পেরুর কবি সেজার ভালেহো-র কবিতা ( ১৮৯২ – ১৯৩৮ ) । অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

images

পপলার গাছের তলায়

হোসে ইউলোজিও গারিদোর জন্য

 

যাজকীয় বন্দী কবিদের মতো,

রক্তের পপলারগুলো ঘুমিয়ে পড়েছে।

পাহাড়ের ওপরে, বেথলেহেমের মেষের পাল

সূর্যোদয়ের সময়ে ঘাসের গান চেবায় ।

 

প্রাচীন মেষপালক, যে কাঁপছিল

শেষতম শহিদের আলোয়,

তার ইস্টার দৃষ্টিতে ধরা আছে

বিশুদ্ধ প্রজননের এক ঝাঁক নক্ষত্র ।

 

অনাথ অবস্হায় বড়ো হয়ে, ও নামতে থাকে

গোরের গুজব নিয়ে প্রার্থনার মাঠে,

আর ভেড়াগুলোর ঘণ্টা ছায়ায় পেকে উঠেছে ।

 

এটা টিকে যায়, নীল লোহার

পাক খুলে, আর তার ওপরে, চোখের তারায় ছেয়ে আছে,

একটা কুকুর তার চারণভূমির ডাক খোদাই করে দিচ্ছে ।

 

কালো ঘোষণা

জীবনে এমন সব মারাত্মক আঘাত আসে…আমি জানি না।

আঘাত যেন ঈশ্বরের ঘৃণা থেকে । আর যদি তার আগে,

এ-পর্যন্ত আমাদের ভোগান্তির কলগুলো

আত্মায় উথলে ওঠে । আমি জানি না ।

তারা বিরল, তবু তারা আছে । তারা অন্ধকার গলিমুখ খুলে দ্যায়

ভয়ঙ্কর মুখ আর শক্তিমান পশ্চাতপট নিয়ে ।

হয়তো ওরা বর্বর আত্তিলার ঝোপেঢাকা পাহাড়,

কিংবা কালো ঘোষণা যা মৃত্যু পাঠায় ।

তারা আত্মার যিশুর দীর্ঘ পতন

অদৃষ্টের দ্বারা অভিশপ্ত প্রিয় বিশ্বাস ।

এই রক্তাক্ত আঘাতগুলো রুটির ফাটতে থাকার মতো

যা আমাদের উনোনের মুখে পুড়িয়ে দ্যায় ।

আর মানুষ : বেচারা, বেচারা মানুষ ! সে নিজের চোখ পাকায়,

যেমনভাবে আমাদের কাঁধের ওপরে এক থাপ্পড়ে আমরা করি ।

সে পাগলের চোখ পাকায়, আর যতো ভোগান্তির ভেতর দিয়ে গেছে

তার চাউনিতে অপরাধী গর্তের জল হয়ে জমে থাকে ।

জীবনে এমন সব মারাত্মক আঘাত আসে…আমি জানি না ।

 

আমি আশার কথা বলব

আমি সেজার ভালেহোর মতন এই যন্ত্রণা সহ্য করি না । আমি শিল্পীর মতন যন্ত্রণা সহ্য করি না, মানুষের মতন, কিংবা নিছক জীবন্ত প্রাণীর মতন । আমি ক্যাথলিকের মতন এই যন্ত্রণা সহ্য করি না, একজন মুসলমানের মতন, কিংবা একজন নিরীশ্বরবাদীর মতন । আজকে আমি কেবল যন্ত্রণাভোগ করি । যদি আমার নাম সেজার ভালেহো না হতো, আমি এই একই যন্ত্রণায় ভুগতুম ।

আমি যদি শিল্পী না হতুম, আমি তবু যন্ত্রণা ভোগ করতুম ।: আমি যদি মানুষ না হতুম কিংবা জীবন্ত প্রাণীও না হতুম, তবু আমি যন্ত্রণা ভোগ করতুম । আমি যদি একজন ক্যাথলিক, একজন নিরীশ্বরবাদী, কিংবা একজন মুসলমান না হতুম, তবু আমি যন্ত্রণায় ভুগতুম । আজকে আমি আরও গভীর অন্তর থেকে যন্ত্রণা ভোগ করছি । আজকে আমি কেবল যন্ত্রণা ভোগ করছি।

 

কোনোও ব্যাখ্যা ছাড়াই আমি যন্ত্রণায় ভুগি । আমার যন্ত্রণা এতো গভীর যে তার কোনো কারণ কখনও ছিল না — বা কারণহীনতা ছিল না । তার কি কারণ হতে পারে ? কোথায় সেই কোনওকিছু যে তার কারণ হওয়া থামিয়ে দিয়েছে ? কোনো কিছুই এর কারণ ছিল না । কেমন করে এই যন্ত্রণা নিজের থেকে নিজেই জন্মেছে ? আমার যন্ত্রণা উত্তরের বাতাস আর দক্ষিণের বাতাস থেকে, সেই যৌনতাহীন বিরল পাখিদের মতন যারা যৌনতাহীন ডিম পাড়ে আর বাতাস তাদের প্রসবে সাহায্য করে । যদি একজন প্রেমিকা মারা যেতো, আমার যন্ত্রণা একই হতো। যদি ওরা আমার গলার নলি কেটে দিতো, আমার যন্ত্রণা একই হতো। যদি জীবন — সংক্ষেপে —  অন্যরকম হতো, আমার যন্ত্রণা একই হতো । আজকে আমি আরও ঊর্ধ থেকে যন্ত্রণা ভোগ করি। আজকে আমি কেবল যন্ত্রণা ভোগ করি ।

 

আমি ক্ষুধার্ত মানুষের যন্ত্রণার দিকে তাকাই আর দেখি যে তাদের ক্ষুধা আমার যন্ত্রণা থেকে অনেক পার্থক্য বজায় রেখেছে ; আমি মৃত্যু পর্যন্ত উপবাস করতে পারি আর অন্তত একটা ঘাসের শীষ আমার কবর থেকে জন্মাবে । প্রেমিক-প্রেমিকাদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার । আমার তুলনায় তাদের রক্ত কতোটা স্পন্দিত হয়েছে, যার কোনও উৎস বা প্রয়োজন নেই ।

 

এতোকাল পর্যন্ত আমি ভাবতুম যে এই বিশ্বে সবকিছুই হয় বাবা-মা অথবা সন্তান । কিন্তু চেয়ে দ্যাখো : আজকে আমার যন্ত্রণা বাবা-মাও নয় সন্তানও নয় । অন্ধকার হবার মতো এর কোনো পিছন নেই, ভোর হবার মতো এর প্রচুর বুকের পাটা আছে ।, আর যদি ওরা একে কোনো অন্ধকার ঘরে বন্দি করে রাখে এ থেকে আলো বেরোবে না ; যদি ওরা একে কোনো উজ্বল ঘরে রাখে, এর কোনো ছায়া তৈরি হবে না । আজকে আমি যন্ত্রণা ভোগ করি তা যাইই হোক না কেন। আজকে আমি কেবল যন্ত্রণা ভোগ করি ।

 

About anubadak

আমি একজন অনুবাদক । এতাবৎ রেঁবো, বদল্যার, ককতো, জারা, সঁদরা, দালি, গিন্সবার্গ, লোরকা, ম্যানদেলস্টাম, আখমাতোভা, মায়াকভস্কি, নেরুদা, ফেরলিংঘেট্টি প্রমুখ অনুবাদ করেছি ।
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s