জাক প্রিভের-এর কবিতা । অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

Jacques-Prévert

আলিকান্তে

টেবিলের ওপরে একটা কমলালেবু

মেঝেয় তোমার পোশাক

আর তুমি আমার বিছানায়

বর্তমানের মিষ্টি উপহার

তরতাজা রাত

আমার জীবনের উষ্ণতা

 

এই প্রেম

এই প্রেম

কতো তীব্র

কতো ভঙ্গুর

কতো কোমল

কতো আশাহীন

এই প্রেম

দিনের মতন সুন্দর

আর আবহাওয়ার মতন খারাপ

যখন আবহাওয়া খারাপ হয়

এই প্রেম

কতো বাস্তব

এই প্রেম

কতো সুন্দর

কতো আনন্দময়

কতো হাসিখুশি

আর কতো হাস্যকর

ভয়ে কাঁপতে থাকে

অন্ধকারে বাচ্চার মতন

আর নিজের সম্পর্কে কতো নিশ্চিত

রাতের স্তব্ধতায় সরল মানুষের মতন

এই প্রেম

যা অন্যদের ভিরু করেছে

যা অন্যদের চুটকির খোরাক করেছে

যা তাদের গাল থেকে রঙ মুছে ফেলেছে

এই প্রেম

লক্ষ্য রাখা হয়

কেননা আমরা তাদের জন্য লক্ষ্য রেখেছি

ছেঁড়া, আহত, পিষে-ফেলা, ফুরোনো, অগ্রাহ্য-করা, ভুলে-যাওয়া

কেননা আমরা তাকে ছিঁড়েছি, আঘাত দিয়েছি, পিষে মেরেছি,

ফুরিয়ে দিয়েছি, অগ্রাহ্য করেছি, ভুলে গেছি

এই প্রেম

সম্পূর্ণ

এখনও কতো জীবন্ত

ঝকমক করছে

এটা তোমার

এটা আমার

এই প্রেম

যা সব সময়ে নতুন

আর যা কখনও বদলায় না

গাছের মতন বাস্তব

পাখির মতন কম্পমান

গ্রীষ্মের মতন উষ্ণ আর জীবন্ত

দুজনেই পারি

চলে যেতে আর ফিরে আসতে

আমরা ভুলে যেতে পারি

আর ঘুমিয়ে পড়তে পারি

আর জেগে উঠতে পারি

বার্ধক্যের যন্ত্রণা ভোগ করতে পারি

আবার ঘুমিয়ে পড়তে পারি

মৃত্যু পর্যন্ত স্বপ্ন দেখতে পারি

জাগ্রত

মৃদু হাসার আর জোরে হাসার জন্য

আবার তরুণ

আমাদের প্রেম সহ্য করে

গাধার মতন একগুঁয়ে

আকাঙ্খার মতন জীবন্ত

স্মৃতির মতন নিষ্ঠুর

মূর্খতার মতন পশ্চাত্তাপ

স্মৃতির মতন কোমল

শ্বেতপাথরের মতন শীতল

দিনের মতন সুন্দর

শিশুর মতন অপলকা

আমাদের দ্যাখে

হাসছি

আমাদের সঙ্গে কথা বলে

একটি শব্দও ব্যবহার না করে

আর আমি

আমি তা শুনি

কাঁপতে থাকি

আর আমি কাঁদি

তোমার জন্য কাঁদি আমি

আমার জন্য কাঁদি

তোমার কাছে চাই

তোমারই জন্য

আমার জন্য

এবং আর সবায়ের জন্য যারা ভালোবাসে

আর যাদের ভালোবাসা হয়

হ্যাঁ

আমি এর কাছে কাঁদি

তোমার জন্য

আমার জন্য

এবং আর সবায়ের জন্য

ওখানেই থাকো

যেখানে আছো সেখানেই থাকো

যেখানে তুমি আগে ছিলে

সেখানে থাকো

নড়বে না

চলে যেও না

আমাদের তো ভালোবাসা হয়

আমরা তোমাকে ভুলে গেছি

আমাদের ভুলে যেও না

এই পৃথিবীতে কেবল তুমিই ছিলে

আমাদের শীতল হয়ে উঠতে দিও না

প্রতিদিন দূর থেকে দূরে

কোথায় তাতে কিছু আসে-যায় না

আমাদের জীবনের ইশারা দাও

জঙ্গলের কোনো একান্তে

স্মৃতির জঙ্গলে

হঠাৎ আবির্ভূত হয়

আমাদের হাত ধরে নিয়ে চলো

আর বাঁচাও

গান

আমরা কোন দিনে ?

আমরা প্রতিটি দিন

বন্ধু আমার

আমরা সম্পূর্ণ জীবন

প্রিয়তমা

আমরা ভালোবাসি আর আমরা বাঁচি

আমরা বাঁচি আর আমরা ভালোবাসি

আর আমরা সত্যিই জানি না

জীবন ঠিক কি

আর আমরা সত্যিই জানি না

আজকে কি বার

আর আমরা সত্যিই জানি না

ভালোবাসা কাকে বলে

 

প্রাতঃরাশ

ও কফি ঢাললো

কাপে

ও দুধ ঢাললো

কফির কাপে

ও চিনি মেশালো

কফিতে আর দুধে

ও নাড়ালো

চামচ দিয়ে

ও কফি খেলো

আর কাপটা ফেরত রেখে দিলো

আমার সঙ্গে কোনো কথা না বলে

ও সিগারেট ধরালো

কয়েকটা গোলা ওড়ালো

ধোঁয়া দিয়ে

ও ছাই ঝাড়লো

অ্যাশট্রেতে

আমার সঙ্গে কথা না বলে

আমার দিকে না তাকিয়ে

ও উঠে দাঁড়ালো

ও  হ্যাট পরলো

নিজের মাথায়

ও পরে নিলো

নিজের রেনকোট

কেননা বৃষ্টি পড়ছিল

ও বেরিয়ে গেল

বৃষ্টিতে

কথা না বলে

আমার দিকে না তাকিয়ে

আর আমি

আমি আমার  মাথা

আমার হাতে নিয়ে

আর আমি কাঁদলুম

পারিবারিক জীবন ( ১ )

মা বুনছেন

ছেলে যুদ্ধে যায়

উনি তা স্বাভাবিক মনে করেন, এই মা

আর বাবা ?

বাবা কি করেন ?

ওনার ব্যবসা আছে

ওনার স্ত্রী বোনেন

ওনার ছেলে যুদ্ধে যায়

ওনার ব্যবসা আছে

ওনার তা স্বাভাবিক মনে হয়, এই বাবার

আর ছেলেটা

আর ছেলেটা

ছেলেটা কি পায় ?

ও একেবারে কিছুই পায় না, এই ছেলে

ছেলেটা : মা নিজের বুনে চলেছেন,

বাবার নিজের ব্যবসা আছে

আর ওর যুদ্ধ আছে

আর যখন যুদ্ধ শেষ হবে

ও বাবার সঙ্গে ব্যবসার কাজ করবে

যুদ্ধ চলতেই থাকে

মা বুনতে থাকেন

বাবা ব্যাবসা চালিয়ে যান

ছেলে মারা যায়

ও আর চালিয়ে যায় না

বাবা আর মা ওর কবরে যান

ওনারা এটা স্বাভাবিক মনে করেন

বাবা আর মা

জীবন চলে যায়

বোনা, যুদ্ধ, ব্যবসার জীবন

ব্যবসা, যুদ্ধ, বোনা, যুদ্ধ

ব্যবসা, ব্যবসা, ব্যবসা

গোরস্তানের জীবন

পারিবারিক জীবন ( ২ )

মা বোনেন

ছেলেটা যুদ্ধে চলে যায়

এটা এক ধরনের স্বাভাবিকতা মনে হয়, মায়ের

আর বাবা ?

বাবা কি নিয়ে ব্যস্ত ?

বাবার চাকরি আছে

ওনার বুড়ির বোনা আছে

ওনার ছেলে যুদ্ধে চলে গেছে

এটা এক ধরণের স্বাভাবিকতা, বাবার কাছে

আর ছেলেটা ?

ছেলেটার কি হলো ?

ও শেষ পর্যন্ত কি করলো ?

মিষ্টতা সবায়ের পেছন মারলো

ওর বুড়ির আছে বোনা

ওর বুড়োর আছে চাকরি

আর ওর আছে পেছন-মারানো যুদ্ধ

আর যখন যুদ্ধ শেষ হলো

ও একটা চাকরি পাবে

ওর বুড়োর মতন

যাহোক যুদ্ধ চলতেই থাকে

ওর বুড়ি বোনা চালিয়ে যায়

ওর বুড়ো চাকরি চালিয়ে যায়

ওর খুলির পেছন মেরে বোমায় উড়ে যায়

ও আর চালিয়ে যেতে পারে না

ও তলায় চলে যায়

মা আর বাপ

কবর দেখতে যায়

যা এক ধরনের স্বাভাবিক ব্যাপার মনে হয়

মা আর বাবার কাছে

আর জীবন চলে যায়

বোনার, যুদ্ধের, চাকরির জীবন

যুদ্ধ, বোনা, যুদ্ধ

চাকরি, চাকরি, চাকরি,

ফালতু গোরস্তানের জীবন

 

অপরিমেয় লোহিত

অপরিমেয় আর লোহিত

প্যারিসের গ্রঁ পালের ওপরে

শীতের সূর্ষ দেখা দেয়

আর মিলিয়ে যায়

যেন আমার হৃদয়ও মিলিয়ে যাবে

আর আমার সব রক্ত চলে যাবে

তোমাকে খুঁজতে যাবে

আমার ভালোবাসা

আমার সুন্দরী

তোমাকে খুঁজে পাবে

ওইখানে যেখানে তুমি রয়েছ

 

বাগান

হাজার হাজার বছরও

যথেষ্ট হবে না

বলার জন্য যে

অনন্তকালের ক্ষণসেকেন্ড

যখন তুমি আমায় জড়িয়ে ধরেছিলে

যখন আমি তোমায় জড়িয়ে ধরেছিলুম

একদিন সকালে

শীতের আলোয়

মসুরিস পার্কে

প্যারিসে

পৃথিবীর ওপরে

এই পৃথিবী

যা এক নক্ষত্র

প্রিয়তমা তোমার জন্য

বাজারে গেলুম, যেখানে পাখি বিক্রি হয়

আর আমি কয়েকটা পাখি কিনলুম

তোমার জন্য

আমার ভালোবাসা

আমি বাজারে গেলুম, যেখানে ফুল বিক্রি হয়

আর আমি কিছু ফুল কিনলুম

তোমার জন্য

আমার ভালোবাসা

আমি বাজারে গেলুম, যেখানে শেকল বিক্রি হয়

আর আমি কয়েকটা শেকল কিনলুম

ভারি শেকল

তোমার জন্য

আমার ভালোবাসা

আর তারপর আমি ক্রীতদাসীদের বাজারে গেলুম

তোমার খোঁজ করলুম

কিন্তু সেখানে তোমাকে পেলুম না

আমার ভালোবাসা

প্রথম দিন

আলমারিতে শাদা চাদর

বিছানায় লাল চাদর

মায়ের মধ্যে শিশু

মা যন্ত্রণায়

বাবা হলঘরে

হলঘর বাড়িতে

বাড়িটা শহরে

শহর রাতের বেলায়

একটি কান্নায় মৃত্যু

আর জীবনে এক শিশু

জীবনের বিস্ময়গুলো

একটা ফাঁদের দাঁতে

এক শাদা শেয়ালের থাবা

আর তুষারের ওপরে, রক্ত

শাদা শেয়ালের রক্ত

আর তুষারের ওপরে, পায়ের ছাপ

শাদা শেয়ালের পায়ের ছাপ

যে তিন পায়ে পালিয়েছে

যখন সূর্য অস্ত যাচ্ছিল

দাঁতে একটা খরগোশ নিয়ে

তখনও জ্যান্ত

এটা সেরকমই

একজন নাবিক সমুদ্র ছেড়েছে

তার জাহাজ বন্দর ছেড়েছে

রাজা ছেড়েছে রানিকে

আর একজন কৃপণ ছেড়েছে নিজের সোনা

এটা সেরকমই

একজন বিধবা তাঁর দুঃখ ছেড়েছেন

এক পাগলি ছেড়েছে পাগলাগারদ

আর তোমার হাসি ছেড়েছে আমার ঠোঁট

এটা সেরকমই

তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে

তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে

তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে

তুমি আমার কাছে ফিরে আসবে

তুমি আমাকে বিয়ে করবে

তুমি আমাকে বিয়ে করবে

ছুরি জখমকে বিয়ে করে

রামধনু বৃষ্টিকে বিয়ে করে

হাসি চোখের জলকে বিয়ে করে

আদর ভ্রুকুটিকে বিয়ে করে

এটা সেরকমই

আর আগুন বরফকে বিয়ে করে

মৃত্যু জীবনকে বিয়ে করে

জীবন প্রেমকে বিয়ে করে

তুমি আমাকে বিয়ে করবে

তুমি আমাকে বিয়ে করবে

তুমি আমাকে বিয়ে করবে

হাইড পার্ক

সেইরকম সমুদ্র যা

বালির ওপরে থুবড়ে পড়ে

এখানে প্রেমিক-প্রেমিকারা ক্রিয়া করে

যা তারা ভালো বোঝে

আর কেউই প্রশ্ন তোলে না

ব্যাপারটা রাতের জন্য

নাকি কিছুক্ষণের

কেউ কথা বলে না

এই ঘরের দামের ব্যাপারে

সবুজ মখমলের জীবনে

হাইড অ্যাণ্ড জেকিল পার্ক

জনগণের ইডেন যেখানে শুনতে পাওয়া যায়

রাত আর দিন

ফিসফিস করে বলা

“শয়তান স্বপ্নকে বাঁচাও!”

About anubadak

আমি একজন অনুবাদক । এতাবৎ রেঁবো, বদল্যার, ককতো, জারা, সঁদরা, দালি, গিন্সবার্গ, লোরকা, ম্যানদেলস্টাম, আখমাতোভা, মায়াকভস্কি, নেরুদা, ফেরলিংঘেট্টি প্রমুখ অনুবাদ করেছি ।
This entry was posted in Jaques Prevert and tagged . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s