জাঁ জেনে-র কবিতা ‘রণতরী’

 

জাঁ জেনের কবিতা 

অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

রণতরী

একজন মুক্ত কয়েদি, জেদি আর ভয়ঙ্কর, ছুঁড়ে ফেলে দিলো

পাটাতনের ওপরে একজন কেনা-গোলাম নাবিককে

কিন্তু তরোয়ালের এক ঝটকায়

কোটনা, দক্ষিণের ক্রস

আর খুনি. উত্তরমেরু

আরেকজনের কান থেকে

তার সোনার মাকড়ি হাতিয়ে নিলো ।

সবচেয়ে সুন্দর হলো তারা

যাদের চরিত্রে আছে অদ্ভুত গোলমাল ।

গিটার বেজে ওঠে সুরে ।

সমুদ্রের ফেনা থুতুকে ভিজিয়ে দ্যায় ।

আমরা কি একজন পাশার

মুখ থেকে

ফেলে দেয়া মানুষ ?

«

ওরা আমাকে পিটুনির কথা বলে আর আমি তোমার ঘুষির আওয়াজ শুনি।

কে আমাকে গড়িয়ে নিয়ে যায়, হারকামোন, আর আমাকে সেলাই করে দিলো

তোমার পরতের সঙ্গে ?

«

সবুজ-বাহু হারকামোন, উড়ন্ত রানি

তোমার রাতের গন্ধে

আর বনানি জেগে ওঠে

তার নামের আতঙ্কে

এই দুঃখি কয়েদি গান গায়

আমার রণতরীতে

আর ওর গান

আমাকে বিধ্বস্ত করে।

«

দাঁড়গুলো শেকল আর লজ্জার ভারে

ফেননিভ, নৌডাকাত, সমুদ্রের এই ষাঁড়গুলো

আর তোমার অঙ্গভঙ্গী হাজার বছরের পরিশ্রমে

তোমার স্মৃতিকে মনে পড়ায়

আর নৈঃশব্দ

রয়েছে তোমার স্পষ্ট চোখের রাতে ।

«

মৃত্যুর সুতো দিয়ে

এই রাতের অস্ত্রগুলো

মদে পক্ষাঘাতগ্রস্ত আমার বাহুকে ধরে নিয়ে গেল

নাসারন্ধ্রের নীলাভ

বিপথগামী গোলাপের চালনায়

যেখানে ঝোপের তলায় কাঁপতে থাকে এক সোনালী হরিণী

আমি নিজেকে অবাক করে তুলি আর নিজেকে হারাই

তোমার পথ ধরে

অবাক নদী

কথাবার্তার শিরা থেকে বয়ে যায় ।

«

এই চিন্তাগুলো যা তুমি পাহারা দাও তার গন্ধ আমার রসনায়

দুই মোড়া বাহুতে তোমার জুলফিতে বাঁধা

তোমার সোনার তলপেট খুলে দাও যাতে তাদের দেখতে পাই

তোমার  নুন মাখানো বুকের মধ্যে।

«

এখানে একটা কুপি জ্বলে

আমার আধখোলা কফিনের ওপরে

ভিজে ফুলে সাজানো

আর তাদের দেখতে থেকে

যেগুলো ডুবে গেছে  ।

«

একটা ইঙ্গিত করো, হারকামোন

তোমার বাহুকে একটু ছড়িয়ে দাও

আমাকে পথ দেখাও

যে পথে তুমি উড়ে যাবে ।

তুমি ঘুমোও কিংবা মারা পড়ো

কিন্তু তুমি আবার যোগ দেবে

এই পাগলিটার সঙ্গে

যেখানে  শেকলখোলা

কেনা-গোলাম নাবিকরা ওড়ে

আমার মতন ফিরে আসে

কারাগারে, বন্দরে

অসাধারণ পাতালকুঠুরিতে

উষ্ণ মদ খেয়ে টলমল করতে করতে ।

«

যে সুরেলা পাদ তুমি চেপে যাও

একদল রোগা কোটনাকে সবুজ ফুলে কারারুদ্ধ করে দ্যায়

নাসারন্ধ্র ফোলা, আমরা ওদের জন্য অপেক্ষা করবো

আর পৌঁছোবো ওদের কাছে

ঢাকা দেয়া রথে ।

«

আমার শৈশব রাতের ওপরে সবেমাত্র বেছানো

জ্বলতে থাকা কাগজে, এই রেশমকে মিশিয়ে

যা এক মোটা কোটনা  পিঙ্গলরঙা দ্যুতিতে মেলে ধরেছে

বহুদূরের শান্ত বাতাসে

আমার শরীর থেকে পালিয়ে গিয়েছিল।

«

তা সত্তেও, হরিণী ধরা পড়ে তার পাতার ফাঁদে

ভোরবেলায় জেগে ওঠে, এক স্বচ্ছ বিদায়

«

তোমার চোখের মধ্যে দিয়ে চলে যায়, তোমার স্ফটিক, আর প্রেমে পড়ে

সমুদ্রে একবিন্দু চোখের জল পড়ার পর, স্বাগত জানায় ।

«

বিপদে-পড়া একজন চোর, একজন চোর সমুদ্রে গেছে।

আর লোহার মুখ নিয়ে কতো কালো হারকামোন

ফিতে আর চুল ওকে টেনে কাদায় নামায়

কিংবা সমুদ্রে ? আর মৃত্যুর ?

তার ভাঙাচোরা গম্বুজকে সাজায়

পতাকার সেলাই-করা সুতোয়

মজায় হাসে কোটনাটা ।

মৃত্যু, যদিও, চালাক

আমি ঠাট্টা করার সাহস পাচ্ছি না ।

«

আমাদের গল্পের অতলে আমি ঘুমন্ত লাফ দিই

আর তোমার গলা দিয়ে নিজেকে কন্ঠরুদ্ধ করি

বেচারা সুগন্ধিত হারকামোন ।

মিষ্টি-মটরের মতন এক সমুদ্রে

মৃত্যু থেকে চুরি করা তোমার কেবিন-বয় সাহায্যের ডাক দ্যায়

মুখে তার পরিষ্কার ফেনা

আকাশের কালো সৈন্যরা যা ছিঁড়ে ফেলেছে

ফিরে গেছে ওই জলে ।

ওরা তাকে ফেনা আর মখমল জলপানায় সাজায়।

প্রেম তাদের পাগড়ি-পরা লিঙ্গকে নাচায়

( হরিণী, নীলাভ আর ফুটন্ত গোলাপকে সামলায় )

দড়িদড়া আর দেহগুলো গিঁটে শক্ত হয়ে গেছে ।

আর রণতরী নিরেট হয়ে উঠছিল ।

এক বিহ্বল শব্দ

জগতের শেষ প্রান্ত

সুন্দর ব্যবস্হাকে শেষ করে দিলো ।

আমি দেখলুম প্রবেশপথ কামড়ে ধরছে

বেড়ি আর জরি ।

«

হায়, আমার কয়েদি-হাত না মরেই মারা গেছে ।

বাগানগুলো বলে না হরিণীকে কোথায়  পরানো হচ্ছে

তুষারের পোশাক, আমার মহিমায় নিহত

ফেনার আলখাল্লায় ভালো করে পোশাক পরানো যেতো ।

«

কারাগার যা আমাদের ধরে রাখে তা পিছিয়ে যায় ।

নিজের বিপর্যয়ে চিৎকার করে

তোমার আঙুরলতায় এক নিশ্চল মুঠি

তোমার পাতাগুলোয় জড়িয়ে ধরে

তোমার শীতল সাজানো কন্ঠস্বরের

মূল পর্যন্ত

হারকামোন ।

চলো ফ্রান্সকে আমাদের রণতরীতে ছেড়ে দিই..

আমি যে কেবিন-বয় ছিলুম নিশ্চয়ই বজ্জাতদের আনন্দ দিয়েছে।

আমি অসাধারণ ফাঁসুড়ের সামনে দাঁড় বাইছিলুম

এই হাসিমুখ সৌন্দর্য আমাকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করেছিল

যেমনভাবে ফুলগুলো জড়িয়ে ধরে

( রোকেটের সেই গোলাপফুল, জংলিঘাসের ফাঁস খুলে )

আর ওর ঢাকনার তলায় গড়ে তুলেছে

এক আদরের কুঞ্জবন যেখানে গায়ক পাখিরা ওড়ে ।

মৃদু গানের সুরে পালিয়ে গেলো হরিণী

একজন রণতরীর কেনা-গোলাম নাবিকের ওপরে ঝুঁকে

স্বপ্নগুলো ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে চলে গেলো।

«

গাছের নীল শাখাগুলো

নুন থেকে আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে ।

আমার নিঃসঙ্গতা গান গায়

আমার রক্তের শুকতারাকে শুনিয়ে

সোনার বুদবুদে ভরা হাওয়া

আমার ঠোঁট চিপে গান বের করে ।

«

প্রেমের এক বালক গোলাপি পোশাক পরে

নিজের বিছানায় মোহসঞ্চারী অঙ্গবিক্ষেপ করছিল ।

মার্সাইয়ের এক ফ্যাকাসে মাস্তান, তার দাঁতে নক্ষত্র

আমার সঙ্গে প্রেমে হেরে গেলো ।

আমার হাত আফিমের বস্তার চোরাচালান করছিল

বিপর্যয়ের ভার — আর ঘন জঙ্গল থেকে

পরের পর চারণভূমিতে

ছিল ভ্রাম্যমাণ পথ

তোমার চোখের আলোয়

তোমার হাত পুনরাবিষ্কার করার জন্য

তোমার পকেটগুলো, ঈগলের বাসা

আর সেই বিখ্যাত জায়গা যেখানে  নৈঃশব্দ তুলে নিয়ে যায়

অন্ধকারের ঐশ্বর্য ।

বাতাসের বিরুদ্ধে আমার হাসি নিজেকে ভাঙচুর করছিল ।

আমি বিরক্ত হয়ে আমার ঘেয়ো মাড়ি উৎসর্গ করি

কারাগারের মশার ডিমগুলোকে

যেখানে আমাকে সম্প্রতি ঢোকানো হয়েছে ।

«

দেয়ালের ওপরের ছায়ায়, যা থেকে নৌচালক–

নুনে ক্ষয়ে যাওয়া ওর নখ

যদিও আমার মাপের লম্বা

রক্তাক্ত হৃদয়ের মাঝে চিন্তাকে বিভ্রান্ত করছিল

পরিলেখগুলো, অস্ত্র নামিয়ে রেখে

আমাদের কান্না হায়

তার কাছে দুর্বোধ্য

যে রাতের বেলায় লড়তে পারে না

যেখানে শব্দগুলো নেকড়ে—

ঝকঝকে নখ কি অনুমতি দেবে

আমার উন্মাদ চোখ যা গিলে ফেলতে চাইছে, তাকে

হাড় পর্যন্ত মাংস তুলে নেয়া
অ্যান্দোভোরান্তের নাম ?

«

গর্বিত লোকটা

যে লজ্জায় ভুগছিল

তাকে কাছাকাছি ধরে রেখেছিল একজন কাউন্টের সদস্যদল ।

ওরা তাকে হাঁটু আর ঘুষি মেরে পিটুনি দিচ্ছিল।

বজ্রাহত লোকেরা আমাদের চারপাশে গড়াগড়ি দিচ্ছিল ।

( আলোয় উজ্বল হাঁটু, কাদায়

হাঁটু থেকে হাঁটুতে, ডেকের ওপরে ছড়াচ্ছিল

হাঁটু, জলেতে যে ঘোড়াগুলো মাথা তুলছিল

বেঁকা হাঁটু, নাবিকদের হইচই )

সূর্য গোলাপ পাপড়ি ছড়াচ্ছিল দ্বীপপূঞ্জে ।

জাহাজ পাক খাচ্ছিল রহস্যময় মাইলের পর মাইল ।

নিচু গলায় ওরা হাঁকছিল

এক ঘোষণা যেখানে চুমু পাগলের মতন ফেরাফিরি করছিল

বিশ্রাম নিতে অসমর্থ । ফেনার ওপরে

আমার ভেতরে এক স্হির জলরাশি ছড়িয়ে দিচ্ছিল

ঠুনকো প্রতিবিম্বটাকে

যা এক অবিনাশী কেবিন-বয়ের ।

«

তোমার দাঁত, প্রভু, তোমার চোখ, আমাকে ভেনিসের কথা বলো !

তোমার কঠিন ঠ্যাঙের গর্তে ওই পাখিগুলো !

আমার আলস্য তোমার পায়ের শেকলকে

আমাকে এখানে ব্যবহার করার জন্য

ভুলের চেয়েও ভারি করে তোলে !

«

বালিশের কিনারা মিটিমিটি হাসে আর পর্দাগুলো যেন ইঁদুর ।

শার্শি থেকে তুমি আঙুল দিয়ে বাষ্প সংগ্রহ করো ।

তোমার কোমল ঘুম নিজেকে গিঁটে বেঁধে ফেলছে

আর তোমার মুখ কুঁচকে যায়

যখন তোমার সুন্দর চোখ উধাও হয়ে যায়

সমুদ্রের ছাদের ওপরে ।

«

ফাটা ঠোঁটের কিনারায়

একটা ছেলে যে ঢেউ আর বাতাসে খাপ খায়

নিশানগুলোর ভেতর দিয়ে অদ্ভুতভাবে বেরিয়ে যায়

আমি প্রায়ই দেখেছি একটা সিগারেটের মোচড়

আমার মেয়েলি স্কার্টের ভেতরে ।

কুড়ি বছর বয়সী এক কেনা-গোলাম নাবিক

যাকে নিয়ে মশকরা আর  ঠাট্টা করা হয়

দেখলো নিজেই মরছে

নৌকোর দেয়ালে গেঁথে দিয়ে ।

«

হারকামোন, তুমি কি ঘুমোও, তোমার মুণ্ডু ঘোরানো

তোমার মুখ জলেতে, স্বপ্ন দেখে ফিরেছে কি ?

তুমি আমার বালির ওপরে হাঁটো যেখানে ভারি ফলগুলো ঝরে পড়ে

যখন কিনা অদ্ভুতভাবে তোমার মখমল অণ্ডকোষ

আমার চোখে ফেটে পড়ে

এক ইন্দ্রজালিক গাছের ফুলে-ফুলে কুসুমিত ।

তোমার রুদ্ধকন্ঠের স্বরে মরে যাওয়া সম্পর্কে যা আমি ভালোবাসি

তা হল এই আঁটো ক্যানেস্তারায় গরম জল ফুটতে থাকা ।

অনেক সময়ে তুমি বলো একটা শব্দ আর তার মানে হারিয়ে যায়

যদিও যে কন্ঠস্বর তা ওগরায় তা বেশ ফুলে ওঠে

যা এই আহত কন্ঠস্বরে ভেঙে পড়ে ।

«

তোমার থুতনি থেকে কুষ্ঠরক্তের বন্যা বইতে থাকে

কোনো যোদ্ধার ক্রোধের চেয়েও ভয়ানক

আমার গর্বিত ম্যানড্রিন ।

«

সবে মাত্র জোড়া লাগানো হয়েছে

এমন গাছের শাখাগুলো

আমি অন্য ফুলেদের থেকে চুরি করেছি

যাদের পা একসময়ে দৌড়োতো

আমার বাগানে হাসতে-হাসতে

যেখানে পড়ে আছে আমার ছায়া

গোলাপগুলোকে স্নান করাচ্ছে

আমার গায়ে ছেটাচ্ছে জলরাশি ।

«

( একমুঠো চারাডাঁটা, উথ্থিত দলমণ্ডল

পালকের দলমণ্ডল আর নেতৃত্বের সদস্যরা )

তাদের দ্রুত আদরে এক মারাত্মক বাতাসের আওয়াজ

জল পড়ে যায়

আমার গোড়ালির ধাক্কায় ।

«

গলির ভেতর থেকে, গরম ফুলগুলো

সন্ধ্যাবেলায় ছেড়ে চলে যায়

আমি একা, স্যাঁতসেতে পতাকায় মোড়া

তোমাদের মধ্যে কে আমাকে খুলে দেবে

এই স্যাঁতসেতে ভাঁজগুলো থেকে

যেগুলো নির্দয় আগুনের ?

«

তোমার হাসির মতন কোনো শীতল দেশ কি আছে ?

তোমার জিভ চেটে নিচ্ছে প্রবালের ওপরের তুষার

জলের পানার নুন আর তলপেটের নীলাভ

আর জলতরঙ্গের মতন তোমার স্পন্দিত দেহের গান ।

«

হরিণীকে  অনুসরণ করার জন্য

আমি যেতে যেতে খেলাটা তৈরি করি।

একজন উত্তেজিত রানি, নির্বাসিত আর বেশ মিষ্টি

প্রতিটি পদক্ষেপে যে কুমারীত্ব হারিয়েছে

তাকে  জটিলতামুক্ত করেছে

এক হরিণীর ভিজে পোশাক ।

শ্রদ্ধায় জমে বরফ

আমি তোমার মুখের রেখায় দেখি

সমুদ্রের তীরে শেকলবাঁধা রানি ।

ঘুমোও, সুপুরুষ হারকামোন

যে খুনি গিরিসঙ্কট পেরিয়ে যায়

আমার ডানা-লাগানো জুতো পরে ।

«

সেই ভঙ্গুর মুহূর্তে যখন সবকিছু সম্ভব ছিল

আমরা হাঁটছিলুম অবাক অথচ

শান্তিময় নীলাভে ।

রণতরীর বিশৃঙ্খলা এক সৌন্দর্যের

মিষ্টতার চেয়ে কম অদ্ভুত

এক মোহমুগ্ধ গ্রাম

এক বিষাদের বাতাস

তার উৎসবগুলোকে নিয়ে

( তুষার পড়ছিল, কি যে শান্তি

এই স্হির ঝড়েতে ! )

ভায়োলিনের আর ওয়ালৎস নাচের ।

বাহু এগিয়ে দ্যায় নিরানন্দ দেহজ্যোতিতে

মেয়েটির ছিল পবিত্র বোঝা

মাস্তুলের, থামের, দড়ির আর ধড়ের ।

ওর পাতলা ত্বকের তলায় ও মুচড়ে উঠছিল ।

আকাশ তার খ্রিস্টবন্দনা গাইছিল

আর আমাদের হৃৎস্পন্দন গুনছিল ।

এই ভয়ানক ব্যবস্হার অনমনীয়তা বেশ কঠিন

যেখানে কাঁপছিল সৌন্দর্য ।

আমরা প্রাসাদগুলোর ভেতরে নিঃশব্দে চলাফেরা করলুম

যেখানে মৃত্যু বিধিসন্মত  জীবন কাটিয়েছে ।

আমার আর ইচ্ছে ছিল না, গায়ে জোরও ছিল না

বাতাসে উঠে পড়ার, তার দরকারই বা কি ?

সবচেয়ে সুন্দর বন্ধুরা

পৃথিবীর সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে

আর সমাধিগুলো

বাতাসের সঙ্গে ।

«

আর সেই সব উজ্বল শিশুরা নৌকোর পালে উড়ছিল ।

পুরো গতিতে, স্বপ্ন তোমাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল

পাক খেয়ে সরে যাচ্ছিল ।

ছেঁড়া মালাটা ছিল প্রেমের গিঁটে বাঁধা

মৃত্যুর পায়ের সঙ্গে

আর মৃত্যুকে করা হয়েছিল প্রতারিত ।

আমি অনুভব করলুম এক আতঙ্কময় নিশ্চল মুহূর্ত

কেননা আমি এই সুন্দর ছলনাময় জগতের কথা জানতুম

যাকে ধরে রেখেছে অনন্তকাল

বেশি কঠিন আর বেশি ঘন

মিশরের তুলনায়

কম নোংরা নয় ।

গিঁট দিয়ে গলা টিপে মেরে ফেললো ওরা কয়েকটা ষাঁড়কে

তিনজন মানুষের তৈরি

আর নোনা বাতাসের হাত

তাদের পাপকে মাফ করে দিয়েছে ।

রণতরীটা ছিল একটা নাগরদোলা

এক সন্ধ্যার ক্রোধে ভেঙে ফেলা ।

আর তবু কিন মহিমা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো !

জাঁকজমকভরা স্মৃতিস্তম্ভ :

দেহের জন্য সাধারণ কফিনও নেই

স্বপ্নের মাঝে

আমাদের যত্নে সুবাসিত করা হয়েছিল !

তোমার স্পঞ্জের হাত দিয়ে টেপো

বের করে আনো তোমার ভালোবাসার আঙুলগুলো ।

আমি জানি কেমন করে ফিরে আসতে হয়

আঙ্গিকহীন পরিবর্তনে ।

যদি তুমি তোমার পোশাককে ছোঁও

আমার আঙুলের ডগায় কুয়াশা জমে যাবে

তুমি আমাকে নীল বাতাস থেকে বিগলিত করে আনো, পশু

আর বদলে দাও অশ্রুবিন্দুতে

তোমার অদ্ভুত অক্ষিগোলক থেকে ঝরে পড়ে

তোমার শুকনো পায়ে

তোমার থেকে আমার বাঁধন খুলে দ্যায়

আমার হরিণী ।

«

উত্তাপ এমন গোলাপি, তোমার গালে বাতাস করো

নৈঃশব্দকে স্ফীত করে তোলে এক দীর্ঘশ্বাস ।

ধীরেসুস্তে চলমান ছায়ায় বাসা বানায় কাঁটাগাছ

তাই আমি একা থাকি ।

কে দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে আসে, রাত্রি ?

তোমার বনানীর ওপরে বাঁধা

অসংলগ্ন এক নৌকো

আকাশে জেগে ওঠে ।

হে অবলা হরিণী,

তোমার কানের কথা শুনতে পায়

শাখাদের অনুচ্চ মর্মর

যেমন সে সোনালী বাতাসের গান শোনে

বরফকে ভেঙে ফেলছে…

«

যারা বিষ দ্যায় তাদের দল দড়ি থেকে ঝুলছে

অপরাধীরা পরস্পরের পোঁদ মারছে

বয়সের তফাত ঘুচিয়ে ।

পরম ক্লান্তি থেকে এক ঘুমন্ত শিশু

উলঙ্গ ফিরে এলো, বমি-করা বীর্যে নোংরা ।

নৌকোর পালের সবচেয়ে হৃদয়-বিদারক কান্না

তীর ছাড়ার জন্য তৈরি হয়েছিল

কোনো নক্ষত্রের বিন্দুর মতন

যখন এক বালকের হৃদয় আর ঠোঁট

আমার কাঁধে বিশ্রাম নিচ্ছিল

যেন আমাকে মুকুট পরিয়ে দিচ্ছে

আর সম্পূর্ণ করছে ভাঙচুরগুলো ।

তোমার দেশ খুঁজে পাবার  প্রয়াস আমার বিফলে গেলো ।

পূতিগন্ধময় আর একান্তবাসী আমার মাথা ডুবে যাচ্ছিল

সুগন্ধিত স্বপ্নের সমুদ্রের তলদেশে

আমি জানি না কতোটা অবিশ্বাস্য গভীরতায় ।

আচমকা এক গ্রিক বাগবিতণ্ডায় দুলে উঠলো জাহাজ

আর শেষ হাসি হেসে

আমি তা মুছে ফেললুম ।

গালাগালের আকাশে ফুটে উঠলো প্রথম নক্ষত্র ।

সেই রাত ছিল যার নাম

নৈঃশব্দ, আর চিৎকার

এক সুপুরুষ কেনা-গোলাম নাবিকের

যে জায়গাটা জানতো

আমাদের অসন্তুষ্ট কুঞ্জবনে

যেখান হরিণী কেঁদে ফ্যালে

রাতের এক প্রাণী, যার অলস ট্রাউজার

আমার ফাঁকা নৌকোর জন্য পতাকা নামিয়ে নিলো ।

আমার নীল হাতের মুঠোয় জলের গোলাপ বন্ধ হলো ।

( ইথার স্পন্দিত হলো অনুগত হয়ে

আমার লিঙ্গের লাফালাফিতে ।

এই প্রাসাদগুলো ঝুলে আছে রাতের মখমলে

যার ভেতর দিয়ে প্রবেশ করলো আমার শিশ্ন

আর তুমি চলে গেলে নিঃসঙ্গ

সরাসরি উলঙ্গ নক্ষত্রের দিকে ঝাঁপিয়ে

শীতল বনপথে দ্রুত ঘুরে বেড়াতে লাগলে )

হারকামোন, তুমি নিজেকে আকাশে ছড়িয়ে দাও !

আর ক্ষুব্ধ হয়ে, উজ্বল আকাশ ঢেকে যায়

মজার ইশারায় ।

«

গান গাইছিল একজন আমোদপ্রিয়

রণতরীর স্বর্গ থেকে

বরফজমাট নক্ষত্র থেকে

সৌরজগতের জন্য ।

«

স্বর্গে  আর শাশ্বত রাতে আরোহণ করে

যে রণতরীকে আকাশের বিশুদ্ধ বিষাদ আটকে দিয়েছে

একজন কুমারীর পায়ের কাছে সে নিজের মৌমাছিদের ডাকছিল ?

«

নক্ষত্রেরা, আমি তোমাদের বমি করি, আর আমার যন্ত্রণাও একইরকম

হারকামোন, তোমার মৃত ঝুলন্ত হাতের মতন ।

তোমার পাদুটো আর বাহু দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরো

ওহ আমার এলোমেলো গোলাপ

কিন্তু তোমার ডানা আবার বন্ধ করো ।

আমরা পেছনে কিছু ফেলে যাবো না

কোনো নথি, কোনো দড়ি, কোনো সূত্র

চলো লাফিয়ে উঠি রথে

আমি শুনতে পাচ্ছি তোমার

পাতলা গেঞ্জির তলার স্পন্দন ।

«

কিন্তু আমার আর আশা নেই

ওরা আমার থেকে  ডাঁটাগুলো ছেঁটে ফেলেছে ।

বিদায় সতেরো বছর থেকে

কুড়ি বছরের ফেনা

এই সন্ধ্যার ফেনাদের বিদায় ।

«

চাঁদ পর্যন্ত সমুদ্রযাত্রা

নাকি সমুদ্র আমি জানি না

গোলাপি গলার হারকামোন

ফাঁসির দড়িতে বাঁধা ।

«

ওহ আমার কোতলকরা সৌন্দর্য, তুমি হেঁটে যাও

সমুদ্রের তলদেশে

প্রতিটি পদক্ষেপ তোমাকে নিয়ে যায়

তোমার তীব্র সুগন্ধের ঢেউয়ের ওপর দিয়ে

যা কুঁকড়ে যায় আর পতাকা ওড়ায়

যেমন যেমন তুমি অতিক্রম করো

খিলানগুলোর গোলোকধাঁধা ।

«

তোমার পুকুরের জলে, কালো উলুখাগড়া অনুসরণ করে

তোমার ধড় আর তোমার বাহু থেকে

মৃত্যু সম্পর্কিত গুজবের জট পাকিয়ে

ঘোড়াদের চেয়েও শক্তিশালী

পরস্পরের সঙ্গে বিজড়িত

একজন রানির

জঙ্ঘায় ।

 

টীকা : রণতরী অর্থাৎ পায়ু ; জেনেকে যে মেত্রে পেনাল কলোনিতে পাঠানো হয়েছিল সেখানে মাঠের মাঝখানে একটা রণতরীর মডেল ছিল কয়েকদিদের নাবিকের শিক্ষানবিশীর জন্য । যাদের গায়ে জোর ছিল তারা এই রণতরীতে কমজোরদের পায়ুসঙ্গম করতো  । হারকামোন ছিল মৃত্যুদণ্ড পাওয়া কয়েদি । কোটনা অর্থাৎ সমকামিদের মধ্যে যে সক্রিয়। সোনালী হরিণী অর্থাৎ কচি ছেলে, যা মেত্রে কলোনিতে জেনেকে মনে করা হতো । সুগন্ধের প্রসঙ্গ সমকামের সময়ে ব্যবহার করা সুগন্ধ, যেমন মেনথল দেয়া ভেসলিন । সৌন্দর্য সব সময়ে সৌম্যকান্তি পুরুষের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত । হাতের তালু অর্থাৎ সমকামের জন্য ফোসলানো । অবিনাশী অর্থাৎ ধর্ষণ । সিগারেট স্ল্যাঙ হিসাবে ব্যবহৃত লিঙ্গের কথা বলতে । ম্যানড্রিন শব্দটা দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে– একজন দুর্ধর্ষ দস্যু ছিল ম্যানড্রিন নামে আর পেনাল কলোনিতে লেদ মেশিনের ব্লেডকে বলা হতো ম্যানড্রিন ।

About anubadak

আমি একজন অনুবাদক । এতাবৎ রেঁবো, বদল্যার, ককতো, জারা, সঁদরা, দালি, গিন্সবার্গ, লোরকা, ম্যানদেলস্টাম, আখমাতোভা, মায়াকভস্কি, নেরুদা, ফেরলিংঘেট্টি প্রমুখ অনুবাদ করেছি ।
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s