নাইজেরিয়ার সাহিত্যিক চিনুয়া আচেবের পরাবাস্তব কবিতা ( ১৯৩০ – ২০১৩ ) অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

chinua-achebe

শকুনেরা

ধূসরতায়

আর এক পশলা বৃষ্টিতে এক হতাশ

সকাল অগ্রদূতদের দ্বারা অনালোড়িত

সূর্যোদয়ে এক শকুন

অনেক উঁচু গাছের ভাঙা

হাড়ের ডালে বসে

কাছে ঘেঁষে বসল

ওর সঙ্গীর মসৃণ

চোট-খাওয়া মাথায়, একটা নুড়ি

এক ডালে শেকড়-পোঁতা

কুৎসিত পালকের জঞ্জালে

আদর করে ঝুঁকলো

শকুনির দিকে । কালকে ওরা পেয়েছিল

জলভরা গর্তে একটা ফোলা লাশের

দুটো চোখ আর নাড়িভুঁড়িতে

যা ছিল তা খেয়েছিল । পেট

ভরে খেয়ে ওরা বেছে নিলো

ওদের বিশ্রামের দাঁড়

বাকি ফাঁপা মাংসের দিকে

শীতল চাউনির সহজ

দূরবিন চোখের আওতায়…

 

অদ্ভুত

সত্যিই প্রেম কেমন অন্য

উপায়ে এতো সুনির্দিষ্ট

একটা কোনা তুলে নেবে

শব রাখার ওই বাসায়

সাজিয়ে-গুছিয়ের গুটিয়ে বসবে সেখানে, হয়তো

ঘুমিয়েও পড়বে — শকুনির মুখ

দেয়ালের দিকে মুখ করে !

 

…এইভাবেই বেলসেন ক্যাম্পের

কমাণ্ডান্ট দিনের শেষে বাড়ি

গেলেন সঙ্গে পোড়া মানুষের

ধোঁয়া বিদ্রোহ করে নাকের

চুলে ঝুলে আছে যা থামবে

রাস্তার ধারে মিষ্টির দোকানে

একটা চকোলেট তুলে নেবে

তার কচি খোকার জন্য

বাড়িতে অপেক্ষা করছে

বাবা কখন ফিরবে…

 

বদান্য দূরদর্শিতার

গুণগান করো যদি চাও

যে এমনকি মানুষখেকো

রাক্ষসকেও একটা ছোটো

জোনাকি উপহার দ্যায়

কোষে মোড়া কোমলতা

নিষ্ঠুর হৃদয়ের তুষার গুহায়

নয়তো সেই বীজানুর জন্যেই

হাহুতাশ করো স্বজাতীয় প্রেমে

যাতে চিরকালের জন্য

প্রতিষ্ঠিত করে হয়েছে

অমঙ্গল ।

 

জবাব

শেষ পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেললুম

সন্ত্রাসের ঝালর-বসানো মোহ

যা আমার প্রাচীন চাউনিকে বেঁধে রাখে

ওই ভিড়ের মুখগুলোর সঙ্গে

যা লুটতরাজের আর দখল করে আমার

অবশিষ্ট জীবন এক অলৌকিকতায়

শাদা-কলার হাতের নির্দেশের মাঝে

আর নাড়িয়ে দিলুম এক সস্তা

ঘড়ির মতন আমার কানের কাছে

আর আমার পাশে মেঝেয় ছুঁড়ে

ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালুম । আমি

তাদের কাঁধ আর মাথাকে

ওপর-নিচ করালুম এক নতুন

সিঁড়ি দিয়ে আর ঝুঁকলুম

ওদের ঘেমো সারিতে

আর উঠে গেলুম মাঝের হাওয়া পর্যন্ত

আমার হাত কঠোরতার জন্য এতো নতুন

পাকড়াও করতে পারলুম এক

ঝঞ্ঝাটে দিনের বন্ধুরতা

আর তেষ্টা মেটালুম উৎসের

যা তাদের পাগুলোকে উথালপাথাল

খাওয়াচ্ছিল । আমি এক নাটকীয়

অবনমন আরম্ভ করলুম সেইদিন

পেছন দিক ফিরে গুঁড়িমারা ছায়ায়

ভাঙা মৌতাতের টুকরোয় । আমি

খুলে ফেললুম অনেকদিনের বন্ধ জানালা

আর দরোজা আর দেখলুম আমার চালাঘর

ইন্দ্রধনুর ঝাঁটায় নতুন সাফসুথরো করা

সূর্যের আলো আবার আমার বাড়ি হয়ে গেল

যার নিয়তিনির্দিষ্ট মেঝেতে অপেক্ষা করছিল

আমার গর্বিত চঞ্চল জীবন ।

 

উড়াল

( নিই ওসুনদারের জন্য ) 

দ্রাঘিমায় কিছু-একটা ক্ষমতার লালসাকে প্রশ্রয় দ্যায়

নিছক বাড়ির ছাদটুকু আমিরের জন্য যথেষ্ট

বৈভবশালী পাগড়ির দামি পাক থেকে বিলিয়ে দেন

ধুলোয় হামাগুড়ি দেয়া কৃষকদের

বিরল দুর্বোধ্য মাথা নাড়া যা প্যাঁচানো থাকে

রাজকুমারীয় বিষণ্ণতায় ।

আমিও জেনেছি

ওই ঝলসানো আদিম ক্ষুধাবোধ,

জীবন প্রকাশ করার দ্রুতি

এক দীর্ঘ পিছুহটা প্রবৃত্তি ।

যদিও দড়িবাঁধা আর হাতকড়া পরানো

সেই দিন আমি চূড়া থেকে হুকুম দিলুম ।

তিন তলা জগতের এক সেতু খাপ খেয়ে যায়

আমার উন্মাদ গর্বিত মূর্তির সঙ্গে যা আমি হয়েছি।

ভাসমান মেঘের এক ম্যাজিক লেপ

নিজের শাদা কোমলতাকে ওড়ালো আর ঘষল

আমার পায়ের তলায় পেশাদার পরীর আঙুলের মতন

আর ব্যাণ্ডেজের কাপড়ের ছাঁকনি দিয়েঢ

এক মহানগরের বিস্ময় প্রকাশ করল

সে ম্যাজিক পরীর দেশের আয়তনের ।

চাউনিকে বিভিন্নভাবে মাপজোক করে

আমি মেঘগুলোকে ভাসিয়ে দিলুম

এক স্হির চারণভূমির ওপরে, মিনারের ওপরে

আর মাস্তুল আর ধোঁয়া-পালক চিমনিতে ;

কিংবা পৃথিবীটাকেই উল্টে দিলুম, ছেড়ে দিলুম

তা থেকেই, এক ভবঘুরে ফেরারিকে

অবিচল আকাশের তলায় । তারপর এলো

জগতের ওপরে এক আচমকা ঔজ্বল্য,

তা ছিল বিরল শীতের হাসি, আর আমার

মেঘ-জাজিমের ওপরে একটা কালো ক্রশ আঁকা

যা ইন্দ্রধনুর অক্ষিগোলকে আটক । যাতে এলো

খ্রিষ্টজন্মের অসাধারণত্ব — তাছাড়া কেই বা আসতো

ধূসর অখেলোয়াড়সুলভ তর্ক, অবিশ্বস্ত

বিদ্যাবাগিশের উৎসর্গ-করা টেকো অবাধ্য ঘোষণা ?

কিন্তু কি তুলনাহীন সৌন্দর্য ! কি গতি !

রাতের এক রথ নিয়েছে আতঙ্কের উড়াল

সেই দিনের আচার-বিচার সম্পর্কে আমাদের

রাজকীয় ঘোষণা থেকে ! আর আমাদের কল্পনার

মিছিল ঘোড়ায় চেপে এগিয়েছে। আমরা এক প্রাচীন

লোভকে দমিয়েছি যা যুগ যুগ পড়ে থেকে কুঁকড়েছিল

যতক্ষণ না মহিমাময় শোভাযাত্রা দেখে ক্লান্ত চোখ

ফিরে এলো বিশ্রাম নেবার জন্যে ওই ক্ষুদ্র

কিংবদন্তিতে যা জীবনের পোশাককে টেনে নিয়ে গেল

সব জায়গা ছেড়ে আমার আসনের তলায় ।

 

এখন আমি ভাবি আমি জানি কেন দেবতারা

উচ্চতার ক্ষেত্রে পক্ষপাত করেন — পাহাড়ের

শীর্ষকে আর গম্বুজকে, গর্বিত ইরোকো গাছগুলোকে

আর কাঁটার পাহারা-দেয়া বোমবাক্সকে,

কেন মামুলি গৃহদেবতারা

কঠিন কাঠের দাঁড়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি বসবেন

ঝুরঝুরে কড়িকাঠ  থেকে বিপজ্জনকভাবে ঝোলানো

চালাবাড়ির চালে যা আরামে বসে আছে

পৃথিবীর নিরাপদ মাটিতে ।

 

প্রতিশ্রুতি-ভীতি

হুররে ! তাদের জন্য যারা কিচ্ছু করে না

কিছুই দেখে না অনুভব করে না যাদের

হৃদয়ে বসানো আছে দূরদর্শিতা

পাতলা ঝিল্লির মতন গর্ভের উন্মুখ

দরোজায় যাতে বীর্যক্রোধের কলঙ্ক

না ঢুকতে পারে । আমি শুনেছি পেঁচারাও

জ্ঞানের গোলক পরে থাকে তাদের

চোখের চারিধারে প্রতিরোধ হিসেবে

প্রতিটি অসুরক্ষিত চোখ দ্রুত আড়াল পেতে চায়

আলোর ছোঁড়া কাঁকর থেকে । অনেকদিন আগে

মধ্য প্রাচ্যে পনটিয়াস পাইলেট

সবার সামনে তাঁর শাদা হাতের অবদান

ধুয়েছিলেন যা বিখ্যাত হয়েছিল । ( তাঁর আগের

আর পরের রোমের কর্তাদের মধ্যে তাঁকে ছাড়া আর

কাকে নিয়ে আলোচনা হয়েছিল প্রতিটি

রবিবার পাঠানো প্রচারকদের ধর্মবিশ্বাস ? ) আর

প্রচারকদের কথা বলতে হলে সেই অন্য লোকটা

জুডাস অমন মূর্খ ছিল না মোটেই ; যদিও

বড়ো বেশি বদনাম হয়েছিল পরের প্রজন্মের

লোকেদের দ্বারা তবু তথ্য তো থেকেই যায় যে

তারই একা ওই  নানা-পোশাক জমঘটে

যথেষ্ট বোধবুদ্ধি ছিল এই কথা বলার

একটা মারাত্মক আন্দোলন যখন ও দেখল

আর তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল, একটা সুন্দর

ছোটো পুঁটলি ওর কোটের পকেট ফুলিয়ে রেখেছে

লেনদেনের ব্যাপারে — ব্যাটা বেশ বিচক্ষণ ।

 

প্রেমচক্র

ভোরবেলায় আস্তে আস্তে

সূর্য নিজের কুয়াচ্ছন্ন দীর্ঘ

বাহুর আলিঙ্গন ফিরিয়ে নেয় ।

খোশমেজাজ প্রেমিক-প্রেমিকারা

প্রেমের ঘষাঘষি-কারবারের

কোনোরকম স্বাদ বা ক্বাথ

ফেলে যায় না ; পৃথিবী

শিশিরে সুগন্ধিত

সুবাসে জেগে ওঠে

নরম-চোখ আলোর

ফিসফিসানিতে…

পরে যুবক তার

গুণাবলীর সমতা খুইয়ে ফেলবে

স্বর্গের বিশাল জমি চাষ করার

সময়ে আর তার ফল ফলাবে

যুবতীটির তপ্ত ক্রোধের

ফুলকির ওপরে । বহুকাল যাবত

অভ্যস্ত অমনধারা আবদারে

যুবতীটি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করবে

সন্ধ্যার জন্য যখন আরেক রাতের

চিন্তাভাবনা যুবকটির প্রফুল্লতা

পুনরুদ্ধার করবে

আর যুবতীটির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা

যুবকটির ওপরে ।

 

প্রজাপতি

গতি হল উৎপীড়ন

ক্ষমতা হল উৎপীড়ন

ওজন হল উৎপীড়ন

প্রজাপতি সুরক্ষা খোঁজে মৃদুতায়

ভারহীনতায়, ঢেউখেলানো উড়ালে

কিন্তু এক চৌমাথায় যেখানে নানারঙা আলো

গাছেদের থেকে হঠকারী নতুন রাজপথে পড়ে

আমাদের অভিসারী এলাকার সংযোগ ঘটে

আমি দুজনের জন্য যথেষ্ট খাবার সঙ্গে করে আনি

আর অমায়িক প্রজাপতি নিজেকে উৎসর্গ করে

উজ্বল হলুদ আত্মবলিদানে

আমার কঠিন সিলিকন ঢালের ওপরে ।

 

উদ্বাস্তু মা আর ছেলে

কোনো ম্যাডোনা আর

শিশু ছুঁতে পারবে না

মায়ের কোমলতার ওই ছবিটিকে

একজন ছেলের খাতিরে ওনাকে দ্রুত ভুলে যেতে হবে।

বাতাস দুর্গন্ধে কটু হয়ে উঠেছিল

না-ছোঁচানো শিশুদের আমাশার

যাদের ক্ষয়ে যাওয়া পাঁজর আর শুকনো

পাছা ফুলে ফাঁপা তলপেট নিয়ে

দাঁড়াতে চেষ্টা করছিল । অনেকেরই

মা বহুকাল যাবত পালন করা বন্ধ

করে দিয়েছে কিন্তু এর নয় । মা

দাঁতের পাটির মাঝখানে ভুতুড়ে

হাসি ধরে রেখেছিল আর দুই চোখে

এক ভুতুড়ে মায়ের গর্ব যা আঁচড়ে দিচ্ছিল

করোটিতে টিকে থাকা মরচেরঙা চুল

আর তখনই —

 

দুই চোখে গান নিয়ে — যত্নে আরম্ভ করল

সিঁথেকাটা…আরেক জীবনে এই কাজ

হতো প্রতিদিনের ঘটনা যা তেমন গুরুত্বপূর্ণ

নয়, ওর সকালের খাবার আর স্কুলে যাবার

আগে ; এখন মা

 

একটা ছোটো কবরে

ফুল রাখার মতন কাজটা করছিলেন ।

 

About anubadak

আমি একজন অনুবাদক । এতাবৎ রেঁবো, বদল্যার, ককতো, জারা, সঁদরা, দালি, গিন্সবার্গ, লোরকা, ম্যানদেলস্টাম, আখমাতোভা, মায়াকভস্কি, নেরুদা, ফেরলিংঘেট্টি প্রমুখ অনুবাদ করেছি ।
This entry was posted in Chinua Achebe and tagged . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s