উইলিয়াম ব্লেক-এর স্বর্গ ও নরকের বিবাহ William Blake : Marriage of Heaven & Hell

 

প্রস্তাবনাwilliam-blake-9214491-1-402

থমথমে হাওয়ায় গর্জন করে উঠলেন রিনট্রাহ আর ওড়ালেন  নিজস্ব আগুনের ঝড় ;

অনন্তে চলছিল ক্ষুধার্ত মেঘমালার সদম্ভ বিচরণ ।

.

একদা দুর্বল এবং বিপদের গলিপথে

সৎ মানুষটি হেঁটে যাচ্ছেন

মৃত্যু উপত্যকার মাঝবরাবর ।

যেখানে কাঁটার জন্ম গোলাপ পোঁতা হয়,

আর উষর প্রান্তর জুড়ে

গান গায় মৌমাছিরা ।

.

তারপর বেছানো হল সেই বিপদের গলিপথ

এবং একটি নদী আর এক ঝর্ণা

প্রতিটি চূড়ায় আর সমাধিতে,

আর অমলিন দুধসাদা হাড়ে

লাল মাটির প্রলেপ দেয়া হয়েছে ।

.

যতোদিন না সহজ পথ ছেড়ে দিয়ে দুবৃত্ত

এগিয়ে যায় বিপদের গলিপথে, আর

উষর ভূখণ্ডে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ততক্ষণ ।

.

এখন এই ছিঁচকে সাপ-শয়তান হেঁটেচলে বেড়াচ্ছে

অনুগ্র অবমানিত অবস্হায়

আর অলৌকিক এলাকার সৎ মানুষটি ক্রোধে চিৎকার করে ওঠেন

যেখানে চরে বেড়াচ্ছে সিংহের দল সেখানে ।

.

থমথমে হাওয়া গর্জন করে উঠলেন রিনট্রাহ আর ওড়ালেন নিজস্ব আগুনের ঝড় ;

অনন্তে চলছিল ক্ষুধার্ত মেঘমালার সদম্ভ বিচরণ ।

.

নতুন স্বর্গের পত্তন হয়েছে, আর তাঁর আবির্ভাবের পর কেটে গেছে তেত্রিশটি বছর, শাশ্বত নরকের ঘটেছে পুনরভ্যূদয় । আর দেখুন ! সমাধির ওপর বসে আছেন দেবদূত সুইডেনবোর্গ ; তাঁর রচনাবলী হল ভাঁজ করে রাখা কাপড়-চোপড় । এখন চলছে শত্রুদের রাজত্ব, আর স্বর্গে ঘটেছে প্রথম মানুষের প্রত্যাবর্তন ।

.

বিরুদ্ধাচরণ যদি না হয় তাহলে এগোনো যায় না ! মানুষের বেঁচে থাকার জন্য চাই আকর্ষণ ও বিকর্ষণ, যুক্তিতর্ক ও তেজ, প্রেম ও ঘৃণা ।

ধর্মে যাকে শুভ ও অশুভ বলা হয় তার উদ্ভব ওই পরস্পরবিরোধিতা থেকে ।

যে নিষ্ক্রিয়তা যুক্তিতর্কের আয়ত্তে তা-ই শুভ, তেজ থেকে যা স্ফূরিত হয় তা অশুভ ।

শুভ হল স্বর্গ । অশুভ হল নরক ।

পাপাত্মার কন্ঠস্বর

নিম্মলিখিত ভুলগুলোর উৎস হল তাবৎ ধর্মগ্রন্হ এবং পবিত্র নির্দেশিকা :

১. মানুষের রয়েছে দুটি সত্ত্বা, অর্থাৎ একটি দেহ, আর একটি আত্মা ।

২. দেহ থেকে যে তেজ নির্গত হয় তা-ই অশুভ, এবং যে যুক্তিতর্ককে বলা হয় শুভ তা আত্মা থেকে উদ্গত ।

৩. ঈশ্বর তাঁর পরাক্রমকে মেনে নেবার জন্য মানুষকে অনন্তকাল পর্যন্ত কষ্ট দেবেন ।

অথচ নিম্নলিখিত বৈপরীত্যগুলোই সত্য :

১. মানুষের দেহ আত্মা থেকে আলাদা নয়, কেননা যাকে দেহ বলা হয় তা পঞ্চেন্দ্রিয় দ্বারা বোধগম্য আত্মার অংশ, এই কালবেলায় তা আত্মার প্রধান আগমপথ ।

২. তেজই জীবন এবং তা দেহ থেকে উদ্গত, আর যুক্তিতর্ক হল তেজের বাঁধন বা বাইরের খোলোশ ।

৩. তেজ হল অনন্তকালব্যাপী পরম আহ্লাদ ।

.

যারা আসক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে তারা তা নিজেদের নিয়ন্ত্রণযোগ্য দুর্বলতার জন্য করে, এবং নিয়ন্ত্রণকারী, অর্থাৎ যুক্তিতর্ক, জবরদখল চালিয়ে অনিচ্ছুককে শাসন করে । আর নিয়ন্ত্রিত থাকার দরুণ তা হয়ে পড়ে নিষ্ক্রিয়, তবুও তা কেবলমাত্র আসক্তির ছায়া ।

প্যারাডাইস লস্ট লেখা আছে সে কাহিনি, আর শাসক অর্থাৎ যুক্তিতর্ক, ওনাকে বলা হয় ত্রাণকর্তা ।

এবং সেই আদিতম দেবদূত, স্বর্গীয় কর্তার নির্দেশের যিনি ভোগদখলকারী, তাঁকে বলা হয় পাপাত্মা ওরফে শয়তান, আর তার সন্তানদের নাম পাপ ও মৃত্যু ।

কিন্তু বুক অব জব-এ মিলটনের ত্রাণকর্তার নাম শয়তান ।

সেহেতু দু’পক্ষই আশ্রয় নিয়েছে ইতিহাসে ।

যুক্তিতর্কে সত্যিই মনে হয়েছিল যে আসক্তিকে ঘরছাড়া করা হয়েছে, কিন্তু পাপাত্মার বক্তব্য হল যে ত্রাণকর্তার তো পতন ঘটেছিল, আর মহাশূন্য থেকে যে জিনিস তিনি চুরি করেছিলেন তা দিয়ে গড়ে তুললেন স্বর্গ ।

ধর্মশাস্ত্রে তা লেখা আছে, যেখানে উনি সান্ত্বনাদানকারীকে পাঠাবার জন্য ঈশ্বরের কাছে অনুনয় করছেন, কিংবা আসক্তিকে, যাতে যুক্তিতর্কের ভিতের ওপর ভাবনার প্রাসাদ গড়ে তোলা যায়, অগ্নিশিখার গর্ভে যাঁর নিবাস তিনি আর কেউ নন, কেবল ধর্মগ্রন্হের পরমেশ্বর । জেনে রাখুন যে যিশুখ্রিস্টের মৃত্যুর পর তিনি পরমেশ্বর হয়েছিলেন । কিন্তু মিলটনে ঈশ্বরই নিয়তি, যিশু পঞ্চেন্দ্রিয়ের অনুপাত, এবং পবিত্র আত্মা হল মহাশূন্য ।

উল্লেখ্য : হাতে-পায়ে বেড়ি পরা অবস্হায় মিলটন দেবদূত ও ঈশ্বর বিষয়ে লিখেছিলেন, আর শৃঙ্খলমুক্ত অবস্হায় লিখেছিলেন নরক ও পাপাত্মাদের সম্পর্কে, কেননা তিনি ছিলেন সত্যকার কবি, এবং অজ্ঞাতসারে ছিলেন পাপাত্মার দলে ।

একটি স্মরণীয় কল্পনা

আমি যখন নরকের আগুনের ভেতর দিয়ে হাঁটছিলুম, প্রতিভা উপভোগের আনন্দে বিভোর, দেবদূতের কাছে যা যন্ত্রণাদায়ক ও মস্তিষ্কবিকৃতির কারণ, আমি তাদের কিছু প্রবাদ সংগ্রহ করেছিলুম, এই ভেবে যে, একটি রাষ্ট্রের চরিত্র সেখানে ব্যবহৃত কথাবার্তা থেকে বোঝা যায়, ঠিক তেমনই বাড়িঘর আর পোশাকের বর্ণনার চেয়ে বরং নরকের প্রবাদগুলো থেকে নারকীয় জ্ঞান অর্জন করা যায় ।

আমি যখন বাড়ি ফিরলুম, পঞ্চেন্দ্রিয়ের রসাতলে, যেখানে এই জগতে একটা চ্যাটালো গহ্বর রয়েছে, মেঘে ঢাকা বিশালাকার পাপাত্মাকে দেখতে পেলুম, পাষাণপিণ্ড ঘিরে পাক খেয়ে চলেছে । ক্ষয়িষ্ণু বাক্য দিয়ে নিচের বাক্যটা সে লিখেছিল, যা মানুষেরা নিজের বোধবুদ্ধি দিয়ে অনুভব করেছে, আর পৃথিবীতে তা তারা পাঠ করেছে :

আপনি জানেন প্রতিটি পাখি বাতাস কেটে এগোয়

তা এক পরমানন্দের জগত, তা কি আপনার পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে ঘেরা ?

নরকের প্রবাদসমূহ

সময়ের শিক্ষা হয় বীজে, শিক্ষা হয় ফসল তোলায়, শীতে আনন্দ ।

মৃতের হাড়ের ওপর চালাও তোমার ঠেলাগাড়ি, তোমার লাঙল ।

অমিতাচারে পথ জ্ঞানের রাজপ্রাসাদে যায় ।

বিচক্ষণতা হল অক্ষমতার প্রণয়িনী, এক ধনী কুৎসিত বুড়ি ।

যে নিজের আসক্তির নির্দেশে চলে না সে মড়কের জনক ।

দ্বিখণ্ডিত কীট লাঙলকে ক্ষমা করে ।

যে জল ভালোবাসে তাকে নদীতে চোবাও ।

যে গাছ জ্ঞানী দেখতে পান তা মূর্খ দেখতে পায় না ।

যার মুখশ্রীতে জ্যোতি নেই সে কখনও নক্ষত্র হবে না ।

সময়ের উৎপাদিকা-শক্তির সঙ্গে অনন্তকালের চিরপ্রণয় ।

ব্যস্ত মৌমাছির দুঃখের সময় নেই ।

ঘযী কেবল বোকামির সময় পরিমাপ করে ;

কিন্তু জ্ঞানীকে কোনও ঘড়ি ধরে মাপা যায় না ।

জাল কিংবা ফাঁদ ছাড়াই পাওয়া যায় সবরকম পুষ্টিকর খাবার ।

অভাবের বছরে বের করে আনো সংখ্যা, ওজন এবং মাপ ।

কেবল নিজের ডানায় ভাসলে কোনো পাখি বেশি উঁচুতে উড়তে পারে না ।

আঘাত নয় পপত্যাঘাত দেয় মৃতদেহ ।

শ্রেষ্ঠ কাজ হল নিজের কাছে অমন আরেকটি কাজ তুলে ধরা ।

মূর্খ যদি বারংবার বোকামি করে তাহলে সে জ্ঞানী হয়ে যাবে ।

বোকামি হল বজ্জাতির আবরণ ।

গর্বের আবরণ হল লজ্জা ।

আইনের পাথর দিয়ে কারাগার গড়ে ওঠে,

ধর্মের ইঁট দিয়ে নির্মিত হয় বেশ্যালয় ।

ময়ূরের গর্ব হল ঈশ্বরের গরিমা ।

ছাগলের ক্ষুন্নিবৃত্তি হল ঈশ্বরের উদারতা ।

সিংহের ক্রোধ হল ঈশ্বরের বিচক্ষণতা ।

নারীর নগ্নতা হল ঈশ্বরের কারুকাজ ।

অত্যধিক দুঃখ হাসে । অত্যধিক আনন্দ কাঁদে ।

সিংহের গর্জন, নেকড়ের আর্তনাদ, ঝোড়ো সমুদ্রের ক্ষোভ এবং খুংখার তরবারি হল

মহাকালের অংশ যা এমন পবিত্র যে মানুষ তা দেখতে পায় না ।

শেয়াল ফাঁদকে দোষ দেয়, নিজেকে নয় ।

আনন্দ প্রবেশ করে । দুঃখ বেরিয়ে আসে ।

পুরুষ পরে নিক সিংহের চামড়া, নারী পরুক মেষের পশম ।

পাখি একটি নীড়, মাকড়সা এক তন্তুজাল, মানুষ বন্ধুত্ব ।

স্বার্থপর হাসিমুখ মূর্খ এবং গোমড়ামুখ জেদিমূর্খ

দুজনকেই মনে করা উচিত জ্ঞানী, তারা উভয়েই হয়তো রাজদণ্ড ।

এখন যা প্রমাণিত হল তা একদা ছিল কল্পনা ।

ইঁদুর, ছুঁচো, শেয়াল খরগোশ দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে শেকড়ে ।

সিংহ, বাঘ, ঘোড়া, হাতি নজর রাখে ফলাফলে ।

হ্রদ ধরে রাখে ; ঝর্ণা উপচিয়ে পড়ে ।

অপরিমেয়তাকে পূর্ণতা দিতে পারে একটিমাত্র চিন্তা ।

নিজের মনের কথা বলার জন্য সর্বদা তৈরি থাকুন,

তাহলে হীনচরিত্র মানুষেরা আপনাকে এড়িয়ে চলবে ।

যা-কিছু বিশ্বাসযোগ্য তা সত্যের রূপকল্প ।

কাকের কথা জানতে আগ্রহী হবার আগে ঈগলের সময় নষ্ট হয়নি কখনও ।

শেয়াল নিজেই নিজের ব্যবস্হা করে নেয়, কিন্তু সিংহের জন্য ব্যবস্হা করেন ঈশ্বর ।

চিন্তা করবেন সকালে ; কাজ করবেন দুপুরে ; খাবেন সন্ধ্যায় ; ঘুমোবেন রাতে ।

আপনার তাঁবেদারিতে যে ভুগছে, সে আপনাকে চেনে ।

লাঙল যেভাবে শব্দকে অনুসরণ করে, ঈশ্বর সেভাবে পুরস্কৃত করেন প্রার্থনাকে ।

আদেশের ঘোড়ার চেয়ে রোষের বাঘ আনেক জ্ঞানী ।

স্রোতহীন জলের কাছে বিষ আশা করবেন ।

যতক্ষণ না আপনি জানছেন যথেষ্টের বেশি কাকে বলে

ততক্ষণ আপনি জানতে পারবেন না যথেষ্ট কাকে বলে ।

মূর্খের ভর্ৎসনা শুনুন ! তা রাজার দেয়া উপাধি !

আগুনের চোখ, বাতাসের নাক, জলের হাঁ-মুখ, পৃথিবীর দাড়ির চুল ।

যে শৌর্যে দুর্বল সে চাতুর্যে দক্ষ ।

কী ভাবে বেড়ে উঠতে হবে তা আপেলগাছ বন্যগাছের কাছে জানতে চায় না,

ঘোড়ার কাছে সিংহ জানতে চায় না কী ভাবে শিকার করতে হবে ।

ধন্যবাদ দানকারী গ্রহীতা অনেক ফসল তোলে ।

অন্যেরা যদি বোকা না হয়, তাহলে আমাদের হতে হবে ।

মিষ্টি আনন্দের আত্মাকে কলুষিত করা যায় না ।

আপনি যখন ঈগলপাখিকে দ্যাখেন তখন প্রতিভার অংশবিশেষ দেখতে পান ;

মাথা একটু ওপর দিকে তুলুন ।

গুটিপোকা যেমন ডিম পাড়ার জন্য সবচেয়ে ভালো পাতাগুলো বাছে,

ঠিক তেমনই অনাবিল আনন্দে অভিশাপ দ্যায় পুরোহিত ।

একটা ছোট্ট ফুল ফোটাতে কয়েক যুগের শ্রম লাগে ।

বাঁধনকে নিন্দা করুন । আশীর্বাদ করুন চিত্তবিনোদনকে ।

পুরোনো মদ সবচেয়ে ভালো । সবচেয়ে ভালো নতুন জল ।

প্রার্থনাকারীরা হাল চষে না । ফসল তোলে না প্রশংসাকারী ।

আনন্দ হাসে না ! দুঃখ কাঁদে না !

মস্তক মহিমা, হৃদয় করুণা, লিঙ্গ সৌন্দর্য, হাত ও পা সমন্বয় ।

পাখির কাছে যেমন বাতাস কিংবা মাছের কাছে যেমন সমুদ্র,

তেমনই ঘৃণ্যের কাছে অবজ্ঞা ।

কাক চেয়েছে সবকিছু হোক কালো ; পেঁচা চেয়েছে সবকিছু হোক সাদা ।

সমৃদ্ধিই সৌন্দর্য ।

শেয়াল যদি সিংহকে উপদেশ দেয় বুঝতে হবে সে বেশ ঘোড়েল ।

সোজা পথের উপায় বাতলায় উৎকর্ষ, কিন্তু উৎকর্ষ-বঞ্চিত বেঁকা রাস্তাই প্রতিভার পথ ।

না-মেটা আকাঙ্খা লালন করার বদলে শিশুকে আঁতুড়ে মেরে ফ্যালো ।

যেখানে মানুষ নেই সেখানে প্রকৃতি উষর ।

সত্যকে বোধগম্য করার মতন,

আর তারপর অবিশ্বাসযোগ্য করার মতন করে বলা যায় না ।

যথেষ্ট । অথবা অনেক !

দেবতা আর প্রতিভার সাহায্যে প্রাচীন কবিরা সমস্ত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুকে

সঞ্জীবিত করতে পারতেন, নাম ধরে ডাকতে পারতেন তাদের,

আর তাদের অলঙ্কৃত করতে পারতেন বনানী, নদী, পর্বতমালা,

হ্রদ, শহর, রাষ্ট্রের গুণাগুণ দিয়ে, আর এ-ছাড়া তাঁদের ব্যপ্ত ও

অনেকানেক সংবাদ সমস্তকিছুকে অনুভব করতে পারতো ।

আর বিশেষ করে প্রতিটি শহর ও দেশের প্রতিভাকে অধ্যয়ন করতেন তাঁরা,

মনের দেবতাকে উৎসর্গ করার জন্য ।

যতদিন না কোনো নিয়ম তৈরি হয়, যার সুযোগ অনেকে নিয়েছিল

আর বস্তুদের কাছ থেকে তাদের মনের দেবতাকে নিয়ে

দিতে চেয়েছে বিমূর্ত আদল কিংবা স্পষ্টীকরণের চেষ্টায়

কয়েদ করেছে স্হূলতাকে । তা থেকে আরম্ভ হল পুরোহিতপ্রথা :

কবিতার আঙ্গিক থেকে পূজার আঙ্গিক বাছাই ।

আর তারা বিস্তারিতভাবে জানিয়েছিল যে

এসমস্ত করা হচ্ছে দেবতাদের নির্দেশ অনুযায়ী ।

তাই মানুষ ভুলে গেল যে সকল দেবতার নিবাস হল মানুষের দেহ ।

একটি স্মরণীয় কল্পনা

ইসায়া এবং এজেকিয়েল পয়গম্বরদ্বয় আমার সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করলেন রাতে, আর আমি তাঁদের জিগ্যেস করলুম তাঁরা জোর গলায় কী করে বলছেন যে ঈশ্বর তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন, আর তাঁরা কি তখন ভাবেননি যে লোকে তাঁদের ভুল বুঝবে, আর সেহেতু তাঁরা প্রতারণার কারণ হবেন ?

ইসায়া উত্তর দিলেন : আমি কোনো ঈশ্বরকে সুনির্দিষ্ট ইন্দ্রিবজাত উপলব্ধির মাধ্যমে দেখিনি, শুনিওনি, কিন্তু আমার চেতনা প্রতিটি জিনিসে আবিষ্কার করেছে অসীমকে ; আর তখন আমাকে যেমন রাজি করানো হয়েছিল, এবং আমি নিশ্চিত, খাঁটি ঘৃণামিশ্রিত কন্ঠস্বরই ঈশ্বরের কন্ঠস্বর, তাই আমি ফলাফলের কথা ভাবিনি, লিখে গেছি ।

তারপর আমি জানতে চাইলুম, “কোনো ব্যাপার সম্পর্কে যদি দৃঢ় বিস্বাস জন্মায় যে তা ‘বিশেষ ধরণের’, তাহলে কি তাকে সেই ‘বিশেষ ধরণের’ বলা যাবে ?”

তিনি উত্তর দিলেন, “তা বলা যায় বলেই বিশ্বাস করেন কবিরা, এবং কল্পনাশক্তির যুগে এই দৃঢ় বিশ্বাস পাহাড়কে পর্যন্ত সরিয়ে দিতে পেরেছে ; কিন্তু অনেকেই কোনোকিছু সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাসের যোগ্য নন ।”

তারপর এজেকিয়েল বললেন, “প্রাচ্যের দর্শন শিখিয়েছে মানুষের উপলব্ধির প্রথম নীতিটি । সৃষ্টির আদি সম্পর্কে কোনও কৌমরাষ্ট্র হয়তো বিশ্বাস করেছে একটি তত্ত্বে, আবার অন্যেরা আলাদা ত্ত্বে । আমরা ইজরায়েলে শিখিয়েছি যে প্রথম তত্ত্বটি হল কাব্যপ্রতিভা [এখন তোমরা যে-নাম দিয়েছ], আর বাদবাকি তা থেকে আহৃত, যার কারণ হল আমাদের হাতে অন্যান্য দেশের পুরোহিত এবং দার্শনিকদের নিগ্রহ, আর আমাদের ভবিষ্যবাণীর উৎস হল যে শেষাবধি সকল দেবতার আবির্ভাব আমাদেরটিতে প্রমানিত হয়েছে, এবং তাঁরা হলেন কাব্যপ্রতিভার উপনদী । আমাদের মহান কবিসম্রাট ডেভিড এই ব্যাপারটি ঐকান্তিক ভাবে চেয়েছিলেন, এবং অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আবাহন করেছিলেন, বলেছিলেন যে এর সাহায্যে তিনি শত্রুদের বশীভূত করেন এবং রাজ্য শাসন করেন ; আর আমরা আমাদের ঈশ্বরকে এতো বেশি ভালোবেসেছি যে চারিপাশের কৌমরাষ্ট্রের দেববিগ্রহদের অবজ্ঞা করেছি, আর দাবি করেছি যে তারা দ্রোহী । এই ধরণের মতামতের দরুন মামুলি লোকেরা মনে করে যে সকল কৌমরাষ্ট্র বুঝি ইহুদিদের অধীন হয়ে যাবে ।”

“এই ব্যাপারটি,” বললেন উনি, “যাবতীয় দৃঢ় বিশ্বাসের মতন, আসবে আর যাবে, কেননা সমস্ত কৌমরাষ্ট্র ইহুদিদের রীতিনীতি মেনে চলে, এবং ইহুদি ঈশ্বরকে পুজো করে, এবং এর থেকে বেশি আর কীই বা আনুগত্য হতে পারে ?”

কিছুটা বিস্ময়ে আমি তা শুনলুম, এবং আমার নিজের প্রত্যয়কে কবুল করা দরকার । রাত্রিভোজের পর আমি ইসায়াকে বললুম, তাঁর হারানো রচনাবলী খুঁজে দিয়ে পৃথিবীকে অনুগ্রহ করুন ; তিনি বললেন, এর সমমূল্যের কিছুই হারায়নি । এজেকিয়েলও নিজের বিষয়ে সেকথা বললেন ।

আমি ইসায়াকে একথাও জিগ্যেস করলুম যে, কী কারণে তিনি তিন বছর তিনি খালি পায়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়ালেন । তিনি উত্তর দিলেন, “ঠিক যে কারণে আমাদের প্রিয় বন্ধু ডায়োজেনেস করেছিল ।”

আমি তারপর এজেকিয়েলকে জিগ্যেস করলুম যে তিনি কেন গোবর খেয়েছিলেন, আর অতোকাল যাবত বাঁপাশ কিংবা ডানপাশ ফিরে শুলেন না কেন । তিনি উত্তর দিলেন, “সবাইকে অসীম উপলব্ধির স্তরে তুলে নিয়ে যাবার ইচ্ছায়। এই প্রক্রিয়াটি উত্তর আমেরিকার উপজাতিরা অভ্যাস করে, এবং সেই লোকটিকে সৎ বলে মনে করব যে নিজের বর্তমান আরাম ও বাসনা চরিতার্থ করার জন্য নিজের প্রতিভা ও বিবেককে জলাঞ্জলি দ্যায় ?”

যেমনটা আমি নরকে শুনেছিলুম, এই সনাতন ধারণাটি সত্য যে, ছয় হাজার বছরের শেষে আগুন পৃথিবীকে গিলে খেয়ে ফেলবে ।

কেননা দেবশিশুকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে নিজের জ্বলন্ত তলোয়ার নিয়ে জীবনবৃক্ষের তত্ত্বাবধান যেন সে করা ছেড়ে দ্যায়, এবং যদি তা করে তাহলে সমগ্র সৃষ্টিতে আগুন ধরে যাবে, আর তাকে মনে হবে অসীম ও পবিত্র, যদিও এখন তাকে মনে হচ্ছে সীমাবদ্ধ ও ভ্রষ্ট ।

যৌন আনন্দের উৎকর্ষের দ্বারা তা মিটে যাবে ।

কিন্তি সবচেয়ে আগে এই মতামত পরিত্যাগ করতে হবে যে, মানুষের আত্মা থেকে আলাদা একটা দেহ আছে ; এটা আমি শয়তানি কায়দায় ছেপে দেখাবো, ক্ষার প্রয়োগ করে, নরকে যা উপকারী ও রোগহর, আপাত আড়ালের ভেতর দিয়ে গলিয়ে লুকিয়ে-থাকা অসীমকে বাইরে বের করে আনবে ।

উপলব্ধির দুয়ারের মলিনতা যদি দূর করা যায়, মানুষের সামনে প্রতিটি জিনিস স্বরূপে প্রতিভাত হবে, অনন্ত প্রতিমার রূপ ধরে ।

কেননা মানুষ নিজেকে বন্দী করে রেখেছে, যতক্ষণ না সংকীর্ণ ফাটল দিয়ে তারা  সারা জগতকে দেখতে পাচ্ছে ।

অন্য একটি স্মরণীয় কল্পনা

নরকের একটা ছাপাখানায় আমি ছিলুম, আর দেখলুম প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম জ্ঞান সম্প্রসারিত হচ্ছে ।

প্রথম প্রকোষ্ঠে ছিল একজন ড্রাগন-মানুষ, গুহামুখ থেকে জঞ্জাল পরিষ্কার করছিল ; ভেতরে গুহাটাকে পরিষ্কার করছিল আরেক ড্রাগন ।

দ্বিতীয় প্রকোষ্ঠেও গুহা আর সেখানে পাথরপিণ্ডকে জড়িয়ে রয়েছে এক বিষধর সাপ এবং অন্যান্যরা তাকে সাজিয়ে তুলেছে সোনা, রুপো ও দামি গ্রহরত্নে ।

তৃতীয় প্রকোষ্ঠে ছিল একটি ঈগলপাখি, যার পালকগুলো বাতাসের ; গুহার ভেতরটা অনন্তে পালটে দিলে সে । ঈগলের মতন দেখতে অসংখ্য মানুষ চারিধারে, তারা প্রাসাদ গড়ছিল আকাশচুম্বী চূড়ায় ।

চতুর্থ প্রকোষ্ঠে ছিল চারিধারে গর্জনরত আগুনশিখার সিংহ, এবং খনিজ তরল পদার্থ গলাচ্ছিল ।

প্রঞ্চম প্রকোষ্ঠে ছিল নামহীন কায়া, যারা খনিজগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছিল বিশাল দিগন্তে ।

সেখানে সেগুলোকে লুফে নিচ্ছিল ষষ্ঠ প্রকোষ্ঠের জবরদখলকারী মানুষেরা, আর সেগুলো গ্রন্হের আকার নিচ্ছিল এবং তাদের পাঠাগারে গুছিয়ে রাখা হচ্ছিল ।

যে দানবগুলো এই পৃথিবীকে ভোগবাসনার সংসারে পর্যবসিত করেছিল, এবং এখন হয়তো সেখানে শেকলবাঁধা অবস্হায় রয়েছে, আসলে তা তাদের জীবনের ও সকল কর্মস্রোতের উৎস ; কিন্তু শেকলগুলো আদপে দুর্বল ও পোষমানা মনের চাতুর্য, যা তেজকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রাখে : সেই প্রবাদ অনুযায়ী, “যে দুর্বল সে চাতুর্যে শক্তিমান ।”

অতএব সংসারের একটা এলাকা বহুপ্রসু, অপরটি সর্বগ্রাসী : যে সর্বগ্রাসী তার মনে হয় যারা সৃষ্টি করে তারা শৃঙ্খলিত, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা সঠিক নয় ; সে কেবল সংসারের টুকরোগুলো জড়ো করে, আর তাকেই সমগ্র বলে মনে করে ।

কিন্তু বহুপ্রসূ আর বহুপ্রসূ থাকবে না যদি না সমুদ্ররূপী সর্বগ্রাস তার মাত্রাতিরিক্ত পরমানন্দকে গ্রহণ করে । অনেকে বলবেন, “কেবলমাত্র ঈশ্বর কি বহুপ্রসূ নন ?” আমি উত্তর দেবো, “ঈশ্বর কেবল কার্যসম্পাদন করেন, এবং জায়মান সংসারে অথবা মানব সম্প্রদায়ে তিনি উপস্হিত ।”

পৃথিবীতে এই দুই ধরণের মানুষ সবসময়ে থাকে, আর তারা নির্ঘাত পরস্পরের শত্রু ; যারা তাদের মিটমাট করাতে চায়, তার পৃথিবীকে ধ্বংস করে ফেলতে চায় ।

ধর্ম হল সেই দু’জনের মিটমাট ঘটানোর প্রয়াস ।

উল্লেখ্য : যিশুখ্রিস্ট তাদের মিল ঘটাতে চাননি, বরং চেয়েছেন আলাদা করে দিতে, যেমন আমরা ভেড়া আর ছাগলের নীতিকথায় পাই । এবং তিনি বললেন, “আমি শান্তির জন্য নয়, এসেছি তরবারির জন্য ।”

এর আগে পয়গম্বর অথবা শয়তান অথবা লুব্ধককে মনে করা হতো মহাপ্রলয়ের পূর্বেকার, যা কিনা আমাদের কর্মশক্তি।

আরেকটি স্মরণীয় কল্পনা

একজন দেবদূত আমার কাছে এলেন আর বললেন, “ওহে, ক্ষুদ্র নির্বোধ যুবক ! ওহ ভয়ানক ! ভয়ঙ্কর তোমার অবস্হান ! অনন্তকালব্যাপী যে জলন্ত গনগনে অন্ধকার কারাকক্ষের উদ্দেশে নিজেকে তুমি গড়ে তুলছো, তা একবার ভেবে দেখো, যেদিকে অমন এক বাহনে চেপে তুমি এগিয়ে চলেছো ।”

আমি বললুম, “তুমি হয়তো আমাকে আমার অবিনশ্বর ভালোমন্দ দেখাতে চাইবে, এবং আমরা দুজনে এই বিষয়ে বিবেচনা করব, আর যাচাই করব তোমার না আমার কার ভালোমন্দ সর্বাধিক কাম্য ।”

তাই উনি আমায় পিঁজরেপোলের ভেতর দিয়ে নিয়ে গেলেন, তারপর গির্জার মধ্যে দিয়ে, আর তারপর গির্জার কোষাগারে, যার শেষপ্রান্তে ছিল ঘানিকল ; আমরা ঘানিকলের ভেতর দিয়ে এগোলুম, আর পৌঁছোলুম এক গুহায় ; পাকানো খাদ বেয়ে একঘেয়ে যাত্রাপথ হাতড়ে আমরা নামতে লাগলুম, যতক্ষণ না আমাদের নিচের দিকে ঢালু আকাশের মতন এক অসীম শূন্যতা দেখা গেল ; এবং গাছের শেকড় আঁকড়ে আমরা এই বিশাল শূন্যতায় ঝুলে রইলুম ; কিন্তু আমি বললুম, “তুমি যদি চাও তাহলে আমরা এই মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যাবো, আর দেখবো এখানেও ভগবান আছেন কিনা ; তুমি যদি না চাও, তাহলে আমি একাই যাবো ।” কিন্তু উনি প্রত্যুত্তর দিলেন, “কেবল অনুমান কোরো না, হে যুবক, বরং আমরা যতক্ষণ এখানে রয়েছি, তুমি নিজেকে সামলাও, কেননা অন্ধকার কেটে গেলেই আবির্ভাব ঘটবে ।”

তাই আমি সারাক্ষণ ওনার সঙ্গে রইলুম, বসে রইলুম ওকগাছের জটপাকানো গুঁড়ির ওপর ; অতলমুখো হয়ে ছত্রাকে ঝুলে রইলেন উনি ।

জ্বলন্ত শহরের আবেগময় ধোঁয়ার মতন দেখতে অনন্ত রসাতলকে আমরা একটু-একটু করে দ৩এখলুম, আমাদের পায়ের তলায় বহুদূরে ছিল সূর্য, কালো অথচ ঝকঝকে ; তাকে ঘিরে অগ্নিময় গমনপথে পাক খাচ্ছিল বিশাল মাকড়সার দল, হামাগুড়ি দিচ্ছিল শিকারের পেছন পেছন, সেগুলো উড়ছিল, বা বলা যায় সাঁতার কাটছিল, ওই অতল অনন্তে, ভ্রষ্টাচার থেকে চাগিয়ে ওঠা বিকট জানোয়ারের চেহারায়, আর তারা বাতাসে কিলবিল করছিল আর মনে হচ্ছিল তাদের নিয়েই গড়ে উঠেছে হাওয়া । ওগুলো সবকটা আসলে রাক্ষস, আর ওদের নাম হলো বাতাসের ক্ষমতা । আমি এবার আমার সহযাত্রীকে জিগ্যেস করলুম যে, “আমার অবিনশ্বর ভালোমন্দ বলতে কী বোঝায় ;” উনি জানালেন, “তা রয়েছে কালো আর সাদা মাকড়সার মাঝখানে ।”

 

 

 

 

About anubadak

আমি একজন অনুবাদক । এতাবৎ রেঁবো, বদল্যার, ককতো, জারা, সঁদরা, দালি, গিন্সবার্গ, লোরকা, ম্যানদেলস্টাম, আখমাতোভা, মায়াকভস্কি, নেরুদা, ফেরলিংঘেট্টি প্রমুখ অনুবাদ করেছি ।
This entry was posted in Marriage of Heaven and Hell, Wiliiam Blake and tagged , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s