই অবিশ্বাস্য স্হিতি, আমি বলব, এর কোনো উন্নত লক্ষণ নেই । তা প্রেতের মতনই ধারণাতীত । বদ্ধসংস্কারের কোনো একটা প্রজাতি, তবে বিক্ষিপ্ত বদ্ধসংস্কারের; তা থেকে আমরা এই নির্ণয়ে পৌঁছোতে পারি যে আমরা সঠিক ছিলুম, অভিজাত অস্তিত্বের নিশ্চয়তা, আর আমাদের প্রতিদিনকার ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে তাকে অধিগত করার আশা আমাদের আছে । চিন্তার এই প্রখরতা, ইন্দ্রিয় এবং আত্মার এই উৎসাহ, প্রতিটি যুগে মানুষের কাছে সর্বোচ্চ আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়ে থাকবে ; আর এই কারণে, অন্য কোনো কিছু না ভেবে, যে তাৎক্ষণিক আনন্দ সে পাচ্ছে, নিজের সংবিধানের আইনকে অমান্য করার উদ্বেগে না ভুগে, সে যাচ্ঞা করেছে, ভৌতিক বিজ্ঞানে, ঔষধি-বিজ্ঞানে, সস্তা পানীয়তে, সূক্ষ্ম সুগন্ধে, প্রতিটি আবহাওয়া ও প্রতিটি কালখণ্ডে, পালিয়ে বাঁচার মাধ্যম, তা কয়েক ঘণ্টার হলেও, তার পাঁকের স্বদেশে, এবং, সমালোচক লাজারে যেমন বলেছেন, “প্রথম আক্রমণেই স্বর্গোদ্যান দখল করা” তা করার উদ্দেশ্যে । হায় ! মানুষের অসৎ চরিত্র, আতঙ্কে ঠাশা এবং তাকেই মান্যতা দিতে হয়, তার প্রমাণ আছে, এমনকি তা তাদের অসীম প্রসারণ হলেও, তার শাশ্বতের জন্য ক্ষুধা ; কেবল, এ এমনই এক স্বাদ যা পথ হারিয়ে ফ্যালে।

 

সেই বহুল প্রচারিত রূপকের উল্লেখ করা যেতে পারে, “সব রাস্তাই রোম-এ যায়,” আর তাকে নৈতিক জগতে প্রয়োগ করা যায় : সব রাস্তাই পুরস্কার কিংবা শাস্তি-তে পৌঁছোয় ; শাশ্বতের দুটি বিন্যাস । মানুষের মন প্যাশনে কানায় কানায় ভরা : তার আছে, আমি যদি আরেকটা পরিচিত বাক্য ব্যবহার করি, জ্বলতে থাকার প্যাশন । কিন্তু এই অসুখি আত্মা, যার স্বাভাবিক দুরাচার তার আকস্মিক প্রবণতার সমান, যথেষ্ট আপাতবিরোধী, পরার্থবাদীতা এবং কঠোর গুণাবলীর জন্য, আপাতবিরোধিতায় ঠাশা, যা তার উপচে-পড়া অতিমাত্রিক প্যাশনকে  অন্য উদ্দেশ্যের দিকে ফিরে তাকাবার সুযোগ দ্যায় । সে কখনও আঁচ করতে পারে না যে সে নিজেকে পুরোপুরি বিক্রি করে দিচ্ছে : সে ভুলে যায়, তার প্রমত্ততায়, যে তার চেয়েও ধূর্ত এবং তার চেয়ে শক্তিশালী খেলোয়াড়ের মুখোমুখি হয়েছে সে ; আর পাপের আত্মাকে এক চুল জায়গা ছাড়লে পুরো মাথাটা তুলে নিয়ে যেতে মোটেই বিলম্ব করবে না । এই দৃশ্যমান মালিকের দৃশ্যমান প্রকৃতি — আমি মানুষের কথা বলছি — তাহলে, রসায়নের মাধ্যমে স্বর্গোদ্যান গড়তে চেয়েছে, গ্যাঁজানো পানীয়ের মাধ্যমে ; সেই ক্ষিপ্ত লোকটার মতন যে নিরেট আসবাব আর আসল বাগানকে ফ্রেমে বাঁধানো ক্যানভাসের ওপর আঁকা পেইনটিঙ দিয়ে প্রতিস্হাপন করতে চায় । শাশ্বত সম্পর্কিত সংবেদনের এই অধঃপতনে আছে, আমার মতে, কলুষিত মাত্রাধিক্যের কারণ ; সাহিত্যিকের নিঃসঙ্গ এবং নিবিষ্ট মাতলামি থেকে, যে শারীরিক যন্ত্রণার উপশমের জন্য আফিমে বেদনানাশকের সন্ধান করে, আর এই ভাবে অস্বাস্হ্যকর আহ্লাদের কুয়ো আবিষ্কার করে, একটু একটু করে তাকে বানিয়ে ফ্যালে তার একমাত্র আহার, আর তা হয়ে ওঠে তার আত্মিক জীবনের সমষ্টি ; শহরতলির সবচেয়ে ন্যক্কারজনক নেশাখোরের পর্যায়ে নেমে, তার মস্তিষ্ক অর্চি এবং গরিমায় প্রদীপ্ত, রাস্তার পাঁকে  হাস্যকর গড়াগড়ি খায় ।

 

আমি যাকে বলি নকল আদর্শ, তা গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে ফলপ্রদ মাদক হলো, পানীয়গুলোর কথা বাদ দিচ্ছি, যা দ্রুত স্হূল উত্তেজনাকে তাতিয়ে তোলে আর যাবতীয় আত্মিক শৌর্যকে, সুগন্ধকে, চাপা দিয়ে দ্যায়, যার অত্যধিক সেবন, সবচেয়ে নিগূঢ় মানুষের কল্পনাকে প্রতিদান দিলেও, তার দৈহিক ক্ষমতাকে ক্রমশ ক্ষইয়ে দ্যায় ; দুটি প্রবলভাবে সক্রিয় মাদক, সবচেয়ে সুবিধাজনক আর সবচেয়ে কুশলী, হলো চরস আর আফিম । এই মাদকগুলো যে রহস্যময় প্রতিক্রিয়া এবং অস্বাস্হ্যকর আনন্দ সৃষ্টি করে, বহুকাল যাবত তার সেবনের ফলাফল থেকে যে অবশ্যম্ভাবী শাস্তি হয়, আর সর্বোপরি  এই নকল আদর্শকে পাওয়ার সন্ধানে যে অমরত্বের জরুরি ব্যবহার হয়, সেই বিষয়ে অধ্যয়ন করাই এই রচনার উদ্দেশ্য ।

 

আফিমের বিষয়ে আগেই আলোচনা করা হয়েছে, আর তা একই সঙ্গে এমন চমকপ্রদ, বৈজ্ঞানিক আর কাব্যিকভাবে যে, আমি নতুন করে আর কিছু যোগ করতে চাই না । আমি অতএব আরেকটি বিষয়ে অধ্যয়ন করে নিজেকে সন্তুষ্ট করতে পারব, সেই সঙ্গে অতুলনীয় এই বইটির বিশ্লেষণ করব যা পুরোপুরি ফরাসি ভাষায় অনুদিত হয়নি । তার লেখক, একজন সুপ্রসিদ্ধ মানুষ, যাঁর কল্পনার ক্ষমতা অসাধারণ এবং সূক্ষ্ম, বর্তমানে অবসর নিয়েছেন এবং মৌন অবলম্বন করেছেন, বিয়োগান্তক অমায়িকতার সাহসে একদা আফিমে তিনি যে আহ্লাদ ও পীড়ন সহ্য করেছেন তা লিখে গেছেন, আর তাঁর বইয়ের সবচেয়ে নাটকীয় অংশ হলো যেখানে তিনি ইচ্ছাশক্তির অতিমানবিক প্রয়াসের কথা বলছেন, যা তাঁর মনে হয়েছিল জরুরি, যাতে তিনি অবিচক্ষণতায় করে ফেলা অধঃপতনের পথ থেকে নিস্তার পান ।

 

আজকে আমি কেবল চরসের কথা বলব, আর আমি সেকথা বলব একাধিক অনুসন্ধান আর পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্যাদির পর ; বুদ্ধিমান মানুষদের টীকা কিংবা গুপ্তকথা থেকে পাওয়া সারাংশ থেকে, যাঁরা বহুকাল এই মাদকে নেশা করতেন ; আমি কেবল এই সমস্ত বিভিন্ন তথ্যাদি একত্রিত করব এক ধরনের প্রকরণে, একটি বিশেষ আত্মাকে বেছে নিয়ে, আর যাঁকে ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞায়িত করা সহজ, এই প্রকৃতির অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার পক্ষে যিনি উপযুক্ত ।

দ্বিতীয় অধ্যায়

চরস কাকে বলে ?

মার্কো পোলোর গল্পগুলো, যা নিয়ে অবিবেচকের মতন হাসাহাসি হয়েছে, যেমনটা হয়েছে অন্যান্য পর্যটকদের ক্ষেত্রে, সেগুলো বৈজ্ঞানিকরা যাচাই করেছেন, আমাদের বিশ্বাস দাবি করে । আমি ওনার গল্পগুলো এখানে আরেকবার বলছি না যে কেমন করে, হ্যাশিসে নেশাগ্রস্ত হয়ে ( যা থেকে “অ্যাসাসিন” শব্দের উৎপত্তি ), পর্বতনিবাসী একজন বৃদ্ধ তাঁর আমোদ-প্রমোদে উচ্ছসিত বাগানে কয়েদ করে রাখতেন যুবক শিষ্যদের, যাদের তিনি নিষ্ক্রিয় ও চিন্তাহীন আনুগত্যের  পুরস্কার হিসাবে স্বর্গোদ্যানের ধারণা দিতে চাইতেন । পাঠক ভন হ্যামার-পার্গস্টলের লেখা ‘দি সিকরেট সোসায়টি অফ হ্যাশিসিনস’ বইটি এবং ‘মেমরিজ দ্য লাকাদেমি দেস ইনসক্রিপশানস এত বেলে-লরত্রস” বইটির ষোড়শ খণ্ডে মসিয়ঁ সিলভেসত্রে দ্য সাসির টীকা পড়ে দেখতে পারেন ; আর “অ্যাসাসিন” শব্দের ব্যুৎপত্তির জন্য ১৮০৯ সালে মনতেউর-এর সম্পাদককে লেখা তাঁর ৩৫৯ নম্বর চিঠিটি পড়ে দেখতে পারেন । হেরোডোটাস বলেছেন যে সিরিয়ার লোকেরা গাঁজার বীজ জড়ো করে তার ওপর জ্বলন্ত লাল পাথর রাখতো ; ফলে তা হয়ে উঠতো এক ধরণের বাষ্পীয় স্নান, প্রাচীন গ্রিসের উনোনের চেয়েও সুগন্ধী ; আর তা থেকে যে আনন্দ সবাই পেতো তা এমনই খোশমেজাজি যে সমবেত সবাই আহ্লাদে কাঁদতে আরম্ভ করতো ।

 

হ্যাশিস, বস্তুত, আমাদের কাছে এসেছে পূর্বদেশ থেকে । প্রাচীন মিশরে গাঁজার উত্তেজক গুণের কথা লোকেরা ভালো ভাবেই জানতো, আর তার ব্যবহার বিভিন্ন নামে ভারত, আলজেরিয়া আর আরাবিয়া ফেলিক্স অঞ্চলে বহুল প্রচারিত ছিল ; কিন্তু আমাদের চারিধারে, আমাদের চোখের সামনে, বিভিন্ন উদ্ভিদ থেকে পাওয়া মাদকের উদাহরণ আছে । বাচ্চারা, যারা কাটা গরুর চারা আলফালফার গাদায় গড়াগড়ি খায়, তাদের মাথা ঘোরার অভিজ্ঞতা হয়, তেমনই গাঁজার ফসল কাটার সময়ে নারী-পুরুষ চাষিদের একই প্রতিক্রিয়া হতো । বলা যেতে পারে যে কাটা গাছগুলো থেকে যে অদৃশ্য বাষ্প ওড়ে তা তাদের মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে তুলতো । যারা ফসল কাটে তাদের মাথা ঘুর্ণিতে ভরে ওঠে, অনেক সময়ে তারা ভাবাবেশে আচ্ছন্ন হয় ; কখনও বা তাদের অঙ্গ সাময়িক দুর্বল হয়ে পড়ে আর কাজ করতে চায় না ।

আমরা রুশদেশের চাষিদের মধ্যে প্রায়শই স্বপ্নচারিতার সঙ্কটের কথা শুনেছি, যার কারণ, ওদের মতে, খাবার রান্নায় গাঁজাবীজের তেলের ব্যবহার । কেই বা মুর্গিদের অস্বাভাবিক আচরণের কথা জানে না যে মুর্গিগুলো গাঁজাবীজ খেয়েছে, আর সেইসব ঘোড়াদের বুনো উৎসাহের কথা, যেগুলোকে চাষিরা, বিয়ে উপলক্ষে আর পৃষ্ঠপোষক সন্তদের ভুরিভোজের উৎসবে, খানাখন্দে-ভরা মাঠে ঘোড়দৌড়ের জন্য যৎসামান্য গাঁজাবীজ খাওয়ায় না, অনেকসময়ে মদের সঙ্গে মিশিয়ে ? যাই হোক, ফরাসি গাঁজা চরস তৈরির জন্য উপযুক্ত নয়, অন্তত, বারংবার নিরীক্ষার পর দেখা গেছে, সেই মাদকের ক্ষমতা চরসের সমান নয় । চরস, বা ভারতীয় গাঁজা ( ক্যানাবিস ইনডিকা ), উরটিকেশিয়া পরিবারের গাছ, দেখতে হুবহু আমাদের অক্ষাংশে যেমন গজায় তেমনই, ব্যতিক্রম হল যে ততো উঁচু হয় না । তাতে নেশা ধরার অসাধারণ উপাদান আছে, যার দরুণ ফরাসিদেশের আর পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের আকর্ষণ করতে পেরেছে । বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে তা কম-বেশি উঁচুদরের বলেই গণ্য করা হয় : আসলে ইউরোপীয়দের কাছে বঙ্গদেশের গাঁজা সবচেয়ে দামি ; যদিও, মিশরের, কন্সটান্টিনোপলের, পারস্যের এবং আলজিরিয়ার গাঁজার উপাদানও এক, তবে এগুলো নিকৃষ্ট স্তরের ।

 

হ্যাশিস বা চরস ( কিংবা পাতাঘাস ; অর্থাৎ, সর্বোচ্চ স্তরের পাতাঘাস, যেন আরব দেশের লোকেরা একটি মাত্র শব্দ দিয়ে একে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছে, পাতাঘাস হলো পার্থিব আনন্দের উৎস ) বিভিন্ন নামে চেনা যায়, যে সমস্ত দেশে তার ফসল সংগ্রহ করা হয়, তার মিশ্রণের উপাদান আর তৈরির কায়দা অনুযায়ী : ভারতে ‘ভাঙ’ ; আফ্রিকায় ‘তেরিয়াকি’ ; আলজেরিয়া এবং আরাবিয়া ফেলিক্সে ‘মাদজৌন্দ’, ইত্যাদি । বছরের কোন ঋতুতে তা সংগ্রহ করা হচ্ছে তা অনেকটা পার্থক্য ঘটায় । সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা থাকে যখন তা ফুলের অবস্হায় । বিভিন্ন প্রস্তুতি-মিশ্রণে ফুলটা কেমন করে প্রয়োগ করা হচ্ছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ, আর সে-বিষয়েই আমরা আলোচনা করব । চরসের পাতার নিষ্কাশন, যেভাবে আরবরা তৈরি করে, তা হলো তাজা গাছের চুড়োকে মাখনে ফোটানো, সামান্য জল মিশিয়ে । বাষ্পীকরণের ফলে শুকিয়ে এলে, তাকে ছেঁকে নেয়া হয়, যে অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায় তাকে দেখতে পমেটমের মতন, সবুজ-হলুদ রঙের, আর যাতে পাওয়া যাবে চরস আর বিস্বাদ মাখনের অনুপভোগ্য গন্ধ । এ থেকে তৈরি করা হয় দুই থেকে চার গ্রাম ওজনের ছোটো-ছোটো গুলি, কিন্তু বিটকেল গন্ধের দরুণ, যা সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে, আরবরা এক একটা গুলি এক একটা মিষ্টান্নর ভেতরে পুরে রাখে । সচরাচর যে মিষ্টান্নে পোরা হয় তার নাম ‘দাওয়ামেস্ক’, তা হলো চরস, চিনি, আর বিভিন্ন সুগ্ধের মিশ্রণ, যেমন ভ্যানিলা, দালচিনি, পেস্তাবাদাম, কাগজিবাদাম, কস্তুরী । অনেক সময়ে একটু ক্যানথারাইড মেশানো হয়, যার সঙ্গে সাধারণ চরসের প্রতিক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই । এই নতুন চেহারায় চরসের আর কোনো বদগন্ধ থাকে না, আর পনেরো, কুড়ি, তিরিশ গ্রাম ওজনের মাদক সেবন করা যায়, পানপাতায় মুড়ে কিংবা কফিতে গুলে ।

 

স্মিথ, গ্যাস্টিনেল এবং দেকুরতিভের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চরসের সক্রিয় উপাদান আবিষ্কারে নিয়োজিত ছিল । তাদের প্রয়াস সত্বেও, চরসের রাসায়নিক মিশ্রণের উপাদান বিশেষ জানা যায়নি, কিন্তু সাধারণত মনে করা হয় যে এর মধ্যে রজন জাতীয় গঁদের উপস্হিতি হলো প্রধান উপাদান যে কেবল দশ শতাংশ থাকে । এই রজন পাবার জন্য শুকনো গাছটাকে পাউডার করে ফেলা হয়, যা বেশ কয়েকবার অ্যালকোহলে ধুয়ে নেয়া হয় ; সামান্য চোলাই আর বাষ্পীয়করণের পর দেখা হয় অবশিষ্টাংশে ঘনত্ব একইরকম কিনা ; এই অবশিষ্টাংশকে জলে ধোয়া হয়, যার ফলে চটচটে জিনিসটা বেরিয়ে যায়, আর বেঁচে থাকে কেবল বিশুদ্ধ রজন ।

 

উৎপাদিত জিনিসটা নরম, ঘন সবুজ রঙের, আর তাতে অনেকাংশে পাওয়া যায় চরসের বিশিষ্ট গন্ধ । পাঁচ, দশ, পনেরো সেন্টিগ্রাম বিস্ময়কর ফলাফল দেবার জন্য যথেষ্ট । কিন্তু হ্যাশচিশাইন, যা চকোলেটের বরফির মতো কিংবা বড়ির আকারে আদার সঙ্গে মেশানো, তা ‘দাওয়ামেস্ক’ আর ‘পাতাঘাস’-এর মতন কম-বেশি কার্যকর, আর তা সম্পূর্ণ আলাদা প্রকৃতির, যে চরস নিচ্ছে তার ব্যক্তিগত পছন্দ আর স্নায়বিক গ্রাহীক্ষমতার ওপর নির্ভর করে; আর, তার থেকেও বেশি, একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ফলাফল হতে পারে। কখনও বা সে অপ্রতিরোধ্য এবং সীমাতিরিক্ত উল্লাসের অভিজ্ঞতা পাবে আবার কখনও স্বপ্নালু তন্দ্রায় আচ্ছন্ন বোধ করবে । এমনকিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা প্রায়ই ঘটে থাকে ; সর্বোপরি, সাধারণ মানসিক ধাত আর শিক্ষিত মানুষের ক্ষেত্রে । বৈভিন্নের ক্ষেত্রে এক ধরণের ঐক্য থাকে যা আমায় চরস-মাতলামির মোনোগ্রাফ সম্পাদনা করার সুযোগ দিচ্ছে, যে ব্যাপারে আমি একটু আগেই বলেছি ।

 

কন্সটানটিনোপলে, আলজেরিয়ায়, এমনকি ফরাসিদেশেও, কিছু লোক তামাকের সঙ্গে চরস মিশিয়ে ধোঁয়া ফোঁকেন, কিন্তু প্রাসঙ্গিক ব্যাপারটা ঘটে মাত্রা বজায় রেখে, আর, সেহেতু, আলস্যে । আমি সম্প্রতি একজনকে বলতে শুনেছি, চোলাই করার মাধ্যমে, চরস থেকে একটা প্রয়োজনীয় তেল বের করা হয়, যার ক্ষমতা এতাবৎ শোনা মিশ্রণগুলোর থেকে অনেক বেশি সক্রিয়, কিন্তু এই বিষয়ে আমি তেমন গভীর অধ্যয়ন করিনি বলে ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত বলতে পারছি না । একথা বলা কি বাহুল্য নয় যে চা, কফি, নানারকম মদ বেশ শক্তিশালী সহায়ক যেগুলো রহস্যময় নেশার সঙ্ঘটনকে কম বা বেশি দ্রুততর করে ?

 

তৃতীয় অধ্যায়

আলোকময় দেবদূতের খেলার বাগান

কেমন হয় একজন লোকের অভিজ্ঞতা ? সে কী দেখতে পায় ? অবিশ্বাস্য জিনিসপত্র, নয় কি? বিস্ময়কর দৃশ্যাবলী ? তা কি খুবই সুন্দর ? আর অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ? আর অত্যন্ত বিপজ্জনক? চরস সম্পর্কে অনবগত লোকেরা চরসসেবিদের কৌতূহলমিশ্রিত ভয়ে এই ধরণের প্রশ্ন করেন। ব্যাপারটা, বস্তুত, জানবার শিশুসুলভ ব্যগ্রতা থেকে করা হয়, সেই সব লোকেদের মতন যারা তাদের আগুন পোয়াবার জায়গা থেকে কখনও নড়েনি তারা বহুদূরের অজানা দেশ থেকে আসা কোনো মানুষের মুখোমুখি হয় । তারা মনে করে তাদের কাছে চরসের নেশা এক অস্বাভাবিক বিস্ময়কর দেশ, হাতসাফাই ম্যাজিকের আর ভেলকি দেখাবার বিশাল নাটমঞ্চ যেখানে সবকিছুই অলৌকিক, সবকিছুই অপ্রত্যাশিত । — তা হলো পূর্বধারণা, সম্পূর্ণ ভ্রান্তিকর । আর যেহেতু সাধারণ পাঠক এবং প্রশ্নকারীর কাছে “চরস” বা হ্যাশিস গড়ে তোলে অদ্ভুত আর ওলোট-পালোট জগতের ধারণা, আশ্চর্যময় স্বপ্নের প্রত্যাশা ( হ্যালুশিনেশান বা অমূলপ্রত্যক্ষ বললে ভালো হবে, যা ব্যাপারটা, লোকে যা ভাবে তেমন পৌনঃপুনিক নয় ), আমি এখনই দুটোর গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য  স্পষ্ট করে দিতে চাই, যে চরসের প্রভাব স্বপ্ন থেকে একেবারে আলাদা । স্বপ্নে আমরা যে অ্যাডভেঞ্চার যাত্রায় প্রতি রাতে যাই, তাতে রয়েছে কিছু ইতিবাচক বিস্ময় । এই অলৌকিক ব্যাপারটা নিয়মিত ঘটার দরুণ এর রহস্য ভোঁতা হয়ে গেছে । মানুষের স্বপ্ন দুই ধরণের হয়। কিছু স্বপ্ন তার প্রতিদিনের ঘটনা, তার কাজকারবার, তার ইচ্ছা, তার দোষ, সব মিলেমিশে গিয়ে মোটামুটি স্মৃতির বিশাল ক্যানভাসে দেখা দেয় । এটা স্বাভাবিক স্বপ্ন ; এক্ষেত্রে লোকটা নিজেই তাতে থাকে । কিন্তু অন্য ধরণের স্বপ্নে, যে স্বপ্ন অদ্ভুত আর অপ্রত্যাশিত, স্বপ্নদ্রষ্টার চরিত্র, জীবন, আবেগের সঙ্গে সম্পর্কহীন আর ব্যাখ্যাহীন : এই স্বপ্ন, যাকে আমি বলব এয়ারোগ্লিফিক, প্রত্যক্ষরূপে জীবনের অতিপ্রাকৃত দিকটির প্রতিনিধিত্ব করে, এবং তা উদ্ভট বলেই প্রাচীন যুগের মানুষেরা একে দৈবী বলে বিশ্বাস করতো । স্বাভাবিক কার্যকারণে ব্যাখ্যাহীন বলে, তাঁরা মনে করতেন ব্যাপারটা একজন মানুষের বাইরে থেকে ঘটে, এবং এমনকি আজকের দিনেও, দার্শনিকদের রোমান্টিক ও মূর্খ গোষ্ঠীকে বাদ দিলেও, তাঁরা এই ধরণের স্বপ্নের মধ্যে অনেক সময়ে আবিষ্কার করেন ভর্ৎসনা, অনেক সময়ে হুঁশিয়ারি ; সংক্ষেপে, এক প্রতীকি এবং নৈতিক ছবি যা ঘুমন্ত লোকটার আত্মায় বাসা বেঁধেছে । এটা এক অভিধান যার অধ্যয়ন প্রয়োজন ; এমনই এক ভাষা যার চাবিকাঠি সন্তরা যোগাড় করতে পারেন ।

 

চরসের নেশায় এরকম কিছুই নেই । আমরা সাধারণ স্বপ্নের বাইরে যাবো না । নেসাটা, যতোক্ষণ থাকে, একথা সত্য, অপরিমেয় স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়, তার জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য এই নেশার রঙবাহুল্যের আতিশয্য আর এর নিষেকের দ্রুতি । কিন্তু তা সব সময়ে ব্যক্তিটির মেজাজের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রাখে । মানুষটা স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিল ; স্বপ্নটা লোকটাকে নিয়ন্ত্রণ করবে । কিন্তু এই সপ্ন হবে সত্যকার বাপের সন্তান । অলস লোকটা নিজের উদ্ভাবন কুশলতাকে চাপ দিয়েছে তার জীবনে আর তার চিন্তাধারায় নকল অতিপ্রাকৃতকে প্রবর্তন করার জন্য ; কিন্তু, তার অভিজ্ঞতার আকস্মিক সক্রিয়তার প্রাবল্য সত্তেও, সে সেই একই মানুষ যে এখন অতিরঞ্জিত, সেই একই সংখ্যা যাকে অত্যন্ত বেশি তেজপূঞ্জে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাকে আনা হয়েছে অধীনতায়, কিন্তু, তার পক্ষে দুঃখের ব্যাপার, সে তা নিজে আনেনি ; অর্থাৎ, তার সেই অংশের দ্বারা যা আগে থেকেই প্রভাবশালী । “সে হতে পারতো দেবদূত ; অথচ সে হয়ে গেলো পশু।” সাময়িকভাবে অত্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন বলা যেতো, যদি নিয়ন্ত্রণহীন ও সহনীয় সংবেদনের বাড়বাড়ন্তকে ক্ষমতার নাম দেয়া হয় ।

 

তাহলে ব্যাপারটা ভালোভাবে বুঝে নিক, মামুলি আর অজ্ঞ লোকেরা, যারা অসাধারণ আনন্দের সঙ্গে পরিচয়ের জন্য কৌতূহলী, যে তারা হ্যাশিস বা চরসে কোনোরকম অলৌকিক ব্যাপার পাবে না,  কেবল প্রকৃতিকে তার মাত্রাধিক্য ছাড়া কিচ্ছু পাবে না । মস্তিষ্ক এবং যে জৈবদেহে চরস কাজ করে তা কেবল সাধারণ আর ব্যক্তিগত ইন্দ্রিয়-পরিমণ্ডলকে বিবর্ধিত করে তুলবে, একথা সত্যি, পরিমাণ ও গুণমান উভয় ক্ষেত্রে, কিন্তু সদাসর্বদা তাদের উৎসের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে । মানুষ তার নৈতিক ও শারীরিক মেজাজের সর্বনাশ থেকে পালাতে পারে না । চরস হবে, বস্তুত, মানুষের পরিচিত ভাবনাচিন্তা ও প্রতীতির আয়না, যে আয়না বাড়িয়ে প্রতিফলন ঘটায়, অথচ আয়না ছাড়া আর কিছুই নয় ।

 

মনে করুন আপনার চোখের সামনে মাদকটা রয়েছে : একটা সবুজ রঙের মিষ্টি, প্রায় বাদামের সমান মাপের, তাতে এক অদ্ভুত গন্ধ ; এমনই অদ্ভুত যে মনোভাব বা রুচিকে বিকর্ষিত করে, বমিও পেতে পারে — যেমন, ধরুন, কোনো সূক্ষ্ম এবং অমায়িক সুরভির ক্ষেত্রে, তাকে যদি তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং ঘনত্বে উন্নত করা হয়, তা যা ঘটাবে, তেমনই।

প্রসঙ্গক্রমে বলার অনুমতি দিন যে প্রস্তাবটা বিপরীতও হতে পারে, এবং সবচেয়ে বিতৃষ্ণাজনক ও বিকর্ষক সুরভিও শুঁকে অপার আনন্দ পাওয়া যাবে যদি তার পরিমাণ ও ঘনত্ব কমিয়ে আনা হয় ।

 

সে-ই ! তাতে রয়েছে আনন্দ ; একটা চামচে স্বর্গ ; যাবতীয় নেশাসহ আনন্দ, তার দোষ, তার বালখিল্য । তুমি বিনা ভয়ে এটা গিলে ফেলতে পারো ; এটা মেরে ফেলবে না ; তোমার দেহের অঙ্গকে জখম করবে না । হয়তো ( পরে ) মায়াবিদ্যার ঘনঘন প্রয়োগ তোমার ইচ্ছাশক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে ; হয়তো মানুষ হিসাবে আজকে তুমি যে লোকটি তার থেকে কম-মানুষ হয়ে যাবে ; কিন্তু প্রতিশোধ তো বহু দূরের ব্যাপার, আর পরিণামস্বরূপ বিপর্যয়কে সংজ্ঞায়িত করা বেশ কঠিন ! তুমি কিসের ঝুঁকি নিচ্ছ ? আগামীকাল যৎসামান্য ক্লান্তি — তার বেশি কিছু নয় । তুমি কি প্রতিদিন কম পুরস্কারের বিনিময়ে এর চেয়ে বড়ো শাস্তির ঝুঁকি নাও না ? তাহলে খুবই ভালো ; তুমি যদি চাও যে এটা দ্রুত আর প্রগাঢ় প্রভাব ফেলুক, তাহলে এক কাপ কালো কফিতে তোমার চরসের খোরাক গুলে নাও । তুমি আগে থেকে তোমার পেট খালি রাখার সাবধানতা নিয়েছো, রাতের খাবার নয়টা বা দশটা পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছ, যাতে বিষটা সক্রিয় হবার জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পায় । বড়ো জোর ঘণ্টাখানেক পরে একটু সুপ খেতে পারো । একটা অদ্ভুত দীর্ঘ যাত্রায় বেরোবার জন্য তুমি যথেষ্ট ব্যবস্হা করে রেখেছ ; স্টিমার ভোঁ বাজিয়ে দিয়েছে, পাল তুলে দেয়া হয়েছে ; আর সাধারণ যাত্রীদের চেয়ে তোমার সুবিধা এই যে তুমি জানো না কোথায় চলেছ । তুমি তোমার যাত্রাপথ বেছে নিয়েছ ; ভাগ্য প্রসন্ন হোক !

 

আমি আশা করি তুমি সতর্ক হয়ে অ্যাডভেঞ্চারে বেরোবার সময়টা সাবধানে  বেছে নিয়েছ, কেননা সর্বগুণান্বিত লম্পটের জন্য প্রয়োজন পূর্ণ অবসর । তাছাড়া তুমি জানো, চরস অতিরঞ্জিত করে, কেবল লোকটির অনুভূতি ও সংবেদন নয়, কিন্তু তার পরিবেশ এবং পরিস্হিতিও । তোমার এমন কোনো কর্তব্য নেই যে সমায়ানুবর্তীতা কিংবা তৎপরতা দরকার ; কোনো গার্হস্হ দুশ্চিন্তা নেই ; প্রেমিকের দুঃখ নেই । এসব ব্যাপারে সাবধান হতে হবে । অমন কোনো নিরাশা, কোনো উদ্বেগ, ভেতরে-ভেতরে চিন্তা যা তোমার ইচ্ছা ও আগ্রহ দাবি করে, কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে, শোকের ঘণ্টার মতন তোমার নেশা জুড়ে বাজতে থাকবে আর আনন্দকে বিষাক্ত করে দেবে । উদ্বেগ হয়ে উঠবে যন্ত্রণা, আর নিরাশা হয়ে উঠবে অত্যাচার । কিন্তু, যদি এই সমস্ত প্রাথমিক অবস্হা পরখ করার পর, আবহাওয়া যদি ভালো থাকে, তুমি যদি মনের মতন পরিবেশে থাকো, যেমন ধরো ছবির মতো ভূদৃশ্যে কোথাও কিংবা সুন্দরভাবে সাজানো একটা ঘরে, আর বিশেষ করে তোমার আয়ত্তে যদি সঙ্গীতের আবহ থাকে, তাহলে তার চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না ।

 

মোটামুটি, চরসের নেশার তিনটি স্তর আছে, যাদের পার্থক্য করা সহজ, আর যারা শুরু করছে তাদের পক্ষে বেমানান নয় যে প্রথম স্তরে তারা কেবল প্রাথমিক লক্ষণগুলোর সন্মুখীন হবে । তুমি শুনে থাকবে চরসের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে লোকেদের ফালতু কথাবার্তা ; তোমার কল্পনাতে বিশেষ কোনো ধারণে এই ব্যাপারে ঘর করে থাকবে, এক আদর্শ নেশার ধারণা । তুমি আশা করো যে বাস্তব সত্যিই তোমার আকাঙ্খার স্তরে পৌঁছোবে ; সেটাই একা শুরুতেই তোমাকে উদ্বেগের স্হিতিতে পৌঁছে দেবে, যা বিষটার ঘিরে ধরার চারিত্র্য আর বিজয় করে ফেলার জন্য যথেষ্ট অনুকূল । বেশির ভাগ আনাড়িরা, তাদের প্রথম দীক্ষায়, প্রভাবের মন্হরতার অভিযোগ করে : তারা বালসুলভ অধীরতায় অপেক্ষা করে, আর তাদের পছন্দমতন মাদকের দ্রুত প্রভাব না ঘটলে, তারা অবিশ্বাসের অনর্থক বুকনি হাঁকে, যা অভিজ্ঞদের কাছে, যারা চরসের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপার ভালো করে জানে, বেশ মজার । প্রথম ঝাপটা, বহুক্ষণ আটক ঝড়ের মতন যার লক্ষণ, দেখা দেয়া আরম্ভ করে আর ওই অবিশ্বাসীর বুকে জমে-জমে প্রাচুর্যে ঘনিয়ে ওঠে । তখন তা এক ধরণের আহ্লাদের, অপপতিরোধ্য অসম্ভাব্যতার, যা তোমাকে কব্জা করে ফ্যালে । উল্লাসের এই উপলব্ধিগুলো, কোনো কারণ ছাড়াই, যা নিয়ে তুমি লজ্জাবোধ করতে পারো, পর্যায়ক্রমে ঘটতে থাকে আর তন্দ্রায় মাঝে-মাঝে বিরাম ঘটাতে থাকে, যে সময়টায় তুমি নিজেকে সামলে নিতে চাও। সহজ কথায়, একেবারে মামুলি ধারণাগুলো, নতুন আর অদ্ভুত বাহ্যিক গঠন পায় । যখন এগুলো ঘটতে থাকে তুমি নিজের সম্পর্কে অবাক হও যে ব্যাপারটা আসলে কতো সহজ। বেখাপ্পা প্রতিচ্ছায়া আর সঙ্গতিসমূহ, আগে থাকতে আঁচ করা অসম্ভব, অন্তহীন শ্লেষ, কৌতূকপ্রদ নকশা, তোমার মস্তিষ্ক থেকে অবিরাম ঝর্ণার মতন বেরোতে থাকে । দানবটা তোমাকে আষ্টেপৃষ্টে ধরে রেখেছে ; আহ্লাদের খোঁচা, যা কাতুকুতুর মতন, তার বিরুদ্ধতা করা তখন বোকামি ! মাঝে-মাঝে তুমি নিজেই তোমার বোকামি আর তোমার পাগলামি নিয়ে হাসতে থাকো, আর তোমার বন্ধুবান্ধব, যদি তুমি আরও অনেকের সঙ্গে থাকো, তারাও হাসে, তোমার আর তাদের নিজেদের অবস্হা নিয়ে তোমরা হাসাহাসি করো ; কিন্তু তারা যেমন কোনো অসূয়া ছাড়াই হাসে, তুমিও তাদের প্রতি বিরক্ত না হয়েই হাসো ।

 

এই আহ্লাদ, একবার আলস্যে আর একবার তীব্রতায়, খোশমেজাজের এই অস্বস্তি, অসুরক্ষার বোধ, এই নির্ণয়হীনতা, শেষ পর্যন্ত, নিয়মমতো, বেশ কম সময়ের জন্য ঘটে । তোমার ধারণাগুলোর মর্মার্থ তাড়াতাড়ি অস্পষ্ট হয়ে যায়, যে আবহের সুতো দিয়ে তোমার ধৃতি একসঙ্গে বাঁধা তা এমন ভঙ্গুর হয়ে যায় যে তোমার দুষ্কর্মের সহযোগীরা  কেউ তোমাকে বুঝতে পারবে না । আর তাছাড়া, এই বিষয়ে এবং এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে, তাকে যাচাই করার কোনো উপায় নেই ! হয়তো তারা ভাবে যে তারা তোমাকে বুঝতে পারছে, আর ভ্রমটা পারস্পরিক । এই চাপল্য, হাসিতে ফেটে পড়া, বিস্ফোরণের মতন, যে লোকেরা তোমার স্হিতিতে নেই তাদের মনে হবে যেন এক সত্যকার খেদোন্মত্ততা, কিংবা অন্তত একজন ক্ষিপ্ত মানুষের বিভ্রম ঘটছে । আরও একটা ব্যাপার, যে লোকটা দেখছে অথচ সতর্কতা অবলম্বন করে নেশা করেনি, তার বিচক্ষণতা এবং সুবুদ্ধির দরুণ, তোমাকে আনন্দ দেয় আর তোমাকে নিয়ে মজা করে যেন তুমি স্মৃতিভ্রংশে ভুগছ । ভূমিকা পালটে যায় ; তার আত্মস্হতা তোমাকে বিদ্রূপের শেষ সীমা পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে যায় । কতোটা রাক্ষুসে মজার এই অবস্হাটা, এমন একজন লোকের ক্ষেত্রে যে আহ্লাদ উপভোগ করছে আর অন্য লোকটা  যে সেই অবস্হায় নেই সে মজা করছে ! পাগলেরা সন্তদের কৃপা করে, আর তখন থেকেই নিজেকে উন্নত মনে করার ধারণা পাগলের মগজে বাসা বাঁধে । দ্রুত তা বিরাট হয়ে উঠবে আর উল্কার মতন ফেটে ঝরে পড়বে ।

 

আমি একবার এই রকম এক দৃশ্যের সাক্ষী ছিলুম আর যা অনেকক্ষণ যাবত টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, আর যার সৃষ্টিছাড়া চাপ কেবল তারাই টের পাচ্ছিল যারা পরিচিত ছিল, অন্তত অন্য লোকেদের দেখে, মাদকের প্রতিক্রিয়া আর পূর্ণ-স্বরগ্রামের ওপর প্রভাব কতো বিশাল পার্থক্য ঘটায় দুই বুদ্ধমত্তার মাঝে যারা আপাতদৃষ্টিতে সমান । একজন বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ, যিনি চরসের প্রভাব সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন, যিনি সম্ভবত বিষয়টা সম্পর্কে শোনেননি কখনও, নিজেকে কয়েকজনের মধ্যে বেমানান মনে করেন, যখন দ্যাখেন আশেপাশে সবাই মাদকটা নিয়েছে । তারা ওনাকে মাদকটার চমৎকার প্রভাবের কথা বোঝাবার চেষ্টা করে ; এই সমস্ত গালগল্প শুনে তিনি সৌজন্যবশত চওড়া একখানা হাসি হাসেন, একজন মানুষের কিছুক্ষণের জন্য বোকার ভান করার শিষ্টতা । এই আত্মাগুলো তাঁর অবজ্ঞায় দ্রুত উত্তেজিত হয়ে ওঠে, ধারালো বিষের দরুণ, আর এদের হাসাহাসি তাঁকে আহত করে ; আহ্লাদের এই সমস্ত বিস্ফোরণ, শব্দ নিয়ে খেলাখেলি, বদলে যাওয়া মুখভঙ্গী — এই  ক্ষতিকর আবহ তাঁকে বিরক্ত করে, আর তাঁকে ঘোষণা করতে বাধ্য করে, হয়তো, যে তাঁর মতে এই আচরণ অত্যন্ত ক্ষুদ্রের, আর যারা এই মাদক নিয়েছে তাদের পক্ষে নিশ্চয়ই ক্লান্তিকর । তাঁর মন্তব্যের মিলনানন্তকতা সকলকে এক ঝটকায় হালকা করে দিলো ; তারা তখন আহ্লাদে টইটুম্বুর। “এই ভূমিকা তোমাদের পক্ষে ভালো হতে পারে.” উনি বললেন, “কিন্তু আমার জন্যে, নয়।” অন্যেরা অহংকারে চেঁচিয়ে বলল, “আমাদের জন্য এটা ভালো ; আর আমরা কেবল তাইই পরোয়া করি।” প্রকৃত পাগলদের মাঝে রয়েছেন নাকি পাগলের ভান করছে এমন লোকজনেরা তাঁকে ঘিরে রয়েছে তা বুঝতে না পেরে উনি নির্ণয় নিলেন যে সেখান থেকে চলে যাওয়াই ভালো ; কিন্তু কেউ একজন দরোজা বন্ধ করে চাবিটা লুকিয়ে রাখে । আরেকজন, তাঁর সামনে হাঁটুগেড়ে বসে, ক্ষমা চায়, সহযোগী হবার দরুণ, আর অহংকার মিশিয়ে বলে, চোখে জল নিয়ে, যে সে মানসিকভাবে নিকৃষ্ট হলেও, যা বলার ফলে কিছুটা সমবেদনা জাগায় ওনার মনে, আর উপস্হিত সবায়ের ওনার সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব হয়ে যায় । উনি সেখানে থেকে যাওয়া মনস্হ করেন, এমনকি ধরাধরি করার কারণে, প্রসন্ন হয়ে বাজনা বাজাতে রাজি হন ।

 

কিন্তু বেহালার আওয়াজ, নতুন রোগের মতন সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে, ছুরি মারে — শব্দটা বড়ো বেশি কঠিন নয় — প্রথমে একজন মাতালকে, পরে আরেকজনকে । আরম্ভ হয়ে যায় একটানা ফ্যাসফেসে দীর্ঘশ্বাস, আচমকা ফোঁপানি, নিঃশব্দ কান্নার অশ্রূজল । ভয়ে সঙ্গীতকার বেহালা বাজানো বন্ধ করেন, এবং, যার আহ্লাদ সবচেয়ে বেশি হইচই-মাখানো ছিল তার কাছে গিয়ে জিগ্যেস করেন যে অতোই যদি কষ্ট হচ্ছে, তাকে যন্ত্রণামুক্ত করতে হলে কী করতে হবে ? উপস্হিত একজন, সাধারণ জ্ঞান আছে এমন একজন, পরামর্শ দ্যায় লেমোনেড আর টক খাওয়াবার ; কিন্তু “অসুস্হ লোকটা”, তার চোখ আহ্লাদে তখন ঝলমল কর‌্ছে, তাদের দুজনের দিকেই ভাষাতীত অবমাননার দৃষ্টিতে তাকায় । একজন “অসুস্হ” মানুষকে তার জীবনপ্রাচুর্যের জন্য সারিয়ে তোলার প্রয়াস, আনন্দধারায় যে “অসুস্হ” !

 

এই অনুকাহিনি থেকে বোঝা যাচ্ছে, চরসের নেশায় উত্তেজিত লোকেদের অনুভূতিতে মানুষের মঙ্গলকামনার একটা বড়ো জায়গা থাকে । একটা কোমল, অলস, মুক হিতৈষিতা যা জেগে ওঠে স্নায়ুগুলোর শিথিলকরণ থেকে । এই মতামতের সমর্ধনে একজন আমাকে একটা অ্যাডভেঞ্চারের কথা বলেছিল, যা তার ঘটেছিল যখন সে চরসের নেশায় চুর, আর নিজের অনুভূতির হুবহু স্মৃতি ধরে রেখেছিল বলে আমি ভালো করে বুঝতে পেরেছিলুম যে তাকে কেমন বিদকুটে আর নাছোড় বিব্রত অবস্হায় পড়তে হয়েছিল,সমবেদনার পাল্লায় পড়ে । আমার মনে নেই প্রাসঙ্গিক লোকটির নেশা প্রথমবার নাকি দ্বিতীয়বারের নিরীক্ষা ছিল; লোকটা যদি আরেকটু কড়া মাত্রায় নিতো, কিংবা চরসটা যদি প্রতিক্রিয়া করে থাকে, কোনো কারণ ছাড়াই, সাধারণের চেয়েও যার প্রভাব অনেক বেশি– তাহলে তা কি বিরল ঘটনা নয়?

 

লোকটা আমাকে বলেছিল যে তার আহ্লাদের পুরো সময়টা জুড়ে, নিজেকে প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ অনুভব করা আর নিজেকে প্রতিভাসম্পন্ন বিশ্বাস করার পরম আনন্দময়তায়, হঠাৎ কামড় বসিয়েছিল প্রচণ্ড ভীতির আতঙ্ক । প্রথমে নিজের সংবেদনের সৌন্দর্যে ঔজ্বল্যে ভেসে, ওর আচমকা ভীতির গহ্বরে পড়ে গিয়েছিল । লোকটা নিজেকে প্রশ্ন করেছিল : “এই স্হিতিতে আমার বুদ্ধিমত্তা আর দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কেমন দশা হবে” ( যে স্হিতিকে ও মনে করেছিল অতিপ্রাকৃত )” যদি এই স্হতি চলতেই থাকে আর অসুস্হ অবস্হায়  আত্মার চোখ উন্মোচিত হয়, এই ভয় এমনই যে তার যন্ত্রণা কথা বলে বোঝানো যাবে না । “আমি যেন এক পলাতক ঘোড়া হয়ে উঠেছিলুম”, বলল লোকটা, “টগবগিয়ে রসাতলের দিকে ছুটছি, থামতে চাইছি কিন্তু পারছি না । সত্যিই আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা, আর আমার ভাবনাচিন্তা, ঘটনাক্রমের, দুর্ঘটনার, প্রতিবেশের গোলাম, আর এই সবকিছুই একটা কথায় বলা যায়, তা হলো ঝুঁকি, যা বিশুদ্ধ, পরম গীতোচ্ছাসের আদল নিয়েছিল । আমি কাতর হয়ে নিজেকে বারবার বলতে থাকলুম, ‘অনেক দেরি হয়ে গেছে, অনেক দেরি হয়ে গেছে !’ যখন এই মেজাজ, যা আমার মনে হচ্ছিল অনন্তকালীন, আর আমি সাহস করে বলছি যে তা কেবল কয়েক মিনিটের ছিল, পালটে গেলো, যখন আমি ভাবলুম যে প্রাচ্যের মানুষদের প্রিয় আনন্দের সাগরে আমি ডুব দিতে পারি, যা এই ভয়ঙ্কর অবস্হায় সফল হয়, নতুন একটা দুর্ভাগ্য আমাকে জড়িয়ে ধরল; এক নতুন উদ্বেগ, যদিও মামুলি, আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল । আমার হঠাৎ মনে পড়ল রাতে আমাকে একটা ভোজে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে, অভিজাত লোকেদের সান্ধ্য জমায়েতে। আমি আগাম দেখতে পেলুম যে আমি ভদ্র সুশীল সম্ভ্রান্ত লোকেদের মধ্যে রয়েছি, যেখানে প্রত্যেকে নিজের প্রতিভূ, যেখানে আমার মনের অবস্হা ঝলমলে আলোর মাঝে সাবধানে গোপন করতে হবে । আমি নিশ্চিত ছিলুম যে সফল হবো, কিন্তু ইচ্চাশক্তির প্রয়াসের কথা মনে আনতেই আমার হৃদয় প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিল । কিন্তু ভাগ্যক্রমে, কারণ ঠিক মনে নেই, গসপেলের উপদেশ, “যে দুর্ভোগে ভোগে তার কাছে অপরাধ আসে!” আমার স্মৃতিতে লাফিয়ে এলো, আর তা ভুলে যাবার চেষ্টায়, তাকে ভুলে যাবার জন্য চিন্তাকে কেন্দ্রিত করতে গিয়ে, আমি কথাটা বারবার নিজেকে শোনাতে লাগলুম । আমার বিপর্যয়, ব্যাপারটা সত্যিই বিপর্যয় ছিল, বিশাল আকার নিয়ে ফেললো : আমার দুর্বলতা সত্তেও, আমি সক্রিয় হবার নির্ণয় নিলুম, আর একজন ডাক্তারের পরামর্শের জন্য গেলুম,  আমি প্রতিষেধক ওষুধগুলো জানতুম না, আর বেপরোয়া স্বাধীন মেজাজে জমায়েতে পৌঁছোতে চাইছিলুম, যেখানে আমাকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে ; কিন্তু দোকানটার চৌকাঠে অকস্মাৎ একটা চিন্তা আমাকে কাবু করে ফেললো, ভুতে পাওয়ার মতন, ভেবে দেখতে বাধ্য করলো । আর যেতে-যেতে একটা দোকানের জানলায় নিজেকে দেখতে পেয়েছিলুম, আর আমার মুখটা আমাকে চমকে দিলো । ফ্যাকাশেপনা, চাপা দুটো ঠোঁট, এই ফ্যালফেলে চোখ ! — আমি সজ্জন লোকটাকে ভয় পাইয়ে দেবো, নিজেকে বললুম, আর সামান্য হেলাফেলার খাতিরে ! আর তার সঙ্গো যোগ করো তামাশা যা আমি এড়াতে চাইছিলুম, ওষুধের দোকানে লোকজন থাকারও আশঙ্কা ছিল । কিন্তু অচেনা ডাক্তারটার প্রতি আমার আচমকা সমবেদনা আমার অন্য অনুভূতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে নিলো । আমি কল্পনা করলুম যে এই লোকটা আমার এই মারাত্মক মুহূর্তে আমার মতনই সংবেদনশীল, আর যেমন-যেমন কল্পনা করলুম, এও ভাবলুম যে লোকটার কান আর আত্মা, আমার মতনই, সামান্য আওয়াজে কেঁপে ওঠে, আমি পা টিপে টিপে এগোবার কথা ভাবলুম।

‘ব্যাপারটা অসম্ভব’, নিজেকে বললুম, ‘আমি যে লোকটার সহানুভূতিতে গলা ঢোকাতে যাচ্ছি, তার সঙ্গে আচরণে বড়ো বেশি সতর্কতা নিয়ে ফেলবো।’ তারপর নির্ণয় নিলুম যে নিজের কন্ঠস্বরকে একেবারে স্তব্ধ করে ফেলবো, আমার পায়ের আওয়াজের মতন । তুমি তো জানোই, চরস-নেয়া গলার আওয়াজ : গম্ভীর, ঘড়ঘড়ে, রাশভারি ; আফিমখোর নেশাড়ুদের মতন নয় । যা চেয়েছিলুম ফলাফল হলো তার একেবারে উল্টো ; ডাক্তারকে বিশ্বাস করাবার প্রয়াসে, আমি তাঁকে ভড়কে দিলুম । উনি এই অসুস্হতার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না ; এমনকি এই অসুখের কথা শোনেনওনি কখনও ; তবু উনি আমার দিকে তাকিয়ে দেখলেন কৌতূহল আর অবিশ্বাস মিশ্রিত চাউনি মেলে । উনি কি আমাকে পাগল, অপরাধী বা ভিখারি বলে মনে করলেন ? নিঃসন্দেহে, কোনোটাই নয়, কিন্তু এইসমস্ত বিদঘুটে চিন্তা আমার মগজে লাঙল চালাচ্ছিল । আমি ওনাকে বিস্তারিতভাবে খোলোশা করতে বাধ্য ছিলুম ( কী ক্লান্তিকর ! ) চরসের মেঠাই ঠিক কী বস্তু আর কি জন্য নেয়া হয়, বারবার বোঝাচ্ছিলুম যে তাতে কোনো বিপদ হয় না, আর যাঁহাতক ওনার ব্যাপার, আঁৎকে ওঠার প্রয়োজন নেই, আর আমি যা চাইছিলুম তা স্রেফ প্রভাবটাকে কমাবার বা প্রতিরোধ করার উপায়, মাঝে মাঝে যোগ করছিলুম যে ওনাকে বিরক্ত করার জন্য আমি আন্তরিক দুঃখিত । আমার বলা শেষ হয়ে গেলে ( এই কথাগুলোয় নিজেকে কতোটা ছোটো করলুম সেদিকে খেয়াল দিতে বলব তোমাকে ) উনি বেমালুম চলে যেতে বললেন । আমার ভাবনাচিন্তাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্হাপনের আর শুভচিন্তার এই ছিল পুরস্কার । আমি সন্ধ্যার নিমন্ত্রণে গেলুম ; আমি কাউকেই অপদস্হ করলুম না । কেউই আঁচ করতে পারলো না অন্য লোকেদের মতন হবার জন্য আমাকে কতো কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে ; কিন্তু আমি কখনও ভুলবো না অতিকাব্যিক নেশার অত্যাচার যা শালীনতা দিয়ে সীমাবদ্ধ আর কর্তব্যের চিন্তায় স্বভাববহির্ভূত ।” যদিও কল্পনাপ্রসূত প্রতিটি যন্ত্রণার প্রতি আমি সমবেদনা জানিয়ে ফেলি, এই ঘটনা শুনে আমি নিজের হাসি থামাতে পারিনি । যে লোকটা আমাকে গল্পটা বলেছিল সে সেরে ওঠেনি । লোকটা অভিশপ্ত মেঠাইতে উত্তেজনা পাবার ঝোঁক বজায় রেখেছিল যা কিনা সে জ্ঞান থেকেই পেতে পারতো ; কিন্তু যেহেতু লোকটা বিচক্ষণ আর সংসারি, পার্থিব মানুষ, ও মাত্রা কমিয়ে এনেছে, যার দরুণ বেড়ে গেছে পুনরাবৃত্তি । লোকটা পরে টের পাবে “বিচক্ষণতার” পচা ফলের স্বাদ কেমন হয় !

 

এবার ফিরে যাই নেশার স্বাভাবিক অগ্রগতির বিষয়ে । প্রথম পর্বের বালকসূলভ আহ্লাদের পরে, বস্তুত, সাময়িক শিথিলতা আসে ; কিন্তু নতুন ঘটনাবলী এসে হাজির হয় সংবেদনের অতিমাত্রিক শীতলতায় — যা এমনকি হয়ে উঠতে পারে, কোনো কোনো লোকের ক্ষেত্রে, তিক্ত-শীতল — আর অঙ্গে-প্রত্যঙ্গে প্রচণ্ড দুর্বলতা । তখন তোমার হবে “মাখনের আঙুল”; আর তোমার মগজে, তোমার সমগ্র অস্তিত্বে, তুমি বোধ করবে এক হতবুদ্ধিকর তন্দ্রা আর স্তম্ভন । তোমার মাথা থেকে এগোতে থাকে তোমার চোখ ; যেন সেগুলোকে প্রতিটি দিকে টান মারছে অনবদ্য পরিতোষ । তোমার মুখাবয়ব ঢেকে যাবে ফ্যাকাশেপনায় ; ঠোঁট ঢুকে যাবে ভেতরে, শ্বাসহীনতার টানে, সেই ধরণের উচ্চাকাঙ্খী মানুষদের মতন যারা নিজেদের বড়ো-বড়ো প্রকল্পনার শিকার হয়, পেল্লাই ভাবনাচিন্তার পাহাড়ের তলায় চাপা, কিংবা দীর্ঘ শ্বাস নেয় যেন ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে । বলা যায়, গলা বন্ধ হয়ে আসে ; তৃষ্ণায় টাকরা শুকিয়ে যায়, যাকে তৃপ্ত করা হয়ে উঠবে অত্যন্ত মিষ্টি, যদি তখনও  আলস্যের আনন্দ মজাদার বলে মনে না হয়, আর দেহে কোনোরকম তোলপাড় না ঘটায় । গভীর অথচ কর্কশ দীর্ঘশ্বাস বেরোয় তোমার বুক থেকে, যেন পুরোনো বোতলের মতন তোমার দেহ, নতুন মদের, তোমার আত্মার, সক্রিয় আবেগ সইতে পারছে না । সময়ে-সময়ে অঙ্গবিক্ষেপ তোমাকে অসাড় করে তোলে আর শিহরণ ঘটায়, অনেকটা প্রচণ্ড দৈহিক খাটুনির পর দিনের শেষে মাংসপেশিতে যেমন খিঁচুনি হয় কিংবা রাতের বেলায় ঝড়ের আগে নিশ্চিন্ত তন্দ্রায় যেমন হয়।

 

আরও এগোবার আগে আমি ওপরে যে শীতলতার সংবেদনের কথা বলেছি, সেই প্রসঙ্গে আরেকটা কাহিনি বলব, যা পরিষ্কার করে দেবে যে ঠিক কতোখানি প্রভাবগুলো, এমনকি নিছক দৈহিক প্রভাব, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে বদলাতে পারে । এবারে যিনি কথা বলছেন তিনি  একজন সাহিত্যিক, আর তাঁর গল্পের কোনো কোনো অংশে যে কেউ ( আমি মনে করি ) সাহিত্যিক মেজাজের ইঙ্গিত পাবেন । “আমি নিয়েছিলুম”, উনি আমাকে বলেছিলেন, “যৎসামান্য পাতাঘাসের মাত্রা, আর সব কিছুই ভালোভাবে চলছিল । আহ্লাদের সঙ্কট বেশিক্ষণ স্হায়ী হয়নি, আর আমি নিজেকে পেলুম অবসন্নতা আর বিস্ময়ের স্হিতিতে যা প্রায় ছিল মহানন্দের । আমি আশা করছিলুম এক শান্তিময় আর উদ্বেগহীন সন্ধ্যা : দুর্ভাগ্যবশত, সুযোগ আমাকে উৎসাহিত করলো এক বন্ধুর সঙ্গে নাটক দেখতে যাবার । আমি নায়কোচিত পথ বেছে নিলুম, আমার অপার আলস্য আর চুপচাপ বসে থাকার স্হিতিকে কাটিয়ে উঠতে চাইলুম । আমাদের পাড়ার প্রতিটি ঘোড়ার গাড়ি লোকে ভাড়া করে নিয়েছিল ; আমি রাস্তার ভিড়ের কর্কশ আওয়াজ, বোকা পথচারীদের মূর্খ কথাবার্তা, একটা পুরো সাগর ফালতু লোকে ঠাশা, তার ভেতর দিয়ে অনেকটা হাঁটতে বাধ্য হলুম । আমার আঙুলের ডগাগুলো আগে থাকতেই একটু ঠাণ্ডা ছিল, যেন আমি দুটো হাত বরফের জলে চুবিয়েছি । কিন্তু একে যন্ত্রণাবোধ বলব না ; ধারালো ছুঁচ ফোটানোর মতন অনুভূতি বরং আমাকে আনন্দ দিচ্ছিল। তবু যতো হাঁটতে লাগলুম ততো এই শীতলতা আমার ওপর ছেয়ে যেতে লাগলো । যাঁর সঙ্গে আমি ছিলুম তাঁকে কয়েকবার জিগ্যেস করলুম যে সত্যিই কি খুব ঠাণ্ডা লাগছে । উনি উত্তরে বললেন যে, বরং উলটো, অন্য দিনের তুলনায় তাপ বেশ উষ্ণ । শেষ পর্যন্ত নাটকে পৌঁছে, যে বক্স আমার জন্য নির্ধারিত ছিল সেখানে বসে, তিন-চার ঘণ্টা বিশ্রাম নেয়া যাবে আঁচ করে মনে হলো বাইবেল বর্ণিত ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’তে পৌঁছে গেছি । আসার সময়ে যে অনুভূতিগুলো আমি যৎসামান্য কর্মশক্তি দিয়ে মাড়িয়ে এসেছিলুম তা এবার ফেটে পড়ল, আর আমি নিজেকে ছেড়ে দিলুম আমার নিঃশব্দ প্রমত্ততায় । শীতলতা বাড়ছিল, অথচ দেখলুম লোকেরা হালকা পোশাকে এসেছে, এমনকি ঘেমে গিয়ে ক্লান্তি কাতাবার জন্য কপাল পুঁচছে । এই মজাদার ধারণাটা আমাকে পেয়ে বসল, যে আমি একজন বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষ, যাকে নাটকের হলঘরে গ্রীষ্মকালে শীত উপভোগ করার অধিকার দেয়া হয়েছে । ভীতিকর মনে না হওয়া পর্যন্ত শীতলতা বাড়তেই থাকলো ; কিন্তু কতো বেশি শীতলতায় আচ্ছন্ন হতে পারি সেই কৌতূহল আমাকে কাবু করে ফেলেছিল । শেষ পর্যন্ত এমন একটা সময় এলো যখন তা অনেক বেশি হয়ে পড়লো, সার্বত্রিক, যে আমার ধারণাগুলো জমে বরফ হয়ে যেতে লাগলো ; আমি হয়ে গিয়েছিলুম চিন্তান্বিত একতা বরফের চাঙড় । আমি কল্পনা করছিলুম যে বরফ কেটে আমার মূর্তি গড়া হয়েছে, আর এই উন্মাদ বিভ্রম আমাকে এতো গর্বান্বিত করলো, নিজের মধ্যে এক নৈতিক শুভত্বের বোধ জাগিয়ে তুললো, যে তোমাকে তা বর্ণনা করার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না । আমার জঘন্য আহ্লাদকে যা উঁচুতে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল তা হল নিশ্চয়তার এই বোধ যে বাদবাকি উপস্হিত লোকজন আমার অবস্হা আর তাদের তুলনায় আমার নায়কত্ব তারা অজ্ঞতার কারণে টের পাচ্ছে না, আর এই আনন্দে বিহ্বল হয়ে যে আমার সঙ্গী এক মুহূর্তের জন্যেই সন্দেহ করতে পারেনি যে কেমন অদ্ভুত অনুভূতিতে আমি টইটুম্বুর । আমি

আমার কৈতবের পুরস্কার চুপচাপ গ্রহণ করলুম, আর আমার অসাধারণ আনন্দ হয়ে রইলো যথার্থ গোপনতা ।

 

“তাছাড়া, আমি সবে বক্সে ঢুকেইছিলুম আর আর আমার চোখ অন্ধকারের প্রকোপে ছেয়ে গেলো যার সঙ্গে, আমার মনে হলো, আমার শীত করার ধারণার সম্পর্ক আছে ; হতে পারে যে এই দুটো ধারণা একে অপরকে শক্তি যুগিয়েছিল । তুমি তো জানো হ্যাশিস সদাসর্বদা আলোর চমৎকারিত্বের উদ্রেক করে, রঙের বাহার, তরল সোনার গড়িয়ে পড়া ; সমস্ত ধরণের আলোই এর প্রতি সমবেদী, যা আলো চাদরের মতন ভাসতে থাকে আর যে আলো আঁটা থেকে আবছা ঝুলে থাকে, উভয় ক্ষেত্রেই ; সামাজিক মহিলাদের আয়োজিত সালোঁর ঝাড়বাতিদান, মোমবাতি যা লোকেরা মে মাসে জ্বলায়, সূর্যাস্তের গোলাপি সম্প্রপাত । মনে হয় যে বেচারা ঝাড়বাতি এতো আলো ছড়ায় যে ঔজ্বল্যের তৃপ্তিহীন তৃষ্ণা মেটাতে অকিঞ্চিৎকর হয়ে পড়ে । আমি ভাবলুম, তোমাকে যেমন বলেছি, আমি ছায়ার জগতে প্রবেশ করছিলুম, যা, উপরন্তু, ক্রমশ ঘন হয়ে উঠছিল, আর আমি স্বপ্ন দেখতে লাগলুম মেরুঅঞ্চলের আলো আর অনন্তকালীন শীতের । আর মঞ্চের কথা বলতে গেলে, নাটকটা ছিল মজার দেবীকে নিয়ে ; তা নিজেই ছিল আলোকময় ; প্রথম দিকে ছোটো এবং অনেকটা দূরে, যেন টেলিসকোপের উলটো দিক দিয়ে কোনো ভূদৃশ্য দেখছি । আমি তোমাকে বলব না যে আমি অভিনেতাদের সংলাপ শুনছিলুম ; তুমি জানো যা তা অসম্ভব । থেকে থেকে আমার চিন্তা কোনো সংলাপের টুকরো খুবলে আনছিলো, আর চতুর নাচিয়ে মেয়ের মতন তাকে বহুদূরের হর্ষোল্লাসে লাফিয়ে পৌঁছোবার পাটাতন হিসেবে ব্যবহার করছিল । তুমি হয়তো ভাববে যে এইভাবে একটা নাটক শোনা যুক্তিহীন আর সঙ্গতিহীন । নিজের ভ্রান্তি দূর করো! আমি আবিষ্কার করলুম যে আমার চিত্তবিক্ষেপ নাটকটা  আমার সূক্ষ্ম অনুভূতিকে ছাপিয়ে গেছে । কিছুই আমাকে বিক্ষুব্ধ করলো না, আর আমি যেন হয়ে উঠলুম সেই ক্ষুদে কবির মতন, যে প্রথমবার ‘এসথার’ নাটক দেখে, ভেবেছিল যে রানিকে ভালোবাসার ঘোষণা হামান-এর পক্ষে স্বাভাবিক ছিল । ব্যাপারটা ছিল, যেমন তুমি আঁচ করেছ, সেই দৃশ্যের যেখানে ও এসথারের পায়ে পড়ে নিজের অপরাধের ক্ষমা চাইছিল । যদি এই প্রণালীতে সব নাটক শোনা হয় তাহলে ওরা সবাই, এমনকি রাসিনের নাটকেরও, প্রচুর লাভ হবে । আমার মনে হচ্ছিল যে অভিনেতাগুলো খুবই ছোট্টো, সুস্পষ্ট এবং রেখাঙ্ক দিয়ে বাঁধা, অনেকটা মেইসনিয়ারের ছবির আকৃতিগুলোর মতন । আমি একেবারে পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছিলুম ওদের পোশাক, তাদের নকশা, সেলাই, বোতাম, ইত্যাদি, কিন্তু তাদের নকল কপাল আর আসল কপালের তফাতও চোখে পড়ছিল ; শাদা, নীল আর লাল, আর মুখ সাজাবার কায়দা; আর এই লিলিপুটগুলোর পোশাক ছিল শীতল ও ঐন্দ্রজালিকভাবে সুস্পষ্ট, যেমনটা কোনো তৈলচিত্রের ওপরে কাচ থাকলে হয় । শেষ পর্যন্ত যখন আমি এই ঠাণ্ডায় জমাট ছায়াদের গুহা থেকে বেরোলুম, তখন, অন্তরজগতের অলীক ছায়ামূর্তিদের ধারাবাহিক প্রবাহ উবে গেল, আমি নিজেকে ফিরে পেলুম, আমি বড়ো বেশি ক্লান্তি অনুভব করলুম যা তার আগে দীর্ঘক্ষণ যাবত করা কঠিন কাজকর্ম করেও আমার হয়নি।”

 

সত্যি বলতে কি, নেশার এই পর্বে এক নতুন মাধুর্য দেখা দ্যায়, প্রতিটি ইন্দ্রিয়তে এক উচ্চতর প্রখরতা : গন্ধ, দেখা, শোনা, স্পর্শ এগিয়ে চলায় সমানভাবে যোগ দ্যায় ; চোখ দেখতে পায় অসীমকে ; প্রচণ্ড আওয়াজের মধ্যেও কান শুনতে পায় সূক্ষ্ম শব্দগুলো । এই সময়েই আরম্ভ হয় হ্যালুশিনেশানের কুহক ; বহির্জগতের বস্তুরা একের পর এক অদ্ভুত আকার নিতে থাকে ; তারা বিকৃত হয় আবার নিজের আকারে ফিরে আসে । তারপর — ধারণাদের অস্পষ্টতা, ভুলবোঝা, আর পক্ষান্তরণ ! শব্দেরা নিজেদের রঙে মুড়ে ফ্যালে ; রঙেরা কুসুমিত হয় সঙ্গীতে। যা তুমি বলবে, স্বাভাবিকতা ছাড়া কিছুই নয় । প্রতিটি কাব্যিক মস্তিষ্ক তার সুস্হ, স্বাভাবিক অবস্হায়, এই আনুরূপ্যগুলো সহজেই কল্পনা করতে পারে । কিন্তু আমি পাঠকদের আগেই সতর্ক করেছি যে চরস সেবন করায় কোনোরকম ইতিবাচক অতিপ্রাকৃত ব্যাপার নেই; আনুরূপ্যগুলোতে আছে অপরিচিত প্রাণবন্ততা ; তারা প্রবেশ করে আর তারা বিকশিত হয় ; তারা তাদের দক্ষতা দিয়ে মনকে অভিভূত করে । সঙ্গীতের স্বরলিপি হয়ে যায় সংখ্যা ; আর যদি তোমার মগজ গাণিতিক প্রবণতায় দক্ষ, যে ঐকতান তুমি শোনো, তার সংবেদনাময় ও ইন্দ্রিয়পরায়ণ চরিত্র বজায় রেখে, নিজেকে বিশাল ছন্দময় ক্রিয়াকলাপে বদলে ফ্যালে, যেখানে সংখ্যা থেকে সংখ্যার জন্ম হয়, আর যার স্তরগুলো এবং উৎস এক অনির্বচনীয় স্বাচ্ছন্দ্য ও তৎপরতাকে অনুসরণ করে, যা সঙ্গীতকারের সমান হয়ে ওঠে ।

 

অনেক সময়ে এমনও হব যে লোকটার ব্যক্তিত্বের বোধ লোপাট হয়ে যায়, আর যে বস্তুনিষ্ঠতা সর্বেশ্বরবাদী কবিদের জন্মগত অধিকার তা তোমার মধ্যে এমন অস্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয় যে বহির্জগতের বস্তুদের সম্পর্কে তোমার চিন্তা তোমাকে নিজের অস্তিত্বের কথা ভুলিয়ে দ্যায় আর তোমাকে তাদের সঙ্গে হতবুদ্ধি করে । তোমার দৃষ্টি একটা গাছে নিবদ্ধ, বাতাস তাকে সুসঙ্গতভাবে বেঁকিয়ে দিয়েছে ; কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে একজন কবির মস্তিষ্কে যা কেবল স্বাভাবিক  উপমা তোমার কাছে বাস্তব হয়ে দেখা দ্যায় । প্রথমে তুমি গাছটাকে তোমার আবেগ, তোমার আকাঙ্খা, তোমার বিষাদ দান করো ; তার কড়কড় শব্দ আর দোল খাওয়া তোমার হয়ে ওঠে, আর শীঘ্রই তুমি নিজেই গাছ হয়ে যাও । ঠিক যেভাবে পাখিরা নীলিমার বিস্তারে ঘুরে বেড়ায় : প্রতীকিস্তরে তা মানুষের যাবতীয় ব্যাপারের ওপর তোমার অমরত্বের ক্ষুধাকে প্রতিনিধিত্ব করে ; কিন্তু শীঘ্রই তুমি পাখি হয়ে যাও । তারপর, মনে করো, তুমি বসে-বসে ফুঁকছো ; তোমার দৃষ্টি বেশ কিছুক্ষণের জন্য নীল মেঘের প্রতি আকৃষ্ট হবে, যা তোমার পাইপ থেকে শ্বাস হয়ে উঠেছিল ; মন্হর, অবিরাম, অনন্তকালীন বাষ্পীভবনের ধারণা দখল করে নেবে তোমার আত্মা, আর এই ধারণা তুমি তোমার ভাবনাচিন্তায়, তোমার চিন্তাধারার নিজস্ব উপকরণে প্রয়োগ করা আরম্ভ করবে। অনন্যসাধারণ অস্পষ্টতার মাধ্যমে, বুদ্ধিমত্তার পরিবহন প্রজাতির অদলবদলের দ্বরা, তুমি নিজের বাষ্পীভবন অনুভব করবে, আর তুমি তোমার পাইপকে দেবে, যাতে তুমি তামাকের মতন কুঁজো আর দাবিয়ে ঠাশা অনুভব করছি, তোমাকে ধোঁয়ায় পরিবর্তনের অদ্ভুত কর্মক্ষমতা !

 

সৌভাগ্যবশত, এই অন্তহীন কল্পনা শুধু এক মিনিটের জন্য স্হায়ী ছিল । একটা সূক্ষ্ম বিরতির জন্য, অনেক চেষ্টা করে অভিগ্রস্ত, তোমাকে ঘড়ির দিকে তাকাতে উৎসাহিত করেছে । কিন্তু চিন্তাধারার আরেকটি স্রোত তোমাকে বহন করে নিয়ে যায় ; তা তোমাকে আরও এক মিনিট তার ঘুর্ণিতে তোমাকে গড়িয়ে নিয়ে যাবে, আর এই অতিরিক্ত মিনিট হবে অনন্তকালীন। কেননা তোমার অনুভূতি আর ধারণা সময়ের বিপুল অংশের  দ্বারা সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল । কেউ হয়তো বলতে পারে যে একটিমাত্র ঘণ্টার পরিসরে একজন লোক বহুবার বাঁচতে পারে । তাহলে তুমি কি, অসাধারণ উপন্যাসের মতন, লিখিত হবার বদলে জীবন্ত ? দেহিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আর আনন্দ উপভোগের মধ্যে আর কোনও সমীকরণ নেই ; আর সর্বোপরি, এর ফলে যে দোষারোপ উৎপন্ন হয় তাকে ব্যক্তি-স্বাধীনতার বিপজ্জনক প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে ।

 

যখন আমি হ্যালুশিনেশানের কথা বলি তখন শব্দটা তার যথাযথ বোধে গ্রহণ করতে হবে। বিশুদ্ধ হ্যালুশিনেশানের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব, যে বিষয়ে ডাক্তাররা অধ্যয়ন করে থাকেন, তার সঙ্গে হ্যালুশিনেশনের, বা ইন্দ্রিয়দের ভুল ব্যাখ্যা, ঘটে চরসের দরুন উৎপন্ন মানসিক স্হিতির। প্রথমটির ক্ষেত্রে হ্যালুশিনেশন হয় আচমকা, সম্পূর্ণ, এবং মারাত্মক ; তাছাড়া, তার কোনো পৃষ্ঠভূমি বা ওজর বাইরের জগতে খুঁজে পাওয়া যায় না । অসুস্হ মানুষ দেখতে পায় ছায়া-আকার কিংবা শুনতে পায় এমন সমস্ত আওয়াজ যা আদপে ঘটেনি । দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, যেখানে হ্যালুশিনেশান ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তা প্রায় ইচ্ছাকৃত, আর তা নিখুঁত হয় না, তা কল্পনার আশ্রয়ে পরিপুষ্ট হয় । শেষে, এর একটা অজুহাত আছে । আওয়াজ কথা বলবে, সম্পূর্ণ আলাদা উচ্চারণে ; কিন্তু আওয়াজ যে ছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই । চরস নেশাখোরের উৎসাহী দৃষ্টি অদ্ভুত আকারদের দেখতে পায়, কিন্তু অদ্ভুত আর রাক্ষুসে হবার আগে আকারগুলো সরল আর স্বাভাবিক ছিল । তেজোময়তা, হ্যালুশিনেশনের জীবন্ত সংলাপ এই নেশায় কোনোক্রমেই এই মৌলিক পার্থক্যকে বাতিল করে না : একটির শিকড় রয়েছে অবস্হায়, এবং বর্তমান সময়ে, অন্যটার নেই । তপ্ত ফুটন্ত এই কল্পনাকে বরং ব্যাখ্যা করা যাক, স্বপ্নের এই পরিপক্বতা, আর এই কাব্যিক বালখিল্য যে কারণে চরসের নেশাগ্রস্ত মস্তিষ্ক নিন্দিত হয়, আমি তোমাকে আরেকটা গল্প শোনাবো । এবার কোনো অলস লোক নয় যে কথা বলছে । ইনি একজন মহিলা ; মহিলাটি আর তাঁর প্রথম যৌবনে নেই ; কৌতূহলী, উত্তেজিত হতে চান এমন মনের, এবং যিনি, বিষটির সঙ্গে পরিচিত হবার আগ্রহে আত্মসমর্পণ করেছেন, এইভাবে আরেকজন মহিলার গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলো বর্ণনা করেছেন । আমি হুবহু তুলে দিচ্ছি ।

 

বারো ঘণ্টার উন্মাদনা থেকে আমার পাওয়া অনুভূতিগুলো যতোই অদ্ভুত হোক বা নতুন– বারো ঘণ্টার ছিল নাকি কুড়ি ? সত্যি বলতে, আমি সঠিক বলতে পারব না — আমি আর কখনও সেই স্হিতিতে ফিরে যেতে চাই না । আত্মিক উত্তেজনা ছিল প্রাণবন্ত, তা থেকে পাওয়া ক্লান্তি বড্ডো বেশি ; আর, এক কথায় বলতে হলে, শৈশবে এইভাবে ফিরে যাওয়া আমার মনে হয়েছে অপরাধ । শেষ পর্যন্ত ( বহুবার ইতস্তত করার পর ) কৌতূহলে আত্মসমর্পণ করলুম, যেহেতু সেটা বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়া বোকামি ছিল, আমার মনে হয়েছিল যৎসামান্য সন্মান নষ্ট হলে খুব বেশি ক্ষতি হবে না । কিন্তু প্রথমেই তোমাকে বলে রাখি অভিশপ্ত এই হ্যাশিস জিনিসটা বড়ো ভয়ঙ্কর বিশ্বাসঘাতক মাদক । অনেক সময়ে লোকে মনে করে যে সে নেশা থেকে মুক্ত হয়ে গেছে ; কিন্তু তা নিছক শান্তির প্রতারণা । বিশ্রামের মুহূর্ত থাকে বটে, আর তারপর পুনঃপ্রকোপ । সন্ধ্যায় দশটার আগে আমি নিজেকে এই রকম এক সাময়িক স্হিতিতে পেলুম ; আমি ভাবলুম জীবনের এই প্রাণপ্রাচুর্য থেকে  পালিয়ে আসাটা, যা আমাকে এতো আনন্দ দিয়েছে, ব্যাপারটা সত্যি, কিন্তু তা উদ্বেগহীন আর ভয়হীন ছিল না। রাতের খাবারের জন্য মহানন্দে বসলুম, সেই ধরণের মানুষের মতন যে দীর্ঘ যাত্রার পর বিরক্তিকর পরিশ্রান্তে ক্লান্ত ; কেননা তার আগে পর্যন্ত, সাবধান হয়ে, আমি খাওয়া থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলুম ;কিন্তু আমি টেবিল থেকে ওঠার আগেই বিভ্রম আমাকে আবার আঁকড়ে ধরেছিল, যেমন কোনো বিড়াল ইঁদুরকে ধরে, আর বিষটা আমার বেচারি মগজে নতুন করে খেলা আরম্ভ করল । যদিও আমার বাড়ি বন্ধুদের বাড়ির কাছেই, আর আমার জন্য ঘোড়ার গাড়িও ছিল, আমি স্বপ্ন দেখার জন্য, আর নিজেকে অপ্রতিরোধ্য উন্মাদনার হাতে ছেড়ে দেবার জন্য একেবারে আবিষ্ট অনুভব করলুম, যে সকাল পর্যন্ত থেকে যাবার তাদের প্রস্তাবে আনন্দে রাজি হয়ে গেলুম । তুমি তো দুর্গের কথা জানো ; তুমি জানো যে ওরা যে অংশে সাধারণত থাকে সেখানে আয়োজন করেছে, সাজিয়েছে, আর আধুনিক কায়দায় সুখস্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্হা করেছে, কিন্তু যে অংশটা সাধারণত যেমনটা আগে ছিল তেমনই খালি পড়ে থাকে, সেই পুরোনো শৈলী আর পুরোনো নকশাগুলো বজায় রেখেছে । বন্ধুরা এই অংশে আমার জন্য একটা শোবার ঘরের ব্যবস্হা করল, আর এই জন্য তারা সবচেয়ে ছোটো ঘরটা বেছে নিলো, এক ধরণের খাসকামরা, যেটা, কিছুটা ফ্যাকাশে আর পলেস্তারা-খসা হলেও মনোমুগ্ধকারী । যতোটা পারি তোমার জন্য বর্ণনা করব, যাতে তুমি টের পাও যা কেমনতর অদ্ভুত দর্শনশক্তিতে আপ্লুত হয়েছিলুম, যে দর্শনশক্তি আমার সারাটা রাতে ছেয়ে গিয়েছিল, সময়ে চলে যাওয়া সম্পর্কে জানার বিশ্রামটুকুও দেয়নি ।

 

“খাসকামরাটা খুবই ছোটো, বেশ অপ্রশস্ত । ঝালরের উচ্চতা থেকে ছাদের খিলান নেমেছে গম্বুজের মতন ; দেয়ালগুলো সঙ্কীর্ণ, লম্বা আয়নায় ঢাকা, প্যানেল দিয়ে আলাদা-করা, যার ওপর ভূচিত্র, সাজাবার মতন সহজ শৈলীতে, আঁকা । চার দেয়ালের ছাদের কারুকার্যে নানা রকমের রূপকধর্মী মূর্তি আঁকা, কয়েকজন বিশ্রামরত, অন্যেরা দৌড়োচ্ছে বা উড়ছে ; তাদের ওপরে চমৎকার সব ফুল আর পাখি । মূর্তিগুলোর পেছনে জাফরি, চোখকে ফাঁকি দেবার মতন করে আঁকা, আর স্বাভাবিকভাবে ছাদের বাঁককে অনুসরণ করেছে ; ছাদটা সোনালী।

কাঠের কারুকাজ আর জাফরি আর মূর্তিদের মাঝেকার ফাঁকগুলো সোনায় মোড়া, আর একেবারে মধ্যখানে সোনাকে নকল জাফরির জ্যামিতিক নকশায় বিভক্ত করা ; তুমি দেখলে মনে করবে সেটা অনেকটা খানদানি খাঁচার মতন, বেশ বড়ো একটা পাখির জন্যে একটা সুন্দর খাঁচা । আমি একানে যোগ করতে চাইব যে রাতটা ছিল বেশ সুন্দর, বেশ পরিষ্কার, আর চাঁদ ঝলমল করছিল আলোয় ; এমনই যে আমি মোমবাতি নেভাবার পরও সাজানো নকশাগুলো দেখা যাচ্ছিল, আমার মনের চোখ দিয়ে যে আলোকিত তা নয়, তুমি হয়তো তাইই ভাববে, বরং এই সুন্দর রাত দিয়ে, যার আলো সোনার সমস্ত নকশা, আয়না, আর রঙের বাহারকে আঁকড়ে ছিল ।

 

“আমি প্রথমে খুবই অবাক হয়েছিলুম যে আমার সামনে বিশাল ফাঁকা জায়গা ছড়িয়ে রয়েছে, আমার আসেপাশে, আমার চারিদিকে । রয়েছে অনাবিল নদী, আর সবুজ চারণভূমি যারা নিজেদের সৌন্দর্যকে শান্ত জলে মুগ্ধভাবে প্রশংসা করছে : আয়নায় পপতিফলিত প্যানেলগুলোর প্রভাব তুমি নিশ্চয়ই আঁচ করতে পারছ । চোখ তুলে আমি দেখতে পেলুম সূর্য আস্ত যাচ্ছে, যেন শীতল হয়ে-আসা গলিত ধাতু । তা আসলে ছিল ছাদের সোনা । কিন্তু জাফরিগুলো দেখে আমার মনে হলো আমি এক ধরণের খাঁচায় রয়েছি, কিংবা শূন্যে ঝোলানো একটা বাড়িতে যার সব দিক খোলা, আর এই বিস্ময়গুলো থেকে আমাকে আলাদা করে রেখেছে আমার কয়েদখানার শিকগুলো । যে বিভ্রম আমাকে পাকড়াও করেছিল তাতে প্রথমত তো আমি একচোট হাসলুম ; কিন্তু যতোই দেখতে থাকলুম ততোই তার ম্যাজিক বাড়তে লাগলো, চতুর বাস্তবতায় জীবন্ত ও স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগলো । যে মুহূর্ত থেকে আমার মাথায় বন্দি থাকার ধারণা চেপে বসল, আমি মানতে বাধ্য, যে নানারকম আহ্লাদ আমি চারিদিক এবং ওপর থেকে পাচ্ছিলুম তাতে আর গুরুতরভাবে বাধা দিলো না । আমি নিজের সম্পর্কে ভাবতে লাগলুম যে আমি দীর্ঘকাল যাবত কারারুদ্ধ, হয়তো হাজার বছরের জন্য, এই মহার্ঘ খাঁচায়, পরীদের এই চারণভূমিতে, মনোমুগ্ধকর দিগন্তের মাঝে । আমি কল্পনা করলুম আমি ‘ঘুমন্ত সুন্দরী’ হয়ে গেছি ; স্বপ্ন দেখলুম প্রায়শ্চিত্তের যা আমাকে ভোগ করতে হবে, আগামী উত্তরণের জন্য । আমার মাথার ওপর ডানা ঝাপটাচ্ছিল গ্রীষ্মমণ্ডলের চমৎকার পাখির দল, আর আমার কান যখন শুনতে পেলো প্রধান রাস্তায় বহুদূর হেঁটে যাওয়া ঘোড়ারদের গলার ছোটো ঘণ্টার শব্দ, দুটি ইন্দ্রিয় একত্রিত হয়ে একটি মাত্র ধারণায় তাদের প্রতীতিকে মিশিয়ে ফেললো, আমার মনে হল রহস্যময় বেহায়া মন্ত্রোচ্চারণ করছে পাখির দল ; আমি কল্পনা করলুম যে পাখিগুলো ধাতব কন্ঠে গান গাইছে । প্রত্যক্ষরূপে তারা আমার সঙ্গে কথা বলছিল, আর আমার বন্দিদশা নিয়ে স্তবগান করছিল । তিড়িং-নাচিয়ে বাঁদরেরা, ভাড়ের মতন দেখতে বনদেবতারা এই বন্দির দশা দেখে, যে নড়াচড়া করতে অপারগ, নিজেদের মধ্যে হইহুল্লোড় করছিল ; তবু পুরাণের সব কয়টি দেবী-দেবতারা আমার দিকে মনোরম হাসিমুখে তাকাচ্ছিল, যেন আমাকে ধৈর্য ধরে উৎসাহিত করছিল  যাতে এই ডাকিনি-প্রকোপ সহ্য করতে পারি, আর ওনাদের চোখগুলো চোখের পাতার কোনায় আটকে ছিল যাতে আমাকে কোনঠাশা করা যায় । আমি এই নির্ণয়ে পৌঁছোলুম যে যদি আগেকার কালের কোনো দোষ, যা আমিও জানি না, এই সাময়িক শাস্তিকে জরুরি করে তুলেছিল, আমি তবুও এক উপচে-পড়া শুভত্বে বিশ্বাস করতে পারছিলুম, যা কিনা, আমাকে বুদ্ধিমান কার্যধারায় নিপাতিত করলেও, আমাদের যৌবনের লঘুমস্তিষ্ক আনন্দের চেয়ে আমাকে সত্যকার আনন্দ দেবে । দেখছেন তো যে আমার স্বপ্নে নৈতিক বিবেচনা অনুপস্হিত ছিল না ; কিন্তু স্বীকার করছি যে এই সমস্ত চমৎকার আদল-আদরা আর রঙবাহার পর্যবেক্ষণ করার আনন্দ এবং নিজেকে এক অদ্ভুত নাটকের কেন্দ্র মনে করার ভাবনা আমার অন্যান্য চিন্তাকে অহরহ নিবিষ্ট করে ফেলছিল । এটা দীর্ঘক্ষণ স্হায়ী ছিল, অনেক ক্ষণ । সকাল পর্যন্ত ছিল কি ? আমি ঠিক জানি না । হঠাৎই আমি দেখলুম সকাল বেলাকার সূর্য আমার ঘরে স্নান করছে । আমার এক প্রাণবন্ত বিস্ময়বিমূঢ়তার অভিজ্ঞতা হলো, আর আমি যেটুকু গড়ে ফেলতে পেরেছি, স্মৃতির যাবতীয় প্রয়াস সত্তেও, আমি কখনও নিজেকে নিশ্চিন্ত করতে পারিনি যে আমি ঘুমিয়েছিলুম নাকি ধৈর্যসহকারে এক সুস্বাদু অনিদ্রায় ভুগেছিলুম । এক মুহূর্ত আগে, রাত ; এখন, দিন। আর তবু আমি বহুক্ষণ সময় কাটিয়েছিলুম ; ওহ, অনেকক্ষণ ! সময়ের প্রতীতি, কিংবা বলা যায় নিয়মানুগ সময়, বাতিল করে দেবার কারণে, সমস্ত রাত আমার চিন্তার অজস্রতা দিয়ে কেবল পরিমাপযোগ্য ছিল । এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আমার মনে হয়েছিল এতো দীর্ঘকালীন ক্ষণ, এও মনে হয়েছিল যে তা কেবল কয়েক সেকেণ্ড বজায় ছিল ; এমনকি হয়তো তা আদপে অনন্তকালে ঘটেইনি ।

 

“আমি আপনাকে আমার ক্লান্তির বিষয়ে কিছু বলিনি ; তা ছিল অপরিমেয় । আমি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলুম, লোকে বলে যে কবিদের আর সৃজনশীল শিল্পীদের উৎসাহের সঙ্গে তার মিল আছে, যদিও আমি চিরকাল বিশ্বাস করেছি যে যাঁদের ওপর আমাদের আলোড়িত করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, নিশ্চয়ই তাঁরা শান্ত ধাতের মানুষ হবেন । কিন্তু কবিদের সৃজনশীল-উন্মাদনা যদি আমার জন্য যোগাড় করা এক চামচ হ্যাশিস মেঠাইয়ের সমান হয়, আমি ভাবতে বাধ্য হচ্ছি যে কবিরা জনগণের খরচে যে আনন্দ বহন করেন, আর তা এক ধরণের ভালো-থাকার বাইরের ব্যাপার নয়, তাহলে আমি অন্তত নিজেকে নিজের আশ্রয়ে রয়েছি বলেই মনে করব, মানে আমার বৌদ্ধিক আশ্রয়ে ; অর্থাৎ, বাস্তব জীবনে।”

 

মহিলাটির বক্তব্য, স্পষ্টত যুক্তিসঙ্গত ; কিন্তু ওনার গল্প থেকে আমরা কয়েকটা জরুরি তথ্য নেবো, যা  হ্যাশিসের উদ্রেক করা প্রধান অনুভূতিগুলোর কথা পুরো করবে ।

 

উনি বলছেন রাতের ভোজের সঙ্গে সঠিক সময়ে আনন্দের আগমনের কথা ; এক মুহূর্তে যখন সাময়িক উপশম, চূড়ান্ততার ভানের জন্য সাময়িক, তাঁকে বাস্তব জগতে ফিরে যাবার অনুমতি দিলো । সত্যিই, যেমন আমি বলেছি, সাময়িক বিরতি এবং প্রতারণাময় শান্তি ঘটে, আর হ্যাশিসের নেশা সঙ্গে আনে উদারসর্বস্ব ক্ষুধা, এবং প্রায় সব সময়ের প্রচণ্ড তৃষ্ণা । কেবল সন্ধ্যার খাওয়া বা রাতের ভোজ, স্হায়ী আরাম আনার বদলে, শুরু করে নতুন অভিগ্রহ, যে ঘুর্নিময় সঙ্কটের অভিযোগ মহিলা করছেন, এবং যার পরে ঘটতে থেকেছে একের পর এক জাদুপূর্ণ অল্প আতঙ্ক মেশানো দৃষ্টিপ্রতিভা, যাতে উনি আত্মসমর্পণ করলেন, জগতের সেরা অনুগ্রহের কোলে নিজেকে সোপর্দ করে । আমরা যে স্বৈরাচারী ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কথা বলি তা প্রচুর সমস্যা ছাড়া নিরীক্ষা করা যায় না । কেননা লোকটা নিজেই নিজেকে এমন বস্তুজগতের ঊর্ধে মনে করে যে, কিংবা বলা যায় লোকটা নেশাব এতো আচ্ছন্ন হয়ে যায়, যে একটা বোতল বা কাঁটাচামচ তুলতেও তার সাহসের দীর্ঘ সময় লাগবে । খাবার হজম করার সঙ্কটও বেশ উদ্দাম ; তার বিরুদ্ধে লড়া অসম্ভব । এবং এই স্হিতি যদি দীর্ঘক্ষণ চলে তাহলে তাকে সমর্থন করা যায় না, আর যদি তার জায়গায় নেশার আরেকটা দমক তাড়াতাড়ি দেখা না দ্যায়, যা উপরোক্ত ক্ষেত্রে অসাধারণ ভিশান, মনোরমভাবে আতঙ্কিত স্হিতির মাধ্যমে বর্ণিত, তা একই সঙ্গে সান্তনায় পরিপূর্ণ । এই নতুন স্হিতিকে প্রাচ্যের লোকেরা বলে ‘কায়েফ’। স্হিতিটা আর ঝড়ের ঘুর্ণি নয় ; তা সমাহিত পরম সুখের প্রশান্তি, এক মহিমান্বিত সমর্পণের। বহুক্ষণ যাবত তুমি তোমার নিজের মালিক ছিলে না ; কিন্তু তা নিয়ে তুমি নিজেকে ব্যতিব্যস্ত করো না । ব্যথা, এবং সময়ের বোধ, লোপাট হয়ে গেছে ; কিংবা যদি তারা উঁকি মারার সাহস দেখায়, তা কেবল প্রধান অনুভূতি দিয়ে পালটানো, আর তারা তখন, তাদের সাধারণ প্রকোপের তুলনায়, কাব্যিক বিষাদ । গদ্যের ক্ষোভ নয় ।

 

কিন্তু সর্বোপরি বলা যাক যে এই মহিলার বর্ণনায় ( এবং সেকারণেই আমি ওনার বক্তব্যের মাধ্যমে উপস্হাপন করেছি ) হ্যালুসিনেশানটা জারজ, আর তার প্রকাশ ঘটছে বহির্জগতের বস্তুদের উপস্হিতির দরুন । আত্মা তো কেবল আয়না যাতে পরিবেশ প্রতিফলিত হচ্ছে, অদ্ভুতভাবে পরিবর্তিত । তারপর, আবার, আমরা দেখছি ঢুকে পড়ছে একটা ব্যাপার যাকে আমি বলব নৈতিক হ্যালুশিনেশান ; রুগি মনে করছেন যে তিনি কিঞ্চিদধিক প্রায়শ্চিত্তে নিপাতিত ; কিন্তু নারীর মেজাজ, যার বিশ্লেষণ করা মনানসই হবে না, হ্যালুশিনেশানের অদ্ভুত ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যকে নজর দিতে পারল না । অলিমপাসের দেবতাদের দয়াময় মুখাবয়বকে কাব্যিক করে তোলা হয় হ্যাশিসের পালিশের দ্বারা । আমি বলব না যে এই মহিলা অনুশোচনার আঁচল ছুঁতে পেরেছেন, কিন্তু ওনার ভাবনাচিন্তা, মুহূর্তের জন্য বিষাদের দিকে মোড় নিয়েছিল এবং গতানুশোচনা বেশ তাড়াতাড়ি আশার রঙে রাঙিয়ে উঠেছিল। এই পর্যবেক্ষণ আমরা আবার বিবেচনা করার সুযোগ পাবো ।

 

উনি সকালবেলাকার ক্লান্তির কথা বলছেন ল সত্যি বলতে কি, এটা বিরাট ব্যাপার। কিন্তু তা তক্ষুনি দেখা দেয়নি, আর যখন তুমি তার অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিচ্ছ তুমি তা অবাক না হয়ে দিচ্ছ না : কেননা প্রথমে তুমি সত্যিই নিশ্চিন্ত হয়েছ যে তোমার জীবনের দিগন্তে এক নতুন দিন দেখা দিয়েছে, তুমি শুভত্বের অসাধারণ অনুভূতির অভিজ্ঞতা পাচ্ছ ; মনে হচ্ছে তুমি আত্মার চমৎকার ভারহীনতা উপভোগ করছ । কিন্তু তুমি উঠে নিজের পায়ে দাঁড়াবার আগেই নেশার একটা ভুলে যাওয়া টুকরো তোমাকে অনুসরণ করে পেছনে টেনে নিচ্ছে ; এটা তোমার সাম্প্রতিক ক্রীতদাসত্বের নিশানচিহ্ণ । তোমার দুর্বল পা তোমাকে সাবধান করে দেবে, আর তুমি প্রতিমুহুর্তে ভেঙে টুকরো হবার ভয়ে আতঙ্কিত হবে, যেন তুমি পোর্সিলিন দিয়ে গড়া । এক বিস্ময়কর অবসাদের স্নিগ্ধতা — এমন অনেকে আছেন যাঁরা ভান করেন যে এতে চারুতার অভাব নেই — তোমার আত্মাকে দখল করে, আর ছড়িয়ে পড়ে তোমার কর্মক্ষমতা জুড়ে, যেমনভাবে কুয়াশা ছড়িয়ে পড়ে কোনও তৃণভূমিতে । তাহলে, তুমি মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য, সেখানে আটক, কাজ করতে অক্ষম, ক্রিয়াহীন আর তেজোময়তা-বর্জিত । এটা অপবিত্র অপব্যয়িতার শাস্তি ; তুমি তোমার স্নায়বিক তেজ খুইয়েছো । তুমি তোমার ব্যক্তিত্বকে স্বর্গের চারটি বাতাসে উড়িয়ে দিয়েছো — আর এখন, কীই বা হবে আবার কষ্ট করে তাতে নিবিষ্ট হয়ে !

 

চতুর্থ অধ্যায়

মানবেশ্বর

বালকসুলম মাথার ধোঁয়া থেকে জন্মানো  এই সমস্ত ভোজবাজি, বড়ো-বড়ো পুতুলনাচ এখন একপাশে সরিয়ে রাখার সময় এসেছে। আমাদের কি আরও গুরুতর ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে হবে না — লোকজনের মতামতের পরিবর্তন, এবং, এক কথায়, হ্যাশিসের নিয়মনিষ্ঠা সম্পর্কে?

 

এখন পর্যন্ত আমি নেশা সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন দিয়েছি ; আমি সীমাবদ্ধ থেকেছি নেশার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর লক্ষণ নিয়ে । কিন্তু যা গুরুত্বপূর্ণ, আমার মনে হয়, আধ্যাত্মিক মানসিকতার মানুষের জন্য, মানুষের যে অংশটা আধ্যাত্মিক তার ওপর এই বিষের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে পরিচয় ; অর্থাৎ, তার অভ্যাসগত ভাবপ্রবণতা এবং তার নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর বৃদ্ধি, বিকৃতি ও অতিরঞ্জন, যা তাদের উপস্হাপন করে, বিরল আবহে, তাদের একটি সত্যকার প্রতিসরণ ।

 

যে লোকটা দীর্ঘকালের জন্য নিজেকে আফিম বা হ্যাশিসের নেশায় ছেড়ে দেবার পর, হয়ে উঠেছে, অভ্যাসের দাসত্বের দরুণ দুর্বল, তাকে পেতে হবে বাঁধন কেটে বেরোনোর কর্মশক্তি, তাকে আমার মনে হয় ফেরারি কয়েদির মতন । লোকটা আমাকে তার প্রতি অনুরক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে, বিশেষ করে সেই সাবধানী লোকগুলোর তুলনায় যারা কখনও অধঃপতিত হয়নি, সব সময় প্রলোভন এড়াতে যত্নশীল থেকেছে । ইংরেজরা, আফিমখোরদের বিষয়ে আলোচনার সময়ে, প্রায়ই এমন সমস্ত শব্দ ব্যবহার করে যেগুলো অত্যন্ত কঠোর মনে হবে সেই সমস্ত নিরীহ লোকেদের কাছে যারা অধঃপতনের আতঙ্ক সম্পর্কে কিছুই জানে না — ‘শৃঙ্খলিত’,

‘পায়ে বেড়ি পরানো’, ‘ক্রীতদাসত্ব’ ইত্যাদি । শৃঙ্খল, সত্যি বলতে, এর সঙ্গে যদি তুলনা করতে হয়, কর্তব্যের শৃঙ্খলতা, বেপরোয়া প্রেমের শৃঙ্খল — মাকড়সার লুতাতন্তু কিংবা পাতলা কাপড়ের বুনানি ছাড়া আর কিছুই নয় ।

 

মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের অপপ্রীতিকর বিয়ে ! “আফিমের খাঁচায় আমি কয়েদি ক্রীতদাস হয়ে গিয়েছিলুম, আর আমার শ্রম ও আমার ব্যবস্হা স্বপ্নের রঙে রাঙিয়ে উঠেছিল”, লিজিয়ার স্বামী বলেছিল । কিন্তু কতোগুলো বিস্ময়কর অনুচ্ছেদে এডগার পো, এই অতুলনীয় কবি, এই দার্শনিক যাঁর বিরোধিতা করা হয়নি, যাঁর উদ্ধৃতি, যখনই আত্মার রহস্যময় গোলমালের প্রসঙ্গ উঠবে, দেয়া জরুরি, আফিমের অন্ধকার আর আঁকড়ে-ধরা উজ্বল দীপ্তির কথা বর্ণনা করে গেছেন ! আলোকময়ী বেরেনিসের প্রেমিক ইগোয়াস, অধিবিদ্যায় পণ্ডিত মানুষ, নিজের মৌলিক মানসিক শক্তির পরিবর্তনের কথা বলেন, যা তাঁকে মামুলি ঘটনারও অস্বাভাবিক ও দানবিক মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে ।

 

“দীর্ঘ ক্লান্তিহীন সময় গভীর চিন্তায় মগ্ন থেকে, কোনো বইয়ের মার্জিন অথবা হরফের অপ্রয়োজনীয়  নকশায় আমার আগ্রহ কেন্দ্রিত ; গ্রীষ্ম-দিনের বেশিক্ষণ সময়, মেঝের ওপরে কিংবা দেয়াল-ঢাকা পর্দায় মিহি বেঁকে-থাকা ছায়ায় ডুবে থাকা ; সারা রাতের জন্য আমার নিজেকে হারিয়ে ফেলা, বাতির শিখার  কিংবা আগুনের স্ফূলিঙ্গের দিকে একঠায় তাকিয়ে থাকা ; সারাদিন ফুলের সুগন্ধে স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকা ; কোনো প্রচলিত শব্দকে একঘেয়ে বারবার বলে, যতক্ষণ না শব্দ, প্রতিবার বলার কারণে, মনের ভেতরের কোনো ধারণাকে অর্থহীন করে দিচ্ছে ততোক্ষন ; গতিবিধির সমস্ত ধারণা কিংবা দৈহিক অস্তিত্বের সংবেদন  হারিয়ে ফেলা, শরীরের চরম নিশ্চলতায় দীর্ঘক্ষণ ও একগুঁয়েভাবে যত্নশীল হওয়া : এগুলোই ছিল কয়েকটা সাধারণ আর ন্যূনতম ক্ষতিকারক অস্পষ্টতা, যা মানসিক ক্ষমতার এক বিশেষ অবস্হার ফলে প্রণোদিত, যদিও একেবারে নিরুপম নয়, কিন্তু তা নিঃসন্দেহে বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যা করার চেষ্টার প্রতি দৃঢ় অবজ্ঞা ।”

 

এবং স্নায়ুচাপে পীড়িত অগাস্টাস বেদলো, যিনি প্রতিদিন সকালে হাঁটতে যাবার আগে নিজের আফিমের খোরাক খেয়ে বেরোন, বলেছেন যে এই দৈনিক বিষপান থেকে তিনি যে অন্যতম পুরস্কার পেয়েছেন তা হল মহাআগ্রহে সমস্তকিছুকে নিজের অন্তরে নিয়ে নেওয়া, এমনকি অত্যন্ত মামুলি ব্যাপারও ।

 

“ইতিমধ্যে মরফিন তার পরিচিত প্রভাব আরম্ভ করে দিয়েছিল — তা হল বহির্জগতকে তীব্র আগ্রহে আত্মস্হ  করা । কোনো পাতার কাঁপুনি — ঘাসের শিসের রঙে — ছাতিম পাতার আকারে — একটা মৌমাছির গুঞ্জনে — এক ফোঁটা শিশিরের আলোকণায় — বাতাসের শ্বাসে — বনানী থেকে আসা মৃদু গন্ধগুলোতে — নিয়ে এলো সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের ইশারা — উচ্ছসিত এবং শৃঙ্খলাহীন চিন্তার এক আনন্দময় ও চিত্রবিচিত্র সারি ।”

 

এই ভাবেই নিজেকে ব্যক্ত করেছেন, কাঠপুতুলদের মুখ দিয়ে, ভয়ঙ্করতার গুরু, রহস্যের রাজকুমার । আফিমের এই দুটি বৈশিষ্ট্য হ্যাশিসের ক্ষেত্রে হুবহু প্রযোজ্য । একটির ক্ষেত্রে, যেমন অপরটির ক্ষেত্রে, বুদ্ধিমত্তা, যা আগে স্বাধীন ছিল, ক্রীতদাস হয়ে যায় ; কিন্তু ‘মহাকাব্যিক’ শব্দটি, যা বাইরের জগতের  প্ররোচিত ও নির্দেশিত চিন্তার ধারাপ্রবাহ ও পরিবেশের দুর্ঘটনা দ্বারা সুন্দরভাবে সংজ্ঞায়িত, বলতে গেলে সত্য এবং হ্যাশিসের নেশার ক্ষেত্রে আরও বেশি করাল । এক্ষেত্রে যুক্তিবোধের ক্ষমতা কেবল ঢেউয়ের মতন, প্রবাহের দয়ার ওপর নির্ভরশীল এবং চিন্তার শৃঙ্খলা অনেক গতিবেগসম্পন্ন ও বেশি ‘মহাকাব্যিক’; অর্থাৎ, স্পষ্ট করে আমি বলতে চাই যে হ্যাশিস, তার তাৎক্ষণিক ক্রিয়ায়, আফিমের থেকে অনেক বেশি অনুভূতি উৎপন্নকারী, রোজকার জীবনযাপনে বড়োই প্রতিকূল ; এক কথায়, বিপর্যস্তকারী । আমি জানি না টানা দশ বছর হ্যাশিসের নেশা টানা দশ বছর আফিমের নেশার সমান অসুখগুলো সঙ্গে আনবে কিনা ; আমি বলতে চাইছি, খানিক সময়ের জন্য, সেবনের পরের দিনের জন্য, হ্যাশিসের ফলাফল মারাত্মক হয় । একটা হলো মিঠে কথার মায়াবিনী ; অন্যটা তেড়ে আসা রাক্ষস ।

 

এই শেষ পর্বে আমি সংজ্ঞায়িত ও বিশ্লেষণ করতে চাই এই বিপজ্জনক এবং সুস্বাদু অভ্যাসের কারণে যে নৈতিক সর্বনাশ ঘটে সেই সব কথা ; এই সর্বনাশ এতো ব্যাপক, এক বিপদ যা প্রগাঢ়, যে যারা এর সঙ্গে লড়ে ফিরেছে কিন্তু যৎসামান্য আহত, তাদের দেখে আমার মনে হয় সেই নায়কেরা যারা প্রোটিয়াসের বহুরুপী গুহা থেকে পালাতে পেরেছে, কিংবা অরফিয়াসের মতন, নরকের বিজেতা । তুমি চাইলে, মনে করতে পারো, এই ধরণের ভাষা বাড়িয়ে বলা রূপক, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আমি জোর দিয়ে বলব যে এই উত্তেজক বিষগুলোকে আমার মনে হয় কেবল এক রকমের ভয়ঙ্কর এবং নিশ্চিত উপায় নয় যা অন্ধকারের মায়াপুরুষ বরবাদ মানবদের বন্দি করার জন্য প্রয়োগ করে, বরং তার নিখুঁত অবতারদের অন্যতম ।

 

এবার, আমার কাজ কমিয়ে এনে বিশ্লেষণকে স্পষ্ট করার খাতিরে, ছড়ানো-ছেটানো গল্প সংগ্রহ করার পরিবর্তে, আমি পর্যবেক্ষণের প্রাচুর্যের মাঝে একটিমাত্র পুতুলকে পোশাক পরাবো। সেক্ষেত্রে আমাকে আবিষ্কার করতে হবে একটি আত্মা যা আমার উদ্দেশ্যের সঙ্গে খাপ খাবে । তাঁর ‘স্বীকৃতি’ বইতে ডি কুইনসি সঠিক বলেছিলেন যে আফিম, মানুষকে ঘুম পাড়াবার বদলে, তাকে উত্তেজিত করে ; কিন্তু তাকে তার স্বাভাবিক পথে উত্তেজিত করে, তাই আফিমের বিস্ময়গুলোকে বিচার করার জন্য কোনো বলদ বিক্রেতার ওপরে তা চেষ্টা করা বাতুলতা হবে, কেননা সেরকম এক স্বপ্ন হবে গবাদি পশুর আর ঘাসের । আমি একজন হ্যাশিসের নেশাগ্রস্ত গরুমোষ প্রজননকারীর জগদ্দল কল্পনা বর্ণনা করতে যাচ্ছি না । কেই বা তা আনন্দে পড়বে, কিংবা পড়বার অনুমতি দেবে ? আমার বিষয়কে আদর্শ হিসাবে উপস্হাপনের জন্য আমাকে যাবতীয় রশ্মিকে একটিমাত্র বৃত্তে কেন্দ্রিত করে সমবর্তিত করতে হবে ; আর যে বিয়োগান্তক বৃত্তে আমি তাদের জড়ো করব তা হলো, যেমন আগেই বলেছি, আমার নিজের পছন্দের একজন মানুষ ; অনেকটা আঠারো শতকে যাকে বলা হতো ‘সংবেদনশীল মানুষ’ ( homme sensible ), যাকে রোমান্টিক গোষ্ঠি নাম দিয়েছিল ‘ভুল বোঝা মানুষ’ ( homme incompris ), আর গৃহস্হ ও বুর্জোয়ারা সাধারণত বলত “মৌলিক।” এই ধরণের নেশায় মাতাল হবার জন্য অনুকূল হলো অর্ধেক স্নায়ুচাপে পীড়িত, অর্ধেক খিটখিটে মনগঠন । এর সঙ্গে যোগ করা যাক এক শিক্ষিত মন, আদরা আর রঙের সাথে পরিচিত, একটি কোমল হৃদয়, দুর্ভাগ্যের দরুন বিষাদগ্রস্ত, কিন্তু তবু আবার যুবক করে তোলা যেতে পারে তাকে ; তোমরা অনুমতি দিলে, আমরা বিগতকালের ভুলগুলো স্বীকার করে নেবো, এবং, এর দরুন  সহজে উত্তেজিত হয় এমন, ইতিবাচক পশ্চাত্তাপ যদি নাও হয়, অন্তত বাজেভাবে খরচ করে ফেলা ও সীমালঙ্ঘিত সময়ের কারণে অনুতাপ করবে।

অধিবিদ্যায় আগ্রহ, মানব নিয়তি সম্পর্কিত দর্শনের বিভিন্ন ধরনের অনুমানের সঙ্গে পরিচয়, নিঃসন্দেহে অপ্রয়োজনীয় শর্ত হবে না ; এবং, তাছাড়া, সততাকে গ্রহণ করা, বিমূর্ত সততাকে, সামাজিক হোক বা নিগূঢ়, যা তাবৎ বইতে রচিত যার ওপর নির্ভর করে আধুনিক বালখিল্য, যার যাকে মনে করা হয় লক্ষে পৌঁছোবার জন্য আত্মার  সর্বোচ্চ শিখর । এই সমস্তের সঙ্গে যদি যোগ করা হয় ইন্দ্রিয়ের পরিশোধন — আর আমি যদি এটা উল্লেখ করতে ভুলে গিয়ে থাকি তাহলে বুঝতে হবে আমি একে মনে করেছিলুম বাহুল্যপূর্ণ — আমি মনে করি যে আমি সাধারণ উপাদান সংগ্রহ করতে পেরেছি যা ‘সংবেদনশীল মানুষদের’ মধ্যে আখছার পাওয়া যায় এবং যাকে বলা যেতে পারে মৌলিকতার সর্বনিম্ন পরিমাপ । এবার দেখা যাক এই ব্যক্তিতার কী ঘটবে যদি তাকে হ্যাশিসের চূড়ান্ত নেশায় ফুসলিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় । মানুষের কল্পনার শেষ এবং অতীব চমৎকার পান্হশালা পর্যন্ত এর ক্রমবৃদ্ধি অনুসরণ করা যাক ; ব্যক্তিটির নিজের দিব্যতায় বিশ্বাসের সীমা পর্যন্ত যাওয়া যাক ।

 

যদি তুমি এইরকম এক আত্মা হও আদরা এবং রঙ সম্পর্কে তোমার স্বভাবগত ভালোবাসা শুরু থেকেই তোমার প্রাথমিক স্তরের নেশায় পাবে বিশাল এক ভোজসভা । রঙগুলো অপরিচিত তেজোময়তায় আক্রান্ত হবে আর তোমার মস্তিষ্কের ভেতরে বিজয়ের  কেতন উড়িয়ে পরস্পরকে আচ্ছন্ন করবে । তারা সূক্ষ্ম, মামুলি, কিংবা খারাপ হলেও, ছাদে আঁকা ছবিগুলো প্রাণশক্তির পোশাক পরে অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে উঠবে । পান্হশালার দেয়ালগুলোয় যে খসখসে কাগজ সাঁটা তা অসাধারণ পরিদৃশ্যের মতন নিজেদের মেলে ধরবে । ঝিকমিকে মাংসল পরিরা আকাশ ও সাগরের চেয়ে গভীর ও অনাবিল আয়ত চোখে তোমার দিকে তাকাবে । বহু-প্রাচীন চরিত্রেরা, যাজক কিংবা সেনার পোশাকে, একটিমাত্র চাউনি মেলে, তোমার সঙ্গে গোপন কথাবার্তা আদান-প্রদান করবে । সর্পিল রেখেগুলো নিঃসন্দেহে বোধগম্য একটি ভাষা যেখানে তুমি পড়তে পারবে তাদের আত্মার দুঃখ ও আবেগ । তা সত্তেও, এক রহস্যময় অথচ সাময়িক মানসিক স্হিতি আপনা থেকে গড়ে উঠবে ; জীবনের নিগূঢ়তা, বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত, দৃষ্টির সামনে সুস্পষ্ট উদয় হবে, তা যতোই স্বাভাবিক ও মামুলি হোক না কেন, চোখের সামনেই রয়ে যাবে ; যে বস্তুগুলো প্রথমে দেখা দেবে সেগুলো বার্তাবহ প্রতীক । ফুরিয়ার এবং সোয়েডেনবোর্গ, প্রথমজন তাঁর উপমান দিয়ে, এবং দ্বিতীয়জন সংগতি দিয়ে, তোমার চোখের সামনে যাকিছু ভেষজ ও জান্তব দেখা যায়, তাতে নিজেদের মূর্ত করেছেন, এবং কন্ঠস্বরের দ্বারা স্পর্শের পরিবর্তে তাঁরা তোমাকে আঙ্গিক ও রঙে উদ্বুদ্ধ করেন । এই রূপকের বোধ তোমার অন্তরে যে অনুপাত সৃষ্টি করে তা তুমি নিজেই জানো না। প্রসঙ্গক্রমে আমরা বলব যে রূপক, শিল্পের এতো আধ্যাত্মিক অংশ, চিত্রকরদের আনাড়িপনার ফলে যাকে আমরা হেয় জ্ঞান করতে অভ্যস্ত, অথচ যা সত্যিই কবিতার সবচেয়ে স্বাভাবিক ও আদিম আঙ্গিক, তার দৈব অধিকার ফিরে পায় নেশার দ্বারা আলোকিত বুদ্ধিমত্তায়। তখন হ্যাশিস ছড়িয়ে জীবনের সর্বত্র ; বলা যায়, ম্যাজিক পালিশের মতন । তার অসামান্যতা আলোকিত হয় রঙের সুশীল আবছায়ায় ; অসমতল উপত্যকা, ধাবমান দিগন্ত, শহরগুলোর পরিপ্রেক্ষণ যা শাদা হয়ে উঠেছে ঝড়ের শবানুগ বিবর্ণতায় কিংবা সূর্যাস্তের কেন্দ্রিত ব্যকুলতায় উজ্বল ; শূন্য-পরিসরের রসাতল, সময়ের অতলের রূপক ; নৃত্য, অভিনেতাদের অঙ্গভঙ্গী অথবা সংলাপ, যদি তোমি নাট্যালয়ে থাকো ; তোমার চোখ যদি কোনো বইতে পড়ে তাহলে প্রথম প্রবাদ ; এক কথায়, সমস্তকিছু ; অস্তিত্বের বিশ্বজনীনতা নতুন গৌরব নিয়ে তোমার সামনে এসে দাঁড়ায় যা ততোক্ষণ পর্যন্ত ছিল অজানিত । ব্যাকরণ, শুকনো ব্যাকরণ নিজেই, হয়ে দাঁড়ায় “আহ্বানের অশুদ্ধ নাম”-এর বই । শব্দেরা আবার উঠে দাঁড়ায়, মাংস ও হাড়ের পোশাকে ; বিশেষ্য, তার অটল মহিমায় ; রঙ আর ঝিলমিলে জালে মোড়া বিশেষণদের স্বচ্ছ আলখাল্লা ; এবং ক্রিয়াপদ, গতির প্রধান দেবদূত যা বাক্যটিকে দোল খাওয়ানো আরম্ভ করে।

সঙ্গীত, অলসদের কিংবা জ্ঞানী আত্মাদের প্রিয় ভাষা, যারা তাদের কাজ-কারবারকে বদলে-বদলে জিরিয়ে নিতে চায়, তোমাকে তোমার কথাই বলে, তোমার জীবনের কবিতা আবৃত্তি করে শোনায় ; তা তোমার অন্তরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে, এবং তুমি তাতে মুর্ছিত হয়ে পড়ো । এ তোমার কামনার কথা বলে, কেবল অস্পষ্ট, অসংজ্ঞায়িত উপায়ে নয়, যেমনটা অপেরায় তোমার অমনযোগী সন্ধ্যায় করে, কিন্তু বেশ সারগর্ভ ও  ইতিবাচকভাবে, প্রতিটি ঝঙ্কার একটি চলনকে চিহ্ণিত করে যাকে তোমার আত্মা চেনে, স্বরলিপির প্রতিটি স্বর পরিবর্তিত হয়ে যায় শব্দে, এবং সম্পূর্ণ কবিতাটি তোমার মস্তিষ্কে প্রবেশ করে যেন একটা প্রাণপ্রাপ্ত অভিধান ।

 

এটা অনুমান করা উচিত হবে না যে এই ব্যাপারগুলো একে অপরের ওপরে উদ্দীপনায় তড়িঘড়ি পড়ে যায়, বাস্তবতার কলরবপূর্ণ স্বরাঘাত ও বহির্জীবনের বিশৃঙ্খলাসহ ; অন্তরজগতের চোখ সমস্তকিছুকে পরিবর্তিত করে, এবং সবাইকে সৌন্দর্যের অভিনন্দন জানায় যা এর নিজের নেই, যাতে সত্যকার আনন্দের যোগ্যতাসম্পন্ন হয় । এই জরুরি ইন্দ্রিয়জ ও সংবেদনের পর্বের সঙ্গে তুলনীয় অনাবিল জলের প্রেম, স্হির বা স্রোতোময়, যা আশ্চর্যজনকভাবে কোনো কোনো শিল্পীর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের নেশায় অভিব্যক্ত হয় । আয়না হয়ে উঠেছে এই স্বপ্নবিহ্বলতার অজুহাত, যা অনেকটা গলায় শুকিয়ে যাওয়া আত্মার তৃষ্ণা ও দেহের তৃষ্ণার মিশেল, এবং যে বিষয়ে আমি আগেই বলেছি । বইতে থাকা জল, খেলতে থাকা জল; সঙ্গীতময় ঝর্ণা ; সমুদ্রের অপার নীল ; সবই বর্ণনার অতীত গড়িয়ে যায়, গান গায়, লাফায়। মোহিনীর মতন দুই বাহু এগিয়ে দ্যায় জল ; এবং যদিও আমি হ্যাশিস-সৃষ্ট উন্মাদ হইচইতে বিশ্বাস করি না, আমি জোর দিয়ে বলতে চাই না যে শূন্য-পরিসর ও স্ফটিকে আকর্যিত মানুষের পক্ষে কিঞ্চিদধিক অনাবিল আবর্তের অনুশীলন একেবারেই বিপজ্জনক হবে না, আর  উনদাইন জলপরীর গল্পটা যে উৎসাহীদের জীবনে বিয়োগান্তক হবে না তাও নিশ্চয় করে বলতে পারি না ।

 

আমার মনে হয় শূন্য-পরিসর এবং সময়ের বিশাল বৃদ্ধি সম্পর্কে আমি যথেষ্ট বলেছি ; দুটি ধারণা সবসময় মিশ খেয়েছে, সবসময় একে আরেকের সঙ্গে বোনা, কিন্তু  সেই সময়ে আত্মা বিষাদ ও ভয়ের মুখোমুখি হয় না । তা বিশেষ বিষণ্ণ আহ্লাদ নিয়ে বহু বছরের ওপারে তাকিয়ে থাকে, এবং অত্যন্ত সাহসিকতায় অনন্তকালীন পরিপ্রেক্ষণে ডুব দ্যায় । তুমি নিশ্চয়ই ভালো করে বুঝতে পেরেছো, আশা করি, যে এই বিকৃত ও স্বৈরাচারী বাড়বাড়ন্ত যাবতীয় সংবেদন এবং ধারণার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য । আমি মনে করি, আমি তুলে ধরতে পেরেছি হিতৈষিতার যথেষ্ট ন্যায্য উদাহরণ । ভালোবাসার ব্যাপারেও এটা সত্য । আমি যেরকম আত্মিক মেজাজের উদ্ভাবন ঘটিয়েছি, সৌন্দর্যের ধারণা স্বাভাবিকভাবেই তাতে বিশাল একটা পরিসরের দখল নিয়ে নেবে । ঐকতান, পংক্তির ভারসাম্য, গতির সূক্ষ্ম সুরপ্রবাহ, যে স্বপ্ন দেখছে তার কাছে দেখা দ্যায় প্রয়োজনীয় হিসাবে, কর্তব্য হিসাবে, কেবল সৃষ্টির তাবৎ অস্তিত্বের জন্য নয়, কিন্তু তার নিজের জন্যও, যে স্বপ্ন দেখছে, যে এই সঙ্কটের সময়ে নিজের মধ্যে আবিষ্কার করে অমর এবং সর্বজনীন ছন্দের এক চমৎকার প্রবণতা । এবং যদি আমাদের গোঁড়া লোকটির ব্যক্তিগত সৌন্দর্যের অভাব থাকে, তাহলে সে মনে করবে যে  সে দীর্ঘ সময় যাবত যে দোষ করেছে তা স্বীকার করতে অপারগ, কিংবা নিজেকে মনে করবে যে তার কল্পনায় গড়া জগতের ঐকতানে ও সৌন্দর্যে সে একটি বেসুরো কন্ঠস্বর । চরস সম্পর্কিত কুতর্ক অসংখ্য ও প্রশংসনীয়, প্রথাগতভাবে ইতিবাচকতার দিকে তার ঝোঁক, এবং প্রধান ও প্রভাবশালী ব্যাপার হলো যে তা ইচ্ছাকে উপলব্ধিতে পালটে দিতে পারে । ব্যাপারটা একই, নিঃসন্দেহে, সাধারণ জীবনের বহু ক্ষেত্রে ; কিন্তু এখানে আরও কতো আকুলতা ও তনিমার প্রয়োজন হচ্ছে ! নয়তো, কেমন করেই বা একজন মানুষ যে ঐকতান হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম, যেন সে সৌন্দর্যের যাজক, কেমন করেই বা সে তার নিজেরই তত্বের কলঙ্ক হতে পারে, ব্যতিক্রম হতে পারে ? নৈতিক সৌন্দর্য ও তার ক্ষমতা, গরিমা ও ফুসলিয়ে নেবার গুণ, বাগ্মীতা এবং তার কৃতিত্ব, এই সবকয়টি ধারণা শীঘ্রই নিজেদের উপস্হিত করে যাতে চিন্তাহীন কদর্যতাকে শুধরে নেয়া যায় ; তারপর তারা উদয় হয় সান্ত্বনাদানকারী হিসাবে, এবং সব শেষে এক কাল্পনিক দরবারের যুৎসই সভাসদ, মোসাহেব হিসাবে ।

 

ভালোবাসার বিষয়ে, আমি অনেকের কাছে স্কুল-বালকসুলভ কৌতূহলের কথা শুনেছি, যারা হ্যাশিসের প্রয়োগের সঙ্গে পরিচিত তাদের কাছ থেকে তথ্য যোগাড় করছে, যা কিনা ভালোবাসার নেশা নয়, নিজের স্বাভাবিক স্হিতিতে এতো ক্ষমতাসম্পন্ন, যখন তা অপর নেশাটিতে আবদ্ধ ; সূর্যের ভেতরে এক সূর্য । আমি যাদের বলি বৌদ্ধিক হাঁ-করা, সেই শ্রেনির লোকের মনে এরকম প্রশ্ন জাগে । যে প্রশ্নের লজ্জাজনক অর্ধেক-অর্থের উত্তর খোলাখুলি আলোচনা করা যায় না, আমি পাঠককে বলব প্লিনি পড়তে, যিনি কোথাও গাঁজাপাতার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এমনভাবে বলেছেন যে যাতে বিষয়টা নিয়ে বিভ্রমের ঘোর কেটে যায় । তাছাড়া লোকে জানে, যে সমস্ত মাদক তাদের উত্তেজিত করে তা সেবন করলে কন্ঠস্বরের ক্ষয় হলো নেশার সবচেয়ে সাধারণ প্রতিফল যা মানুষ তাদের স্নায়ুর ক্ষেত্রে ঘটায় । এখন, যখন আমরা প্রভাবশীল গুণের বিষয়ে আলোচনা করছি, গতি আর গ্রাহীক্ষমতা, আমি পাঠককে শুধুমাত্র ভেবে দেখতে বলব যে হ্যাশিসের নেশাগ্রস্ত একজন সংবেদনশীল মানুষের কল্পনাকে

চূড়ান্ত স্তরে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে টের পাওয়া তেমনই সহজ যেমন ঝড়েতে বাতাসের গতির তীব্রতা, আর তার ইন্দ্রিয়গুলো এমনই এক বিন্দুতে নিগূঢ়, যাকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন । অতএব এটা বিশ্বাস করা যুক্তিযুক্ত যে আলতো আদর, যতোটা নিষ্পাপ হতে পারে, হ্যাণ্ডশেক, উদাহরণস্বরূপ, আত্মার ও সৌন্দর্যের প্রকৃত স্হিতিকে একশোগুণ ধরে রাখতে পারে, আর হয়তো তাদের পরিচালিত করতে পারে, এবং তাও বেশ দ্রুত, সেই সাময়িক সংজ্ঞাহীনতা পর্যন্ত যাকে আনাড়ি নশ্বররা মনে করে আনন্দের সমাপ্তি ( summum );কিন্তু এটা সংশয়াতীত যে হ্যাশিস জেগে ওঠে এমনই এক কল্পনায় যা নিজেকে কোমল স্মৃতিতে পরিব্যপ্ত করতে অভ্যস্ত, যে অবস্হায় ব্যথা ও আনন্দহীনতা নতুন জেল্লা পায় । মনের এই ধরনের মন্হনক্রিয়ায় এটা কম নিশ্চিত নয় যে তাতে রয়েছে কামনার তীব্র উপাদান ; এবং তাছাড়া, এখানে মন্তব্য করা জরুরি — আর হ্যাশিসের অনৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য এই তর্ক যথেষ্ট বলে মনে হয় — ইশমায়েলাইটদের ( ইশমায়েলাইটদের থেকেই অ্যাসাসিন বা গুপ্তঘাতকদের উৎপত্তি ) একটা একটা উপদল হ্যাশিসের অভিবন্দনা এমন স্তরে নিয়ে গিয়েছিল যে তারা লিঙ্গ-যোনি থেকে বহুদূরে চলে গিয়েছিল ; অর্থাৎ, লিঙ্গের চরম অর্চনায়, নারীপ্রতীকের অর্ধাংশকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে । কিছুই অস্বাভাবিক নয়, প্রতিটি মানুষ যেহেতু ইতিহাসের প্রতীকি প্রতিনিধি, কোনো অশ্লীল বৈধর্ম্য দেখতে পেয়ে, এক দানবিক ধর্ম, মনের মধ্যে জাগ্রত হয় যা ভীরুতার সঙ্গে নারকীয় এক মাদকের দয়ায় আত্মসমপহণ করেছে এবং যা নিজের মৌলিক মানসিক শক্তির অবক্ষয় নিয়ে হাসাহাসি করে ।

 

যেহেতু হ্যাশিসের নেশায় আমরা প্রত্যক্ষ করেছি মানুষের প্রতি অদ্ভুত সদিচ্ছা, এমনকি অচেনা লোকের প্রতিও, লোকহিতৈষণার একটি প্রজাতি যা ভালোবাসার বদলে পরদুঃখকাতরতায় গড়া ( আর এখানেই শয়তানি আত্মার প্রথম বীজ যা পরবর্তীকালে অসাধারণভাবে বিকশিত হবে তা দেখা দেয় ), কিন্তু যা অন্য কাউকে যন্ত্রণা দেবার ভীতি পর্যন্ত এগোয়, যে কেউ অনুমান করতে পারে যে যা ভালোবাসার পাত্রের ক্ষেত্রে স্হানিক ভাবপ্রবণতা হয়ে দেখা দ্যায়, কিংবা দিয়েছে, হইচইকারীর নৈতিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূজা, অর্চনা, প্রার্থনা, আনন্দের স্বপ্ন, ছিটকে বেরোয় এবং অস্পষ্ট তেজোময়তায় ও অত্যুৎসারিতায় রকেটের মতন উৎসারিত হয় । আতশবাজির মশলা আর রঙবস্তুর মতন, তারা ঝিকমিক করে অন্ধকারে বিলীন হয়ে যায় । এমন কোনোরকম সংবেদনশীল সমন্বয় নেই যাতে হ্যাশিস-গোলামের সূক্ষ্ম ভালোবাসা নিজেকে উপুড় করে দেবে না । রক্ষা করার ইচ্ছা, পিতৃত্বের আকুল ও একনিষ্ঠ অনুভূতি মিশে যেতে পারে অপরাধমূলক কামনার সঙ্গে যা হ্যাশিস সদাসর্বদা জানবে কেমন করে মাফ করে দিতে হয় এবং পাপমুক্ত করতে হয় । ব্যাপারটা আরও প্রসারিত হয় । আমার মনে হয়, অতীতের ভুলগুলো আত্মায় তিক্ত পথচিহ্ণ রেখে যায়, একজন স্বামী অথবা একজন প্রেমিকা স্বাভাবিক পরিস্হিতিতে বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে তার ঝঞ্ঝাময় অতীতের মেঘে ছায়া দিনগুলোর কথা ভাববে ; এই তিক্ত ফলগুলো, হ্যাশিসের নেশাগ্রস্ত থাকার সময়ে, মিষ্টি ফল হয়ে উঠতে পারে । ক্ষমা করে দেবার প্রয়োজন কল্পনাকে আরও চতুর ও আরও মিনতিপূর্ণ করে তোলে, এবং অনুশোচনা স্বয়ং, এই শয়তানি নাটকে, যা নিজেকে দীর্ঘ স্বগতসংলাপে প্রকাশ করে, হৃদয়ের উৎসাহকে প্রাচুর্যে ভরিয়ে প্ররোচিত করতে পারে । হ্যাঁ, অনুশোচনা । সত্যকার দার্শনিক মনে হ্যাশিস নিখুঁত শয়তানি যন্ত্রের মতো মনে হয়, এই কথাটা আমি কি ভুল বলেছিলুম ? অনুশোচনা, আহ্লাদের একমাত্র উপাদান, দ্রুত চাপা পড়ে যায় অনুশোচনার সুস্বাদু প্রত্যাশায় ; এক ধরণের ইন্দ্রিয়পরায়ণ বিশ্লেষণে ; এবং এই বিশ্লেষণ এতো তাৎক্ষনিক যে মানুষ, এই প্রাকৃতিক শয়তান, সোয়েডেনবোর্গের অনুসরণকারীরা যেমন বলেন, বুঝতে পারে না এটা কতো অনৈচ্ছিক, আর কেমন করে, মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে, সে শয়তানের পরিপূর্ণতা লাভ করে । সে তার অনুশোচনাকে প্রশংসা করে, আর নিজেকে করে গৌরবান্বিত, এমনকি যখন সে তার স্বাধীনতা খোয়াতে চলেছে।

 

তাহলে, আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমার কাল্পনিক মানুষটাকে, যে মন আমি বেছে নিয়েছি, আহ্লাদ এবং প্রশান্তির সেই স্তরে পৌঁছেচে যেখানে সে নিজেকে প্রশংসা করতে বাধ্য । প্রতিটি পরস্পরবিরোধিতা নিজেদের মুছে ফ্যালে ; যাবতীয় দার্শনিক সমস্যা স্পষ্ট হয়ে যায়, অন্তত সেটাই মনে হয় ; আনন্দের জন্য সমস্তকিছুই বস্তুগত ; জীবনের যে প্রাচুর্য সে উপভোগ করে তাকে গর্বান্বিত বোধ করতে উৎসাহ যোগায় ; একটা কন্ঠস্বর তার সঙ্গে কথা বলে ( হায়, তার নিজেরই কন্ঠস্বর ! ) যা তাকে বলে : “এখন তোমার অধিকার জন্মেছে নিজেকে সমস্ত মানুষের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করার । কেউ তোমাকে চেনে না, তুমি যা চিন্তা করো ও যা অনুভব করো তা কেউ বুঝতে পারবে না ; তারা, নিঃসন্দেহে, তোমার অন্তরে জাগরিত কামনাসিক্ত ভালোবাসাকে সমাদর করতে পারবে না । পথচারীর কাছে তুমি অপরিচিত মহারাজা ; যে মহারাজা জীবিত, কিন্তু কেউই টের পায় না সে নিজেই নিজের মহারাজা । কিন্তু তোমার তাতে কীই বা আসে-যায় ? তোমার কি সার্বভৌম অবমাননা নেই, যা আত্মাকে দয়ালু করে তোলে ?”

 

তুমি হয়তো ভাববে, যে এক সময় থেকে আরেক সময়ে  কোনো তোমাকে স্মৃতি কামড়ে ধরবে আর আনন্দকে মাটি করে দেবে । বহির্জগতের কোনো অপছন্দের প্রসঙ্গ অতীতকে জাগিয়ে তোমার মেজাজ খারাপ করে দেবে । অতীতে কতোই বা বোকা আর ইতর কাজকর্ম রয়েছে ! — চিন্তার মহারাজার পক্ষে যা সত্যিই বেমানান, আর কার বর্মকে তারা নোংরা করে ? বিশ্বাস করো, হ্যাশিস-নেয়া লোকটি এই সমস্ত মানহানিকর ভুতপ্রেতকে সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করবে, এমনকি এই সমস্ত বিরক্তিকর স্মৃতি থেকে সে জানতে পারবে আনন্দ আর গর্বের নতুন উপাদান পাওয়া যায় ।

 

তার যুক্তিতর্কের উদ্ভব এই ভাবেই ঘটবে । ব্যথার প্রাথমিক সংবেদন ফুরিয়ে যাবার পর, সে কৌতূহলী হয়ে যাচাই করে দেখবে তার বর্তমান গৌরবকে কোন কোন স্মৃতি কষ্ট দিয়েছে ; কোন মানসিকতা অমন করে কাজ করতে প্ররোচিত করেছিল ; কোন পরিস্হিতি তাকে তখন ঘিরে রেখেছিল ; এবং সে যদি ঘটনাগুলোয় যথেষ্ট কারণ খুঁজে না পায়, দোষক্ষালনের জন্য না হলেও, অন্তত তার অপরাধবোধকে প্রশমিত করার খাতিরে, এটা মোটেই মনে করা উচিত নয় যে সে পরাজয় স্বীকার করেছে । আমি তার যুক্তিতর্কে উপস্হিত রয়েছি, যেমন করে স্বচ্ছ কাচের তলায় কোনো যন্ত্রের খেলা দেখা যায় । “এই হাস্যকর, ভীতু, কিংবা ইতর কাজ, যার স্মৃতি আমাকে এক মুহূর্তের জন্য বিপর্যস্ত করেছিল, তা আমার সত্যকার ও বাস্তব প্রকৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত, এবং যে তেজোময়তায় আমি তাকে ভর্ৎসনা করছি, যে বিচার-বিবেচনার সাহায্যে আমি তাকে বিশ্লেষণ আর জেরা করছি, প্রমাণ করে সততার জন্য আমার উত্তুঙ্গ ও দৈব আগ্রহ । মানবজগতে কতোজন বুদ্ধিমান মানুষই বা পারে নিজেদের বিচার করতে ; নিজেদের ভর্ৎসনা করার মতো যথেষ্ঠ কঠোর ?” এবং সে কেবল নিজেকে ভর্ৎসনাই করছে না, বরং নিজেকে গৌরবান্বিতও করছে ; ভয়ঙ্কর স্মৃতি আদর্শ সততার অভিপ্রায়ে, আদর্শ পরার্থিতা, আদর্শ প্রতিভায় অভিনিবিষ্ট হবার পর, সে নিজেকে ছেযে দ্যায় বিজয়ী আত্মিক স্ফূর্তিতে । আমরা তা লক্ষ করেছি, কলুষিতকারীদের  ধর্মসংস্কারের নকল তপস্যা, একই সঙ্গে কলুষিত করছে আর স্বীকৃতি দিচ্ছে, সে নিজেকে এক সহজ পাপমোচনে সোপর্দ করেছে ; কিংবা, আরও খারাপ, নিজের গর্ববোধের খোরাকের জন্য সে তার অভিপ্রায়ের আশ্রয় নিয়েছে । এখন, তার স্বপ্নের অন্তর্গত অভিপ্রায় এবং তার সততার পরিলেখ থেকে সে শেয পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারে যে সততার ব্যবহারিক দক্ষতা তার আছে ; যে প্রণয়োদ্দীপক তেজোময়তা দিয়ে সে এই সততার প্রেতকে প্রভাবিত করে তা থেকে তার মনে হয় তার কাছে যথেষ্ট ও সুনিশ্চিত প্রমাণ রয়েছে যে নিজের উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য তার আছে পুরুষোচিত বীর্যশক্তি । সে স্বপ্নকে কাজ দিয়ে পুরোপুরি বানচাল করে দ্যায়, আর তার কল্পনা, তার নিজের মোহিনী প্রদর্শনীর সামনে উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয়ে তার প্রকৃতিকে শুধরে দ্যায় আর আদর্শায়িত করে, নিজের কল্পনার প্রতিচ্ছবির জায়গায় স্হাপন করে তার সত্যকার ব্যক্তিত্ব, যা ইচ্ছাশক্তিতে দুর্বল, অহমিকায় ধনী, সে তার মহিমান্বয়নকে এই সুস্পষ্ট ও সরল ঘোষণা দিয়ে শেষ করে, যাতে রয়েছে তার জন্য ন্যক্কারজনক আহ্লাদের সমগ্র জগতসংসার :”আমি সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র।” এ-কথা কি তোমায় মনে করায় না ছোট্ট জাঁ-জাক-এর ব্যাপার, যে, সেও ব্রহ্মাণ্ডের কাছে স্বীকার করেছিল, আনন্দহীন নয়, সাহস দেখিয়েছিল বিজয়ের একই কান্নায় ( কিংবা তফাতটা যৎসামান্য ) একই আন্তরিকতা এবং একই প্রত্যয় নিয়ে ? যে উৎসাহ নিয়ে সে সততার প্রশংসা করেছিল, ভালো কাজ কিংবা ভালো কাজের চিন্তা, যা সে নিজে অর্জন করতে চেয়েছিল, যার দরুন স্নায়বিক আবেগে তার চোখ জলে ভরে উঠেছিল, তার যথেষ্ট ছিল নিজের নৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে বাড়িয়ে-চাড়িয়ে ধারণা গড়ার জন্য । হ্যাশিস ছাড়াই জাঁ-জাক নিজেকে নেশাগ্রস্ত করে ফেলেছিল ।

 

আমি কি এই বিজয়ী বাতিকের আরেকটু বিশ্লেষণ করব ? আমি কি ব্যাখ্যা করব কেমন করে, বিষটার প্রভাবে, আমার আলোচ্য লোকটা নিজেকে ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র করে ফেলেছে ? কেমন করে সে জীবন্ত আর উড়নচণ্ডী উদাহরণ হয়ে উঠেছে সেই প্রবাদের যা বলে যে কামনা চিরকাল সমস্তকিছু নিজের প্রসঙ্গে উল্লেখ করে ? সে নিজের সততা আর নিজের প্রতিভায় বিশ্বাস করে ; তুমি কি শেষটা আঁচ করতে পারছ না ? তাকে ঘিরে থাকা চারিপাশের বস্তুগুলো এতো বেশি পরামর্শমূলক যে সেগুলো তার অন্তরের চিন্তার জগতে আলোড়ন তোলে, আরও বেশি রঙ নিয়ে, বেশি জিবন্ত, আগের থেকে সূক্ষ্ম, ম্যাজিকের ঠাটঠমকে মোড়া । “এই বিশাল শহরগুলো”, সে নিজেকে বলে, “যেখনে অনন্য অট্টলিকাগুলো একটার ওপরে আরেকটা উঠে গেছে ; স্বদেশে ফেরার জন্য কাতর আলস্যে এই সুন্দর জাহাজগুলো পথের ধারের জলরাশিতে ভারসাম্য নিয়ে ভাসছে, আমাদের চিন্তাকে এইভাবে অনুবাদ করে, ‘কখন আমরা আনন্দের পাল তুলে ভাবো ? ; এই জাদুঘরগুলো সুন্দর প্রতিমা আর মোহক রঙে নেশা ধরায়; এই গ্রন্হাগারগুলো যেখানে রয়েছে বিজ্ঞানের বই আর কবিতার স্বপ্নের সংগ্রহ ; যন্ত্রপাতির এই সমাবেশ যাদের একটিই সঙ্গীত ; এই মোহিনী নারীরা, যাদের আরও সুন্দরী করে তুলেছে সাজসজ্জার বিজ্ঞান ও ভালোবাসার ভান : এই সমস্তকিছুই আমার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, আমার জন্য, আমার জন্য ! আমার জন্য মানব সম্প্রদায় খেটেছে ; শহিদ হয়েছে, ক্রুশকাঠে চেপেছে, চারণভূমিতে কাজ করেছে, আমার অপ্রশম্য আবেগ, জ্ঞান ও সৌন্দর্যের ক্ষুধা মেটাবার জন্য খেটেছে।” গল্প ছোটো করার খাতিরে আমি উপসংহারে লাফ দিই । কেউই আশ্চর্য হবে না স্বপ্ন দেখিয়ের মগজ থেকে এক শেষ ও মহান চিন্তার ঝর্ণা বেরোয় : “আমি ঈশ্বর হয়ে গেছি।”

 

কিন্তু তার বুক থেকে একটা বুনো আর জ্বলন্ত কান্না এমন জোরে, উৎসারের এমন ক্ষমতায় বেরিয়ে আসে যে, কোনো নেশাগ্রস্ত মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও বিশ্বাস যদি প্রভাবশীল ক্ষমতা রাখতো তাহলে এই কান্না স্বর্গের আশ্রয়ে দেবদূতরা ছত্রখান হয়ে ছড়িয়ে পড়ত : আমি একজন দেবতা।”

 

কিন্তু বেশ তাড়াতাড়ি গর্বের এই ঝঞ্ঝা শান্ত, নিঃশব্দ, বিশ্রামরত স্বর্গসুখের আবহাওয়ায় পরিবর্তিত হয়, আর অস্তিত্বের সার্বজনীনতা নিজেকে উপস্হিত করে রঙিন আর উজ্বল প্রতিভাময়ী ভোরবেলায় । যদি কোনোক্রমে এই শোচনীয় তিনবার-সুখি আত্মায় এক অস্পষ্ট স্মৃতি  ঢুকে পড়ে — “তাহলে কি আরেক ঈশ্বর হবেন না ?” — বিশ্বাস করো, সে ঈশ্বরের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াবে ; সে ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরোধিতা করবে, এবং বিনা ভয়ে ঈশ্বরের মোকাবিলা করবে ।

 

কে সেই ফরাসি দার্শনিক যিনি আধুনিক জার্মান তত্বকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন : আমি কি দেবতা যে রাতের ভোজে অখাদ্য খেয়েছে ?” হ্যাশিসের দ্বারা উন্নীত আত্মায় এই বিদ্রূপ কামড় বসাবে না ; সে ঠাণ্ডা মাথায় জবাব দেবে : “হয়তো আমি রাতের ভোজে অখাদ্য খেয়েছি ; কিন্তু আমি একজন দেবতা।”

পঞ্চম অধ্যায়

নৈতিক শিক্ষা

কিন্তু আগামীকাল ; ভয়ানক আগামীকাল ! সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিরুদ্বেগ, ক্লান্ত ; স্নায়ুরা অপ্রসারিত, অশ্রুজলের উত্যক্ত করার প্রবণতা, নিয়মিত কাজে নিজেকে নিয়োগ করার অসম্ভাব্যতা, নিষ্ঠুরভাবে তোমাকে শেখায় যে তুমি একটি নিষিদ্ধ খেলা খেলছিলে । ঘৃণ্য প্রকৃতি, আগের সন্ধ্যার ঔজ্বল্য থেকে বের করে আনা, কোনো উৎসবের মনমরা অবশেষের মতন দেখায় । ইচ্ছাশক্তি, কার্যক্ষমতায় যেটি সবচেয়ে মহার্ঘ, সবার আগে আক্রান্ত হয় । লোকে বলে, এবং সেকথা সত্যি, যে এই মাদক কোনো শারীরিক অসুখ ঘটায় না ; কিংবা অন্তত ভয়ানক কোনো অসুখ ; কিন্তু কেউ কি জোর দিয়ে বলতে পারে যে একজন লোক যে কোনো কাজ করতে অক্ষম এবং কেবল স্বপ্ন দেখার জন্য কর্মক্ষম, সত্যিই সুস্বাস্হ্যে রয়েছে, এমনকি দেহের প্রতিটি অঙ্গ ঠিকঠাক কাজ করলেও ? এখন আমরা মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে ভালো করে জানি যে একজন লোক যে এক চামচ মেঠাই খেয়ে নিজের জন্য স্বর্গের ও জগতের তাবৎ ঐশ্বর্য সংগ্রহ করতে পারে সে কখনও তার হাজার ভাগের এক ভাগও তা পাবার জন্য কাজ করেও পাবে না । তুমি কি এমন এক রাষ্ট্রের কল্পনা করতে পারো যার প্রতিটি নাগরিক চরসখোর ? কেমনতর নাগরিক ! কেমনতর যোদ্ধা ! এমনকি প্রাচ্যদেশেও, যেখানে এর ব্যবহার দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানকার সরকাররা একে নিষিদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবেছে । মানুষের ব্যবহারের জন্য নিষিদ্ধ, বৌদ্ধিক ক্ষয় ও মৃত্যুর শাস্তির আশঙ্কায়, যা মানুষের অস্তিত্বের প্রাথমিক অবস্হাকে বিপর্যস্ত করে, আর যে পরিবেশে সে ঘুরে বেড়ায় এগুলো তার গুণের ভারসাম্যকে নষ্ট করে ফ্যালে ; এক কথায়, নিজের নিয়তিকে ছাপিয়ে যাবার জন্য, নতুন ধরনের এক সর্বনাশকে তার জায়গায় আনার জন্য । মনে করো মেলমথের কথা, ( আরও দেড়শো বছর বাঁচার জন্য মেলমথ নিজের আত্মা শয়তানকে বিক্রি করে দিয়েছিল ) সেই অসাধরণ কাহিনি । তার অতিশয় বেদনাদায়ক যন্ত্রণার কারণ ছিল তার অসাধারণ দক্ষতা, যা সে শয়তানের সঙ্গে আড়ম্বরহীন চুক্তি করে পেয়েছিল এবং তার পরিবেশের ভিন্নতায়, ঈশ্বরসৃষ্ট প্রাণী হিসাবে, বেঁচে থাকতে বাধ্য থাকার চুক্তির ফলে অভিশপ্ত । এবং যাকেই সে অনুরোধ করতো তার কাছ থেকেশয়তানের চুক্তি কিনে নেবার জন্য, সেই একই ভয়ঙ্কর শর্তে, তারা কেউই রাজি হতো না । প্রসঙ্গত, প্রতিটি মানুষ, যে জীবনের অবস্হাকে স্বীকৃতি দিতে চায় না সে নিজের আত্মাকে বিক্রি করে । রূপকটা বুঝতে পারা যায়  কবিদের শয়তানি সৃষ্টি এবং সেই মাদকের কাছে আত্মসমর্পিত জীবন্ত প্রাণীগুলোর উদ্দীপনার পার্থক্যে । মানুষ ঈশ্বর হতে চেয়েছে, এবং তা দ্রুত ? — তবে সে এইখানে, এক অমোঘ নৈতিক আইনের দ্বারা, তার স্বাভাবিক অবস্হার তলায় অধঃপতিত ! সে এমনই এক আত্মা যে নিজেকে টুকরো টুকরো করে বিক্রি করে ।

 

বালজাক নিঃসন্দেহে ভেবেছিলেন যে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে পরিত্যাগ করার চেয়ে মানুষের আর কোনো বড়ো লজ্জার ব্যাপার হতে পারে না, কোনো বড়ো যন্ত্রণা হতে পারে না । আমি ওনাকে একবার এক বৈঠকখানায় দেখেছিলুম, যেখানে অনেকে হ্যাশিসের বিস্ময়কর প্রভাবের কথা আলোচনা করছিল।  উনি শুনছিলেন এবং মজাদার আগ্রহে ও উৎফুল্ল হয়ে প্রশ্ন করছিলেন । যারা ওনাকে জানতো হয়তো অনুমান করে থাকবে যে বিষয়টা সম্পর্কে উনি আগ্রহী, কিন্তু ‘নিজের উপস্হিতিতেও নিজেকে নিয়ে চিন্তা করার ধারণা’ ওনাকে ভীষণ বিপর্যস্ত করেছিল। কেউ ওনাকে ‘দাওয়ামেস্ক’ সেবন করার জনভ দিয়েছিল । উনি তা নিরীক্ষণ করলেন, শুঁকলেন, এবং বিনা ছুঁয়ে ফেরত দিলেন । ওনার প্রায় শিশুসুলভ কৌতূহল এবং ওনার নিজেকে আত্মসমর্পণ করার ঘেন্না চোখেমুখে অদ্ভুতভাবে ফুটে উঠেছিল । আত্মসন্মানের পপতি তাঁর ভালোবাসা দিনটাকে উৎরে দিয়েছিল । এ ব্যাপারটা কল্পনা করা কঠিন যে যিনি ইচ্ছাশক্তির তত্ব তৈরি করেছিলেন, লুই ল্যামবার্টের পারমার্থিক যমজ, এই দামি মাদকের একটা কণা দিতে রাজি হলেন । মানুষের সেবায় ইথার এবং ক্লোরোফর্ম প্রশংসনীয় কাজ করে থাকলেও, আদর্শবাদী দর্শনের দিক থেকে আমার মনে হয়, সেই একই নৈতিক বদনাম দেয়া হয় প্রতিটি আধুনিক আবিষ্কারকে, যেগুলো মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে ও দেহের যন্ত্রণাকে কম করে । আমি একবার বিশেষ আগ্রহে একজন অফিসারের কাছে ফরাসি সেনাধ্যক্ষ এল-আঘুতের শল্য চিকিৎসায় কূটাভাসের কধা শুনেছিলুম, যে তাঁকে ক্লোরোফর্ম দেয়া সত্বেও তিনি মারা গেলেন । এই সেনাধ্যক্ষ ছিলেন অত্যন্ত সাহসী মানুষ, এমনকি তার থেকেও বেশি: সেই রকম এক আত্মা যাঁর ক্ষেত্রে লোকে স্বাভাবিকভাবে ‘বিক্রমশালী’ শব্দটা ব্যবহার করে । অফিসার আমাকে বলেছিলেন যে, ওনার ক্লোরোফর্মের প্রয়োজন ছিল না, প্রয়োজন ছিল সমগ্র সেনাবাহিনীর দৃষ্টি এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গীত । তা হয়তো তাঁকে বাঁচাতে পারতো ।অফিসারের সঙ্গে শল্যচিকিৎসক একমত হননি, কিন্তু সেনাবাহিনীর যাজক এই ধরণের অনুভূতিতে নিঃসন্দেহে আপ্লুত হতেন ।

 

ব্যাপারটা নিশ্চয়ই অনাবশ্যক, এই সমস্ত বিবেচনার পর, হ্যাশিসের নৈতিক বৈশিষ্ট্যের ওপর জোর দেয়া জরুরি । তুলনা করা যাক আত্মহত্যার সঙ্গে, মন্হর আত্মহত্যা আর  সদাসর্বদা রক্ত বইয়ে দেওয়া কোনো অস্ত্রের সঙ্গে, সবসময়ে ধারালো, এবং কোনো যুক্তিপূর্ণ মানুষ তাতে আপত্তি করবে না । এবার একে তুলনা করা যাক ডাকিনিবিদ্যা কিংবা ম্যাজিকের সঙ্গে, যা বস্তুর ওপরে গোপন রহস্যের মাধ্যমে সক্রিয় ( যা অসাধুতার চেয়ে নিশ্চিত ফলদানের ক্ষমতাকে হেয় করে না )  এবং এক প্রভূত্বকে জয় করতে চায় যা মানুষের কাছে নিষিদ্ধ অথবা কেবল সেই লোকগুলোকে অনুমতি দেয়া যায় যারা এর যোগ্য, আর কোনো দার্শনিক মন এই তুলনাকে দোষ দেবে না । গির্জা যদি ম্যাজিক আর ডাকিনিবিদ্যাকে নিন্দা করে তা এই জন্য যে এরা ঈশ্বরের অভিলাষে বাগড়া দ্যায় ; এরা সময় বাঁচায় এবং নৈতিকতাকে অনাবশ্যক প্রতিপন্ন করে, এবং গির্জা একনিষ্ঠৈ শুভচিন্তার মাধ্যমে পাওয়া ঐশ্বর্যকে কেবল বৈধ ও সত্য বলে মনে করে । যে জুয়াড়ি জেতার উপায় খুঁজে পেয়েছে তাকে আমরা ঠকাই ; আমরা কেমন করে সেই লোকটার বর্ণনা করব যে মাত্র কিছু পয়সা নিয়ে আনন্দ ও প্রতিভা কিনতে চায় ? উপায়ের আপ্ততা নিজেই অনৈতিকতা সৃষ্টি করে ; ম্যাজিকের অনুমিত আপ্ততা তাকে শয়তানির কালিমালিপ্ত করে ; আমি কি যোগ করব যে হ্যাশিস, একক আনন্দগুলোর মতন, ব্যক্তিকে তার সহযোগিদের কাছে এবং সমাজের কাছে ফালতু করে তোলে, তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় অবিরাম আত্ম-প্রশংসায়, এবং দিনের পর দিন তাকে টেনে নিয়ে যায় এক আলোকময় রসাতলে যেখানে সে নিজের নার্সিসাস মুখাবয়ব দেখে আহ্লাদিত হয় ? কিন্তু তবু তার সন্মান, তার সৎপ্রবৃত্তি, আর তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির দামের বিনিময়ে মানুষ কি হ্যাশিস থেকে পেয়েছে আত্মিক কল্যাণ ; হতে পেরেছে একধরণের চিন্তাযন্ত্র, এক উর্বর সাধিত্র ? এই প্রশ্ন আমি অনেককে করতে শুনেছি, আর আমি উত্তর দিয়েছি  : প্রথমত, যেমন বিস্তারিত আলোচনা করেছি, হ্যাশিস মানুষের কাছে তাকে ছাড়া আর কিছুই মেলে ধরে না । একথা সত্যি যে এই ব্যক্তি ঘণাঙ্কিত হয়, আর যদি তার সীমা পর্যন্ত তাকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হয়, এবং এও সমানভাবে নিশ্চিত যে হইহুল্লোড় সত্তেও স্মৃতিতে ঘটনাগুলো থেকে যায়, এই উপযোগবাদীদের আশায় প্রথম দৃষ্টিতে যা দেখা মেলে তা একেবারে অযৌক্তিক নয় । কিন্তু আমি তাদের লক্ষ করতে অনুরোধ করব যে, যে ভাবনাচিন্তা থেকে তারা দারুন সুফল চাইছে তা তেমন সুন্দর নয় যেমনটা তারা ম্যাজিকের রাংতায় মোড়া সাময়িক রূপান্তরণে দেখতে পাচ্ছে । তা স্বর্গের নয়, পৃথিবীর ব্যাপার, আর স্নায়ুর উত্তেজনা থেকে আহরণ করছে সৌন্দর্য। ফলত এই আশা একটি দুষ্টচক্র । কিছু সময়ের জন্য না-হয় মেনে নেওয়া যাক যে হ্যাশিস সৃষ্টি করে, অন্তত বাড়িয়ে দ্যায় প্রতিভাশক্তি ; তারা ভুলে যায় যে হ্যাশিসের বৈশিষ্ট্যেই রয়েছে ইচ্ছাশক্তিকে হ্রাস করার ক্ষমতা, অর্থাৎ তা এক হাতে দ্যায় এবং আরেক হাতে নেয় ; একথা বলার মানে হলো, কল্পনা গড়ে ওঠে অথচ তা থেকে লাভ করার মতো কর্মশক্তি থাকে না । সব শেষে, মনে রাখা দরকার, একজন লোক হয়তো এই উভয়সঙ্কট এড়াবার মতো যথেষ্ট ধুরন্ধর ও তেজস্বী, কিন্তু আরেকটা বিপদ আছে, মারাত্মক এবং ভয়ঙ্কর, যা প্রতিটি অভ্যাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য । বেশ তাড়াতাড়ি এগুলো অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়ায় । চিন্তা করার জন্য যে লোকটাকে বিষের আশ্রয় নিতে হয় সে দ্রুত বিষ ছাড়া আর চিন্তা করতে পারবে না। সেই ভীতকর লোকটার কথা ভেবে দ্যাখো যার পক্ষাঘাতগ্রস্ত কল্পনা হ্যাশিস কিংবা আফিম ছাড়া আর কাজ করবে না ! দার্শনিক স্হিতিতে মানুষের মন, নক্ষত্রদের যাত্রাপথকে নকল করার জন্য, একটি অর্ধবৃত্তকে অনুসরণ করতে বাধ্য যা বেঁকে ফিরে আসে তার প্রস্হানবিন্দুতে, যখন বৃত্তটি সম্পূর্ণ হবে । শুরুতে আমি এই চমৎকার স্হিতির কথা বলেছি যার মধ্যে মানুষের আত্মা অনেক সময়ে তাকে ছুঁড়ে-ফেলা অবস্হায় আবিষ্কার করে, যেন তা বিশেষ অনুগ্রহ । আমি বলেছি যে অবিরাম নিজের আকাঙ্খাকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াসে এবং নিজেকে অনন্তের দিকে তুলে নিয়ে যাবার চেষ্টায়, সে দেখায় ( প্রতিটি দেশে এবং প্রতিটি সময়ে ) সব রকমের মাদক সম্পর্কে প্রমত্ত ক্ষুধা, এমনকি যেগুলো বিপজ্জনক সেগুলোও, যা তার ব্যক্তিত্বকে উন্নীত করে, মুহূর্তের মধ্যে তার চোখের সামনে বিনিময়ের স্বর্গোদ্যান নিয়ে আসে, তার যাবতীয় আকাঙ্খার উদ্দেশ্য ; এবং সব শেষে তার বেপরোয়া আত্মা, না জেনেই রথ চালিয়ে নিয়ে যায় নরকের দরোজা দিয়ে, এই তথ্যই সাক্ষী হয়ে থাকে তার প্রাথমিক গরিমার । কিন্তু মানুষ তো তেমন ঈশ্বর-ত্যাজ্য নয়, সরাসরি স্বর্গে পৌঁছোবার উপায় থেকে প্রতিভাশূন্য, যে তাকে ম্যাজিক আর ডাকিনিবিদ্যার আশ্রয় নিতে হবে । হুর আলাইনের ( আরব স্বর্গের হুরিপরি) বন্ধুত্ব  এবং নেশার আদর কেনার জন্য নিজের আত্মা বিক্রি করার প্রয়োজন তার নেই । শাশ্বত উত্তরণের জন্য দাম দিয়ে যে স্বর্গোদ্যান পাওয়া যাবে সেটা কী? আমি একজন মানুষের কল্পনা করি ( আমি কি বলব সে একজন ব্রাহ্মণ, একজন কবি, কিংবা একজন খ্রিস্টধর্মী দার্শনিক ?) আধ্যাত্মিকতার অলিমপাসের চূড়ায় বসে আছেন; তাঁর চারিপাশে রাফায়েল কিংবা মাতেঙ্গার মিউজদেবীরা, তার দীর্ঘকালের উপবাস এবং আন্তরিক প্রার্থনার দরুণ সান্ত্বনা দিতে, অভিজাত নৃত্য রচনা করতে, কোমল চাউনি মেলে ও ঝিকমিকে হাসিতে তাকে দেখতে ; দৈবিক অ্যাপোলো, যাবতীয় জ্ঞানের শিক্ষক ( ফ্রাঙ্কাভিলা, আলবের্ত দুয়েরার, গোল্তজিয়াস, কিংবা অন্য কারোর — তাতে কিই বা আসে-যায় ? প্রতিটি মানুষের জন্য কি একজন অ্যাপোলো নেই, যে মানুষ তার যোগ্য ?), সবচেয়ে সুবেদী তারগুলোকে আদর করছেন তাঁর ধনুক দিয়ে ; তাঁর নীচে, পাহাড়ের পাদদেশে, কাদায় আর কাঁটাঝোপে, মানুষের কলরোল ; হেলট গোষ্ঠী উপভোগের মুখবিকৃতি নকল করে আর চিৎকার করে যার হুল তার বুক থেকে বিষ টেনে বের করে ; এবং কবি, দুঃখে কাতর, নিজেকে বলেন : “এই অভাগা লোকগুলো, যারা উপোস করেনি আর প্রার্থনাও করেনি, যারা খাটুনির মাধ্যমে উত্তরণ প্রত্যাখ্যান করেছে, ডাকিনিবিদ্যার আশ্রয় নিয়ে এক ধাক্কায় উঠে যেতে চেয়েছে তুরীয় জীবনে । তাদের ম্যাজিক তাদের ঠকায়, তাদের মধ্যে জাগায় নকল আনন্দ, নকল আলো ; যখন কিনা আমাদের কবিদের ও দার্শনিকদের ক্ষেত্রে, আমরা আমাদের আত্মাকে অবিরাম খাটাখাটুনি করে এবং মনোনিবেশের মাধ্যমে আবার জন্ম দিয়েছি; ইচ্ছাশক্তির অক্লান্ত প্রয়োগে এবং আকাঙ্খার দ্বিধাহিন গরিমায় আমরা আমাদের জন্য সৃষ্টি করেছি সত্যের বাগান, যা সৌন্দর্য ; সৌন্দর্য যা সত্য । বিশ্বাস পাহাড় সরাতে পারে এই বাক্যে আত্মবিশ্বাসী, আমরা কেবল সেই অলৌকিকতা অর্জন করেছি যা প্রতিপাদন করার জন্য ঈশ্বর আমাদের অনুজ্ঞাপত্র দিয়েছেন ।”

 

( ১৮৬০ সালে প্রকাশিত Les Paradis artificiels -এর অংশ । সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের জন্ম হয়েছিল এই রচনাটি প্রকাশের পাঁচ বছর পরে । )

 

About anubadak

আমি একজন অনুবাদক । এতাবৎ রেঁবো, বদল্যার, ককতো, জারা, সঁদরা, দালি, গিন্সবার্গ, লোরকা, ম্যানদেলস্টাম, আখমাতোভা, মায়াকভস্কি, নেরুদা, ফেরলিংঘেট্টি প্রমুখ অনুবাদ করেছি ।
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s