অরুণ বালকৃষ্ণ কোলাটকর – Arun Kolatkar in Bengali

index

অরুণ বালকৃষ্ণ কোলাটকর মারাঠি ভাষার প্রখ্যাত কবি যিনি মারাঠি ও ইংরেজি দুটি ভাষাতেই কবিতা লিখতেন । তাঁর জন্ম ১৯৩২ সালে এবং মৃত্যু ২০০৪ সালে । তিনি জে জে স্কুল অব আর্ট থেকে ছবি আঁকা শেখেন এবং লিনটাস-এ গ্রাফিক ডিজাইনার হিসাবে যোগ দেন । ছবিও আঁকতেন । ইংরেজি ভাষায় লেখা তাঁর কাব্যগ্রন্হ জেজুরি-র জন্য  ১৯৭৭ সালে কমনওয়েলথ রাইটারর্স পুরস্কার পান । মারাঠি কাব্যগ্রন্হ ভিজকি ওয়াহি-র জন্য সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পান মৃত্যুর বছরে । ১৯৫৩ সালে তিনি বাবা-মা-র অমতে দর্শন ছাবডাকে বিয়ে করে বাড়ি ছাড়েন । কোলাটকারের উড়নচণ্ডী ও জীবন যাপন ও মদ্যপানে আসক্তির কারণে দর্শনের সঙ্গে তাঁর অবনিবনা বিবাহ-বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায় ; ১৯৬৬ সালে তাঁদের ডিভোর্স হয় । এর পর কোলাটকর সুনু নামে কমবয়সী একটি পার্সি মেয়েকে বিয়ে করে প্রভাদেবীতে একটিমাত্র ঘরের ফ্ল্যাটে থাকা আরম্ভ করেন । দুটি ধর্মের দ্বন্দ্বের কারণে তাঁরা দুজনে সন্তানহীন থাকাই শ্রেয় মনে করেন । এই পর্বে তিনি কোনো সাহিত্যিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না, কোথাও যেতেন না, কারোর সঙ্গে মিশতেন না  । কেবল নিজের মনে লিখতেন । তাঁর কবিতাগুলি সংগ্রহ করে অরবিন্দকৃষ্ণ মেহরোত্রা একটি সংকলন প্রকাশ করেছেন ।

__________________________________________________________________________________________________________________________________________

ধ্বংসের হৃদয়ে

হনুমান মন্দিরের ছাদ ভেঙে পড়েছে দেবতার মাথার ওপর

কেউ তা খেয়াল করে না

.

এব্যাপারে একেবারে নির্লিপ্ত হনুমানদেব নিজে

বোধহয় এরকম মন্দিরই  উনি পছন্দ করেন

.

একটা মাদি নেড়িকুকুর জায়গা করে নিয়েছে সেখানে

নিজের আর বাচ্চাদের জন্য

.

ধ্বংসের হৃদয়ে

হয়তো মন্দিরটা ওভাবেই ওর পছন্দ

.

কুকুরিটা তোমার দিকে আড়চোখে তাকায়

ভাঙা টাইলের ওপর দাঁড়িয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে

.

কুকুরবাচ্চাগুলো ওর ওপর ডিগবাজি খাচ্ছে

হয়তো অমন মন্দিরই ওদের পছন্দ

.

কালো-কান বাচ্চাটা একটু দূরে চলে গিয়েছিল

ওর পায়ের চাপে একটা টালিতে চিড় ধরে গেল

.

ওইটুকুই যথেষ্ট একটা গুবরে পোকার

হৃদয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য

.

আর তাকে দৌড় করতে পাঠানোর জন্য

প্রণামি ফেলার ভাঙা বাক্সের তলায়

.

যে বাক্সটি পালাবার পথ পায়নি

খিলান-পতনের ওজন ফাঁকি দিয়ে

.

জায়গাটা আর পুজোর উপযুক্ত নেই

দেবতাদের বাসাবাড়ি ছাড়া এটা আর কিছুই তো নয়

_________________________________________________________________________________________________________________________________________

দাঁত

হে প্রভু আমার সবকিছু ফাঁস হয়ে গেছে

আমার দাঁত কেমন ঝিকমিক করে

দেহের দুপাশ ব্যথা করে । আমার কপাল

হাই তোলে । আমি ফেটে চৌচির

একটা দানবিক

বেদানার মতন । আমাকে দয়া করে

ছোঁবেন না হে ঈশ্বর দয়া করে

কাছে আসার চেষ্টা করবেন না, কেননা

সবকিছুই তো আমার পেষাইকলের শস্য ।

আমার কুঁচকির দাঁত বেরিয়ে গেছে

আমার উরু খুলে গেছে লোহার

মানবীর মতন । পেটের আঁতগুলো হয়ে উঠেছে চাবুক ।

আমার নাক আমার ওপর হামাগুড়ি দিচ্ছে

বেঁচে ফেরা প্রগৈতিহাসিক গিরগিটির ঢঙে।

আমার কন্ঠ টনসিলটাকে চেবায় । আমি হাসতে থাকি

দুটি ঠোঁটই খেয়ে ফেলার দরুন ।

__________________________________________________________________________________________________________________________________________

একটি বুড়ি

একজন বুড়ি

শার্টের হাতা আঁকড়ে ধরে

হাঁটতে থাকে আমার সঙ্গে

ওর চাই একটি পঞ্চাশ পয়সা

ও বলে যে ও তোমায় নিয়ে যাবে

ঘোড়ার খুরের মন্দিরে

তুমি তা আগেই দেখে এসেছো

তবু ও তোমার পিছু ছাড়ে না

আর শক্ত করে ধরে তোমার শার্টের হাতা

ও তোমায় সহজে ছাড়বে না

তুমি তো জানোই বুড়িরা কেমন হয়

ওরা চোরকাঁটার মতন লেগে থাকে

তুমি ওর দিকে ফিরে তাকাও

ছাড়াবার জন্য

তুমি ব্যাপারটা শেষ করে ফেলতে চাও

তখনই তুমি শুনতে পাও ও বলছে

একজন বুড়ি এ-ছাড়া আর কী-ই বা করতে পারে

এরকম একটা হতভাগা পাহাড়ে

আর তুমি যখন তাকিয়ে আছ

ওর চোখের কোলে যে রেখাগুলো রয়েছে

সেগুলো ওর চামড়ায় ছড়িয়ে পড়ে

আর পাহাড়ে চিড় ধরে যায়

আর মন্দিরে চিড় ধরে যায়

আর আকাশ ভেঙে পড়ে

কাচের বাসনের মতন টুকরো-টুকরো হয়ে

থুতথুরে বুড়ির চারিপাশে

যে একা দাঁড়িয়ে থাকে

আর তুমি তখন হয়ে গেছ একেবারে ক্ষুদ্র

ওই বুড়ির হাতের পাতায় ধরা

খুচরো পয়সা

__________________________________________________________________________________________________________________________________________

আলো

কিছু একটা পচা জিনিসের গন্ধ পাচ্ছিলুম

গন্ধটা এড়াতে যেটুকে সময়

পকেট থেকে আমার রুমাল বের করব

কড়ে আঙুলটা খসে বেরিয়ে এলো আর পড়ে গেল

অন্য হাত দিয়ে তুলে নিলুম সেটা

আর নাক চাপা দেবার আগেই

নাকটা খসে রুমালে চলে এলো

আমি সেটা মুড়ে নিলুম

পকেটে রেখে দিলুম খসে পড়া নাকটা

পোকা হয়ে গেছে কিনা

দেখারও সময় হল না

সব আলো নিভে গেল

__________________________________________________________________________________________________________________________________________

গণেশঠাকুর

তোমাদের গণেশঠাকুরগুলো নিয়ে এসো

আমার চোখের গভীরে তাঁদের বিসর্জন দাও

তাঁদের বলো সার বেঁধে দাঁড়াতে

আমি তাঁদের সবাইকে ডুবি্যে দিতে চাই

__________________________________________________________________________________________________________________________________________

মেঘপূঞ্জ

কে বলেছে

নির্ধারিত সংখ্যায় তোমার  থাকা উচিত

চিবুক

এ কি অতি-আবশ্যক

যে তোমার থাকা উচিত নির্ধারিত সংখ্যায়

তলপেট

কোনোই নিয়ম নেই এ-ব্যাপারে যে

চোখ কোথায় থাকা উচিত

অথবা কোন প্রাণীর

অথবা কতবার

তুমি তাদের পরিবর্তন করতে পারো

তোমার পক্ষে এগুলো বেশ সহজ

কেননা তুমি হলে মেঘপূঞ্জ

এক জানালা থেকে ভেসে

চলে যাও বাতাসের মাঝ বরাবর

ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে

কিংবা তোমার তলপেট বা কাঁধে

চোখে থেকে নাক খুঁটতে বসে

কিংবা তোমার হাঁটুতে

মুখের ভেতর দাঁত খুঁচিয়ে

তোমার পাছা বা তোমার বগলজুড়ে

চলে এসো তাহলে

যেমনভাবে আমি বলছি

এই জানালা দিয়ে প্রবেশ করে

কেনই বা ওই জানালা দিয়ে

বেরোও না

যাতে আমি অন্তত এক-নিমেষ

কড়িকাঠের দিকে শান্তিতে তাকাতে পারি

ভোর-বেলায়

__________________________________________________________________________________________________________________________________________

বাঘ আর ভেড়ার বাঘবন্দি খেলা

কে বাঘেদের পেল আর কে ভেড়াগুলোকে

তাতে কিছুই এসে যায় না

ফলাফল সেই একই :

মেয়েটি জেতে

আমি হারি

কিন্তু অনেক সময়ে ওর বাঘেরা

যখন খেয়ে ফেলার জন্য ঝাঁপিয়েছে

আর আমি অর্ধেক ভেড়ার পাল খুইয়েছি

সহসা সাহায্য আসে অজানা সূত্র থেকে

ওই ওপরে

মরচেপড়া ঢালের বাহক

এতক্ষন পর্যন্ত যে ছিল নিরপেক্ষ

বিজয়প্রাপ্তির একটি ফুল ঝরিয়ে দ্যায়—

হলুদ

এবং  অবান্তর—

খেলার আঁকঘরের ওপর

ফুটপাতে কয়লা দিয়ে দাগ দেয়া

ফেরার পথ বন্ধ করে দ্যায়

একটা বাঘের

আর থামিয়ে দ্যায় অন্যটাকে

আর তারপরেই

ঝরিয়ে দ্যায়

আরকটি ফুল

একইরকম হলুদ

আর একইরকম অবান্তর — কেবল এই যে

সেটি আরও ধিরে-ধিরে নামে

খানাতল্লাসির হুকুম ছাড়াই

যা ওর কানের লতির পাশ দিয়ে

গাল ছুঁয়ে নামে

আর হারিয়ে যায়

ওর লো-কাট ব্লাউজের ভেতরে

যেখানে ও সাধারণত গুঁজে রাখে

ওর চরসের দলা

নিজেকে আরও বেশি বোকা বানাবার জন্য

হালকা নেশাতুর

অথচ আনমনা করে দেবার সুগন্ধে

_________________________________________________________________________________________________________________________________________

স্টেশানের কুকুর

এই জায়গার আত্মা

স্টেশানের কুকুরটার

ঘেও শরীরে বসবাস করে

.

প্রায়শ্চিত্ত করে চলেছে

বিগত তিনশ বছর যাবত

যাওয়া ও আসার গাছের তলায়

.

কুকুরটা নিজের ডান চোখ খোলে

যতক্ষণ লাগে তাকিয়ে এক ঝলক দেখতে

তুমি একজন মানুষ নাকি উপদেবতা

.

কিংবা অষ্টভূজা টাইমটেবল

এসেছ টোকা দেবার জন্য

মাথায় একটু আদরের ছোঁয়া দিতে

.

এবং স্বর্গে নিয়ে যাবার জন্য

কুকুরটা ভেবে দ্যাখে

নাহ সেদিন এখনও আসেনি

About anubadak

আমি একজন অনুবাদক । এতাবৎ রেঁবো, বদল্যার, ককতো, জারা, সঁদরা, দালি, গিন্সবার্গ, লোরকা, ম্যানদেলস্টাম, আখমাতোভা, মায়াকভস্কি, নেরুদা, ফেরলিংঘেট্টি প্রমুখ অনুবাদ করেছি ।
This entry was posted in মারাঠি কবি and tagged . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s