জাঁ জেনে : চোরের জার্নাল

জাঁ জেনে : চোরের জার্নাল 

অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

যারা জেল খাটে তাদের পোশাক গোলাপি আর শাদা ডোরাকাটা । যদিও আমার হৃদয়ের ওসকানিতে আমি সেই জগৎ বেছে নিয়েছি যেখানে আহ্লাদিত হই, আমি অন্তত সেখানে সেই সমস্ত মর্মার্থের ইশারা খুঁজে পাবার ক্ষমতা রাখি, যা আমি জানতে চাই : ফুল আর দণ্ডিতদের মাঝে একটা কাছাকাছি সম্পর্ক আছে । প্রথমটার যেমন অপলকাভাব আর সূক্ষ্মতা, তেমনই প্রকৃতির, যেমন দ্বিতীয়টার নির্দয় সংবেদনহীনতা । যদি আমাকে একজন দণ্ডিতের — কিংবা অপরাধীর বর্ণনা করতে হয় — আমি তাকে ফুলে এমনভাবে সাজাবো যে সে তার তলায় চাপা পড়ে যাবে, সে নিজেই ফুল হয়ে উঠবে, বিশাল আর নতুন ফুল । যাকে আমি পাপ বলে জানি তার জন্য, আমি আরামে এক অভিযানে বেরোলুম যা আমাকে কারাগারে পৌঁছে দিলো । যদিও তারা সব সময়ে সুপুরুষ নয়, যে মানুষেরা পাপে পর্যবসিত,  তাদের পৌরুষের প্রচুর সততা থাকে । তারা নিজে থেকেই, কিংবা কোনও অঘটনের কারণে, যা তাদের জন্য বাছাই করা হয়েছে, তারা বিনা নালিশে কলঙ্কের, ঘৃণ্য ঘটনায় ঝাঁপিয়ে পড়ে, যেমন প্রেমে, যদি তা গভীর হয়, মানুষকে তার মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দ্যায় । যৌনতার খেলা এক নামহীন জগতকে ফাঁস করে, যা প্রেমিকদের রাতের ভাষায় প্রকাশিত হয় । সেই ভাষাকে লিখে রাখা যায় না । তা রাতের বেলায় কানে-কানে কর্কশস্বরে ফিসফিস করে বলা হয় । ভোর বেলায় তা লোকে ভুলে যায় । তোমাদের জগতের সদগুণকে প্রত্যাখ্যান করে, অপরাধীরা এক নিষিদ্ধ ব্রহ্মাণ্ডকে আশাহীনভাবে সঙ্গঠিত করার জন্য একমত হয় । তারা তার ভেতরে বসবাস করার জন্য আত্মসমর্পণ করে । সেখানকার হাওয়ায় বমি পায় : তারা তবু সেখানে শ্বাস নিতে পারে । কিন্তু — অপরাধীরা তোমার ধরাছোঁয়ার বাইরে– যেমন ভালোবাসায়, তারা পেছন ফেরে আর আমাকেও জগতসংসার আর তার আইনকানুন থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে বাধ্য করে । তাদের ঘাম, বীর্য, আর রক্তের গন্ধ । সংক্ষেপে, আমার দেহকে আর আমার তৃষ্ণার্ত আত্মাকে তা একনিষ্ঠতা উপহার দ্যায় । তাদের জগতের এই যৌনতার দরুন আমি অশুভের প্রতি আকৃষ্ট হই । আমার দুঃসাহসিক অভিযান, কখনও দ্রোহ বা অবিচারের অনু্ভূতির দ্বারা প্ররোচিত হয়নি, তা যেন এক দীর্ঘ সময়ের সঙ্গম, দুঃসহ, অদ্ভুত, যৌন উৎসব ছিল ( কাল্পনিক উৎসব যা কারাগারে নিয়ে যায় আর যাকে আগাম অনুমান করা যায় ) । যদিও তা অনুমোদিত, আমার দৃষ্টিতে তার ন্যায্যতা প্রতিপাদনও, জঘন্য অপরাধের, তা হবে অত্যন্ত অবক্ষয়ের নিদর্শন ।    সেই চরম বিন্দু যেখানে পুরুষদের জুগুপ্সাকে নিয়ে যায়, তাকে আমার মনে হতো বিশুদ্ধতার আদর্শ জায়গা, অর্থাৎ, সবচেয়ে ঘোলা প্রেমাত্মক সাদৃশ্য,  যেখানে উদযাপিত হয় মেকি বিয়ে ।    তাকে সুরে বাঁধবার ইচ্ছায়, আমি ব্যবহার করি স্বাভাবিক সংবেদনের আঙ্গিকে আমাকে দেয়া উপহার, যা দণ্ডিতের চেহারায় আগে থেকেই উত্তেজিত করে তোলে । ব্যাপারটা জাগিয়ে তোলে, তার রঙে আর তার বন্ধুরতায়, এক ধরণের ফুল যার পাপড়িগুলো কিছুটা কোঁকড়া, যার বর্ণনা আমার পক্ষে যথেষ্ট, শক্তিমত্তার ধারণাকে লজ্জার জুড়িদার করা ; লজ্জা যা কিনা প্রাকৃতিক স্তরে অত্যন্ত অপলকা আর মহার্ঘ । এই অনুষঙ্গ, যা আমাকে আমার সম্পর্কে অনেক কথা বলে, তা নিজের সম্পর্কে অন্য কোনো মনের কথা প্রস্তাব করবে না, আমার মন তা এড়াতে পারে না । এইভাবে আমি আমার কোমলতা দণ্ডিতদের উপহার দিয়েছি ; আমি তাদের মনোরম নামে ডাকতে চেয়েছি, তাদের অপরাধকে অভিহিত করতে চেয়েছি, শালীনতার কারণে, সূক্ষ্ম রূপকে ( যার আড়ালে আমি জানতে পারতুম না খুনির বৈভবী পৌরুষ, তার লিঙ্গের হিংস্রতা ) । এই ছবির মাধ্যমে আমি কি তাদের গিয়ানার পেনাল কলোনিতে কল্পনা করতে পারিনা : সবচেয়ে পালোয়ান, মাথায় শিঙ, সবচেয়ে কঠিন, মশারির ঢাকনার আড়ালে ? আর আমার ভেতরের প্রতিটি ফুল এমন এক বিষাদ ছড়ায় যে তার সবই দুঃখ আর মৃত্যুর নিদর্শন । এইভাবে আমি ভালোবাসা চাইলুম,  যেন তা বন্দিশিবিরের ব্যাপার । আমার প্রতিটি কামেচ্ছা আমাকে তার আশায় আকৃষ্ট করলো, তার একটা আভাস আমায় দিলো, আমাকে অপরাধীদের উপহার দিলো, তাদের কাছে আমাকে উপহার দিলো কিংবা আমাকে অপরাধ করার জন্য অনুপ্রাণিত করলো । যখন আমি এই বইটা লিখছি, শেষ অপরাধীরা ফ্রান্সে ফিরছে । সংবাদপত্রে সেই খবর প্রকাশিত হচ্ছে । রাজার উত্তরাধিকারীরা এক শূন্যতায় ভোগে যদি তাকে অভিষেক থেকে প্রজাতন্ত্র বঞ্চিত করে । বন্দিশিবিরের সমাপ্তি আমাদের জীবন্ত মননকে পৌরাণিক অতল জগতে উত্তীর্ণ হওয়ায় বাধা দ্যায় । আমাদের সবচেয়ে নাটকীয় আন্দোলনকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে । আমাদের অভিনিষ্ক্রমণ, নৈপূণ্য, সমুদ্রের পথে মিছিল, মাথা নত করে ক্রিয়ান্বিত হয়েছিল । ফিরে যাওয়া, সেই একই মিছিলের প্রত্যাবর্তন, তা অর্থহীন হয়ে গেছে । আমার অন্তরজগতে, বন্দিশিবিরের ধ্বংস হয়ে দাঁড়িয়েছে শাস্তির শাস্তি : আমাকে খোজা করা হয়েছে, আমি আমার কলঙ্ক থেকে কর্তিত । আমাদের স্বপ্নকে তাদের গৌরব থেকে মুণ্ডহীন করার ব্যাপারে উদাসীন, ওরা আমাদের আগেই ঘুম ভাঙিয়ে দ্যায় । পেনাল কলোনির তুলনায় দেশের কারাগারগুলোর নিজেদের ক্ষমতা থাকে : পেনাল কলোনির মতো তা  নয় । তা ছোটোখাটো । তাতে সেরকম সৌষ্ঠব, কিছুটা বিনীত মহিমা নেই । আবহাওয়া সেখানে এমন গুমোটভরা যে তোমায় নিজেকে হিঁচড়ে বেড়াতে হবে । তুমি হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াও । দেশের কারাগারগুলো বেশ উঁচু, আরও অন্ধকার আর কড়া মেজাজের ; পেনাল কলোনির ধীর, বিষণ্ণ যন্ত্রণাবোধ ছিল চরম দুর্দশার নিখুঁতভাবে কুসুমিত হবার জায়গা । তাই এখন দেশের জেলগুলো, বজ্জাত পুরুষে ফেঁপে ওঠা, পোশাক কালচে, অনেকটা রক্তের মতন, যা কার্বনিক গ্যাস দিয়ে ভেজানো । ( আমি “কালচে” লিখেছি । দণ্ডিতদের পোশাক — যারা ধরা পড়েছে, বিচারাধীন, এমনকি জেলবন্দিরাও, আমাদের নামকরণের জন্য যে শব্দগুলো বেছে নিয়েছে তা বেশ অভিজাত — আমার ওপরে শব্দটা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে : পোশাকগুলো সাদাসিধে বাদামি রঙের ।) আমার হ্যাংলামি তাদের জন্য। আমি জানি পেনাল কলোনি হোক বা দেশের কারাগার, তা প্রায়ই ব্যঙ্গাত্মক অনুকরণের মতন হয়। আওয়াজ-করা ভারি কাঠের জুতোয়, শাস্তি-পাওয়া লোকগুলো সব সময়েই যেন ভার সামলাতে পারে না । মাল নিয়ে যাবার ঠেলাগাড়ির সামনে হঠাৎ বোকার মতন ভেঙে পড়ে । কোনো পাহারাদারের উপস্হিতিতে ওরা মাথা নামায়, আর হাতে ধরে থাকে খড়ের তৈরি রোদ থেকে মাথা বাঁচাবার বড়ো টুপি — যা কমবয়সীগুলো সাজিয়ে নেয় ( আমার তাই মনে হয়েছে ) পাহারাদারের অনুমতি-দেয়া চুরি করা গোলাপফুলে — কিংবা বাদামি কাপড়ের বেরেটুপি। ওরা হতভাগা, বিনয়ের অভিনয় করে । যদি তাদের মারধর করা হয়, তাদের মগজে কোনো ব্যাপার নিশ্চয়ই কঠিন আকার নেবে : যারা ভিতু, তারা গুটিসুটি কেটে পড়ে, ভয় পাওয়া, কেটে পড়া, এগুলো হলো — যখন সবচেয়ে কঠিন অবস্হায় রাখা হয়, বিশুদ্ধ ভয় আর কেটে পড়া– তাদের শক্ত করে তোলা হয় “সুসিক্ত” করার মাধ্যমে, যেমন নরম লোহাকে শক্ত করা হয় সুসিক্ত করা হয় । এসব সত্বেও তারা চাটুকারিতা বজায় রাখে । যদিও আমি বিকলাঙ্গ আর দুর্ঘটনাগ্রস্তদের দুরছাই করি না, যারা সুপুরুষ অপরাধী,  আমার নমনীয়তা তাদের আকর্ষণ করে ।

 

অপরাধ, আমি নিজেকে বললুম, পিলোরগে বা অ্যাঞ্জেল সান-এর মতন নিখুঁত সফলদের গড়ে তোলার আগে তাকে বহুকাল অপেক্ষা করতে হয় । তাদের সংহার করার আগে ( শব্দটা নিষ্ঠুর ) জরুরি হলো একযোগে কিছু ঘটনার সংশ্লেষ : তাদের মুখের সৌন্দর্য, তাদের দেহের শক্তি আর সৌষ্ঠব আর তার সঙ্গে যোগ করতে হবে অপরাধ সম্পর্কে তাদের প্রবৃত্তি, পরিস্হিতি যা অপরাধীকে গড়ে তোলে, অমন অদৃষ্ট বেছে নেবার নৈতিক প্রাণশক্তির ধারণক্ষমতা, আর সব শেষে, শাস্তি, তার নিষ্ঠুরতা, স্বকীয় বৈশিষ্ট্য যা একজন অপরাধীকে তাতে গৌরবান্বিত বোধ করার অধিকার দ্যায়, আর, এই সমস্ত কিছু ছাপিয়ে, অন্ধকারের এলাকাগুলো । নায়ক যদি রাতের সঙ্গে লড়াই করে জিতে যায়, তাহলে তার কাছে থেকে যায় বিজয়ের টুকরো-টাকরা ! সেই একই সংশয়, খোশমেজাজ পরিস্হিতির একই কেলাসন, একজন খাঁটি গোয়েন্দার সফলতাকে দিশানির্দেশ দ্যায় । আমি উভয়কেই সন্মান করি । কিন্তু আমি তাদের অপরাধকে ভালোবাসি, তার জন্য যে শাস্তি বরাদ্দ, “সেই পেনালটি” ( আমার মনে হয় না তারা এর আগাম আঁচ করেনি। তাদের একজন, প্রাক্তন মুষ্ঠিযোদ্ধা লেডো, হাসিমুখে তদন্তকারীদের জবাব দিয়েছিল : “আমার অপরাধগুলো ? সেগুলো করার আগে হয়তো আমি তা নিয়ে অনুতাপ করতুম” ) যাতে আমি তাদের সঙ্গে যেতে চাই , যাইই হয়ে যাক না কেন, আমার ভালোবাসা উপচে পড়বে।

 

এই জার্নালে আমি অন্য কারণগুলো লুকোতে চাই না, যা আমাকে চোর বানিয়েছে, সবচেয়ে সহজ কারণ হলো ক্ষুধা, যদিও দ্রোহ, তিক্ততা, ক্রোধ কিংবা তেমন ধরণের ভাবপ্রবণতা আমার বাদবিচারে ঢোকেনি । গোঁড়ামিভরা যত্নে, “ঈর্ষান্বিত যত্নে”, আমি আমার দুঃসাহসিক অভিজানের খাতিরে নিজেকে গড়ে তুললুম, যেমনভাবে কেউ তার বিছানা বা ঘরকে ভালোবাসাবাসির আগে সাজায় ; অপরাধ করার  জন্য আমি ছিলুম গরম । আমার উত্তেজনা হলো এক থেকে আরেক জনের মাঝে দোল খাওয়া । তাকে বাতিল করে আমার যে কতো বড়ো ক্ষতি হয়েছে তা আমি গোপনে আবার কল্পনা করি, নিজের অন্তরে আর কেবল একা নিজের জন্য, গিয়ানার পেনাল কলোনির চেয়েও পঙ্কিল এক পেনাল কলোনি। আমি বলব যে দেশের কারাগারগুলোকে বলা চলে “ছায়াময়”। পেনাল কলোনিতে রয়েছে চড়া রোদে। সেখানে সবকিছু ঘটে নিষ্ঠুর আলোতে,  যাকে আমি প্রাঞ্জলতার নিদর্শন হিসাবে বেছে নেয়া ছাড়া আর কিছু বলতে পারব না ।

 

আমি সেই সাহসকে হিংস্রতার নাম দেবো,  যা অলস হয়ে অপেক্ষা করছে আর বিপদের অঙ্কশায়ী । তা দেখা যেতে পারে এক চাউনিতে, হাঁটাচলায়, এক হাসিতে, আর তোমার মধ্যেই যা আছে তা ফলত মুচড়ে ওঠে । তা তোমাকে কাবু করে ফ্যালে । হিংস্রতা হলো এক প্রশান্তি যা তোমাকে বিপর্যস্ত করে । বলাবলি করা হয় : “লোকটার আভিজাত্য আছে !” পিলোরগের অপলকা বৈশিষ্ট্য ছিল উদ্দাম হিংস্রতার । স্তিলিতানোর একটি মাত্র হাতের হিংস্রতার অভিসন্ধি, স্রেফ টেবিলের ওপরে রাখা, স্হির, নীরবতাকে বিঘ্নিত করেছে আর তা বেশ বিপজ্জনক । আমি চোরেদের আর কুটনিদের সঙ্গে কাজ করেছি, যাদের কর্তৃত্ব আমাকে তাদের ইচ্ছের কাছে ঝুঁকিয়েছে, কিন্তু কয়েকজনই সত্যিকারের সাহসী হিসাবে প্রমাণ করতে পেরেছে নিজেদের, তাদের মধ্যে যে জন সবচেয়ে বেশি সাহসী ছিল — গি — সে ছিল হিংস্রতাহীন । স্তিলিতানো, পিলোরগে আর মিশাই ছিল ভিতু । জাভাও তাই । এমনকি যখন বিশ্রাম নিচ্ছে, স্হির আর হাসিমুখ, তাদের চোখে, নাকের ফুটোতে, হাঁ-মুখে, হাতের তালুতে আর হাতে ধরা পড়তো, ফুলে ওঠা ঝুড়ি, সোয়েটার কিংবা ডেনিমের তলায় পেশির নিষ্ঠুর ঢিবি, এক উজ্বল আর নিরানন্দ ক্রোধ, দেখে মনে হতো আবছায়া।

কিন্তু, প্রায় সব সময়েই, ব্যাপারটাকে  চিহ্ণিত করার মতো কিছু নেই, স্বাভাবিক ইঙ্গিতের অনুপস্হিতি ছাড়া । রেনের মুখ প্রথম দর্শনে মনোরম । ওর নিচু বেঁকা নাক দেখে মনে হতো যেন চতুর দুর্বৃত্ত, যদিও ওর মুখের সীসার মতন ফ্যাকাশে উদ্বেগ তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলবে ।  ওর চোখদুটো ক্ষর, ওর ঘোরাফেরা শান্ত আর অসন্দিগ্ধ । স্নানের ঘরে ও ঠাণ্ডা মাথায় সমকামীদের পিটুনি দ্যায় ; তাদের পোশাক তল্লাসি করে, যা পায় কেড়ে নেয়, অনেক সময়ে, শেষ বার্তা হিসেবে, গোড়ালি দিয়ে পোঁদে লাথি মারে । আমি ওকে পছন্দ করি না, কিন্তু ওর ঠাণ্ডা মেজাজ আমাকে ওস্তাদি শেখায় । ও গভীর রাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে, পেচ্ছাপখানা, বাগান, ঝোপঝাড়, শঁজে লিজের গাছের তলায়, স্টেশনগুলোর কাছে, পোর মাইলোতে, বোয় দ্য বুলোনে ( সব সময়ে রাতের বেলায় ) এমন এক গাম্ভীর্য নিয়ে থাকে যা থেকে কল্পনাপ্রবণতা একেবারে বাদ । যখন ও ফেরে, ভোর দুটো বা তিনটের সময়ে, আমার মনে হয় আমি দুঃসাহসিক অভিযানে ফুলেফেঁপে উঠেছি । ওর দেহের প্রতিটি অঙ্গ, যা নিশাচরের, ওর কাজে অংশ নেয় : ওর হাত, ওর বাহু, ওর পা , ওর ঘাড়ের পেছন দিক । কিন্তু ও, এই সমস্ত বিস্ময় সম্পর্কে অনবহিত, আমাকে সেগুলো সম্পর্কে সোজাসুজি  বলে । পকেট থেকে বের করে আঙটি, বিয়ের আঙটি, ঘড়ি, সন্ধ্যাবেলাকার লুটের মাল। একটা বড়ো কাচের পাত্রে রাখে যা তখনই ভরে উঠবে । রাস্তায় পায়ুকামীদের বা তাদের কাজ কারবার দেখে ও অবাক হয় না, তা বরং ওর কাজকে সাহায্য করে । ও যখন আমার বিছানায় বসে, আমি উৎকর্ন হয়ে উঠি, ওর অভিযানের টুকরো টাকরা শোনার জন্য : জাঙিয়া পরা একজন অফিসার যার মানিব্যাগ ও চুরি করেছিল সে তার আঙুল তুলে চিৎকার করেছিল : “বেরিয়ে যাও !” রেনে ব্যাটা বিজ্ঞের উত্তর : “তুই কি মনে করিস তুই সৈন্যবাহিনীর কেউ ?” বুড়ো লোকের খুলিতে একখানা কড়া ঘুষি । সে লোকটা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল যখন রেনে, বেশ উত্তেজিত, দেরাজ খুলে একগাদা মরফিনের শিশি পেয়েছিল । অনেক গল্প, যেমন, যে সমকামীর পয়সাকড়ি ছিল না আর যাকে ও নিজের সামনে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেছিল । আমি এইসব ঘটনা শুনি বেশ একাগ্র হয়ে । আমার অ্যান্টওয়ের্পের জীবন মজার হয়ে ওঠে, ঋজু দেহের কাঠামোয়, আমার পুরুষালি ধরনধারন অনুযায়ী । আমি রেনেকে উৎসাহ দিই, আমি ওকে পরামর্শ দিই, ও আমার কথায় কান দ্যায় । আমি ওকে বলি যে নিজে প্রথমে কথা বলবে না । “লোকটাকে তোমার কাছে আসতে দাও, তাকে ঝুলিয়ে রাখো । অবাক হবার ভান করো, যখন সে বলবে, নাও করো। কার কাছে বোবা সাজতে হবে তা আঁচ করে নিও ।”

প্রতি রাতে আমি তথ্যের অংশবিশেষ যোগাড় করি । আমার কল্পনা তাতে হারিয়ে যায় না । আমার উত্তেজনার কারন আমি নিজের মধ্যে শিকার আর অপরাধী উভয়ের ভূমিকা খুঁজে পাই। সত্যি বলতে কি, আমি নিঃসরণ করি, রাতের বেলায় আমি আমার থেকে পয়দা হওয়া শিকার আর অপরাধীকে উদ্ভাবন করি ; আমি তাদের দুজনকে একই জায়গায় আনি, আর সকালের দিকে আমি জানতে পেরে উৎফুল্ল হই যে শিকার মৃত্যুদণ্ডের আদেশের মুখে পড়েছিল আর অপরাধীকে পাঠানো হচ্ছিল পেনাল কলোনিতে বা আরেকটু হলে গিলোটিনে চাপানো হচ্ছিল । এই ভাবে আমার উত্তেজনা আমার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, যা গিয়ানার পেনাল কলোনি ।

ওরা না চাইলেও, এই লোকগুলোর ভাবভঙ্গী আর নিয়তি ঝঞ্ঝাময় । তাদের আত্মা এমন হিংস্রতা সহ্য করে যা তারা চায়নি আর যাকে তারা মানিয়ে নিয়েছে । যাদের স্বভাবগত পরিবেশ হিংস্রতার, অথচ তারা নিজেদের কাছে সহজ-সরল । এই দ্রুত আর ধ্বংসাত্মক জীবনকে যে গতিবিধিগুলো গড়ে তোলে তা সরল আর সরাসরি, একজন নামকরা নকশাকারের আঁকা রেখার মতন পরিষ্কার — কিন্তু যখন রেখাগুলো চলন্ত অবস্হার মুখোমুখি হয়, তখনই ঝড় ওঠে, বিদ্যুতে তারা মারা পড়ে কিংবা আমি বিপদে পড়ি । তবু, তাদের হিংস্রতার সঙ্গে আমার হিংস্রতার কীই বা তুলনা, যার মানে তাদের হিংস্রতাকে মেনে নেয়া, তাকে আমার করে তোলা, তাকে আমার ইচ্ছে অনুযায়ী গড়ে নেয়া, তাকে থামিয়ে দেয়া, তাকে ব্যবহার করা, তাকে আমার ওপরে চাপিয়ে নেয়া, তাকে জানা, তাকে অনুমান করা, তার অনিষ্টপাতকে অনুধাবন আর উপলব্ধি করা ? কিন্তু যা আমার ছিল, আমার আত্মরক্ষার জন্য অভিলাষিত আর জরুরি, আমার বলিষ্ঠতা, আমার অনমনীয়তা, তাদের হিংস্রতার তুলনায়, যা তারা একটা অভিশাপের মতন পেয়েছে, যুগপৎ অন্তরজগতের আগুন আর বহির্জগতের আলো, যা তাদের পুড়িয়ে ছারখার করে আর আমাদের উদ্ভাসিত করে ? আমরা জানি যে তাদের অভিযানগুলো বালকসুলভ । তারা নিজেরা মূর্খ । তারা তাস খেলার হারজিত নিয়ে খুন করার জন্য বা খুন হবার জন্য তৈরি থাকে, যখন একজন প্রতিপক্ষ — কিংবা তারা নিজেরা — জোচ্চুরি করছিল । তা সত্বেও, অমন লোকেদের ধন্যবাদ, বিয়োগাত্মক ঘটনা সম্ভব হয় ।

এই ধরণের সংজ্ঞা — বহু পরস্পরবিরোধী উদাহরণ দিয়ে — হিংস্রতা সম্পর্কে তোমাকে অবহিত করছি।  আমি এমন শব্দ প্রয়োগ করব না কোনো ঘটনার নায়ককে তুলে ধরার খাতিরে, বরং তারা আমার সম্পর্কে কিছু  বলুক । আমাকে বুঝে ওঠার জন্য, কুকর্মে পাঠকের অংশগ্রহণ জরুরি । তবু আমি তাকে সতর্ক করে দেবো যখনই আমার ভাবোচ্ছাস আমার পদক্ষেপকে টলমলে করে তোলে ।

স্তিলিতানো ছিল দীর্ঘদেহী আর পালোয়ান । ওর চলনভঙ্গী ছিল একযোগে নমনীয় আর গোদা, প্রাণবন্ত আর ঢিমেতালে, সর্পিল ; লোকটা ছিল চটুল । আমার ওপরে ওর ক্ষমতার বেশির ভাগ — আর বারিও চিনোর বেশ্যাদের ওপর — কারণ হলো এক গাল থেকে আরেক গালে চালান করা ওর মুখের লালা, যা ও অনেকসময়ে হাঁ-মুখের সামনে আনতো পরদা টানার মতন । “কিন্তু কোথা থেকে এতো থুতু যোগাড় করে,” আমি নিজেকে জিগ্যেস করতুম, “কোথা থেকেই বা আনে? আমার তো কখনও ওর মতন তেলালো আর রঙিন হবে না । তা হবে পাকানো কাচের মতন মামুলি, স্বচ্ছ আর অপলকা ।” আমার পক্ষে কল্পনা করা স্বাভাবিক ছিল যে ওর লিঙ্গটা কেমন হবে যদি আমার সুবিধার জন্য তাতে অমন সুন্দর একটা জিনিস মাখায়, ওই দামি মাকড়সার তন্তু, এমন এক পাতলা-জাল যা আমি গোপনে প্রাসাদের আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করেছি । ও একটা পুরোনো ধূসর টুপি পরতো যার সামনে দিকটা ভাঙা । যখন ও সেটা আমাদের ঘরের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলতো, তা হঠাৎ হয়ে উঠতো যেন বেচারা কোনো ডানা কাটা মরা পায়রার মতন, কিন্তু যখন ও ওটা পরে নিতো, কান পর্যন্ত টেনে নামিয়ে, টুপির অন্য কিনারাটা ওপর দিকে উঠে যেতো আর দেখা যেতো ওর গৌরবান্বিত সোনালি চুল । ওর উজ্বল চোখের কথা যদি বলতে হয়, নম্রভাবে নামানো — তবু স্তিলিতানো সম্পর্কে বলতে হবে : “ওর হাবভাব অবিনয়ী” — যার ওপরে চোখ বন্ধ হয়ে আসতো আর চোখের পাতা এতো সোনালি, এতো উজ্বল আর ঘন, যে তা সন্ধ্যার ছায়া আনতো না বরং নিয়ে আসতো শয়তানের ছায়া। মোটের ওপর, কী মানে হয় যখন একটা দৃষ্টি আমাকে বন্দরের কাছে টলমলিয়ে দ্যায়, আমি দেখি জাহাজের পাল, একটু একটু করে, থেকে-থেকে, ছড়িয়ে পড়ে আর মাস্তুলের ওপর পর্যন্ত কষ্ট করে উঠে যায়, প্রথমে ইতস্তত, তারপর সুসংকল্পিত, যদি এই বিচলনগুলো স্তিলিতানোর প্রতি আমার প্রেমের বিচলনের প্রতীক না হয় তাছাড়া আর কীই বা হবে ? ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল বারসেলোনাতে । ও ভিখারি, চোর, পরী আর বেশ্যাদের জমঘটে বসবাস করছিল। ও ছোল সৌম্যকান্তি, কিন্তু এটা দেখার ছিল যে আমার অধঃপতনের সঙ্গে ওর সৌন্দর্যের কতোটা যোগাযোগ । আমার পোশাক ছিল নোংরা আর ছেঁড়া । আমি ছিলুম শীতে কাতর আর ক্ষুধার্ত। এই সময়টা ছিল আমার জীবনে সবচেয়ে দৈন্যপীড়িত ।

১৯৩২. স্পেন সে সময়ে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল ইঁদুর-ছুঁচোয়, তার ভিখারিতে । তারা গ্রাম থেকে গ্রামে যেতো, আন্দালুসিয়াতে কেননা জায়গাটা উষ্ণ, ক্যাটালোনিয়াতে কেননা জায়গাটা ধনী অধ্যুষিত, কিন্তু পুরো দেশটা ছিল আমাদের জন্য অনুকূল । ফলে আমি ছিলুম একটা উকুন আর সে ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিলুম । বারসেলোনাতে আমরা কালে মেদিওদিয়া আর কালে কারমেন-এ ঘুরে বেড়াতুম । অনেক সময়ে আমরা বিনা চাদরের বিছানায় ছয়জন শুতুম, আর সকালে উঠে বাজারে যেতুম ভিক্ষা করার জন্য । আমরা দল বেঁধে বারিও চিনো ছাড়তুম আর ছড়িয়ে পড়তুম প্যারালেলোতে, হাতে বাজারের সাজি নিয়ে, কেননা বাড়ির বউরা পয়সার বদলে একটা পেঁয়াজ বা শালগম দিতেন । দুপুরে আমরা ফিরতুম, আর কুড়িয়ে বাড়িয়ে পাওয়া সবজি দিয়ে সুপ বানাতুম । ইঁদুর-ছুঁচোর জীবনের কথাই বলব । বারসেলোনাতে আমি পুরুষদের জুটি দেখতে পেতুম যার দুজনে মধ্যে একজনের ভালোবাসা বেশি সে অন্যজনকে বলত:

“আজকে সকালের সাজিটা আমি নিয়ে যাবো।”

সে তুলে নিয়ে বেরিয়ে যেতো । একদিন সালভাদোর আমার হাত থেকে সাজিটা আলতো করে টেনে নিয়ে বলল, “আমি তোমার হয়ে ভিক্ষা চাইতে যাবো।”

বাইরে তুষার পড়ছিল । ও বরফজমা ঠাণ্ডা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল, ছেঁড়া আর ফর্দাফাঁই জ্যাকেট পরে — পকেটগুলো ছেঁড়া আর ঝুলন্ত — আর তেলচিটে ময়লায় অনমনীয় শার্ট । ওর মুখটা ছিল গরিব আর দুঃখি, ছলনাভরা, ফ্যাকাশে আর নোংরা, কেননা ঠাণ্ডার দরুন আমরা কখনও ধুতুম না । দুপুরবেলায়, ও সবজি নিয়ে ফিরলো আর কিছুটা চর্বি । এখানে আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করব এক ধরণের ক্ষতের দিকে — ভয়াবহ, কেননা বিপদ সত্বেও আমি উত্তেজিত করে দিতে পারতুম — যার মাধ্যমে আমার সামনে মেলে ধরা হতো সৌন্দর্য । আর তীব্র — ভাতৃসুলভ — ভালোবাসা আমার দেহকে তাতিয়ে তুললো আর টেনে নিয়ে গেলো সালভাদোরের কাছে । ওর পেছন পেছন হোটেল ছেড়ে, আমি ওকে দেখতুম একজন মহিলাকে মিনতি করছে । আমি ফরমুলাটা জানতুম, কেননা আমি নিজের জন্য আর অন্যের জন্য ভিক্ষা করেছি : এতে খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে হিতৈষিতা মিশ খায় ; ঈশ্বরের সঙ্গে গরিব লোকটাকে মেলায় ; ব্যাপারটা হৃদয় থেকে বেরোনো এমন এক নিরহঙ্কার যে আমার মনে হয় তা থেকে সরাসরি সুগন্ধের প্রকাশ ঘটে, ভিখারির হালকা শ্বাস যে তা উচ্চারণ করে । সারা স্পেন জুড়ে সে-সময়ে ওরা বলতো:

“ঈশ্বরের জন্য।”

ওর কথা শুনতে না পেলেও, আমি বুঝতে পারতুম যে প্রতিটি দোকানে, প্রতিটি গৃহবধূর কাছে এই কথাটাই ওগরাচ্ছা সালভাদোর । কোটনারা যেমন নিজেদের বেশ্যার দিকে নজর রাখে আমি ওর ওপর নজর রাখতুম, কিন্তু হৃদয়ে ওর জন্য কোমলতা পুষে ! এইভাবে, স্পেন আর আমার ভিখারির জীবন আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলো অপমানের মহিমার সঙ্গে, কেননা তার জন্য দরকার ছিল গর্ববোধ ( অর্থাৎ, ভালোবাসার ) ওই সমস্ত নোংরা, ঘৃণ্য প্রাণীদের সুশোভিত করার জন্য । দরকার ছিল কর্মদক্ষতার, যা আমি একটু-একটু করে হাসিল করলুম । যদিও তোমাকে এর কায়দা আমি ঠিকমতন বলতে পারবো না, অন্তত এটুকু বলতে পারি যে আস্তে আস্তে আমি নিজেকে বাধ্য করলুম এই দুস্হ জীবনকে স্বেচ্ছাকৃত প্রয়োজনীয়তা হিসাবে মেনে নিতে । ব্যাপারটা যা আমি ঠিক তাই মেনে নেওয়া ছাড়া আর কিছু ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করিনি, আমি একে উঁচুতে তুলিনি, মুখোশ পরাইনি, বরং উল্টোটা, আমি এর অপরিচ্ছন্নতাকে হুবহু সত্যাপন করতে চেয়েছি, আর সবচেয়ে নোংরা নিদর্শনগুলো আমার কাছে হয়ে উঠলো জাঁকজমকের নিদর্শন ।

এক সন্ধ্যায়, আমি আতঙ্কিত বোধ করলুম, যখন পুলিশের হানার পর আমার খানাতল্লাস করা হচ্ছিল — আমি সেই সময়ের কথা বলছি যা এই বইয়ের শুরুতে লেখা ঘটনাগুলোর আগের — অবাক গোয়েন্দা আমার পকেট থেকে টেনে বের করলো, অন্যান্য টুকিটাকির মধ্যে, ভেসলিনের একটা টিউব । আমরা এটা নিয়ে ঠাট্টা করতুম কেননা ভেসলিনটা ছিল মেনথল দেয়া । পুরো নথি দপতর, সেই সঙ্গে আমিও, যদিও কষ্ট করে, এইভাবে হাসিতে মুচড়ে উঠলুম :

“তুমি এটা নাকে শোঁকো ?”

“দ্যাখো, তোমায় আবার না সর্দিকাশিতে ধরে । তুমি তোমার জুড়িকে হুপিং কাফ দিয়ে ফেলবে।”

আমি ভাসা-ভাসা অনুবাদ করলুম, প্যারিসের একজন জোচ্চোরের ভাষায়, সুস্পষ্ট আর বিষাক্ত স্প্যানিশ প্রবাদের বিদ্বেষপরায়ন বিড়ম্বনাটুকু । ব্যাপারটা একটা ভেসলিন টিউবের যার পেছন দিকটা মোড়া ছিল । যার মানে দাঁড়ায় যে তা ব্যবহার করা হয়েছে । পুলিশ হানায় পুরুষদের পকেট থেকে যে সমস্ত চমৎকার টুকিটাকি বের করা হয়েছিল, এটা ছিল তার মধ্যে অপমানের নিখুঁত প্রতীক, যা বেশ সাবধানে লুকিয়ে রাখা হয়, তবু তা গোপন মহিমার চিহ্ণ, যা আমাকে পরে অবমাননা থেকে বাঁচিয়েছে । যখন আমাকে লকআপে পোরা হলো, আর আমি আমার তেজোময়তা ফিরে পেলুম যাতে গ্রেপ্তারির দুর্ভাগ্য কাটিয়ে উঠতে পারি, ভেসলিনের টিউবের ছবিটা আমাকে ছেড়ে যায়নি । পুলিশের লোকটা আমাকে ওটা বেশ ক্রুরভাবে দেখিয়েছিল, যাতে তারা তাদের প্রতিশোধস্পৃহায়, ঘৃণায়, অবমাননায় আহ্লাদে আটখানা হতে পারে । কিন্তু, দ্যাখো দ্যাখো ! সেই নোংরা, অপকৃষ্ট জিনিসটা যার উদ্দেশ্য দুনিয়ার কাছে মনে হয়েছিল — পৃথিবীর ওই প্রতিনিধি জমঘটের কাছে যা কিনা পুলিশের দল আর, তাছাড়া, ওই বিশেষ পুলিশের স্প্যানিশ দলটা, মুখে রসুনের দুর্গন্ধ, গায়ে ঘাম আর তেলের, কিন্তু দেখতে শাঁসালো, পেশি বেশ পালোয়ানি আর নিজেদের নৈতিক চালচলনে অটল — অত্যন্ত জঘণ্য, আমার কাছে হয়ে উঠলো বেশ মহার্ঘ । যেসব জিনিস আমার কোমলতাকে ফাঁস করে তাদের থেকে আলাদা, এই জিনিসটা মোটেই অলৌকিক মহিমাদীপ্ত ছিল না ; তা পড়ে রইলো টেবিলের ওপরে ভেসলিনের ধূসর টিউব হয়ে, ভাঙা আর বিবর্ণ, যার বিস্ময়কর বিচক্ষণতা, আর কারাগারের মহাফেজখানায় মামুলি জিনিসপত্রের সঙ্গে তার অত্যাবশ্যক সংগতি ( বেঞ্চ, কালির দোয়াত, নিয়মের বই, মাপার স্কেল, দুগন্ধ ), সাধারণ উদাসীনতার মাঝে, আমাকে মর্মপীড়িত করতে পারতো, যদি না টিউবের ভেতরের মাল আমাকে মনে করিয়ে দিতো একটা তেলের কুপির কথা ( হয়তো তার প্রাণবন্ত বৈশিষ্ট্যের জন্য ), রাতের বেলায় একটা কফিনের পাশে রাখা।

তা বর্ণনা করার জন্য, আমি আরেকবার একটা ছোটো লক্ষ্যবস্তু গড়ে তুলি, কিন্তু এই ছবিটা তাতে ঢুকে পড়ে : ল্যাম্পপোস্টের তলায়, যে শহরে বসে আমি লিখছি, একজন বুড়ির ম্লান মুখ, গোল, ছোটো, চাঁদের মতন, খুবই ফ্যাকাশে ; বলতে পারছি না আমি দুঃখ পেয়েছিলুম নাকি ভণ্ড সেজেছিলুম । বুড়ি এগিয়ে এলো আমার দিকে, বলল যে ও ভীষণ গরিব আর কিছু পয়সা চাইলো। ওই চাঁদামাছের মতন মুখের ভদ্রতা আমাকে তক্ষুনি বলল : বুড়িটা এখনই কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছে ।

“বুড়িটা চোর”, আমি নিজেকে বললুম । আমি যখন ওর কাছ থেকে চলে যাচ্ছি, এক ধরণের  তীব্র ভাবাবেশ, আমার অন্তরের গভীরে ঘুমিয়ে, আর তা আমার মনের কিনারায় নয়, আমাকে ভাবতে প্ররোচিত করল যে হয়তো বুড়িটা আমার মা যার সঙ্গে আমার এখন দেখা হলো । আমি তাঁর সম্পর্কে কিছুই জানি না যিনি আমাকে দোলনায় ফেলে চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু আশা করলুম যে রাতের বেলায় যে ভিক্ষা চাইছিল সেই বুড়িই আমার মা ।

“যদি তিনিই হতেন তাহলে কী হতো?” আমি বুড়ির থেকে দূরে যেতে যেতে ভাবতে লাগলুম । ওহ! যদি তাই হতো, আমি ওনাকে ফুলে ঢেকে দিতুম, গ্ল্যাডিওলি আর গোলাপে, আর চুমু দিয়ে ! ওই চাঁদ-মাছ চোখের ওপরে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে ফোঁপাতুম, ওই গোল, বোকা মুখের ওপরে ! “কিন্তু কেন”, আমার ভাবনা এগিয়ে চললো, “ কেনই বা তা নিয়ে কাঁদবো?” আবেগপ্রবণতার এই গতানুগতিক ছাপ আমার মগজ থেকে সরে যেতে বেশিক্ষণ লাগলো না, তার জায়গায় অন্য ব্যাপার এলো, সবচেয়ে নোংরা আর নিকৃষ্ট, যাকে আমি মর্মার্থের ক্ষমতা দিলুম চুমুর, কিংবা কান্নার কিংবা ফুলের ।

আমি ভাবলুম, “আমি ওনার কাঁধে মাথা রেখে আবোলতাবোল বলতে পারলে আনন্দিত হবো”, ভেসে যাবো ভালোবাসায় ( এক্ষুনি যে গ্ল্যাডিওলি ফুলের কথা বলেছি তা কি বাচ্চার লালার কথা মনে পড়ায় ? )। ওনার চুলেতে লালা ফেলবো কিংবা ওনার হাতে দুধ ওগরাবো । কিন্তি আমি সেই চোরকে আদর করতে চাইবো যা আমার মা ।

ভেসলিনের টিউব, যা আমার লিঙ্গকে তেলালো করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করি কিংবা আমার প্রেমিকদের লিঙ্গ, তাঁর মুখ মনে পড়িয়ে দিল যিনি, এক স্বপ্নবিহ্বলতার সময়ে যা শহরের অন্ধকার গলিতে ঘোরাফেরা করতো, তিনি ছিলেন মায়েদের মধ্যে সবচেয়ে অভীষ্ট । তা আমাকে আমার গোপন আনন্দগুলোর জন্যে গড়েপিটে তৈরি করেছিল, এমন সমস্ত জায়গায় যা অসম্বদ্ধ তুচ্ছতার, যা হয়ে উঠেছিল আমার খেয়ালখুশির শর্ত, এই যেমন আমার বীর্যের ছিটেফোঁটা লাগা রুমাল প্রমাণ করে । টেবিলের ওপরে শুয়ে, তা ছিল পুলিশের বিরুদ্ধে আমার ওড়ানো অদৃশ্য বিজয়কেতন । কারাগারের এক কুঠুরিতে । আমি জানতুম যে আমার ভেসলিনের টিউবটা সারারাত ধরে অপমানের মুখে পড়বে — চিরকালীন উপাসনার উলটো ব্যাপার — একদল সশক্ত, সৌম্যকান্তি, খসখসে কন্ঠে পুলিশের । এমনই তারা পালোয়ান যে তাদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল লোকটা সবকয়টা আঙুল মোচড়ায়, তা থেকে ফেটে বেরোবে, প্রথমে একটা ঠুসকি পাদ, ক্ষণিক আর পচা, গঁদের একটা ফিতে বেরিয়ে আসতে থাকবে হাস্যকর নৈঃশব্দে । যাই হোক, আমি জানতুম যে এই ছোটো আর বিনয়ী বস্তুটা ওদের বিরুদ্ধে নিজেই লড়ে যাবে ; তার সামান্য উপস্হিতি দিয়ে পৃথিবীর সমস্ত পুলিশকে বেশ চটিয়ে ফেলতে পারবে ; জিনিসটা নিজের দিকে টেনে আনবে অপমান, ঘৃণা, শাদা আর বোবা ক্রোধ । হয়তো জিনিসটা সামান্য বিদ্রুপ করবে– বিয়োগান্ত নায়কের মতন যে দেবতাদের চটিয়ে মজা পায় — তার মতনই অবিনাশী, আমার আনন্দে আত্মসমর্পিত, আর গর্বিত । আমি ফরাসি ভাষার নতুন শব্দে গান গাইতে চাইবো । কিন্তু আমি তার জন্য লড়তেও রাজি, তার সন্মানে সর্বসংহারের অনুষ্ঠান করতেও রাজি আর কোনো একটা গ্রামকে গোধুলীবেলায় লাল নিশান দিয়ে সাজিয়ে তুলতে চাইবো ।

কোনো নৈতিক কাজের সৌন্দর্য নির্ভর করে তার প্রকাশ করার মধ্যে । একথা বলা যে এই জিনিসটা সুন্দর তার মানে হলো যে তা সত্যিই সুন্দর । তাকে প্রমাণ করে দেখাতে হবে । এটা হলো ছবির করণীয় কাজ, অর্থাৎ, বাস্তব জগতের প্রভার সঙ্গে তার একাত্মতা । কাজটা সুন্দর হবে যদি তা প্ররোচিত করে, আর আমাদের কন্ঠে বিকশিত হয়, গান । অনেক সময়ে যে চেতনার সাহায্যে আমরা একটা বিখ্যাত কুকর্মের কথা ভেবেছি, প্রকাশ করার ক্ষমতার জন্য জরুরি তাকে জ্ঞাপন করা, আমাদের গান গাইতে বাধ্য করা । এর মানে হলো প্রতারণা ব্যাপারটা সুন্দর হবে যদি তা আমাদের দিয়ে গান গাওয়ায় । চোরদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে তা যে আমাকে আবার নৈতিক জগতে নিয়ে গিয়ে ফেলবে, তা নয়, আমি ভাবলুম, তার ফলে আমি আরেকবার নিজেকে সমকামীতার জগতে পাবো । আমার গায়ে যতো জোর বাড়ে, আমি আমার শুভ হয়ে উঠি । আমি হুকুম জারি করি। পুরুষদের ক্ষেত্রে সৌন্দর্য বলতে আমি বুঝি একটা মুখের আর শরীরের সমন্বয়পূর্ণ বৈশিষ্ট্য আর তার সঙ্গে অনেক সময়ে যোগ করতে হয় পুরুষালি চারুতা ।  সৌন্দর্যের সঙ্গে তখন যোগ হয় দুর্দান্ত সৌষ্ঠব, প্রবলপ্রতাপ আকার-ইঙ্গিত। আমরা মনে করি তারা নির্ধারিত হয় বিশেষ নৈতিক আচরণের মাধ্যমে, আর নিজেদের ভেতর তেমন সদগুণ চর্চা করে যা আমাদের শুকনো মুখ আর অসুস্হ শরীরকে সেই ওজস্বিতা দেবে যা প্রেমিকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে থাকে । হায়, এই সমস্ত সদগুণ, যা তাদের কখনও থাকে না, তা আমাদের দুর্বলতা ।

এই যে আমি লিখতে বসেছি, আমি আমার প্রেমিকদের নিয়ে ভাবি । আমি তাদের আমার ভেসলিন মাখিয়ে দিতে চাইবো, সেই মোলায়েম, মিহি মেনথলগন্ধ জিনিসটা ; আমি চাইবো তাদের পেশিগুলো স্নান করুক স্বচ্ছ হালকা জিনিসটায় যেটা ছাড়া সবচেয়ে সৌম্যকান্তির সাধনীটিও কম প্রণয়োদ্দীপক ।

যখন কোনো প্রত্যঙ্গ বাদ দেয়া হয়, বলা হয় যে অন্য অঙ্গটা তখন শক্তপোক্ত হয়ে বেড়ে ওঠে। আমি আশা করেছিলুম যে স্তিলিতানোকে যে হাতটা খোয়াতে হয়েছিল তার প্রাণক্ষমতা ওর লিঙ্গে একত্রিত হবে । অনেককাল যাবত আমি কল্পনা করেছি একজন সারবান সদস্যের, সোঁটার মতন, যা সবচেয়ে সাংঘাতিক অর্ন্তদৃষ্টির ক্ষমতা রাখে, অথচ যা আমাকে প্রথমে উৎসুক করলো তাহলো এই যে স্তিলিতানো আমাকে ব্যাপারটা জানতে দিলো : মামুলি ভাঁজের দাগ, যদিও আশ্চর্যজনকভাবে বাঁ পায়ে, ওর নীল ডেনিম ট্রাউজারে । এই ব্যাপারটা আমায় দুঃস্বপ্নে দেখা দিতো যদি না স্তিলিতানো উদ্ভট মুহূর্তগুলোয়, ওর হাত জায়গাটায় না রাখতো, আর যদি না ও, মহিলারা যেমন সৌজন্য দেখান, ভাঁজের দাগটা দেখিয়ে নখ দিয়ে কাপড়ের ওপর চিমটি কাটতো। আমার মনে হয় না ও কখনও আত্মাভিমান হারিয়েছে, কিন্তু আমার কাছে ও থাকতো বিশেষভাবে প্রশান্ত । নির্লজ্জের মতন হেসে, যদিও বেশ নিস্পৃহ, ওকে আমার আদর করার পানে চেয়ে থাকতো । আমি জানতুম ও আমাকে ভালোবাসবে ।

হাতে সাজি নিয়ে সালভাদোর, আমাদের হোটেলের চৌহদ্দি পেরোবার আগে, আমি এমন উত্তেজিত বোধ করছিলুম যে রাস্তাতেই ওকে চুমু খেলুম, কিন্তু ও আমাকে ঠেলে এক পাশে সরিয়ে দিলো :

“তোমার মাথা খারাপ ! লোকেরা ভাববে আমরা গাণ্ডু !”

ও ফরাসিভাষা ভালোই বলতে পারতো, পেরিপিয়াঁয় আঙুর ক্ষেতে কাজ করার সময়ে শিখেছিল। গভীর আঘাত পেয়ে আমি পেছন ফিরলুম । ওর মুখ বেগুনি হয়ে উঠলো। ওর গায়ের রঙ ছিল শীতের বাঁধাকপির মতন । সালভাদোর হাসলো না । ও মর্মাহত হয়েছে টের পেলুম । “আমি এরকম ব্যবহারই পাই”, ও নিশ্চয়ই ভেবেছিল, “সাতসকালে উঠে তুষারের মধ্যে ভিক্ষা করার বদলে। ও জানেই না কেমন আচরণ করতে হয়।” ওর চুল ভিজে গিয়েছিল আর জটপাকানো। জানালার ভেতর থেকে, মুখগুলো আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল, কেননা হোটেলের একতলায় একটা কাফে ছিল যা ফুটপাত পর্যন্ত প্রসারিত, যার মধ্যে দিয়ে যেতে হতো ওপরের ঘরে যাবার জন্য। আস্তিনে মুখ পুঁছে সালভাদোর ভেতরে চলে গেলো । আমি ইতস্তত করছিলুম । তারপর ওর পেছন পেছন ঢুকলুম । আমার তখন কুড়ি বছর বয়স । যদি নাকের ডগায় একটা ফোঁটা চোখের জলের মতন অনাবিল হয় তাহলে কেনই বা তা একই আগ্রহে চেটে নেবো না ? আমি আগে থেকেই যথেষ্ট জড়িয়ে পড়েছিলুম নীচকুলোদ্ভবদের পুনর্বাসনে । যদি না বেয়াড়া সালভাদোরের ভয়ের ব্যাপার হতো, আমি কাফেতেই ওকে চুমু খেতে পারতুম । ও, যদিও, নাকের জল ফেলছিল, আমি বুঝতে পারলুম ও নিজের শ্লেষ্মা গিলছিল । হাতে সাজি নিয়ে, ভিখারি আর ভবঘুরে নিরাশ্রয়দের পাশ কাটিয়ে ও রান্নাঘরের দিকে এগোলো । আমার আগে-আগে ।

“তোমার সঙ্গে ব্যাপারটা কি বলোতো ?” আমি বললুম ।

“তুমি লোকেদের মনোযোগ আকর্ষণ করছ।”

“তাতে দোষের কি?”

“লোকে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ওইভাবে চুমু খায় না । আজ রাতে, তুমি যদি চাও…”

ও ঠোঁট ফাঁক করে এমনভাবে কথাগুলো বললো মনে হলো তা কমনীয়তাহীন আর সেই সঙ্গে একইরকম অবজ্ঞার সুরে । আমি শুধু আমার কৃতজ্ঞতা জানাতে চেয়েছিলুম, আমার দারিদ্রের স্নেহে উষ্ণতা দিতে চেয়েছিলুম ।

“কিন্তু তুমি কি ভাবছিলে ?”

কেউ একজন ওর সঙ্গে ধাক্কা খেলো আর দুঃখ প্রকাশ করলো না, ওকে আমার থেকে আলাদা করে দিলো । আমি ওকে রান্নাঘরের ভেতর পর্যন্ত অনুসরণ করিনি ।আমি স্টোভের কাছে একটা ফাঁকা বেঞ্চে গিয়ে বসলুম । যদিও আমি সতেজ সৌন্দর্যের প্রশংসা করি, আমি এখন আর মাথা ঘামালুম না যে এই গেরস্হ ধরণের লোকটাকে ভালোবাসার জন্যে নিজেকে কেমনভাবে উপস্হিত করব ; এমনই এক দারিদ্র্যপীড়িত ভিখারি যার ওপর কম সাহসীরাও তর্জন-গর্জন করতে পারে, কেমন করেই বা ওর তেকোনা পাছাকে আদর করতে পারবো…আর যদি, দুর্ভাগ্যবশত, ওর সাধনীটা প্রণয়োদ্দীপক হয় ?

বারিও চিনো জায়গাটা, সে-সময়ে, ছিল একধরণের আস্তানা যেখানে স্পেনের লোকেরা কম আর বিদেশিরা বেশি ভিড় করতো, তাদের সব কয়টা ছাঁটাই মাল । আমরা অনেকসময়ে কাগজি-বাদাম সবুজ পোশাক পরতুম কিংবা নার্সিসাস-হলুদ রেশমের শার্ট আর ছেঁড়া ক্যাম্বিশ জুতো, আর আমাদের চুল এমন পেছন দিকে চেকনাই দেয়া থাকতো যে মনে হতো তাতে চিড় ধরবে । আমাদের কোনো নেতা ছিল না বরং পরিচালক ছিল । আমি বলতে পারছি না কেমন করে তারা অমন ক্ষমতা পেলো । বোধহয় আমাদের সামান্য মালপত্রের ভালো দাম যোগাড় করতে পারতো বলে । ওরা আমাদের সমস্যার খেয়াল রাখতো আর কাজকারবারের ব্যাপারে খবর দিতো, তার জন্য ওরা মোটামুটি একটা অংশ নিতো । আমরা ঢিলেঢালা দল গড়িনি, কিন্তু সেই বিরাট নোংরা বিশৃঙ্খলায়, যে পরিবেশে তেলকুটে দুর্গন্ধ, পেচ্ছাপ আর গুয়ের ছড়াছড়ি, কয়েকজন বাজে আর ইতর লোক নিজেদের চেয়ে চালাক-চতুরদের ওপর বেশি নির্ভর করতো। কলুষ আর কল্মষ আমাদের যুবকদের সঙ্গে ঝিলমিলিয়ে উঠতো আর হাতেগোণা কয়েকজনের রহস্যময় প্রতিভা, যারা সত্যিই স্ফূলিঙ্গ ছড়াতো, যুবকেরা যাদের দেহ, চাউনি আর ইশারা-ইঙ্গিত এমন এক চৌম্বকশক্তিতে আকর্ষণীয় ছিল যে আমাদের করে তুলতো তাদের শিকারী । এই ভাবেই আমি ওদের একজনের দ্বারা টলে গিয়েছিলুম । এক হাতের স্তিলিতানো সম্পর্কে লেখার জন্য আমি কয়েক পৃষ্ঠা অপেক্ষা করবো । শুরুতেই বলে ফেলা যাক ওর কোনো খ্রিস্টধর্মী মূল্যবোধ ছিল না । ওর পুরো ধীশক্তির, ওর পুরো ক্ষমতার, উৎস ছিল ওর দুই উরুর ফাঁকে । ওর লিঙ্গ, আর যা তাকে সম্পূর্ণ করে, সম্পূর্ণ যন্ত্রপাতি, এতোই সুন্দর ছিল যে আমি তাকে সৃজক অবয়ব বলতে পারি । যে কেউ মনে করতে পারতো যে ও মরে পড়ে আছে, কেননা ও কদাচিৎ, আর বেশ ধীরেসুস্তে, উত্তেজিত হতো : ও কেবল দেখতো । অন্ধকারে ভালোভাবে বোতামদেয়া অবস্হায় ও নিষ্পাদনের জন্য তৈরি হতো, যদিও কেবল এক হাতে বোতাম পরানো, যে আলোকময়তায় জিনিসটার বাহক উজ্বল হয়ে উঠবে ।

সালভাদোরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছয় মাস বজায় ছিল । এটা সবচেয়ে মোহক ভালোবাসা ছিল না, ছিল বহুপ্রসূ ভালোবাসাগুলোর অন্যতম । আমি ওই অসুস্হ দেহ, ধূসর মুখ, আর কয়েকটা চুলের হাস্যকর দাড়ির লোকটাকে ভালোবাসার জন্য নিজেকে বাগ মানিয়ে নিয়েছিলুম । সালভাদোর আমার যত্ন করতো, কিন্তু রাতের বেলায়, মোমবাতির আলোয়, আমি হুকুন বাছতুম, আমাদের পোষা প্রাণী, যেগুলো বাসা বাঁধতো আমাদের ট্রাউজারের খাঁজে-খাঁজে । উকুনগুলো আমাদের সঙ্গে বসবাস করতো । আমাদের জামাকাপড়কে প্রাণবন্ত করতো, এক উপস্হিতি, আর যখন ওরা বিদায় নিতো, আমাদের পোশাক হয়ে যেতো প্রাণহীন । আমরা জানতে চাইতুম — আর অনুভব করতে — যে এই আধা-স্বচ্ছ পোকাগুলো ঝাঁক বেঁধে রয়েছে, যদিও পোষা নয়, ওগুলো আমাদের জীবনের এমন অংশ হয়ে গিয়েছিল যে তৃতীয় কোনো লোকের উকুন আমাদের বিতৃষ্ণা জাগাতো ।  আমরা ওগুলোকে তাড়াতুম কিন্তু দিনের বেলায় ভাবতুম ডিমগুলো থেকে কচি উকুন বেরিয়েছে । ওগুলোকে নখে পিষে মারতুম, কোনোরকম বিতৃষ্ণা আর ঘৃণা ছাড়াই । লাশগুলোকে ফেলে দিতুম না — বা অবশিষ্টাংশ — জঞ্জালে ; ওগুলোকে পড়ে যেতে দিতুম, আমাদের রক্তে রক্তাক্ত, আমাদের অপরিচ্ছন্ন জাঙিয়ায় । আমাদের উন্নতির একমাত্র প্রমাণ ছিল উকুনগুলো, উন্নতির পাতালের নিদর্শন, কিন্তু ব্যাপারটা যুক্তিযুক্ত ছিল এই কারণে যে আমাদের অবস্হা একটা অপারেশান করতে পারলো যা ন্যায্যতা প্রমাণ করে, যে আমরা, একই শর্তে, আমাদের অবস্হার চিহ্ণগুলোকে ন্যায্যতা দিচ্ছি । উকুনগুলো ছিল দামি, কেননা আমাদের অবসানের জরুরি জ্ঞানের জন্য এই মণিরত্নগুলোকে, বলা যেতে পারে, আমাদের বিজয় । তারা চিল একযোগে আমাদের গৌরব ও লজ্জা । আমি বহুদিন একটা ঘরে থাকতুম যাতে জানালা ছিল না, কেবল দালানে একটা ঘুলঘুলি, যেখানে, সন্ধ্যাবেলায়, পাঁচটা চোটো মুখ, নিষ্ঠুর আর কোমল, হাসতো কিংবা গুমোট জায়গাটাকে আঁটার অযোগ্য করে তুলতো, টপটপে ঘাম ফেলে, ওই পোকাগুলো শিকার করতো যেগুলোর সুকৃতিতে আমরা অংশ নিয়েছি । ভালো ছিল যে অমন দুর্দশার গভীরে, আমি ছিলুম গৃহস্হের মধ্যে সবচেয়ে গরিবের প্রেমিক । আমি তাই পেয়েছিলুম এক বিরল সুবিধা । মুশকিল হতো বটে, কিন্তু আমার প্রতিটি বিজয় — আমার নোংরা হাত, গর্বে মেলে ধরা, আমার দাড়ি আর দীর্ঘ চুলকে সদম্ভে প্রকাশ করতে পারতো — আমাকে দিতো শক্তি — কিংবা দুর্বলতা, আর এখানে দুটো ব্যাপারই এক– কেননা বিজয় অনুসরণ করে, যা আমাদের ভাষায় বলা হতো অপমানপূর্ণ হতাশা । তবু, আমাদের জীবনে আলো আর প্রতিভা জরুরি হওয়ার কারণে, শার্শি আর জঞ্জালের ভেতর দিয়ে একটা সূর্যরশ্মি আসতো আর ঢুকে পড়তো নিষ্প্রভতায় ; এই উপাদানগুলোর জন্য আমাদের ছিল শিশির জমে তৈরি তুষার, মেঝের ওপরে বরফের পাতলা প্রলেপ, যদিও তারা দুর্যোগ সৃষ্টি করতে পারে, আমাদের কাছে যথেষ্ট ছিল, আনন্দের উৎস, যার চিহ্ণ, আমাদের ঘরে অনন্বিত : ক্রীসমাস আর নববর্ষ উৎসব সম্পর্কে আমরা যেটুকু জানতুম তা হল তার সঙ্গে যাকিছু থাকে আর যা উল্লাসিত লোকদের কাছে প্রিয় : তুষার ।

নিজেদের ক্ষতকে চর্চা করাটাও ভিখারিদের কাছে বাড়তি পয়সা রোজগারের একটা উপায় — যার ওপর নির্ভর করে জীবন চালানো যায় — যদিও তারা হয়তো এই পথে চলে যায় তাদের দারিদ্র্যের হালতের  আলস্যের দরুণ, গর্বে মাথা তুলে দাঁড়ানো, অবজ্ঞাকে পরোয়া না করে, সেই জিনিসটা হলো পুরুষালি সততা । নদীতে পাথরের মতন, গর্বও ভেঙে পড়ে আর অবহেলায় চূর্ণ হয়, ফেটে যায় । আরও অপমানে প্রবেশ করলে, গর্ববোধ উন্নত হবে ( যদি সেই ভিখারিটা আমি হই ) যখন আমি জানি — শক্তি বা দুর্বলতা — অমন অদৃষ্টের সুযোগ নেবার জন্য । এটা খুবই জরুরি, যেমন এই কুষ্ঠরোগ আমাকে কাবু করছে, আমাকেও তাকে কাবু করতে হবে আর, শেষে, আমাকে জিততে হবে । তাহলে কি আমি ক্রমশ  করে জঘন্য হয়ে উঠবো, বেশির থেকে বেশি, বিতৃষ্ণার পাত্র, সেই অন্তিম বিন্দু পর্যন্ত যা এখনও অজানা কিন্তু যা এক নান্দনিকতা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হবে আর সেই সঙ্গে নৈতিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে ? বলা হয় যে কুষ্ঠরোগ, যার সঙ্গে আমি আমাদের অবস্হার তুলনা করি, টিশ্যুগুলোতে চুলকানির সৃষ্টি করে ; রোগি নিজেকে চুলকাতে থাকে ; তার লিঙ্গোথ্থান হয় । স্বমেহন হয়ে দাঁড়ায় পৌনোঃপুনিক । তার নিঃসঙ্গ যৌনতায় কুষ্ঠরোগি নিজেকে সান্তনা দ্যায় আর নিজের রোগের স্তবগান গায় । দারিদ্র্য আমাদের ঋজু করেছে । সারা স্পেন জুড়ে আমরা এক গুপ্ত ব্যাপার বয়ে বেড়িয়েছি, ঔদ্ধত্বের সঙ্গে মিশেল না দেয়া অবগুন্ঠিত চমৎকারীত্ব । আমাদের অঙ্গভঙ্গী হয়ে উঠলো নম্র থেকে আরও নম্র, মিনমিনে থেকে আরও মিনমিনে, যেমন যেমন আমাদের নীচাবস্হার স্ফূলিঙ্গ আমাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য আরও দীপ্ত হতে থাকলো । এইভাবে আমার ভিখারির চেহারাকে মহিমায় মুড়ে তোলার জন্য আমার মধ্যে বিকশিত হলো বিশেষ কর্মদক্ষতা । ( আমি এখনও সাহিত্যিক প্রতিভার কথা বলিনি ।) এটা একটা কাজে লাগাবার শৃঙ্খলা বলে আমার মনে হয়েছে আর এখনও তার দরুণ আমি মৃদু হাসি হাসতে পারি সবচেয়ে নম্র পেঁকোদের মাঝে, তা মানুষ হোক বা জিনিসপত্র, এমনকি বমিও, এমনকি যে লালা আমি আমার মায়ের মুখের ওপর উগরে আবোলতাবোল বকতে পারতুম, এমনকি তোমার গু-পেচ্ছাপ । ভিখারি হবার অবস্হানের ধারণা আমি আমার মধ্যে সংরক্ষণ করে রাখবো ।

আমি হতে চেয়েছিলুম মহিলাদের মতন যাঁরা, বাড়িতে, লোকেদের দৃষ্টির আড়ালে, নিজের মেয়েকে সামলে রাখে, এক ধরণের বীভৎস কদাকার দানব, বোকা আর শ্বেতাঙ্গ, যে চার পায়ে ঘোঁৎঘোৎ করে বেড়ায় । মা যখন জন্ম দিয়েছিলেন, তখন ওনার বিষাদ সম্ভবত এমন ছিল যা তা তাঁর জীবনের একমাত্র সারসত্তা হয়ে উঠেছিল । উনি এই দানবকে ভালোবাসবার নির্ণয় নিলেন, তাঁর পেট থেকে যে কদর্যতা বেরিয়ে এসেছিল, শ্রমের দ্বারা সুসম্পন্ন, আর তাকে ভক্তিভরে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন । তাঁর নিজের ভেতরে তিনি এক বেদিকে সাজিয়ে তুলেছিলেন যার ওপরে তিনি দানবের ধারণাকে সংরক্ষণ করেছিলেন । স্নেহে উৎসর্গ করে, আলতো হাতে, তাঁর প্রতিদিনের পরিশ্রমে তাতে কড়া পড়ে গিয়ে থাকলেও, আশাহীনের স্বেচ্ছাকৃত উদ্দীপনায়, তিনি নিজেকে পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিলেন আর পৃথিবীর বিরুদ্ধে তিনি দাঁড় করিয়ে দিলেন দানবটাকে, যা জগতের আর তার ক্ষমতার সমানুপাত নিয়ে নিলো । দানবকে বনিয়াদ করে নতুন রীতিনীতি প্রতিপাদন করা হলো, যে রীতিনীতি কে অবিরাম লড়ে যেতে হয়েছে জগতের পরাক্রমের সঙ্গে যা তাঁকে বিদ্ধস্ত করতে এগিয়ে এসেছে কিন্তু থেমে গেছে তাঁর বাসার দেয়ালের কাছে পৌঁছে যেখানে তাঁর মেয়ে অবরুদ্ধ ছিল ।

কিন্তু, অনেকসময়ে চুরি করা দরকার ছিল, আমরা জানতুম সাহসের সুস্পষ্ট পার্থিব সৌন্দর্যের কথা । ঘুমোতে যাবার আগে, সরদার, মানে দলের কর্তা, আমাদের পরামর্শ দিতো । যেমন ধরা যাক, আমরা জাল কাগজ নিয়ে নানা কনসুলেটে যাবো যাতে আমাদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানো হয় । দেশের দূত, আমাদের দুঃখকষ্ট আর দুর্দশায় প্রভাবিত হয়ে বা চটে গিয়ে, আমাদের টিকিট কেটে দেবেন সীমা পর্যন্ত । আমাদের নেতা সেগুলো বারসেলোনা স্টেশানে বিক্রি করে দেবে । সে আমাদের বলতো গির্জায় কেমন করে চুরি করতে হবে — যা স্পেনের লোক করতে সাহস পায় না — কিংবা বড়োলোকদের ভিলায় ; আর ও নিজে নিয়ে আসতো নেদারল্যাণ্ড আর ইংরেজ নাবিকদের যাদের কাছে আমরা খুচরো পয়সার জন্য গাণ্ডুগিরি করতুম ।

এইভাবে আমরা কখনও চুরি করতুম, আর প্রতিটি লুটতরাজ আমাদের কিছুদিনের জন্য খোলা জায়গায় স্বাস নিতে দিতো । রাতের তৎপরতার জন্য আমাদের আগে থেকে খবর রাখতে হতো অস্ত্রশস্ত্রের । ভয়ের চোটে তৈরি স্নায়বিক দুর্বলতা, আর অনেক সময়ে উদ্বেগ,  ধার্মিকের মতন মেজাজ গড়ে তোলে । সেরকম সময়ে আমি সামান্য দুর্ঘটনাতেও অশুভের সংকেত পেতুম । সুযোগের ইশারা হয়ে ওঠে অনেক ব্যাপার । অজানা ক্ষমতাগুলোকে আমি জাদুমুগ্ধ করে দিতে চাই যার ওপর আমাদের অভিযানের সফলতা নির্ভর করে । আমি নৈতিক কাজ দিয়ে তাদের জাদুমুগ্ধ করতে চাই, মূলত দান-খয়রাতের মাধ্যমে । আমি ভিখারিদের বেশি করে আর হাত খুলে দিত চাই, আমি বুড়ো লোকেদের আমার আসন ছেড়ে দিই, আমি একপাশে সরে দাঁড়াই যাতে তারা যেতে পারে, আমি অন্ধদের রাস্তা পার হতে সাহায্য করি, আরও কতো কি। এইভাবে, মনে হয় আমি মেনে নিই যে চুরিচামারির কাজের ওপর একজন দেবতার শাসন কাজ করে যাঁর কাছে নৈতিক কাজ গ্রহণযোগ্য । এই প্রয়াসগুলো হলো সুযোগের ওপরে জাল ফেলার কাজ যাতে এই দেবতা, যার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না, জালে ধরা পড়বে, আমাকে ক্লান্ত করবে, বিঘ্ন সৃষ্টি করবে আর ধার্মিক মনঃস্হিতি তৈরি করতে সাহায্য করবে । চুরি করার ব্যাপারে তারা আনুষ্ঠানিক কাজের গাম্ভীর্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করে । তা সত্যিই অন্ধকারের হৃদয়ে অনুষ্ঠিত হয়, তার সঙ্গে যোগ হব যে তা রাতে হলে ভালো, যখন লোকেরা ঘুমোয়, এমন জায়গা যা বন্ধ আর হয়তো কালোর মুখোশে ঢাকা । পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে হাঁটা, নৈঃশব্দ্য, দিনের বেলাতেও যে অদৃশ্যতা আমাদের দরকার হয়, হাতড়ানো হাতের অন্ধকারে ইশারা কোনো আসন্ন জটিলতা বা সতর্কতার । কেবল একটা দরোজার হাতল ঘোরানোতেও দরকার হয় অনেকগুলো প্রক্রিয়া, প্রতিটি পলকাটা মণিরত্নের মতন দীপ্তিমান । যখন আমি সোনা খুঁজে পাই, তখন মনে হয় আমি তা মাটির তলা থেকে বের করেছি ; আমি বহু উপমহাদেশকে, দক্ষিণ-সমুদ্রের দ্বীপগুলো লুট করেছি ; আমাকে নিগ্রোরা ঘিরে রেখেছে ; তারা আমার অসুরক্ষিত দেহকে বিষমাখানো বর্শা দিয়ে খোঁচা দেবার হুমকি দ্যায়, কিন্তু তখন সোনার সততা কাজ করা আরম্ভ করে, আর আমাকে দারুণ একটা বলিষ্ঠতা পিষে ফ্যালে কিংবা উল্লসিত করে । বর্শাগুলো নামানো হয়, নিগ্রোরা আমাকে চিনতে পারে আর আমি উপজাতির একজন সদস্য হয়ে যাই ।

নিখুঁত কাজ : ভুল করে আমার হাত সৌম্যকান্তি এক ঘুমন্ত নিগ্রোর পকেটে ঢুকে যায়, আমার আঙুলে তার শক্ত হতে থাকা লিঙ্গ অনুভব করি আর হাত বের করে তার পকেট থেকে চুরি করা সোনার মুদ্রা আবিষ্কার করি — বিচক্ষণতা, ফিসফিসে কন্ঠস্বর, উৎকর্ণ কান, অদৃশ্য, কোনো দোসরের স্নায়বিক দুর্বল উপস্হিতি আর তার ইশারা বুঝতে পারা, সবকিছু আমাদের নিজেদের মধ্যে কেন্দ্রিত করে, আমাদের একজুট করে, আমাদের করে তোলে উপস্হিতির নাচের দল, যা গি-এর মন্তব্য ভালো ব্যাখ্যা করে :

“তুমি অনুভব করো যে তুমি জীবন্ত।”

কিন্তু আমার অন্তরজগতে, এই সামগ্রিক উপস্হিতি, যা আমার মনে হয় কাজের গাম্ভীর্যকে অসাধারণ ক্ষমতার বোমায় পালটে দিয়েছে, তা যেন এক অন্তিক ভালোথাকা— লুটতরাজ, যখন চলছে, সব সময়ে মনে হয় এটাই শেষ, এমন নয় যে তুমি ভাবো যে এর পর আরেকটা করবে না — বস্তুত তুমি ভাবোই না — বরং অমন অহং-এর একত্রীকরণ হতে পারে না ( জীবনে তো নয়ই, কেননা একে আরও চাপ দিলে জীবন থেকে কেটে পড়তে হবে ) ; আর কাজের এই একতা যা বিকশিত হয় ( যেমন গোলাপফুল তার দলমণ্ডল মেলে ধরে ) তা সচেতন ইঙ্গিত-ইশারার, তাদের নৈপূণ্য সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী, তাদের দুর্বলতা সম্পর্কেও আর তবু কাজটায় যে হিংস্রতা আছে, এখানেও তাকে ধার্মিক আচার-আচরণের মূল্য দ্যায় । প্রায়ই আমি তা কাউকে উৎসর্গ করি । প্রথমবার ছিল স্তিলিতানো যার অমন সন্মান ছিল প্রাপ্য । আমার মনে হয় ওর দ্বারাই আমি অভিষিক্ত হয়েছিলুম, মানে, ওর দেহ সম্পর্কে আমার আবেশ আমাকে পিছিয়ে আসতে দ্যায়নি। ওর সৌন্দর্যের প্রতি, ওর খোলাখুলি দুর্বিনয়ের প্রতি, আমি প্রথম দিকের চুরিগুলো উৎসর্গ করেছিলুম । ওই অসাধারণ বিকলাঙ্গের এককত্বও, যার হাত, কবজির কাছ থেকে কাটা, কোথাও পচছে, কোনো চেস্টনাট গাছের তলায়, ও আমাকে তাইই বলেছিল, মধ্য ইউরোপের জঙ্গলে । চুরি করার সময়ে, আমার শরীর ফাঁস হয়ে যায় । আমি জানি তা আমার ইশারা-ইঙ্গিতে ঝলমল করে । পৃইবী আমার সমস্ত চলাফেরা সম্পর্কে একাগ্র, যদি তা আমায় ল্যাঙ মারতে চায় । সামান্য ভুলের জন্য আমাকে বড়ো খেসারত দিতে হবে, কিন্তু যদি ভুল হয়ও আর আমি তা সময়মতো টের পাই, তাহলে আমাদের বাপের আস্তানায় সবাই আহ্লাদে আটখানা হবে । কিংবা, যদি ফেঁসে যাই, তাহলে বিপর্যয়ের পর বিপর্যয় আর তারপর কারাগার । কিন্তু বুনো অমার্জিতদের ক্ষেত্রে, যে দণ্ডপ্রাপ্ত পালাবার ব্যবস্হা করার ঝুঁকি নেয় সে তাদের সঙ্গে সেই উপায়ে দেখা করবে যা আমি সংক্ষেপে আমার অভ্যন্তরিক অভিযানে বর্ণনা করেছি । যদি অচেনা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে-যেতে, সে প্রাচীন উপজাতিদের পাহারা-দেওয়া কোনো মাল পাচারকারীর মুখোমুখি হয়, তাহলে তারা তাকে মেরে ফেলবে কিংবা বাঁচাবে । আদিম জীবনে ফিরে যাবার জন্য আমি দীর্ঘ, বহু দীর্ঘ পথ বেছে নিয়েছিলুম । যা আমি সবচেয়ে আগে চাই তা হল আমাদের জাতির দ্বারা নিন্দা ।

সালভাদোর আমার কাছে গর্ববোধের উৎস ছিল না । ও যখন চুরি করতো, ও কেবল দোকানগুলোর সামনের জানলার তাক থেকে মামুলি জিনিস তুলে নিতো । রাতের বেলায়, যে কাফেতে আমরা সবাই জড়ো হতুম, ও আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সৌম্যকান্তির পাশে দুঃখি মুখে সেঁদিয়ে যেতো । অমন জীবন ওকে হাঁপিয়ে তুলতো । যখন আমি ঢুকতুম, আমি ওকে কুঁজো হয়ে বসে থাকতে দেখে লজ্জা পেতুম, কোনো বেঞ্চে বসে, ওর কাঁধ সবুজ আর হলুদ সুতির কাঁথায় জড়োসড়ো, যেটা গায়ে জড়িয়ে ও শীতকালে ভিক্ষা করতে বেরোতো । ও একটা পুরোনো কালো শালও গায়ে জড়াতো, যেটা আমি নিতে চাইনি । সত্যিই, যদিও আমার মন সহ্য করতো, এমনকি চাইতো, নম্রতা প্রকাশ করি, কিন্তু আমার তেজি দেহ তা প্রত্যাখ্যান করতো । সালভাদোর দুঃখি, চাপা গলায় বলতো :

“তুমি কি চাও আমরা ফ্রান্সে ফিরে যাই ? আমরা গ্রামের দিকে কাজ করবো।”

আমি বললুম, না । ও আমার অপছন্দ বুঝতে পারেনি — না, আমার ঘৃণা — ফ্রান্সের প্রতি, এমন নয় যে আমার অভিযান, যদি বারসেলোনায় থেমে যায়, গভীরভাবে চলতেই থাকবে, বেশি বেশি করে গহনভাবে, আমার অন্তরজগতের প্রত্যন্ত এলাকায় ।

“কিন্তু আমি সব কাজ করে দেবো । তোমাকে কষ্ট করতে হবে না ।”

“না।”

আমি ওকে ওর আনন্দহীন দারিদ্র্যে ওর বেঞ্চে ফেলে চলে যেতুম । আমি স্টোভের কাছে যেতুম কিংবা মদের জমায়েতে আর দিনের বেলায় কুড়িয়ে পাওয়া সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ফুঁকতুম, একজন দাঁত-খেঁচানো আন্দালুসীয়ের সঙ্গে, যার নোংরা শাদা পশমের সোয়েটার ওর ধড় আর পেশিকে ফুলিয়ে তুলতো । নিজের দুহাত কচলে, যেমন বুড়োরা করে, সালভাদোর ওর বেঞ্চ ছেড়ে সার্বজনিক রান্নাঘরে ঢুকে সুপ তৈরি করতে আরম্ভ করতো কিংবা গ্রিলের ওপরে একটা মাছ বসিয়ে দিতো । একবার ও প্রস্তাব দিলো যে হেউলভাতে যাওয়া যাক কমলালেবু তোলার মজুরের কাজ করতে । তখন সন্ধ্যা আর ও অনেকের কাছে অপমানিত হয়েছিল, আমার হয়ে ভিক্ষা করার জন্যে অনেক ধমক খেয়েছিল, তবুও আমাকে ভর্ৎসনা করে ক্রিয়োলায় আমার যৎসামান্য সফলতার কথা বলতে পারলো ।

“সত্যিই, তুমি যখন কোনো খদ্দেরকে বেছে নাও, তোমার উচিত তাকে পারিশ্রমিক দেওয়া।”

আমরা হোটেলের মালিকের সামনেই ঝগড়া করছিলুম, যে আমাদের বাইরে বের করে দিতে চাইছিল । সালভাদোর আর আমি তাই ঠিক করলুম পরের দিন দুটো কম্বল চুরি করবো আর দক্ষিণে যাবার মালগাড়িতে লুকিয়ে রাখবো । কিন্তু আমি এমন চালাক-চতুর ছিলুম যে সেদিন সন্ধ্যাতেই একজন কাস্টমস অফিসারের হাফকোট গেঁড়িয়ে আনলুম । যখন ডক দিয়ে যাচ্ছিলুম, যেখানে ওদের পাহারাদাররা থাকে, একজন অফিসার আমাকে ডাকলো । সে যা চাইলো আমি তাইই করলুম, সান্ত্রি কুঠরির ভেতরে । বীর্যপাতের পর ( সম্ভবত, আমাকে সেকথা বলার সাহস ছিল না লোকটার, ও একটা ফোয়ারার কাছে ধুতে চলে গেলো ), এক মুহূর্তের জন্য ও আমাকে একা ছেড়ে গিয়েছিল, সেই ফাঁকে আমো ওর পশমের বড়ো কালো উর্দি নিয়ে কেটে পড়লুম । আমি হোটেলে ফেরার আগে সেটা পরে নিলুম, আমি আমি জানতুম দ্ব্যর্থকতার মজা, তখনও পর্যন্ত বিশ্বাসভঙ্গের আনন্দ নয়, যদিও যে প্রতারণামূলক বিভ্রান্তি আমাকে বুনিয়াদি পরস্পরবিরোধিতাকে অস্বীকার করতে বাধ্য করবে তার বিরচন  ইতিমধ্যে আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল । কাফের দরোজাটা খোলার সময়ে সামনেই দেখলুম সালভাদোর । ভিখারিদের মধ্যে ও ছিল সবচেয়ে বিষণ্ণ । ওর মুখের বৈশিষ্ট্য, এমনকি গঠনবিন্যাস ছিল অনেকটা কাঠের গুঁড়োর মতন যা দিয়ে কাফের মেঝে ঢাকা থাকতো । তক্ষুনি আমি স্তিলিতানোকে দেখতে পেলুম জুয়াড়িদের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে । আমাদের চোখাচোখি হলো । ওর চাউনি আমার দিকে রইলো কিছুক্ষণ, একটু লজ্জিতও হলো । আমি কালো উর্দিটা খুলে ফেললুম, আর সবাই মিলে সেটা নেবার জন্য দরাদরি আরম্ভ করে দিলো । তাতে অংশ না নিয়ে স্তিলিতানো তাকিয়ে থাকলো তুচ্ছ দর-কষাকষির দিকে ।

“যদি চাও, তাহলে তাড়াতাড়ি করো,” আমি বললুম । “তোমরা মনোস্হির করো, কাস্টমসের লোকটা নির্ঘাৎ আমার খোঁজে আসবে ।”

তাস-খেলুড়েরা তৎপর হয়ে উঠলো । ওরা সবাই এরকম অজুহাতের ব্যাপার জানে । যখন তাসের শাফল আমাকে ওর দিকে নিয়ে এলো, স্তিলিতানো ফরাসি ভাষায় বলল :

“তুমি প্যারিস থেকে ?”

“হ্যাঁ । কেন ?”

“না, এমনিই, কোনো কারণ নেই ।”

যদিও ও-ই প্রথম এগিয়ে এসেছিল, আমি জানতুম, যখন উত্তর দিলুম, একজন অন্তমূখী মানুষের মরিয়া আচরণের ইঙ্গিত-ইশারা, যখন সে কোনো যুবককে চায় । আমার বিভ্রান্তিকে লুকোবার জন্য, আমি শ্বাসরুদ্ধ হবার ভান করলুম, আমার চারপাশে মুহূর্তটার হইচই ছিল । ও বলল, “নিজের জন্যে তুমি বেশ ভালোই কাজ করছ।”

আমি বুঝতে পারলুম যে এই প্রশস্তি বেশ চালাকি করে দেয়া হলো, কিন্তু ভিখারিদের মাঝে কতো সৌম্যকান্তি যে স্তিলিতানো ছিল ( আমি তখনও ওর নাম জানতুম না ) ! ওর একটা হাতে বেশ বড়ো ব্যাণ্ডেজ বাঁধা আর বুকের কাছে ঝোলানো, কিন্তু আমি জানতুম ওই হাতটা ওর নেই । স্তিলিতানোকে কাফে বা রাস্তায় কোনোটাতেই ঘন ঘন দেখা যেতো না ।

“উর্দিটার জন্য কতো দাম দিতে হবে ?”

“তুমি আমাকে এর দাম দিতে চাও ?

“কেন দেবো না ?”

“কিসের মাধ্যমে দেবে ?”

“তুমি কি ভয় পাচ্ছো ?”

“তুমি কোথা থেকে এসেছো ?”

“সার্বিয়া । আমি ফরাসি সৈন্যবাহিনীর লোক । আমি বাহিনী থেকে পালিয়ে এসেছি।”

আমি স্বস্তি পেলুম । বিপর্যস্ত । যে আবেগ আমার মধ্যে গড়ে উঠলো তা এক শূন্যতার, যাতে ভরে গেল বিয়ের দৃশ্যের এক স্মৃতি । নাচের হলঘরে সৈন্যরা দলবেঁধে নাচছিল, আমি ওদের ওয়ালৎজ নাচ দেখছিলুম । সে সময়ে আমার মনে হচ্ছিল দুজন সৈনিকের অদর্শন সেখানে সামগ্রিক । ওরা আবেগে বয়ে যাচ্ছিল । যদিও প্রথম দিকে ‘রামোনা’ পর্বে তাদের নাচ ছিল অপাপবিদ্ধ, কিন্তু তাইই কি থাকবে আমাদের উপস্হিতিতে, ওরা হাসি বদল করে বিয়ে করে নিলো, যেমন প্রেমিক-প্রেমিকারা আঙটি বদল করে ? অদৃশ্য যাজকদের অনুজ্ঞা সত্বেও সৈন্যরা উত্তর দিল, “আমি দায়িত্ব গ্রহণ করছি।”   প্রত্যেকে ছিল দম্পতি, উভয়ই মুখের ওপরে কালো জাল ঢেকে আর এক উর্দি ( শাদা চামড়া, কাঁধের লাল আর সবুজ দড়ি )। ওরা থেমে-থেমে পরস্পরের কোমলতা আর স্ত্রীসুলভ শিষ্টতা অদলবদল করছিল । আবেগকে উঁচু স্তরে বজায় রাখার জন্য, ওরা নিজেদের নাচকে ধিমেতালে করছিল, যখন কিনা তাদের লিঙ্গ, দীর্ঘ কুচকাওয়াজে ক্লান্ত, পরস্পরকে রুক্ষ ডেনিমের ব্যারিকেডের আড়াল থেকে বিপজ্জনকভাবে ভয় দেখাচ্ছিল আর চ্যালেঞ্জ করছিল । পালিশ-করা চামড়া তৈরি শিরস্ত্রাণের মুখাবরণে ঠোকাঠুকি লাগছিল । আমি বুঝতে পারছিলুম স্তিলিতানো আমাকে আয়ত্ত করতে চাইছিল । আমি সেয়ানার খেলা খেলছিলুম:

“তা থেকে প্রমাণ হয় না যে তুমি দাম দিতে পারবে।”

“আমাকে বিশ্বাস করো।”

অমন কঠিন মুখ, অমন শক্তপোক্ত দেহের মানুষ, আমাকে বলছে বিশ্বাস করতে । সালভাদোর আমাদের দেখছিল । ও আমাদের বোঝাপড়া সম্পর্কে জানতো আর টের পেলো যে আমরা ওর ওর একাকীত্বের, সর্বনাশের নির্ণয় নিয়ে ফেলেছি । কোপনস্বভাব আর বিশুদ্ধ, আমি ছিলুম জীবনে ফিরিয়ে দেয়া পরীর দেশের নাটক । যখন ওয়ালৎজ নাচ থামলো, সৈন্য দুজন নিজেদের থেকে দূরে সরে গেলো । আর জাঁকজমকভরা ও বিহ্বল দুটি অর্ধাংশের প্রত্যেকে ইতস্তত করলো, আর, অদর্শন এড়ানোর আনন্দে, চলে গেলো, মাথা নামিয়ে, পরের ওয়ালৎজের জন্য কোনো যুবতীর দিকে ।

“দাম দেবার জন্য আমি তোমাকে দুদিন সময় দেবো,” আমি বললুম । “আমি মালকড়ি চাই। আমিও সৈন্যবাহিনীতে ছিলুম । পালিয়ে এসেছি । তোমার মতন।”

“তুমি পেয়ে যাবে ।”

আমি উর্দিটা দিয়ে দিলুম ওকে । ও নিজের একটা হাতে নিলো আর আমাকে ফেরত দিয়ে দিলো। ও মৃদু হাসলো, যদিও উদ্ধতভাবে, আর বলল, “ওটা গুটিয়ে ফ্যালো।” আর তার সঙ্গে  রহস্যোচ্ছলে যোগ করলো, “ততক্ষণে আমি একটা গুটিয়ে নিই ।”

অভিব্যক্তিটা সকলেই জানে : “স্কেটিংবোর্ড গুটিয়ে ফেলা ।” চোখের পাতা না ফেলে, ও যা বলল আমি তাই করলুম । উর্দিটা হোটেল মালিকের মালপত্র লুকোবার জায়গায় তক্ষুনি লোপাট হয়ে গেলো । হয়তো এই মামুলি চুরি আমার মুখকে উজ্বল করে থাকবে, কিংবা স্তিলিতানো ভালো সাজার অভিনয় করছিল ; ও যোগ করলো : “তুমি তাহলে বেল-অ্যাব-এর একজন প্রাক্তনীকে মদ খাওয়াচ্ছো ?”

এক গেলাস মদের দাম দুই সউ । আমার পকেটে ছিল চারটে, কিন্তু আমি সেগুলো সালভাদোরকে ধার দিলুম যে আমাদের দেখছিল ।

“আমি কপর্দকশূন্য,” স্তিলিতানো গর্বভরে বলল ।

তাস খেলুড়েরা নতুন গোষ্ঠী তৈরি করছিল যার দরুণ কিছু এক মুহূর্তের জন্যে আমি সালভাদোর থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলুম । আমি দাঁতের ফাঁকে বিড়বিড় করলুম, “ আমার কাছে চার সউ আছে আর আমি সেগুলো তোমাকে পাচার করে দিচ্ছি, কিন্তু দাম তোমাকেই দিতে হবে ।”

স্তিলিতানো মৃদু হাসলো । আমি পরাজিত । আমরা একটা টেবিলে বসলুম । ও সৈন্যবাহিনীর কথা বলা আরম্ভ করেছিল, কড়া চোখে আমার দিকে তাকিয়ে, কিন্তু অন্য কথা বলা শুরু করলো।

“আমার কেমন মনে হচ্ছে আমি তোমাকে আগে কোথাও দেখেছি।”

আমার কথা বলতে হলে, আমি স্মৃতিতে সবকিছু ধরে রেখেছিলুম।

আমার অদৃশ্য দড়িদড়া আঁকড়ে ধরা জরুরি ছিল । আমি কূজন করতে পারতুম । শব্দাবলী, কিংবা আমার স্বরভঙ্গী, কেবল আমার আকুলতাকে  প্রকাশ করতে পারতো না, আমি শুধু গান শোনাতে পারতুম না, আমার কন্ঠ থেকে বেরোতে পারতো বুনো প্রণয়খেলার ডাক । হয়তো আমার ঘাড়ে শাদা পালকগোছা গজিয়ে উঠেছিল । একটা আকস্মিক দুর্ঘটনা সব সময়ে সম্ভব। আমাদের জন্য অপেক্ষা করে রূপান্তরিত আকৃতি ।  আতঙ্ক আমাকে রক্ষা করলো।

আমি আকৃতির রূপান্তরের ভয়ে বসবাস করেছি । পাঠককে পুরো সচেতন করার জন্য, তারা দেখছে যে প্রেম আমার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে চলেছে — এটা কেবল বাগ্মীতার ব্যাপার নয় যার জন্য তুলনা দরকার — বাজপাখির মতন — সবচেয়ে সূক্ষ্ম ভীতির জন্য আমি কাছিমঘুঘুর উদাহরণ ব্যবহার করি । জানি না সেই মুহূর্তে কেমন অনুভব করেছিলুম, কিন্তু আজকে আমি যা চাই তা হলো স্তিলিতানো সম্পর্কে আমার কল্পনাশক্তি, কেননা আমার দুর্দশার তুলনা করা যায় একটা নিষ্ঠুর পাখি আর তার শিকারের পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্গে । ( আমি যদি আমার ঘাড় মৃদু কূজনে ফুলে ওঠা অনুভব না করতুম তাহলে আমি বরং লালবুক রবিনপাখির কথা বলতুম)।

এক বিদকুটে প্রাণী দেখা দেবে যদি আমার প্রতিটি আবেগ একটা পশু হয়ে দেখা দ্যায় : আমার ঘাড়ে কেউটের  ক্রোধ হিসহিস করে ; সেই একই কেউটে আমার লিঙ্গকে ফোলায় ; আমার বিনয়ের অভাব থেকে পয়দা হয়েছে আমার ঘোড়াগুলো আর নাগরদোলা….এক কাছিমঘুঘুর যার খসখসে স্বর আমি ধরে রেখেছি, যা স্তিলিতানো লক্ষ্য করেছিল । আমি কাশলুম।

প্যারালেলোর পেছনে একটা ফাঁকা জায়গা ছিল যেখানে মাস্তানরা তাস খেলতো। ( প্যারালেলো হলো বারসেলোনার একটা অ্যাভেনিউ যা বিখ্যাত রামব্লাসের সমান্তরাল। আই দুই প্রশস্ত রাস্তার মাঝে, আক অন্ধকার, নোংরা, সরু গলি গযে তুলেছে বারিও চিনো জায়গাটাকে ।) মেঝেতে বসে, ওরা তাস-টাস খেলতে থাকে ; ধুলোর ওপরে চারচৌকো কাপড় বিছিয়ে তাসগুলো সাজিয়ে রাখে । এক তরুণ জিপসি তার মধ্যে একটা খেলা চালাতো, আর আমি আমার পকেটের কয়েকটা সউয়ের ঝুঁকি নিলুম। আমি জুয়াড়ি নই । ধনীদের ক্যাসিনো আমাকে আকৃষ্ট করে না । বিজলিবাতির ঝাড়লন্ঠনে আমি সিঁটিয়ে যাই । মার্জিত জুয়াড়ির মেকি ঘনিষ্ঠতা দেখে আমার বমি পায় । আর বল, রুলেট আর ছোট্টো ঘোড়াগুলো নিয়ে খেলার অসম্ভাব্যতা আমাকে অনুৎসাহিত করে, কিন্তু আমার ভালো লাগতো মাস্তানদের ধুলো, নোংরা আর চালবাজি ।

আমি সামনে দিকে ঝুঁকে জিপসিটাকে পাশ থেকে দেখলুম, বালিশে চাপা, কোনও বেদনার কারণে। আমি ওর দৈহিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে দেখি ওর মুখবিকৃতি, কিন্তু ওর ব্যথার প্রভাও। আমি এটা প্রায়ই দেখেছি রাস্তায় বসে থাকা ছোঁড়াদের তেলচিটে মুখে । এখানকার পুরো জনসমপ্রদায় জেতা কিংবা হারার সঙ্গে যুক্ত । প্রতিটি উরু ক্লান্তি কিংবা উদ্বেগে কাঁপছে । সেইদিনকার আবহাওয়া ছিল আশঙ্কাজনক । আমি তরুণ স্পেনিয়দের যৌব অধীরতায় আটক পড়ে গিয়েছিলুম । আমি খেললুম আর জিতলুম । আমি প্রত্যেকটা দান জিতলুম । খেলার সময়ে আমি একটাও কথা বলিনি । তাছাযা, জিপসিটা ছিল আমার অচেনা । নিয়ম অনুযায়ী জেতা টাকাকড়ি নিয়ে আমার কেটে পড়ার কথা । ছেলেটাকে দেখতে আতো সুন্দর যে ওইভাবে ওকে ছেড়ে কেটে পড়াটা হবে সৌন্দর্যের অবহেলা । ও হঠাৎ দুঃখি হয়ে উঠলো, গরম আর অবসাদের মাঝে দাঁড়িয়ে ও মুখ নত করে নিয়েছিল । আমি দয়া করে ওকে টাকাটা ফেরত দিয়ে দিলুম। আচমকা অবাক হয়ে, ও সেগুলো নিয়ে নিলো আর আমাকে ধন্যবাদ জানালো ।

“হ্যালো, পেপে,” একজন পাগলাটে কালচে চেহারার খোঁড়া লোক ডাক দিয়ে উঠলো আমার পাশ দিয়ে লেংচে যেতে যেতে ।

“পেপে,” আমি নিজেকে বললুম, “ওর নাম পেপে।” জায়গাটা ছাড়লুম, কেননা আমি ওর কৃশকায়, প্রায় নারীসুলভ কমনীয় ছোটো হাত দুটো দেখেছিলুম । কিন্তু সবে কয়েক পা এগিয়েছি চোর, বেশ্যা, ভিখারি আর পায়ুকামীদের ছেড়ে, কেউ একজন আমার কাঁধে হাত রাখলো । ও ছিল পেপে। ও খেলা ছেড়ে চলে এসেছে। ও আমাকে স্প্যানিশে বলল :

“আমার নাম পেপে।”

“আমি হুয়ান।”

‘চলো, মদ খাওয়া যাক।”

ও আমার চেয়ে লম্বা ছিল না । ওর মুখ, যা আমি ওপর থেকে দেখেছিলুম যখন ও মাটিতে বসেছিল, কম পুষ্ট মনে হলো । দেহ কাঠামো সুশীল ।

“ছেলেটা একটা মেয়ে,” আমি ভাবলুম, ওর কোমল হাতের কথা মনে করে, আর আমি অনুভব করলুম ওর সঙ্গ আমাকে বিরক্ত করবে । ও এখনই ঠিক করে নিলো যে টাকাটা আমি জিতেছিলুম তা মদ খেয়ে ওড়াবে । আমরা শুঁড়িখানাগুলোয় চক্কর মারলুম, আর যতোক্ষণ একসঙ্গে ছিলুম ওকে বেশ কমনীয় লাগছিল । ওর পরনে ছিল, শার্টের বদলে, নিচু গলা নীল জার্সি। খোলা জায়গাটা থেকে দেখা যাচ্ছিল একটা মোটা ঘাড়, ওর মাথার মতনই চওড়া । যখন ও মাথা ঘোরালো, বুক না ঘুরিয়ে, একটা মোটা পেশিতন্তু জেগে উঠলো । আমি ওর দেহটা কল্পনা করার চেষ্টা করলুম, আর, কোমল প্রায় নরম হাত সত্বেও, মনে হলো তা বেশ পুরুষ্টু, কেননা ওর উরুগুলো ট্রাউজারের পাতলা কাপড়কে ভরে দিয়েছিল। আবহাওয়া ছিল উষ্ণ । ঝড় ওঠেনি । আসপাশের তাস খেলুড়েদের স্নায়ুচাপ হয়ে উঠেছিল তীব্র । বেশ্যাগুলোকে মনে হচ্ছিল গাগতরে ।ধুলো আর রোদ ছিল কষ্টকর । আমরা তেমন মদ খাইনি, খেলুম লেমোনেড । আমরা হকারদের কাছে বসলুম আর মাঝেসাজে এক-আধটা কথা বললুম । ও হাসি বজায় রেখেছিল, একধরনের ক্লান্তিময়তায় । মনে হচ্ছিল ও আমাকে প্রশ্রয় দিতে চাইছে । ও কি সন্দেহ করছিল যে ওর সুন্দর মুখ আমার ভালো লেগেছে ? আমি জানতে পারলুম না, কিন্তু ও আর এগোলো না । তাছাড়া, আমারও ওর মতন একই ধূর্ত চাউনি ; ভালো পোশাক পরে যারা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল তাদের কাছে আমি বোধহয় অমঙ্গলের সংকেত হয়ে দেখা দিয়েছি ; ছেলেটার যৌবন আর কলুষ আমার মতনই, আর আমি ছিলুম ফরাসি । সন্ধ্যার দিকে ও জুয়া খেলতে চাইলো, কিন্তু সব জায়গাগুলো দখল হয়ে গিয়েছিল বলে দেরি হয়ে গিয়েছিল । আমরা খেলুড়েদের আসেপাশে ঘুরে বেড়ালুম । বেশ্যাগুলোর গা ঘেঁষে ও যখন যাচ্ছিল, পেপে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করলো ওদের সঙ্গে । কাউকে-কাউকে চিমটি কাটলো । গরম হয়ে উঠছিল অসহ্য । আকাশ আর মাটি হয়ে উঠেছিল ঘনিষ্ঠ । ভিযের স্নায়ুচাপ বিরক্তিকর লাগছিল । জিপসি ছোঁড়াটার ওপর ছেয়ে গিয়েছিল ধৈর্যচ্যুতি কেননা ও নির্ণয় নিতে পারছিল না কোন খেলাটায় যোগ দেবে । নিজের পকেটের টাকাগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল । হঠাৎ ও আমার বাহু আঁকড়ে ধরলো ।

“এসো !”

প্যারালেলোতে কয়েক পা দূরে একটা বিশ্রামাগারে ও আমাকে নিয়ে এলো । সেটা চালাচ্ছিল বুড়িরা । হঠাৎ অমন নির্ণয়ে অবাক হয়ে আমি জিগ্যেস করলুম :

‘কী করতে চলেছ তুমি ?”

“আমার জন্য অপেক্ষা করো ।”

“কেন ?”

ও স্প্যানিশ একটা শব্দ ব্যবহার করে উত্তর দিলো যা আমি বুঝতে পারলুম না । সে কথা ওকে বললুম, এক বুড়ির সামনে, যে তার দুটো সউয়ের জন্য অপেক্ষা করছিল, শুনে হাসিতে ফেটে পয। ছোঁড়াটা আর স্বমেহনের ইঙ্গিত করলো । যখন ও বেরিয়ে এলো, ওর মুখে রঙ ধরে গিয়েছিল । ও তখনও হাসছিল ।

“এখন সব ঠিক আছে । আমি তৈরি ।”

ঘটনাটা থেকে আমি শিখলুম যে, বড়ো দাঁও মারার আগে, খেলোয়াড়রা ওখানে ঢুকে স্বমেহন করে যাতে নিজেদের শান্ত করে খেলতে পারে । আমরা জুয়ার জমঘটে ফিরে গেলুম । পেপে একটা গোষ্ঠীকে বেছে নিলো । ও হেরে গেলো । ওর কাছে যতো টাকা ছিল সব হেরে গেলো । আমি ওকে থামাতে চেষ্টা করেছিলুম ; ততক্ষণে সব হেরে বসে আছে । খেলার যেমন নিয়ম, যে লোকটা টাকাকড়ি ধার দিচ্ছিল বা জমা রাখছিল তাকে বলল তহবিল থেকে ওকে পরের খেলার জন্য ধার দিতে । লোকটা প্রত্যাখ্যান করলো । আমার তখন মনে হলো যা বৈশিষ্ট্যে জিপসির ভদ্রতা গড়া তা টকে গেল, যেমন দুধ ছানা কেটে যায়, আর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলো যেরকম ক্রোধ আমি আগে কারোর দেখিনি । জিপসি ছেলেটা মহাজনটার টাকাকড়ি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তুলে নিলো । মহাজন ওর পেছনে ছুটে লাথি মারার চেষ্টা করলো । পেপে পাশ কাটিয়ে নিলো । ও টাকাগুলো আমার হাতে দিলো, কিন্তু যতোক্ষণে আমি সেগুলো পকেটে রাখতে যাবো ছোঁড়াটার ছুরি বেরিয়ে এসেছে । ছুরিটা ও বসিয়ে দিলো মহাজনের বুকে, একজন ঢ্যাঙা, তামাটে লোক, যে পড়ে গেলো মাসটিতে আর যে, তার ত্বকের তামাটে রঙ সত্বেও, ফ্যাকাশে হয়ে গেলো, গুটিয়ে গেলো, ছটফট করে ধুলোর ওপরে মরে গেলো । জীবনে প্রথমবার আমি কাউকে পটল তুলতে দেখলুম । পেপে সেখান থেকে অদৃশ্য  হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু যখন আমি লাশ থেকে দৃষ্টি ঘোরালুম, ওপর দিকে চাইলুম, সেখানে, মুখে মৃদু হাসি নিয়ে, দাঁড়িয়ে রয়েছে স্তিলিতানো । সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে । মৃত লোকটা আর সৌম্যকান্তি মানুষেরা যেন একই সোনালি ধুলোতে মিশে গেছে, পৃথিবীর সব জায়গা থেকে এসে উপস্হিত নাবিক, সৈন্য, মাস্তান আর চোরেদের সঙ্গে । পৃথিবী আর ঘুরছিল না : স্তিলিতানোকে নিয়ে তা সূর্যের কাছে কাঁপছিল । একই সময়ে আমি পরিচিত হলুম মৃত্যু আর ভালোবাসার সঙ্গে । এই দর্শনশক্তি, যদিও ক্ষণিকের, তবু আমি সেখানে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলুম না কেননা আমার ভয় ধরে গিয়েছিল যে আমাকে পেপের সঙ্গে দেখে মৃত লোকটার বন্ধুরা আমার পকেটে রাখা টাকাকড়ি কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু আমি যখন কেটে পড়ছি, আমার স্মৃতি জীবন্ত হয়ে উঠলো আর পরবর্তী দৃশ্যের কথা মনে পড়িয়ে দিলো, যা আমার মনে হয়েছিল সমারোহপূর্ণ : “হত্যাটা, এক সৌম্যকান্ত বালকের দ্বারা, একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষকে যার রোদেপোড়া ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যেতে পারে, মৃত্যুর রঙ ধরে গেলো, আর তা আরাম করে দেখলো একজন দীর্ঘদেহী ফর্সা লোক যার সঙ্গে আমি সম্প্রতি গোপনে বাগদত্ত হয়েছি।” আমার চাউনি ওর দিকে দ্রুত হলেও, আমার হাতে সময় ছিল স্তিলিতানোর পালোয়ানি পৌরুষকে স্বীকার করা আর দেখা, দুই ঠোঁটের মাঝে, আধখোলা মুখে, একটা শাদা, থুতুর গোলা, শাদা পোকার মতন মোটা, যা ও ঘোরাচ্ছিল, ওপর থেকে নিচে যতক্ষণ না তা ওর হাঁ-মুখ ঢেকে ফেলছে। ও ধুলোর ওপরে খালি পায়ে দাঁড়িয়েছিল । ওর ঠ্যাঙ ঢাকা ছিল ছেঁড়া নোংরা ফ্যাকাশে ডেনিম ট্রাউজারে। ওর সবুজ শার্টের হাতা ছিল গোটানো, তার একটা ওর কাটা হাতেরর ওপর পর্যন্ত ; কবজিটা, যেখানে সেলাই করা চামড়ায় একটা ফ্যাকাশে গোলাপি ক্ষতচিহ্ণ দেখা যাচ্ছিল, তা ছিল সঙ্কুচিত।

বিয়োগাত্মক আকাশের তলায়, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রাকৃতিক ভূচিত্র পার হয়ে যাবার ছিল যখন রাতের বেলায় স্তিলিতানো আমার হাত ধরলো । কী ছিল সেই তরল জিনিসটার বৈশিষ্ট্য যা ওর কাছ থেকে আমার কাছে ধাক্কা দিয়ে চালান করা হতো ? আমি বিপজ্জনক নদীতীরে হেঁটেছি, উদয় হয়েছি বিষণ্ণ সমভূমিতে, শুনেছি সমুদ্রের আওয়াজ । যখন সিঁড়িবদল হলো, বলা চলে আমি ওকে ছুঁইনি : ও ছিল জগতের ওস্তাদ । সেই সংক্ষিপ্ত মুহূর্তগুলোর স্মৃতি নিয়ে, আমি তোমাদের কাছে বর্ণনা করতে পারি, শ্বাসহীন উড়াল, অনুসৃতি, পৃথিবীর সেই সব দেশের যেখানে আমি কখনও যাবো না ।

 

 

 

About anubadak

আমি একজন অনুবাদক । এতাবৎ রেঁবো, বদল্যার, ককতো, জারা, সঁদরা, দালি, গিন্সবার্গ, লোরকা, ম্যানদেলস্টাম, আখমাতোভা, মায়াকভস্কি, নেরুদা, ফেরলিংঘেট্টি প্রমুখ অনুবাদ করেছি ।
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s